শাহরুখ হোসেইন তন্ময়
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাংলাদেশের আইনি কাঠামোতে এক বহুল আলোচিত ও সমালোচিত অধ্যায়। স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের সংবিধান সর্বোচ্চ আইন, যার সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ যেকোনো আইন বাতিল বলে গণ্য হয়…
বাংলাদেশ স্বাধীন ও সার্বভৌম একটি রাষ্ট্র। সংবিধান হলো রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন। বাংলাদেশের সংবিধানের ৭(২) নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংবিধানের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ যেকোনো আইন বাতিল বলে গণ্য হবে। কোনো আইন তৈরি করতে হলে অবশ্যই এই বিষয়টি মাথায় রেখেই তৈরি করতে হবে অন্যথায় সেটি বাতিলযোগ্য বলে বিবেচিত হবে।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮ বহুল আলোচিত-সমালোচিত একটি আইন। বাংলাদেশ বা বিশ্বের যেকোনো দেশে বসে বাংলাদেশের কোন নাগরিক যদি এই আইন লঙ্ঘন করেন, তাহলেই তার বিরুদ্ধে এই আইনের অধীনে বিচার করা যাবে। এ আইন নিয়ে প্রথম থেকেই সর্বস্তরে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে পাস হওয়া ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন’ এর বিলে সই না করার জন্য তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদকে আহবান জানিয়েছিলেন সাংবাদিকদের আন্তর্জাতিক সংগঠন কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে)। সম্পাদক পরিষদ ইতোমধ্যে এ আইনটিকে প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা আইনের ৮,২১,২৫,২৮,২৯,৩১,৩২ ও ৪৩ ধারা নিয়ে আপত্তি জানায় যা সংবাদপত্র ও বাক স্বাধীনতাকে বিঘ্নিত করে। অথচ সংবিধানের ৩৯(২) নং অনুচ্ছেদ সংবাদপত্র ও ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতাকে নিশ্চিত করে। বর্তমান আইনমন্ত্রী এ আপত্তিগুলোকে যৌক্তিক বলে জানিয়ে তা সংশোধনের আশ্বাস দিয়েছিলেন। সম্প্রতি এটি সংশোধনের প্রস্তাব এসেছে। প্রস্তাবিত নতুন আইনের নাম হবে সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩। নতুন এই আইনে কিছু বিষয়ে সংশোধনীর কথা বলা হয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের দুটি ধারা যথা ২১ ও ২৮ ধারা বাতিলের আহবান জানিয়েছিল। প্রস্তাবিত আইনে এই দুটি ধারা বাতিল না করে সাজা ও জামিনের ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা হয়েছে। মূলত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে সবচেয়ে বড় সমালোচনার জায়গাই ছিল, যে কেউ যে কারোর বিরুদ্ধে এই আইনের অধীনে মামলা করতে পারবে যদিও সে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। যদিও প্রস্তাবিত আইনে মানহানির মামলায় কারাদণ্ডের বিষয়টি বাদ দিয়ে শুধু জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। এর কিছু ধারা অজামিনযোগ্য ছিল যেগুলোকে জামিনযোগ্য করা হয়েছে। তবে এতেও সংবাদপত্র ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতা ব্যাহত হবে বলে মতামত ব্যক্ত করেছেন সাংবাদিকদের কিছু ইউনিয়ন।

প্রস্তাবিত সাইবার নিরাপত্তা আইনেও কিছু ত্রুটির কথা উল্লেখ করেছেন সচেতন মহল যা মৌলিক অধিকারকে খর্ব করে। সংবিধানের ২৬ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মৌলিক অধিকারের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ আইন বাতিল বলে গণ্য হবে। তাই কোনো আইন তৈরি করতে হলে এই বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় তা দেশ ও জাতির জন্য দুর্দশার কারণ হবে। বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক বার্কার বলেছেন, “আইনকে আদর্শ (Ideal) হতে হলে তা কেবল রাষ্ট্রীয় সংগঠন কর্তৃক স্বীকৃত, ঘোষিত ও প্রযোজ্য হলেই হবে না, তা ন্যায়সঙ্গত এবং যুক্তসংগতও হতে হবে।” তবেই তা দেশ ও জাতির জন্য কল্যাণজনক হবে।
লেখক, শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি।

