বর্জ্য ব্যবস্থাপনা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জরুরি বিষয়, বিশেষত ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোর জন্য। আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় প্রতিনিয়ত ব্যবহৃত প্রতিটি বস্তু থেকেই কিছু অপ্রয়োজনীয় উচ্ছিষ্ট অংশের উদ্ভব হয় যা ব্যবহারের অনুপযোগী, মূল্যহীন ও ত্রুটিপূর্ণ। এগুলোকে আমরা বর্জ্য পদার্থ বা ময়লা বলেই আখ্যায়িত করে থাকি। বর্জ্যের ধরন বিভিন্ন রকম হতে পারে, যেমন গৃহস্থালি বর্জ্য, বাণিজ্যিক বর্জ্য এবং শিল্প বর্জ্য।
স্থপতি হিসেবে বলব, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা শহরের নান্দনিকতা, জনস্বাস্থ্য এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সহায়ক একটি মৌলিক কাঠামোগত উপাদান। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নকশা প্রণয়নের সময় প্রথমেই বিবেচনায় আসে শহরের পরিবেশ এবং নগরবাসীর স্বাস্থ্য সুরক্ষা। ঢাকার মতো শহরগুলোর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কাঠামো পুনঃনির্মাণ করার সময় স্থপতি, প্রকৌশলী এবং নগর পরিকল্পনাকারীদের যৌথভাবে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা প্রয়োজন।
বর্জ্যের শ্রেণিবিন্যাস এবং তাদের প্রভাব:
বর্জ্য সাধারণত দুই ভাগে বিভক্ত—মিউনিসিপ্যাল কঠিন বর্জ্য এবং শিল্প বর্জ্য। মিউনিসিপ্যাল কঠিন বর্জ্য মানে হলো শহর বা পৌর এলাকায় উৎপন্ন গৃহস্থালি, বাণিজ্যিক ও কিছু প্রাতিষ্ঠানিক বর্জ্য, যা সিটি কর্পোরেশন দ্বারা সংগৃহীত হয়। অন্যদিকে শিল্প বর্জ্য প্রধানত কারখানা ও উৎপাদনশীল কার্যক্রম থেকে আসে যা রাসায়নিক এবং ভারী ধাতু দ্বারা দূষিত। একজন স্থপতি হিসেবে এ ধরনের শিল্প বর্জ্য সংরক্ষণের সময় বিশেষ ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করি, যাতে বর্জ্যের রাসায়নিক উপাদানগুলো নগরবাসীর বাসস্থানের কাছাকাছি পৌঁছাতে না পারে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়ার প্রধান স্তরসমূহ:
বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রক্রিয়া মূলত পাঁচটি ধাপে বিভক্ত: বর্জ্য সংগ্রহ, পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পুনর্ব্যবহার ও চূড়ান্ত নিষ্পত্তি। ঢাকার মতো শহরে প্রতিটি স্তরে সচেতন এবং কাঠামোগত পদ্ধতির প্রয়োগ প্রয়োজন। সঠিক নকশা অনুসারে পরিকল্পিত সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশনগুলো বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ধারাবাহিকতার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
ল্যান্ডফিল ও পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে পরিবেশ সুরক্ষা:
বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চূড়ান্ত ধাপ হলো ল্যান্ডফিল বা ময়লার ভাগাড়, যেখানে বর্জ্য নিরাপদে নিষ্পত্তি করা হয়। একজন স্থপতি হিসেবে বলব, স্যানিটারি ল্যান্ডফিলের নকশা ও অবকাঠামো যদি সঠিকভাবে তৈরি করা হয়, তবে বর্জ্যের ক্ষতিকর প্রভাব পরিবেশে ছড়াতে বাধা দেয়া সম্ভব। লিচেট ও গ্যাস কালেক্টর ব্যবহারের মাধ্যমে দূষণ নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে, যা পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি শক্তি উৎপাদনেও সহায়ক হতে পারে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বর্তমান অবস্থা এবং চ্যালেঞ্জসমূহ:
বাংলাদেশে অর্থনৈতিক উন্নতির সঙ্গে বর্জ্য উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে, কিন্তু এই খাতে অবকাঠামোগত উন্নতি তেমনভাবে দেখা যায় না। ঢাকায় প্রতিদিন যে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য উৎপন্ন হয়, সেগুলো যথাযথভাবে সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে না। এর ফলে যত্রতত্র উন্মুক্তভাবে বর্জ্য পড়ে থাকে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে। স্থপতি হিসেবে এ সমস্যার একটি কাঠামোগত সমাধান প্রয়োজন।
সিটি করপোরেশনের অধীনস্থ ল্যান্ডফিলের সমস্যা ও সমাধান:
ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অধীনে আমিনবাজার এবং মাতুয়াইল ল্যান্ডফিল রয়েছে। যদিও এ ল্যান্ডফিলগুলো স্যানিটারি ল্যান্ডফিল হওয়ার কথা, বাস্তবে এগুলো উন্নত উন্মুক্ত ল্যান্ডফিল হিসেবে কাজ করছে। এগুলোতে গ্যাস ও লিচেট সংগ্রহের সঠিক ব্যবস্থার অভাব রয়েছে, যা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। ভবিষ্যতে পরিকল্পিত নতুন ল্যান্ডফিলের নকশায় অত্যাধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ করা হলে এ সমস্যা নিরসন সম্ভব।
বর্জ্য সংগ্রহ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের প্রয়োজনীয়তা:
বাংলাদেশে সব ধরনের বর্জ্য একত্রে সংগ্রহ করা হয়, যা আলাদাভাবে সংগ্রহ করা উচিত। এলাকাভিত্তিক ভ্যানগুলো মাসিক অর্থের বিনিময়ে ময়লা সংগ্রহ করলেও অনেক নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার এ সুবিধা নিতে পারে না। সিটি করপোরেশন কর্তৃক সরকারি উদ্যোগে এ ভ্যান ব্যবস্থা পরিচালিত হলে নিম্নআয়ের পরিবারের জন্য এটি সহায়ক হবে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সঠিক পরিকল্পনা ও প্রযুক্তিগত সহায়তার প্রয়োজন:
অবশেষে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগে পরিবেশ বিজ্ঞান এবং স্থপতিদের নিয়োগ দেয়া উচিত, যাতে আধুনিক এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে এ খাত পরিচালনা করা যায়। ঢাকায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য আধুনিক প্রযুক্তি এবং পরিকল্পনার মাধ্যমে টেকসই উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা শুধু পরিবেশ রক্ষার জন্য নয়, বরং জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই সরকারের পাশাপাশি জনগণের সচেতনতা এবং সক্রিয় অংশগ্রহণ জরুরি।
আমরা আগেই উল্লেখ করেছি যে, তৃতীয় শতকে ইমাম আবূ হানীফার বিরুদ্ধে প্রচারণা ব্যাপকতা লাভ করে। বিশেষত মুতাযিলী শাসনের অবসানের পরে পরিস্থিতি আরো ঘোলাটে হয়। বাহ্যত এর কারণগুলি নিম্নরূপ:
৭. ১. প্রসারতা ও ক্ষমতার ঈর্ষা
আমরা আগেই বলেছি যে, তাবিয়ী যুগের অন্য কোনো ফকীহ ইমাম আবূ হানীফার মত প্রসিদ্ধি ও মর্যাদা লাভ করেন নি। তাঁর জীবদ্দশাতেই তাঁর মত প্রসিদ্ধি লাভ করে। আববাসী খলীফা মাহদীর যুগ (১৫৮-১৬৯হি) থেকে হানাফী ফিকহ রাষ্ট্রীয় ফিকহে পরিণত হয়। এ ফিকহে পারদর্শীগণই বিভিন্ন বিচারিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। পরবর্তী শতাব্দীর পর শতাব্দী এ নেতৃত্বের ও কর্তৃত্বের ধারা অব্যাহত থাকে। হানাফী বিরোধীদের ক্ষোভ এতে বাড়তে থাকে এবং তাঁদের বৈরী প্রচারণাও ব্যাপক হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এ প্রচারণা হানাফী ফিকহের বিরুদ্ধে না হয়ে ব্যক্তি আবূ হানীফার চরিত্র হননের দিকে ধাবিত হয়।
৭. ২. মুতাযিলী ফিতনা ও সম্পৃক্তি
২০০ হিজরীর দিকে আববাসী খলীফা মামুন (রাজত্ব ১৯৮-২১৮ হি) মুতাযিলী ধর্মবিশ্বাস গ্রহণ করেন এবং একে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ঘোষণা করেন। পরবর্তী খলীফা মু’তাসিম বিল্লাহ (২১৮-২২৭ হি) ও ওয়াসিক বিল্লাহ (২২৮-২৩২ হি) এ মতবাদ অনুসরণ করেন। গ্রীক দর্শন নির্ভর এ মতবাদে কুরআনের বিভিন্ন আয়াতের সাথে সুস্পষ্টভাবে সাংঘর্ষিক বিভিন্ন বিশ্বাস বিদ্যমান। এ সকল বিশ্বাসের মধ্যে রয়েছে ‘‘কুরআন সৃষ্ট বা মাখলূক’’। এ ছাড়া মুতাযিলীগণ আল্লাহর ‘‘বিশেষণগুলো’’ ব্যাখ্যা করে অস্বীকার করেন। এ মত প্রতিষ্ঠায় এ তিন খলীফা ছিলেন অনমনীয়। এ মত গ্রহণে অস্বীকৃতি জ্ঞাপনকারী আলিমদেরকে গ্রেফতার করে তাঁরা অবর্ণনীয় অত্যাচার করতে থাকেন। পরবর্তী শাসক মুতাওয়াক্কিল (২৩২-২৪৭ হি) এ অত্যাচারের অবসান ঘটান। সকলেই স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ ও পালনের সুযোগ পান।
প্রায় ত্রিশ বৎসরের মুতাযিলী শাসনের সময়ে স্বভাবতই প্রশাসন ও বিচার ব্যবস্থায় হানাফী ফকীহগণ ছিলেন। তাঁদের অনেকেই ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় মুতাযিলীদের সাথে সহযোগিতা করেছেন বা তাদের মত গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছেন। বিশেষত খলীফা মামুনের মুতাযিলী ফিতনার মূল স্থম্ভ বিশর আল-মারীসী: বিশর ইবন গিয়াস ইবন আবী কারীমা আব্দুর রাহমান (২১৮ হি) এবং বিচারপতি আহমদ ইবন আবী দুওয়াদ (আবী দাউদ) ইবন জারীর (১৬০-২৪০ হি) উভয়েই ফিকহী মতে ইমাম আবূ হানীফার অনুসারী হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিলেন। মুতাযিলী মতের প্রচার-প্রসার, দেশের সকল আলিমকে খলীফার দরবারে ডেকে মুতাযিলী মত গ্রহণে বাধ্য করা এবং ইমাম আহমদ ও মুতাযিলা মতবিরোধী অন্যান্য প্রসিদ্ধ ইমামগণের উপর নির্মম নির্যাতন ও হত্যাকান্ডের মূল হোতা ছিলেন তাঁরা।[1]
মুতাযিলী অত্যাচারের অবসানের পরেও হানাফী ফকীহগণ বিচারিক ও প্রশাসনিক দায়িত্বে নিয়োজিত থাকেন। এছাড়া মুতাযিলীগণ ‘হানাফী’ নামের ছত্রছায়ায় তাদের মত প্রচার করতে থাকেন। অপরদিকে হানাফী বিরোধীগণ আহলুস সুন্নাতের নামে, বিদআত বিরোধিতা বা মুতাযিলী বিরোধিতার নামে ইমাম আবূ হানীফা ও তাঁর অনুসারীদের বিরুদ্ধে কথা বলতে থাকেন। অনেকে এ বিষয়ে জালিয়াতির আশ্রয় নিতে থাকেন। অনেক সরলপ্রাণ প্রাজ্ঞ আলিমও এরূপ অপপ্রচারে প্রভাবিত হন।
৭. ৩. বিচার ও শাসন বনাম ইলম ও কলম
আমরা দেখেছি যে, দ্বিতীয় হিজরী শতকের শেষ দিক থেকেই হানাফী ফিকহ রাষ্ট্রীয় ফিকহে পরিণত হয়। হানাফী ফকীহগণ ফিকহ ও বিচারিক দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। তৃতীয় হিজরী শতক থেকে হাদীস চর্চায় হানাফী ফকীহগণের সম্পৃক্তি কমতে থাকে। এছাড়া ফিকহী বিষয়ে অতিরিক্ত মনোসংযোগের কারণে হাদীস বিষয়ে তাদের দুর্বলতা বাড়তে থাকে। এভাবে তাদের সাথে মুহাদ্দিসগণের দূরত্ব ও বিচ্ছিন্নতা বাড়তে থাকে।
৭. ৪. মাযহাবী গোঁড়ামি ও বিদ্বেষ
চতুর্থ হিজরী শতক থেকে মাযহাবী গোঁড়ামি ও বিদ্বেষ ব্যাপকতা লাভ করতে থাকে। এ সময়ে তিনটি মাযহাব প্রসিদ্ধ ছিল: হানাফী, মালিকী ও শাফিয়ী। মালিকী মাযহাব উত্তর আফ্রিকা ও স্পেনে বিস্তার লাভ করে। মুসলিম বিশ্বের প্রাণকেন্দ্র মিসর, ইরাক ও পারস্যে হানাফী-শাফিয়ী দ্বন্ধ ব্যাপক রূপ গ্রহণ করে। ক্ষমতা, প্রতিপত্তি ও প্রসারতা ছিল হানাফীদের বেশি। কিন্তু হাদীস চর্চা ও লিখনীতে শাফিয়ীগণ অগ্রগামী ছিলেন। মুহাদ্দিসগণের মধ্যে শাফিয়ী মাযহাব প্রসার লাভ করে। কোনো কোনো মুহাদ্দিস হানাফীদের ‘ঘায়েল’ করার জন্য তাদের ইমামকে ছোট করতে চেষ্টা করেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে সত্য, মিথ্যা, জাল-বানোয়াট সবকিছু সংকলন করেন।
এ প্রচারণার কারণে তৃতীয় শতকের মাঝামাঝি থেকে মুহাদ্দিসগণের মধ্যে তাঁর প্রতি কঠোর আপত্তি ও বিদ্বেষের ভাব জন্ম নিতে থাকে। এ সময়ে ‘‘আহলুস সুন্নাহ’’ ও মুহাদ্দিসদের মধ্যে বিদ্যমান অনুভূতি অনেকটা নিম্নরূপ: যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর হাদীস অস্বীকার করত!! হাদীসের বিপরীতে নিজের মত দিয়ে দীন তৈরি করত!!! সকল বিদআতী আকীদার প্রচারক ছিল!! সে কিভাবে এত প্রসিদ্ধি লাভ করল? তার মত কেন এত প্রসার লাভ করল? কোনো অজুহাতেই তাকে সহ্য করা যায় না!!!!
হানাফীগণ এ সকল অভিযোগ খন্ডন করেছেন। তবে মুহাদ্দিসগণের সাথে দূরত্বের কারণে তাঁদের মধ্যে তা তেমন প্রভাব বিস্তার করে নি। এছাড়া হানাফীগণ সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ার কারণে অনেক সময় ইলমী প্রতিবাদের চেয়ে শক্তির প্রতিবাদ বেশি জোরদার হয়েছে। কখনো বা ইমামের বিরুদ্ধে অভিযোগ খন্ডন করতে যেয়ে প্রতিপক্ষকে ছোট করার প্রবণতা দেখা দিয়েছে। কখনো তাঁর মর্যাদা প্রমাণ করার নামে তাঁর নামে প্রচলিত সবকিছু নির্ভুল ও নির্বিচারে গ্রহণযোগ্য বলে দাবি করা হয়েছে। পক্ষের-বিপক্ষের সকলেই আবেগ ও বাড়াবাড়িতে আক্রান্ত হয়েছেন।
আমরা জানি, ইমাম আবূ হানীফাকে হক্ক বলা আর তাঁর অন্ধ অনুসরণকে হক্ক বলা এক নয়। ইমাম আবূ হানীফাকে হক্ক বলার অর্থ তাঁকে নিষ্পাপ বা নির্ভুল বলা নয়। ইমাম আবূ হানীফাকে ভাল বলতে যেয়ে তাঁর বিরুদ্ধে যারা আপত্তিকর কথা বলেছেন তাদেরকে মন্দ বলাও ঠিক নয়। ইমাম আবূ হানীফাকে হক্ক বাতিলের মাপকাঠি বানিয়ে দেওয়াও ঠিক নয়।
এভাবে অভিযোগ ও প্রতিবাদ প্রক্রিয়া মাযহাবী আক্রোশের গন্ডি থেকে বের হতে পারে নি। হিজরী ৫ম শতক থেকে অন্য মাযহাবের কতিপয় আলিম এ সব অপপ্রচারের বিরুদ্ধে কলম ধরেন। এদের অন্যতম প্রসিদ্ধ মালিকী ফকীহ ও মুহাদ্দিস ইউসূফ ইবন আব্দুল্লাহ ইবন আব্দুল বার্র (৩৬৮-৪৬৩ হি)। তিনি ‘‘আল-ইন্তিকা ফী ফাদায়িলিল আয়িম্মাতিস সালাসাহ’’ নামক গ্রন্থে তিন ইমাম: আবূ হানীফা, মালিক ও শাফিয়ীর মর্যাদা ব্যাখ্যা করেন এবং তাঁদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার জ্ঞানবৃত্তিকভাবে খন্ডন করেন।
পরবর্তীকালে অন্যান্য মাযহাবের কতিপয় ফকীহ, মুহাদ্দিস, ঐতিহাসিক ও জারহ-তাদীল বিশেষজ্ঞ নিরপেক্ষ বিচার ও পর্যালোচনার চেষ্টা করেন। এদের মধ্যে রয়েছেন প্রসিদ্ধ হাম্বালী ফকীহ ও মুজতাহিদ শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়া আহমদ ইবন আব্দুল হালীম (৬৬১-৭২৮ হি), তাঁর তিন ছাত্র: প্রসিদ্ধ শাফিয়ী ফকীহ ও মুহাদ্দিস ইউসূফ ইবন আব্দুর রাহমান, আবুল হাজ্জাজ আল-মিয্যী (৬৫৪-৭৪২ হি), প্রসিদ্ধ শাফিয়ী-হাম্বালী ফকীহ ও মুহাদ্দিস ইমাম যাহাবী: মুহাম্মাদ ইবন আহমদ (৬৭৩-৭৪৮ হি), প্রসিদ্ধ শাফিয়ী ফকহী ও মুহাদ্দিস আবুল ফিদা ইসমাঈল ইবন উমার ইবন কাসীর (৭০১-৭৭৪ হি) এবং অষ্টম হিজরী শতকের প্রসিদ্ধ শাফিয়ী ফকীহ ও মুহাদ্দিস ইবন হাজার আসকালানী: আহমদ ইবন আলী (৭৭৩-৮৫২ হি)।
সিফিলিস হল এক প্রকার যৌনবাহিত সংক্রমণ (STD), যা Treponema pallidum নামে একটি ব্যাকটেরিয়ার কারণে হয়ে থাকে। এটি এক প্রকার বহুমাত্রিক রোগ, যা সাধারণত চারটি পর্যায়ে বিভক্ত। সিফিলিস রোগের সংক্রমণ দ্রুত ছড়ায় এবং এর প্রাথমিক পর্যায়ে সঠিক চিকিৎসা না করলে রোগটি দীর্ঘমেয়াদে বিপজ্জনক পরিণতির দিকে ধাবিত হতে পারে। বাংলাদেশে এই রোগের প্রাদুর্ভাব শতকরা ৫.৭ ভাগ। যৌনকর্মী, প্রবাসী ও বস্তিবাসী মধ্যে এই রোগ বেশি দেখা দেয়।
সিফিলিসের কারণ ও সংক্রমণ
সিফিলিসের প্রধান কারণ হল যৌন সংস্পর্শ। Treponema pallidum ব্যাকটেরিয়া প্রধানত যৌনমিলনের সময় সংক্রামিত ব্যক্তির থেকে অন্য ব্যক্তির শরীরে প্রবেশ করে। এটি গর্ভবতী মায়ের শরীর থেকে নবজাতক শিশুর শরীরেও স্থানান্তরিত হতে পারে, যা জন্মগত সিফিলিস হিসেবে পরিচিত। অরক্ষিত যৌনমিলন, একাধিক যৌন সঙ্গীর সাথে সম্পর্ক এবং সঠিক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ার ফলে সিফিলিস সংক্রমণের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।
সিফিলিসের বিভিন্ন স্টেজ ও লক্ষণ:
সিফিলিস প্রধানত চারটি পর্যায়ে বিকশিত হয়: প্রাইমারী, সেকেন্ডারি, লেটেন্ড, এবং টারশিয়ারি স্টেজ।
১) প্রাইমারী স্টেজ: প্রাইমারী স্টেজে সিফিলিসে আক্রান্ত হলে সংক্রমণের দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে সংক্রমণের স্থানে ছোট ক্ষত (চ্যানক্র) তৈরি হয়। এই ক্ষত সাধারণত ব্যথাহীন হয় এবং এটি কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সেরে যায়, যদিও সংক্রমণ শরীরে থেকে যায়।
২) সেকেন্ডারি স্টেজ: প্রাইমারী স্টেজের পর সিফিলিস সেকেন্ডারি স্টেজ প্রবেশ করে, যেখানে সারা শরীরে লালচে দানা বা ফুসকুড়ি দেখা দিতে পারে। এ সময় সর্দি-কাশি, গলাব্যথা, জ্বর, মাথাব্যথা, এবং অস্থিরতা অনুভূত হতে পারে। এই লক্ষণগুলো কয়েক সপ্তাহের জন্য বিদ্যমান থাকতে পারে এবং তারপর সেরে যায়।
৩) লেটেন্ড স্টেজ: সেকেন্ডারি স্টেজের পর সিফিলিস লেটেন্ড স্টেজে প্রবেশ করে, যেখানে সংক্রমণ সক্রিয় না থেকে গোপনে অবস্থান করে। এই পর্যায় কয়েক বছর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে এবং সঠিক চিকিৎসা না পেলে পরবর্তীতে তৃতীয় পর্যায়ে চলে যেতে পারে।
৪) টারশিয়ারি স্টেজ: সিফিলিসের সবচেয়ে বিপজ্জনক পর্যায় হলো টারশিয়ারি স্টেজ। এটি ত্বক, হৃদযন্ত্র, মস্তিষ্ক, স্নায়ুতন্ত্র এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এটি কখনো কখনো মৃত্যু ঘটাতে পারে।
সিফিলিস নির্ণয়
সিফিলিস রোগ নির্ণয় জন্য চিকিৎসক সাধারণত রক্ত এবং যেখান থেকে ঘা হয়েছে ঐ জায়গা থেকে তরল পদার্থ নিয়ে রোগ নির্ণয় করা হয়:
১) মাইক্রোবায়োলজি টেস্ট: সাধারণ মাইক্রোস্কোপ থেকে সহজে সিফিলিস অণুজীব পাওয়া যায় না। এটা দেখার জন্য ডার্ক ফিল্ড মাইক্রোস্কোপ অথবা সিলভার স্টেনিং মাধ্যমে সিফিলিস অণুজীব দেখতে পারি।
২) ভিডিআরএল (ভেনেরিয়াল ডিজিজ রিসার্চ ল্যাবরেটরি) টেস্ট: এই টেস্ট সাধারণত স্কিনিং এর কাজে ব্যবহার করা হয়। তবে এটি অনেক সময় অন্য রোগ থাকলে সেটি পজিটিভ হিসেবে গণ্য হবে। যেমন: যক্ষ্মা, সারকোইডোসিস ইত্যাদি অন্যান্য জীবাণুযুক্ত রোগ দেখা দেয়।
৩) টিপিএইচএ (ট্রেপোনেমা প্যালিডাম পার্টিকেল অ্যাগ্লুটিনেশন অ্যাস) টেস্ট: এই টেস্ট মাধ্যমে নিশ্চিত জানা যায় যে, রোগী সিফিলিস রোগে আক্রান্ত। তবে যার একবার সিফিলিস হয়েছে, তারা যদি আরেকবার টেস্ট করাতে আসে তাহলে আজীবন পজিটিভ থাকবে।
চিকিৎসা
সিফিলিসের চিকিৎসার জন্য মূলত পেনিসিলিন ব্যবহার করা হয়, যা সংক্রমণ দূরীকরণে অত্যন্ত কার্যকর। প্রাইমারী স্টেজে সঠিক চিকিৎসা গ্রহণ করলে সিফিলিস সম্পূর্ণভাবে নিরাময় করা সম্ভব। তবে সেকেন্ডারি বা টারশিয়ারি স্টেজে রোগটি নিরাময়যোগ্য হলেও কিছু ক্ষেত্রে স্থায়ী ক্ষতি থেকে যায়। চিকিৎসার সময় যৌন কার্যক্রম এড়িয়ে চলা উচিত এবং যৌন সঙ্গীদের সঠিকভাবে পরীক্ষা ও চিকিৎসা করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
প্রতিরোধ
সিফিলিস প্রতিরোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সঠিক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ। অরক্ষিত যৌনমিলন এড়ানো, সঠিক যৌন শিক্ষার প্রসার, এবং নিয়মিত STD পরীক্ষা করানো অত্যন্ত জরুরি। এছাড়াও একাধিক যৌন সঙ্গীর সাথে সম্পর্ক স্থাপনে সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।
সিফিলিস একটি গুরুতর যৌনবাহিত রোগ, যা নির্দিষ্ট পর্যায়ে জীবনের জন্য হুমকিস্বরূপ হতে পারে। এ রোগের দ্রুত শনাক্তকরণ এবং প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। যৌন সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সামাজিক শিক্ষার মাধ্যমে সিফিলিসসহ অন্যান্য যৌনবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব কমানো সম্ভব।
২০১৬ সালে প্রথমবার আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প গোটা বিশ্বকে চমকে দিয়েছিলেন। তখন অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেছিলেন যে, মার্কিন ভোটাররা হয়তো ভুল করে ফেলেছে। এবার, ২০২৪ সালে সেই ভুলের অজুহাতের সুযোগ নেই। মার্কিন জনগণ জানত যে ট্রাম্প একজন দোষী সাব্যস্ত অপরাধী, যিনি কথায় কথায় মিথ্যা বলেন, এবং যার বিরুদ্ধে বর্ণবিদ্বেষের অভিযোগ রয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, চার বছর আগে, তিনি ক্ষমতায় থাকা একটি গণতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাতের চেষ্টা করেছিলেন, যা ক্যাপিটলে হামলার মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল। সেই পরাজয় এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে মনে হয়েছিল তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শেষ হয়ে গেছে।
অন্যদিকে, কমলা হ্যারিসের মধ্যে আমেরিকা প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট হওয়ার সম্ভাবনা দেখেছিল। তবে তারপরও ভোটের ফলাফল বিস্ময়করভাবে ট্রাম্পের পক্ষে এসেছে। চার বছরের মধ্যে কীভাবে তিনি হোয়াইট হাউসে ফিরলেন, তা নিয়ে অনেকের মনেই প্রশ্ন। ভোটারদের মনস্তত্ত্ব, তার কৌশলী প্রচারণা, এবং বিরোধী শিবিরের দুর্বলতা হয়তো এই “ম্যাজিক” ফলাফলের পেছনে ভূমিকা রেখেছে। তবে এটুকু নিশ্চিত যে, ট্রাম্পের প্রত্যাবর্তন বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন প্রভাব ফেলতে চলেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প, আর এর প্রভাব যেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলেও পড়েছে। নির্বাচনে ট্রাম্পের জয়লাভকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা চলছে। সদ্য ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ ইতোমধ্যেই ট্রাম্পের জয়কে স্বাগত জানিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছে, কারণ এটি তাদের মতে দলটির বাংলাদেশের ক্ষমতায় ফিরে আসার ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, বিশেষ করে ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকে আওয়ামী লীগের শাসনামল, একটি জটিল আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক পটভূমির সঙ্গে জড়িত ছিল। উইকিলিকসে ফাঁস হওয়া তথ্য এবং হিলারি ক্লিনটনের বক্তব্যের মাধ্যমে, বেশ কিছু রাজনৈতিক বিশ্লেষক ধারণা করেছিলেন যে, ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি সমন্বিত কৌশল ছিল, যার মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় বসানোর পেছনে এক ধরনের ইন্দো-মার্কিন ব্লুপ্রিন্ট কাজ করছিল।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রত্যাশা, মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার চেয়ে, তাদের জন্য ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ঠেকানো ছিল বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই কারণেই, পশ্চিমা দেশগুলো একাধিক নির্বাচন বা রাজনৈতিক সংকটের পরেও বাংলাদেশে স্বৈরশাসক শাসনকে সমর্থন দিতে ছিল প্রস্তুত। তারা বারবার নির্বাচনী পুনর্নির্বাচন এবং গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের দাবি জানালেও, মূলত ভারতকে নিজেদের অবস্থান সমর্থক রাখতে, কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
২০১৪ সালে, ক্ষমতায় আসার পর, আওয়ামী লীগ তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কঠোর দমনপীড়ন শুরু করে, বিশেষ করে ছাত্র আন্দোলন, গণতান্ত্রিক প্রতিবাদ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে। পুলিশের, র্যাব এবং বিজিবির মতো বাহিনীগুলোকে দলীয় বাহিনীতে পরিণত করা হয়, যা রাজনৈতিক সহিংসতা এবং গুম-খুনের ঘটনায় অবলম্বন হয়ে ওঠে। তবে, অবশেষে ছাত্র সমাজের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন, বিশেষত “বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন”, এক নতুন দিগন্ত সৃষ্টি করে, যা দেশের জনগণের মধ্যে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য এক অভূতপূর্ব বিপ্লবের সূচনা করে।
এ ধরণের পরিস্থিতিতে, ছাত্র-জনতা একসঙ্গে বিপ্লবী অভ্যুত্থানের পথে অগ্রসর হয়ে অবশেষে দেশের স্বৈরাচারের পতন ঘটাতে সক্ষম হয়। তারা এক ঐতিহাসিক সংগ্রামের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের নক্সাসকে ভেঙে দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যত গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি করেছিল।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশাল জয় নিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনার ঝড় বইছে। মার্কিন বিদেশনীতি কীভাবে গড়ে উঠবে, বিশেষ করে নতুন প্রশাসনের বিশ্বমঞ্চে কেমন অবস্থান হবে—এ নিয়েই আগ্রহ সর্বাধিক। ২০২৪ সালের এই নির্বাচনে ট্রাম্পের বিজয় বাংলাদেশে বিশেষভাবে আলোচিত, কারণ মাত্র তিন মাস আগেই, ৫ আগস্ট, শেখ হাসিনার দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে এবং ড. ইউনুসের নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠিত হয়।
ড. ইউনুসের সরকারের প্রতি নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কৌশল কী হবে, তা নিয়ে এখন রাজনৈতিক মহলে বিশ্লেষণ চলছে। নির্বাচনী প্রচারণার সময় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী এবং সমর্থকরা প্রকাশ্যেই ট্রাম্পের জয় কামনা করেছিলেন, কারণ তাদের মতে, তার বিজয় আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনে সহায়ক হতে পারে। ট্রাম্পের বিজয়ে আওয়ামী লীগ আশার সঞ্চার পেলেও, নতুন সরকারের প্রতি তার প্রশাসনের অবস্থান কী হবে তা সময়ই বলে দেবে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখা যাচ্ছে, দলের নেতাকর্মী ও সমর্থকরা ট্রাম্পের এই জয়ের জন্য অভিনন্দন জানাচ্ছেন এবং দোয়া করছেন। এমনকি শোনা যাচ্ছে যে, প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে সরে গিয়ে ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা নাকি তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ে ট্রাম্পের জন্য দোয়া করেছেন। ফেসবুকে এই বিষয়টি ঘিরে পোস্টার ও নানা মন্তব্য ঘুরে বেড়াচ্ছে।
মার্কিন নির্বাচনের পর বাংলাদেশের সামাজিক মাধ্যমে যে আলোচনা চলছে, তা মূলত অপ্রাসঙ্গিক। মার্কিন রাজনীতিতে পরিবর্তন আসলেও, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও পরিস্থিতিতে তার তেমন প্রভাব পড়ে না; দেশের শাসনব্যবস্থা ও অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো অপরিবর্তিতই থেকে যায়। পরিবর্তনের যে আকাঙ্ক্ষা আমাদের ছিল, তা জুলাইয়ের আন্দোলনে তীব্রভাবে প্রতিফলিত হয়েছিল। সবস্তরের মানুষ উন্নয়ন ও সুশাসনের প্রত্যাশায় ছিল। তবে সাম্প্রতিক কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা সেই আশাকে ম্লান করে দিয়েছে। সুতরাং, মার্কিন প্রেক্ষাপটে কোনো পরিবর্তন এলেও দেশের ভেতরে নতুন কোনো আন্দোলন গড়ে উঠলে হয়তো আগের মতো সমর্থন পাওয়া সম্ভব হবে না।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প বিজয়ী হওয়ায় তার সমর্থকরা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছে, যদিও নির্বাচনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ডেমোক্র্যাট প্রার্থী কমলা হ্যারিসের সঙ্গে কড়া প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছিল। নির্বাচনে আগাম ভোটের পরিসংখ্যানে ডেমোক্র্যাটরা কিছুটা এগিয়ে থাকলেও ট্রাম্পের শেষ মুহূর্তের জয়ের মাধ্যমে ভোটারদের সমর্থন তিনি নিজের পক্ষে টানতে সক্ষম হয়েছেন।
এদিকে, গণআন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হওয়া বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে ট্রাইবুনাল। দেশে ফিরলে তাকে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। গণহত্যার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে কয়েকশত মামলা ইতোমধ্যেই দায়ের হয়েছে। ট্রাম্পের জয়কে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের কিছু সমর্থক আশাবাদী হলেও দেশের পরিস্থিতি শেখ হাসিনার জন্য চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠেছে।
বাস্তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের পুনঃনির্বাচন আওয়ামী লীগের জন্য কাঙ্ক্ষিত ফল বয়ে আনবে না। কারণ, বাংলাদেশ বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগের প্রতি সহানুভূতিশীল হবে না। যুক্তরাষ্ট্র আর আগের মতো বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ভারতের অবস্থানকে অন্ধভাবে সমর্থন করবে না। ২০০১ সালে প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দিয়ে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র ঘনিষ্ঠতা বাড়ালেও ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদের শেষ দিকে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের পথ তৈরি করেন। পরে, ২০২১ সালের আগস্টে জো বাইডেনের সময়কালে এই অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে। এর ফলে দক্ষিণ এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ভারতের গুরুত্ব আগের তুলনায় কমে আসে।
ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের আরেকটি প্রধান স্তম্ভ ছিল চীনবিরোধী অবস্থান, কিন্তু সাম্প্রতিক ব্রিকস সম্মেলনে (২২-২৪ অক্টোবর, ২০২৪) ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং নিজেদের পুরোনো বিরোধ ভুলে ব্যবসায়িক সম্পর্কের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সহজলভ্য চীনা ঋণ ভারতকে উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় আকৃষ্ট করছে, এবং এর ফলে ভারত এখন চীনের সাথে আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। ভারতের দৃষ্টিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনবিরোধী অবস্থান ধরে রাখার চেয়ে চীনের ঘনিষ্ঠতা লাভজনক হবে।
এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে মিলে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রভাব বিস্তারের পুরোনো কৌশল ভারতের জন্য ততটা কার্যকর বা প্রয়োজনীয় নয়। ফলে, বাংলাদেশ ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত আগের মতো ঐক্যবদ্ধ থাকবে না, এবং ট্রাম্প প্রশাসন বাংলাদেশের ওপর প্রভাব বিস্তারে ভারতীয় সহায়তার উপর নির্ভর করবে না। এ অবস্থায় আওয়ামী লীগের আশা পূরণ হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ।ভারত বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তার সম্পর্ককে নতুনভাবে মূল্যায়ন করছে, এবং এই দৃষ্টিভঙ্গি পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্করের সাম্প্রতিক বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন জয়লাভের দ্বারপ্রান্তে, জয়শঙ্কর তখন ক্যানবেরায় ভারত-অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড ত্রিদেশীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্মেলনে বলেন, “যিনিই প্রেসিডেন্ট হন না কেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন একক পথে চলার চেষ্টা করছে, যা তাকে বিশ্ব থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। অতীতে যে মার্কিন প্রাধান্য ছিল, তা আর আগের মতো চলবে না।” জয়শঙ্করের এই মন্তব্যে প্রতিফলিত হয় যে ভারত একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থায় নিজেদের জন্য প্রস্তুত করছে, যেখানে মার্কিন প্রভাব পূর্বের তুলনায় কমে আসতে পারে।
ভারত বর্তমানে চীন ও রাশিয়ার নেতৃত্বাধীন ব্রিকস জোটের মাধ্যমে এই নয়া বিশ্বব্যবস্থায় প্রবেশ করতে চাইছে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর ভারত রাশিয়ার কাছ থেকে শক্তি ও বাণিজ্যে সুবিধা নিচ্ছে, আর একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখছে। তবে ট্রাম্প পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর ভারতকে তার এই দ্বিমুখী কৌশল পরিত্যাগের চাপ দিতে পারেন, বিশেষ করে যদি তিনি চীন ও রাশিয়া-বিরোধী অবস্থানকে আরও কঠোর করেন। এটি ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন করে মনোমালিন্যের জন্ম দিতে পারে, কারণ ভারত তার স্বার্থ রক্ষায় স্বাধীন ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অবলম্বনে অগ্রসর হচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে ভারতের সামনে চ্যালেঞ্জ হবে যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মধ্যে থেকেও চীন ও রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক ধরে রাখা। ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক নতুন ধরনের পরীক্ষার মুখোমুখি হতে পারে, যেখানে ভারত হয়তো তার স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের পুনর্মূল্যায়ন করতে বাধ্য হবে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের পুনঃনির্বাচনের পর তার সম্ভাব্য পররাষ্ট্রনীতি বুঝতে হলে প্রথমে তার আগের মেয়াদের (২০১৬-২০২০) পদক্ষেপগুলোর দিকে ফিরে তাকানো জরুরি। ট্রাম্পের নীতির মূল লক্ষ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক সংঘাত থেকে দূরে রাখা এবং সামরিক উপস্থিতি কমিয়ে এনে দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা। আব্রাহাম অ্যাকোর্ডের মাধ্যমে তিনি মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত হ্রাস করতে উদ্যোগ নেন এবং আফগানিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহারের পরিকল্পনাও তিনিই চূড়ান্ত করেন। তিনি রাশিয়ার সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটো সম্পর্কে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করতেন। তার কৌশল ছিল দ্বিরাষ্ট্রিক সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং যেকোনো ধরনের জোটবদ্ধ সামরিক উদ্যোগ এড়িয়ে চলা।
ট্রাম্প তার জাতীয়তাবাদী ধারণা থেকে “মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন” নীতি অনুসরণ করেন, যা মূলত যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার দিকে মনোযোগী। তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে অর্থনৈতিকভাবে মজবুত করতে চান, চীনের বাণিজ্যিক উত্থানকে প্রতিহত করতে চান, এবং অন্য দেশের জন্য যুদ্ধের বোঝা নিতে নারাজ। চীনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা মোকাবিলা করার বিষয়টি ট্রাম্পের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
মধ্যপ্রাচ্যে ট্রাম্পের নীতি ইসরাইলের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও ইরানের প্রতি কঠোরতা বজায় রাখা, তবে অন্য মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের প্রতি মনোযোগ দেওয়া। সম্ভবত এবারও, তিনি মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখবেন, তবে অন্যান্য মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও জোরদার করবেন। এ প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশও ট্রাম্প প্রশাসনের অগ্রাধিকার তালিকায় থাকবে, এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়া ও এরশাদের আমলের মতো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সুসম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে।
ড. ইউনূসের মতো একজন ব্যক্তিত্ব সরকার পরিচালনায় আসুক—এমন আকাঙ্ক্ষা আমার মতো অনেকেরই ছিল। তবে বাস্তবতা বলছে, এমন একটি সরকার গঠিত হলেও তার স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা সহজ হবে না। অতীতের সরকারগুলো লাগামহীন ক্ষমতার অপব্যবহার, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, এবং জনগণের অধিকার দমনের মাধ্যমে শাসনব্যবস্থাকে যে স্থানে নিয়ে গেছে, তারই প্রতিফলন আমরা ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে দেখেছি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে এখনো একই ধরনের প্রতিহিংসার রাজনীতি চলছে। স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী দল হিসেবে আওয়ামী লীগের আজকের এই পরিস্থিতি দুঃখজনক। অন্তর্বর্তী সরকার সর্বদলীয় অংশগ্রহণে গঠিত হওয়া উচিত ছিল, কিন্তু এখানে বিদ্বেষের পথই বেছে নেওয়া হয়েছে।
আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ধারণা ছিল যে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে নরেন্দ্র মোদির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে, যা জো বাইডেন বা কমলা হ্যারিসের সাথে এতটা দৃঢ় নয়। তাদের বিশ্বাস, মোদির অনুরোধে ট্রাম্প বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে আগ্রহী হতে পারেন, যা শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। এমন এক অদ্ভুত সমীকরণের ভিত্তিতেই আওয়ামী লীগের অনেক নেতা-কর্মী ট্রাম্পের জয় কামনা করছিলেন।
অবশেষে, ট্রাম্প বিজয়ী হওয়ার পর আওয়ামী শিবিরে উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়ে। তড়িঘড়ি করে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অভিনন্দন জানানো হয়, এবং তার বিজয়কে রাজনৈতিকভাবে নিজেদের জন্য ইতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি আদৌ তাদের প্রত্যাশার সাথে কতটা সঙ্গতিপূর্ণ হয়।
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, বিশেষ করে নতুন সরকারের অধীনে দেশের পুলিশ বাহিনীকে জনবান্ধব হিসেবে গড়ে তোলার প্রক্রিয়া এবং সেনাবাহিনীর সঙ্গে সমন্বিত কাজের উদ্যোগ, দেশের মানুষের জন্য একটি নতুন দিগন্তের সূচনা করছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার, দেশের ৯৫% মানুষের সমর্থনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, এবং এটি একটি বিপ্লবী পরিবর্তনের মাধ্যমে গঠিত হয়েছে। এই সরকারের একান্ত লক্ষ্য হল দেশের জনগণের স্বার্থে কাজ করা এবং স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন ঘটেছে, তার অব্যাহত প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা।
তবে, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ক্ষমতার জন্য প্রতিযোগিতা এবং বিভক্তির বিষয়টি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে ষড়যন্ত্রকারীরা সুবিধা নিতে পারে এবং দেশকে পুনরায় অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিতে পারে। মৌলিক জাতীয় প্রশ্নে রাজনৈতিক বিভাজন দেশকে বিপথগামী করতে পারে, বিশেষ করে ঐতিহাসিক দৃষ্টিতে ভারত বা বিদেশি শক্তির হাতে দেশের ভাগ্য ছেড়ে দেওয়া হলে তা জাতির স্বাধীনতাকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে।
তবে, দেশের মুক্তিকামী জনগণ একত্রিত থাকলে, তারা যেকোনো ষড়যন্ত্র ও বিভেদকে পরাস্ত করতে সক্ষম হবে। তারা স্বাধীনতার জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছে এবং তারা জানে, বিভাজন সৃষ্টিকারী রাজনৈতিক শক্তির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই করলে অন্য কোনো শক্তি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব এবং স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। বাংলাদেশের জনগণ, বিশেষ করে বিপ্লবী ছাত্র-জনতা, এই সময়ে ঐক্য ও সংহতির মাধ্যমে দেশের ভবিষ্যত নিশ্চিত করার প্রতিজ্ঞা করেছে।
প্রিয় পাঠক, আশা করি সুস্থ আছেন। উত্তাল চব্বিশের শেষ দিকে উপস্থিত হয়ে আমরা নভেম্বর মাসের এই সময়ে, জুলাই পটপরিবর্তনের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে নানা বড় পরিবর্তন এবং চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি আমাদের দেশের জনগণ। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন, দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা, গার্মেন্টস শিল্পে অশান্তি এবং খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি এ সব কিছুই আমাদের ভাবনায় প্রভাব ফেলছে।
পতিত স্বৈরাচারের কুশীলবদের দিক মাথায় রেখে ও দেশের আভ্যন্তরীণ নীতি এবং জনগণের স্বার্থের কথা মাথায় রেখে, এই পরিবর্তনগুলিকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করা প্রয়োজন। আর সেই সাথে আমাদের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলার বিষয়ে গভীর মনোযোগ দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। গত কয়েক বছরে দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি যেমন অস্থিতিশীল হয়েছে, তেমনি পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর আস্থা কমেছে। জনগণের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কার্যকর ও উন্নত ব্যবস্থা গ্রহণে সরকারের দ্রুত পদক্ষেপ প্রয়োজন।
এর পাশাপাশি, দেশের অন্যতম বড় শিল্প খাত গার্মেন্টস সেক্টরে অশান্তি চলতে থাকা একটি বড় সংকট হিসেবে দাঁড়িয়ে রয়েছে। শ্রমিকদের চলমান আন্দোলন এবং অস্থিরতার কারণে এই সেক্টরের ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মুখে পড়েছে। দেশের অর্থনীতির বৃহত্তর স্বার্থে, এটি জরুরি যে সরকারের পাশাপাশি গার্মেন্টস মালিকরা শ্রমিকদের অধিকার ও শর্তগুলো পুনঃমূল্যায়ন করে, যাতে উৎপাদনশীলতা এবং শৃঙ্খলা বজায় থাকে। এর সঙ্গে যদি মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব যুক্ত হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের জীবনে চাপ বাড়বে, যা জাতীয় অস্থিরতার কারণ হতে পারে। তাই খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রীয় নীতির পরিবর্তন অত্যন্ত জরুরি।
এছাড়া, চব্বিশের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। তাদের আত্মত্যাগের কারণে আজ আমরা স্বাধীন রাষ্ট্রে বাস করছি। স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের জন্য তাদের সংগ্রামের সত্যিকার মূল্যায়ন করতে হবে, যাতে আমরা তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নে একটি সুশাসিত সমাজ গড়তে পারি।
প্রিয় শিক্ষার্থীরা, আপনারাই জাতির ভবিষ্যৎ, জুলাই বিপ্লবের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে আপনাদের দায়িত্বপূর্ণ ভূমিকায় এগিয়ে আসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক স্থিতিশীলতা, ন্যায়বিচার, এবং জাতীয় ঐক্য রক্ষা করতে হলে, আমাদের সবার একযোগ প্রচেষ্টা প্রয়োজন। যদি আমরা সঠিক পথে এগিয়ে যেতে পারি, তবে তা আমাদের দেশকে আরও উন্নত ও সমৃদ্ধ করবে।
পতেঞ্জা নদীর ওপর দাঁড়িয়ে থাকা মুসমেসি সেতু যেন প্রকৃতি, নান্দনিকতা এবং ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের এক অসাধারণ সম্মিলন। এটি কেবল একটি সেতুই নয়, বরং এমন একটি শিল্পকর্ম যা স্থাপত্য ও প্রকৌশলের সীমাকে ছাড়িয়ে প্রকৃতির সঙ্গে গভীর সংযোগ তৈরি করেছে। ‘ভায়াডোত্তো ডেল’ইন্ডাস্ট্রিয়া’ (ইন্ডাস্ট্রি ভায়াডাক্ট) যা ‘বাসেন্টো নদীর উপর সেতু’ বা মুসমেসি ব্রিজ নামেও পরিচিত, এটি পতেঞ্জা , ব্যাসিলিকাটা এবং ইতালিকে সংযুক্ত করেছে।
এই সেতুর মাধ্যমে মুসমেসি স্থাপত্যের এক নতুন ধারার সূচনা করেন, যা পরিচিত হয় ‘প্যারামেট্রিজম’ নামে। প্রকৃতি থেকে অনুপ্রাণিত হলেও এই ধারার ডিজাইন সম্পূর্ণ মানুষের ব্যবহারের জন্য নির্মিত। যদিও এতে খরচ কিছুটা বেশি হয়, তবে যা তৈরি হয়, তা একদমই অন্যরকম। মুসমেসি সেতু তাই কেবল একটি স্থাপনা নয়, বরং প্রকৃতি ও মানুষের সৃজনশীলতার এক অনন্য মেলবন্ধন।
মুসমেসি সেতু পৃথিবীর অন্যতম সুন্দর সেতুগুলোর একটি। ১৯৬৭ সালে এটি ডিজাইন করেছিলেন প্রতিভাবান ইঞ্জিনিয়ার সার্জিও মুসমেসি, এবং নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয় ১৯৭১ থেকে ১৯৭৬ সালের মধ্যে। চমৎকার এই সেতুটি দাঁড়িয়ে আছে দুইবার ভাঁজ হওয়া একটি প্যাঁচানো কংক্রিট কলামের ওপর, যার গভীরতা মাত্র ৩০ সেন্টিমিটার বা ১ ফুট। ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে লোড ডিস্ট্রিবিউশন ও স্ট্রেস ডাইনামিকস শব্দ দুটি প্রায়ই ব্যবহৃত হয়। এই সেতুতে সেই লোড ডিস্ট্রিবিউশন দক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন হয়েছে কলামের অনন্য আকৃতির মাধ্যমে।
মুসমেসি সেতুটি ডিজাইন করেছেন একটি ব্যতিক্রমী ভি-আকৃতির কলামের মাধ্যমে। এই ডিজাইনের পেছনে তিনি নদীর স্রোতের ধারণা কাজে লাগিয়েছিলেন এবং ভেবেছিলেন সেতুটি যেন পানির গতিপথের প্রতিফলন হয়। তার লক্ষ্য ছিল নদী ও রেলপথ উভয়কেই সমান গুরুত্ব দেওয়া, যা সেতুটিকে প্রকৃতির সঙ্গে মিশে যেতে সাহায্য করেছে। এর ফলে, স্ট্রাকচারটি এমন এক স্বাভাবিক রূপ পেয়েছে যেন এটি সেই স্থানেই হাজার বছর ধরে দাঁড়িয়ে আছে।
ভারতের আশ্রয় নেতা পতিত শেখ হাসিনার বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র থামছেই না। একের পর এক ষড়যন্ত্র করে এ দেশীয় এজেন্টদের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করছেন। ‘ডিসেম্বরে দেশে ফিরবেন’ ‘২২৭ জনকে হত্যা করবেন’ গাইবান্ধার এক নেতার সঙ্গে অডিও সংলাপে এ ঘোষণা দেয়ার পর ফের গার্মেন্টস সেক্টরে বিশৃঙ্খলার চেষ্টা করছেন। আর হাসিনার বিশৃঙ্খলার রোডম্যাপ বাস্তবায়নে কয়েকজন গার্মেন্টস মালিক, শ্রমিক নামধারী কিছু ছাত্রলীগ-যুবলীগ ক্যাডার ফের মাঠে নেমেছে।৩১ অক্টোবর রাজধানীর মিরপুর ১৪ নম্বরে রাস্তা অবরোধ করে দু’টি গার্মেন্টসের কর্মীর আবরণে আওয়ামী সন্ত্রাসীরা।
এ সময় তারা আশপাশের আরো আটটি গার্মেন্টসসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে হামলা চালায়। পুলিশ ও যৌথবাহিনী বাধা দিতে গেলে তাদের ওপরও চড়াও হয়। এতেই ক্ষান্ত হয়নি শ্রমিকের আড়ালে থাকা সন্ত্রাসীরা। রাস্তা অবরোধমুক্ত করতে গেলে সেনাবাহিনী ও পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর শেষে তাতে আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে দু’টি গাড়ি সম্পূর্ণ পুড়ে যায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, যারা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছে তাদের কিছু শ্রমিক থাকলেও বেশির ভাগই যুগলীগের কর্মী। আর গার্মেন্টস মালিকদের অনেকেই শ্রমিকদের উসকে দিতে ইচ্ছে করে বেতন-ভাতা আটকে রেখে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে।গার্মেন্টস শিল্প ধ্বংসের পাঁয়তারা ও পরিস্থিতি ঘোলাটে করতে এবার শ্রমিকবেশে মাঠে নেমেছে ছাত্রলীগ-যুবলীগসহ পতিত আ.লীগ সরকারের প্রেতাত্মারা। আর অন্তরালে থেকে এসব সন্ত্রাসীদের অর্থ ও নাশকতার উপাদানের জোগান দিচ্ছে আওয়ামী লীগের কতিপয় গার্মেন্টস ব্যবসায়ী।
সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে কুচক্রী মহল আশুলিয়া-সাভারের পর এবার ঢাকার গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠানসমূহে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে। এই কুচক্রী মহল এ ধরনের আরো ঘটনা ঘটানোর ষড়যন্ত্র চালাচ্ছে। যেকোনো সময় তারা ভিন্নরূপে অন্য কোনো আন্দোলনের নামেও নাশকতার অপচেষ্টা চালাতে পারে বলেও শঙ্কা রয়েছে।
এরই অংশ হিসেবে ৩১ অক্টোবর বৃহস্পতিবার ঠুনকো দাবিতে আন্দোলনের নামে রাজধানীর মিরপুর ১৪ নম্বরে রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছে দু’টি গার্মেন্টেসের কর্মীরা। এ সময় তারা আশপাশের আরো আটটি গার্মেন্টসসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে হামলা চালায়। পুলিশ ও যৌথবাহিনী বাধা দিতে গেলে তাদের ওপরও চড়াও হয়। এতেই ক্ষান্ত হয়নি শ্রমিকের আড়ালে থাকা সন্ত্রাসীরা। রাস্তা অবরোধমুক্ত করতে গেলে সেনাবাহিনী ও পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর শেষে তাতে আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে দু’টি গাড়ি সম্পূর্ণ পুড়ে যায়। পুলিশের সাথ দফায় দফায় ধাওয়া পাল্টা-ইটপাটকেল নিক্ষেপের পর পুলিশ টিয়ারশেল ও পরে রাবার বুলেট ছুটতে বাধ্য হয়। এতে মিরপুর-১৪ নম্বরের কাফরুল ও ভাষানটেক থানার কিছু এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। পুলিশের গুলিতে এ সময় দুজন শ্রমিক আহত হয়। প্রায় ছয় ঘণ্টা পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। এর আগে আন্দোলনের নামে সন্ত্রাসীদের রাস্তা অবরোধের কারণে অফিসগামী মানুষদের চরম ভোগান্তির শিকার হতে হয়। বিড়ন্বনার শিকার বেশির ভাগ মানুষ পায়ে হেঁটে গন্তব্যে পৌঁছেন। অনেকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় আটকে থাকেন।
সরকারের নানামুখী উদ্যোগ সত্ত্বেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ঘাটতি, ঝুটসহ কারখানা সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ, কিছু কারখানার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তৎপরতা, বেতন ভাতা সংক্রান্ত সমস্যা এবং বাইরের ইন্ধনসহ বিভিন্ন কারণে পোশাক কারখানাগুলোতে অস্থিরতা বন্ধ হচ্ছে না। পাঁচই অগাস্টের পট পরিবর্তনের পর শিল্প জোনগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্বের শিকার হচ্ছে পোশাক খাত।
কয়েকটি কারখানার মালিক, শ্রমিক নেতা ও কারখানা সংশ্লিষ্ট স্থানীয়দের সাথে কথা বলে এমন ধারণা পাওয়া গেছে। বিজেএমইএ ও পোশাক খাতের নেতারা বলছেন গত কিছুদিনে অন্তত ২৫টি কারখানা বন্ধ হয়ে পড়েছে। তবে এর মধ্যে কয়েকটি খোলার প্রক্রিয়া চলছে। যদিও পরিস্থিতির উন্নতি না হলে আগামী দু মাসে আরও কিছু কারখানা বন্ধ হওয়ারও আশঙ্কা করছেন কেউ কেউ। এ অবস্থায় চাকুরিতে নিয়োগ ও পুনর্বহালসহ বিভিন্ন দাবিতে গাজীপুর এলাকায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধের পর অন্তত দশটি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করতে হয়েছে বুধবার।
গত মাসেও বিভিন্ন দাবিতে আশুলিয়া অঞ্চলের পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা বিক্ষোভ করেছেন। শ্রমিকদের টানা বিক্ষোভের জের ধরে শেষ পর্যন্ত তাদের ১৮ দফা দাবি বাস্তবায়নে সম্মত হয় মালিকপক্ষ। ২৪শে সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার মালিক ও শ্রমিকেরা একটি যৌথ ঘোষণাও দিয়েছেন। এতে বলা হয়েছিলো, দেশের পোশাক শিল্পের সব কারখানার শ্রমিকদের মাসিক হাজিরা বোনাস ২২৫ টাকা বাড়ছে। টিফিন ও রাত্রিকালীন ভাতাও (নাইট বিল) বাড়বে। আগামী অক্টোবরের মধ্যে বিদ্যমান ন্যূনতম মজুরি বাস্তবায়ন করা হবে।
আশুলিয়া জোনে এখন দু পক্ষই নিয়ন্ত্রণে আছে বলে জানাচ্ছেন স্থানীয়রা। মূলত ঝুট ব্যবসাসহ পোশাক কারখানা সংশ্লিষ্ট আরও কিছু ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করতেই স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিরা নানাভাবে চেষ্টা করেন সবসময়। এতদিন যারা কোটি কোটি টাকার ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে আসছিলো তাদের অনেকেই এখন পলাতক। এছাড়া শ্রমিকদের মধ্যেও বিভিন্ন রাজনৈতিক দল সমর্থিত ব্যক্তিরা আছেন। কারখানাগুলোতে গত দুই দশক ধরেই মধ্যম পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সাথে শ্রমিকদের দূরত্ব ছিল। দাবি দাওয়া উত্থাপনে শ্রমিকদের মধ্যে একটি ভয়ের সংস্কৃতি কাজ করতো। এখন সরকার পরিবর্তনের পর শ্রমিকরা কথা বলতে শুরু করেছেন বলে জানিয়েছেন গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য পরিষদের কেন্দ্রীয় নেতা মমিনুর রহমান।
“আইনশৃঙ্খলা সমন্বয়েও ঘাটতি আছে। এছাড়া লেবার লিডার, রাজনৈতিক দল, বাইরের ইন্ধনসহ বিভিন্ন ইস্যু আছে। তবে আশা করি আগামী দশদিনে পরিস্থিতির উন্নতি হবে,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ৩২১ অক্টোবর সকালে মিরপুর-১৪ নম্বরের ‘গার্মেন্ট ক্রিয়েটিভ ডিজাইনার্স লি.’ নামে একটি পোশাক কয়েকশ শ্রমিক কচুক্ষেতে রাস্তায় জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করে। এ সময় তারা সড়ক অবরোধের চেষ্টা করে। শ্রমিকরা কাছাকাছি আরো আটটি গার্মেন্টে হামলা ও ভাঙচুরের চেষ্টা করে। সেনাবাহিনী তাদের ফাঁকা গুলি ছুুড়ে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। কিন্তু তারা আবারো জড়ো হয়ে সড়ক অবরোধ করে। একপর্যায়ে যৌথ বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়। সকাল সাড়ে ৮টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত আড়াই ঘণ্টা ধরে সংঘর্ষ চলে।
সংঘর্ষ মিরপুর ১৪ নম্বর থেকে কচুক্ষেত পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। এতে মিরপুর ১৪ নম্বর সড়কের সঙ্গে সংযোগ সড়কগুলোর যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। একপর্যায়ে পুলিশ পোশাক শ্রমিকদের লাঠিপেটা করে। বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা সেনাবাহিনীর একটি গাড়ি ও পুলিশের একটি গাড়িতে ভাঙচুর চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।গাড়িতে আগুন লাগানোর পরেও আন্দোলনের নামে সন্ত্রাসীরা পুলিশ ও সেনাবাহিনীকে লক্ষ করে এলোপাতাড়ি ইটপাটকেল নিক্ষেপ করলে পুলিশ একপর্যায়ে কাঁদানে গ্যাসের শেল ও গুলি চালায়। এতে দুই পোশাক শ্রমিক গুলিবিদ্ধ হন। এরা হলেনÑ আল আমিন (১৮) ও ঝুমা আক্তার (১৫)। এদের মধ্যে আল আমিনের দুই কাঁধে ও ঝুমার ডান পায়ের গোড়ালিতে গুলি লাগে। তাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। দুপুর ১২টার পর পরিস্থিতি ধীরে ধীরে শান্ত হয়। স্বাভাবিক হয় যান চলাচল।
শ্রমিকবেশের আন্দোলনরতদের তা ছিল কাফরুল ও ভাষানটেক থানার বেশ কিছু অংশজুড়ে। পুলিশের ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় কাফরুল থানায় একটি মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে। মামলাটির বাদি হবে পুলিশ। তবে আসামিদের ব্যাপারে তিনি মুখ খুলতে চাচ্ছেন না। তবে পুলিশের একটি সূত্র বলেছে, যারা যৌথ বাহিনীর ওপর হামলা ও গাড়ি পুড়িয়েছে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরায় মাধ্যমে তাদের শনাক্ত করা গেছে। এসব চিহ্নিত অপরাধীদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।
প্রায় একই ধরনের কথা বলেন ভাষানটেক থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহ মোহাম্মদ ফয়সাল। তিনি বলেন, পুলিশ লাইনের গাড়ি পোড়ানোর দায়ে তার থানায় মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে। যেকোনো ধরনের অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা এড়াতে ঘটনাস্থলে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন রয়েছে। এ ছাড়া ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতারেও অভিযান চলছে।
এদিকে ঘটনাস্থলে থাকা গোয়েন্দা সংস্থার এক সদস্য জানিয়েছেন, গতকালের ঘটনাটি আসলে গার্মেন্টস শ্রমিকদের আন্দোলন ছিল না। কারণ তাদের সুনির্দিষ্ট কোনো দাবি ছিল না। ঠুনকো দাবি তুলে তারা রাস্তায় নেমেছে। মূলত তাদের উসকে দিয়েছে একটি চক্র। যে চক্রটি বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালিয়েছে। ছাত্রদের ওপর গুলি চালিয়েছে। তারাই এখন আড়ালে থেকে শ্রমিকদের উসকে দিচ্ছে। এরা ছাত্রলীগ-যুবলীগ ও ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকারের আশ্রিত সন্ত্রাসী। তাদের উদ্দেশ্য দেশকে অস্থিতিশীল করা। সরকারকে বেকায়দায় ফেলে ঘোলা পানিতে মাছ ধরার অপচেষ্টা। এ জন্য চক্রটি মোটা অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করছে। এর পেছনে আওয়ামী লীগের একাধিক গার্মেন্টস ব্যবসায়ী জড়িত রয়েছেন। পুলিশ ইতোমধ্যে এদের সম্পর্কে তদন্ত শুরু করেছে।
কচুক্ষেত এলাকায় মৌসুমি অ্যান্ড ভুঁইয়া নামে একটি ভবনের নিরাপত্তাকর্মী জানান, তিন দিন আগে ওই ভবনের একটি পোশাক কারখানায় এক নারী পোশাক শ্রমিককে মারধর করা হয়। এর প্রতিবাদ জানাতে গেলে একজন পুরুষ শ্রমিককেও মারধর করা হয়। গতকাল সকালে শ্রমিকরা ওই কারখানায় গেলে কারখানা বন্ধ দেখেন। এ ঘটনার বিচার দাবিতে ও কারখানা বন্ধের প্রতিবাদে শ্রমিকরা বিক্ষোভ করে।
গত তিন মাসে বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পে বিভিন্ন বিক্ষোভ ও সংঘর্ষের ঘটনাগুলোর বিস্তারিত নীচে দেয়া হলো:
৩১ আগস্ট, ২০২৪:
ঢাকার সাভারে শ্রমিকরা বেতন বৃদ্ধির দাবি জানিয়ে বিক্ষোভ করেন। জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়ায় শ্রমিকরা তাদের ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির দাবি তোলেন। এদিন পুলিশের সাথে সংঘর্ষে শ্রমিকদের কয়েকজন আহত হন।
১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৪:
গাজীপুরে শ্রমিকদের দাবির প্রেক্ষিতে আরও একটি বড় আন্দোলন হয়। উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাব এবং ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে শ্রমিকরা সড়ক অবরোধ করেন। পুলিশের সাথে সংঘর্ষ চলাকালে কিছু শ্রমিক আহত হন।
২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৪:
নারায়ণগঞ্জে শ্রমিকরা বকেয়া মজুরির দাবিতে একটি গার্মেন্টস কারখানায় তালা লাগিয়ে দেন। শ্রমিকরা জানান যে তাদের মাসের পর মাস বেতন প্রদান করা হচ্ছে না, যা তাদের জীবনে সংকট তৈরি করছে।
৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৪:
আশুলিয়ায় শ্রমিকদের এক বিক্ষোভে একজন শ্রমিক নিহত হন। ন্যূনতম মজুরি ও বেতন বৃদ্ধির দাবিতে শ্রমিকরা আন্দোলনে অংশ নিলে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে।
৮ অক্টোবর, ২০২৪:
তেজগাঁওয়ে শ্রমিকরা বেতন ও উৎসব ভাতার দাবিতে সড়ক অবরোধ করেন, যা শহরের বেশ কিছু জায়গায় যানজটের সৃষ্টি করে। সংঘর্ষে শ্রমিকদের কয়েকজন আহত হন।
২১ অক্টোবর, ২০২৪:
চট্টগ্রামে অতিরিক্ত কাজের জন্য বিশেষ ভাতার দাবি জানিয়ে শ্রমিকরা আন্দোলনে নামেন। এ সময় কারখানার নিরাপত্তা কর্মীদের সাথে সংঘর্ষ ঘটে। শ্রমিকরা সপ্তাহান্তে অতিরিক্ত কাজের জন্য ভাতা দাবি করেন।
২৫ অক্টোবর, ২০২৪:
সাভারে শ্রমিকরা তাদের ন্যূনতম মজুরি ১৫,০০০ টাকা করার দাবি জানিয়ে ব্যাপক বিক্ষোভ করেন। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এই মজুরি কাঠামো দিয়ে জীবন চালানো কঠিন হওয়ায় শ্রমিকরা সরকারের কাছে তাদের দাবি তুলে ধরেন।
৩ নভেম্বর ২০২৪ ‘গুলি করা ৭৪৭ পুলিশ চিহ্নিত’ আজকের পত্রিকার প্রথম পাতার শিরোনাম। এ খবরে বলা হয়েছে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমাতে রাজধানী ঢাকা ও বন্দরনগরী চট্টগ্রামে প্রাণঘাতী অস্ত্র থেকে গুলিবর্ষণকারী পুলিশ সদস্যদের তালিকা হচ্ছে। ইতিমধ্যে পুলিশের অন্তত ৭৪৭ সদস্যকে চিহ্নিত করা হয়েছে বলে সংবাদটিতে বলা হয়েছে। কনস্টেবল থেকে সহকারী পুলিশ সুপার পদমর্যাদার এসব কর্মকর্তা গত ১৮ থেকে ২১শে জুলাই গুলি করেছেন।
শনিবার (২ নভেম্বর) পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. ময়নুল ইসলাম সংবাদমাধ্যমকে বলেন, অতি বলপ্রয়োগকারী পুলিশ সদস্যদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন গ্রেপ্তার হয়েছেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা অনেকের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে তদন্ত করছে।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে ১৮ থেকে ২১ জুলাই পর্যন্ত ১৫০ জনের বেশি নিহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন থানায় অন্তত ১১৫টি মামলা হয়। এগুলোর মধ্যে ১০০টির এজাহার পর্যালোচনা করে ‘লয়ার ফর এনার্জি, এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ নামে আইনজীবীদের একটি সংগঠন। সেই পর্যালোচনার একটি প্রতিবেদন সংগঠনটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থাকে দিয়েছে। সেখানেই ওই চার দিনে প্রাণঘাতী গুলিবর্ষণকারী পুলিশ সদস্যদের চিহ্নিত করে তালিকা করা হয়েছে।
লয়ার ফর এনার্জি, এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের অন্যতম সংগঠক আব্দুল্লাহ আবু নোমান বলেন, ১৮-২১ জুলাইয়ের ঘটনায় পুলিশের করা মামলাগুলোর এজাহারে গুলিবর্ষণকারী পুলিশ সদস্যদের নাম ও গুলির পরিমাণ উল্লেখ করা হয়েছে। এসব মামলায় আসামি করা হয়েছিল অজ্ঞাতনামা সাধারণ শিক্ষার্থীদের। মামলাগুলোতে তখন বেশ কিছু শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকার সেই মামলাগুলো প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয়।
ওই তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, শিক্ষার্থীদের ওপর গুলিবর্ষণকারী হিসেবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ৭৫৪ জন সদস্যকে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাদের মধ্যে পুলিশ সদস্য হলেন ৭৪৭ জন। যাদের মধ্যে কনস্টেবল ৪৬৭ জন, সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) ১০৬, উপপরিদর্শক (এসআই) ১৫৭, পরিদর্শক দুজন এবং এএসপি পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা রয়েছেন। বাকি ১৪ জন পুলিশের নায়েব, সুবেদার ও চালক।
জানা যায়, ১৮-২১ জুলাই ঢাকা মহানগর পুলিশের ১২টি থানা ও চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের ১০টি থানা এলাকায় ছাত্র-জনতার ওপর অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ ও নির্বিচার গুলিবর্ষণের অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে। পুলিশ প্রাণঘাতী গুলি, রাবার বুলেটসহ অন্তত ২৬ হাজার ২৩টি গুলি ছোড়ে। এর মধ্যে শটগানের শিসা কার্তুজ ১২ হাজার ৩৪০টি, চীনের সেভেন পয়েন্ট সিক্সটু এমএম, এসএমজি, টরাস নাইন এমএম ও অন্যান্য আগ্নেয়াস্ত্রের গুলি ৪ হাজার ৩১৬টি, পিস্তলের গুলি ২৫৬টি, ৮ হাজার ৯৯৪টি রাবার বুলেট, ১৬টি হ্যান্ড গ্রেনেড, ৯৮৪টি সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ার গ্রেনেড, মাল্টি ইম্প্যাক্ট, কাইনেটিভ ও ভারী বল কার্তুজ রয়েছে। এসব ছুড়েছেন ৭৪৭ জন পুলিশ সদস্যসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ৭৫৪ সদস্য। এর মধ্যে প্রাণঘাতী গুলি ছিল ১৬ হাজার ৯১২টি।
ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার সূত্র বলছে, আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি করার ক্ষেত্রে শটগান, পিস্তল ও চায়নিজ রাইফেলের ব্যবহার বেশি হয়েছে। কোথাও কোথাও এসএমজি (সাব-মেশিনগান) ও এলএমজির (লাইট মেশিনগান) মতো অস্ত্রও ব্যবহৃত হয়েছে। এসব অস্ত্র বাংলাদেশ পুলিশ ব্যবহার করে। এই চার দিনে নিহত ১২০ জনের মৃত্যুর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ৯৭ জনের শরীরে প্রাণঘাতী গুলির চিহ্ন ছিল। তাঁদের অনেকে ‘এইম ফায়ার’ বা লক্ষ্যবস্তু করে গুলির শিকার হয়েছেন।
পুলিশ প্রবিধানের ১৫৩ ধারা অনুযায়ী, তিন ক্ষেত্রে পুলিশ আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করতে পারবে। এগুলো হলো ব্যক্তির আত্মরক্ষা ও সম্পদ রক্ষার অধিকার প্রয়োগ, বেআইনি সমাবেশ ছত্রভঙ্গ করা ও গ্রেপ্তার কার্যকর করার জন্য। এ ছাড়া দণ্ডবিধির ১০২ ধারা অনুযায়ী, যখনই ক্ষতির আশঙ্কা শেষ হবে, তখন আত্মরক্ষার জন্য শক্তি প্রয়োগের অধিকারও শেষ হবে। অভিযোগ রয়েছে, আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর গুলিবর্ষণের ক্ষেত্রে এসব নিয়ম মানেননি পুলিশ সদস্যরা। এ কারণে প্রাণহানিও অনেক বেশি হয়েছে।
সাবেক আইজিপি নূর মোহাম্মদ বলেন, লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে গুলি করা পুলিশের কাজ নয়। এই আন্দোলন দমন করতে গিয়ে পুলিশ বেশ কিছু অপেশাদার কাজ করে ফেলেছে।
আন্দোলন দমাতে গুলিবর্ষণকারী পুলিশ সদস্যদের চিহ্নিত করার বিষয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার কোনো কর্মকর্তা সরাসরি কিছু বলেননি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সদস্য জানান, ছাত্র-জনতার আন্দোলন নির্মূলে গণহত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধে সম্পৃক্ততার অভিযোগে কয়েক শ পুলিশ সদস্যের তালিকা পাওয়া গেছে। তাঁদের সম্পৃক্ততার বিষয়টি যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে গুলি চালানোর নির্দেশদাতা বেশ কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।
জুলাই-আগস্টের গণহত্যার অভিযোগে ইতিমধ্যে পুলিশের দুই কর্মকর্তা ডিএমপির মিরপুর বিভাগের সাবেক উপকমিশনার জসীম উদ্দিন মোল্লা ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সাভার সার্কেল) শহীদুল ইসলামকে গ্রেপ্তার দেখানোর পর কারাগারে পাঠিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।
খবর অনুযায়ী, ওই চার দিনে হতাহতের ঘটনায় পুলিশের করা মামলাগুলোর এজাহার থেকেই গুলি-বর্ষণকারী পুলিশ সদস্যদের চিহ্নিত করা হয়েছে। তারা গুলি করার ক্ষেত্রে কোনো নিয়ম মানেননি। গুলি করার নির্দেশদাতা বেশ কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
সূত্র বলেছে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ১৮ জুলাই সারা দেশে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ আহ্বান করেছিল। ১৮ থেকে ২১ জুলাই—এ চার দিনে দেশে সবচেয়ে বেশি গুলি চলে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে। পুলিশের ৩৫৭ সদস্য এ সময় প্রায় ৮ হাজার প্রাণঘাতী গুলি করেন। এতে অনেক বিক্ষোভকারী নিহত এবং কয়েক শ আহত হয়।
তালিকাটি যাচাই – বাছাই করছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। সূত্রের বরাত দিয়ে সংবাদে বলা হয়েছে, ওই চার দিনে হতাহতের ঘটনায় পুলিশের করা মামলাগুলোর এজাহার থেকেই গুলিবর্ষণকারী পুলিশ সদস্যদের চিহ্নিত করা হয়েছে।
প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরেকটি মেয়াদে জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা বিশ্ব অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছে। তার প্রশাসনের আক্রমনাত্মক বাণিজ্য নীতি, নিয়ন্ত্রণহীনতা এবং অনন্য বিদেশী কূটনীতির ট্র্যাক রেকর্ডের সাথে, তাৎক্ষণিক এবং দীর্ঘমেয়াদী উভয় প্রভাব বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত। এই নিবন্ধটি বাণিজ্য সম্পর্ক, বিদেশী বিনিয়োগ, মুদ্রার ওঠানামা এবং বৃহত্তর সামাজিক পরিণতি বিশ্লেষণ করে এই ধরনের বিজয়ের সম্ভাব্য প্রভাবগুলি পরীক্ষা করে।
শুল্কনীতি এবং বাণিজ্য যুদ্ধ ট্রাম্পের অতীত রাষ্ট্রপতি বাণিজ্য, বিশেষ করে চীনের সাথে একটি দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতির দ্বারা চিহ্নিত করা হয়েছিল। দ্বিতীয় মেয়াদ বাণিজ্য যুদ্ধ বাড়বে নাকি আরও স্থিতিশীল কাঠামোর দিকে নিয়ে যাবে তা নিয়ে অর্থনীতিবিদরা বিভক্ত। অফিস অফ ট্রেড অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারিং পলিসির প্রাক্তন ডিরেক্টর পিটার নাভারোর মতে, “আমেরিকান ম্যানুফ্যাকচারিং এর উপর একটি দৃঢ় ফোকাস মার্কিন কর্মীদের সাহায্য করে আরও অনুকূল বাণিজ্য ভারসাম্যের দিকে নিয়ে যেতে পারে।” যাইহোক, সমালোচকরা যুক্তি দেন যে আরোপিত শুল্ক ব্যবসায়িক অংশীদারদের কাছ থেকে প্রতিশোধ নিতে পারে, যা বিশ্বব্যাপী গ্রাহকদের জন্য সম্ভাব্য মূল্য বৃদ্ধির দিকে পরিচালিত করতে পারে। এই ধরনের কর্মের প্রতিক্রিয়া প্রতিষ্ঠিত সরবরাহ শৃঙ্খলকে অস্থিতিশীল করতে পারে, বিশেষ করে এশিয়ায়, যেখানে অনেক দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির উপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করে। শুল্ক আরোপের সম্ভাবনা ট্রাম্পের প্রশাসন পূর্বে যেমন চীনের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপ করেছিল, তেমনই তাঁর পুনঃনির্বাচনের পরও এমন নীতির পুনরাবৃত্তি হতে পারে। তিনি আমদানি করা পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়ানোর পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অস্থিরতা সৃষ্টি করবে। বিশেষ করে, চীনের মতো দেশগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি হলে তারা পাল্টা ব্যবস্থা নিতে পারে, যা বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। বাণিজ্য চুক্তির পুনর্বিবেচনা ট্রাম্পের প্রশাসন পূর্ববর্তী বাণিজ্য চুক্তিগুলে- ার পুনর্বিবেচনা করতে পারে। যেমন, উত্তর আমেরিকার মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (ঘঅঙ্কঞঅ) এবং ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ (এচচ) এর মতো চুক্তিগুলোকে নতুন করে আলোচনার টেবিলে আনা হতে পারে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পর্কের কাঠামো পরিবর্তিত হতে পারে। বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা মার্কেটের প্রতিক্রিয়া ট্রাম্পের বিজয়ের ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। বিনিয়োগকারীরা তাঁর নীতিগুলোর প্রতিক্রিয়া হিসেবে শেয়ার বাজারে উদ্বেগ প্রকাশ করতে পারেন। যদি ট্রাম্প আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে কঠোর অবস্থান নেন, তবে তা বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। মূল্যস্ফীতি এবং মুদ্রাস্ফীতি শুল্ক আরোপের ফলে আমদানি করা পণ্যের দাম বৃদ্ধি পাবে, যা মূল্যস্ফীতির দিকে নিয়ে যাবে। এর ফলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাবে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে বাধা সৃষ্টি হবে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এই পরিস্থিতি আরও গুরুতর হতে পারে।আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিবর্তন যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক ট্রাম্পের বিজয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্ক আরও জটিল হতে পারে। তিনি চীনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে পারেন, যা দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক উত্তেজনা বৃদ্ধি করবে। এই পরিস্থিতি বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষ করে প্রযুক্তি খাতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিক্রিয়া ইউরোপীয় ইউনিয়ন ট্রাম্পের বিজয়ে উদ্বিগ্ন হতে পারে, কারণ তাঁর নীতি ইউরোপের অর্থনীতির জন্য একটি বড় ধাক্কা হতে পারে। ইউরোপীয় দেশগুলো মার্কিন পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপ করতে পারে, যা দুই অঞ্চলের মধ্যে বাণিজ্য সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রভাব বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশ বাংলাদেশসহ অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশগুলো ট্রাম্পের নীতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক বাজারে কঠোর হয়, তবে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে গার্মেন্টস শিল্প, যা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং সাহায্যের সংকোচন ট্রাম্প প্রশাসন বিদেশি সাহায্য ও সহযোগিতার ক্ষেত্রে সংকোচন করতে পারে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে মার্কিন সাহায্যের পরিমাণ কমে গেলে তা তাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করবে। প্রযুক্তি খাতে প্রভাব প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে যুক্তরাষ্ট্র প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে চীনকে প্রতিযোগী হিসেবে দেখছে। তিনি প্রযুক্তি সংস্থাগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারেন যাতে তারা চীন থেকে পণ্য আমদানি কমায় বা উৎপাদন স্থানান্তর করে। এর ফলে বৈশ্বিক প্রযুক্তি সরবরাহ শৃঙ্খলে পরিবর্তন আসতে পারে। গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ কমে যেতে পারে যদি ট্রাম্প প্রশাসন বিদেশি গবেষণা প্রকল্পগুলোর প্রতি আগ্রহ হারায়। এটি বৈশ্বিক উদ্ভাবনী ক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। শ্রম বাজারে অস্থিরতা চাকরি হারানোর সম্ভাবনা ট্রাম্পের বাণিজ্য নীতির ফলে অনেক শিল্পে চাকরি হারানোর আশঙ্কা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে যদি আমদানি শুল্ক বৃদ্ধি পায়, তবে উৎপাদকরা তাদের উৎপাদন খরচ কমাতে বাধ্য হতে পারেন, যা কর্মী ছাঁটাইয়ের দিকে নিয়ে যেতে পারে। এই পরিস্থিতি মার্কিন শ্রম বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করবে এবং বেকারত্বের হার বাড়াতে পারে। অবৈধ অভিবাসীদের ওপর চাপ ট্রাম্পের কঠোর অভিবাসন নীতির ফলে অবৈধ অভিবাসীদের ওপর চাপ বৃদ্ধি পেতে পারে। এটি শ্রম বাজারে আরও অস্থিরতা সৃষ্টি করবে, কারণ অনেক ক্ষেত্রেই অবৈধ শ্রমিকরা কম খরচে কাজ করেন। তাঁদের চলে যাওয়ার ফলে কিছু শিল্পে শ্রমিকের অভাব দেখা দিতে পারে, যা উৎপাদন খরচ বাড়াবে। বিনিয়োগের অনিশ্চয়তা বিদেশি বিনিয়োগ হ্রাস বিদেশি বিনিয়োগকারীরা যদি মার্কিন বাজারকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করেন, তবে তারা বিনিয়োগ কমিয়ে দিতে পারেন। এটি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিদেশি বিনিয়োগ হ্রাস পাওয়ার ফলে নতুন প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের প্রবাহও কমে যাবে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে ৭ নভেম্বর, ১৯৭৫ একটি স্মরণীয় দিন। ৭ নভেম্বর বিপ্লবের তাৎপর্য সুদূরপ্রসারী। এই বিপ্লবের প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশে ফিরে আসে প্রকাশ্য রাজনীতি, গঠিত হয় রাজনৈতিক দল, পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয় নির্বাচনী প্রক্রিয়া ও বহুদলীয় গণতন্ত্রের ধারা। এই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে চক্রান্তমুক্ত হয়ে সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ও ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়। এই বিপ্লবের ধারায় ভারতীয় স্বার্থের পরিপূরক অবস্থান থেকে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব অর্জিত হয়। এদিন সিপাহী ও জনতা এক হয়ে বিদ্রোহের মাধ্যমে এক নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা করে, যা “জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস” নামে পরিচিত।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা-উত্তর রাজনৈতিক সংকটকালে এই বিদ্রোহের মাধ্যমে জিয়াউর রহমানের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় এবং দেশের স্থিতিশীলতা ও জাতীয় ঐক্যের ভিত মজবুত হয়। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ নামের যে জাতিরাষ্ট্র বা নেশন স্টেটটি জন্ম নিয়েছিল সেই রাষ্ট্রের নাগরিকরা রাষ্ট্রভিত্তিক, আধুনিক ও বাস্তবসম্মত এক জাতীয় পরিচয় অর্জন করে। আত্মপরিচয় লাভের মাধ্যমে নবউদ্দীপ্ত ও আত্মোপলব্ধির মাধ্যমে নবোত্থিত এই বাংলাদেশী জাতিসত্তার অভিষেকের দিন ৭ নভেম্বর। আর সিপাহী-জনতার মিলিত বিপ্লবের মহান শিক্ষা ও তাৎপর্যকে আত্মস্থ করে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য, স্বকীয়তা, মর্যাদা, নিজস্ব সংস্কৃতি ও গৌরব নিয়ে সামনের দিকে এই জাতিসত্তাকে এগিয়ে চলার প্রশস্ত নতুন মহাসড়ক গড়ে দিয়ে গেছেন জিয়াউর রহমান।
এই ঘটনায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ড থেকে শুরু করে ৭ নভেম্বর পর্যন্ত ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো বাংলাদেশের ইতিহাসে গভীর ছাপ ফেলে। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সুবহে সাদেকের সময় রাজপথে সূচিত সৈনিক-জনতার সংহতির মধ্য দিয়ে যে বিপ্লব সম্পন্ন হয়েছিল তাতে পরাস্ত হয়েছিলো একদল কুচক্রী। সেদিন শুধু নয়, ওই ঘটনার পর অনেক দিন পর্যন্ত তাদেরকে প্রকাশ্যে সমর্থন জানাবার সাহস এ দেশের কোনো রাজনৈতিক কিংবা সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর ছিলো না। সময়ের বিবর্তনে অনেক পরে এসে বিশেষ গোষ্ঠীটি ৭ নভেম্বরের ইতিহাস বিকৃতভাবে প্রচার শুরু করে। আরো পরে শুরু হয় সিপাহী জনতার বিপ্লব ও সংহতির বিরুদ্ধে বিষোদ্গার।
এই চক্রটি সিপাহী জনতার বিপ্লব ও সংহতি দিবসকে ‘সৈনিক হত্যা দিবস’ নামে অভিহিত করতে থাকে। জাসদের এককালীন সশস্ত্র শাখা গণবাহিণীর নেতা অবসরপ্রাপ্ত কর্ণেল আবু তাহেরকে ৭ নভেম্বরের হিরো এবং শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে বিশ্বাসঘাতক হিসেবে চিত্রিত করাই ওই প্রচারণার আসল উদ্দেশ্য। এ ধরণের বিভ্রান্তি, মিথ্যা প্রচার ও ইতিহাস বিকৃতি যখন চলছে এবং সিপাহী জনতার বিপ্লবে পরাজিত শক্তির সমর্থকরা আজ যখন রাষ্ট্র ক্ষমতায় বসে ৭ নভেম্বরের চেতনাকে ভূলুণ্ঠিত করতে চাইছে, সেই মুহূর্তে এই দিনটিকে বিশেষভাবে স্মরণ করা এবং বিপ্লব-সংহতির শিক্ষা ও চেতনাকে আরো দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরা খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে।
প্রেক্ষাপট: স্বাধীনতা-পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতা
৭ নভেম্বরের বিপ্লব ও সংহতির স্বরূপ ও অনিবার্যতা বুঝতে হলে এর সংক্ষিপ্ত পটভূমি জানা দরকার। এ জন্য আমাদের ফিরে তাকাতে হবে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ সংগ্রাম এবং চূড়ান্ত পরিণতিতে সংঘটিত সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের দিকে। মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জন্ম হয়। কিন্তু স্বাধীনতার পরপরই নতুন দেশটিতে রাজনৈতিক সংকট, অর্থনৈতিক সমস্যাবলী এবং সামাজিক বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে দেশ পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা চললেও নানা প্রতিকূলতার কারণে চ্যালেঞ্জগুলো দিনে দিনে আরও গভীর হয়। রুশ-ভারতঘেঁষা বলে পরিচিত তাজউদ্দিনকে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে দিয়ে তিনি সরকারপদ্ধতি বদল করে নিজেই প্রধানমন্ত্রী হন। কিছুদিনের মধ্যেই তাজউদ্দিনকে তিনি মন্ত্রিসভা থেকেও ড্রপ করে দিয়ে খন্দকার মোশতাক আহমাদ ও অন্যান্য মার্কিনপন্থীদের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়েন। বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহারের জন্যও তিনি ইন্দিরা গান্ধীকে অনুরোধ করেন এবং সফল হন।চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যসহ মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের উদ্দেশ্যে তিনি গোপনে লবিয়িং শুরু করেন। পাকহানাদার বাহিনীর সদস্যদের বিচারের দাবিও তিনি ত্যাগ করেন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধীদের জন্য ঘোষণা করেন সাধারণ ক্ষমা। এগুলো সবই ছিলো পাকিস্তান ও মার্কিন প্রশাসনকে দেয়া তার অঙ্গীকার বাস্তবায়নের পদক্ষেপ। কিন্তু বেশি দূর এগুনো সম্ভব ছিলো না তার পক্ষে। কেননা সদ্য প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ তখন রুশ-ভারত প্রভাব বলয়ে আষ্ট্রেপৃষ্ঠে বাঁধা। ক্ষমতাসীন দল ও প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদ এবং অবস্থানগুলো তখন ভারতপন্থীদের কব্জায়। ফলে শেখ মুজিবকেই তাদের কাছে আত্মসমর্পিত হতে হলো। ওয়াদা ভাঙলেন শেখ মুজিব। ভোল পাল্টালেন। নিজের আজন্মলালিত বিশ্বাসের বিরুদ্ধে সাজলেন সমাজতন্ত্রী।
১৯৭৫ সালের আগে বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিভক্তি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, এবং আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সমস্যার সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে বঙ্গবন্ধু চার মূলনীতির ভিত্তিতে দেশ চালানোর জন্য একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে বাকশাল গঠন করেন। এই সিদ্ধান্ত দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক সৃষ্টি করে এবং জনগণের একটি অংশের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়।
১৫ আগস্ট ১৯৭৫: শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ড
সশস্ত্র বাহিনীর সমান্তরাল বাহিনী হিসেবে প্রভূত ক্ষমতা ও সুযোগ-সুবিধা দিয়ে গঠন করা হয়েছিল জাতীয় রক্ষীবাহিনী। এ কারণে প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যরা নিজেদের উপেক্ষিত ভাবতে শুরু করেছিলেন। দেশের সার্বিক পরিস্থিতি এবং অভ্যন্তরীণ কিছু বিক্ষিপ্ত ঘটনায়ও সেনাবাহিনীর অনেক সদস্য সরকারের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিলেন। তারা যখন দেখলেন যে, সরকার পরিবর্তনের শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক সব রাস্তা বন্ধ করে দিয়ে ক্ষমতাকে চিরস্থায়ীভাবে পাকাপোক্ত করার সব আয়োজন শেখ সাহেব সম্পন্ন করেছেন, তখন তারা ক্রুব্ধ হয়ে ওঠেন। সেনাবাহিনীর এই উত্তেজিত অংশটিকে ব্যবহার করে আওয়ামী লীগের মার্কিনপন্থী অংশটি এক রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট প্রত্যুষে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে।
১৫ আগস্ট, ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের সদস্যদের এক নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে হয়। দেশের অভ্যন্তরে থাকা কিছু সেনা সদস্য এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিল, এবং তাদের নেতৃত্বে কিছু সংখ্যক উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে। এই হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে এক নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা হয় এবং দেশে এক অভূতপূর্ব সংকট তৈরি হয়। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর খোন্দকার মোশতাক আহমেদকে দেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব প্রদান করা হয়, যিনি পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের সাথে সহযোগিতা করেন এবং তাদের শাসনক্ষমতায় আসার সুযোগ করে দেন।
খোন্দকার মোশতাকের শাসন এবং সামরিক বিভ্রান্তি
খোন্দকার মোশতাক আহমেদের ক্ষমতাগ্রহণের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যায়। সদ্য ক্ষমতাচ্যুত বাকশালের রুশ-ভারতপন্থী অংশটি এই পরাজয়কে মেনে নিতে পারেনি। তারা পাল্টা আঘাত হানার প্রস্তুতি নিতে থাকে।
মুজিব বাকশাল করে সব দল নিষিদ্ধ করেছিলেন। আর সিভিল পলিটিশিয়ান মোশতাকের নেতৃত্বাধীন আধাসামরিক সরকার বাকশালও বাতিল করে। ফলে দেশ থেকে রাজনৈতিক দলতো বটেই, রাজনীতিও বিলুপ্ত হয়ে যায়। এই রাজনীতিহীন সময়ে স্বার্থান্বেষী বিভিন্ন মহল সশস্ত্রবাহিনীকে তাদের উদ্দেশ্য হাসিলের মাধ্যম হিসেবে বেছে নেয়।
স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রতীক প্রতিরক্ষা বাহিনীর শৃঙ্খলা এবং চেইন অব কমান্ড ভেঙ্গে পড়ে। এ ধরনের বিশৃঙ্খল অবস্থার সুযোগে সেনাবাহিনীর উচ্চাভিলাষী ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ তার অনুগত কতিপয় অফিসারের সমর্থনে খন্দকার মোশতাককে হটিয়ে ক্ষমতা দখলের উদ্দেশ্যে বিদ্রোহ করেন।
৩ নভেম্বর সংঘঠিত ওই বিদ্রোহের হোতারা সেনাবাহিনীপ্রধান জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দী করেন। চেইন অব কমান্ড ভেঙ্গে সম্পূর্ণ বেআইনীভাবে অধস্তন কর্মকর্তা খালেদ সেনাপ্রধান পদ থেকে জিয়াকে অপসারিত করেন এবং নিজেকে নয়া সেনাপ্রধান ঘোষনা করেন। মোশতাক আহমেদ বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন এবং তাদের বিরুদ্ধে কোনো কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি, বরং তাদের পুরস্কৃত করেছিলেন। এর ফলে দেশের অভ্যন্তরে অসন্তোষ সৃষ্টি হয় এবং সাধারণ জনগণের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা অনুভূত হতে থাকে।
অন্যদিকে সেনাবাহিনীর সদস্যদের মধ্যেও বিভ্রান্তি এবং ভীতি বিরাজ করছিল। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর সামরিক বাহিনী দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে। সেনাবাহিনীতে নানা গোষ্ঠী এবং আদর্শের অনুসারীরা ভিন্নমত পোষণ করতে শুরু করে। এই সময়ে সেনাবাহিনীতে মেজর জিয়াউর রহমানের মতো নেতার উত্থান ঘটে, যিনি জনপ্রিয়তা এবং আদর্শিকভাবে দৃঢ় ছিলেন।
স্বাধীনতার সত্যিকারের ঘোষক, বীর মুক্তিযোদ্ধা, স্বাধীনতা যুদ্ধের মুক্তি বাহিনীর জেড ফোর্সের অধিনায়ক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়ার সততা, দেশ প্রেম, রাষ্ট্রপরিচালনায় সফলতা, আওয়ামী দুর্ণীতিবাজদের আমলে ‘তলা বিহীণ ঝুড়ি’ বানানো দেশটাকে উন্নতির দিকে ধাবিত করাটাই পরজীবি, ভারতীয় দালাল আওয়ামী লীগারদের গাত্র দাহের কারণ।
সিপাহী বিদ্রোহ এবং ৭ নভেম্বর বিপ্লব
সিপাহি জনতার বিপ্লব ও জিয়া
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের পেছনে খালেদের সক্রিয় সমর্থন থাকা সত্ত্বেও ৩ নভেম্বর তিনি মুজিব ভক্তদের বুঝিয়েছিলেন যে, মোশতাকের সরকার অবৈধ। এই সরকারকে আঘাত করে মুজিব হত্যার বদলা নিতে চান তিনি। তার কথায় মুজিবভক্তরা বলেছিলেন, মোশতাককে অপসারণের পর মুজিবের ভাইস প্রেসিডেন্ট সৈয়দ নজরুলকে ক্ষমতায় বসাতে হবে। কিন্তু মোশতাককে অপসারণের সঙ্গে যুগপৎভাবে ঘটে যায় রহস্যঘেরা জেলহত্যাকান্ড। একদল সৈন্য জেলে ঢুকে নজরুলসহ বিলুপ্ত বাকশালের চার শীর্ষনেতাকে খুন করে। এই হত্যাকান্ডের ব্যাপারে খালেদ অজ্ঞতা প্রকাশ করলেও অনেকেই তাকে সন্দেহ করতে থাকে।
দেশের এই অনিশ্চিত এবং অস্থিতিশীল অবস্থার মধ্যে ৭ নভেম্বর, ১৯৭৫ সালে সিপাহী-জনতা বিদ্রোহের সূচনা হয়। সেনাবাহিনীর নিচু স্তরের সৈনিকদের মধ্যে তৎকালীন সেনাবাহিনীর কিছু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের প্রতি অসন্তোষ ছিল, যারা বঙ্গবন্ধু হত্যার পরে ক্ষমতা গ্রহণের পেছনে ছিলেন। এই অসন্তোষের ফলে সিপাহীরা বিদ্রোহ করে এবং কর্নেল তাহেরের প্ররোচনায় তারা একটি বড় ধরনের আন্দোলন গড়ে তোলে।
খালেদ সবখানে তার নিজের কর্তৃত্বকে সংহত করতে পারেনি। সামরিক শাসন বলবৎ করা সত্ত্বেও ক্ষমতার শীর্ষপদে তিনি এক মুহূর্তের জন্যও বসতে পারেননি। বঙ্গভবন দখল করতে গিয়ে ক্যান্টনমেন্টেই তার কর্তৃত্ব আলগা হয়ে যায়। সাধারণ সৈনিক ও অফিসাররা খালেদের রহস্যজনক কার্যকলাপের ব্যাপারে প্রকাশ্যেই ক্ষোভ, সংশয় ও সন্দেহ প্রকাশ করতে থাকেন। এ ধরনের পরিস্থিতিতে সশস্ত্র বাহিনীতে রক্তক্ষয় ও সংঘাত এড়াতে জেনারেল ওসমানীর হস্তক্ষেপে একটি মাঝামাঝি পদক্ষেপ নেন খালেদ, কিন্তু এতেও শেষ রক্ষা হয়নি তার। রুশ-ভারতপন্থীরা পুনরুত্থানের পথ খুঁজছিল।
খালেদের বিদ্রোহে উল্লসিত হয়ে ওঠে তারা। মুজিব ভক্তরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সমবেত হয়ে সভা করে। সেখান থেকে মুজিবের ফটো নিয়ে মিছিল করে, তারা ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কে নিহত নেতার বাসভবনে গিয়ে তার প্রতি শ্রদ্ধা জানায়। ওই সমাবেশ থেকে খালেদের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করা হয়। মিছিলে খালেদের মা এবং ভাই (আওয়ামীলীগ সরকারের সাবেক ভূমি প্রতিমন্ত্রী মরহুম রাশেদ মোশাররফ) শরিক হন। এই খবর প্রচারিত হলে সেনাবাহিনীসহ সবখানে ক্ষোভের সঞ্চার হয়। সৈনিক ও অফিসাররা বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করে পারস্পরিক যোগাযোগ স্থাপন ও মতবিনিময় করে খালেদের ক্ষমতার স্বপ্নকে গুঁডিয়ে দেয়ার সিন্ধান্ত নেন।
৭ নভেম্বর প্রথম প্রহর থেকে সারা দেশের সেনা ছাউনিগুলোর চেহারা বদলে যায়। সৈনিকেরা অস্ত্রহাতে গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে বেরিয়ে আসেন রাজপথে। প্রত্যেক ক্যান্টনমেন্ট থেকে একদল করে সশস্ত্র সৈন্যকে পাঠিয়ে দেয়া হয় রাজধানীর দিকে। রাত্রির শেষপর্বে তারা ঢাকায় এসে পৌঁছে। মধ্যরাত্রির পর ঢাকা সেনানিবাসেও শুরু হয়ে যায় সৈনিকদের অভ্যুত্থান। ব্যারাক থেকে গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে তারা বেরিয়ে আসেন। বন্দী সেনাপ্রধান জিয়াকে মুক্ত করে কাঁধে তুলে সাধারণ সৈনিকরা বেরিয়ে আসেন রাজপথে। অবস্থা বেগতিক দেখে বঙ্গভবন থেকে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পালাতে গিয়ে ঢাকার রাজপথে সৈনিকদের হাতে ধরা পড়েন খালেদ তার কয়েকজন দোসরসহ। ক্রুদ্ধ সৈনিকেরা তাদেরকে গুলি করে হত্যা করেন।
এর অল্প কিছু আগে খালেদের সমর্থক কর্নেল মালেক, শাফায়াত জামিল, জাফর ইমাম, মেজর হাফিজ প্রমুখ কয়েকজন অফিসার পরিস্থিতি অনুধাবন করে তাকে ছেড়ে নিরাপদে পালিয়ে গিয়েছিলেন।
“বাংলাদেশ জিন্দাবাদ, কুচক্রিরা নিপাত যাক, জিয়াউর রহমান জিন্দাবাদ” ধ্বনি দিয়ে সৈনিকেরা ৭ নভেম্বর সুবহে সাদেকের সময়ে রাজপথে নেমে এলে তাদের প্রতি স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন জানাতে সারা দেশের জনগণ রাজপথে নেমে আসেন। শ্রেণীপেশা নির্বিশেষে আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা দেশরক্ষার সৈনিকদের সঙ্গে কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে স্লোগান তোলেন। সেনাদলগুলিকে বিপুল করতালি দিয়ে অভিনন্দিত করতে থাকে রাজপথের দু’পাশে অপেক্ষমাণ লাখো মানুষ। জনসমুদ্র থেকে বর্ষিত পুষ্পবৃষ্টিতে ছেয়ে যায় ট্যাংক, সাঁজোয়া যান। কামানের নলে সাধারণ মানুষেরা মালা পরিয়ে দেন। সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য!বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পর আর এমন দৃশ্যের অবতারণা কখনো হয়নি।
বিদ্রোহীরা মেজর জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করে তাকে নেতৃত্বে আসতে আহ্বান জানায়। জিয়াউর রহমান সেই সময় দেশের স্থিতিশীলতা এবং জাতীয় সংহতির জন্য নতুন করে নেতৃত্ব প্রদান করেন। এই বিদ্রোহের মাধ্যমে খোন্দকার মোশতাকের শাসনের অবসান ঘটে এবং মেজর জিয়া দেশের জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে ক্ষমতায় আসেন।
জিয়াউর রহমানের নেতৃত্ব: জাতীয় ঐক্যের ভিত্তি
৭ নভেম্বরের ঘটনাবলি মেজর জিয়াউর রহমানকে দেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে এক দৃঢ় নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। ’৭১-এ ২৫ মার্চের গণহত্যার সূচনায় আওয়ামীলীগের নেতারা আত্মসমর্পণ ও পালানোর পথ বেছে নিলে নেতৃত্বশূণ্য ও আক্রান্ত জনগণ মারাত্মক অসহায় হয়ে পড়েছিলেন। সেই ঘোর দুঃসময়ে ইথারে ভেসে এসেছিলো একটি কণ্ঠ : ‘আমি মেজর জিয়া বলছি…।’ চট্টগ্রামের কালুরঘাট রেডিও স্টেশন মারফত স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচার করে জিয়া জাতিকে দিয়েছিলেন বরাভয় আর পথনির্দেশ। শুধু মৌখিক ঘোষণা নয়, শুরু করে দিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধ। একইভাবে ’৭৫-এর ৭ নভেম্বর প্রত্যুষেও জনগণ আবার বেতার তরঙ্গে শুনলো সেই একই কণ্ঠ : ‘আমি জিয়া বলছি’।
জাতীয় দুর্যোগের কান্ডারী জিয়ার নির্দেশনা কান পেতে শুনলো সবাই। তিনি জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে দেশকে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনের সমন্বয়ে পরিচালিত হতে থাকে।
জিয়াউর রহমানের অধীনে দেশে জাতীয় ঐক্যের ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, দেশের স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য সকল শ্রেণির জনগণকে একত্রিত হওয়া জরুরি। তার প্রচেষ্টায় দেশের অর্থনীতি পুনর্গঠন করা হয় এবং কৃষি, শিল্প, ও বাণিজ্য খাতে ব্যাপক সংস্কার সাধিত হয়।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা
দেশের জাতীয়তাবাদী ধারাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ সালে “বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল” (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন। বিএনপি ছিল একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল, যা দেশের স্বাধীনতার চেতনাকে ধরে রেখে জনকল্যাণে কাজ করার প্রতিশ্রুতি নেয়।
বিএনপির মাধ্যমে জিয়াউর রহমান দেশের জাতীয়তাবাদী দর্শনকে জনগণের মাঝে জনপ্রিয় করেন এবং এটি পরবর্তীতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দল হিসেবে গড়ে ওঠে। বিএনপি গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে জনগণের অধিকার ও কল্যাণের কথা বলত এবং দেশের উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিত।
জিয়াউর রহমানের শাহাদাতঃ নিছক বিদ্রোহ না অন্যকিছু?
জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে দেশ এক নতুন উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে একটি সামরিক বিদ্রোহের সময় বিদ্রোহী সৈন্যদের হাতে তিনি শহীদ হন। তার মৃত্যুতে দেশ হারায় এক দৃঢ়চেতা এবং দেশপ্রেমিক নেতাকে, যিনি দেশের স্বার্থকে সর্বদা অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে জিয়া প্রবর্তিত উন্নয়নের রাজনীতির কতিপয় সাফল্য:
সকল দলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান।
জাতীয় সংসদের ক্ষমতা বৃদ্ধি।
বিচার বিভাগ ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেয়া।
দেশে কৃষি বিপ্লব, গণশিক্ষা বিপ্লব ও শিল্প উৎপাদনে বিপ্লব।
সেচ ব্যবস্থা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে স্বেচ্ছাশ্রম ও সরকারি সহায়তার সমন্বয় ঘটিয়ে ১৪০০ খাল খনন ও পুনর্খনন।
গণশিক্ষা কার্যক্রম প্রবর্তন করে অতি অল্প সময়ে ৪০ লক্ষ মানুষকে অক্ষরজ্ঞান দান।
গ্রামাঞ্চলে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় সহায়তা প্রদান ও গ্রামোন্নয়ন কার্যক্রমে অংশগ্রহণের জন্য গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী (ভিডিপি) গঠন।
গ্রামাঞ্চলে চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি বন্ধ করা।
হাজার হাজার মাইল রাস্তা-ঘাট নির্মাণ।
২৭৫০০ পল্লী চিকিৎসক নিয়োগ করে গ্রামীণ জনগণের চিকিৎসার সুযোগ বৃদ্ধিকরণ।
নতুন নতুন শিল্প কলকারখানা স্থাপনের ভেতর দিয়ে অর্থনৈতিক বন্ধ্যাত্ব দূরীকরণ।
কলকারখানায় তিন শিফট চালু করে শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি।
কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও দেশকে খাদ্য রপ্তানীর পর্যায়ে উন্নীতকরণ।
যুব উন্নয়ন মন্ত্রাণালয় ও মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয় সৃষ্টির মাধ্যমে দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে যুব ও নারী সমাজকে সম্পৃক্তকরণ।
ধর্ম মন্ত্রণালয় প্রতিষ্টা করে সকল মানুষের স্ব স্ব ধর্ম পালনের সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধিকরণ।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সৃষ্টি করে প্রযুক্তির ক্ষেত্রে অগ্রগতি সাধন।
তৃণমূল পর্যায়ে গ্রামের জনগণকে স্থানীয় প্রশাসন ব্যবস্থা ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করণ এবং সর্বনিম্ন পর্যায় থেকে দেশ গড়ার কাজে নেতৃত্ব সৃষ্টি করার লক্ষ্যে গ্রাম সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন।
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশের আসনলাভ।
তিন সদস্যবিশিষ্ট আল-কুদস কমিটিতে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি।*.দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে ‘সার্ক’ প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগ গ্রহণ।
বেসরকারিখাত ও উদ্যোগকে উৎসাহিতকরণ।
জনশক্তি রপ্তানি, তৈরি পোশাক, হিমায়িত খাদ্য, হস্তশিল্পসহ সকল অপ্রচলিত পণ্যোর রপ্তানীর দ্বার উন্মোচন।
শিল্পখাতে বেসরকারি বিনিয়োগের পরিমাণ বৃদ্ধি ও বিনিয়োগ ক্ষেত্রের সম্প্রসারণ।
ব্যক্তিস্বার্থের উর্ধে উঠে দেশের জন্য নিবেদিত প্রান জিয়াউর রাহমানকে আজকাল না জেনে অনেকেই অহেতুক দোষারোপ করে যায়। এই জঘন্য ঘৃনিত মনোবৃত্তি কোথা থেকে এসেছে সেই আসল সত্যটা কেউ আজকাল ইতিহাস পড়ে দেখে না। শুধু শহীদ জিয়া নন, বঙ্গবীর জেনারেল ওসমানী, সেক্টর কমান্ডার জলিল সহ এরকম অনেকেই সেই ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ চলাকালেই ভারতের রোশানলে পড়েন। তাদের দোষ ছিল মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রে থাকতে চাওয়া। কিন্তু শফিউল্লাহ, একে খন্দকার বা এই রকমের কিছু কোলাবোরেটর ছিল যারা ভারতের অধীনতা গ্রহণ করায় তারা সর্বদাই দিল্লীর প্রিয় পাত্র।
আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে তাজউদ্দিন ভারতের সাথে ৭ দফা ২৫বছরের অধীনতামূলক চুক্তি করেছিল। শহীদ জিয়া এগুলোর বেশীর ভাগ অগ্রাহ্য করে মধ্যপ্রাচ্য, চীনের সাথে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক গড়ে। এটাই ইন্দিরা গান্ধী মেনে নিতে পারেনি। ইন্দিরা গান্ধীর উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশকে হয় ভারতে ফিরিয়ে নিবে নতুবা আজীবন করদরাজ্য করে রাখবে। কিন্তু জিয়াউর রহমান এতে বাধ সাধেন; ওই নোংরা চাওয়ার মুখে লাত্থি দিয়েছিলেন। এই জন্যই শহীদ জিয়ার নামে কুৎসা রটনা আর কেউ করেনা, করে ভারতের কিছু দালাল।
৭ নভেম্বরের জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস বাংলাদেশে একটি ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সূচনা করে। এই দিনটি শুধু সিপাহী-জনতার বিদ্রোহের প্রতীক নয়, বরং এটি জাতীয় ঐক্য এবং সংহতির মর্মার্থকেও প্রতিফলিত করে। মেজর জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে দেশের যে উন্নয়ন এবং জাতীয়তাবাদী ভাবধারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তা আজও বাংলাদেশের ইতিহাসে সম্মানের সঙ্গে স্মরণ করা হয়।