এস. এম. এম. মুসাব্বির উদ্দিন
বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মকে সুশৃঙ্খল, দায়িত্বশীল এবং মানবিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে স্কাউটিং একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। প্রতি বছর বাংলাদেশ স্কাউটস দিবস উদযাপনের মাধ্যমে এই মহান আন্দোলনের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য এবং আদর্শ নতুন করে স্মরণ করা হয়। ২০২৬ সালের বাংলাদেশ স্কাউটস দিবস আমাদের সামনে নিয়ে এসেছে এক নতুন অঙ্গীকার “স্কাউটিং হোক সবার”। এই প্রতিপাদ্য কেবল একটি স্লোগান নয়; বরং এটি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের আহ্বান, যেখানে প্রত্যেক শিশু ও তরুণ স্কাউটিংয়ের সুযোগ পাবে।
স্কাউটিং মূলত একটি আন্তর্জাতিক শিক্ষামূলক আন্দোলন, যা শিশু ও তরুণদের নৈতিক শিক্ষা, নেতৃত্বের গুণাবলি, আত্মনির্ভরশীলতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা শেখায়। বাংলাদেশে স্কাউটিং কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে পরিচালিত হচ্ছে এবং এটি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে লাখো শিক্ষার্থীর জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে। স্কাউটদের মূলমন্ত্র “সদা প্রস্তুত” শুধু একটি বাক্য নয়, বরং এটি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রস্তুত থাকার একটি মানসিকতা গড়ে তোলে।
১৯৭২ সালে ০৮ই এপ্রিল “বাংলাদেশ বয় স্কাউট এসোসিয়েশন” গঠন করা হয়। পরবর্তীতে ১৯৭৪ সালে বিশ্ব স্কাউট সংস্থা ১০৪ তম সদস্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। তারপর থেকে “বাংলাদেশ বয় স্কাউট সমিতি” কার্যক্রম জোরদার করে। ১৯৭৮ সালে “বাংলাদেশ বয় স্কাউট সমিতি” নাম পরিবর্তন করে নাম রাখা হয় “বাংলাদেশ স্কাউটস”।
২০২৬ সালের স্কাউটস দিবসের প্রতিপাদ্য “নতুন দিনের অঙ্গীকার, স্কাউটিং হোক সবার” আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, স্কাউটিং কেবল নির্দিষ্ট কিছু মানুষের জন্য নয়। এটি এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যা সমাজের প্রতিটি স্তরের শিশু-কিশোরদের জন্য উন্মুক্ত হওয়া উচিত। বিশেষ করে গ্রামীণ ও সুবিধাবঞ্চিত এলাকায় স্কাউটিং কার্যক্রম সম্প্রসারণ অত্যন্ত জরুরি। কারণ এই অঞ্চলের শিশুরাই প্রায়ই শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ থেকে বঞ্চিত থাকে।
স্কাউটিং কার্যক্রমের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর ব্যবহারিক শিক্ষা। এখানে বইয়ের বাইরে গিয়ে বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে শেখানো হয়। ক্যাম্পিং, হাইকিং, কমিউনিটি সার্ভিস, প্রাথমিক চিকিৎসা, পরিবেশ সংরক্ষণ ইত্যাদি কার্যক্রমের মাধ্যমে একজন স্কাউট ধীরে ধীরে একজন দক্ষ ও আত্মবিশ্বাসী মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে। এই প্রক্রিয়ায় তারা শিখে কিভাবে দলবদ্ধভাবে কাজ করতে হয়, কিভাবে নেতৃত্ব দিতে হয় এবং কিভাবে সংকট মুহূর্তে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
০৮ ই এপ্রিল বাংলাদেশ স্কাউটস দিবস উপলক্ষে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সংগঠন ও স্থানীয় স্কাউট গ্রুপ নানা কর্মসূচি গ্রহণ করে থাকে। এর মধ্যে রয়েছে র্যালি, আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বৃক্ষরোপণ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান এবং স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম। এসব কর্মসূচি শুধু স্কাউটদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং সাধারণ মানুষের মধ্যেও সচেতনতা সৃষ্টি করে।
বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে তরুণদের জীবনযাত্রায় অনেক পরিবর্তন এসেছে। তারা এখন অধিকাংশ সময় মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটে ব্যস্ত থাকে, যা অনেক ক্ষেত্রে তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই প্রেক্ষাপটে স্কাউটিং একটি ইতিবাচক বিকল্প হিসেবে কাজ করতে পারে। স্কাউটিং তরুণদের বাস্তব জীবনের সাথে সংযুক্ত করে, প্রকৃতির কাছে নিয়ে যায় এবং তাদের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করে।
“স্কাউটিং হোক সবার” এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের জন্য সরকার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সমাজের সচেতন ব্যক্তিদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। বিদ্যালয় পর্যায়ে স্কাউটিং কার্যক্রম বাধ্যতামূলক বা আরও বিস্তৃত করা যেতে পারে। পাশাপাশি অভিভাবকদেরও তাদের সন্তানদের স্কাউটিংয়ে অংশগ্রহণে উৎসাহিত করা উচিত। গণমাধ্যমও এই বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
এছাড়া, স্কাউটিংয়ে নারী ও প্রতিবন্ধী শিশুদের অংশগ্রহণ বাড়ানোও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি সত্যিকার অর্থে অন্তর্ভুক্তিমূলক স্কাউটিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে সমাজেৃর সকল শ্রেণির মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। এই উদ্যোগ দেশের সামাজিক বৈষম্য কমাতে সহায়ক হবে এবং একটি সমতাভিত্তিক সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখবে।
বাংলাদেশ স্কাউটস দিবস ২০২৬ আমাদের সামনে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। এটি কেবল একটি দিবস উদযাপন নয়, বরং একটি প্রতিশ্রুতি একটি সুন্দর, সুশৃঙ্খল ও মানবিক সমাজ গঠনের প্রতিশ্রুতি। তরুণদের শক্তিকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে স্কাউটিং একটি কার্যকর মাধ্যম হতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, “নতুন দিনের অঙ্গীকার, স্কাউটিং হোক সবার” এই প্রতিপাদ্য বাস্তবায়ন করতে পারলে আমরা একটি সচেতন, দায়িত্বশীল এবং দেশপ্রেমিক প্রজন্ম গড়ে তুলতে সক্ষম হব। স্কাউটিংয়ের মাধ্যমে তরুণরা শুধু নিজেদের নয়, বরং সমাজ ও দেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবে। তাই আসুন, আমরা সবাই মিলে এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নে এগিয়ে আসি এবং স্কাউটিংকে সবার জন্য উন্মুক্ত করে তুলি।
লেখক:
এস. এম. এম. মুসাব্বির উদ্দিন
আমরা স্কাউট গ্রুপ, ঢাকা
বাংলাদেশ স্কাউটস
