পারভেজ হত্যাকাণ্ডের সঠিক তদন্ত ও দ্রুত বিচার দাবিতে ছাত্রশিবির প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় শাখার প্রতিবাদ কর্মসূচি

রাজধানীর বনানীতে নির্মমভাবে খুন হওয়া পারভেজ হত্যাকাণ্ডের সঠিক তদন্ত, নিরপেক্ষ বিচার এবং ঘটনার সাথে জড়িত সকল অপরাধীকে দ্রুত গ্রেপ্তার করার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় শাখা।

রবিবার শিবিরের প্রতিনিধি দলটি বনানী থানায় গিয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এর সাথে সাক্ষাৎ করে। সাক্ষাৎকালে তারা বলেন, “পারভেজ ছিল এক সচেতন ও দায়িত্বশীল শিক্ষার্থী। তার মতো একজন তরুণের নির্মম হত্যাকাণ্ড শুধু তার পরিবার নয়, পুরো শিক্ষার্থী সমাজকে শোকাহত করেছে।” তারা হত্যার পেছনে কারা জড়িত তা খুঁজে বের করে তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে প্রশাসনের প্রতি জোর দাবি জানান।

প্রতিনিধি দলে নেতৃত্ব দেন ছাত্রশিবির প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সেক্রেটারি রেজাউল করিম। তার সাথে ছিলেন শাখার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃবৃন্দ।

পরে প্রতিনিধি দলটি প্রাইম এশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. রায়হানা বেগমের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। সেখানে তারা ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে গভীর শোক প্রকাশ করেন এবং নিহত পারভেজের পরিবার ও সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি সমবেদনা জানান। উপাচার্যকে দেওয়া শোকবার্তায় বলা হয়, “একজন মেধাবী শিক্ষার্থীকে এভাবে হারানো জাতির জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। আমরা এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করছি।”

ছাত্রশিবির প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সেক্রেটারি রেজাউল করিমের নেতৃত্বে বনানী থানার ওসির সাথে সাক্ষাৎ

ছাত্রশিবির নেতারা এ সময় বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে চলমান শিক্ষার্থী আন্দোলনকারীদের মধ্যেও উপস্থিত হন এবং তাদেরকে মনোবল ধরে রেখে শান্তিপূর্ণভাবে ন্যায়সঙ্গত দাবিতে অটল থাকার আহ্বান জানান। তারা বলেন, “এই দুঃসময়েও শিক্ষার্থীদের মধ্যে সচেতনতা ও ঐক্য দেখিয়ে দিতে হবে যে, অন্যায়কে কখনো মেনে নেওয়া হবে না।”

ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তারা এ ঘটনার পূর্ণ তদন্ত এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়া পর্যন্ত দেশের শিক্ষার্থী সমাজের পক্ষ থেকে ন্যায়বিচারের আন্দোলন চালিয়ে যেতে সহায়তা প্রদান করবে।

ছাত্রশিবির প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি দল

পারভেজ হত্যা: একটি ভুল বোঝাবুঝি কীভাবে প্রাণঘাতী পরিণতিতে পৌঁছাল?

প্রাইম এশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের মেধাবী শিক্ষার্থী নবাব পারভেজ এর নির্মম মৃত্যু কেবল একটি হত্যাকাণ্ড নয়, এটি আমাদের শিক্ষা দেয় ভুল বোঝাবুঝি এবং অব্যবস্থাপনা কতটা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, ঘটনার সূচনা হয় একেবারে তুচ্ছ একটি বিষয় থেকে। ক্যাম্পাসে বন্ধুদের সঙ্গে পারভেজ হাসাহাসি করছিলেন। পাশেই বসে থাকা দুই ছাত্রী ভেবে বসেন, ওই হাসাহাসি তাদের নিয়েই। একটি কল্পিত অপমানবোধ থেকে শুরু হয় উত্তেজনা। দুই ছাত্রী বিষয়টি জানান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর বরাবর।

প্রক্টর অফিসে ডাকা হয় পারভেজকে। সেখানে সে স্পষ্ট করে জানায় তার হাসাহাসির উদ্দেশ্য কোনোভাবে ওই দুই ছাত্রীকে লক্ষ্য করে ছিল না। বরং, বন্ধুদের ব্যক্তিগত আলাপ নিয়েই মজা করছিলেন তিনি। তবুও পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে তাকে ঐ দুই ছাত্রীর কাছে ক্ষমা চাইতে বলা হয়। এবং পারভেজ বিনা দ্বিধায় সেই অনাকাঙ্ক্ষিত ক্ষমা প্রার্থনা করেন।

হ্যাঁ, পারভেজ ক্ষমা চেয়েছিল।

কিন্তু ঘটনা এখানেই থেমে থাকেনি। এরপর থেকেই তার ওপর বাড়তে থাকে চাপ, শুরু হয় হুমকি-ধামকি। শেষ পর্যন্ত, বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের মাহাথির হাসান, বিবিএ বিভাগের মেহেরাজ ইসলাম ও এলএলবি বিভাগের আবু জোহর গিফারী পিয়াস তিনজন শিক্ষার্থী বস্তির একটি কিশোর গ্যাং ভাড়া করে আনে পারভেজের ওপর হামলার উদ্দেশ্যে।

২০ এপ্রিল, বিকেল চারটায় ক্যাম্পাসের সামনে ওই গ্যাং সদস্যরা ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলা চালায় পারভেজ ও তার আরও চার-পাঁচজন বন্ধুর ওপর। গুরুতর আহত অবস্থায় পারভেজকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ক্যাম্পাসে নেমে আসে শোকের ছায়া।

তদন্তে বেরিয়ে আসে ভয়াবহ তথ্য:

সাইবার টিমের সহায়তায় জানা গেছে, হামলাকারী গ্যাংটির নাম ‘বেনসন গ্যাং’। এই গ্যাংয়ের নেতৃত্বে রয়েছে ব্যানসন নাসিম ওরফে আহমেদ নাসিম। গ্যাংয়ের আরও সদস্যরা হলেন—
• ব্যানসন সাকিব
• ব্যানসন নাদিম
• ব্যানসন নাফিজ
• আহম্মেদ ইউনুস
• আহম্মেদ ইউসুফ
• জয়ান ব্রো (বর্তমানে বিদেশে অবস্থানরত)

সন্দেহভাজন ইউনুসের মোবাইল নম্বর ০১৯২৭-৮৩৪১৯৪, যা ট্র্যাক করলে গ্যাং সদস্যদের অবস্থান নির্ধারণ করা সম্ভব হবে বলে ধারণা তদন্তকারীদের।

এছাড়াও, এ ঘটনার নেপথ্যে সহায়তাকারী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন ফাতেমা তাহসিন ঐশী, যিনি অভিযুক্ত পিয়াসের প্রেমিকা। তিনি ইউনিভার্সিটি অফ স্কলার্সের বিবিএ বিভাগের ৩য় সেমিস্টারের শিক্ষার্থী।

একটি জীবন শেষ হয়ে গেল, একটি হাসির প্রতিধ্বনি থেমে গেল শুধুমাত্র একপেশে ধ্যানধারণা, ভুল বোঝাবুঝি এবং প্রতিহিংসার বলি হয়ে।

শিক্ষার্থীরা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে দোষীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবি জানিয়েছেন। বিষয়টি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ঊর্ধ্বতন মহলে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে এবং তদন্ত চলমান রয়েছে।

ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
নবাব পারভেজের মৃত্যুতে শুধু একটি পরিবার নয়, পুরো বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার আজ শোকে মুহ্যমান।
(সামগ্রিক তথ্য সহায়তায় PUSAB)

হত্যায় মদদদাতা ৪ আসামী
হত্যায় মদদদাতা ৪ আসামী
বেনসন গ্যাং
বেনসন গ্যাং
হত্যায় মদদদাতা মাহাথির
হত্যায় মদদদাতা মাহাথির
হত্যায় মদদদাতা পিয়াস
হত্যায় মদদদাতা পিয়াস
বেনসন গ্যাং
বেনসন গ্যাং
বেনসন গ্যাং
বেনসন গ্যাং

প্রাইম এশিয়ার শিক্ষার্থী নবাব পারভেজ হত্যার প্রতিবাদে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ


প্রাইম এশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নবাব পারভেজকে নির্মমভাবে ছুরিকাঘাতে হত্যার প্রতিবাদে আজ রোববার ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির সাধারণ শিক্ষার্থীদের আয়োজনে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

ক্যাম্পাস চত্বরে অনুষ্ঠিত এ কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীরা হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানান এবং জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেন।

আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী সালাহউদ্দিন শুভ বলেন, “যারা পারভেজ হত্যায় জড়িত, তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে। প্রয়োজনে আমরা ঢাকা জজ কোর্ট ও হাইকোর্ট পর্যন্ত আইনি লড়াই করবো।”

আরেক শিক্ষার্থী নাঈম আহমেদ খান বলেন, “মব করে একজন শিক্ষার্থীকে হত্যা কোনোভাবেই বৈধতা পেতে পারে না। এই হত্যাকাণ্ডের দায় সরকারকে নিতে হবে এবং সঠিক তদন্ত সুনিশ্চিত করতে হবে।”

সমাবেশ চলাকালে ক্যাম্পাসজুড়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীরা প্ল্যাকার্ড হাতে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন এবং পরে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করেন।

এসময় বক্তারা দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের প্রতি জোর দাবি জানান এবং ন্যায়বিচার না পাওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন।

বিক্ষোভ মিছিল
বিক্ষোভ মিছিল
বক্তব্য রাখছেন ইস্ট ওয়েস্ট এর ছাত্রনেতা সালাহউদ্দিন শুভ
বক্তব্য রাখছেন ইস্ট ওয়েস্ট এর ছাত্রনেতা সালাহউদ্দিন শুভ

কাজী ও উত্তরা পরিবহনের হামলায় আহত IUBAT-এর শিক্ষার্থীরা: তিন দফা দাবিতে শিক্ষার্থীদের আল্টিমেটাম, না মানলে ‘বিএনএস সেন্টার অবরোধ’ এর ঘোষনা

রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকায় কাজী পরিবহনের স্টাফ ও স্থানীয় সন্ত্রাসীদের হামলায় প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় IUBAT-এর অন্তত ছয়জন শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হয়েছেন। ঘটনার পর ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা তিন দফা দাবি উত্থাপন করে প্রশাসনকে আগামীকাল সকাল ৯টার মধ্যে আল্টিমেটাম দিয়েছেন।

আহতদের মধ্যে রয়েছেন সামি সওদাগর, লিটন ইসলাম, আলিশান রহমান, আহাদ, টিয়ন এবং আসাদুজ্জামান শিকদার। তারা বর্তমানে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে।

শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, বাস ভাড়াকে কেন্দ্র করে বাকবিতণ্ডার একপর্যায়ে কাজী পরিবহনের স্টাফরা প্রথমে একজন শিক্ষার্থীকে মারধর করে। পরবর্তীতে শিক্ষার্থীরা এর প্রতিবাদ করতে গেলে স্থানীয় সন্ত্রাসীদের সহায়তায় দেশীয় অস্ত্র নিয়ে চালানো হয় পরিকল্পিত হামলা।

ঘটনার পর IUBAT-এর সাধারণ শিক্ষার্থীরা তিন দফা দাবি উত্থাপন করেছেন:

১. ১৪ এপ্রিল সকাল ৯টার মধ্যে হামলায় জড়িত সকল স্টাফ ও সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার করতে হবে।
২. কাজী পরিবহন এবং উত্তরা পরিবহনের মালিককে শিক্ষার্থীদের সামনে এসে প্রকাশ্যে জবাবদিহি করতে হবে।
৩. আহতদের চিকিৎসার সমস্ত ব্যয় বহন করতে হবে পরিবহন কর্তৃপক্ষকে।

শিক্ষার্থীরা আরও জানিয়েছেন, উল্লেখিত সময়সীমার মধ্যে যদি প্রশাসন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে আগামীকাল সকাল ৯:১৫ মিনিটে IUBAT-এর মূল ফটকে সমবেত হয়ে ‘বিএনএস সেন্টার অবরোধ’ কর্মসূচি পালন করা হবে।

একজন আন্দোলনরত শিক্ষার্থী বলেন, “এই হামলা কেবল IUBAT-এর শিক্ষার্থীদের ওপর নয়, এটি পুরো দেশের শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা। রাজপথে আমাদের জীবন ঝুঁকিতে থাকবে এটা আমরা আর মেনে নেবো না।”

ঘটনার পরেও এখনো কোনো অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়নি এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকেও তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ঘিরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

রাজপথে রক্তাক্ত শিক্ষার্থী: কাজী পরিবহনের বর্বর হামলায় উত্তাল IUBAT


রাজধানীর রাজপথে আবারও শিক্ষার্থীদের রক্ত ঝরালো পরিবহন সেক্টরের বর্বরতা। শনিবার ঢাকার আব্দুল্লাপুর এলাকায় বাস ভাড়া নিয়ে কথা কাটাকাটির জেরে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় IUBAT-এর ১৫ জন শিক্ষার্থীর ওপর নৃশংস হামলা চালিয়েছে কাজী পরিবহন এর বাস স্টাফরা।

প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগীদের বরাতে জানা গেছে, বাস ভাড়ার ব্যাপারে বাকবিতণ্ডার একপর্যায়ে একজন শিক্ষার্থীকে মারধর করে কাজী পরিবহনের কর্মীরা। পরে বিষয়টির সুরাহা চেয়ে শিক্ষার্থীরা কাউন্টারে গেলে সেখানে ফের উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এসময় বাস স্টাফরা স্থানীয় সন্ত্রাসীদের সহায়তায় দেশীয় ধারালো অস্ত্র নিয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায়।

ঘটনায় IUBAT-এর অন্তত শিকদার আসাদুজ্জামান সহ ৫ জন শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। আহত আরও অন্তত ১০ জন শিক্ষার্থীর খোঁজ পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ ঘটনার প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা তাৎক্ষণিকভাবে কাজী পরিবহনের সব বাস চলাচল বন্ধ করে দেয়। তাদের দাবি, যতক্ষণ না ঘটনার সুষ্ঠু বিচার হবে এবং হামলাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত কাজী পরিবহনের বাস রাজপথে চলতে দেয়া হবে না।

এ বিষয়ে IUBAT-এর এক শিক্ষার্থী বলেন, “এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। প্রতিনিয়ত ঢাকার রাজপথে বাস স্টাফদের নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন সাধারণ যাত্রী ও শিক্ষার্থীরা। আজ আমরা মুখ তুলে দাঁড়িয়েছি, কারণ এবার আমাদের সহপাঠীদের রক্ত ঝরেছে।”

শিক্ষার্থীরা জানান, দ্রুত বিচার ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সরাসরি হস্তক্ষেপ না এলে, তাঁরা ঢাকার প্রবেশদ্বার আব্দুল্লাপুর রুট সম্পূর্ণভাবে অবরোধ করার ঘোষণাও দিতে পারেন।

এ ঘটনায় এখনো কোনো মামলা হয়নি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

শিক্ষার্থীরা এখন ন্যায়বিচার এবং নিরাপদ সড়কের দাবিতে একতাবদ্ধ।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ‘মার্চ ফর গাজা’ পদযাত্রা ও সমাবেশে অংশগ্রহণ

১২ এপ্রিল ঢাকা শহর সাক্ষী হলো এক ব্যতিক্রমী দৃশ্যের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ১০ হাজার শিক্ষার্থী দীর্ঘ পদযাত্রা শেষে পৌঁছেছে ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে, ‘মার্চ ফর গাজা’ শীর্ষক কর্মসূচিতে অংশ নিতে।

পদযাত্রার সূচনা হয় দুপুর ১২টায়, আফতাবনগরের গেট থেকে। ব্যানার, ফেস্টুন ও ফিলিস্তিনি ১০০ ফুট পতাকা হাতে শিক্ষার্থীরা গাজায় চলমান নৃশংসতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে বিভিন্ন স্লোগানে মুখর করে তোলেন রাজধানীর রাজপথ। পুরো রুট জুড়েই ঢাকাবাসী এই পদযাত্রাকে স্বাগত জানায় সংহতির ভাষায়।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পৌঁছে সমবেত ছাত্ররা ‘ফ্রি ফ্রি প্যালেস্টাইন’, ‘ফ্রম দ্য রিভার টু দ্য সি, প্যালেস্টাইন উইল বি ফ্রি’ ইত্যাদি আন্তর্জাতিক স্লোগানের পাশাপাশি বাংলায় দেন হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া আহ্বান “আমার ভাইয়ের রক্ত বৃথা যেতে দেব না”, “রক্তের বন্যায় ভেসে যাবে অন্যায়।”

আয়োজকেরা জানান, “এটি কোনো একক সংগঠনের উদ্যোগ নয়। দেশের বিভিন্ন প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরা গাজাবাসীদের পক্ষে সংহতি জানাতে একত্রিত হয়ে আজকের এই ঐতিহাসিক পদযাত্রা সফল করেছেন। যারা সামনে থেকে কিংবা পেছন থেকে সহযোগিতা করেছেন, সবাইকে জানাই গভীর কৃতজ্ঞতা।”

সমাবেশে বক্তারা ফিলিস্তিনে চলমান গণহত্যার তীব্র নিন্দা জানান এবং জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর হস্তক্ষেপ দাবি করেন।

এটাই প্রমাণ করে ,বাংলাদেশের তরুণরা শুধুই পাঠ্যপুস্তকে সীমাবদ্ধ নয়, তারা জেগে উঠলে ন্যায়ের জন্য রাস্তায় নামতেও জানে।

চারুকলায় ফের গড়ে তোলা হচ্ছে “স্বৈরাচারের প্রতিকৃতি”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে আয়োজিত ঐতিহ্যবাহী মঙ্গল শোভাযাত্রার অন্যতম প্রতীকী উপস্থাপন ‘স্বৈরাচারের প্রতিকৃতি’ আবারও নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। চারুকলা প্রাঙ্গণে শনিবার (১২ এপ্রিল) রাতে প্রস্তুতি পরিদর্শনে এসে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খান জানান, প্রতিকৃতি নির্মাণের দায়িত্ব শিল্পীদের ওপর অর্পণ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, “আমরা একটি জাতীয় দায়িত্ব পালন করছি। ষড়যন্ত্র আসবে—তবু মানুষের পরিশ্রম আর আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে আমরা এগিয়ে যাবো, শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে। এ কাজে সবার সহযোগিতা কামনা করছি।”

চারুকলায় ইতোমধ্যে প্রতিকৃতিটি গড়ার জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ পৌঁছে গেছে। দ্রুততম সময়ে কাঙ্ক্ষিত মোটিফটি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে শিল্পীরা দিনরাত কাজ করে চলেছেন। ককশিটসহ বিকল্প উপকরণ দিয়ে এটি নির্মাণের নানা দিক যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. সাইফুদ্দিন আহমদ বলেন, “এক মাস ধরে যে কাজ তৈরি হচ্ছিল, তা একদিনে পুনর্নির্মাণ করা কঠিন। কিন্তু শিল্পীরা নিরন্তর পরিকল্পনা করছেন। বিষয়টি তাদের হাতেই ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, কারণ তারাই জানেন কোন পথটি সঠিক।”

রাত সাড়ে ৯টার দিকে শোভাযাত্রার অগ্রগতি দেখতে চারুকলা প্রাঙ্গণে আসেন অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা ও নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। তিনি বলেন, “যারা এই আয়োজনে যুক্ত, তাদের সবাইকে স্যালুট জানাই। আগুনে প্রতিকৃতি ধ্বংসের মাধ্যমে শিল্পীদের মনোবল ভাঙার চেষ্টা হলেও আমি এসে দেখেছি, তাদের স্পিরিট দ্বিগুণ হয়ে গেছে। আশা করি, এবার দেশবাসী এক অসাধারণ শোভাযাত্রা দেখতে পাবে।”

প্রসঙ্গত, ১৪২৯ বঙ্গাব্দের নববর্ষকে সামনে রেখে তৈরি করা ‘ফ্যাসিস্টের প্রতিকৃতি’টি গত সপ্তাহে দুর্বৃত্তদের দেয়া আগুনে পুড়ে যায়। এ ঘটনার প্রতিবাদে এবং শোভাযাত্রার ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ণ রাখতে চারুকলার শিল্পীরা নতুন উদ্যমে প্রতিকৃতিটি পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শাহবাগ থানায় অজ্ঞাতনামাদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। পাশাপাশি ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খানকে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

একমাত্র শিল্প আর সাংস্কৃতিক প্রতিরোধই পারে সমাজে অন্ধকারের মুখে আলো জ্বালাতে—এমন বার্তাই যেন এবার চারুকলার শোভাযাত্রা বহন করে চলেছে।

মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে ব্যাংক কর্মকর্তাদের সম্মেলন

চট্টগ্রাম, ১১ এপ্রিল:

বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)-এর উদ্যোগে এবং অ্যাসোসিয়েশন অব অ্যান্টি মানি লন্ডারিং কমপ্লায়েন্স অফিসার্স অব ব্যাংকস ইন বাংলাদেশ (অ্যাকব)-এর সহায়তায় ব্যাংকগুলোর প্রধান পরিপালন কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি দিনব্যাপী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। চট্টগ্রামের হোটেল র‍্যাডিসন ব্লুতে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে অর্থ পাচার রোধ, প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন ও আর্থিক খাতে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

সম্মেলনের প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। সভাপতিত্ব করেন বিএফআইইউর প্রধান কর্মকর্তা এ জেড এম শহীদুল ইসলাম। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের চেয়ারম্যান সেলিম আর এফ হোসেন এবং অ্যাকবের চেয়ারম্যান মাহাদ জিয়াউল হাসান কাওলা।

গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেন, “অর্থ পাচার রোধ এবং বিদেশে পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার বিষয়টি বর্তমান সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। এ লক্ষ্যে অ্যান্টি-টাস্কফোর্স গঠন করে বিএফআইইউ ও অন্যান্য সরকারি সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করছে।”

তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে, যা অর্থ পাচারের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক। তবে মুদ্রানীতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার নিয়ে কিছু অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, যা সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে মোকাবিলা করা সম্ভব।

বিএফআইইউ প্রধান শহীদুল ইসলাম ব্যাংকিং খাতের অনিয়ন্ত্রিত ঋণপ্রবাহ, খেলাপি ঋণ, ঋণ জালিয়াতি এবং করপোরেট সুশাসনের অভাবকে অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি ও নীতিগত সিদ্ধান্তের ফলে ইতোমধ্যে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।”

অ্যাকবের চেয়ারম্যান মাহাদ জিয়াউল হক AML/CFT (অ্যান্টি মানি লন্ডারিং/কাউন্টার টেররিজম ফাইনান্সিং) কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানান। সেলিম আর এফ হোসেন ঝুঁকিভিত্তিক মনিটরিং জোরদার এবং প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসনের ঘাটতি নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলেন।

সম্মেলনে ৬০টি তফসিলি ব্যাংকের AML/CFT দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান ও উপ-প্রধান কর্মকর্তারা অংশ নেন। আলোচনায় ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, মানি লন্ডারিংয়ের নতুন ধারা, এবং তা প্রতিরোধের কৌশল নিয়ে পৃথক অধিবেশনও অনুষ্ঠিত হয়।

সম্মেলনের মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতে করপোরেট সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং অর্থ পাচার প্রতিরোধে ঐক্যবদ্ধ পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা আবারও উঠে আসে।

বাংলাদেশকে ১ বিলিয়ন ডলারের অর্থ সহায়তা দিচ্ছে ব্রিকস ব্যাংক

রিপোর্ট: ক্যাম্পাস মিরর ডেস্ক

বাংলাদেশের অর্থনীতি ও অবকাঠামো উন্নয়নে বড় অংকের অর্থ সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে ব্রিকস-এর নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (NDB)। সাংহাইভিত্তিক এই বহুপাক্ষিক উন্নয়ন ব্যাংক বাংলাদেশের জন্য ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ তহবিল অনুমোদনের পথে রয়েছে।

সম্প্রতি নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির কাজবেকভের সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে এই আলোচনা সম্পন্ন করেছেন দেশের প্রধান উপদেষ্টা ও নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনুস। বৈঠকে বাংলাদেশের অবকাঠামো খাতে বিশেষত গ্যাস খাতের উন্নয়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং সবুজ জ্বালানি ব্যবস্থাপনার দিকগুলোতে বিনিয়োগের বিষয়টি গুরুত্ব পায়।

এর আগে গত ২৬ মার্চ চীন সফরের সময় ড. ইউনুস মোংলা বন্দর আধুনিকীকরণ প্রকল্পে চীনের কাছ থেকে প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলারের ঋণ প্রতিশ্রুতি নিয়ে দেশে ফেরেন। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের বন্দর ব্যবস্থাপনায় একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশ এমন এক সময়ে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগিতার দ্বারস্থ হচ্ছে, যখন বৈদেশিক ঋণ প্রবাহ ও বৈশ্বিক মন্দার চাপ একসাথে মোকাবিলা করতে হচ্ছে। নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের এই সহায়তা দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অবকাঠামো উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে।

গণঅভ্যুত্থানে গণমাধ্যমের নির্লজ্জ ভূমিকা

২০১৭ সালে প্রথম আলোর উদ্যাগে বাংলাদেশে ১ হাজার ২০০ তরুণের মধ্যে একটি জরিপ করা হয়েছিল। সেখানে দেখা যায় ৮২ শতাংশ তরুণই তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন। জরিপে অংশ নেওয়া তরুণদের ৬৩ শতাংশই বলেছিলেন, তারা জানেন না তাদের জীবনের লক্ষ্য। ৫৬ শতাংশ তরুণ উদ্বিগ্ন নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে। রাজনীতি নিয়ে অধিকাংশ তরুণ অনাগ্রহের কথা জানিয়েছিলেন। কারণ রাজনীতি মানে বিদ্বেষ, আন্দোলনের নামে হয় নিরীহ মানুষের প্রাণহানি। স্বাধীনতা আনা সংগঠন নিজের হাতে সব কবর দিয়ে গেছে!

গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী আজও তা কঠিন বাস্তবতা। এর মাঝে জুলাই এসেছিল তারুণ্যের আশা-হতাশার মাস হিসেবে।

কত জীবনের অপূরণীয় ক্ষতি, সম্ভাবনার অকাল অবসান! আমি আপনি নিজের জায়গা থেকে, তাদের মা-বাবা, ভাইবোন, স্বজনদের কথা বিবেচনা করি। সাঈদ, মুগ্ধ, ওয়াসিম, তরুয়া ও মেহেদীদের মায়েরা কীভাবে সহ্য করবেন ব্যথা! বাবারা কীভাবে কাটাবে রাত? এমন পরিস্থিতিতে নবারুণ ভট্টাচার্যকে মনে করি-

“এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না।”

পরের অংশে বলেছেন-

“যে শিক্ষক বুদ্ধিজীবী কবি ও কেরাণী

প্রকাশ্যপথে এই হত্যার প্রতিশোধ চায় না

আমি তাকে ঘৃণা করি।”

মানব দেহে একদিনে ক্যান্সার হয় না, তেমনি দেশও তলানিতে যায় না। দেশটা যখন মৃত্যু উপত্যকায় পরিণত হচ্ছে তখনও চুপ ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষক, চুপ করে ছিলেন দেশের কবি-লেখক, সম্পাদক ও সাংবাদিক। ভাবছি বইমেলায় তাদের হাজার হাজার বই, কীভাবে দেখাবে মুখ নন্দলালের জীবন নিয়ে? প্রাইভেট ছাড়া পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক আছে ১৫ হাজার ২৩৬। তাদের মধ্যে অধ্যাপক রয়েছে ৪ হাজার ৬৬১ জন। তারা ব্যস্ত কীসে, কেউ কী জানেন? শিক্ষক নেতাদের নীরবতা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন শতশত শিক্ষার্থী। যারা পাশে দাঁড়িয়েছেন তারা শক্তি। আমাদের সমাজের লজ্জা নতুন কেউ শহীদ শামসুজ্জোহা হতে পারেননি, জাগতিক লোভে।

স্বৈরাচার প্রধানমন্ত্রীর এক সভায় সিনিয়র এক সাংবাদিক বলেছিলেন, “শেখ হাসিনার সঙ্গে আছেন, প্রয়োজনে যেকোনো কিছু করতে প্রস্তুত।” এতে সাংবাদিকদের সঙ্গে ক্ষমতার পারস্পরিক স্বার্থের সম্পর্ক আরও পরিষ্কার হয়েছে। যেন ছাত্রলীগের ভূমিকা রাখছে। আজ তারা কই, সবাই পালিয়েছেন। এ যেন কানার হাটবাজার। কেপিআই মানে সম্পদ নষ্ট হচ্ছে দেখানো হয়, হাজার হাজার মানুষের কোন খবর নেই, অনুতাপ নেই। ক্ষমতাপ্রীতি সাংবাদিকতায় একটি রোগ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই প্রজন্ম এদের নিন্দা, ধিক্কার জানিয়েছে।

তারা ভুলে গেছে- শিক্ষকতা, সাংবাদিকতা কোনো চাকরি না। এখানে দায় ও দায়িত্ব আছে। আছে নীতিবোধের চর্চা, জ্ঞানকা-ের ব্যবহার। শিক্ষক কবি সাংবাদিক এরা যখন নষ্ট হয়ে যায় তখন রাষ্ট্র ভালো থাকতে পারে না। তার উদাহরণ গণঅভ্যুত্থান আগের বাংলাদেশ।

যারা ঊনসত্তর, একাত্তর, পঁচাত্তর ও নব্বইয়ে কবিতা-গানে মাতিয়ে রেখেছেন দেশ, তারাও হারিয়ে গেছেন। বেঁচে থাকা উল্লেখযোগ্য কবি লেখকরা চুপ। পাঠকরা চায় তাদের লেখকরা কিছু বলুক, পাশে থাকুক। এক সময় বাংলা একাডেমিতে কর্মরত লেখকরাও কথা বলতেন, লিখতেন। আজ তারাও চুপ।

গ্রন্থাগার বিশেষজ্ঞ ফজলে রাব্বী এক বইতে উল্লেখ করছেন- “বাংলা একাডেমি একটা দ্বীপের মত। এটি জন্ম থেকেই সরকারের বিরুদ্ধে। সরকারও এর বিরুদ্ধে। এর কারণ বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠা হয়েছিলো একটি গণতান্ত্রিক দাবীর প্রেক্ষিতে, গণতান্ত্রিক সরকার কর্তৃক। এ দেশে সরকার ও জনতা পরস্পর বিরোধী। গণতন্ত্র ও সরকার সম্পূরক শক্তি নয় বরং বিরোধী। এর প্রাণ হচ্ছে লেখক গবেষক।” সেই প্রাণের আজ প্রাণ নেই। পদ-পদবি পুরষ্কারে মাতাল। অনুভূতি অনুভোতা হয়ে গেছে সে কতকাল আগে। সময় দেখে কেউ কেউ ভোল পাল্টাবে!

খ

মানুষ সামাজিক জীব। ফলে সমাজের একপ্রান্তে কী ঘটছে, অন্যপ্রান্তের মানুষ তা জানতে চায়। তাই তো দেখা হলেই বলে ‘কি মিয়া, খবর কি! ভালো মন্দ জানাইয়ো’। এমনই মানুষের জীবন। পুরনো আলাপে না গিয়ে কেবল পঞ্চদশ শতক থেকে শুরু করি। এই দশকের মাঝামাঝি জার্মানে য়োহান গুটেনবার্গ ছাপাখানা আবিষ্কার করে পুরো জগৎ চেহারা পাল্টে দিলেন।

এই ছাপাখানা এনে দিলো বার্তা, ভাবনা, প্রচারণা, গণপ্রচারের অবাধ সুযোগ। ইতিহাসের চেনা ছক পাল্টে দেওয়ার পথে ছাপাখানার যুগান্তকারী প্রভাব পড়ল। এর মাঝে প্রভাবশালী উপাদান হলো মুদ্রিত খবরের কাগজ। মানুষের পৃথিবীতে এলো নতুন একটি বর্গ, যার নাম গণমাধ্যম।

গণমানুষ গণতন্ত্র গণমাধ্যম তিনটি শব্দে ‘গণ’ শব্দটি সাধারণ। গণমাধ্যম থেকে যদি ‘গণ’ উধাও হয়ে যায় তবে সেটি শুধুই একটি প্রচারমাধ্যমে পরিণত হয়। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান একটি পেশাকে গণমানুষের পক্ষে ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার জন্য দিয়েছে অবাধ স্বাধীনতা।

যদিও প্রমথ চৌধুরী বলেছিলেন, মুখ থেকে কলমে ভাষা যায়। প্রমথ চৌধুরীর সময় কলমের সংখ্যা কম ছিল। আজ অনেক কলম, অনেক দিক। কলমের সংখ্যা বেড়েছে। কলম থেকে মানুষের মুখে সংক্রমিত হওয়ার সংখ্যাও বেশি। প্রযুক্তির নতুন কিছু আসলে সঙ্গে সঙ্গে নতুন শব্দ হাজির হয়। গণমাধ্যম বা যারা লেখালেখি করেন তারা সেটা ভালোভাবে টের পান। প্রকাশ করেন ফেসবুকে বা পত্রিকা অথবা বইতে। প্রাত্যহিক জীবনের সঙ্গে গণমাধ্যম অন্যতম অংশ এখন। তার ভাষাভঙ্গি, জ্ঞান আচরণ ও সংস্কৃতি আমাদের নানানভাবে প্রভাবিত করে।

এর মাঝে টেলিভিশন দেশে যাত্রা শুরু করে ১৯৫০-এর দশকে। হলিউডের কারণে গণবিনোদনের তুমুল জনপ্রিয় অনুষঙ্গ হয়ে চলচ্চিত্র যাত্রা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের সীমানা ছাপিয়ে। বিভিন্ন দেশেও তখন চলছে রুপালি পর্দায় নিজের নিজের মতো করে উঠে দাঁড়ানোর প্রয়াস। বিজ্ঞাপনী প্রচারণার রঙে ইতিহাসটা অবশ্য এগুলোর মতো অভিনব নয়।

তবে ডিজিটাল মাধ্যমের বয়স দুই দশকের ঘরে। এর জন্ম সোনার চামচ মুখে দিয়ে-অপার সম্ভাবনাময় এই পরিসরটি পেয়েছে বিপুল বিনিয়োগ, প্রযুক্তির অনিঃশেষ উদ্ভাবনী চমকের আশীর্বাদ, আর সর্বশেষ করোনার অতিমারিতে বছরের পর বছর রুদ্ধ ঘরে বসে থেকেও পৃথিবীর সঙ্গে যুক্ত থাকার জন্য মানুষের মরিয়া আকুতি। এই যে পরিস্থিতি, তার প্রশ্রয়ে প্রায় মুদ্রিত গণমাধ্যমকে ডিজিটাল গণমাধ্যম দেড় দশকের মধ্যেই কাবু করে পেলেছে।

গ

কোটা সংস্কারে গড়ে ওঠা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে বিশ্বজুড়ে আবু সাঈদ সাহসী প্রতিবাদী চরিত্র হয়ে থাকবে। এমন অসংখ্য ছাত্র-জনতার জীবনের ত্যাগে একক কর্তৃত্বের শাসনে স্বৈরাচারের পদত্যাগ ও দেশ ছাড়ার ঘটনা ঘটে। জুলাই থেকেই সরকার সম্পূর্ণভাবে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। পশ্চিমাকে শত্রু বানিয়ে শেষ পর্যায়ে ভূরাজনীতিতেও প্রায় একা হয়ে পড়েছিলেন। অবশেষে গণ–আন্দোলনের মুখে তার নির্মম পরিণতি দেখে বিশ্ব।

কিন্তু আরেকটি ঘটনা সচেতন মাত্র খেয়াল করেছে গণমাধ্যমের লজ্জাকর ভূমিকা। সবার চোখের সামনেই তরুণদের ক্রমবিস্তৃত একটা শান্তিপূর্ণ আন্দোলন ভয়ঙ্কর সহিংসতার শিকার হতে থাকল। অথচ অধিকাংশ গণমাধ্যম একে যথাযথ ‘ট্রিটমেন্ট’ দিল না। ন্যায্যা আন্দোলনকারীদের বলেছে দুর্বৃত্ত, ষড়যন্ত্রকারী, দেশবিরোধী, উন্নয়ন বিরোধী। সরকার বলছে, রাজাকারের নাতিপুতি, ছাত্রলীগ বলছে- কোটা আন্দোলনের প্রতি আমরা তীক্ষ্ণ নজর রাখছি। আন্দোলনের নামে পরিস্থিতি অশান্ত করে তোলার চেষ্টা হলে ছাত্রলীগ তার করণীয় ঠিক করবে।‘ এই আলাপের বাহিরে গিয়ে হাতেগোনা ৫-৭টি পত্রিকা, ২-৩টি চ্যানেল বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে প্রকৃত দায়িত্ব পালন করেছে

বিশ্লেষণ করলে দেখব- বাংলাদেশে ৪ ধরনের গণমাধ্যম রয়েছে। সংবাদপত্র, টেলিভিশন, রেডিও এবং অনলাইন নিউজ পোর্টাল। স্মার্টফোনের কারণে অবশ্য এর বাইরে সিটিজেন জার্নালিজমের এক বিশাল ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে ফেসবুক। এর মাঝে দেশের বেশিরভাগ গণমাধ্যম ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। গণমাধ্যমের উপর গণমানুষের আস্থা তলানিতে ঠেকেছে। গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র জনতার পক্ষে বেশিরভাগ গণমাধ্যম দাঁড়ায়নি। ফলে ক্ষুব্ধ জনতা বেশ কয়েকটি গণমাধ্যম অফিস ভাংচুর হয়েছে। যদিও এটি অপ্রত্যাশিত কিন্তু বাস্তবতা ছিল।

সাধারণ মানুষ ক্ষমতাহীন মানুষ প্রান্তিক মানুষের পক্ষে ক্ষমতাকে প্রশ্ন করে অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। ক্ষমতাহীনের পক্ষে এই স্বাধীনতার চর্চা যারা করেন তাদেরকে বলা হয় সাংবাদিক। ক্ষমতা যাতে সীমা ছাড়িয়ে স্বৈরাচার হতে না পারে সেজন্য সাংবাদিকরা ক্ষমতাকে চোখে চোখে রাখেন। তার ক্ষমতার উৎসও তাই গণমানুষ। এর আইনি ভিত্তি দিয়েছে সংবিধান। কিন্তু সেই ভিত্তি নিয়ে দালালি করেছি, গণ মানুষের পাশে দাড়ায়নি। স্বাভাবিক বিচার, বিবেচনাবোধ এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছি। এই কা-জ্ঞানহীন কাজটি আরও পরিষ্কার হয়েছে চব্বিশের জুলাই গণ অভ্যুত্থানে।

এমন দলবাজি, অপসাংবাদিকতা, হলুদ সাংবাদিকতা ও তথ্যসন্ত্রাস সাংবাদিকদের মর্যাদা ম্লান করে দিয়েছে। বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতাকে দখল করে নিয়েছে স্বার্থনির্ভর সাংবাদিকতা। কথা ছিল গণমাধ্যমকে সব সময় জনগণের পক্ষে থাকার। কিন্তু জনগণের সঙ্গে গণমাধ্যমের একটা দূরত্ব তৈরি হয়ে গেছে।

সবার মনে আছে নিশ্চয়, সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনাকে গুম-খুনের কথা জিজ্ঞেস না করে তৈলমর্দন করতেন অনেক দালাল সাংবাদিক। সেটা প্রধানমন্ত্রীর সংবর্ধনা সভায় পরিণত হতো। এভাবে শেখ হাসিনাকে স্বৈরাচার থেকে মহাস্বৈরাচার তৈরিতে সবচেয়ে বড় অবদান রাখে দালাল সাংবাদিকেরা।

আসলে দাসত্ব একবার গ্রহণ করলে বাকি জীবন মানুষের আচরণ করা সম্ভব হয় না, প্রমাণ বাংলাদেশের উল্লেখ্যযোগ্য অংশ সাংবাদিক সম্পাদকরা।

ঘ

‘ভোটবঞ্চিত তারুণ্য’ অভূতপূর্ব অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ফেললেন। ঘোর আষাঢ়-শ্রাবণেও এমন প্লাবন এ দেশ দেখেনি। এ যেন নজরুলের উষার দুয়ারে আঘাত হেনে রাঙা প্রভাত আনার ছন্দময় বিপ্লব। বাংলাদেশের সঙ্গে ৩টি গণঅভ্যুত্থানের সময় স্মরণীয়।

৬৯ সালের বাঙালির স্বকীয়তাবোধে শ্লোগান ছিল-

‘তোমার দেশ আমার দেশ ,বাংলাদেশ বাংলাদেশ’

জ্বালো জ্বালো

আগুন জ্বালো’;

‘আইয়ুব-মোনায়েম ভাই ভাই

এক দড়িতে ফাঁসি চাই’,

‘পুলিশ তুমি যতই মারো

বেতন তোমার এক শ বারো’ প্রভৃতি।

৯০ এরশাদ পতনের আন্দোলনে স্লোগান ছিল

‘জনতার দাবি এক

এরশাদের পদত্যাগ’;

‘এক দফা এক দাবি

এরশাদ তুই কবে যাবি’;

‘এই মুহূর্তে দরকার

তত্ত্বাবধায়ক সরকার’।

পতনের পরপর স্লোগান উঠেছিল

‘এই মাত্র খবর এলো

এরশাদ পালিয়ে গেল’।

২০২৪ সালের ছাত্রজনতার আন্দোলনে

‘চাইলাম অধিকার হয়ে

হয়ে গেলাম রাজাকার’;

‘আপস না সংগ্রাম

সংগ্রাম সংগ্রাম’;

‘দালালি না রাজপথ

রাজপথ রাজপথ’;

‘আমার সোনার বাংলায়

বৈষম্যের ঠাঁই নাই’;

‘একাত্তরের হাতিয়ার

গর্জে ওঠো আরেকবার’;

‘যে হাত গুলি করে

সে হাত ভেঙে দাও’;

‘অ্যাকশন অ্যাকশন

ডাইরেক্ট অ্যাকশন’;

‘আমার ভাই কবরে

খুনিরা কেন বাইরে’;

‘আমার ভাই জেলে কেন’;

‘জাস্টিস জাস্টিস

উই ওয়ান্ট জাস্টিস’;

‘জ্বালো রে জ্বালো

আগুন জ্বালো’;

আমার খায়

আমার পরে

আমার বুকেই গুলি করে’;

‘লাশের ভেতর জীবন দে/

নইলে গদি ছাইড়া দে’;

‘এক দুই তিন চার

শেখ হাসিনা গদি ছাড়’;

‘লাখো শহীদের রক্তে কেনা

দেশটা কারো বাপের না’-

এর মতো কিছু স্লোগানও ওঠে। এমনকি ব্রিটিশবিরোধী লড়াইর সাড়া জাগানো ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগানটিও যেন এবার নতুন প্রাণ পেয়েছে।

এগুলো পত্রিকা কাভার করেছে বা করতে বাধ্য হয়েছে। মানুষের কথা কীভাবে কলমে চলে যায় বলা যায় না। তবে পত্রিকা কীভাবে ট্রিটমেন্ট দিয়েছে। তার কিছু নমুনা হাজির করছি। এ থেকে পাঠক ধারনা পাবেন গণমাধ্যমের ভাষাজ্ঞান ও জনগণের প্রতি দায় ও দরদ।

যুগান্তর ৫ আগস্ট লিখছে- ১৩ পুলিশকে ‘হত্যা’ আর ফেনীতে এক দফা কর্মসূচিতে সংঘর্ষ নিহত ৭। দেখা যাচ্ছে- পুলিশের ক্ষেত্রে ‘হত্যা’ আর ছাত্র-জনতার ক্ষেত্রে ‘নিহত’! পরদিন লিখছে- বিজয়ের দিনেও পুলিশের গুলি, হামলা, নিহত ১০৩ / রাজপথে ছাত্র-জনতার বিজয় উল্লাস, ভাষাভঙ্গি কতটা পরিবর্তন ঘটেছে।

অন্যদিকে আর একটি সংবাদের কয়েকটি নমুনা দিলাম। বিভিন্ন মামলায় ৪২ এইচএসসি পরিক্ষার্থীর জামিন আদেশ (জনকন্ঠ), আইনমন্ত্রীর উদ্যোগে ৪২ এইচএসসি পরীক্ষার্থীর জামিন (যুগান্তর), কোটা আন্দোলন : ৪২ এইচএসসি পরীক্ষার্থীর জামিন (নয়া দিগন্ত), কোটা আন্দোলন: কারাগারে থাকা ৪২ এইচএসসি পরীক্ষার্থীর জামিন (যমুনা টিভি), আন্দোলনে সহিংসতা: জামিন পেলেন ৪২ এইচএসসি পরীক্ষার্থী (বিডি নিউজ অনলাইন), কোটা সংস্কার আন্দোলন/ মামলায় জামিন পেলেন যেসব এইচএসসি পরীক্ষার্থী ও শিক্ষার্থী (প্রথম আলো)।

কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে সংঘাত, সংঘর্ষ ও সহিংসতার ঘটনায় করা মামলায় গ্রেপ্তার দেশের বিভিন্ন জেলার এইচএসসি পরীক্ষার্থী ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। অথচ জনকন্ঠ ও যুগান্তর পত্রিকা পড়ে বুঝার উপায় নেই, কেন তাদের জামিন কেন তাদের গ্রেফতার করেছে। এই হচ্ছে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা।

আর একটি দেখব- ৬ সমন্বয়ককে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করল ডিবি (ইত্তেফাক), ডিবি হেফাজত থেকে পরিবারের কাছে ৬ ‘সমন্বয়ক’- (বিডি নিউজ অনলাইন), ৬ সমন্বয়ককে ছেড়ে দিয়ে প্রহরায় না রাখার দাবি, নাগরিক সমাজ (প্রথম আলো)। কার শিরোনাম কেমন, কে কী এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে, বুঝা যায়?

শেষ আর একটি হাজির করি- মার্চ ফর জাস্টিস’ কর্মসূচি প– (জনকন্ঠ), পুলিশি বাঁধায় মার্চ ফর জাস্টিস কর্মসূচি প-, আটক ১৪ (ইনকিলাব), ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ কর্মসূচিতে পুলিশের বাধা- (বিডি নিউজ অনলাইন), মার্চ ফর জাস্টিস: বিভিন্ন জায়গায় মিছিল, পুলিশের বাধা- আটক (প্রথম আলো)

শিরোনামে বুঝা যায়, কে কার দিকে হেলে পড়ছে অথবা যথার্থটা তুলে আনছেন। ভাষা ও ভঙ্গিতে সীমাহীন লেজুড়বৃত্তির চর্চা পরিষ্কার। নিউজ ট্রিটমেন্টে আরও বুঝা যায় কার কী এজেন্ডা। এসব চর্চা দীর্ঘ সময় ধরে চর্চিত হতে হতে এখন প্রতিষ্ঠিত সেলফ সেন্সরশিপে রূপান্তরিত হয়েছে। অথচ বলা হয়- গণমাধ্যম আধুনিক সমাজের একটি অপরিহার্য অংশ। গণমাধ্যম জনগণকে প্রভাবিত করে, বিভিন্ন বিষয়ে সচেতন করে এবং স্বপ্ন দেখায়। গণমানুষ তাদের যাপিত জীবনের বিভিন্ন দিক নির্দেশনা পায় গণমাধ্যমের কাছ থেকে। সেই গণমাধ্যম অধরা!

পত্রিকাগুলোর মধ্যে কোন সমন্বয় নেই। যে যার মত করে বানান লিখছে। এমন বহু সংকটে চুপ অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, সাংবাদিক ও সম্পাদক। অনেক আগে মারা গেছেন অদ্ভুত উটের পিঠে চলছে স্বদেশের কবি, বেঁচে থেকেও চুপ দুঃশাসনবিরোধী কবিরা, কেউ কেউ মুখে কুলুপ এঁটে সুবিধা নিতে নিতে রীতিমতন রাজকবির পর্যায়ে পৌঁছে গেছেন।

তরুণ সাংবাদিকদের একটা অংশ জুলাইতে পেশাগত দায়িত্বপালনের সময় হামলার শিকার হয়েছেন। অনেককে শারীরিকভাবে নির্যাতন এবং কাজের সময় হাত থেকে ক্যামেরা ছিনিয়ে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে। আবার অফিস থেকে অসহযোগিতা পেয়েছেন এমন উদাহরণও আছে। সম্পাদক থেকে বার্তা প্রধান বা প্রধান প্রতিবেদক পর্যায়ের নেতারা বিক্রি হয়ে গেছে অনেক আগেই। তাদের কারণে প্রজন্মের পথচলা বিব্রতকর। শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি শহীদ সাংবাদিকদের।

আমরা আমরা বিগত সরকারের আমলে মিডিয়া হস্তক্ষেপ বা কণ্ঠরোধ করার সংস্কৃতি। এর মাঝেও জুলাই আন্দোলনের শুরু থেকে মাল্টিমিডিয়া সাংবাদিকরা ঝুঁকি নিয়ে কিছু কাজ করেছে। বিভিন্ন ক্যাম্পাসের খবর দিয়েছে।

সবচেয়ে খারাপ লাগার সংবাদ হচ্ছে- আন্দোলনে বিক্ষোভকারীদের ওপর চালানো গুলিতে পাঁচ সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। পুলিশের গুলিতে ১৮ই জুলাই হাসান মেহেদী নামের এক সাংবাদিক নিহত হন। তিনি ঢাকা টাইমস এই নিউজ পোর্টালে কর্মরত ছিলেন। ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে খবর সংগ্রহের সময় তিনি গুলিবিদ্ধ হন। একই দিনে ভোরের আওয়াজ নামের একটি দৈনিকের প্রতিবেদক শাকিল হোসাইন নিহত হন। ওই দিন দৈনিক নয়াদিগন্তের সিলেট প্রতিনিধি আবু তাহের মুহাম্মদ তুরাব নামের আরেক সাংবাদিক পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান। ২ আগস্ট তাহির জামান প্রিয় নামের আরেক ফ্রিল্যান্স ভিডিও সাংবাদিক গুলিবিদ্ধ হন। এর দুইদিন পর ৫ আগস্ট সিরাজগঞ্জে দৈনিক খবরপত্রের সাংবাদিক প্রদীপ কুমার ভৌমিক প্রাণ হারান। নিহত সাংবাদিকের সকলেই পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন। নিহতের পাশাপাশি অন্তত কয়েক ডজন সাংবাদিক আহত হয়েছেন।

আমি মনে করি শেখ হাসিনার চলে যাওয়াও কেবল তার দলের জন্য শিক্ষা না, সবার জন্য উচিৎ শিক্ষা। অহংকার ও শব্দের ব্যবহারে সতর্ক হতে হয়! না হলে কর্মের ফল হাতে হাতে পেতে হয়। সেই দীক্ষায় গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও সামাজিক সম্প্রীতি নিয়ে নতুন বাংলাদেশ নির্মাণে কাজ করে যেতে হবে। সজাগ থাকতে হবে চারপাশের গুজব নিয়েও। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন শেষ হয় না- এটা বিশেষ করে মনে রাখতে হবে সাংবাদিকদের।