ক্যাম্পাস মিরর ডেস্ক
২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি—ঢাকার পিলখানায় তৎকালীন বাংলাদেশ রাইফেলস (বিডিআর) সদর দপ্তরে সংঘটিত বর্বর হত্যাযজ্ঞ বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ অধ্যায়গুলোর একটি। ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাসহ মোট ৭৪ জন মানুষ নির্মমভাবে নিহত হন। বিদ্রোহের নামে সংঘটিত এই হত্যাকাণ্ডের পর ১৭ বছর পার হয়ে গেছে, কিন্তু জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এখনো কেন এই হত্যাকাণ্ড কি কেবল একটি ‘বিদ্রোহ’, নাকি একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক ষড়যন্ত্র? এই প্রশ্নের জবাব সঠিকভাবে তুলে ধরেনি তা ভাবার বিষয়।
এখন আমাদের সামনে দেখার পালা, আগামী দিনে যারা জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় আসবে তারা সঠিক তদন্ত ও বিচার করে এর সত্যতা কতটুকু উন্মোচন করে। তবে আশার আলো হচ্ছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তদন্ত কমিশন যে প্রতিবেদন দিয়েছে সেটি সামনের দিনে সত্যকে উন্মোচিত করতে কাজ দিবে।
তদন্ত কমিশনের রিপোর্টে তৎকালীন সময়ে ঘটনার সাথে যারা জড়িত ছিল তাদের নাম উঠে এসেছে।
নির্দেশদাতা, গোপন সংশ্লিষ্টতা, পরিকল্পনা সহ নানান অভিযোগে পিলখানা হত্যাকাণ্ডে ১৭ জন রাজনৈতিক ব্যক্তির নাম উঠে এসেছে। তারা হলেন:
শেখ হাসিনা(পলাতক ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সভাপতি),ফজলে নূর তাপস,শেখ সেলিম,জাহাঙ্গীর কবির নানক,মির্জা আজম,কামরুল ইসলাম,সাহারা খাতুন,ওয়ারেসাত হোসেন বেলাল,মাহবুব আরা গিনি,আসাদুজ্জামান নূর,তানজীম আহমদ সোহেল তাজ,মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক,শাহীন সিদ্দিক,কর্নেল (অব.) মুহাম্মদ ফারুক খান,মেহের আফরোজ চুমকি,লেদার লিটন,মেজর (অব.), খন্দকার আব্দুল হাফিজ।
ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার সংশ্লিষ্টতা
তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে পিলখানা হত্যাকাণ্ডে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার সংশ্লিষ্টতার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতীয় পক্ষের সঙ্গে বৈঠকের পর পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয় এবং কয়েকজন রাজনৈতিক ব্যক্তির উপস্থিতির কথাও উঠে আসে। বিদ্রোহের সময় পিলখানায় হিন্দি ও ভিন্ন ভাষায় কথোপকথন শোনার দাবি করেছেন একাধিক সাক্ষী। পাশাপাশি, ওই সময়ে শতাধিক ভারতীয় পাসপোর্টধারীর আগমন–বহির্গমন সংক্রান্ত অসংগতি পাওয়া গেছে। এসব তথ্যকে ভারতের সম্পৃক্ততার সম্ভাব্য প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করে বিষয়টি আরও গভীর তদন্তের সুপারিশ করেছে কমিশন।
সামরিক বাহিনী, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার ৩০ কর্মকর্তার নাম
কমিশন সূত্র বলেছে, তদন্তে সামরিক বাহিনী, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার ৩০ জনের বেশি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন পর্যায়ের দায়িত্বহীনতা, অবহেলা ও সন্দেহজনক আচরণের অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনে তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদ, নৌবাহিনীর প্রধান ভাইস অ্যাডমিরাল জহির উদ্দীন আহম্মেদ, বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার মার্শাল এস এম জিয়াউর রহমানসহ ১২ জন সাবেক সামরিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। অন্য সাবেক সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন লে. জেনারেল (অব.) সিনা ইবনে জামালী, জেনারেল (অব.) আজিজ আহমেদ, লে. জেনারেল (অব.) মো. মইনুল ইসলাম, লে. জেনারেল (অব.) চৌধুরী হাসান সারওয়ার্দী, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আব্দুল হাকিম আজিজ, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. শামসুল আলম চৌধুরী, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ইমামুল হুদা, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মাহমুদ হোসেন ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মাহবুব সারোয়ার।
কমিশনের তদন্ত সূত্র বলছে, তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মইনের সিদ্ধান্ত এবং আচরণ হত্যাযজ্ঞের সঙ্গে তাঁর সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ দেয়। বিডিআরের ডিজি শাকিল পিলখানার ভয়াবহ পরিস্থিতি জানানোর পরও তিনি সেনা পাঠানোর স্পষ্ট নির্দেশ দেননি এবং যুক্তি দেন, অভিযান চালালে ভারতীয় বাহিনী দেশে প্রবেশ করতে পারে। জেনারেল (অব.) আজিজ আহমেদ সামরিক শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে ঘটনাস্থলে আওয়ামী লীগ নেতাদের নিয়ে যান।
এর বাইরে ডিজিএফআইয়ের সাবেক কর্মকর্তা লে. জেনারেল (অব.) মোল্লা ফজলে আকবর, লে. জেনারেল (অব.) মামুন খালেদ, মেজর জেনারেল (অব.) ইমরুল কায়েস ও মেজর জেনারেল (অব.) সুলতানুজ্জামান সালেহ উদ্দীন; এনএসআইয়ের সাবেক কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) শেখ মুনিরুল ইসলাম ও মেজর জেনারেল (অব.) টি এম জোবায়ের, র্যাবের চার কর্মকর্তা, বিডিআরের তিন কর্মকর্তা এবং পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে।
র্যাবের সাবেক ওই কর্মকর্তারা হলেন তৎকালীন ডিজি হাসান মাহমুদ খন্দকার, মেজর জেনারেল (অব.) রেজানুর রহমান খান, মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আজিম আহমেদ (তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত ডাইরেক্টর ইন্টেলিজেন্স)। কমিশন বলেছে, ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকেও তাঁরা র্যাবকে নিষ্ক্রিয় রেখেছেন।
বিডিআরের অভিযুক্ত তিন কর্মকর্তা হলেন কর্নেল (অব.) সাইদুল কবির, লে. কর্নেল (অব.) ফোরকান আহমদ এবং মেজর (অব.) গোলাম মাহবুবুল আলম চৌধুরী। দায়িত্বে অবহেলা, সত্য গোপন করা এবং অপরাধীদের পালানোর সুযোগ দেওয়ার অভিযোগ ওঠা পুলিশের কর্মকর্তারা হলেন সাবেক আইজিপি নূর মোহাম্মদ, তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার নাঈম আহমেদ, সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি (এসবি) ও বর্তমান আইজিপি বাহারুল আলম, সাবেক অতিরিক্ত আইজি মনিরুল ইসলাম, সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল কাহার আকন্দ ও তাঁর তদন্ত দল। তৎকালীন আইজিপির বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি শুধু নিজের মেয়ে ও কিছু পরিবারের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করায় দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছেন।
মিডিয়া ও রাষ্ট্রীয় নীরবতা
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘটনার সময় কিছু সংবাদমাধ্যম যাচাই ছাড়াই উত্তেজনাকর তথ্য প্রচার করে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে করে তোলে। পাশাপাশি, রাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ না করে এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক নীরবতা বজায় রাখে, যা সত্য উদ্ঘাটনের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
পিলখানা ট্র্যাজেডির সত্য উন্মোচিত না হওয়া রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতার ব্যর্থতাকেই প্রমাণ করে। সেই সাথে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম কি শুধু এটাকে নিছক ট্র্যাজেডি হিসেবে দেখবে নাকি এর আসল কোথায় গিয়ে ঠেকেছে তা দেখবে সে পর্যন্ত অপেক্ষা করবে? আর অপেক্ষার প্রহর কখন শেষ হবে তার হিসাব গুনতে থাকবে!
