Wednesday, November 30, 2022
বাড়িপ্রবন্ধব্যবহার জয় করে মানুষের মন

ব্যবহার জয় করে মানুষের মন

আপনি যেমন প্রত্যাশা করেন মানুষজন আপনার সাথে সুন্দর আচরণ করুক, অনুরূপভাবে বিপরীত মানুষটিও চায় আপনি যেন তার সাথে সুন্দর আচরণ করেন। আপনার আচরণ যত বেশি সুন্দর হবে সবাই আপনাকে ততবেশি ভালবাসবে,  হৃদয়ের গভীর থেকে স্ফীত স্বরে বলবে, ‘লোকটি ভালো’। আবার আপনার আচরণ খারাপ হলে আপনাকে সবাই এড়িয়ে চলবে, ঘৃণা করবে, আপনার থেকে দূরুত্ব বজায় রাখবে।আপনার সুন্দর আচরণ ই আপনার সুন্দর মনের পরিচায়ক। মনে রাখা দরকার- আপনার একটি ভাল কথা যেমন একজনের মন জয় করে নিতে পারে তেমনিভাবে একটু খারাপ বা অশোভন আচরণ মানুষের মনে কষ্ট দিতে পারে, মন্দ কথা যদি আপনার অভ্যাস হয় তাহলে মন্দ কথা ছাড়ুন। মন্দ কথায় কোন লাভ নেই, উপকার নেই বরং এতে ক্ষতি আছে, এতে পাপ আছে, মন্দ কথা আপনার যবান নষ্ট করে, আপনার ব্যক্তিত্ব বিলীন করে, আপনার মন ও চরিত্রকে কলুষিত করে। মন্দ কথা বন্ধুত্ব নষ্ট করে, সখ্যতা ছিন্ন করে, মানুষের সাথে সম্পর্কহানি করে। আল্লাহ তায়ালা মন্দ কথার উপমা দিয়েছেন খুব চমৎকারভাবে- ” আর একটি মন্দকথা একটি বাজে গাছের মতই, সে গাছের মতো যাকে ভূমি থেকে উপড়ে ফেলা হয়, যার কোন স্থায়িত্ব নেই” (সূরা ইব্রাহিম -২৬)।  বিশ্বনবী সাঃ বলেছেন: মন্দ কথা মানুষকে জাহান্নামে উপুড় করে নিক্ষেপ করবে-(তিরমিযি)।

 

ব্যবহার এমন এক শক্তি যা দিয়ে পুরো পৃথিবীকে জয় করা যায়, শত্রুকে পরাজিত করা যায়। আমরা যদি বিশ্বনবী সাঃ এর জীবনীর দিকে লক্ষ্য করি তাহলে দেখবো তিনি তাঁর উত্তম আচরণ আর চরিত্র দিয়ে পুরো বিপক্ষ শক্তিকে তাঁর পক্ষে নিয়ে এসেছেন। আল্লাহ বলছেন-” আর নিশ্চয়ই আপনি সুন্দর চরিত্রের অধিকারী”(সূরা- আল কলম -৪)। রাসূলের (সাঃ) সুমিষ্ট ব্যবহারের সুবাসে সৌরভ ছড়িয়েছিল সর্বত্র। যার সুবাসে প্রতিটি জনপদ থেকে লোকজন তাঁকে দেখার জন্য ছুটে এসেছিলো। আদর্শিক জায়গা থেকে বিরোধীতা করলেও রাসূল সাঃ এর চরিত্র ও আচরণ নিয়ে সকলের বক্তব্য ছিলো এক ও অভিন্ন। বিশ্বস্ততা, নির্ভরতা ও অমায়িক আচরণের অধিকারী বিশ্বনবীকে সবাই ভালবেসে উপাধি দিয়েছিলো আল আমিন (বিশ্বাসী)। তাই বিশ্বাসীদের উচিত রাসূল সাঃ এর জীবনাদর্শ অনুসরণ করা এবং এটি আল্লাহ পাকের বিশেষ নির্দেশনা- তোমাদের মধ্যে যাহারা আল্লাহ্ ও আখিরাতকে ভয় করে এবং আল্লাহ্‌কে অধিক স্মরণ করে তাহাদের জন্য তো রাসূলুল্লাহর মধ্যে রহিয়াছে উত্তম আদর্শ। (সূরা আহযাব -২১)

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা মানুষকে সুন্দর ও উত্তম কথা বলার নির্দেশ দিয়েছেন। ‘তোমরা মানুষের সঙ্গে উত্তম ও সুন্দর কথা বলো।’ (সুরা বাকারা : ৮৩)। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে যার আচার-ব্যবহার সুন্দর, সে আমার সবচেয়ে বেশি প্রিয় এবং আমার সবচেয়ে কাছে থাকবে।’ (সুনানে তিরমিজি)। সবার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়ে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন, ‘তোমরা পিতা-মাতা, আত্মীয়স্বজন, এতিম, অভাবগ্রস্ত, নিকটস্ত প্রতিবেশী, দূরবর্তী প্রতিবেশী, সঙ্গী-সাথি, পথচারী এবং তোমাদের অধিকারভুক্ত দাস-দাসীদের প্রতি সদ্ব্যবহার করবে।’ (সূরা আল নিসা, আয়াত: ৩৬)  যুগে যুগে নবী-রাসুলরা অন্ধকারে নিমজ্জিত, পথহারা, দিশেহারা মানুষদেরকে আলোর পথ দেখাতে সক্ষম হয়েছিলেন সুন্দর আচরণের মাধ্যমে। আজকের দিনে এসেও মানুষকে সত্য, সুন্দর, কল্যাণের পথে আনার ক্ষেত্রে উত্তম ব্যবহার একটি শক্তিশালী মাধ্যম হিসাবে ভূমিকা পালন করছে। আল্লাহ বলছেন- ‘(হে মানুষ) তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও পরকালকে ভয় করে (মুত্তাকি মুসলমান) এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে (মুমিন মুসলমান) তাদের জন্য রাসুলুল্লাহর (সর্বোত্তম চরিত্রের) মধ্যে রয়েছে তোমাদের জন্য উত্তম আদর্শ। (সুরা আহজাব : আয়াত ২১)। কোরআনের এসব আয়াত সমাজের উঁচু-নিচু, সাদা-কালো সবার সঙ্গে উত্তম ও শোভনীয় আচরণ করার নির্দেশ দেয় ইসলাম। শুধু নির্দেশই নয় বরং মানুষের সুন্দর আচরণ আল্লাহর প্রিয়তম ইবাদতসমূহের মধ্যে অন্যতম। হাদিসের বর্ণনা থেকে তা সুস্পষ্ট- হযরত আবু দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন, ‘রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- ‘কেয়ামতের দিন কর্ম বিচারের পাল্লায় বান্দার সবচেয়ে ভারী ও মূল্যবান কর্ম হবে সুন্দর আচরণ। (শুধু তা-ই নয়) আর নিশ্চয়ই সুন্দর আচরণের অধিকারী মানুষ শুধু তার সুন্দর ব্যবহারের বিনিময়েই (নফল) নামাজ ও (নফল) রোজা পালন করার সাওয়াব অর্জন করবে’।(তিরমিজি)।

 

হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, ‘সবচেয়ে বেশি যা মানুষকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে তা হলো- আল্লাহ তায়ালার ভয় ও সুন্দর আচরণ। আর সবচেয়ে বেশি যা মানুষকে জাহান্নামে প্রবেশ করাবে তা হলো- (মানুষের) মুখ এবং লজ্জাস্থান ’ -সুনানে তিরমিজি।  অন্য এক হাদিসে আছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যার আচরণ সুন্দর, আমি তার জন্য সর্বোচ্চ জান্নাতে একটি বাড়ির নিশ্চয়তা প্রদান করছি। -সুনারে আবু দাউদ, অন্যত্র রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘সুন্দর আচরণই নেক আমল। ’ –সহিহ মুসলিম। বিশ্বনবী রাসূলুল্লাহ (সা.) আরও ইরশাদ করেন, ‘অশোভন-অশ্লীল কথা ও আচরণের সঙ্গে ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই। আর যার আচরণ যত সুন্দর তার ইসলাম তত সুন্দর। ’ -মুসনাদে আহমদ

 

সুন্দর ব্যবহার জাহান্নাম থেকে মুক্তির মাধ্যম। আদি ইবনে হাতিম (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘জাহান্নামের আগুন থেকে আত্মরক্ষা করো, যদিও তা খণ্ডিত খেজুরের বিনিময়েও হয়। কেউ যদি তা করতেও সক্ষম না হয়, সে যেন অন্তত ভালো ও সুন্দর ব্যবহার দিয়ে হলেও নিজেকে জাহান্নাম থেকে বাঁচায়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৫৪০)। মানুষের যত সেরা গুণ আছে, তন্মধ্যে অন্যতম হলো সুন্দর করে কথা বলার গুণ। শ্রেষ্ঠ মনীষীরা সুভাষী ছিলেন। আমাদের প্রিয় রাসূল সাঃ ছিলেন শ্রেষ্ঠতম সুভাষী। তিনি হৃদয় স্পর্শী কথা বলতেন। তাঁর কথা শুনলে স্রোতার মনের কষ্ট দূর হয়ে যেতো, মুখে হাসি ফটতো। তিনি সবসময় মন্দ কথার জবাবে সুন্দর কথা বলতেন। তিনি ছিলেন সত্যভাষী, স্পষ্টভাষী, হিতভাষী, স্নিগ্ধভাষী, দৃঢ়ভাষী, শুদ্ধভাষী, সুভাষী। মন্দের জবাব ভালো দিয়ে দেওয়ার নির্দেশনা স্বয়ং আল্লাহ পাক দিয়েছেন -“কেউ যখন তোমাকে সৌজন্যপূর্ণ সম্ভাষণ জানাবে প্রতি-উত্তরে তুমি তাকে তার চাইতে সুন্দর ধরনের সম্ভাষণ জানাও, কিংবা অন্তত ততটুকুই জানাও”।  (সূরা নিসা ৮৬)। সাহাবায়ে কিরাম সুভাষী ছিলেন, সুন্দর কথা দিয়ে তাঁরা বিশ্বজয় করেছেন, যেসব মনীষী বিশ্বজোড়া জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন তাদের প্রধান হাতিয়ার ছিলো সুন্দর ব্যবহার। সুন্দর ও কল্যাণকামী শাশ্বত জীবন ব্যবস্থার নাম ইসলাম। ইসলামের প্রতিটি নির্দেশনাই সুন্দর। এর বাস্তব প্রতিফলন আরও বেশি সুন্দর। দুনিয়ার জমিনে সত্য ও কল্যাণের জীবন ব্যবস্থা হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত ইসলাম। শুধু জীবন ব্যবস্থা হিসেবেই ইসলাম সুন্দর নয়, ইসলামের অনুসারীদের আচার-ব্যবহারও সুন্দর। এসব সুন্দর ও উত্তম আচরণ আল্লাহর কাছে ইবাদত হিসবে বিবেচিত হয়। কুরআনের একটি উপমা দিয়ে আলোচনা শেষ করা যাক- “একটি ভালো কথা একটি ভালো গাছের মত, মাটিতে যার বদ্ধমূল শিকড়, আকাশে যার বিস্তৃত শাখা, সবসময় সে দিয়ে যায় ফল আর ফল। ” (সূরা ইব্রাহিম-২৪-২৫)।

কি সুন্দর উপমা! আপনার একটি সুন্দর কথা, একটি ভালো কথা ঐ গাছটির মতোই কল্যাণময়। আপনার একটি সুন্দর কথা ঐ গাছটির মতই হতে পারে শান্তির বাহক, কল্যাণের কাসিদা, আনন্দের দূত আর অফুরন্ত সুফল দায়ক। আসুন সুন্দর ও অমায়িক ব্যবহারে মনযোগী হই। ব্যক্তি জীবনে রাসূল সাঃ এর অনুপম জীবনাদর্শ অনুসরণ করি। তাহলেই মানুষের মন জয় করে তাদের হৃদয়ের মণিকোঠায় নিজের অবস্থান নিশ্চিত করতে পারবো।

লেখকঃ মুহাম্মদ মেহেদী হাসান

প্রভাষক, তামীরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসা

সম্পর্কিত প্রবন্ধঃ

মন্তব্য বাদ দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন

সবচেয়ে জনপ্রিয়