Friday, May 1, 2026
হোমপ্রবন্ধত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনী ফলাফল ও পর্যবেক্ষণ 

ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনী ফলাফল ও পর্যবেক্ষণ 

মুনিম মুবাশশির

গণতান্ত্রিক উত্তরণের প্রত্যাশা ও প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা পুনর্গঠনের প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে প্রতিভাত হয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থান এর ফলে দীর্ঘ ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদী আমলের পরিসমাপ্তি ঘটে। পরপর ৩ টা জাতীয় নির্বাচনকে কৌতুকে পরিণত করা বিগত সরকারের প্রায় সকল এমপি, মন্ত্রীরা নিজ দেশ থেকে পালাতে বাধ্য হয়। সন্ত্রাসী কার্যক্রমের জন্যে আওয়ামী লীগ এর দলীয় কার্যক্রমও নিষিদ্ধ করা হয়। ৫০ টি নিবন্ধিত দলের মধ্যে আওয়ামীলীগসহ ১০ টি দল এবারের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১২ কোটি ৭৭ লক্ষ নিবন্ধিত ভোটার ২৯৯টি সংসদীয় আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী ২,০২৮ জন প্রার্থীর মধ্য থেকে তাঁদের প্রতিনিধিকে নির্বাচিত করার সুযোগ লাভ করেন। দীর্ঘ সময় ধরে ন্যূনতম গ্রহণযোগ্যতা নির্বাচন অনুপস্থিত থাকার ফলে এ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উচ্চমাত্রার আগ্রহ ও প্রত্যাশা সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে এবারের নির্বাচনের ভোটারদের একটা বড় অংশ ফার্স্ট টাইম ভোটার হিসেবে ভোট প্রদান সম্পন্ন করেছেন। তাই নির্বাচনটি উৎসবমুখর পরিবেশেই সম্পন্ন হয়েছে বলে জনসাধারণ তাদের মতামত প্রকাশ করেছে। 

উল্লেখযোগ্য যে, নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলোর ১,৭৫৫ জন প্রার্থীর পাশাপাশি ২৭৩ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হন, যা প্রতিযোগিতামূলক বহুদলীয় অংশগ্রহণের একটি পরিসংখ্যানগত চিত্র উপস্থাপন করে। তবে একজন প্রার্থীর আকস্মিক মৃত্যুর কারণে শেরপুর-৩ আসনে ভোটগ্রহণ স্থগিত থাকায় অবশিষ্ট ২৯৯টি আসনে সকাল ৭:৩০ মিনিট থেকে বিকেল ৪:০০টা পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্নভাবে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়।

এ নির্বাচনের সাথে সমান্তরালভাবে একইদিনে রাষ্ট্র সংস্কার-সংক্রান্ত একটি গণভোট আয়োজন করা হয়, যা নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে কেবল প্রতিনিধিত্বমূলক ক্ষমতা হস্তান্তরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না রেখে প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তরের প্রশ্নের সাথে সংযুক্ত করে। নির্বাচন কমিশনের প্রাথমিক প্রতিবেদনে প্রায় ৬০ শতাংশ ভোটার উপস্থিতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যা অংশগ্রহণের মাত্রা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

উপর্যুক্ত প্রেক্ষাপটে, এ প্রবন্ধে নির্বাচনটির গুণগত মান, অংশগ্রহণের প্রকৃতি, প্রতিযোগিতার বাস্তবতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক নিরপেক্ষতার প্রশ্নসমূহের একটি বস্তুনিষ্ঠ ও বিশ্লেষণধর্মী পর্যালোচনা উপস্থাপনের প্রয়াস গ্রহণ করা হয়েছে।

নির্বাচনী পর্যবেক্ষণ: একটি সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ

১) শক্তিশালী সরকার গঠন:

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি মোট ২৯৯ আসনের মাঝে ২০৯ টি আসনে জয় লাভ করে। সংসদীয় রাজনীতিতে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা বা জোটবদ্ধ সংহতি সরকারকে নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত গ্রহণে একচ্ছত্র শক্তি প্রদান করেছে। এটি রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা দূর করে প্রশাসনে গতিশীলতা ফিরিয়ে আনছে। নবগঠিত সরকারের শক্তিশালী ম্যান্ডেট বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়া। একটি শক্তিশালী সরকারের অধীনেই কেবল দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও বৈদেশিক বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা সম্ভব। বিএনপি জোট থেকে মাত্র ২ জন এমপি জয় লাভ করেছেন যারা বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের, এবং বিএনপি ব্যতীত ভিন্ন কোনো দলের।

২) দ্বি-দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা:
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো কার্যকর দ্বি-দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার উত্থান। ওয়েস্টমিনস্টার পদ্ধতির একটি সীমাবদ্ধতা হচ্ছে বহুমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্রে খুব কম ভোট পেয়েও প্রার্থীর জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বিগত নির্বাচনগুলোতে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত ও জাতীয় পার্টি- এই চার দলের মধ্যে তুলনামূলক ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা লক্ষ করা যেত। তবে এবারের নির্বাচনে বিএনপি জোট ও জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট সম্মিলিতভাবে প্রায় ৯০% ভোট অর্জন করে এবং ২৮৯টি আসনে প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে, যা দ্বিমেরু রাজনীতির দিকে একটি কাঠামোগত রূপান্তরের ইঙ্গিত বহন করে। ৩য় বিশ্বের দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনে রাজনৈতিক দ্বি-দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বীতার চর্চা ইতিবাচক পরিবর্তন।

৩) তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা:
নির্বাচনে অধিকাংশ আসনেই প্রত্যাশার তুলনায় অধিক প্রতিযোগিতাপূর্ণ হয়েছে। বিএনপি জোট ও জামায়াত জোট এর প্রার্থীরা নির্বাচনে জয়ী হওয়ার জন্য একে উপরের সাথে তীব্র প্রতিযোগিতায় নেমেছিলো। অল্প কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা বাদ দিলে নির্বাচন কেন্দ্রিক সহিংসতা পূর্বের তুলনায় অনেকটাই কমেছে। জুলাই পরবর্তী বাংলাদেশে সাধারণ জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রত্যেক প্রার্থীকেই সর্বোচ্চ ইফোর্টস দিতে হয়েছে। এই প্রবণতা প্রতিযোগিতামূলক গণতন্ত্রের বিকাশে ইতিবাচক সূচক হিসেবে বিবেচ্য।

৪) নির্বাচনের মাঠে জামায়াতের শক্তিশালী উত্থান:
দীর্ঘ ৮০ বছরের বেশি সময় ধরে রাজনীতি করে আসা রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। অতীতে পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে সর্বোচ্চ ১২.৩ শতাংশ ভোট পেয়ে ১৮ টি আসনে জয়ী হয়। সরকারের অংশ হলেও একক নির্বাচনেও তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য সফলতা দেখতে পারেনি সংগঠনটি। সহযোগী শক্তি হিসেবে দীর্ঘদিন রাজনীতি করে আসা দল এবার প্রধানধারার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এর মাধ্যমে জামায়াত তাৎপর্যপূর্ণ সাফল্য প্রদর্শন করেছে। সিটি কর্পোরেশন অঞ্চলের ৪৫টি আসনের মধ্যে ১০টিতে জামায়াত জোটের জয় বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ উত্থান করে।

৫) ক্ষুদ্র দলগুলোর এলার্মিং ভোটের হার:
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী ৫০টি দলের মধ্যে মাত্র পাঁচটি দল এক শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছে(বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ)। ফলে তুলনামূলক ক্ষুদ্ দলগুলোর টিকে থাকার সম্ভাবনা সংকুচিত হয়েছে। প্রায় ৪৫ টা দলই দেশব্যাপী ১% এর নিচে জনসমর্থন পেয়েছে।

৬) স্বল্প ব্যবধানে নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণ:
এ নির্বাচনের বহু আসনে জয়ের ব্যবধান ছিল খুবই কম। ফলাফল নির্ধারণে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অনিশ্চয়তা বজায় ছিল। ইসির তথ্যানুযায়ী, প্রায় ২৩টি আসনে পাঁচ হাজারের কম ভোটের ব্যবধানে নির্বাচনী ফল নির্ধারিত হয়, যা নির্বাচনকে উচ্চমাত্রার প্রতিযোগিতাপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে। এই অনিশ্চয়তা আদর্শ নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ একটি নির্দেশক।

৭) স্বতন্ত্র প্রার্থীদের অগ্রগতি:
ত্রয়োদশ নির্বাচনে ভালো সংখ্যক স্বতন্ত্র প্রার্থীর বিজয় এ নির্বাচনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক। অধিকাংশই দলীয় মনোনয়নবঞ্চিত হলেও তাঁরা সংগঠিত দলীয় প্রার্থীদের সঙ্গে সমানতালে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়লাভ করেছেন। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে যে ৭ প্রার্থী জয়ী হয়েছেন, সকলেই বিএনপির সাথে কোনো না কোনো সময় যুক্ত ছিলো। এটি নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় তুলনামূলক সমান সুযোগ ও ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার কার্যকারিতা নির্দেশ করে। ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও ইউনিক নির্বাচনী প্রচারণার ফলে জাতীয় নির্বাচনের মতো গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে এই স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয় নিশ্চিত করেছে।

৭) অঞ্চলভেদে দলীয় প্রভাব ফলাফলেও লক্ষণীয়:
উক্ত নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অঞ্চলভেদে ফলাফলের একটা প্যাটার্ন লক্ষ্য করা যায়। খুলনা, রংপুর ও রাজশাহী বিভাগে ১১-দলীয় জোটের প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল, অন্যদিকে বিএনপি বিশেষ করে চট্টগ্রাম, সিলেট ও বরিশালে তাদের শক্তিশালী প্রভাব প্রদর্শন করে।

৮) বামদলগুলোর ললজ্জাজনক হার:
বাম ও আদর্শভিত্তিক দলগুলোর ভোট ও আসনপ্রাপ্তি ছিল অত্যন্ত সীমিত, যা তাদের সাংগঠনিক দূর্বলতা ও ভোটার-আকর্ষণের ঘাটতির প্রতিফলন। ফলে নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হলেও বাম রাজনীতির প্রভাব ছিল না বললেই চলে। বেশির ভাগ আসনে জামানত বাজেয়াপ্ত হয়ে লজ্জাজনক হারের অভিজ্ঞতা অর্জন করে। বাংলাদেশে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাম দলগুলোর প্রভাব ধীরে ধীরে কমে আসছে।

৯) কারসাজির অভিযোগ ও ভোট পুনর্গণনার দাবি:
নির্বাচনের রাতে ভোট গণনার সময় কিছু আসনে ফলাফল নিয়ে বেশ আপত্তি উঠতে থাকে। ভোট গণনাকে কেন্দ্র করে উভয় জোটই একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে থাকে। আলোচনায় আসে, “ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং” টার্মটা। আসলেই কি ইঞ্জিনিয়ারিং হয়েছে? হলেও সেটা কিভাবে হয়েছে? বিস্তারিত জানা যাবে ইলেকশনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ডাটা ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ফ্যাক্টর এর চুলচেড়া বিশ্লেষণ এর পরে। পরবর্তীতে প্রায় ৩০টি আসনে পুনর্গণনার দাবি উত্থাপিত হয়েছে। অভিযোগ উত্থাপিত হওয়া মানেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনিয়মের প্রমাণ নয়। তবুও এর ফলে নির্বাচনী স্বচ্ছতা নিয়ে আংশিক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।

১০) জাতীয় পার্টির হতাশাজনক ফলাফল:
এ নির্বাচনে প্রায় ১৯৯টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেও ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের ঘনিষ্ঠ মিত্র জাতীয় পার্টির ১ শতাংশেরও কম ভোট প্রাপ্তি তাদের রাজনৈতিক প্রভাবের তীব্র অবনমন নির্দেশ করে। অতীতে উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও এবারের নির্বাচনে তাদের ভরাডুবি ভোটার পছন্দের পুনর্বিন্যাস এবং নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের প্রতিফলন হিসেবে প্রতীয়মান। জাতীয় পার্টির শক্তিশালী ভূমি হিসেবে পরিচিত রংপুরেও হারের স্বাদ নিতে হয়।

লেখক: সাবেক সদস্য, দুদক সংস্কার কমিশন।

এই সম্পর্কিত আরও আর্টিকেল দেখুন

একটি উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

সর্বাধিক পঠিত