
সাদী মোহাম্মদ সাদ
বইপড়া কেবল একটি অবসর বিনোদন নয়, এটি অনুভূতি, চিন্তা, বোধ ও কল্পনার জগতে এক গভীর ও অনন্য যাত্রা। একটি বই সম্পূর্ণ করার পরও পাঠকের মনে তার চরিত্র, ঘটনাপ্রবাহ, সামাজিক পটভূমি, ভাষার সৌন্দর্য ও নিহিত বার্তা দীর্ঘসময় প্রতিধ্বনিত হয়। কখনো তা চিন্তার খোরাক জোগায়, কখনো আবেগকে আলোড়িত করে, আবার কখনো নতুন দৃষ্টিভঙ্গির পথও খুলে দেয়।
এই পাঠ-পরবর্তী অনুভবকে সুশৃঙ্খলভাবে প্রকাশ করার অন্যতম মননশীল মাধ্যম হলো বই পর্যালোচনা বা রিভিউ লেখা। একটি সুন্দর রিভিউ শুধু বইটির সারমর্ম উপস্থাপন করে না, বরং পাঠকের নিজস্ব বিশ্লেষণ, অভিজ্ঞতা ও ব্যাখ্যাকে সৃজনশীলভাবে ফুটিয়ে তোলে। এতে একজন পাঠক তার বোঝাপড়া ও উপলব্ধির আলোকে বইটির সমালোচনামূলক মূল্যায়ন করতে পারেন। একইসঙ্গে এটি অন্য পাঠকদের জন্য হয় পথনির্দেশক। যারা রিভিউ পড়ে বইটি সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা লাভ করেন এবং সিদ্ধান্ত নিতে পারেন বইটি তাঁদের পাঠ-রুচির সঙ্গে মানানসই কি না।
অর্থাৎ, একটি রিভিউ বইপাঠের অভিজ্ঞতাকে আরও পরিপূর্ণ করে তোলে এবং পাঠকদের মধ্যে জ্ঞান ও চিন্তার একটি সৌহার্দ্যমূলক সেতুবন্ধন তৈরি করে।
রিভিউ লেখার মূল উদ্দেশ্য দুটি:
১) নিজের পাঠ-অভিজ্ঞতাকে একটি কাঠামোবদ্ধ বিশ্লেষণে রূপ দেওয়া
২) অন্য পাঠকদের বইটি সম্পর্কে প্রাথমিক, নিরপেক্ষ ও তথ্যসমৃদ্ধ ধারণা দেওয়া

লেখক তাঁর অভিজ্ঞতা, ভাষাবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে গল্পটি নির্মাণ করেন; কিন্তু রিভিউ লেখক সেই নির্মাণকেই নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করেন। তাই রিভিউতে ব্যক্তিগত মতামত থাকলেও তা যেন শালীন, বস্তুনিষ্ঠ ও যুক্তিনির্ভর হয়, এটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
১. শিরোনাম ও ভূমিকা: পাঠককে আগ্রহী করার প্রথম সোপান
একটি শক্তিশালী রিভিউ শুরু হয় আকর্ষণীয় শিরোনাম দিয়ে। শিরোনামে বইয়ের নাম থাকলে পাঠকের জন্য সুবিধা বাড়ে, বিশেষ করে সার্চ ইঞ্জিন থেকেও পাঠক খুব সহজেই রিভিউটি খুঁজে পায়।
শিরোনামের পর আসে সংক্ষিপ্ত কিন্তু প্রভাবশালী ভূমিকা বা ইন্ট্রোডাকশন; যা পাঠককে পরবর্তী অংশে নিয়ে যেতে উৎসাহিত করে। ইন্ট্রো এমন হওয়া উচিত,
-
সংক্ষিপ্ত
-
বাহুল্যহীন
-
চিত্তাকর্ষক
-
পাঠকের মনোযোগ ধরে রাখার মতো
অনেকে ইন্ট্রো লেখার চাপ থেকে পুরো লেখাই শুরু করতে পারছেন না, এটি স্বাভাবিক। এ ক্ষেত্রে প্রথমে মূল অংশ লিখে শেষে ইন্ট্রো লেখা খুবই কার্যকর একটি কৌশল।
২. কাহিনির সংক্ষেপ: সীমিত পরিসরে স্পষ্ট উপস্থাপন
রিভিউতে বইয়ের কাহিনির সংক্ষিপ্ত বর্ণনা থাকা উচিত, তবে এটি রিভিউয়ের প্রধান অংশ হতে পারে না।
রিভিউ মানে পুরো গল্প বলে দেওয়া নয়; বরং পাঠককে বই সম্পর্কে কৌতূহলী করে তোলা।
সংক্ষেপ দিতে গিয়ে,
-
স্পয়লার এড়িয়ে চলা
-
কাহিনির মূল ভরকেন্দ্র তুলে ধরা
-
লেখকের গল্প বলার ধরন বোঝানো
এসব বিষয় মাথায় রাখা জরুরি।
৩. প্রেক্ষাপট, ঘরানা ও লেখকের উদ্দেশ্য বিশ্লেষণ
রিভিউ লেখার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো গল্পের প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করা। বই যে সময়, সংস্কৃতি, রাজনৈতিক পরিস্থিতি বা মানসিক অবস্থাকে কেন্দ্র করে লেখা; তা রিভিউতে উল্লেখ করলে পাঠক গল্পটিকে গভীরভাবে বুঝতে পারে।
এছাড়া বইয়ের ঘরানা (genre) পাঠকদের জানানোর দায়িত্বও রিভিউয়ারের,
-
রোমান্স
-
থ্রিলার
-
সায়েন্স ফিকশন
-
ইতিহাস/রাজনীতি
-
আত্মজৈবনিক
-
দর্শন/চিন্তাশাস্ত্র
-
নন-ফিকশন/গবেষণামূলক
ঘরানা জানা পাঠকের বই নির্বাচন সহজ করে। প্রয়োজনে সাদৃশ্যপূর্ণ বই বা ঘটনাও উল্লেখ করা যেতে পারে।

৪. বইয়ের শক্তি, সীমাবদ্ধতা ও উন্নতির জায়গা সবগুলোর ভারসাম্য
এই অংশই রিভিউর হৃদয়। এখানে রিভিউয়ার আলোচনা করেন,
-
বইয়ের শক্তি
-
দুর্বলতা
-
কী করলে আরও ভালো হতে পারত
ভালোর কথা বলতে গিয়ে অতিরিক্ত বিশেষণ ব্যবহার করা যাবে না।
দুর্বল দিক বলতে গিয়ে ভাষায় কঠোরতা আনাও সমীচীন নয়।
গঠনমূলক সমালোচনা হলো সবচেয়ে মানসম্মত পথ।
এ অংশে আরও উল্লেখ করা যায়,
-
বইটি কোন ধরনের পাঠকের জন্য উপযোগী
-
গল্পের গতি কেমন
-
চরিত্র নির্মাণ কতটা শক্তিশালী
-
লেখকের ভাষাশৈলী পাঠযোগ্য কিনা
-
থিম বা মূল বার্তা কতটা প্রভাব ফেলে
৫. লেখক পরিচয় ও রচনার পেছনের অভিজ্ঞতা
রিভিউতে লেখকের পরিচিতি সংক্ষেপে তুলে ধরলে পাঠক বইটির প্রকৃতি আরও ভালোভাবে বুঝতে পারে।
লেখকের,
-
পেশাগত ব্যাকগ্রাউন্ড
-
আগের উল্লেখযোগ্য কাজ
-
এই বই লেখার আগের অভিজ্ঞতা
এসব তথ্য থাকলে রিভিউটি আরও সমৃদ্ধ হয়।
৬. উদ্ধৃতি যোগ: রিভিউতে প্রাণ আনতে কার্যকর উপাদান
সংক্ষিপ্ত ও প্রাসঙ্গিক উদ্ধৃতি রিভিউকে আরও জীবন্ত করে তোলে।
একটি গ্রহণযোগ্য সংলাপ বা লাইন বইটির অনুভব পাঠকের কাছে পৌঁছে দেয়।
তবে উদ্ধৃতির সংখ্যা সীমিত হওয়াই ভালো, ১ বা ২টি যথেষ্ট।
৭. সমাপ্তি: পাঠকের জন্য মূল্যায়ন ও সুপারিশ
শেষাংশে রিভিউয়ার লিখতে পারেন,
-
কারা বইটি পড়লে বেশি উপকৃত হবে
-
কোন ঘরানার পাঠকের কাছে এটি আকর্ষণীয় হবে
-
বইটি পড়া কতটা অভিজ্ঞতামূলক
-
কিংবা নির্দিষ্ট একটি সুপারিশ
এই অংশটিই রিভিউকে নিখুঁতভাবে শেষ করে।
