Wednesday, November 30, 2022

লোপা

অনেকদিন পর লোপাকে মনে পড়লো, অবশ্য কারণ আছে। পত্রিকার পাতায় লোপার বয়সীদের নির্মম খবর গুলো বাধ্য করেছে লোপাকে মনে করতে। বাবার পরিচয় সমাজে দিতে না পেরে নবজাতককে পাওয়া যাচ্ছে ডাস্টবিনে, নর্দমায়, বস্তায়। একটা মানব দেহকে টেনে নিয়ে যায় কুকুর বিড়ালে। হয়তো এই ভাবেই……..

না আর বলতে পারছিনা। আচ্ছা লোপার কি মনে পড়ে সেই সন্তানের কথা। বর্তমানে কি কোন রকম প্রভাব পড়েছে সেই অতীতটা। লোপার কৈশরের সেই কষ্ট আর দুঃখের কথা জানতাম আমরা কয়েকজনে। ৮ম শ্রেণীতে পড়তো আমাদের লোপা। দুই বোন এক ভাই আর মা এই হল লোপাদের সংসার। লোপার মা অন্য ৮/১০ জন সাধারণ মায়েদের মত ছিলেন না। একটু পাওয়ারফুল মহিলা, নেত্রী নেত্রী ভাব। গ্রামের বিভিন্ন জায়গায় উনার পদচারণ, বিচার শালিসিও করতেন গ্রামের অন্য মাতাব্বরদের সাথে। ওর বাবা থাকতেন বিদেশে। লোপার পড়ালেখা ভাল করার জন্য গৃহশিক্ষক ঠিক করা হয়। গৃহশিক্ষক ছিলেন ওর বাড়ীর এক চাচা। গ্রামে বা শহরের মায়েরা এখন সন্তানদের লেখাপড়া নিয়ে খুব সচেতন। গ্রামের পরিবেশ, তার উপর নেত্রী ভাবের লোপার মা তেমন করে বসে বসে সন্তানদের পড়ালেখা দেখতেন না। লোপা আর তার ভাই-বোনেরা দিনের বেশিরভাগ সময় ঘরে থাকতো। সময়মত স্কুলে যাওয়া, খাওয়া দাওয়া আর গৃহশিক্ষকের কাছে পড়া। মা ব্যস্ত থাকেন গ্রাম নিয়ে, গ্রামের তথাকথিত বিচার আচার নিয়ে। এইভাবে যায় লোপার দিনগুলো। কয়দিন যাবৎ লোপা স্কুলে আসে না। খোঁজ নিয়ে জানতে পারি ও অসুস্থ, প্রায় ১০/১৫ দিন পর লোপা স্কুলে আসে। চেহারা মলিন গলার মাঝে কালো একটা সুতা আর শরীরের মাঝে কিসের যেন একটা কষ্ট। সব মিলিয়ে লোপাকে দেখতে খুবই দুর্বল আর অপুষ্টি দেখায়। জিজ্ঞেস করি,

– কি হয়েছে তোর?

– না কিছু না, ক’দিন যাবৎ শরীর ভাল না। কেমন জানি দুর্বল লাগছে। খুব একটা খাওয়া দাওয়া করতে মন চায় না। মাঝে মাঝে বমি বমি ভাব হয়। পড়ালেখা করতে মন চায় না।

এইভাবে গড় গড় করে বলছে লোপা। ওর দিকে তাকিয়ে খুব মায়া হল। এরপর প্রায়ই সময় পেলে আমরা ওর সাথে গল্প করতাম। আর একটু একটু করে বুঝতে পারি লোপা কি যেন ভাবে। বেশিরভাগ সময় আনমনা হয়ে থাকে। মাঝে মাঝে লোপাকে এটা সেটা কিনে খাওয়াতাম আমরা। লোপা বলে,

– জানিস মা আমার এই অবস্থা দেখে বলে আমার গায়ে নাকি বাতাস লেগেছে। তাই গলায় এই কালো সুতা দিয়ে দিয়েছে।

লোপার গলার সুতাটা যেন ওকে আরো রোগা করে দিয়েছে। গলার হাড়গুলো বের হয়ে যেন বিউটি বস্ক তৈরি হয়েছে। কোন কোন সময় আবার ওকে নিয়ে হাসাহাসি করতাম আমরা।

এইভাবে লোপার ১ম পরীক্ষাটাও ভাল হয়নি। পরীক্ষার রেজাল্ট বের হল। লোপার মনে আরো কষ্ট। সময়তো কারো জন্য বসে থাকে না ভাল ফল আর খারাপ ফল সময় চলছে তার গতিতে। দিন যায় মাস যায়। সবাই সবার বাড়ির কাজ পরীক্ষার পড়া নিয়ে ব্যস্ত। সেদিন যখন স্কুলে আসলাম দূর থেকে দেখি লোপা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। আমায় দেখে একটু হাসি দিয়ে বলল,

– তোরা পড়ালেখা নিয়ে ভালই আছিস। আমার হয়ত আর পড়ালেখা হবে না।

– কি হল তোর?

কিছুই বলছে না। আজ লোপা স্কুল ড্রেসের সাথে বড় একটা ওড়না পরেছে। দেখতে অন্যদিনের চাইতে আলাদা। বাড়তি ওড়নার কথা জিজ্ঞাস করাতে বলল,

– মা বলছে এখন থেকে এই ওড়নাটা পড়তে হবে।

– একটু হেসে বললাম, কয়দিন পর পর তোর মায়ের মাথায় ভূত চাপে তাই এমন করে। এখন দেখি তোর মায়ের গলায় কালো সুতা দিতে হবে।

ক্রমান্বয়ে লোপা আমাদের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। স্কুলে আসলে চুপচাপ বসে থাকে। সব সময় মাথায় কাপড় দিয়ে শরীর ঢেকে বসে থাকে। খুব একটা হাঁটাচলা করে না। ওকে দেখে আমরা কিছুই বুঝতে পারি না। হঠাৎ একদিন লোপা দরজার মাঝে দাঁড়ানো। আমি তাড়াতাড়ি বের হতে গিয়ে ওর সাথে আমার ধাক্কা খায়।

– এই লোপা তুই কি খুব বেশি ভাত খাস। দিনদিন এইভাবে তোর পেট বড় হচ্ছে কেন? তোর মাকে বলিস তোকে ডাক্তার দেখাতে।

কথাগুলো শুনে লোপা কিছুই বলল না, শুধু ফ্যালফ্যাল করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমিও তেমন কিছু বললাম না। ৫/৭ দিন পর লোপাদের পাশের বাড়ীর পলি বলে,

– আচ্ছা লোপার কি চুপে চুপে বিয়ে হয়েছে, মনে হয় পেটে বাবু আছে।

আমরা কথাটা শুনে হাহাহা করে হেসে উঠি, অবাক হই। বলি,

– এ আবার কেমন কথা। ওর বিয়ে হলে আমরা জানব না। ওরতো মাত্র ১৪/১৫ বছর বয়স। এই বয়সে কিসের বিয়ে।

পলি, আমি, বেবি আর সানু গিয়ে লোপার পাশে বসি আর জানতে চাই, পলি বলে,

– লোপা তোর কি হয়েছে আমাদের বল।

লোপার চোখ দিয়ে পানি ঝরতে শুরু করে আর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,

– হারিয়ে গেছে আমার কৈশরের দিনগুলো। আর কখনও আমার জীবনে আসবে না তোদের মতো এই আনন্দের দিনগুলো। আমি ধ্বংস হয়ে গেছি নিঃস্ব হয়ে গেছি। আমাকে তোরা আর কখনও কাছে টানবি না। আমি তোদের থেকে অনেক দূরে চলে যাব।

চোখের আর নাকের পানির সাথে এইভাবে বলছে লোপা। চোখের পানি মুছে দিয়ে বলি,

– সব আমাদের খুলে বল।

তখন দীর্ঘ একটা দম নিয়ে লোপা বলতে থাকে,

– আমার গৃহ শিক্ষক (চাচা) মাঝে মাঝে আমার সাথে অন্য ধরনের কিছু কথা বলতো। মাকে বলতাম, মা কিছুই বলতো না। একদিন উনি আমাকে একটা জুস খেতে দেয় আমি খাই। তারপর শরীরটা ঘুমের ভাব হয়। মা বাসায় ছিল না। তেমন কিছু বলতে পারি না। যখন বুঝতে পারি ঘুম শেষ উঠে দেখি আমার শরীরের নিচের দিকে রক্ত দিয়ে ভরা। খাটের উপর আমি শুয়ে আছি, জামাটা ছেঁড়া। আমি নষ্ট হয়ে গেছিরে। স্যারকে বলেছি আমার কি হয়েছে? স্যারকে বলে,

“বেশি পড়ালেখার জন্য তোমার শরীর খারাপ হয়েছে। কয়দিন বিশ্রাম নেও আমি কিছুদিন আসব না তুমি সুস্থ্য হলে আসব।”

এই বলে স্যার ২/৩ দিন পর গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে যায়। মাকে বলেছি মা খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি। স্যারকে অনেক খুঁজেছি। পাইনি, মা আমার গলায় এই সুতা আর বড় ওড়নাটা দিয়েছে। মা বলেছে কাল আমাকে খালার বাড়ি নিয়ে যাবে।

আমরা সবাই চুপ করে ওর কথাগুলো শুনছি বলার কোন ভাষা আমাদের মুখে ছিল না। শব্দহীন পরিবেশ। যেন কোথায় ও কোন ধ্বংসের পর সব স্তব্ধ হয়ে গেছে। আমাদের বিজ্ঞানের ম্যাডাম (ফরিদা বেগম) রুমে ঢুকলো। আর বললেন,

– তোমাদের সাথে লোপার ব্যাপারে আমার কিছু কথা আছে। তখন ম্যাডামকে আমরা সব খুলে বলি।

ম্যাডাম বলছে,

– আমি তো কিছুই বুঝতে পারি না, দেখি কি করা যায়।

কিছুই করতে পারল না ম্যাডাম, লোপা বাসায় গেল। এরপর এক মাস লোপা আর স্কুলে আসেনি। আমাদের করার কিছুই ছিল না। খোঁজ নিয়ে জানতে পারি লোপার মা ওকে নিয়ে দুরে এক খালার বাসায় বেড়াতে গিয়েছে। এক মাস পর লোপা স্কুলে এসেছে। ওর দৈহিক বর্ণনা দেবার আজ আর কিছুই নেই। কঙ্কালের মত একটা শরীর, হাড়গুলো যেন কিছু একটা বলতে চায়। এই ঘৃণার পৃথিবী থেকে ছুটি চায়। জানতে চাই কি হয়েছে কোথায় ছিলি সব খুলে বল। লোপার মুখের কথা, মা আমায় ডাক্তার দেখাবে বলে নিয়েছে। অনেক ওষুধ খেতে দিল এরপর তেমন কিছু আমার মনে নেই। মাঝখানে একটুর জন্য যখন জ্ঞান ফিরে আসে দেখি আমার পাশে ফুটফুটে একটা কন্যা সন্তান আর কিছুই বলতে পারব না। প্রায় এক সপ্তাহ পরে যখন আমি সুস্থ্য হই কান পেতে শুনি মা আর খালার কিছু কথা। ওনারা বলছেন, “বাচ্চাটা ঠিক ছোটবেলার লোপাই হয়েছিল।” এত সুন্দর খুব মায়া হয়েছিল তাদের কিন্তু কোন মায়াই তাদের মনকে নরম করেনি, সমাজের নিষ্ঠুরতার কথা মনে রাখতে দেয়নি। ওরা বাচ্চাটাকে জীবন্ত মাটি চাপা দিয়ে দিয়েছে। এইসব কথা শুনে আমি নির্বাক হয়ে গেছি। মাকে বলেছি মা আমার কি হয়েছে মা বলল আমার পেটে টিউমার হয়েছে। আমি যে সব জানি, মা আর খালা তা জানেন না।

আর কি বলবে লোপা আমাদের। আমরাও কোন কথা খুঁজে পাচ্ছি না। আমরা ওর চোখের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। ওর চোখ যেন অনেক কথা বলতে চায়। চোখের ভাষা যেন এইভাবে বলছে আমাদের। এইভাবে সেই দিনটা আমাদের পার করতে হয়। কোন উত্তর আমাদের জানা নেই কিন্তু লোপার চোখে আছে অনেক প্রশ্ন। লোপার প্রশ্নগুলোর উত্তর কি দিতে পারবে আমাদের সমাজ। এইভাবে হাজার হাজার লোপাদের প্রশ্নের মুখোমুখি আজ আমাদের দেশটা। অথচ এই দেশকে স্বাধীন করার জন্যে লোপাদের মত অনেকে জীবন হারিয়েছে। আজ যারা এইভাবে সমাজ থেকে নিস্তব্দতার মাঝে হারিয়ে যাচ্ছে তাদের কে কোন দলে ফেলব আমরা? লোপা পরের দিন স্কুলে এসে আমাদের বলে,

এই পর্যন্ত আমার মাঝে হাজারটি প্রশ্ন তৈরী হয়েছে। তোরা কি পারবি আমার মাত্র কয়টি প্রশ্নের উত্তর দিতে।

  • কেন আমি ভাল পড়ার জন্য গৃহশিক্ষকের কাছে পড়তে গেলাম?
  • কেন স্যারের দেওয়া জুসটা খেলাম?
  • কেন আমি নষ্ট হয়ে যাবার কথা মা ছাড়া কাউকে বলতে পরিনি?
  • কেন পেট বড় হবার কথা বুঝতে পারলাম না? কেন?
  • মায়ের কাছ থেকে পালিয়ে গেলাম না কেন? স্যারের খোঁজ করতে পারলাম না?
  • এক মুহূর্তের জন্য কেন আমার জ্ঞান আসল?
  • কেন আমি আমার কষ্টের লজ্জার ফসলটাকে বুকে তুলে নিতে পারলাম না?
  • কেন সারা জীবন একটা সন্তানের মা হয়ে বেঁচে রইলাম না?
  • কেন দরজার পাশে দাঁড়িয়ে মা আর খালার কথাগুলো শুনলাম?
  • কেন আজও আমি বেঁচে আছি?
  • বলনা তোরা উত্তর দে তোরা কে আমি?
  • আমি কি মানুষ, নারী  নাকি শুধুই এই সমাজের ধর্ষিতা?
  • আমার কৈশরটা কোথায় হারালো?

কিছুই বলতে পারলাম না আমরা, এটা কি লোপার ভাগ্য নাকি নিয়তি। কোনটা আসল, ভাগ্য নাকি নিয়তি। আচ্ছা ভাগ্য আর নিয়তি কি একই নাকি আলাদা। আমাদের দেশের আনাচে কানাচে রয়েছে এমন অনেক লোপা ওরা নিজের কষ্টের কথাগুলো বলতে চায়। ওরা সমাজের মাঝে ওদের একটা ঠাঁই খুঁজে নিতে চায়।

লেখক: রহিমা আক্তার মৌ

 সাহিত্যিক, কলামিস্ট প্রাবন্ধিক

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
সম্পর্কিত প্রবন্ধঃ

মন্তব্য বাদ দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন

সবচেয়ে জনপ্রিয়