আধুনিক অন্তলোজি মূলত সত্তার স্বরূপ নিয়ে আলোচনা করে। মার্টিন হাইডেগার (১৮৮৯-১৯৭৬), ইমানুয়েল কান্ট (১৭২৪- ১৮০৪) জঁ-পল সার্ত্র (১৯০৫-১৯৮০) প্রমুখ মহারথী প্রশ্ন করেছেন : অস্তিত্ব (existence) আসলে কী? ‘আমি আছি’ (Dasein) মানে কী? এখানে সত্তাকে (ইবরহম) প্রথাগতভাবে অবজেক্ট হিসেবে না দেখে, সচেতনতা ও উপলব্ধি (awareness and perception) দিয়ে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
ইসলামের দৃষ্টিতে, অস্তিত্ব কেবল একটি অবজেক্ট বা বস্তু নয়, বরং তা সচেতনতা, উপলব্ধিও বটে। মূলত তা আল্লাহর সৃষ্টি হিসেবে একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য ও উদ্দেশ্যসম্পন্ন বাস্তবতা। অস্তিত্বকে আমরা শুধু একটি ভৌত বা বস্তুগত বাস্তবতা হিসেবে দেখি না, বরং তা আল্লাহর মাকদূর (পরিকল্পনা) ও ইচ্ছার বাস্তবায়ন। এটি মানবজীবনের আধ্যাত্মিক এবং নৈতিক দৃষ্টিকোণের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত। আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে কোনো কিছুই নিছক অবজেক্ট নয়। প্রতিটি সৃষ্টি আল্লাহর পরিচয়, মহিমা এবং পূর্ণতা প্রকাশ করে। এটি একটি আধ্যাত্মিক উপলব্ধি, যেখানে মানুষ তার বাস্তবতা এবং সৃষ্টির সাথে সংযোগ স্থাপন করে এবং আল্লাহর উদ্দেশ্য অনুসরণের চেষ্টা করবে।

এই অস্তিত্বতত্ত্বে (ক) সৃষ্ট জগত (মাখলুকাত ) ও সৃষ্টিকর্তা (খালিক) আলাদা।
(খ) সৃষ্টির অস্তিত্ব স্রষ্টার ইচ্ছা ও কুন (আদেশ, হও) এর ভিত্তিতে সূচিত।
(গ) ‘সত্য সত্তা’ (আল ওজুদুল হক) একমাত্র আল্লাহ।
তার মানে অস্তিত্ব অধ্যয়নে পশ্চিমা দর্শনের আওয়াজের সাথে ইসলামের কণ্ঠস্বর মিলছে না। ভিন্নতা পরিষ্কার। কিন্তু এখানে কি এই দূরত্ব অতিক্রমের সম্ভাবনাসূত্র নেই? তা আছে বটে?
সমন্বয়ের জন্য কয়েকটি সম্ভাবনা সূত্র : বিষয়, আধুনিক অন্তলোজি, ইসলামী অন্তলোজি, সমন্বয়ের দিক, সত্তার উৎস, অবিরাম অনুসন্ধান, নির্দিষ্ট উৎসহীনতা, আল্লাহই একমাত্র পরম সত্তা, অস্তিত্বের প্রয়োজনীয়তা ও নির্ভরতাকে ব্যাখ্যা, মানুষের ভূমিকা, অস্তিত্বের জিজ্ঞাসু, সন্ধানী, প্রশ্নমুখর। (Being-in-the-world) ইবাদত ও প্রতিনিধিত্বকারী, খলিফা।
মানবসত্তার তাৎপর্য ব্যাখ্যায় সেতুবন্ধন : জগতের সত্তা, আপেক্ষিক ও অবস্থানভিত্তিক, সৃষ্ট ও উদ্দেশ্যনির্ভর, সৃষ্টি ও উপলব্ধির সংযোগ, সময় (Time), অস্তিত্বের ভেতর সময়-সম্পৃক্ততা। সময় হলো আল্লাহর সৃষ্ট ও পরীক্ষা, সময়ের ধারণাকে রূপান্তরিত করা।
আধুনিক অন্তলোজি প্রশ্ন করে : ‘আমি কে?’
ইসলামী অন্তলোজি জবাব দেয় : ‘তুমি আল্লাহর সৃষ্ট এখতিয়ারসম্পন্ন সত্তা, আল্লাহর প্রতি প্রত্যাবর্তনশীল।’
এই প্রশ্ন ও উত্তরকে গভীরভাবে সংলাপে বসানো জরুরি। এর ভেতরে রয়েছে সমন্বয়ের আসল পথ। ইসলাম অস্তিত্ব বা উজুদকে দেখে আল্লাহর গুণ ও সৃষ্টি হিসেবে। ইসলামী দর্শন বলে, উজুদে হাকিকী বা আসল অস্তিত্ব (True Existence) কেবল আল্লাহর।
আল্লাহ সব কিছুর স্রষ্টা। (সূরা জুমার, ৩৯:৬২) অর্থাৎ, যেকোনো অস্তিত্ব আল্লাহর সৃষ্টি। তাহলে বাকি সব অস্তিত্বের স্বরূপ কী? বস্তুত নিজস্ব ও স্বয়ংসম্পূর্ণ অস্তিত্ব একমাত্র আল্লাহর বাকি সব অস্তিত্ব ‘উপস্থিত’ (dependent) এবং ‘ধার করা’ (borrowed)। তার মানে হলো, অস্তিত্বকে আমরা দুই ভাগে ব্যাখ্যা করতে পারি। এক. ওয়াজিবুল ওজুদ বা আবশ্যকীয় অস্তিত্ব (আল্লাহ ছাড়া কারো অস্তিত্ব আবশ্যক নয়।) দুই. মুমকিনুল ওজুদ বা সম্ভব অস্তিত্ব (এর মধ্যে আছে সব সৃষ্টবস্তু। যাদের অস্তিত্ব আল্লাহর ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল)।
ইসলামের বিচারে অস্তিত্ব মানে কেবল বস্তু নয়, অর্থও। কোনো বস্তুর টিকে থাকাটাই অস্তিত্ব নয়। বরং তার উদ্দেশ্য (Purpose), সত্যতা (Truthfulness) এবং সম্পর্ক (Relationship) ও অস্তিত্বের সাথে যুক্ত। ফলে আমরা আমাদের উদ্দেশ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে টিকে থাকলেই অস্তিত্ব সার্থকতা পায় না। আমাদের অস্তিত্বের উদ্দেশ্য আল্লাহর ইবাদত করা। আমার অস্তিত্বকে অর্থবহ করার জন্য আমাকে তা করতে হবে। সময়, স্থান, আত্মা, নৈতিকতা সবই আমার অস্তিত্বের অংশ। আমি এসব কিছু থেকে নিরপেক্ষ নই। ফলে এখানে আমার দায় ও করণীয়ের বিরাট শৃঙ্খলা রয়েছে। সময়ের জন্য আমি জিজ্ঞাসিত হবো, আত্মার পবিত্রতা না থাকলে আমি বিফল হবো, নৈতিকতা হারালে আমি টিকে থাকলেও অর্থ হারাব। তাহলে দেখা যাচ্ছে অস্তিত্বের দুই রূপ। এক. সত্তাগত অস্তিত্ব বা জাতি ওজুদ (Ontological Existence ), যা বস্তু ও আত্মার নিজস্ব অস্তিত্ব। দুই. উপলব্ধিজাত অস্তিত্ব বা মাফহুমী ওজুদ (Experiential Existence) যা অনুভূতি, মানসিকতা, আধ্যাত্মিক উপলব্ধির অস্তিত্ব।
আমার প্রথম রূপটিই আমাকে অর্থবহ করে না। দীপ্ত, তৃপ্ত ও মহিমান্বিত করে না। সে জন্য আমার দ্বিতীয় রূপটি গুরুত্বপূর্ণ। ফলে শুধু আয়নায় সুন্দর ছবি দেখে আমি নিজেকে পড়তে পারি না। শুধু চিন্তায় নিজেকে অনুভব ও ব্যাখ্যা করে আমি নিজেকে পুরোপুরি পাই না। আমাকে আমার পেতে হয় হৃদয় দিয়ে। হৃদয় দিয়ে নিজেকে ধরতে না পারা আমি আয়নার কাছে খুব সুন্দর হওয়ার পরেও কান্না করি। নিজেকে পাচ্ছি না বলে।
আমি জানি, আমার অস্তিত্ব ক্ষণস্থায়ী : ‘পৃথিবীর সব কিছুই ধ্বংস হবে’ (সূরা রহমান ৫৫:২৬)। আমি নিজেকে নিজস্ব আয়োজনে এখানে নিয়ে আসিনি। আমার অস্তিত্বের আসল কারণ আমি নই। আমার রবের ইরাদা (ইচ্ছা) ও কুদরত (সামর্থ্য, শক্তি) আমাকে অস্তিত্বে এনেছে। অতএব আমার অস্তিত্বের মাপকাঠি আল্লাহর সাথে সম্পর্কিত। অস্তিত্বের মানে কেবল থাকা নয়, বরং সঠিকভাবে থাকা আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে। সেভাবে থাকলে আমি থাকি।
আমার এই থাকা Martin Heidegger এর Dasein নয়, যার মানে Being-there- ‘থাকা’, ‘উপস্থিত থাকা’ বা সচেতন অস্তিত্ব। এটা কেবল সেই অস্তিত্ব নয়, যার বড় কাজ নিজের অস্তিত্ব নিয়ে চিন্তা করতে পারা। এটা কেবল ততটুকু নয় যে, সে জানবে সে আছে এবং তার অস্তিত্ব শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যায়। আমার অস্তিত্ব অন্য ও ভিন্ন। আমি আছি মানে আছি তো বটেই। তবে আল্লাহর ইরাদা (ইচ্ছা) ও কুদরতের সাথে লগ্ন হয়ে আছি। আমি নিজেকে চিন্তা করি তো বটেই। তবে ভুলে যাই না ‘আমি থাকা’ (existence) এর মানে হলো এক দান বা নিয়ামাহ (মরভঃ) এবং এক দায়িত্ব বা তাকলিফ, জিম্মাদারি (responsibility)।
অতএব ‘আমি আছি’ মানে হলো আমি এক পরীক্ষা বা ইবতেলায় আছি। আছি এক উদ্দেশ্যপূরণকারী প্রতিনিধি বা খলিফা হিসেবে। ফলে ‘আমি আছি’ মানে শুধু বেঁচে আছি, এতটুকুই নয়, আমার বাঁচার মানে হলো আল্লাহর প্রতিনিধি হয়ে বেঁচে থাকা। এই প্রতিনিধিত্ব এক পরিণতির দিকে আমাকে নিয়ে যায়। আমার দায়িত্ব, কর্তব্য ও উদ্দেশ্য পূরণের সাথে যা যুক্ত। ফলে সচেতনভাবে, প্রতিটি চিন্তা, অভিব্যক্তি ও আচরণ দিয়ে পরিণতির দিকে যাচ্ছি। অতএব ‘আমি আছি’ মানে হলো সচেতনভাবে নিজের পরিণতি নিয়েও ভাবা।

Heidegger-Gi Dasein যেমন মৃত্যুর দিকে তাকিয়ে তার অস্তিত্বকে বোঝে, ইসলামী দর্শনও জীবনের মধ্যে মরণের অমোঘ আসন্নতাকে দেখে, এর ফলে চূড়ান্ত ফলাফলকে দেখে। কুরআনের ঘোষণা প্রত্যেক প্রাণীই মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করবে’ (সূরা আলে ইমরান ৩:১৮৫)। এর মধ্য দিয়ে ইসলাম বলে, ‘আমি আছি’, ‘আমি আল্লাহর দিকে ফিরে যাবো’র চেতনার মধ্যেও আছি। হাইডেগার -এর Dasein অস্তিত্বকে নিজের মতো করে উপলব্ধি করে, ইসলামে ওজুদতত্ত্ব আমাদের অস্তিত্বকে আল্লাহর নিয়ামত হিসেবে দেখায় এবং আল্লাহর হেদায়েতের মধ্য দিয়ে উপলব্ধি করে। হাইডেগার জানান, মৃত্যুর দিকে এগোনো অনিবার্য। তারপর কী? তার আর পর স্পষ্ট নয়। কিন্তু ইসলাম বলে, মৃত্যু অবধারিত। তারপর আছে আল্লাহর সামনে জবাবদিহি। হাইডেগার-এর Dasein নিজের উদ্দেশ্য নিজে খুঁজে নেয়, কিন্তু ইসলামের ওজুদতত্ত্ব আল্লাহর নির্ধারিত উদ্দেশ্য অনুসরণ করে। হাইডেগার-এর Dasein সময়ের মধ্যে অস্তিত্ব বোঝে, ইসলামী দর্শনের ওজুদ কেবল সময়ের মধ্যে নয়, চিরস্থায়ী জীবনের মধ্যেও অস্তিত্বকে দেখে, তার জন্যও অস্তিত্বকে প্রস্তুত করে।
বিচ্ছিন্ন ও একাকী সত্তা : কিন্তু ইসলামী দর্শনের ওজুদ আল্লাহর সাথে সম্পর্কিত, সৃষ্টির সাথে সম্পর্কিত এবং সমাজের সাথে সম্পর্কিত। নিজের অস্তিত্ব ও দায়িত্ব এখানে হাত ধরাধরি করে চলে। আর তা আল্লাহর দিকে এগুতে থাকে। তার কাছে জীবন একটি আমানত।
এখানে সে নিজের অস্তিত্বের সীমাবদ্ধতা ও প্রয়োজনীয়তাকে জানবে। জানবে যে, আমি আসলে সামর্থ্যবান এবং দুর্বল, সম্ভাবনাময় এবং সীমিত ও দায়িত্ববান এবং নির্ভরশীল। কারণ আমার অস্তিত্ব আংশিক এবং পরিপূর্ণতা প্রত্যাশী। সে জন্য নিরন্তর সচেষ্ট। আল্লাহই পরিপূর্ণ, চিরস্থায়ী ও স্বয়ংসম্পূর্ণ। অতএব আমাদের ‘আমি আছি’ প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর কুদরত ও ইচ্ছার আয়না মাত্র। আমার অস্তিত্ব আছে মানে পরম অস্তিত্বের অবিমুখী আছি। অতএব ‘আমি আছি’ মানে হলো ‘আমি আল্লাহর দিকে আছি, লগ্ন ও মগ্ন আছি।’ আবার সৃষ্টিজগতে দায়িত্ব ও কর্তব্য থেকে পলায়ন করে বা তাতে কমতি রেখে এই থাকাকে অর্থবহ করা যাবে না। এর মানে পরিষ্কার। অস্তিত্বের সব স্তর এক ঐক্যবদ্ধ নকশায় গাঁথা, যেখানে সৃষ্টিকর্তা ও সৃষ্টিজগত পরস্পর সম্পর্কিত। কাউকে বাদ দিয়ে অস্তিত্বের সার্থকতা নয়। তবে সৃষ্টিকর্তা ও সৃষ্টিজগত পরস্পরে সম্পর্কিত হলেও কখনোই এক নয়।
প্রকৃতি ও অস্তিত্ব এখানে ঐশী সত্তার বহিঃপ্রকাশ, কিন্তু আল্লাহর সাথে বস্তুজগতের মিশ্রণ অসম্ভব। উত্তরাধুনিক চিন্তকরা যেমন বলেন, সত্য কোনো একক ভাষায় বা ডিসকোর্সে ধরা পড়ে না, তেমনি মুসলিম দর্শন বলে, মানুষের ভাষা ও যুক্তি অস্তিত্বের পূর্ণ সত্যকে ধরতে অক্ষম। এর সাথে যুক্ত আছে গায়েব বা ইন্দ্রিয়াতীত অদৃশ্য। যার সত্যতত্ত্বের জন্য আমার চাই হেদায়েত। মানুষের অস্তিত্বের অভিজ্ঞতা যেহেতু ব্যক্তির সমাজ, ইতিহাস ও আত্মিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে, অতএব আমার অস্তিত্ববোধ শুধু আমার সাফল্য ব্যর্থতাকে সংজ্ঞায়িত করে না, বরং মানুষের বৃহত্তর জীবন, যাপন ও বিকাশকে প্রভাবিত করে।

ফলে মুসলিম বিশ্বদৃষ্টি ও আধুনিক দর্শনের বোঝাপড়ার মধ্য দিয়ে এমন অন্তলোজির প্রয়োজন, যেখানে প্রকৃতি হলো নৈতিকভাবে অর্থবহ এক অস্তিত্ব।
মুসলিম অন্তলজি শুধু আধুনিকতাকে প্রত্যাখ্যান করে না, বরং ঐতিহ্য ও আধুনিক জ্ঞানের মধ্যে সংলাপও গড়ে তোলে। যদিও সায়্যিদ হুসাইন নসরের ভাষা ধার করে বলতে চাই, আধুনিক বৈজ্ঞানিক বস্তুবাদ (scientific materialism) অস্তিত্বের প্রকৃত সারমর্ম ভুলে গেছে।
লেখক : কবি, গবেষক
