Wednesday, November 30, 2022
বাড়িবাংলাদেশমানহানি মামলার বিষয়বস্তু

মানহানি মামলার বিষয়বস্তু

প্রত্যেক মানুষের অধিকার যে সে তার সন্মান রক্ষা করে চলবে। যদি কোন ব্যক্তি তার এই অধিকারে হস্তক্ষেপ করে অর্থাৎ তার সন্মান হানি করে তবে সেই ব্যক্তি যে ব্যক্তি সন্মান হানি করেছে তার বিরুদ্ধে আইনত ব্যবস্থা গ্রহন করতে পারবে। মানুষের সম্পদ ও জীবন রক্ষার কথা আবহমান কাল থেকে বলা হয়ে আসছে। কিন্তু মানুষের কাছে তার সুনাম সকল সম্পদের চাইতে বড় সম্পদ। এই সম্পদ একবার হারিয়ে গেলে তা ফিরিয়ে আনা কঠিন। তাই তো প্রবাদে বলা হয়- “তোমার অর্থ হারালো তো যেন কিছুই হারায়নি, তোমার স্বাস্থ্য হারাল তো কিছুটা হারিয়েছো। কিন্তু তুমি তোমার চরিত্র হারালে তো সব কিছু হারিয়ে ফেলেছো।’’

কেউ যদি এমন কোন মন্তব্য করে যার মাধ্যমে কোন ব্যক্তির সন্মান হানি হয়, তবে সেই ব্যক্তি আইনত ভাবে তার কাছ থেকে ক্ষতিপুরন আদায় করতে পারে। প্রখ্যাত আইনবিদ স্যালমন্ড বলেছেন, “যদি কোন ব্যক্তি কারো সম্পর্কে মিথ্যা অথবা মানহানিমুলক কথা বলে যার কারনে ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্থ হয়, আইনের ভাষায় তাকে মানহানি বলে।”  আইনবিদ উইনফিলড আরো সুন্দর ভাবে বলেছেন, “যদি কেউ কোন জ্ঞানি ব্যক্তির কোন বিচক্ষন মুল্যায়নকে বিবৃতির মাধ্যমে অবজ্ঞা প্রদর্শন করে, এবং এই বিবৃতির কারনে মানুষ তার এই মুল্যায়ন থেকে সরে যায় তবে উইনফিলড এর ভাষায় তাকে মানহানি বলা যাবে।”

 

উপরোক্ত সংজ্ঞায়ন থেকে মান হানি হওয়ার জন্য কিছু শর্ত পয়েন্ট আউট করা যায়। তা হলো-

১। বিবৃতি বা অবজ্ঞাসুচক বক্তব্য

২। যেটা নির্দিষ্ট ব্যাক্তিকে বোঝানো হবে।

৩।লিখিত অবজ্ঞা সুচক মন্তব্য।

৪। মন্তব্যটি হবে মিথ্যা ।

৫। মন্তব্যটির কারনে ব্যক্তি অন্যায় ভাবে অসন্মানিত বা ক্ষতি গ্রস্থ হবে।

মানহানি মামলার শাস্তি

বাংলাদেশের আইনে দন্ডবিধি ১৮৬০ এর ৪৯৯ থেকে ৫০২ ধারা পর্যন্ত মানহানি বিষয়ক আলোচোনা করা হয়েছে। ১৮৬০ এর দন্ডবিধির ৫০০ ধারা অনুযায়ি এই মামলার শাস্তি হবে ২ বছরের কারাদন্ড অথবা সমপরিমান অর্থদন্ড। তবে কারাদন্ড হবে মিনাশ্রম কারাদন্ড।

বাংলাদেশ তথা বর্তমান বিশ্বের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী মানহানিযে শুধু সাধারন ভাবেই হবে তা কিন্তু নয়। অনলাইনেও মানহানি হয়। যদি কোন ব্যক্তি অনলাইনে কারো মানহানি মামলা করে তাহলে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ এর ২৯ নং ধারা অনুযায়ী তার ৩ বছরের বিনাশ্রম কারাদন্ড অথবা ৫ লক্ষ টাকা অর্থ দন্ডে দন্ডিত হবে। তবে যদি কেউ একই ঘটনার পুনারাবৃতি ঘটায় তার ৫ বছরের কারাদন্ড অথবা ১০ লক্ষ টাকা অর্থদন্ডে দন্ডিত হবে।

মানহানি মামলা যে শুধু ফৌজদারি হবে তা কিন্তু নয়। এই মানহানি জন্য যদি কেউ আর্থিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয় তাহলে সে ক্ষতিপুরন আদায়ের জন্য দেওয়ানি  মামলায় ক্ষতিপুরন আদায় করতে পারবে।

তবে মানহানি মামলা হলেই পুলিশ আপনাকে গ্রেফতার করতে আসবে না। মামলা হলে আদালত থেকে বিবাদি পক্ষকে আইনি নোটিশ পাঠানো হবে নির্ধারিত তারিখে তার কাছথেকে যৌক্তিক ব্যাখ্যা শোনার জন্য। যদি তিনি নির্ধারিত তারিখে হাজিরা না দেন তাহলে তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারী করা হবে। তখন পুলিশ আপনাকে গ্রেফতার করতে পারবে।

তাহলে কি চোরকে চোর বলা যাবে না? ডাকাত কে ডাকাত বলা যাবে না? বললে কি মানহানি মামলায় শাস্তি পেতে হবে? উত্তর হবে না ।আইনে কিছু ব্যাতিক্রম অবস্থার কথাও বলা আছে যেগুলো বললে মানহানি হলেই আপনি শাস্তি পাবেন না ।তা হলো-

১। জনগনের কল্যানে কারো প্রতি সত্য কথা বলে ইজ্জত নষ্ট করলে মানহানি হবে না।

২।সরকারি যে কোন বিষয়ের প্রশ্নে কোন ব্যাক্তি তার মতামত ব্যাক্ত করলে তা মানহানি হবে না।

৩। আদলতের কার্যবিবরনির প্রতিবেদন প্রকাশ করা মানহানি হবে না।

৪।যে কোন জনসমস্যা সম্পর্কে কোন ব্যাক্তি অভিমত প্রকাশ করলে তা মানহানি হবে না।

৫। গন অনুষ্টানের বিষয় সম্পর্কে কোন মন্তব্য করলে তা মানহানি হবে না।

৬।কোন বিষয়ের প্রতিকার চেয়ে কারো কাছে অন্য ব্যক্তি সম্পর্কে অভিযোগ করলে তা মানহানি বলে গন্য হবে না।

কিভাবে মানহানি মামলা করা যাবে

মানহানির জন্য ফৌজদারি ও দেওয়ানি দুই ভাবে মামলা করার সুযোগ আছে ।

ফৌজদারি আদালতে নালিশি মামলা হিসাবে মামলা দায়ের করতে হয়। যিনি মানহানির শিকার হয়েছেন তিনি আদালতে জবানবন্দির মাধ্যমে মামলা দায়ের করতে পারবেন।কেউ যদি অনলাইনে বা অন্য কোন মাধ্যমে মানহানির শিকার হবে তবে থানায় এজহারের মাধ্যমে মামলা দায়ের করতে পারবেন।

মানহানি অনলাইনে হলে সাইবার ট্রাইবুনালে মামলা করা যায়।

মানহানির জন্য দেয়াওয়ানী আদালতে ক্ষতিপুরন দাবি করে মামলা দায়ের করা যাবে।এ মামলা করতে হলে দাবিকৃত ক্ষতিপুরনের টাকার উপর কোর্ট ফি জমা দিতে হবে। মামলায় বাদি পক্ষ জয়ী হলে ক্ষতি পুরন আদায় করতে পারবে।

২০২২ সালের সবচেয়ে আলোচিত মানহানি মানহানি মামলা গুলোর মধ্যে একটি হলো ডাক্তার জাফরুল্লাহ চৌধুরির বিরুদ্ধে ছাত্র ইউনিয় নেতা সাইফ রুদাদ এর মামলা।

মামলার এজহার সুত্রে যানা যায় ২ ফেব্রুয়ারি ২০২২ সালে ডাঃ জাফরুল্লাহ চৌধুরি জাতীয় প্রেস ক্লাবে ন্যাশনাল ড্যমোক্রেটিক পার্টির একটি সভায় তিনি বলেন  -কথিত যুদ্ধঅপরাধের দায়ে দন্ডিত আব্দুল কাদের মোল্লা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ছাত্র ইউনিয়নের রাজনিতি করতেন।তিনি প্রকৃত যুদ্ধ অপরাধি ছিলেন না।তাকে ফাসি দিয়ে তার প্রতি অবিচার করা হয়েছে। তিনি সিকৃতি দেন যে আব্দুল কাদের মোল্লা যুদ্ধঅপরাধি ছিলেন না। তার এই বক্তব্যের উপর ভিত্তি করে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন শরিয়তপুর জেলা সভাপতি সাইফ রুদাদ শরিয়তপুর জেলা দায়রা আদালতে মামলা রজু করেন।

সাইফ রুদাদ এর অভিমত যে ডাঃ জাফরুল্লাহ মুক্তিযুদ্ধের সময় কাদের মোল্লার ছাত্র ইউনিয়নের রাজনিতির সাথে জরিত থাকার বিষইয়ে তিনি কথা বলে তিনি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সাথে ছাত্র ইউনিয়নের বিরোধ সৃষ্টির অপচেষ্টা চালিয়েছেন ।মামলাটি আদালত আমলে নেন এবং আদালত ডাঃ জাফরুল্লাহ চৌধুরির বিরুদ্ধে সমন জারী করেন।

লেখকঃ এস এম মুহতাসিম বিল্লাহ 

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
সম্পর্কিত প্রবন্ধঃ

মন্তব্য বাদ দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন

সবচেয়ে জনপ্রিয়