Wednesday, November 30, 2022
বাড়িবই রিভিউএকটা আধখাওয়া চাঁদ ডুবে গেল

একটা আধখাওয়া চাঁদ ডুবে গেল

লেখকঃ রাসেল ওয়াহিদ

মুদ্রিত মূল্যঃ ২৭০৳

প্রথম প্রকাশঃ জুলাই ২০২১

গল্পের সারাংশঃ বনলতা, জলে ভাসতে থাকা কচুরিপানার মতো একটা চরিত্র। ধর্ম, জাত-পাত কিংবা শিক্ষা- তার জন্য আলাদা কোনো পরিচয় বহন করে না। সভ্য সমাজে মাথা উঁচু করে জীবন-যাপনের মতো পরিচয় তার নেই। শরীর বিক্রির টাকায় একটা সংসার চালাতে হয় তাকে। তার কাছে মাথা উঁচু করে জীবন-যাপনের চেয়ে জীবনটা বাঁচিয়ে রাখাই মুখ্য। আমাদের সমাজে এমন হাজারো ‘বনলতা’র হাজারটা জীবন-গল্প আছে। আমরা ক’জন সেসব গল্প জানার কিংবা শোনার আগ্রহ নিয়ে তাদের কাছে পাড়ি জমাই? কিন্তু ‘একটা আধখাওয়া চাঁদ ডুবে গেল’-তে বনলতার গল্প শুনতে এসেছিল বিখ্যাত লেখক ভাস্কর দে ধ্রুব। একসময় বনলতার এই জীবন-গল্প একটা বই আকারে প্রকাশ করেন তিনি। গল্পের আরেক প্রধান চরিত্র বিদেশ ফেরত উৎপল। পেশায় একজন আর্টিস্ট। তার আয়োজিত একটা এক্সিবিশনকে ঘিরে কিছু রহস্য, গল্পের প্রায় শেষ পর্যন্ত টানটান উত্তেজনা সৃষ্টি করে রেখেছে। গল্পের প্রথমদিকে বেণুর সাথে উৎপলের খুনসুটির সম্পর্ক লক্ষ করা গেলেও গল্পের ধারাবাহিকতায় একসময় তা সত্যিকারের ভালোবাসায় রূপ নেয়। কিন্তু উৎপলের দোটানা মনোভাব সেই ভালোবাসায় প্রশ্নবোধক চিহ্ন এঁকে দেয়। সেই প্রশ্নবোধক চিহ্ন বিস্ময়সূচকে পরিণত হয় তখন, যখন গল্পে নামকরা আর্টিস্ট নিলুফা ইয়াসমিনের আগমন ঘটে। তার ঘটানো অপহরণের ঘটনার মাধ্যমে গল্পে আরেকটা সাসপেন্স তৈরি হয়।

উপন্যাসের শেষদিকে নামকরা এই শিল্পীর কাটা মুন্ডু প্রদর্শনের মাধ্যমে চরিত্রটার ইতি টানা হয়।

বনলতা, বেণু— এই দুটো চরিত্রের শেষ পরিণতি দুঃখদায়ক হলেও গল্পের পরিপূর্ণতায় সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। নিলুফা ইয়াসমিন অকালে কেন তার প্রাণ হারালো; উৎপল কীসের কর্মফল ভোগ করছিল; বনলতা, বেণুর শেষ পরিণতি কী হয়েছিল— এসব জানতে হলে আপনাকে পড়তে হবে ‘একটা আধখাওয়া চাঁদ ডুবে গেল’ উপন্যাসটি।

পাঠপ্রতিক্রিয়াআজকাল যেসব গল্প পড়ে আমরা অভ্যস্থ, সেসব গল্পের ভিড়ে এই গল্পটা একদমই ভিন্ন ধাঁচের বলে মনে হয়েছে। গল্পের প্লট, ডেভেলপমেন্ট, চরিত্রের বর্ণনা সবকিছুতেই লেখক তার অসাধারণ লেখার হাতের ছাপ রেখেছেন। বনলতা, তার বন্ধু আতিক, উৎপল, উৎপলের ছোটভাই অমল, তাদের মা বিমলা দেবী, বেণু সবগুলো চরিত্রকে লেখক বেশ সাজিয়ে গুছিয়ে তৈরি করেছেন। বনলতা এবং বেণুর মধ্যকার সম্পর্ক আগে থেকে আঁচ করা গেলেও চমক হারায়নি। ভিন্ন ধর্মের চরিত্রগুলোর বর্ণনা, পরিবার সম্পর্কে বিবৃতি, আচার-আচরণ সবকিছু দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। এটা লেখকের জন্য অন্যতম স্বার্থকতা।

বনলতার জীবন-যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার গল্প প্রথম থেকে শেষ অবধি পাঠককে এক অন্যরকম শিক্ষা দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। বেণু আর উৎপলের অল্পস্বল্প প্রেমের গল্প বেশ স্নিগ্ধ ছিল। আবার, বনলতার সাথে আতিকের ‘না হওয়া’ ছোট একটা প্রেমের গল্পও লেখক তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। উপন্যাসের শেষের দিকে যদিও আতিক চরিত্রটা পাঠকের মন ক্ষুণ্ন করেছে, তবু এই সম্পর্কটা মিষ্টি ছিল। অগণিত ‘বনলতা’-দের স্বপ্ন থাকে, ইচ্ছা থাকে- পরিবারের মুখে দুবেলা ভাত তুলে দেওয়ার প্রয়োজনে সম্পূর্ণ আলাদা যে এক জীবন তারা বেছে নেয় সেই জীবন থেকে বেরিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার। হয়তো সম্ভব। কিন্তু সম্ভব তখন, যখন এই স্বাভাবিক সমাজের ‘আমরা’ তাদের প্রতি সাহায্যের একটা হাত বাড়িয়ে দিতে পারব। লেখক তার লেখার মাধ্যমে বারবার আমাদের কাছে এই বার্তাটা পৌঁছে দেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন এবং তিনি তার চেষ্টায় সফল বলে মনে করি।

নামকরণে সার্থকতা : প্রথম যেদিন লেখকের টাইমলাইনে বইয়ের প্রচ্ছদের ছবি দেখলাম, প্রচ্ছদের সাথে নামের মিল খুঁজার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু কোনো মিল খুঁজে পাইনি। বইয়ের প্রথম পৃষ্ঠা থেকেই উপন্যাসের নামকরণের রহস্যটা খুঁজছিলাম। কিন্তু গল্পের সাথে নামকরণের চেয়ে প্রচ্ছদের মিলটাই বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে হচ্ছিল। অবশেষে ৪৭ পৃষ্ঠায় এসে প্রথম নামকরণের পেছনের কারণ জানতে পেরেছি। বনলতার জীবন-গল্প নিয়ে উপন্যাসের ‘লেখক’ চরিত্র ভাস্কর দে ধ্রুব-র লেখা উপন্যাসটার নাম ছিল ‘একটা আধখাওয়া চাঁদ ডুবে গেল’। তারপর একেবারে শেষ অধ্যায়ে আধখাওয়া চাঁদের সাথে বনলতা কিংবা বেণু চরিত্রের জীবনের পরিণতি মিলিয়ে লেখক যে বেদনাপূর্ণ দৃশ্য অঙ্কন করেছেন, তা প্রশংসনীয়। এবং এখানেই নামকরণের সার্থকতা নিখুঁতভাবে ফুটে উঠেছে।

মন ছুঁয়ে যাওয়া পঙক্তি :

🔹”হ্যাঁ, সে নরকবাসী, সে পাপী, সে অচ্ছুত। কিন্তু এই পাপী-তাপী, অচ্ছুত মেয়ের পয়সাতেই একজন বাবার চিকিৎসা হয়, একটা পরিবারের ভরণপোষণ হয়। এসব কেউ দেখে না। সবাই উঁচুতে বসে নিচের দিকে থুতু ফেলে।”

🔹”আচ্ছা, ওই যে আধখাওয়া চাঁদ, ওর সাথে কি কোনো তফাৎ আছে তার জীবনের? নেই। এতটুকুও তফাৎ নেই। যেন ওই আধখাওয়া চাঁদখানা তারই জীবনের প্রতিচ্ছবি।”

  • সমালোচনা :

🔸এক কথা দুই লাইনে আসার ব্যাপারটা কিছু কিছু লেখকের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলেও ব্যক্তিগতভাবে এই ব্যাপারটা ভালো লাগেনি। বিশেষ করে, প্রতি পৃষ্ঠায় এবং পুরো বই জুড়ে ব্যাপারটা পুনরাবৃত্তি হওয়াতে পড়তে গিয়ে বারবার আটকাতে হয়েছে।

যেমনঃ

  • “কিন্তু পেটে তার দানাপানি পড়েনি। এক ফোঁটাও দানাপানি পড়েনি।”
  • “কিন্তু কেন? কেন এমন হচ্ছে আজ?”
  • “কেন? কেন মনে পড়বে?”
  • “কে চাইবে? চাওয়ার কে আছে তার? কেউ নেই।”
  • ২৩ পৃষ্ঠায় বিমলা দেবীর সংলাপ – “জানিস তো, বুয়ার হাতের রান্না খেতে পারি না।”

হিন্দুরা সাধারণত কাজের মেয়ে/মহিলাকে ‘বুয়া’ সম্বোধন করে না।

  • 🔸৪২ পৃষ্ঠায় “মায়ের ডাক শুনে ক্যানভাসে আঁকিবুঁকি করতে থাকা অমল রঙতুলির খেলা থামাল।” লাইনটিতে উৎপলের জায়গায় অমল চলে এসেছে।
  • প্রথম অধ্যায়ে বনলতা এবং লেখক ভাস্কর দে ধ্রুব চরিত্র দুটোর বর্ণনা শেষে, পরবর্তী ছয় অধ্যায়ে তাদের কোনো গল্প আসেনি। অষ্টম অধ্যায়ে আবার এই দুটো চরিত্রের দেখা মিললেও আমার কাছে মনে হয়েছে, তৃতীয়-চতুর্থ অধ্যায়ে আবার বনলতাকে রাখতে পারলে গল্পের ধারাবাহিকতা আরেকটু সুন্দর হতো।
  • উপন্যাসে ‘লেখক’ চরিত্রটার একটা পরিণতির অভাব বোধ করেছি। ‘চমৎকার শুরু’-তে থাকা একটা চরিত্রের পরিণতি না থাকায় খারাপ লেগেছে।
  • শেষ কথা :

সব মিলিয়ে লেখকের প্রথম উপন্যাস হিসেবে ‘একটা আধখাওয়া চাঁদ ডুবে গেল’ বেশ সুখপাঠ্য মনে হয়েছে। ভিন্ন ধাঁচের শিক্ষণীয় গল্পটি সবার পড়া উচিৎ বলে মনে করি।

লেখকের জন্য ঢের শুভকামনা রইল।

লেখকঃ- সিতাপ পাল

শিক্ষার্থী, বৃন্দাবন সরকারি কলেজ।

ইংরেজি বিভাগ, ২য় বর্ষ।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
সম্পর্কিত প্রবন্ধঃ

মন্তব্য বাদ দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন

সবচেয়ে জনপ্রিয়