Saturday, January 24, 2026
হোমসম্পাদকীয়প্রচ্ছদ রচনাগণঅভ্যুত্থানে গণমাধ্যমের নির্লজ্জ ভূমিকা

গণঅভ্যুত্থানে গণমাধ্যমের নির্লজ্জ ভূমিকা

২০১৭ সালে প্রথম আলোর উদ্যাগে বাংলাদেশে ১ হাজার ২০০ তরুণের মধ্যে একটি জরিপ করা হয়েছিল। সেখানে দেখা যায় ৮২ শতাংশ তরুণই তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন। জরিপে অংশ নেওয়া তরুণদের ৬৩ শতাংশই বলেছিলেন, তারা জানেন না তাদের জীবনের লক্ষ্য। ৫৬ শতাংশ তরুণ উদ্বিগ্ন নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে। রাজনীতি নিয়ে অধিকাংশ তরুণ অনাগ্রহের কথা জানিয়েছিলেন। কারণ রাজনীতি মানে বিদ্বেষ, আন্দোলনের নামে হয় নিরীহ মানুষের প্রাণহানি। স্বাধীনতা আনা সংগঠন নিজের হাতে সব কবর দিয়ে গেছে!

গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী আজও তা কঠিন বাস্তবতা। এর মাঝে জুলাই এসেছিল তারুণ্যের আশা-হতাশার মাস হিসেবে।

কত জীবনের অপূরণীয় ক্ষতি, সম্ভাবনার অকাল অবসান! আমি আপনি নিজের জায়গা থেকে, তাদের মা-বাবা, ভাইবোন, স্বজনদের কথা বিবেচনা করি। সাঈদ, মুগ্ধ, ওয়াসিম, তরুয়া ও মেহেদীদের মায়েরা কীভাবে সহ্য করবেন ব্যথা! বাবারা কীভাবে কাটাবে রাত? এমন পরিস্থিতিতে নবারুণ ভট্টাচার্যকে মনে করি-

“এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না।”

পরের অংশে বলেছেন-

“যে শিক্ষক বুদ্ধিজীবী কবি ও কেরাণী

প্রকাশ্যপথে এই হত্যার প্রতিশোধ চায় না

আমি তাকে ঘৃণা করি।”

মানব দেহে একদিনে ক্যান্সার হয় না, তেমনি দেশও তলানিতে যায় না। দেশটা যখন মৃত্যু উপত্যকায় পরিণত হচ্ছে তখনও চুপ ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষক, চুপ করে ছিলেন দেশের কবি-লেখক, সম্পাদক ও সাংবাদিক। ভাবছি বইমেলায় তাদের হাজার হাজার বই, কীভাবে দেখাবে মুখ নন্দলালের জীবন নিয়ে? প্রাইভেট ছাড়া পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক আছে ১৫ হাজার ২৩৬। তাদের মধ্যে অধ্যাপক রয়েছে ৪ হাজার ৬৬১ জন। তারা ব্যস্ত কীসে, কেউ কী জানেন? শিক্ষক নেতাদের নীরবতা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন শতশত শিক্ষার্থী। যারা পাশে দাঁড়িয়েছেন তারা শক্তি। আমাদের সমাজের লজ্জা নতুন কেউ শহীদ শামসুজ্জোহা হতে পারেননি, জাগতিক লোভে।

স্বৈরাচার প্রধানমন্ত্রীর এক সভায় সিনিয়র এক সাংবাদিক বলেছিলেন, “শেখ হাসিনার সঙ্গে আছেন, প্রয়োজনে যেকোনো কিছু করতে প্রস্তুত।” এতে সাংবাদিকদের সঙ্গে ক্ষমতার পারস্পরিক স্বার্থের সম্পর্ক আরও পরিষ্কার হয়েছে। যেন ছাত্রলীগের ভূমিকা রাখছে। আজ তারা কই, সবাই পালিয়েছেন। এ যেন কানার হাটবাজার। কেপিআই মানে সম্পদ নষ্ট হচ্ছে দেখানো হয়, হাজার হাজার মানুষের কোন খবর নেই, অনুতাপ নেই। ক্ষমতাপ্রীতি সাংবাদিকতায় একটি রোগ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই প্রজন্ম এদের নিন্দা, ধিক্কার জানিয়েছে।

তারা ভুলে গেছে- শিক্ষকতা, সাংবাদিকতা কোনো চাকরি না। এখানে দায় ও দায়িত্ব আছে। আছে নীতিবোধের চর্চা, জ্ঞানকা-ের ব্যবহার। শিক্ষক কবি সাংবাদিক এরা যখন নষ্ট হয়ে যায় তখন রাষ্ট্র ভালো থাকতে পারে না। তার উদাহরণ গণঅভ্যুত্থান আগের বাংলাদেশ।

যারা ঊনসত্তর, একাত্তর, পঁচাত্তর ও নব্বইয়ে কবিতা-গানে মাতিয়ে রেখেছেন দেশ, তারাও হারিয়ে গেছেন। বেঁচে থাকা উল্লেখযোগ্য কবি লেখকরা চুপ। পাঠকরা চায় তাদের লেখকরা কিছু বলুক, পাশে থাকুক। এক সময় বাংলা একাডেমিতে কর্মরত লেখকরাও কথা বলতেন, লিখতেন। আজ তারাও চুপ।

গ্রন্থাগার বিশেষজ্ঞ ফজলে রাব্বী এক বইতে উল্লেখ করছেন- “বাংলা একাডেমি একটা দ্বীপের মত। এটি জন্ম থেকেই সরকারের বিরুদ্ধে। সরকারও এর বিরুদ্ধে। এর কারণ বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠা হয়েছিলো একটি গণতান্ত্রিক দাবীর প্রেক্ষিতে, গণতান্ত্রিক সরকার কর্তৃক। এ দেশে সরকার ও জনতা পরস্পর বিরোধী। গণতন্ত্র ও সরকার সম্পূরক শক্তি নয় বরং বিরোধী। এর প্রাণ হচ্ছে লেখক গবেষক।” সেই প্রাণের আজ প্রাণ নেই। পদ-পদবি পুরষ্কারে মাতাল। অনুভূতি অনুভোতা হয়ে গেছে সে কতকাল আগে। সময় দেখে কেউ কেউ ভোল পাল্টাবে!

মানুষ সামাজিক জীব। ফলে সমাজের একপ্রান্তে কী ঘটছে, অন্যপ্রান্তের মানুষ তা জানতে চায়। তাই তো দেখা হলেই বলে ‘কি মিয়া, খবর কি! ভালো মন্দ জানাইয়ো’। এমনই মানুষের জীবন। পুরনো আলাপে না গিয়ে কেবল পঞ্চদশ শতক থেকে শুরু করি। এই দশকের মাঝামাঝি জার্মানে য়োহান গুটেনবার্গ ছাপাখানা আবিষ্কার করে পুরো জগৎ চেহারা পাল্টে দিলেন।

এই ছাপাখানা এনে দিলো বার্তা, ভাবনা, প্রচারণা, গণপ্রচারের অবাধ সুযোগ। ইতিহাসের চেনা ছক পাল্টে দেওয়ার পথে ছাপাখানার যুগান্তকারী প্রভাব পড়ল। এর মাঝে প্রভাবশালী উপাদান হলো মুদ্রিত খবরের কাগজ। মানুষের পৃথিবীতে এলো নতুন একটি বর্গ, যার নাম গণমাধ্যম।

গণমানুষ গণতন্ত্র গণমাধ্যম তিনটি শব্দে ‘গণ’ শব্দটি সাধারণ। গণমাধ্যম থেকে যদি ‘গণ’ উধাও হয়ে যায় তবে সেটি শুধুই একটি প্রচারমাধ্যমে পরিণত হয়। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান একটি পেশাকে গণমানুষের পক্ষে ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার জন্য দিয়েছে অবাধ স্বাধীনতা।

যদিও প্রমথ চৌধুরী বলেছিলেন, মুখ থেকে কলমে ভাষা যায়। প্রমথ চৌধুরীর সময় কলমের সংখ্যা কম ছিল। আজ অনেক কলম, অনেক দিক। কলমের সংখ্যা বেড়েছে। কলম থেকে মানুষের মুখে সংক্রমিত হওয়ার সংখ্যাও বেশি। প্রযুক্তির নতুন কিছু আসলে সঙ্গে সঙ্গে নতুন শব্দ হাজির হয়। গণমাধ্যম বা যারা লেখালেখি করেন তারা সেটা ভালোভাবে টের পান। প্রকাশ করেন ফেসবুকে বা পত্রিকা অথবা বইতে। প্রাত্যহিক জীবনের সঙ্গে গণমাধ্যম অন্যতম অংশ এখন। তার ভাষাভঙ্গি, জ্ঞান আচরণ ও সংস্কৃতি আমাদের নানানভাবে প্রভাবিত করে।

এর মাঝে টেলিভিশন দেশে যাত্রা শুরু করে ১৯৫০-এর দশকে। হলিউডের কারণে গণবিনোদনের তুমুল জনপ্রিয় অনুষঙ্গ হয়ে চলচ্চিত্র যাত্রা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের সীমানা ছাপিয়ে। বিভিন্ন দেশেও তখন চলছে রুপালি পর্দায় নিজের নিজের মতো করে উঠে দাঁড়ানোর প্রয়াস। বিজ্ঞাপনী প্রচারণার রঙে ইতিহাসটা অবশ্য এগুলোর মতো অভিনব নয়।

তবে ডিজিটাল মাধ্যমের বয়স দুই দশকের ঘরে। এর জন্ম সোনার চামচ মুখে দিয়ে-অপার সম্ভাবনাময় এই পরিসরটি পেয়েছে বিপুল বিনিয়োগ, প্রযুক্তির অনিঃশেষ উদ্ভাবনী চমকের আশীর্বাদ, আর সর্বশেষ করোনার অতিমারিতে বছরের পর বছর রুদ্ধ ঘরে বসে থেকেও পৃথিবীর সঙ্গে যুক্ত থাকার জন্য মানুষের মরিয়া আকুতি। এই যে পরিস্থিতি, তার প্রশ্রয়ে প্রায় মুদ্রিত গণমাধ্যমকে ডিজিটাল গণমাধ্যম দেড় দশকের মধ্যেই কাবু করে পেলেছে।

কোটা সংস্কারে গড়ে ওঠা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে বিশ্বজুড়ে আবু সাঈদ সাহসী প্রতিবাদী চরিত্র হয়ে থাকবে। এমন অসংখ্য ছাত্র-জনতার জীবনের ত্যাগে একক কর্তৃত্বের শাসনে স্বৈরাচারের পদত্যাগ ও দেশ ছাড়ার ঘটনা ঘটে। জুলাই থেকেই সরকার সম্পূর্ণভাবে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। পশ্চিমাকে শত্রু বানিয়ে শেষ পর্যায়ে ভূরাজনীতিতেও প্রায় একা হয়ে পড়েছিলেন। অবশেষে গণ–আন্দোলনের মুখে তার নির্মম পরিণতি দেখে বিশ্ব।

কিন্তু আরেকটি ঘটনা সচেতন মাত্র খেয়াল করেছে গণমাধ্যমের লজ্জাকর ভূমিকা। সবার চোখের সামনেই তরুণদের ক্রমবিস্তৃত একটা শান্তিপূর্ণ আন্দোলন ভয়ঙ্কর সহিংসতার শিকার হতে থাকল। অথচ অধিকাংশ গণমাধ্যম একে যথাযথ ‘ট্রিটমেন্ট’ দিল না। ন্যায্যা আন্দোলনকারীদের বলেছে দুর্বৃত্ত, ষড়যন্ত্রকারী, দেশবিরোধী, উন্নয়ন বিরোধী। সরকার বলছে, রাজাকারের নাতিপুতি, ছাত্রলীগ বলছে- কোটা আন্দোলনের প্রতি আমরা তীক্ষ্ণ নজর রাখছি। আন্দোলনের নামে পরিস্থিতি অশান্ত করে তোলার চেষ্টা হলে ছাত্রলীগ তার করণীয় ঠিক করবে।‘ এই আলাপের বাহিরে গিয়ে হাতেগোনা ৫-৭টি পত্রিকা, ২-৩টি চ্যানেল বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে প্রকৃত দায়িত্ব পালন করেছে

বিশ্লেষণ করলে দেখব- বাংলাদেশে ৪ ধরনের গণমাধ্যম রয়েছে। সংবাদপত্র, টেলিভিশন, রেডিও এবং অনলাইন নিউজ পোর্টাল। স্মার্টফোনের কারণে অবশ্য এর বাইরে সিটিজেন জার্নালিজমের এক বিশাল ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে ফেসবুক। এর মাঝে দেশের বেশিরভাগ গণমাধ্যম ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। গণমাধ্যমের উপর গণমানুষের আস্থা তলানিতে ঠেকেছে। গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র জনতার পক্ষে বেশিরভাগ গণমাধ্যম দাঁড়ায়নি। ফলে ক্ষুব্ধ জনতা বেশ কয়েকটি গণমাধ্যম অফিস ভাংচুর হয়েছে। যদিও এটি অপ্রত্যাশিত কিন্তু বাস্তবতা ছিল।

সাধারণ মানুষ ক্ষমতাহীন মানুষ প্রান্তিক মানুষের পক্ষে ক্ষমতাকে প্রশ্ন করে অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। ক্ষমতাহীনের পক্ষে এই স্বাধীনতার চর্চা যারা করেন তাদেরকে বলা হয় সাংবাদিক। ক্ষমতা যাতে সীমা ছাড়িয়ে স্বৈরাচার হতে না পারে সেজন্য সাংবাদিকরা ক্ষমতাকে চোখে চোখে রাখেন। তার ক্ষমতার উৎসও তাই গণমানুষ। এর আইনি ভিত্তি দিয়েছে সংবিধান। কিন্তু সেই ভিত্তি নিয়ে দালালি করেছি, গণ মানুষের পাশে দাড়ায়নি। স্বাভাবিক বিচার, বিবেচনাবোধ এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছি। এই কা-জ্ঞানহীন কাজটি আরও পরিষ্কার হয়েছে চব্বিশের জুলাই গণ অভ্যুত্থানে।

এমন দলবাজি, অপসাংবাদিকতা, হলুদ সাংবাদিকতা ও তথ্যসন্ত্রাস সাংবাদিকদের মর্যাদা ম্লান করে দিয়েছে। বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতাকে দখল করে নিয়েছে স্বার্থনির্ভর সাংবাদিকতা। কথা ছিল গণমাধ্যমকে সব সময় জনগণের পক্ষে থাকার। কিন্তু জনগণের সঙ্গে গণমাধ্যমের একটা দূরত্ব তৈরি হয়ে গেছে।

সবার মনে আছে নিশ্চয়, সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনাকে গুম-খুনের কথা জিজ্ঞেস না করে তৈলমর্দন করতেন অনেক দালাল সাংবাদিক। সেটা প্রধানমন্ত্রীর সংবর্ধনা সভায় পরিণত হতো। এভাবে শেখ হাসিনাকে স্বৈরাচার থেকে মহাস্বৈরাচার তৈরিতে সবচেয়ে বড় অবদান রাখে দালাল সাংবাদিকেরা।

আসলে দাসত্ব একবার গ্রহণ করলে বাকি জীবন মানুষের আচরণ করা সম্ভব হয় না, প্রমাণ বাংলাদেশের উল্লেখ্যযোগ্য অংশ সাংবাদিক সম্পাদকরা।

‘ভোটবঞ্চিত তারুণ্য’ অভূতপূর্ব অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ফেললেন। ঘোর আষাঢ়-শ্রাবণেও এমন প্লাবন এ দেশ দেখেনি। এ যেন নজরুলের উষার দুয়ারে আঘাত হেনে রাঙা প্রভাত আনার ছন্দময় বিপ্লব। বাংলাদেশের সঙ্গে ৩টি গণঅভ্যুত্থানের সময় স্মরণীয়।

৬৯ সালের বাঙালির স্বকীয়তাবোধে শ্লোগান ছিল-

‘তোমার দেশ আমার দেশ ,বাংলাদেশ বাংলাদেশ’

জ্বালো জ্বালো

আগুন জ্বালো’;

‘আইয়ুব-মোনায়েম ভাই ভাই

এক দড়িতে ফাঁসি চাই’,

‘পুলিশ তুমি যতই মারো

বেতন তোমার এক শ বারো’ প্রভৃতি।

৯০ এরশাদ পতনের আন্দোলনে স্লোগান ছিল

‘জনতার দাবি এক

এরশাদের পদত্যাগ’;

‘এক দফা এক দাবি

এরশাদ তুই কবে যাবি’;

‘এই মুহূর্তে দরকার

তত্ত্বাবধায়ক সরকার’।

পতনের পরপর স্লোগান উঠেছিল

‘এই মাত্র খবর এলো

এরশাদ পালিয়ে গেল’।

২০২৪ সালের ছাত্রজনতার আন্দোলনে

‘চাইলাম অধিকার হয়ে

হয়ে গেলাম রাজাকার’;

‘আপস না সংগ্রাম

সংগ্রাম সংগ্রাম’;

‘দালালি না রাজপথ

রাজপথ রাজপথ’;

‘আমার সোনার বাংলায়

বৈষম্যের ঠাঁই নাই’;

‘একাত্তরের হাতিয়ার

গর্জে ওঠো আরেকবার’;

‘যে হাত গুলি করে

সে হাত ভেঙে দাও’;

‘অ্যাকশন অ্যাকশন

ডাইরেক্ট অ্যাকশন’;

‘আমার ভাই কবরে

খুনিরা কেন বাইরে’;

‘আমার ভাই জেলে কেন’;

‘জাস্টিস জাস্টিস

উই ওয়ান্ট জাস্টিস’;

‘জ্বালো রে জ্বালো

আগুন জ্বালো’;

আমার খায়

আমার পরে

আমার বুকেই গুলি করে’;

‘লাশের ভেতর জীবন দে/

নইলে গদি ছাইড়া দে’;

‘এক দুই তিন চার

শেখ হাসিনা গদি ছাড়’;

‘লাখো শহীদের রক্তে কেনা

দেশটা কারো বাপের না’-

এর মতো কিছু স্লোগানও ওঠে। এমনকি ব্রিটিশবিরোধী লড়াইর সাড়া জাগানো ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগানটিও যেন এবার নতুন প্রাণ পেয়েছে।

এগুলো পত্রিকা কাভার করেছে বা করতে বাধ্য হয়েছে। মানুষের কথা কীভাবে কলমে চলে যায় বলা যায় না। তবে পত্রিকা কীভাবে ট্রিটমেন্ট দিয়েছে। তার কিছু নমুনা হাজির করছি। এ থেকে পাঠক ধারনা পাবেন গণমাধ্যমের ভাষাজ্ঞান ও জনগণের প্রতি দায় ও দরদ।

যুগান্তর ৫ আগস্ট লিখছে- ১৩ পুলিশকে ‘হত্যা’ আর ফেনীতে এক দফা কর্মসূচিতে সংঘর্ষ নিহত ৭। দেখা যাচ্ছে- পুলিশের ক্ষেত্রে ‘হত্যা’ আর ছাত্র-জনতার ক্ষেত্রে ‘নিহত’! পরদিন লিখছে- বিজয়ের দিনেও পুলিশের গুলি, হামলা, নিহত ১০৩ / রাজপথে ছাত্র-জনতার বিজয় উল্লাস, ভাষাভঙ্গি কতটা পরিবর্তন ঘটেছে।

অন্যদিকে আর একটি সংবাদের কয়েকটি নমুনা দিলাম। বিভিন্ন মামলায় ৪২ এইচএসসি পরিক্ষার্থীর জামিন আদেশ (জনকন্ঠ), আইনমন্ত্রীর উদ্যোগে ৪২ এইচএসসি পরীক্ষার্থীর জামিন (যুগান্তর), কোটা আন্দোলন : ৪২ এইচএসসি পরীক্ষার্থীর জামিন (নয়া দিগন্ত), কোটা আন্দোলন: কারাগারে থাকা ৪২ এইচএসসি পরীক্ষার্থীর জামিন (যমুনা টিভি), আন্দোলনে সহিংসতা: জামিন পেলেন ৪২ এইচএসসি পরীক্ষার্থী (বিডি নিউজ অনলাইন), কোটা সংস্কার আন্দোলন/ মামলায় জামিন পেলেন যেসব এইচএসসি পরীক্ষার্থী ও শিক্ষার্থী (প্রথম আলো)।

কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে সংঘাত, সংঘর্ষ ও সহিংসতার ঘটনায় করা মামলায় গ্রেপ্তার দেশের বিভিন্ন জেলার এইচএসসি পরীক্ষার্থী ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। অথচ জনকন্ঠ ও যুগান্তর পত্রিকা পড়ে বুঝার উপায় নেই, কেন তাদের জামিন কেন তাদের গ্রেফতার করেছে। এই হচ্ছে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা।

আর একটি দেখব- ৬ সমন্বয়ককে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করল ডিবি (ইত্তেফাক), ডিবি হেফাজত থেকে পরিবারের কাছে ৬ ‘সমন্বয়ক’- (বিডি নিউজ অনলাইন), ৬ সমন্বয়ককে ছেড়ে দিয়ে প্রহরায় না রাখার দাবি, নাগরিক সমাজ (প্রথম আলো)। কার শিরোনাম কেমন, কে কী এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে, বুঝা যায়?

শেষ আর একটি হাজির করি- মার্চ ফর জাস্টিস’ কর্মসূচি প– (জনকন্ঠ), পুলিশি বাঁধায় মার্চ ফর জাস্টিস কর্মসূচি প-, আটক ১৪ (ইনকিলাব), ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ কর্মসূচিতে পুলিশের বাধা- (বিডি নিউজ অনলাইন), মার্চ ফর জাস্টিস: বিভিন্ন জায়গায় মিছিল, পুলিশের বাধা- আটক (প্রথম আলো)

শিরোনামে বুঝা যায়, কে কার দিকে হেলে পড়ছে অথবা যথার্থটা তুলে আনছেন। ভাষা ও ভঙ্গিতে সীমাহীন লেজুড়বৃত্তির চর্চা পরিষ্কার। নিউজ ট্রিটমেন্টে আরও বুঝা যায় কার কী এজেন্ডা। এসব চর্চা দীর্ঘ সময় ধরে চর্চিত হতে হতে এখন প্রতিষ্ঠিত সেলফ সেন্সরশিপে রূপান্তরিত হয়েছে। অথচ বলা হয়- গণমাধ্যম আধুনিক সমাজের একটি অপরিহার্য অংশ। গণমাধ্যম জনগণকে প্রভাবিত করে, বিভিন্ন বিষয়ে সচেতন করে এবং স্বপ্ন দেখায়। গণমানুষ তাদের যাপিত জীবনের বিভিন্ন দিক নির্দেশনা পায় গণমাধ্যমের কাছ থেকে। সেই গণমাধ্যম অধরা!

পত্রিকাগুলোর মধ্যে কোন সমন্বয় নেই। যে যার মত করে বানান লিখছে। এমন বহু সংকটে চুপ অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, সাংবাদিক ও সম্পাদক। অনেক আগে মারা গেছেন অদ্ভুত উটের পিঠে চলছে স্বদেশের কবি, বেঁচে থেকেও চুপ দুঃশাসনবিরোধী কবিরা, কেউ কেউ মুখে কুলুপ এঁটে সুবিধা নিতে নিতে রীতিমতন রাজকবির পর্যায়ে পৌঁছে গেছেন।

তরুণ সাংবাদিকদের একটা অংশ জুলাইতে পেশাগত দায়িত্বপালনের সময় হামলার শিকার হয়েছেন। অনেককে শারীরিকভাবে নির্যাতন এবং কাজের সময় হাত থেকে ক্যামেরা ছিনিয়ে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে। আবার অফিস থেকে অসহযোগিতা পেয়েছেন এমন উদাহরণও আছে। সম্পাদক থেকে বার্তা প্রধান বা প্রধান প্রতিবেদক পর্যায়ের নেতারা বিক্রি হয়ে গেছে অনেক আগেই। তাদের কারণে প্রজন্মের পথচলা বিব্রতকর। শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি শহীদ সাংবাদিকদের।

আমরা আমরা বিগত সরকারের আমলে মিডিয়া হস্তক্ষেপ বা কণ্ঠরোধ করার সংস্কৃতি। এর মাঝেও জুলাই আন্দোলনের শুরু থেকে মাল্টিমিডিয়া সাংবাদিকরা ঝুঁকি নিয়ে কিছু কাজ করেছে। বিভিন্ন ক্যাম্পাসের খবর দিয়েছে।

সবচেয়ে খারাপ লাগার সংবাদ হচ্ছে- আন্দোলনে বিক্ষোভকারীদের ওপর চালানো গুলিতে পাঁচ সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। পুলিশের গুলিতে ১৮ই জুলাই হাসান মেহেদী নামের এক সাংবাদিক নিহত হন। তিনি ঢাকা টাইমস এই নিউজ পোর্টালে কর্মরত ছিলেন। ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে খবর সংগ্রহের সময় তিনি গুলিবিদ্ধ হন। একই দিনে ভোরের আওয়াজ নামের একটি দৈনিকের প্রতিবেদক শাকিল হোসাইন নিহত হন। ওই দিন দৈনিক নয়াদিগন্তের সিলেট প্রতিনিধি আবু তাহের মুহাম্মদ তুরাব নামের আরেক সাংবাদিক পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান। ২ আগস্ট তাহির জামান প্রিয় নামের আরেক ফ্রিল্যান্স ভিডিও সাংবাদিক গুলিবিদ্ধ হন। এর দুইদিন পর ৫ আগস্ট সিরাজগঞ্জে দৈনিক খবরপত্রের সাংবাদিক প্রদীপ কুমার ভৌমিক প্রাণ হারান। নিহত সাংবাদিকের সকলেই পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন। নিহতের পাশাপাশি অন্তত কয়েক ডজন সাংবাদিক আহত হয়েছেন।

আমি মনে করি শেখ হাসিনার চলে যাওয়াও কেবল তার দলের জন্য শিক্ষা না, সবার জন্য উচিৎ শিক্ষা। অহংকার ও শব্দের ব্যবহারে সতর্ক হতে হয়! না হলে কর্মের ফল হাতে হাতে পেতে হয়। সেই দীক্ষায় গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও সামাজিক সম্প্রীতি নিয়ে নতুন বাংলাদেশ নির্মাণে কাজ করে যেতে হবে। সজাগ থাকতে হবে চারপাশের গুজব নিয়েও। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন শেষ হয় না- এটা বিশেষ করে মনে রাখতে হবে সাংবাদিকদের।

এই সম্পর্কিত আরও আর্টিকেল দেখুন

একটি উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

সর্বাধিক পঠিত