দ্যা ক্যাম্পাস মিরর কথা বলেছে দৈনিক যুগান্তর সম্পাদক বিশিষ্ট নজরুল গবেষক কবি আবদুল হাই শিকদার স্যারের সাথে। তার কথায় উঠে এসেছে শৈশবের ঈদ স্মৃতি, সেসময়কার ঈদ সংস্কৃতি এবং বর্তমান সময়ের ঈদ সংস্কৃতির তফাৎ। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছে দ্যা ক্যাম্পাস মিররের সহকারী সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল মারুফ।
মিররঃ আসালামু আলাইকুম স্যার। কেমন আছেন?
আবদুল হাই শিকদারঃ ওয়ালাইকুম আসসালাম।আমি আছি বাংলাদেশের মতো।
মিররঃ বাংলাদেশের মতো! দেশের গতিপথ মুহূর্তে মুহূর্তে চেঞ্জ হচ্ছে।
আবদুল হাই শিকদারঃ আমারও চেঞ্জ হয়। দেশ যেভাবে চলে, আমরা তো সেভাবেই চলি।
মিররঃ শুরুতেই আমরা ক্যাম্পাস মিরর থেকে আপনাকে অগ্রিম ঈদের শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।
আবদুল হাই শিকদারঃআপনাদেরকেও ঈদ মোবারক।
মিররঃ শৈশবের কোন বিশেষ ঈদ স্মৃতি মনে পড়ে?
আবদুল হাই শিকদারঃ অনেক স্মৃতি আছে ঈদের। যেমন;আমাদের আব্বা যখন নতুন জামা-কাপড় কিনে দিতেন, আমরা ওই জামা-কাপড় আর জুতা কাউকে দেখতে দিতাম না;ভাবতাম ঈদের দিন দেখাবো। কিন্তু মাঝে মাঝে জুতা-জামা পরে বিছানার ওপর হাঁটাহাঁটি করতাম। জুতা নিয়ে নিচে নামলে তো জুতায় ময়লা লাগবে;এটা একটা খুব আনন্দের ব্যাপার ছিল। নতুন কাপড় পেয়ে আমরা খুব উদ্বেলিত হতাম, আনন্দিত হতাম। আর কাউকে না দেখিয়ে বিছানার ওপর জুতা পরে হাঁটা;এই মজাটাও ছিল।
মিররঃ বিছানার উপর হাটঁলে কেউ দেখলে?
আবদুল হাই শিকদারঃ মা দেখতেন, আব্বা দেখতেন;কিছু মনে করতেন না; উৎসাহ দিতেন। নতুন জুতা তো, ময়লা লাগেনি।
মিররঃ ঈদে সালামি দেওয়ার সংস্কৃতি কি আপনাদের শৈশবে ছিল কিনা?
আবদুল হাই শিকদারঃ এগুলো একটু নাগরিক কালচার ছিল। গ্রামবাংলার সাথে এইভাবে সম্পর্কটা নাই। আমরা এমনিতেই সালাম দিতাম। অনেক সময় মুরুব্বিরা সালামি দিলে সেটা দিয়ে বিকালবেলা কটকটি,মজা কিনে খেতাম।
মিররঃ চাঁদ রাতের উত্তেজনা তখন কেমন ছিল?
আবদুল হাই শিকদারঃ ওরে বাপরে বাপ! আমরা তো গ্রামের বাইরে চলে যেতাম;মাঠের মাঝখানে, বিলের মাঝখানে। শুকনা বিল তো বেশিরভাগ সময় থাকতো। গ্রামের যত ছেলেপেলে আছে সবাই বসে বসে চাঁদ দেখতাম;চাঁদ কোথায়? এইটা চাঁদের মতো লাগতেছে না? এটা চাঁদ না, ওইটা চাঁদ;এই করে মাগরিব পর্যন্ত চলতো চাঁদ খোঁজা। তারপর বাসায় গিয়ে ইফতার করে আবার মাঠে চলে আসতাম;এখন দেখা যায় কিনা। অন্ধকার হয়ে গেলে আবার খুঁজতাম। এই চাঁদ দেখার আনন্দটা ছিল অসাধারণ;মানে আর রোজা থাকতে হবে না, চাঁদ দেখা গেছে, নতুন চাঁদ!
মিররঃ ঈদের দিনের কোনো বিশেষ খাবার ছিল কিনা আপনাদের?
আবদুল হাই শিকদারঃ প্রচুর। আমাদের মা ছিলেন খুব অভিজাত পরিবারের মানুষ। মা নানান ধরনের ভ্যারাইটিজ রান্না করতেন; গুড়ের ক্ষীর, তারপর চিনি দিয়ে দুধ দিয়ে পায়েশ। আর আমাদের একটা প্রিয় খাবার ছিল গরুর ভুনা দিয়ে মুড়ি খাওয়া।
মিরর: গরুর ভুনা দিয়ে মুড়ি খাওয়া?
আবদুল হাই শিকদার: আমরা তো খুব শখ করে খেতাম। গরুর ভুনার মধ্যে একটু ঝোলঝোল থাকতো, ওটার মধ্যে মুড়ি মাখা;মজা করে খেতাম। তারপর গ্রামবাংলায় সকালবেলা এ বাড়ি-ও বাড়ি লেনদেন হতো;ওরা পায়েশ রান্না করে আমাদের বাড়িতে পাঠাল, আমরা আবার নিয়ে আরেক বাসায় দিয়ে আসলাম। এভাবে খুব আন্তরিক আর প্রাণবন্ত ঈদ উদযাপন করতাম।
মিররঃ বর্তমান সময়ের সংস্কৃতির মধ্যে বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করছেন কিনা?
আবদুল হাই শিকদারঃ লক্ষ্য তো করছি। এখন তো নানা রাজনীতিকরণ হয়েছে। যেমন গত ১৫ বছর ফ্যাসিবাদী শাসনে বাংলাদেশ যেভাবে পর্যুদস্ত হয়েছে; রাষ্ট্র আর রাজনীতি যখন দূষিত হয়ে যায়, তখন তার ছাপ পড়ে জীবনের সর্বস্তরে, সংস্কৃতিতেও। আমরা বিজাতীয় বা অপসংস্কৃতিকে নিজের সংস্কৃতি মনে করে নিজেদের সংস্কৃতিকে দূরে ঠেলে দিয়েছিলাম; এরকম টানাপোড়েন চলছে। এখনো দেখবেন;এই যে মোদির জামা-কোট গায়ে দিয়ে ঘুরে বেড়ায় বাংলাদেশের ছেলেরা; দেখলে খারাপ লাগে। জানেও না যে কোটটা যেখানেই জন্ম হোক, এখন “মোদি কোট” নামে ওয়ার্ল্ডওয়াইড ব্র্যান্ডেড। সবাই জেনে গেছে মোদির কোট। সেই কোট পরে আমাদের ছেলেপেলেরা ঘুরে বেড়ায়; এগুলো আগ্রাসনের এক একটা চিত্র।
জীবনে আমরা ভাবতেই পারতাম না যে ডিজে পার্টি হয়, ব্যান্ড হয়, ফুর্তির জন্য। আমাদের ঈদের আনন্দ ছিল সকালবেলা দল বেঁধে গোসল করে ফ্রেশ হয়ে নতুন জামাকাপড়-জুতা পরে ঈদগায় যেতাম। আমার আব্বা ছিলেন সরকারি কর্মকর্তা এবং এগ্রিকালচারিস্ট। অখণ্ড ভারতের ইতিহাসে আসাম থেকে যে দুই-তিনজন ছাত্র কৃষিতে গ্র্যাজুয়েশন করেছিল, তার একজন ছিলেন আমার বাবা। আব্বা হাই মাদ্রাসার ছাত্র ছিলেন। ফারসি, আরবি, উর্দু, ইংরেজি, বাংলা;অনর্গল বলতে পারতেন। আরবি স্পিকিং জানতেন।
আব্বা ঈদগায় গেলে ঈদের মূল খুতবার আগে বাংলায় ভাষণ দিতেন। এইটা শোনার জন্য গ্রামের মানুষ মুখিয়ে থাকতো। আব্বা যদি কোনো ঈদে বাড়ি আসতে না পারতেন, গ্রামজুড়ে হাহাকার পড়ে যেত;“উনি কোথায়?” এইসব বলতো। আমরা ঈদের নামাজ পড়তাম, আব্বা বক্তৃতা করতেন;আমরা খুব প্রাউড ফিল করতাম। আব্বা ফারসি-আরবি-উর্দু ও বাংলায় নানা কবিতার উদ্ধৃতি দিতেন;হাফিজের, শেখ সাদির; এগুলো দিয়ে বক্তৃতা করতেন।
ঈদগাহ থেকে বাড়ি ফিরে আসার পর দল বেঁধে বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেড়ানো, দৌড়াদৌড়ি, খেলা;নানান ঝামেলায় জড়িয়ে পড়তাম। অনেক সময় দুপুরের খাবারের কথাও ভুলে যেতাম। মাঠে ছোটাছুটি করতাম। ঈদের সময় গ্রামগুলোতে মেলার মতো বসতো;দুই-তিন গ্রামের মাঝখানে। আমরা দল বেঁধে যেতাম। খুব ব্যস্ত সময় কাটতো।
মিররঃ দুপুরে না খেয়ে বাসায় আসলে মা বকা দিত না?
আবদুল হাই শিকদারঃ ঈদের দিন তো! কান ধরে টানতো;“খাওয়া বাদ দিয়ে বাইরে ঘুরছিস কেন? এত সুস্বাদু রান্না বান্না করেছি; খা!”
আরেকটা জিনিস আমরা করতাম ছোটবেলায়। আমার আরেক বন্ধু ছিল;মাহমুদুল হাসান বুলবুল। আমরা দুই বন্ধুর নেতৃত্বে ভোরবেলা বেরিয়ে পড়তাম। আমাদের সাথে আরও ১০-১৫ জন ছেলে থাকতো। প্রত্যেক বাড়ি থেকে পায়েশ আর ক্ষীর জোগাড় করতাম। সবাই জানতো যে এই বাহিনী আসবে;ইয়াং বাহিনী। ক্ষীর-পায়েশ আমাদের হাঁড়ি ভরে যেত। মসজিদে রেখে আবার আরেক পাড়ায় যেতাম, সেখান থেকেও জোগাড় করে মসজিদে রাখতাম। ঈদের নামাজের পরে হুজুর সবার মধ্যে বিতরণ করে দিতেন। কলার পাতার মধ্যে বসে সবাই মজা করে খেত। এটা ছিল আমাদের তরুণদের একটা বড় কাজ;আমরা আনন্দ করে করতাম। আমার আব্বা খুব উৎসাহ দিতেন;ভালো কাজ তোমরা করতেছো। গরিব মানুষ অনেক সময় ঠিকমতো খেতে পারত না;দারিদ্র ছিল অসহনীয়। আব্বা দারুণভাবে সহযোগিতা করতেন। খাবার কম জুটলে আব্বা মাকে দিয়ে আলাদা রান্না করে মসজিদে পাঠাতেন।
মিররঃ ইয়াং বাহিনীর কোনো বিশেষ নাম ছিল কিনা?
আবদুল হাই শিকদারঃ আমরা কোনো নাম দিতাম না। সবাই বলতো; “বাচ্চু বাহিনী।” আমার ডাকনাম ছিল বাচ্চু;সবাই আদর করত বাচ্চু বাহিনীকে। মানুষ জানতো ছেলেগুলো ভালো;মানুষের খাওয়ার ব্যবস্থা করে। কোরবানির সময়ও এই কাজ করতাম;বাড়ি বাড়ি থেকে মাংস কালেকশন করে গরিবদের মধ্যে বিতরণ করতাম।
মিররঃ বর্তমানে ঈদে সাংস্কৃতিক দিকটা সরকারি মহল থেকে যেভাবে উপেক্ষিত থাকে; এ বিষয়ে মন্তব্য?
আবদুল হাই শিকদারঃ ঈদ তো ঈদই। কিন্তু গত ১৫ বছরের দুঃশাসনে ঈদকে করা হয়েছে রাজনীতিকরণ। ঈদের মাঠে খুতবার সময়ও দেখা যেত শেখ মুজিবের নাম চলে আসতো;ইসলাম প্রচারে শেখ মুজিবের অবদান; এমন অদ্ভুত কাণ্ডকারখানা হতো। লোক দেখানো হয়ে গেছে বেশি।
তারপরেও আমি মনে করি ঈদ তার সত্ত্বা হারায় নাই। কোথাও জানি আমাদের নিজস্বতা টিকে আছে। এর জন্য সাধারণ মানুষের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি।
মিররঃ তরুণদের জন্য সুস্থ সংস্কৃতির মাধ্যমে ঈদ উদযাপন নিয়ে কোনো বিশেষ বার্তা আছে?
আবদুল হাই শিকদারঃ বিশেষ বার্তা হলো;আমি মনে করি, আমাদের প্রফেট, আমাদের রসূলের জীবনকে অনুসরণ করা;তিনি ঈদের দিন সকালবেলা কী করতেন, সারাদিন কী করতেন;সেগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে সেই কাজগুলো করা খুব গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। ঈদ খালি ব্যক্তিগতভাবে খুশি হওয়া বা ফুর্তি করা না;সোসাইটির সবাইকে নিয়ে উদযাপনের আবহ তৈরি করতে হবে।
মিররঃ যেমনটি বলছিলেন;প্রতিবেশীদের মধ্যে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতেন, এখন সে সংস্কৃতি অনেকটা বিলুপ্ত। সেটা আবার কীভাবে ফিরিয়ে আনা যায়? শহরের কালচার ভিন্ন;শহরে যারা ঈদ উদযাপন করে তারা পাড়া-প্রতিবেশীদের সাথে মিশে না। এটা কিভাবে ফেরানো যায়?
আবদুল হাই শিকদারঃ এটা ফেরানোর প্রথম কথা হলো;আমার শৈশব কেটেছে ম্যাট্রিকুলেশন/এসএসসি পর্যন্ত পাকিস্তান আমলে। এইচএসসি পরীক্ষা দেওয়ার আগেই যুদ্ধ লেগে গেল। তারপর আমরা আসলাম বাংলাদেশে;ডিফারেন্ট হয়ে গেল জিনিসগুলো। পাকিস্তান আমলে গ্রামবাংলায় মানুষের আন্তরিকতা ছিল অঢেল। মানুষ মানুষকে সত্যি আন্তরিকভাবে ভালোবাসতো। মুক্তিযুদ্ধের পরে অতিমাত্রায় রাজনৈতিক ঝাঁজ ঢুকে গেল। অনেক গুরুত্বপূর্ণ হুজুর, যারা আগে ওয়াজ করতেন, ঈদের নামাজ পড়াতেন;তাদের অনুপস্থিতি ফিল করতাম।
এখন বাস্তব কারণেই মানুষ অনেক বেশি আত্মকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। আত্মকেন্দ্রিকতার প্রধান কারণ হলো রাষ্ট্র তাদের পাশে দাঁড়ায় না। রাষ্ট্র মানুষের জীবনের নিরাপত্তা দিতে পারে না, আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটেছে। আর ঈদের সময় দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। পৃথিবীতে মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র দেশ বাংলাদেশ;যেখানে ঈদের সময়, রোজার সময় জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে দেয় অসাধু ব্যবসায়ীরা। এটা নিষ্ঠুর অমানবিক আচরণ। পাকিস্তান আমলে আমি এটা কখনো দেখিনি। তখন জিনিসপত্রের দাম সহনীয় থাকতো। অনেক দোকানদার সেল দিত;যেমন ১০ টাকার জিনিস ৮ বা ৭ টাকায় দিত। চাল-ডাল-নুন-চিনি ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণে থাকতো। বাংলাদেশ হওয়ার পরে অসাধু ব্যবসায়ীদের সাথে যুক্ত হলো রাজনীতিবিদরা, রাজনীতিবিদদের সাথে যুক্ত হলো সামাজিক দুর্বৃত্তরা। এই অসাধু চক্র মানুষের ধর্মকে কেন্দ্র করে ধর্ম পালনের জায়গাটাকে সংকুচিত করে এবং ধর্মকে সামনে রেখে লোভের লালসায় সমাজকে দূষিত করে।
এই জায়গাগুলোকে এড্রেস করতে হবে। সুশৃঙ্খল গণতান্ত্রিক জীবন ফিরে আসলে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হলে, দ্রব্যমূল্য সহনীয় থাকলে;আস্তে আস্তে আমরা আবার আগের জায়গায় ফিরে যেতে পারব।
মিররঃ বর্তমানে এই প্রজন্ম চাঁদ রাতে ককটেল, বাজি ইত্যাদি ফোঁটায়, আপনাদ সময় এগুলো ছিল না। এ নিয়ে ছোট্ট বার্তা?
আবদুল হাই শিকদারঃ আমি ছোটখাটো বাজি ফোটানোকে অপরাধ হিসেবে দেখি না। ফেস্টিভালের একটা চেহারা দিতে হবে। এখন ধরেন বদরের যুদ্ধ হয়েছিল;সে যুদ্ধের অস্ত্র দিয়ে আজ আমেরিকার মোকাবেলা সম্ভব? না। তাহলে বদরের যুদ্ধ থেকে নিতে হবে শিক্ষা;স্পিরিট। সেই স্পিরিট নিয়ে এগোতে হবে। তারপর এটাকে মোকাবেলা করার মতো আধুনিকায়ন করা;বিজ্ঞানভিত্তিক জীবন, প্রযুক্তিকে সম্মান জানানো। তখন হয়তো আমরা স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরে যাব।
আর বাজি ফোটানো বা আতশবাজি যদি পাবলিক নুইসেন্স ক্রিয়েট না করে, জনজীবন ব্যাহত না করে;ইয়াং ছেলেরা ফুর্তি করার জন্য করে;এটা বাধা দেওয়াটা খুব বেশি প্রাসঙ্গিক মনে করি না। ইয়াংরা যদি ফুর্তি করতে না পারে, যাবে কোথায়? আমরা শবে বরাতে আগে তারাবাতি জ্বালাতাম, মজা করতাম। শিশুদের এই মজা থেকে বঞ্চিত করছে সমাজ। এক শ্রেণির কুপমণ্ডক হুজুর;সবাই না;এক শ্রেণির অন্ধ মাওলানা এগুলোর বিরুদ্ধে আজেবাজে কথা বলে।
আগে শবে বরাতে সারারাত রান্না করে বাড়ি বাড়ি রুটি বিতরণ হতো, হালুয়া বিতরণ;এগুলো সামাজিক আনন্দের অংশ ছিল। সারারাত মসজিদে নামাজ পড়তাম। এটাকে এখন নানা অজুহাতে ব্যাহত করা হয়েছে।
ভারতে যখন ইসলাম ঢুকলো, সুফি সাধকরা এসে দেখল এখানে নানা উৎসব;১২ মাসে ১৩ উৎসব। লোকদেরকে ফিরাতে হলে ফেস্টিভাল দিতে হবে, উৎসব দিতে হবে। আমাদের ছিল দুই ঈদ;তাছাড়া সারা বছরে আর কিছু নাই। তখনকার বিচক্ষণ ইসলামী দার্শনিক/ধর্ম প্রচারকরা এর সাথে যুক্ত করলেন মহররম, শবে বরাত, শবে কদর;ফেস্টিভালের চেহারা দিলেন। ধর্ম থাকলোই। কিন্তু সমাজের সবাইকে নিয়ে ইনজয় করার আবহ তৈরি হলো;বাড়ি বাড়ি রুটি বিতরণ। শবে বরাত নিয়ে নজরুলের কবিতা আছে, গোলাম মোস্তফার বিখ্যাত কবিতা আছে;এসব আমাদের পাঠ্য ছিল। এগুলো সামাজিকভাবে মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত না করলে অপরাধটা কোথায়?
মিররঃ এই বয়সে এসে শহুরে ঈদ কিভাবে উদযাপন করেন?
আবদুল হাই শিকদারঃ এখন তো আর সেই দিল্লিও নেই, সেই আগ্রাও নাই। এখনকার ঈদ বয়স্ক লোকদের ঈদ;সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে গোসল করে ফ্রেশ হয়ে জামাকাপড় পরে নামাজ পড়তে যাওয়া, তারপর এসে ঘুম। আত্মীয়স্বজন এলে তাদের সাথে আড্ডা, বন্ধুবান্ধব এলে আড্ডা। আমাদের এখন আর ওই জৌলুশটা থাকে না। কিন্তু শিশুরা যখন আনন্দ করে তখন ভালো লাগে।
আমি খুব আগ্রহ করে শিশুদের সালামির ব্যবস্থা করি। বিশেষ করে এক্সট্রা-অর্ডিনারি খাম রাখি;খামের মধ্যে কিছু টাকা (৫০০, ১০০০, বা ১০০/২০০);ব্যাংক থেকে চকচকা নোট এনে খামে ভরে গিফট করলে বাচ্চারা মহাখুশি হয়।
একটা উদাহরণ দিই;আব্বা বলতেন, যে শিশুরা সত্য কথা বলে, সৎপথে চলে, নামাজ পড়ে, ঈদগাহে যায়, জুম্মার নামাজ পড়ে;আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন এবং তাদের জন্য উপহার পাঠান। কী উপহার? অন্য উপহার তো আছেই;পরীক্ষার রেজাল্ট ভালো হবে, খেলতে ভালো পারবে;সব আছে। কিন্তু আরেকটা জিনিস;মাঝে মাঝে রহমতের ফেরেশতা দিয়ে আল্লাহ লজেন্স-চকলেট এসব বাড়িতে বাড়িতে দিয়ে যায়, আর যারা ভালো ছেলে তাদের বালিশের নিচে অনেক সময় থাকে।
একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে আমার ছোটটা চিৎকার শুরু করল;“আব্বা আব্বা, আমাদের বাড়িতে রহমতের ফেরেশতা আসছিল!” কী হয়েছে? “আমার বালিশের নিচে অনেকগুলো চকলেট!” তখন আব্বা বললেন;“দেখছো, তুমি কালকে নিয়ত করছিলা না;আজকে জুম্মার নামাজে আমার সাথে যাবে;আল্লাহ খুশি হয়ে এটা পাঠিয়ে দিয়েছে।”
মিররঃ আপনার ছোট ভাইয়ের উদাহরণ দিলেন; বাহ বাহ!।
আবদুল হাই শিকদারঃ হ্যাঁ, আব্বা আমাদের ভাই-বোনদেরকে উৎসাহিত করার জন্য এই কাজ করতেন। আমরা অবাক হয়ে ভাবতাম ফেরেশতা চকলেট দিয়ে গেছে। চকলেট ভালোবাসতাম। আব্বা কিনে এনে বালিশের নিচে রেখে দিতেন;রূপকথার মতো সাজিয়ে দিতেন;আর আমরা খুশির ঠেলায় মসজিদে যাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে যেতাম। রাতে বলতাম;“আল্লাহর কাছে আজ কী চাইবো;সকালবেলা যদি এরকম পাই কেমন হয়!” সকালে উঠে চকলেট পেতাম।
মিরর: অনেক বেশি ধন্যবাদ স্যার, ক্যাম্পাস মিররকে সময় দেওয়ার জন্য। আবারও ঈদের শুভেচ্ছা। আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।
আবদুল হাই শিকদারঃ ওয়ালাইকুম আসসালাম।
