ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের প্রায় ৫০০ কর্মকর্তাকে একযোগে বদলি করা হয়েছে। শিক্ষা প্রশাসনের ইতিহাসে এটিকে অন্যতম বড় গণবদলি হিসেবে দেখা হচ্ছে। হঠাৎ এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা, প্রশাসনিক মহল ও নির্বাচন বিশ্লেষকদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ, প্রশ্ন ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
নীতিমালা উপেক্ষার অভিযোগ
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বদলি হওয়া কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ মাত্র চার থেকে নয় মাস আগে বর্তমান কর্মস্থলে যোগ দিয়েছিলেন। অথচ বিসিএস শিক্ষা ক্যাডার বদলি নীতিমালার ৪.৩ (খ) ধারায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে—
“একই কর্মস্থলে দুই বছর পূর্ণ হওয়ার আগে অন্যত্র বদলির জন্য আবেদন করা যাবে না।”
তবে সেই নীতিমালাকে উপেক্ষা করেই নির্বাচনকালীন সময়ের শুরুতে এই গণবদলি কার্যকর করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
নির্বাচনকে প্রভাবিত করার আশঙ্কা
নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের মতে, তফসিল ঘোষণার পরপরই এ ধরনের বড় পরিসরের বদলি নির্বাচনী পরিবেশ ও প্রশাসনিক স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এক থেকে দুই মাস আগেই নির্বাচন কমিশন বিভিন্ন দপ্তর থেকে নির্বাচনী দায়িত্ব পালনের উপযোগী কর্মকর্তাদের তালিকা সংগ্রহ করেছে এবং অনেক শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা সেই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। তফসিল ঘোষণার পর এমন বদলি সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে কি না—সে প্রশ্নও উঠেছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যা
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, শিক্ষা ক্যাডারের বদলির ফাইল দীর্ঘদিন ধরে আটকে ছিল। প্রশাসনিক ও কারিগরি জটিলতার কারণে সেগুলোতে সময়মতো স্বাক্ষর করা সম্ভব হয়নি। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার রাতে জমা থাকা ফাইলগুলোতে স্বাক্ষর করেছেন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব রেহানা পারভীন।
এ বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের যুগ্মসচিব (কলেজ–১) খোদেজা খাতুন ক্যাম্পাস মিররকে বলেন,
“শিক্ষা ক্যাডারদের বদলির ফাইলে চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছেন আমাদের সচিব মহোদয়। সিন্ডিকেট বা আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে আমার কোনো জানা নেই। আমি এই ধরনের কোনো কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত নই।”.jpg)
বদলি সিন্ডিকেটের অভিযোগ
তবে মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে একটি প্রভাবশালী বদলি সিন্ডিকেটের অভিযোগ। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি), শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর ও ডিআইএ–এর কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তার মাধ্যমে বদলি ও পদায়ন নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে—এমন আলোচনা রয়েছে শিক্ষা সংশ্লিষ্ট মহলে।
আরও অভিযোগ রয়েছে, গণবদলির পর অনেক কর্মকর্তা এই সিন্ডিকেটকে ‘ম্যানেজ’ করে তাদের বদলি আদেশ সংশোধন করিয়েছেন। এর প্রমাণ হিসেবে বদলি আদেশ জারির ১০ দিনের মাথায় পাঁচটি পৃথক প্রজ্ঞাপনে সংশোধনী আনার বিষয়টি সামনে এসেছে। সংশোধনীতে ঢাকার বাইরে বদলি হওয়া একাধিক কর্মকর্তাকে আবার ঢাকায় পদায়ন করা হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা ক্যাম্পাস মিররকে বলেন,
“শিক্ষা উপদেষ্টা সংশ্লিষ্ট একজন প্রভাবশালী কর্মকর্তার সুপারিশ ছাড়া ভালো পদায়ন হয় না। এই সিন্ডিকেটের কারণে অনেক কর্মকর্তা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। নিয়ম সবাই জানে, কিন্তু কেউ ব্যবস্থা নেয় না।”
বারবার বদলিতে চরম ভোগান্তি
এই গণবদলির ফলে অনেক কর্মকর্তা ব্যক্তিগত ও পারিবারিকভাবে চরম সংকটে পড়েছেন। কেউ নতুন বাসা ভাড়া নিয়েছেন, কেউ সন্তানদের নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি করিয়েছেন—এর মধ্যেই আবার নতুন কর্মস্থলে যোগদানের নির্দেশ পেয়েছেন তারা।
একজন কর্মকর্তা বলেন,
“চার মাস আগে ঢাকায় বদলি হয়ে এসেছি। সংসার গুছিয়ে ওঠার আগেই আবার বদলি। পরিবার নিয়ে কীভাবে নতুন করে শুরু করব বুঝতে পারছি না।”
শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এ ধরনের অস্থির বদলি শুধু কর্মকর্তাদের জীবনেই নয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একাডেমিক কার্যক্রমেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। একজন কর্মকর্তা নতুন দায়িত্ব বুঝে ওঠার আগেই বদলি হওয়ায় শিক্ষা ব্যবস্থায় ধারাবাহিকতা নষ্ট হচ্ছে।
প্রশ্নবিদ্ধ সিদ্ধান্ত, অনিশ্চিত জবাব
নির্বাচনকালীন সময়ে প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা রক্ষার কথা থাকলেও শিক্ষা ক্যাডারে এই গণবদলি পরিস্থিতিকে আরও অস্থির করে তুলেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অনেকের মতে, এই সিদ্ধান্ত উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রশাসনে প্রভাব বিস্তারের কৌশলও হতে পারে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক চৌধুরী রফিকুল আববার এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব রেহানা পারভীনের ব্যবহৃত মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা সাড়া দেননি।
