Friday, April 17, 2026
হোমপ্রবন্ধকবির পাশে সমাহিত কবিতা

কবির পাশে সমাহিত কবিতা

 

আ.ন.ম উসামা বিন হাশেম

আমি চির-বিদ্রোহী-বীর-
আমি বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা চির উন্নত শির!

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ কবিতার এই কালজয়ী পঙক্তিগুলো যখন আমরা পড়ি, তখন আমাদের চোখের সামনে এক অদম্য তেজস্বী তরুণের অবয়ব ফুটে ওঠে। শত বছর আগে
নজরুল যে ‘উন্নত শির’-এর কথা বলে গেছেন, চব্বিশের জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশে সেই শির বা মস্তকের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি ছিলেন শহীদ শরীফ ওসমান বিন হাদি। তিনি কেবল একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবেই আমাদের সামনে হাজির হননি বরং তিনি হাজির ছিলেন যুগের এক প্রতিনিধি, এক দ্রোহের নাম হিসেবে।
নজরুল জীবদ্দশায় কলম ধরেছিলেন ব্রিটিশ শৃঙ্খলে পরাধীন এক জাতির মুক্তির জন্য, কবির সেই লাইনগুলোকে ধারণ করে ওসমান হাদি দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন ভারতীয় আধিপত্যবাদ এবং কালচারাল
ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে।

“আমি বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা চির উন্নত শির”
এই পঙক্তির জীবন্তরূপ ওসমান হাদি দেখিয়ে গিয়েছেন।

জুলাই বিপ্লবের পর যখন সুবিধাবাদীরা ক্ষমতার রস আস্বাদন করতে করতে তৃপ্তির ঢেকুর তুলছিল তখন সেই সুবিধাবাদীদের ভিড়ের বাহিরে তিনি একাই দাঁড়িয়ে বেছে নিয়েছিলেন বিপদের রাস্তা। যেখানে আপস ছিল সহজ, সেখানে তিনি প্রতিবাদকে বেছে নিয়েছিলেন। ওসমান হাদি প্রতিকূলে দাড়িয়েই উচ্চারণ করেন-

“জান দিব, কিন্তু জুলাই দেব না”।

নজরুল ব্রিটিশ উপনিবেশের পরাধীন মুসলিমজাতির শৃঙ্খল ভাঙতে কলম ধরেছিলেন, আর ওসমান হাদি স্বাধীন বাংলাদেশে ভারতীয় আধিপত্যবাদ আর ফ্যাসিবাদকে উপড়ে ফেলতে রাজপথ বেছে নিয়েছিলেন। যেন নজরুলেরই এক জীবন্তরূপ। হাদির রাজনীতিতে ছিল তাত্ত্বিক প্রজ্ঞা আর মাঠের লড়াইয়ের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ। জীবনের অর্জিত জ্ঞানকে তিনি ড্রয়িংরুমের আলোচনায় সীমাবদ্ধ না রেখে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন সাধারণ মানুষের মাঝে। ‘ইনকিলাব মঞ্চ’-এর মাধ্যমে তিনি যে জাগরণ তৈরি করেছিলেন, তা ছিল মূলত নজরুলের সেই ‘চির-বিদ্রোহী’ সত্তার আমাদের সময়ের সংস্করণ।

ওসমান হাদির রাজনৈতিক দর্শনের মূলে ছিল ইনসাফ ও জাতীয় সার্বভৌমত্ব। তিনি কেবল রাজপথের কর্মী ছিলেন না, বরং তাত্ত্বিকভাবেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত প্রখর। তিনি তার এই প্রজ্ঞার প্রখরতা ও দূরদর্শী দৃষ্টি থেকে বুঝতে পেরেছিলেন ফ্যাসিবাদী শক্তিকে কেবল রাজনৈতিক বক্তৃতা
বা তাৎক্ষণিক আন্দোলনের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে পরাজিত করা যাবে না বরং এর জন্য লাগবে আদর্শিক ও কালচারাল বিজয়। এই ভাবনা থেকেই গড়ে তুলেছিলেন “ইনক্বিলাব কালচারাল সেন্টার”। যার উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক প্রতিরোধের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রামের জন্য শাহবাগের কালচারাল ফ্যাসিজম এর বিরুদ্ধে একটি সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ফ্রন্ট তৈরি করা,যা দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক হেজিমনি বা আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করবে। এছাড়াও সমাজের বৃহৎ সামাজিক মনস্তত্ত্বে ভারতীয় আধিপত্যের যে বিষাক্ত ধোঁয়া ছড়িয়ে আছে সেটাকে দূর করবে।
ওসমান হাদি বিশ্বাস করতেন, “জুলাই বিপ্লব” আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিশেষ আমানত। এই বিপ্লব যদি ব্যার্থ হয় তাহলে বাংলাদেশের ভাগ্য দীর্ঘমেয়াদী অন্ধকারের কবলে পড়বে। তাঁর একাধিক বক্তব্যেও তিনি এই কথা বারবার উচ্চারণ করতেন এবং সত্যিই এই আমানত রক্ষার জন্য ওসমান জীবনকে বিলিয়ে দিতে পিছপা হননি। আমাদের দেশে রাজনীতিকদের কথার খই ফোটাতে কার্পণ্য করেন না
কোনদিনও, কিন্তু যখন আদর্শের জন্য নিজের জীবন বাজী রাখার কথা আসে তখন হ্যারিকেন দিয়েও তাদের খুজে পাওয়া দুষ্কর হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু ওসমান হাদি তো ছিল সত্যিকারের বীর। ওসমান হাদি সেই বিরল মানুষদের একজন যে নিজের আদর্শ এবং দেশের সার্বভৌমত্বের লড়াই এর জন্য নিজের জীবনকে বিলিয়ে দিতে কুণ্ঠাবোধ করে না। ১২ ডিসেম্বর বিজয়নগরে যখন গুলিবিদ্ধ হলেন, তখন ওসমান হাদী কেবল একজন এমপি প্রার্থী হিসেবে ভোট চাইছিলেন না; তিনি চাইছিলেন বিপ্লবের ঝাণ্ডাকে সমুন্নত রাখতে। ১৮ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরে তার নিথর দেহ যখন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করল, তখন বুঝা গেলো—ওসমান হাদি যা মুখে বলতেন, তা লালন করতেন হৃদয়ে। তিনি জান দিয়েছেন, কিন্তু জুলাইকে আপসের টেবিলে বিকিয়ে দেননি।
দ্রোহের কবি কাজী নজরুলকে ধারণ করা শহীদ শরীফ ওসমান বিন হাদি তার কর্ম ও আদর্শের মধ্য দিয়ে নজরুলের
সেই দ্রোহের চেতনাকে নিজের অস্তিত্বে মিশিয়ে নিয়েছিলেন। নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতার জীবন্ত রূপ হিসেবে তিনি আজ শায়িত আছেন তারই আদর্শের রাহবার জাতির দ্রোহের প্রতীক কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধি ঠিক পার্শ্বেই।
আমাদের শহীদ ওসমানকে স্মরণ করতে তাই আমরা বলতে
পারি,
কবির পাশে সমাহিত কবির “শ্রেষ্ঠ কবিতা”

লেখক: শিক্ষার্থী, ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়,কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ।

এই সম্পর্কিত আরও আর্টিকেল দেখুন

একটি উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

সর্বাধিক পঠিত