25 C
Dhaka
Wednesday, December 6, 2023
বাড়িপ্রবন্ধটিনএজ মন; সমস্যা ও সমাধান

টিনএজ মন; সমস্যা ও সমাধান

তেরো থেকে উনিশ বছর বয়স সময়টাকে সংক্ষেপে টিনএজ ধরা হয়। টিনএজ খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা অংশ জীবনের। কৌতূহলে ভরা, উদ্দীপনাপূর্ণ, দুরন্ত সময়। অধিকাংশ অভিভাবকরাই এই বয়সী বাচ্চাদেরকে শেখাতে শুরু করেন বেশি কৌতূহল ভালো না। কৌতুহলও যে একটা জ্ঞান চর্চার ক্ষেত্র সেটা তারা বোঝাতে পারেন না। একেকটা বয়সে একেক ধরনের চিন্তা, ভাবনা মাথায় আসে। যার অনেকটাই আশেপাশের পরিবেশ দ্বারা প্রভাবিত হয়। পরিবারে সবাইকে যথাসম্ভব মূল্যবোধ শিক্ষা দিয়ে বড় করা হয়। কিন্তু সেটার স্থায়ীত্বে ভাঙন ধরে টিনএজে এসেই। “মেয়েদের সম্মান করতে হবে”, “ছোটদের স্নেহ করতে হবে”, “বড়দেরকে শ্রদ্ধা করতে হবে” এসবের উল্টো চিত্র তারা বাড়ির বাইরের পরিবেশ দেখে জেনে যায়। তারা বুঝে যায় এসব শিষ্টাচার না মেনেও দিব্যি চলা যায় সমাজে।

টিনএজাররা শৈশব পেরিয়ে একটু একটু করে বাইরের জগৎ চিনতে শুরু করে। ঘরের অনুকূল পরিবেশের সাথে যখন বাইরের প্রতিকূল পরিবেশ মিলে না তখনই শুরু হয় মূল দ্বন্দ। তার ভালো সত্তাকে বাইরের দুনিয়ার  সাথে টিকিয়ে রাখার লড়াই।

প্রাইমারি লেভেল পর্যন্ত বাচ্চাদের তবু পারিবারিক শিক্ষায় আবদ্ধ রাখা যায়। কিন্তু হাইস্কুল অর্থাৎ বয়স তেরোতে গড়াতে না গড়াতেই আরেকটা বিশাল রংচংয়ে নতুন মঞ্চের সাথে দেখা হয় টিনএজারদের। একেকজনের একেক জিনিসের উপর কৌতূহল, আগ্রহ থাকে। নানারকম পরিবার থেকে আসা কিশোর-কিশোরীদের,  ভিন্ন ভিন্ন চিন্তা-ভাবনা থাকে।

বেশিরভাগ স্কুলে ক্লাস সিক্স থেকে ক্লাস টেন পর্যন্ত সময়টায় “কে বেশি পড়াশোনা পারে” তার চেয়ে “কে বেশি সুন্দরী” “কার চুল বেশি ঘন”, “কার উপর ছেলেরা বেশি ক্রাশ খায়”, “কোন ছেলেটা মেয়েদের বেশি পাত্তা পায়”, “কে তার টিফিনের খাবার খাওয়ার পরেও বান্ধবীকে নিয়মিত দামি উপহার দেওয়ার মতো টাকা বাসা থেকে আনতে পারে” এসব বিষয় নিয়ে তুমুল আলোচনা হয়। এমন অবস্থায় কৌতূহল বা ধ্যান-জ্ঞান এর মোড়টা “পড়াশোনা” থেকে সরে  “নিজেকে কীভাবে সুন্দর দেখানো যায়” আর “টাকা হাতে রাখার উপায় কী” সেদিকে চলে যায়। পড়াশোনায়, খেলাধুলায় টপ করার চেয়ে “একটা প্রেমও কখনো কেউ নিবেদন করেনি আমায়” বা “এই পর্যন্ত একটা ধামাকা না করতে পেরে কারো নজরে আসতে পারলাম না” এই ভাবনাগুলো কুড়ে কুড়ে খায়৷ এটাই টিনএজ পিরিয়ডের স্বাভাবিক ভাবনা। একটু ভালো চেহারার রিকশাওয়ালা, ঝালমুড়িওয়ালাও যদি বিশেষ দৃষ্টিতে তাকায় সেটাও উঠতি বয়সের কিশোরীদেরকে পুলকিত করে। একটা সুন্দরী মেয়ের সাথে একটু কথা বলতে পারার মধ্যে অনেক বীরত্বের আনন্দ অনুভব করে নবীন কিশোররা। রঙিন চশমায় দুনিয়া দেখার বয়স এটা।

পড়াশোনায় এগিয়ে থাকার গৌরবকে পাশ কাটিয়ে অনেকের কৌতূহল দামি ফোন, সুন্দর ছবি, ক্রাশ পটানোর ধান্দা এগুলোর উপর চলে আসে। এই কৌতূহলটাই ভয়ংকর।

সেক্ষেত্রে বাচ্চাটা ভালো পরিবারের হলে  বাধাও আসে অনেক। সবমিলিয়ে এত বাজে অবস্থা সৃষ্টি হয় ছোটবড় অনেক আপত্তিকর ঘটনা শয়তানের ধোঁকায় পড়ে ঘটে যায় তাদের জীবনে।  একটা মানুষের ভালো-মন্দ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলো তার আশপাশ থেকেই অর্জিত হয়। পরিবার তাকে শেখায় কীভাবে টিকে থাকতে হবে, পরিবেশের সাথে। যখন বাইরের পরিবেশ  এবং তার শেখার পরিধির মধ্যে বিস্তর ফারাক এসে যায়, তখন মানিয়ে নিতে গিয়ে সে করে বসে ভুল। সেই সামান্য ঘটনাগুলোই আবার তার কাছে বিশাল মনে হয়৷ সাংঘাতিক বিপজ্জনক এই সময়টা। সুকান্তের আঠারো বছর বয়সের “দুর্যোগে হাল ঠিক মতো রাখা ভার” লাইনগুলোর মতো।

পড়াশোনা থেকে দূরে ছিটকানো, পরিবারের সাপোর্ট পাবে কি-না সে ব্যাপারে সন্দিহান থাকা, তারপর মুখ ফসকে মনের যাবতীয় কৌতূহল, কালো অধ্যায়ের দুয়ার খুলে দেওয়া যায় এমন কাউকে ভরসা করেও এই বয়সের মানুষগুলো অনবরত ধাক্কা খেতে থাকে। তাদেরকে তাদের মতো করে কেউ বুঝতে পারে না। বয়সটা এমনিতেই দুর্বিষহ, এর মাঝে দোষারোপ করে করে, তাদের জীবনকে কাছের মানুষরাই করে তোলে আরও অসহনীয়।

যারা ভালো পরিবেশে, নৈতিকতা, মূল্যবোধ শিখতে শিখতে বড় হয় তাদের কাছে সামান্য একটা পাপই অনেক বড় বলে মনে হয়। খারাপ কাজ করে অনভ্যস্ত কিশোর-কিশোরীদের হঠাৎ এত তীব্র অনুশোচনা হয় যা ভবিষ্যতে তার জন্য হয়ে ওঠে হুমকিস্বরূপ।

মানুষ যত শক্তিশালীই হোক না কেন জীবনে জোয়ার-ভাটা আসবেই। কিন্তু থেমে গেলে হবে না। যা করে ফেলেছি তা নিয়ে এত ভেবে মাথা ব্যথা বাধালে হবে না।

আমি কী ছিলাম, কী হতে চাই, কী হওয়া সম্ভব এসব ভাবতে হবে। টিনএজে আসলে জীবনের কিছুই দেখা হয় না। তেরো থেকে উনিশ পর্যন্ত বয়সটা পুরোটাই জীবনের শেখার সময়। এসময়টায় পড়াশোনা, কৌতূহল, খেলাধুলা, জ্ঞান, বিতর্ক, ভুল, অপরাধ সবকিছুই একেকটা এক্সপেরিমেন্ট হিসেবে কাজ করে৷ কিন্তু এটুকুতে অংশগ্রহণ করেই মোটেও মনে করে ফেলা যাবে না আমি অনেক দেখে ফেলেছি। আমার দ্বারা অনেক কিছু হয়ে গেছে আমি সেরা। কিংবা আমি খারাপ, আমি বিপথগামী হয়ে গেছি, আমার দ্বারা কিছুই হবে না।

নিজের কাছে নিজের পূর্ণতা, অপূর্ণতা সব স্বীকার করে সামনে এগিয়ে যেতে হবে। নিজের সত্যিকারের স্বপ্ন, চাহিদা আর কোথায় আছে আসল পূর্ণতা, কোনগুলো প্রকৃত অর্জন সেগুলোকে চিনতে হবে। মুঠো ভরে ভরে সেগুলোকে পুরে ফেলতে হবে নিজেদের ঝুলিতে। মোটেও অবসাদগ্রস্ত, বিষণ্ণ হওয়া চলবে না। যা হয়েছে হয়ে গেছে, নতুন কোনো ইতিহাস তৈরি করতে হবে এবার।

হারানো আমির গল্পগুলোকে জ্যান্ত করার জন্য উঠে পড়ে লাগতে হবে আবার। মুখে মুখে সেই দুর্দান্ত আমির গল্প। কী দারুণ ব্রেইন! কী দারুণ খেলে! কী ভালো গায়! কী ভালো আঁকে!  অথবা কারো সম্পর্কে ভালো বললে গোপনে জাগা সেই ইচ্ছাগুলো,” ইশ! আমাকে নিয়েও যদি এমন করে সবাই গল্প করত…”

টিনএজে এসেই যারা থমকে যাচ্ছে, তারাও একসময় পরিণত হয়। ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে যায়। তাই সঠিক প্যারেন্টিং  এবং টিনএইজ কেয়ার নেওয়াটা প্রত্যেক পরিবারের মা এবং অভিভাবকদের জন্য খুবই জরুরি। সঠিক কৌতূহল, কোন জিনিসটা এখন জানা দরকার, জগতে নিষিদ্ধ বলে কিছু নেই, আঠারো প্লাস ব্যাপারগুলা সংক্ষেপে বুঝিয়ে বলা, প্রত্যেকদিনের গল্প শোনা, কোনো কারণে সে নিজেকে ছোট ভাবছে কি-না। বিশেষ করে সৌন্দর্য, দামি ফোন, ভাব দেখানোর বাহাদুরির দিকে পিছিয়ে পড়ে আছে বলে হীনমন্যতার শিকার হচ্ছে কি-না খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে খেয়াল রাখতে হবে। সন্তানের ভালো বন্ধু হতে হবে বাবা-মাকেই।

আমার খুব কাছের একজন ক্ষ্যাপা মানুষ আছে। সে পূর্ণিমার রাতে বাইকের হেডলাইট অফ করে চাঁদের আলোয় ঘুরে বেড়ায় গ্রাম থেকে বন্দর। সে যদি কখনো প্রধানমন্ত্রী হতো তাহলে না-কি বাংলাদেশের প্রত্যেকটা মেয়ের মা হওয়ার আগে পরীক্ষা নিত। অর্থাৎ মা হতে গেলে মিনিমাম যোগ্যতায় উত্তীর্ণ হতে হবে। সন্তানের পুষ্টিজ্ঞান, সন্তানকে লালন-পালন করার সঠিক পদ্ধতি সম্পর্কে ধারণা আছে কি-না তা জানতে হবে। মা হওয়ার জন্য সার্টিফিকেট নিয়ে তারপর পরবর্তী স্টেপ নিতে হবে।

খুব পছন্দ হয়েছিল কথাটা। আমারও মনে হয় একজন যোগ্য মায়ের মূল্য অপরিসীম। সোনা তৈরি করার আসল কারিগর এই মায়েরাই। প্রপার প্যারেন্টিং আর টিনএজ কেয়ারটা ঠিকঠাক করতে পারলে পুরো সমাজের দৃশ্যপটটাই পরিবর্তীত হয়ে যেত। অবস্থান, বয়সভেদে পৃথিবীতে তৈরি হতো নতুন নতুন সোনার মানুষ। যারা একে অপরকে ছোট করে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাওয়ার চিন্তা ভাবনা করে না। সবাই মিলে সেরা হওয়ার, নতুন নতুন সুন্দর জিনিস শেখার পরিকল্পনা করে বেড়ায়।

এবার বলি টিনএজারদের নিজেদের কী করণীয় সে ব্যাপারে। যেহেতু আমাদের নিজেদের কাছে নিজেদের পরিবার পছন্দ করে নেওয়ার সুযোগ নেই, তাই বুদ্ধি দিয়ে পরিস্থিতি আর পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়াতে হবে নিজেকে।

তারপরও যারা পরিবেশ, পরিবারের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে প্রতিদিন ভাবছে, পাপ করে ফেলেছি, পিছিয়ে গেছি, কিছু নেই জীবনে, জীবনের মূল্য নেই!

শোনো, জীবন পুরোটাই পড়ে আছে। কে বলতে পারে আজকের ভেঙে পড়া বিপর্যস্ত তুমি দশ বছর পরে হয়তো নেতৃত্ব দিবে পুরো দেশটাকে। সব সমস্যারই সমাধান আছে। তোমার জীবনের সমস্যা যত বিশালই হোক, সমাধানটা কিন্তু একদম সহজ।

একবার শুধু সবচেয়ে উঁচু স্বপ্নটা দেখার ইচ্ছাটা বাঁচিয়ে তোলো। তারপর ভাবো সেইখানেই আছো তুমি। এসব ছোটখাটো অপরাধবোধ কতটা তুচ্ছ তা কিছুটা আঁচ করতে পারবে। বিস্তৃত জীবনে কোনো অপরাধই বেঁচে থাকার জন্য অন্তরায় না। তোমার যাবতীয় সব দোষের দায়ভার সমাজ, পরিবেশ আর বৈষম্যে ভরা এই সিস্টেমের। তোমাকে এরা পথ দেখাতে পারেনি কিংবা সঠিক পথ থেকে ছিটকে যেতে প্ররোচিত করেছে। আমার সাথে যে যত উচ্চস্বরেই দ্বিমত পোষণ করুক না কেন, আমি দৃঢ়ভাবে বলেই যাব, তোমার কোনো দোষ নেই। তুমি অল্প অল্প করে, যারা তোমার দিকে আঙুল তুলেছে তাদের কাছ থেকেই পুরোটা শিখেছো। ওদের দোষ তোমার চেয়ে বহুগুণ বেশি। এবার দ্রুতপায়ে অপরাধবোধ থেকে বেরিয়ে এসে সুন্দর সুন্দর স্বপ্নগুলোতে চোখ বুলাতে শুরু করো। মানব জীবন একটাই। একে সার্থক করার সুবর্ণ সুযোগ টিনএজে ভেঙে পড়া তোমার কাছেই আছে। একবার শুধু নিজেকে স্বপ্নের পেছনে দৌড়ানোর পথে সঁপে দাও। বাকিটা এই ভয়ংকর টিনএজ পেরোতে পেরোতেই সহজ হয়ে যাবে।

টিনএজে এসেই যারা হুমড়ি খেয়ে, বুকে তীব্র ব্যথা বয়ে বেড়াচ্ছো, তোমরা পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান কথাটা জেনে রাখো৷ বিশ্বাস করো মনে প্রাণে, অমাবস্যা খুবই সংক্ষিপ্ত একটা সময়৷ পূর্ণিমার বিশাল উজ্জ্বল চাঁদ একদিন পুরোটাই তোমার হবে।

 

লেখক- মুনিয়া রশীদ চৌধুরী। 

শিক্ষার্থী।

বৃন্দাবন সরকারি কলেজ, অর্থনীতি বিভাগ।

সম্পর্কিত

মন্তব্য বাদ দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন

সর্বাধিক পঠিত