বাজেট ২০২৪-২৮ঃ রাজনীতির বাজেট নাকি বাজেটের রাজনীতি

আজিজুল হক

দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আকারের বাজেট পাস হলো সংসদে, এমন একটি সময় বর্তমান অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী: জাতিকে উপহার দিলেন- যখন মূল্যস্ফীতির চাপ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পতন, ব্যাংক খাতে বিশৃঙ্খলা, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে দুর্বলতা ইত্যাদি সব ক্ষেত্রে যে অর্থনৈতিক সংকট বিরাজ করছে, এর ফলে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা আরও অনেক বেশি ভঙ্গুর হয়ে গেছে। সংবাদপত্রে উঠে আসা রিপোর্ট বলছে, নিত্যপণ্যের বাড়তি দামের কারণে কষ্টে আছে মানুষ।

মে মাসেও মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ শতাংশের কাছাকাছি। আছে ডলার-সংকট। এ কারণে পণ্য আমদানি সংকুচিত করে রাখা হয়েছে। গত বছরের মে মাসের তুলনায় এ বছরের মে মাসে রপ্তানি আয় কমে গেছে ১৬ শতাংশ। আবার রাজস্ব আয়েও ভালো প্রবৃদ্ধি নেই। বাড়ছে দেশি-বিদেশি দেনা পরিশোধের চাপ।

কিন্তু এতসবের পরেও, অর্থনীতির জটিল হিসাব-নিকাশ বোঝেন না শ্রমজীবীসহ সমাজের নিম্নআয়ের মানুষরা। ক্ষুধার তাড়নায় খাদ্য জোগাতে হিমশিম খাওয়া মানুষজন বোঝেন প্রতি বছর বাজেট মানেই ব্যয়ের নতুন নতুন খাত তৈরি হওয়া। তাই বাজেট নিয়ে তাদের উৎসাহ কম, বরং আতঙ্কটাই বেশি।

জাতীয় সংসদে বাজেট বক্তব্যের শুরুর দিকে অনেক প্রতিশ্রুতি থাকে, ভালো ভালো কথা থাকে। কিন্তু শুভংকরের ফাঁকিতে তা আর কাজে লাগানো হয় না। বরং সুবিধাবাদীদের স্বার্থ রক্ষায় বিভিন্ন ধরনের বিচিত্র সব করের প্রস্তাব দেয়া হয়। এ ধরনের নৈতিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তিহীন দর্শন যে বাজেটে থাকে, তাতে সংবিধানে উল্লেখিত বৈষম্যহীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তোলার মূল উদ্দেশ্য ধূলিসাৎ হয়ে যায়।

আমরা একটি দীর্ঘকাল ধরে দেশের অর্থনীতির চরকায় যে সুতো কাটতে দেখেছি- মোটাদাগে সেগুলোর নাম যদি আমরা ধরে নেই নীতিমালা: সেগুলো তিন ধরনের-নীতির ভ্রান্তি ও দুর্বলতা, নীতি গ্রহণে দ্বিধা-দ্বৈত নীতি। এসবের সুনিপুণ মেলবন্ধনে হয়েছে নীতির অসারতা- সারমর্ম হিসেবে যা অকার্যকর হয়ে গেছে। গত দুইটা বছর ধরে টানা নজিরবিহীন মূল্যস্ফীতি ও রিজার্ভ পতনে রাষ্ট্র নির্বিকার, মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনে নিদারুণ পুরবস্থা চলছে।

কিন্তু এই সংকটে আমরা কী নীতি গ্রহণ করলাম? সংকাটকালীন সময় কোনো উদ্ভাবনী নীতি কাজে আসে না, প্রথাগত নীতি বাস্তবায়ন করতে হয়। মূল্যস্ফীতি কমানোয় মৌলিক নীতি হলো বাজারে মুদ্রা সরবরাহ কমানো ও নির্দিষ্ট খাত অনুসারে সুদের হার বাড়িয়ে দেয়া। সারা বিশ্ব এ নীতি অনুসরণ করেছে। ভেঙে পড়া শ্রীলঙ্কা আমাদের সামনে ভুলন্ত আমরা তো এ এ পথে অগ্রসর হবো না। আমাদের খুল্লাম যুল্লা সুদহারের নয়-ছয় নীতি প্রণয়ন হয়। কাদের সঙ্গে আলাপ করে এটি করা হয়ে সেটিও আমরা জানি- যা এখন ওপেন সিক্রেট। কিন্তু এর ফলে কি বৈদেশিক বিনিয়োগ এসেছে? কিংবা বাজি খাতে কর্মসংস্থান বেড়েছে? উত্তর হচ্ছে, না, এমন কিছুই ঘটেনি। একদিকে আমরা বাজারভিত্তিক অর্থনীতির কথা বলছি, অন্যদিকে চরম নিয়ন্ত্রণমূলক অর্থনৈতিক নীতিমালা বজায় রেখেছি। যার ফলে মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরা যায়নি।

পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র শ্রীলংকার মূল্যস্ফীতি প্রায় ৭০ শতাংশে পৌঁছেছিল। শ্রীলংকা কীভাবে খাদ থেকে উত্তরণে সফল হলো? আমাদের দেশে বিরাজমান উচ্চ মূল্যস্ফীতিই বলে দিচ্ছে আমরা যথাসময়ে সঠিক নীতি গ্রহাণ ব্যর্থ হয়েছি।

অকার্যকর নীতি বাস্তবায়ন করতে চাওয়ার আরেকটি বড় উদাহরণ হলো বৈদেশিক মুদ্রার ব্যাপক রিজার্ভ পতন। আমাদের মোট জাতীয় রিজার্ভ ক্রমেই নিম্নমুখী। এ পরিস্থিতির কোনো দৃশ্যমান উন্নতি নেই। আমরা ডলার বিনিময় হারের বিপরীতে টাকার মূল্যমান ধরে রাখতে চেয়েছি যেন জিডিপিতে মাথাপিছু আয় বেশি দেখানো যায়। আমাদের পলিসিমেকারদের মধ্যে এটি এক ধরনের ধারণাগত ভুল। যেখানে বিশ্বের অন্যতম দোলাচালে থাকা রাষ্ট্রের তালিকায় ভারত, চীন, ভিয়েতনামসহ অন্য দেখ ডলারের বিপরীতে মুদ্রার মান অবমূল্যায়ন করল, সেখানে আমাদের দেশে দীর্ঘ সময় টাকা শক্তিশালী করে রাখা হয়। এরপর হঠাৎ করেই টাকার মানের অবমূল্যায়ন করা হলে সেই চাপ গিয়ে পড়ে আমদানিতে। রিজার্ভ ক্ষয় বাড়তে থাকে। পরবর্তী সময়ে এ পরিস্থিতি উন্নয়নের জন্য যেসব পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে (বাজারভিত্তিক সুদহার ও ক্রলিং গেগ) সেগুলোও সময়মতো গ্রহণ হ্যালি, হলেও অণেক দেরিতে গ্রহণ করা হয়েছে, সেটিও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) চাপে। অথচ দেশের অর্থনীতিবিদরা এসব সুপারিশ অনেক আগে থেকেই করে আসছেন যা গ্রহণে আমাদের এক ধরনের মানসিক প্রতিবন্ধকতা দেখা যায়।

মনে রাখা দরকার মুদ্রানীতি এককভাবে কাজ করে না। আর্থিক নীতির সামঞ্জস্যতা রক্ষা করা প্রয়োজন। অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে বিবেচনায় নেয়া হয়নি। সমন্বিত অর্থনৈতিক সূচকের দিক না তাকিয়ে আইএমএফের চাপে তাদের কথাই যোগ-বিয়োগ করে নতুন বাজেট করা হয়েছে এখানেও আইএমএফ কম আকারের বাজেট দিতে বলেছিলো, যা বাস্তবায়ন হয়নি কাগজ কলমেও।

ঘোষিত এই বাজেটে দুটি সমস্যাকে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দেয়া যেত মূল্যস্ফীতি কমানো ও সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দেয়া। প্রস্তাবিত বাজেটে উন্নয়ন বাজেট ও পরিচালন ব্যয় সমন্বয় করা হয়নি, উন্নয়ন বাজেটও কমানো যেত। কারণ জাতীয় সংকটের সময়ে সাধারণ ঐকিক নিয়মের মধ্যেই কৃচ্ছ্রসাধন হয়।

এই বাজেটের আরেকটি বিতর্কিত ব্যাপার হচ্ছে বড় বড় মেগা প্রকল্প নেয়া। অর্থনীতিবিদ এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতারা যেগুলো নিয়ে ব্যাপক কথাবার্তা বলছেন। এই মেগা প্রকল্পগুলোর মধ্যে চারটি এ বছর আর ছয়টি ২০২৫ সালে শেষ হওয়ার কথা। প্রতি প্রাক্কলিত ব্যায়ের বাইরে বরাদ্দ দিয়ে প্রকল্পগুলোকে চলমান রাখার তো কোনো দরকার নেই। বরং যেগুলো শেষের পথে কেবল সেগুলোর বরাদ্দ দিয়ে প্রকল্প দ্রুত সম্পন্ন করা যেত। পরিচালন ও উন্নয়ন বাজেট সমন্বয়ের অভাবে আসন্ন অর্থবছরেও বাজেট ঘাটতি রাখা হয়েছে জিডিপির ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। গত বছর এটি ছিল জিডিপির ৪ দশমিক ৭ শতাংশ। তাহলে মূল্যস্ফীতি কমানোর চেষ্টা কীভাবে করা হলো? আর মানুষকে স্বস্তি দেয়া যেত সামাজিক নিরাপত্তা খাতের বরাদ্দের মাধ্যমে। কিন্তু এ খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে মাত্র ১২ শতাংশ। সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর বিষয়টি যদি জিডিপির শেয়ারে বা মোট বাজেটের আকারে দেখিড়সামান্য একটু পরিবর্তন হয়েছে। বাজেটের হিসাবে দেখলে গত বছর যেটা ১৭ শতাংশ, এ বছর সেটা ১৭ দশমিক ১ শতাংশ। জিডিপির আকারে দেখলে সেক্ষেত্রেও সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী খাতে ২ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে ২ দশমিক ৪৩ শতাংশ বেড়েছে। কিন্তু এখানে শুভঙ্করের ফাঁকি আছে। এ খাতের বরাদ্দ ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানো হয়েছে।

বিস্তারিত দেখলে সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর মধ্যে রয়েছে সরকারি কর্মচারী ও তাদের পরিবারদের পেনশনের টাকা, সঞ্চয়পত্রের সুদের অর্থ, কৃষি খাতে ভর্তুকি, মুক্তিযোদ্ধাদের যে বিভিন্ন প্রকল্প রয়েছে সেগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এ খাতে। এগুলো করার ফলে এ খাতের বরাদ্দে একটা বড় অ্যামাউন্ট দেখা যায়। কিন্তু সেগুলো যদি বাদ দেয়া যায় তাহলে কিন্তু খুব একটা বাড়েনি, বরং কমেছে। তবে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে মূল্যস্ফীতি কমানোর জন্য সরকার বেশকিছু পণ্যের ওপর কর ছাড়ের প্রস্তাবও করেছে। এটি একটি ভালো প্রস্তাব। কিন্তু বিষয়টি হচ্ছে কীভাবে তা বাস্তবায়ন হবে। দেখা যায় কর কমানোর পর বাজারে পণ্যের দাম সেই অনুপাতে কমে না, এক্ষেত্রে বাজার ব্যবস্থাপনার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। করের দোহাই দিয়েই মূল্য বাড়িয়ে দেয়া হয়, বাজার মনিটরিং করা হয় না।

বাজেটের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে প্রতি বছরই জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে দেয়া লক্ষ্যমাত্রা ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে। যদিও রাজস্ব বোর্ডের ওপর দেয়া লক্ষ্যমাত্রা গত ১০ বছরে কোনোভাবেই পরিপালন করা সম্ভব হয়নি। চলতি বছরে যে লক্ষ্যমাত্রা দেয়া হয়েছিল সেটার তুলনায় আগামী অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হয়েছে। অথচ চলতি বছরের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ঘাটতি রয়ে গেছে। তাই লক্ষ্যমাত্রাটা বাস্তবসম্মতভাবে করা উচিত। রাজস্ব আহরণের জন্য অনেক প্রচেষ্টা দেখছি। দেশে উৎপাদিত বিভিন্ন জুসের ওপর, মোবাইল ফোনের টকটাইমের ওপর, পার্কে প্রবেশ ফির ওপরে দেয়া হচ্ছে। এগুলো তো ভোক্তাদের ওপরে গিয়ে পড়ে। বিদ্যমান কাঠামো দিয়ে বেশি রাজস্ব আহরণ সম্ভব নয়। এছাড়া করনীতি ও কর প্রশাসন এখনো আলাদা নয়। আবার অনেকে কর দিতেও চান, ভাবেন সৎভাবে বেঁচে থাকার কথা। কিন্তু তা নেয়ার সক্ষমতা নেই সরকারের। তাই কর কাঠামোর সংস্কার প্রয়োজন। কর কাঠামোর সঙ্গে প্রযুক্তির সংযোগ ঘটিয়ে এ ব্যবস্থার সরলীকরণ আবশ্যক। আরেকটি সংস্কারের কথা অর্থনীতিবিদরা সর্বদাই বলে আসছেন তা হলো ব্যাংক খাতের সংস্কার। ব্যাংক খাতকে অর্থনীতির ‘প্রাণকেন্দ্র’ বলা হয়। বিভিন্ন খাতকে চলমান রাখার জন্য দরকার ভালো ব্যাংক খাত। অথচ খাতটি ভঙ্গুর থেকে ভঙ্গুরতর হয়ে গেছে। এ খাতে সাধারণ মানুষের জন্য কিছু নেই, আস্থাও নেই। কিছু ব্যাংক আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে গড়িমসি করে। ব্যাংক খাত গোষ্ঠীস্বার্থ রক্ষা করে চলছে। এ খাতে চালু হয়েছে ঋণ পুনঃতফসিল করার সংস্কৃতি এবং নতুন নতুন কায়দায় তা করা হচ্ছে। ২ শতাংশ অর্থ জমা দিয়ে বারবার পুনঃতফসিল করার সুযোগ দেয়া হয়েছে কোনো ধরনের যাচাই-বাছাই ছাড়া। এতে মানুষের আস্থার জায়গাটা ভেঙে গেছে। জনপ্রতিনিধিরা কীভাবে তা ফিরিয়ে আনবেন, সেটাও এ বাজেটের একটা লক্ষ্য হওয়া উচিত।

আমরা কেবল প্রবৃদ্ধির কথা বলছি। কিন্তু এ প্রবৃদ্ধি আমাদের কী দিল? আয়বৈষম্য তো বাড়ছেই। পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টির সক্ষমতা কমে গেছে অর্থনীতির। বলা হচ্ছে, বেকারত্বের হার ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। এ হিসাব কীভাবে করা হয়, তা তো আমরা জানি। সপ্তাহে ১ ঘণ্টা কাজ করলেও তা যুক্ত হচ্ছে। বাস্তবে বেকারত্বের হার ১০ দশমিক ৬ শতাংশ। কিছুদিন আগে একটি পত্রিকায় এসেছে, চাকরির জন্য এসএসসি পাস দরকার, অথচ আবেদন বেশি এসেছে মাস্টার্স পাস প্রার্থীদের কাছ থেকে। এর পরও যে চাকরিগুলো সৃষ্টি হচ্ছে সেগুলো অনানুষ্ঠানিক খাতে। যতটুকু প্রবৃদ্ধি হয়েছে, তার বেশির ভাগই অনানুষ্ঠানিক খাত থেকে আসা। শিল্প খাতে ৯০ শতাংশের বেশি এবং সেবা খাতে ৬৭ শতাংশের বেশি অনানুষ্ঠানিক খাতের অবদান। অথচ অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মীদের আয় কম ও কাজের নিশ্চয়তা নেই। তবু বাজেটে শ্রমবাজার সংস্কারের কোনো লক্ষ্যমাত্রা নেই। আরেকটি সংস্কারের কথা না বললেই নয়ড়প্রশাসনিক সংস্কার। আগেও একবার বলেছি বড় বড় মেগা প্রকল্প সময়মতো শেষ হয় না। অথচ অর্থ বরাদ্দ হচ্ছে, ব্যয় হচ্ছে। এ খাতে জবাবদিহির সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। সরকারি সেবা দেব, কিন্তু জবাবদিহির বাইরে থাকব, তা ঠিক নয়। নিজেরা জবাবদিহির বাইরে থাকলে অন্যদের কীভাবে এর মধ্যে আনবেন? ক্ষমতাসীন ও দুর্নীতিবাজদের সুবিধা দেব, অন্যদেরও ছিটেফোঁটা এদিক-সেদিক দেব-এমন অনুমিতি ও দর্শনের ওপর ভিত্তি করেই বাজেট করা হয়েছে। অন্যরা তা গ্রহণ করলে করুক, চিৎকার করলে করুক, তা নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই সরকারের। এসব পদক্ষেপের নৈতিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তি নেই। নৈতিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তিকে অবজ্ঞা করে বৈষম্যমূলক সমাজ সৃষ্টির কাজ করা হচ্ছে।

রাষ্ট্রীয় সম্পদ, সৌভাগ্য তথা স্বাধীনতার সুফল সবার মধ্যে সুষম বণ্টন ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও সুনিশ্চিত সুশাসন এবং জবাবদিহির সুযোগ ছাড়া গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থা গড়ে ওঠে না। গণতান্ত্রিক মূলবোধ প্রতিষ্ঠায় অযুত ত্যাগ স্বীকারের প্রকৃত প্রতিফল অর্জন সম্ভব হয় না সুশাসন সুনিশ্চিত না হলে। সম্পদ অর্জনের নৈতিক ভিত্তি বা প্রক্রিয়া স্বচ্ছ না হলে বণ্টন ব্যবস্থাপনা সুষ্ঠু হয় না। সমাজে বণ্টনবৈষম্য দূর করতে সুশাসন প্রেরণা ও প্রভাবক ভূমিকা পালন করে থাকে। এটি দায়িত্ববোধ গড়ে তোলার জন্যও জরুরি। যেমন- আজকাল এক দেশ বা অর্থনীতির প্রচুর অর্থ বিদেশে কিংবা অন্য অর্থনীতিতে দেদার পাচার হয়ে থাকে। বিনা বিনিয়োগে বা বিনা পরিশ্রমে প্রকৃত পণ্য ও সেবা উৎপাদন ব্যতিরেকে অর্থ অর্জিত হলে অবৈধভাবে অর্জিত সেই অর্থ পাচার হবেই। অর্থ বৈধ পন্থায় উপার্জিত না হলে সে অর্থের মালিকানার প্রতি দায়-দায়িত্ববোধও গড়ে ওঠে না। জাতীয় ঐক্য ও সংহতি শক্তিশালীকরণেও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিমূলক পরিবেশের আবশ্যকতা রয়েছে। কেননা, সমাজে একপক্ষ বা কতিপয় ব্যক্তি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির মধ্যে থাকলে, আর বেশির ভাগের কারো কাছে কোনো জবাবদিহিতা না থাকলে অর্থাৎ একই যাত্রায় ভিন্ন আচরণে নিষ্ঠ হলে পারস্পরিক অভিযোগের নাট্যশালায় জাতীয় ঐক্য গড়ে ওঠে না। সমতা বিধানে, সবার প্রতি সমান আচরণের (যা গণতন্ত্রের মর্মবাণী) জন্যও স্বচ্ছতা তথা আস্থার পরিবেশ প্রয়োজন। আরেকটি বিষয়, সুশাসনের অবর্তমানে জবাবদিহিহীন পরিবেশে, আয়-ব্যয় ব্যবস্থাপনায় অস্বচ্ছতার অবয়বের অন্যতম প্রতিফল হলো দুর্নীতি। দুর্নীতি শুধু ব্যক্তিবিশেষ অর্থাৎ যে দুর্নীতি করে তাকে ন্যায়নীতিহীনতার জন্য ক্ষতিগ্রস্ত করে তা নয়, তার দ্বারা সমাজকে নেতৃত্বদান বা যেকোনো ক্ষেত্রে দৃঢ়চিত্ত অবস্থান গ্রহণে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালনকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে দেয়। সর্বত্র তাকে দুর্বল করে দেয়। দুর্নীতিবাজ নেতৃত্বের জন্য বা কারণে সমাজে আস্থার সঙ্কট সৃষ্টি হয়। নেতৃত্বের এ অধোগতির প্রেক্ষাপট প্রত্যক্ষভাবে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাবজনিত পরিবেশ নির্মাণ করে। নেতৃত্বের কার্যকলাপে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি না থাকলে সমাজে সংসারে সে নেতৃত্বের অধীনে আস্থার সঙ্কট সৃষ্টি হয়। এটি পরস্পর প্রযুক্ত সমস্যা। স্বচ্ছতা-জবাবদিহির অনুপস্থিতির অবসরে আত্মঘাতী পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যেমন- যেকোনো সেবা প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ। যেমন- স্বেচ্ছাচারিতায়, নানান অনিয়ম ও অবৈধ লেনদেনের মাধ্যমে শিক্ষায়তনে শিক্ষক, সুশীল সেবক, হাসপাতালে চিকিৎসক কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে কর্মীবাহিনী নিয়োগ। অর্থ বিনিময় ও নানান অনিয়মের কারণে যোগ্যতা ও মেধার ভিত্তিতে ভালো এবং যোগ্য সুশীল সেবক, চিকিৎসক, শিক্ষক, আইনরক্ষক নিয়োজিত হতে পারে না। সুশীল সেবক, চিকিৎসক অমেধাবী ও অযোগ্য শিক্ষক এবং আইন রক্ষকের কাছ থেকে গুণগত মানসম্পন্ন প্রশাসনিক সেবা, চিকিৎসা, শিক্ষা বা তালিম বা অনুসরণীয় আদর্শ লাভ সম্ভব হয় না। নানা আঙ্গিকে পরীক্ষা-পর্যালোচনায় দেখা যায়, শিক্ষক, চিকিৎসক, আইনজীবী, ব্যবসায়ী এমনকি চাকরিজীবীদেরও বাঞ্ছিতভাবে জবাবদিহির আওতায় আনা সম্ভব হয় না। অতিমাত্রায় কোটারি, সিন্ডিকেট বা দলীয় বা রাজনীতিকীকরণে পেশাজীবী, সংস্থা সংগঠন এবং এমনকি সুশীলসেবকরাও প্রজাতন্ত্রের হয়ে দলনিরপেক্ষ অবস্থানে থাকতে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে, গলদঘর্ম হতে হচ্ছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে এমন একটি পরিবেশ তৈরি হয় যার ছত্রছায়ায় বিভিন্নভাবে অবৈধ অর্জন চলতে এর পথ সুগম হতে পারে। সেবক প্রভুতে পরিণত হলে সম্পদ আত্মসাৎ, ক্ষমতার অপব্যবহারের দ্বারা অর্জিত অর্থ দখলের লড়াইয়ে অর্থায়িত হয়ে এভাবে একটি ঘূর্ণায়মান দুষ্টচক্রবলয় হয়ে থাকে। অর্থাৎ সুশাসনের অভাবে স্বচ্ছতার অস্বচ্ছতায় ঘুরেফিরে পুরো প্রক্রিয়া বিষিয়ে তোলে। সুতরাং সব ক্ষেত্রে সর্বাগ্রে উচিত স্বচ্ছতা-জবাবদিহি নিশ্চিত করা। এটি প্রয়োজন গণতন্ত্র ও সার্বিক উন্নয়নের স্বার্থে। বলার অপেক্ষা রাখে না, সুশাসন স্বচ্ছতা-জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে সত্যিকার উন্নয়ন হবে না। এটি পরস্পরের পরিপূরক। স্বচ্ছতার অস্বচ্ছতায় যে উন্নয়ন হয় তাতে জনগণের সুফল নিশ্চিত হয় না। এ উন্নয়নের কোনো উপযোগিতা বা রিটার্ন নেই। এটি এক ধরনের আত্মঘাতী ভেল্কিবাজি। জিডিপি প্রবৃদ্ধির মূল কথা হলো- যে অর্থই ব্যয় করা হোক না কেন, সেই আয়-ব্যয় বা ব্যবহারের দ্বারা অবশ্যই পণ্য ও সেবা উৎপাদিত হতে হবে। পণ্য ও সেবা উৎপাদনের লক্ষ্যে যে অর্থ আয় বা ব্যয় হবে সেটিই বৈধ। আর যে আয়-ব্যয় কোনো পণ্য ও সেবা উৎপাদন করে না সেটি অবৈধ, অপব্যয়, অপচয়। জিডিপিতে তার থাকে না কোনো ভূমিকা। আরো খোলাসা করে বলা যায়, যে আয় পণ্য ও সেবা উৎপাদনের মাধ্যমে অর্জিত হয় না এবং যে ব্যয়ের মাধ্যমে পণ্য ও সেবা উৎপাদিত হয় না সেই আয়-ব্যয় জিডিপিতে কোনো অবদান রাখে না। কোনো প্রকার শ্রম বা পুঁজি বিনিয়োগ ছাড়া মওকা যে আয় তা সম্পদ বণ্টন বৈষম্য সৃষ্টিই শুধু করে না সেভাবে অর্জিত অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রেও সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ধার ধারা হয় না। ফলে তা সৃষ্টি করে আর্থিক বিচ্যুতি। এভাবে যে অর্থ আয় বা খরচ করা হয় তা প্রকারান্তরে অর্থনীতিকে পঙ্গু ও পক্ষাঘাতগ্রস্ত করে।

-লেখক

কলামিস্ট ও অর্থনীতি বিশ্লেষক

অনিবার্য বিপ্লবের ইশতেহার’র কবি আসাদ বিন হাফিজ আর নেই

শরফুদ্দীন আহমেদ

‘অনিবার্য বিপ্লবের ইশতেহার’ খ্যাত কবি; বাংলা কে সাহিত্যের অন্যতম প্রধান ও ৮০-এর দশকের খ্যাতিমান কবি আসাদ বিন হাফিজ (৬৬) পহেলা জুলাই মহান রবের দরবারে পাড়ি জমিয়েছেন। আর আগের কয়েক দিন ধরেই তিনি জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে লাইফ সাপোর্টে ছিলেন। রোববার সন্ধ্যার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় শোকে ভেঙে পড়েন তার ভক্ত-অনুরাগীরা। দিবাগত রাত ১২টা ৫৫ মিনিটে আনুষ্ঠানিকভাবে তার মৃত্যুর সংবাদ ঘোষণা করেন চিকিৎসকরা। এ সংবাদে তার অনুরাগী অগণিত পাঠক, কবি, সাহিত্যিক ও সাস্কৃতিক কর্মীদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। খাতিম্যান এই কবি স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়েসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। পরদিন জোহর নামাজের পর জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে তার প্রথম নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।

নামাজে জানাজা শেষে তার লাশ নিজ গ্রামের বাড়ি গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার মোক্তারপুর ইউনিয়নের বড়গাঁও গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আসরের নামাজের পর দ্বিতীয় নামাজে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে বড় ভাই অধ্যাপক ইউসুফ আলীর কবরের পাশে তাকে দাফন করা হয়।

প্রিয় কবি ১৯৫৮ সনের ১ জানুয়ারি গাজীপুরের কালীগঞ্জের মোক্তারপুরের বড়গাঁও এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবে তিনি নিজ গ্রাম বড়গাঁও প্রাইমারি স্কুলে এবং বাড়ির পাশের

মক্তবে আরবি শেখেন। ১৯৮০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতক (সম্মান) ও ১৯৮৩ সালে বাংলা সাহিত্যে মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করেন তিনি। শিক্ষাজীবন শেষ করে তিনি বাংলার শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন তা’মীরুল মিল্লাত মাদরাসায়। পরে মানারাত স্কুল অ্যান্ড কলেজে বাংলার প্রভাষক পদে যোগদান করেন। এছাড়াও তিনি মাসিক পৃথিবী পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক, সাইমুম শিল্পীগোষ্ঠীর পরিচালক, বাংলা সাহিত্য পরিষদের নির্বাহী, প্রীতি প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সদস্য ছিলেন।

কবি ফররুখ আহমেদের অনুসারী কবি আসাদ বিন হাফিজ ছোটবেলা থেকেই ইসলামিক সাংস্কৃতিক চর্চায় মনোনিবেশ করেন। তারই ধারাবাহিকতায় তিনি তার সাহিত্যে বাংলার মুসলিম সমাজের পুনর্জাগরণ এবং বিপ্লবের অনুপ্রেরণা প্রকাশ করেছেন। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের সৃজনশীলতার পাশাপাশি তিনি সাহিত্যে ইসলামিক দৃষ্টিভঙ্গির ব্যবহারেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তার সাহিত্যে বিপ্লবী চিন্তা চেতনার প্রকাশ ঘটে। তিনি ইসলামী সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সাথে জড়িত ছিলেন।

কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, শিশুসাহিত্য, গবেষণা, সম্পাদনাসহ সাহিত্যের সব শাখাতেই তিনি অসামান্য প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। তার লেখা প্রায় ৮১টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। তার উল্লেখযোগ্য ও আলোচিত কাব্যগ্রন্থ ‘কি দেখো দাঁড়িয়ে একা সুহাসিনী ভোর’ এবং ‘অনিবার্য বিপ্লবের ইশতেহার’।

কবির সাহিত্য রচনার ভাষা অত্যন্ত সহজ-সরল, দুর্বোধ্যতামুক্ত। এ কবির কাব্যসৌধ গড়ে উঠেছে সুবোধ্যতার ভিতের ওপর। কবির শ্রেষ্ঠ রচনা হল ‘অনিবার্য বিপ্লবের ইশতেহার’। এই গ্রন্থে কবিতা ‘অনিবার্য বিপ্লবের ইশতেহার’ কবিতাটি সমগ্র বাংলা সাহিত্যের মধ্যেই একটি অন্যতম সেরা কবিতা। তিনি যে-সমাজের স্বপ্ন দেখেন তার অসাধারণ এক কাব্যিক রূপ দিয়েছেন এই কবিতায়। যা বাংলা সাহিত্যে আর কোনো কবির কলমে এ রকমভাবে ফুটে উঠেনি। তার এ কবিতার কয়েকটি চরণ-

“আমি আপনাদেরকে আরেকটি অনিবার্য বিপ্লবের জন্য

প্রস্তুতি নেয়ার কথা বলছি।

বিপ্লবে প্রতিটি নাগরিকের জীবন হয় যে

একেকজন যোদ্ধার জীবন

প্রাপ্ত বয়স্ক প্রতিটি মানুষ হয়

একেকজন আমূল বিপ্লবী

প্রতিটি যুবক

নারীর বাহুর পরিবর্তে স্বপ্ন দেখে উত্তপ্ত মেশিনগানের

আর রমণীরা

সুগন্ধি রুমালের পরিবর্তে পুরুষের হাতে তুলে দেয়

বুলেট, গ্রেনেড।”

উপরিউক্ত চরণগুলোতে কবির সাহিত্যিক দ্যোতনা প্রকাশ পেয়েছে। আবার কবির আদর্শের বিপ্লবের ব্যঞ্জনা ধ্বনিত হয়েছে নিম্নোক্ত চরণগুলোতে-

“আমি আমার জনগণকে

আসন্ন সেই বিপ্লবে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য উদাত্ত আহ্বান

জানাচ্ছি।

যেখানে অন্ধকার

সেখানেই বিপ্লব

যেখানে ক্লেদাক্ত পাপ ও পঙ্কিলতার সয়লাব সেখানেই বিপ্লব

যেখানে নগ্নতা ও বেহায়াপনার যুগল উল্লাস

সেখানেই বিপ্লব

যেখানে মিথ্যার ফানুস

সেখানেই বিপ্লব

বিপ্লব সকল জুলুম, অত্যাচার আর নির্যাতনের বিরুদ্ধে বিপ্লব অন্তরের প্রতিটি কুচিন্তা আর কুকর্মের বিরুদ্ধে।”

কাব্যগ্রন্থঃ ১. কি দেখো দাঁড়িয়ে একা সুহাসিনী ভোর (১৯৯০) ২. অনিবার্য বিপ্লবের ইশতেহার (১৯৯৬) শিশুতোষ গ্রন্থঃ ১. হরফ নিয়ে ছড়া (১৯৮৯) ২. আলোর হাসি ফুলের গান (১৯৯০) ৩. কুক কু রুকু (১৯৯২) ৪. ইয়াগো মিয়াগো (১৯৯৪) ৫. আল্লাহ মহান (২০০১) ৬. কারবালা কাহিনী (২০০১) অনুবাদ কাব্যগ্রন্থঃ ১. নাতিয়াতুন নবী (২০০৩) ছড়াঃ ১. রাজনীতি ধুমধাম (১৯৮০) ২. হিরালালের ছড়া (২০০৩) গবেষণা গ্রন্থঃ ১. আল-কুরআনের বিষয় অভিধান (১৯৯২) ২. ইসলামী সংস্কৃতি ৩. ছন্দের আসর ঐতিহাসিক গ্রন্থঃ ১. ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস (১৯৯০) গল্প গ্রন্থঃ ১. পনেরই অগাস্টের গল্প (১৯৯০) জীবনী গ্রন্থঃ ১. আপোষহীন এক সংগ্রামী নেতা (১৯৯২) ২. নাম তার ফররুখ (১৯৯৭) কিশোর সাহিত্য সম্পাদনাঃ ১. নতুন পৃথিবীর স্বপ্ন (১৯৯২) ২. আলোর পথে এসো (১৯৯৯) ঐতিহাসিক দুঃসাহসিক অভিযান সিরিজঃ ১. গাজী সালাউদ্দীনের দুঃসাহসিক অভিযান (১৯৯৭) ২. সালাউদ্দীনের কমান্ডো অভিযান (১৯৯৭) ৩. সুবাক দুর্গে আক্রমণ (১৯৯৭) ৮. ভয়ংকর শিরযন্ত্র (১৯৯৭) ৯. ভয়াল রজনী (১৯৯৮) ১০. আবারো সংগ্রাম (২০০০) ১১. দুর্গ পতন (২০০০) ১২. ফেরাউনের গুপ্তধন (২০০১) ১৩. উপকূলে সংঘর্ষ (২০০১) ১৪. সর্প কেল্লার খুনী (২০০১) ১৫. চারিদিকে চক্রান্ত (২০০২) ১৬. গোপন বিদ্রোহ (২০০২) ১৭. পাপের ফল (২০০২) ১৮. তুমুল লড়াই (২০০২) ১৯. উফ্র দরবেশ (২০০২) ২০. টার্গেট ফিলিস্তিন (২০০২) ২১. গাদ্দার (২০০৩) ২২. বিষাক্ত ছোবল (২০০৩) ২৩. খুনী চক্রের আস্তানায় (২০০৩) ২৪. পাল্টা ধাওয়া (২০০৩) ২৫. ধাপ্পাবাজ (২০০৪) ২৬. হেমস এসর যোদ্ধা (২০০৪) ২৭. ইহুদী কন্যা (২০০৪) ২৮. সামনে বৈরুত (২০০৪) ২৯. দূর্গম পাহাড় (২০০৪) ৩০. রক্তাক্ত মরুভূমি (২০০৪) ৩১. ছোট বেগম (২০০৬) ৩২. রক্তস্রোত (২০০৬) ৩৩. যাযাবর কন্যা (২০০৬) ৩৪. মহাসমর (২০০৬)

কবি আসাদ বিন হাফিজ তার বর্ণাঢ্য কর্মজীবনে সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ কলম সেনা পুরস্কার (১৯৯৪), কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন এমইউ আহমেদ পুরস্কার (১৯৯৭), বাংলাদেশ সাহিত্য সংস্কৃতি সংসদ পুরস্কার (১৯৯৭), ছড়ার ডাক পদক ও সম্মাননা (২০০৪), মেলোডি শিল্পীগোষ্ঠী পদক (২০০৪), কিশোরকণ্ঠ সাহিত্য পুরস্কার (২০০৪), গাজীপুর সংস্কৃতি পরিষদ কৃতী সংবর্ধনা (২০০৪), মরহুম ওমর ফারুক সম্মাননা স্মারক ‘কাব্যরত’ ২০১৬ ও সাহিত্যচর্চা সম্মাননা পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।

বাংলা ও ইসলামী সাহিত্যে তার অবদান অতুলনীয়।

খ্যাতিমান, বিশ্বাসী কবি ও সাহিত্যিক আসাদ বিন হাফিজের ইন্তেকালে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সাংবাদিক সংগঠন গভীর শোক প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছে। দ্যা ক্যাম্পাস মিরর পরিবারও গভীর শোক প্রকাশ করে রূহের মাগফিরাত কামনা করছে।

-লেখক

সম্পাদনা সহযোগী

দ্যা ক্যাম্পাস মিরর

নতুন আঙ্গিকে কোটা সংস্কার আন্দোলন

চার দফা দাবিতে চতুর্থ কোটা-সংস্কার আন্দোলন চলছে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে। দাবিগুলো হলো- ২০১৮ সালে ঘোষিত সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতি বাতিল ও মেধা ভিত্তিক নিয়োগের পরিপত্র বহাল রাখা; পরিপত্র বহাল সাপেক্ষে কমিশন গঠন পূর্বক দ্রুত সময়ের মধ্যে সরকারি চাকরির সমস্ত গ্রেডে অযৌক্তিক ও বৈষম্যমূলক কোটা বাদ দেওয়া (সুবিধা বঞ্চিত ও প্রতিবন্ধী ব্যতীত); সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় কোটা সুবিধা একাধিকবার ব্যবহার করা যাবে না এবং কোটায় যোগ্য প্রার্থী না পাওয়া গেলে শূন্যপদগুলোতে মেধা অনুযায়ী নিয়োগ দেওয়া এবং দুর্নীতিমুক্ত, নিরপেক্ষ ও মেধা ভিত্তিক আমলাতন্ত্র নিশ্চিত করতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

দেশের কোনও কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩০ জুন থেকে এ পর্যন্ত আন্দোলন চলছে। এতে করে ঢাকা-সহ সারা দেশের বিভিন্ন সড়ক মহাসড়কে ঘণ্টাব্যাপী তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়েছে। শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, তাদের সকল দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত এই কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।

ঢাকার বিভিন্ন পয়েন্টে আন্দোলন করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, শের-এ-বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়-সহ সরকারিকলেজের শিক্ষার্থীরাও

শুরুতে ৪ জুলাই বৃহস্পতিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও তার আশেপাশের কলেজগুলোর শিক্ষার্থীরা মিছিল শুরু করে। পরে তারা শাহবাগ মোড়ে অবস্থান নেয়, যা চলে এদিন সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা পর্যন্ত।

এদিন কয়েক হাজার শিক্ষার্থী শাহবাগ মোড়ে জড়ো হওয়ায় রাস্তাঘাটে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়েছিল। “কিন্তু আমরা এম্বুলেন্সের যাতায়াত ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছি” বলে জানান আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। এদিন শাবিপ্রবিতেও সকাল ১১টা থেকে দুপুর একটা পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করেছে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী এদিন আন্দোলনে শামিল হয়েছেন। তাদের এই আন্দোলনের কারণে রাঙ্গামাটি-চট্টগ্রাম সড়কে ১০ কিলোমিটার পর্যন্ত তীব্র যানজট হয়েছে।

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা মিলে এদিন দুপুর ১২টা সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত বরিশাল-পটুয়াখালী মহাসড়কে অবস্থান নেয়।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও কয়েক হাজার শিক্ষার্থী কোটাবিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে। তারা সকাল ১০টা থেকে দুপুর দুইটা পর্যন্ত এই আন্দোলন চলমান রাখে।

এদিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীয়া এক ঘণ্টা ধরে বন্ধ রাখেন ঢাকা-আরিচা মহাসড়কও। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের কারণে বন্ধ থাকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কও।

২০১৮ সাল পর্যন্ত সরকারি চাকরিতে ৫৬ শতাংশ কোটা প্রচলিত ছিল বাংলাদেশে। তার মাঝে ৩০ শতাংশই ছিল মুক্তিযোদ্ধা কোটা।

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ হাইকোর্টের এই রায় স্থগিত না করায় পূর্বের নিয়মানুযায়ী সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা আপাতত বহাল রয়েছে।

ওই বছরই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কোটা সংস্কারের দাবিতে কোটাবিরোধী আন্দোলন শুরু করে। শিক্ষার্থীদের দাবি ছিল যে কোটা ৫৬ শতাংশ না হয়ে ১০ শতাংশ করা হোক।

তাদের দাবির মুখে সে বছর সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা দেন পুরো কোটা পদ্ধতিই বাতিল করার, এর একটি পরিপত্র তখন জারি করেছিল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।

কিন্তু ২০২১ সালে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা ফিরে পাবার জন্য উচ্চ আদালতে রিট করেন এবং গত পাঁচই জুন প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে সরকারি চাকরিতে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিলের সরকারি সিদ্ধান্ত অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেয় হাইকোর্ট। তারপর হাইকোর্টের ওই রায় স্থগিত চেয়ে আপিল বিভাগে আবেদন করে রাষ্ট্রপক্ষ। বৃহস্পতিবার সকালে কোটার পক্ষের এক আইনজীবীর আবেদনের প্রেক্ষিতে শুনানি করেনি আদালত।

সুতরাং, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ হাইকোর্টের এই রায় স্থগিত না করায় পূর্বের নিয়মানুযায়ী সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা আপাতত বহাল রয়েছে।

হাইকোর্টের ওই রায়ের পর গত ছয় জুন থেকেই তা বাতিলের দাবিতে আন্দোলন করছেন শিক্ষার্থীরা। তবে কিছুদিন আন্দোলন চললেও মুসলিমদের অন্যতম বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদ-উল-আজহা চলে আসায় ২৯শে জুন পর্যন্ত আন্দোলন স্থগিত রাখেন শিক্ষার্থীরা।

এরপর গত ৩০শে জুন থেকে ফের আন্দোলন শুরু করেন তারা এবং পহেলা জুলাই থেকে এই আন্দোলন দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে।

“একটা চাকরিতে ১০০ আসন থাকলে ৫৬টি যদি রিজার্ভ থেকে যায়, তাহলে বাকী ৪৪টা সিটে আমরা ১০ হাজার মানুষ লড়াই করব। আর ঐ ৫৬টি সিটের জন্য তারা মাত্র দুই তিন হাজার জন লড়াই করবে। সাধারণ জনগণ তো এভাবে বৈষম্যের শিকার হতে পারে না। মুক্তিযুদ্ধ কোটা, এটা মুক্তিযোদ্ধা সন্তানদের পর্যন্ত মানা যায়। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-নাতনিদের পর্যন্ত মানা যায় না। আগে যখন আমরা পাকিস্তানের অধীনে ছিলাম, তখন পাকিস্তানিরা আমাদের চেয়ে বেশি কোটা নিতো। কিন্তু এখন স্বাধীন বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধারা বেশি কোটা নেয়। এভাবে চললে সাধারণ মানুষকে এগিয়ে নেওয়া যাবে না।” বলে মনে করেন আন্দোলনকারীরা। তারা আরও প্রশ্ন করেন, ‘দুই শতাংশ লোকের জন্য ৫৬ শতাংশ কোটা কীভাবে যৌক্তিক হয়?”

শিক্ষার্থীরা সমতার পক্ষে উল্লেখ করে আন্দোলনকারীরা বলেন, “কোটা পুনর্বহাল করার মাধ্যমে তো সুযোগের সমতা থাকল না। সংবিধানের ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদ খেলাপ করা হচ্ছে। মাত্র কয়েক শতাংশ মানুষের জন্য “৩০ শতাংশ কোটা কীভাবে সম্ভব?”, এই প্রশ্ন রাখেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কোটা-পদ্ধতি সংস্কার আন্দোলনে অংশ নেয়া শিক্ষার্থীরাও।

কোটা পদ্ধতির সংস্কারের লক্ষ্যে শিক্ষার্থীরা চার দফা দাবি জানিয়েছে। একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা জানিয়েছে তারা নিজেদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে এই দাবিগুলো তুলে ধরছে।

এর মধ্যে রয়েছে- ২০১৮ সালের পরিপত্র বহাল সাপেক্ষে কমিশন গঠন করে সরকারি চাকরিতে কোটাপদ্ধতি সংস্কার করা এবং কোটায় প্রার্থী না পাওয়া গেলে মেধা কোটায় শূন্যপদ পূরণ করা, একজন ব্যক্তি যেন তার জীবদ্দশায় সব ধরনের সরকারি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় একবার কোটা ব্যবহার করতে পারে, প্রতিটি জনশুমারির সাথে অর্থনৈতিক সমীক্ষার মাধ্যমে বিদ্যমান কোটার পুনর্মূল্যায়ন নিশ্চিত করা, দুর্নীতিমুক্ত, নিরপেক্ষ ও মেধাভিত্তিক আমলাতন্ত্র নিশ্চিত করতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

এসময় শিক্ষার্থীরা ‘সংবিধানের/মুক্তিযুদ্ধের মূলকথা, সুযোগের সমতা’, ‘সারা বাংলায় খবর দে, কোটা প্রথার কবর দে’, ‘দালালি না রাজপথ, রাজপথ রাজপথ,’ ‘আঠারোর হাতিয়ার, গর্জে উঠুক আরেকবার”, ‘জেগেছে রে জেগেছে, ছাত্রসমাজ জেগেছে’, ‘লেগেছে রে লেগেছে, রক্তে আগুন লেগেছে’, “কোটা প্রথা, বাতিল চাই বাতিল চাই’, ‘কোটা প্রথার বিরুদ্ধে, ডাইরেক্ট একশন’, ‘কোটা না মেধা, মেধা মেধা’, ‘আপস না সংগ্রাম, সংগ্রাম সংগ্রাম’, ‘মুক্তিযুদ্ধের বাংলায়, বৈষম্যের ঠাই নাই’ এমন স্লোগান দিতে থাকেন।

মিরর ডেস্ক

সম্পাদকীয়- জুলাই ২০২৪

প্রিয় পাঠক,

ক্যাম্পাস মিরর-এর আরও একটি চমৎকার পর্বে স্বাগতম। যেখানে আমরা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের ভেতর বাইরের; নাগরিক জীবনের প্রাণবন্ত অস্তিত্বের সাথে সাথে চাপ ও উদ্ভূত সমস্যাগুলি বলিষ্ঠভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছি।

প্রিয় পাঠক, চলতি বর্ষা মৌসুমের মধ্য দিয়ে চলার সাথে সাথে আমরা দেখতে পাচ্ছি তিলোত্তমা নগরের জলাবদ্ধতার বারবার সমস্যাটি আবার মাথা তুলেছে। খাল এবং জলাশয় বেদখল হয়ে যাওয়ায় দেখা দিয়েছে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা। নাগরিক জীবনকে স্বস্তি দিতে আমাদের নগর পরিকল্পনাবিদ এবং নগর কর্তৃপক্ষের অবশ্যই একটি টেকসই নিষ্কাশন ব্যবস্থা স্থাপন করতে হবে যাতে এই ধরনের বারবার চ্যালেঞ্জ প্রতিরোধ করা যায় এবং দখলকৃত খাল এবং ড্রেনেজ সিস্টেমকে পুনরুদ্ধার করা যায়।

অতি সম্প্রতি জাতীয় অর্থবছর ২০২৪-২৫ এর পাশ হওয়া বাজেট উল্লেখযোগ্যভাবে চারিদিকে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ছাত্র এবং ভবিষ্যত নেতা হিসেবে, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মূল ক্ষেত্রগুলিকে কার্যকরভাবে পরিচালনা করার জন্য আমাদের অবশ্যই বরাদ্দ এবং নীতিগুলি বিশ্লেষণ করতে হবে। ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের উপর বাজেটের ফোকাসকে আরও সুনির্দিষ্ট হতে হবে।

প্রিয় পাঠক, দেশজুরে আরো একটি ছাত্র আন্দোলন ডানা মেলেছে- কোটা সংস্কার আন্দোলন। ২০১৮ সালে মুক্তিযোদ্ধার নাতি নাতনিদেরকে দেয়া কোটা বাতিলের নির্বাহী সিদ্ধান্ত হাইকোর্ট বাতিল করে দেয় এবং আপিল বিভাগও সেটায় বহাল রাখে, ফলে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে সারা দেশের সবগুলো বিশ্ববিদ্যালয়, পুলিশ ও ছাত্রলীগ আওয়ামীলীগের গুলিতে প্রাণ যায় নির্বিচারে, অচল হয়ে যায় সারা দেশের প্রায় সকল গুরুত্বপূর্ণ জায়গা-সড়ক ও রেল পথ। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলি মূল সামাজিক আন্দোলনের কেন্দ্রস্থল। সাম্প্রতিক প্রায় সব যৌক্তিক ছাত্র আন্দোলন; কোটা সংস্কার আন্দোলন নিরাপদ সড়ক আন্দোলন থেকে নিয়ে প্রায় সকল ন্যায্য এবং ন্যায়সঙ্গত সুযোগের প্রয়োজনে উদ্দীপিত হয়েছে বারবার। আমাদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থান ব্যবস্থায় সংস্কারের বাধ্যতামূলক প্রয়োজনীয়তার উপর এই আন্দোলন জোর দেয়। এই প্রতিবাদগুলি আমাদের সম্মিলিত পদক্ষেপের শক্তি এবং ছাত্র, পলিসি মেকার এবং আইন আদালতের মধ্যে একটি খোলা আলোচনা বজায় রাখার গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দেয়।

পাঠক, সাহিত্য ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে, আমরা বিখ্যাত কবি আল মাহমুদকে তাঁর জন্মবার্ষিকীতে স্মরণ করছি, যার বাংলা সাহিত্যে অবদান প্রজন্ম থেকে প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে ঢলেছে। তিনি শেষ বাংলা মহাকাব্যের মহাকবি। একইসাথে আমরা আমাদের সাহিত্য সমাজের গভীর কন্ঠ কবি আসাদ বিন হাফিজের প্রয়াণে শোক প্রকাশ করছি। তাঁর লেখা আমাদের জাতীয় বোধ ও বিবেকের পারদকে আরও উঁচু স্থানে নিয়ে যাবে বলেই আমাদের প্রত্যাশা।

ক্যাম্পাস মিররের এই সংস্করণটি অর্থনিতি, রাজনীতি, সাহিত্য, স্বাস্থ্যসহ ছাত্রজীবন ঘনিষ্ঠ অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলিকে এক কাতারে এনে দাঁড় করিয়েছে: পাঠকদের আরও গভীরভাবে চিন্তা ও গবেষণা করার জন্য, আমাদের লেখক এবং কন্ট্রিবিউটরদের মতামত ও মন্তব্য উপস্থাপন করার জন্য সংখ্যাটি নিবেদিত। যথারীতি, আমরা আপনাকে আমাদের ম্যাগাজিনের বিষয়বস্তুতে অংশগ্রহণ করতে, আপনার চিন্তাভাবনাগুলি তুলে করতে এবং পরিবর্তন ও উন্নয়নের জোরালো কণ্ঠস্বর হতে আমন্ত্রণ জানাই।

Enhancing Your Credibility in Speeches

Saady Mohammad Saad

Introduction
Assalamu alaikum, everyone! Today, we’ll discuss an essential ingredient for effective public speaking: credibility. Whether you’re presenting in class, giving a keynote speech, or participating in a debate, your audience must trust and believe in you. So, how do you establish credibility?

Let’s break it down into three key strategies:

explaining your competence, establishing common ground, and delivering with fluency and conviction.


1. Explain Your Competence
First, you need to demonstrate your expertise on the topic. Why should the audience listen to you?

This doesn’t mean you have to be a world-renowned expert. Instead, share your knowledge, research, or personal experience. Let me give you an example: Imagine a student giving a speech about UFOs. Instead of just saying, “UFOs are interesting,” they could explain how they’ve spent months researching UFO sightings, reviewing expert opinions, and analyzing historical reports. That makes their argument credible.

As a speaker, you need to show your audience that you’ve put in the work and that you know what you’re talking about.


2. Establish Common Ground
Next, connect with your audience by showing that you understand and respect their values, concerns, and experiences. People are more likely to trust you when they feel like you’re “one of them.”

Let’s say you’re addressing a group of students about a potential tuition increase. Instead of jumping straight into financial jargon, start by acknowledging how everyone in the room values education quality and is concerned about affordability. You’re creating a bridge of trust by aligning your message with their shared experiences.

Remember, empathy and connection go a long way in building credibility.


3. Deliver with Fluency and Conviction
Finally, your delivery matters. You might have all the knowledge and empathy in the world, but if you sound uncertain or disinterested, you’ll lose your audience.

Practice is key. Rehearse your speech to ensure smooth transitions, a confident tone, and natural pacing. And, most importantly, believe in your message. Enthusiasm is contagious! If you’re passionate about your topic, your audience will feel it too.

A dynamic delivery shows that you’re not just reading off a script—you’re genuinely invested in your message.


Takeaway
So, to recap:

  • Competence: Show that you’ve done your homework.
  • Connection: Find common ground with your audience.
  • Conviction: Deliver your speech with confidence and enthusiasm.

These three elements—competence, connection, and conviction—form the foundation of credibility in speeches. Remember, a credible speaker isn’t just heard; they’re trusted.

writer,

Assistant editor, The Campus Mirror.

চিন্তায় চিন্তায় সময় নষ্ট


আমাদের জীবনের এক অমীমাংসিত বিষয় হচ্ছে সময়। সময় বলতে আমরা অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যৎ বুঝলেও বিজ্ঞান সময়কে একটু অন্যভাবে দেখে। অতীত কেবলই আমাদের স্মৃতি। বাস্তবে আমরা শুধু বর্তমানকেই দেখি আর বর্তমানের অভিজ্ঞতার আলোকে আমরা কোন ঘটনার ভবিষ্যৎ কল্পনা করতে পারি। সময় নিয়ে বিজ্ঞানে বিতর্কের শুরু নিউটনীয় পদার্থবিদ্যা বা ক্লাসিকাল পদার্থবিদ্যা থেকে যেখানে সময়কে ধ্রুব ধরা হয়েছিলো। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে আইনস্টাইন দেখান যে সময় ধ্রুব রাশি নয়। ‘বিগ ব্যাং’ এর সূচনাই সময়ের সূচনা। তখন থেকেই ঘটনার প্রবাহ মহাবিশ্বের অন্তিম পরিণতির দিকে ধাবিত হচ্ছে। তা পৃথিবীর হিসেবে আনুমানিক 13.8 বিলিয়ন বছর পূর্বে। এই সময়ের যেহেতু শুরু আছে তাহলে শেষটাও নিশ্চয়ই থাকার থাকা। যে বিন্দুতে এসে মহাবিশ্বের সকল ঘটনা ঘটে যাবে সেটাই সময়ের Ending Point. একটা সময় মহাবিশ্বের সকল শক্তি ভরে পরিনত হবে। সমস্ত কিছু ধীরে ধীরে ঠান্ডা হতে থাকবে। সমস্ত জায়গায় তাপমাত্রা একই বিন্দুতে চলে আসবে। সমস্ত নক্ষত্র নিভে যাবে। পুরো মহবিশ্বে শক্তি বলতে কিচ্ছু থাকবে না। তখন মহাবিশ্ব অন্ধকারাচ্ছন্ন অসীম ভর ছাড়া আর কিছুই নয়। এই point এ এসে সময় অর্থহীন হয়ে যাবে। আর কোনো ঘটনা ঘটার বাকি নেই। এখানেই সময়ের শেষ।

কেউ কেউ ভাবেন সময় বলে আসলে কিছু নেই। যেমন- সূর্য উঠেও না, অস্তও যায় না। আমরাই সূর্যের চারদিকে ঘুরি। অন্য ভাবে চিন্তা করলে- পৃথিবী সৃষ্টির আগেও সময় ছিল, পৃথিবী ধ্বংসের পরও সময় থাকবে। সময়কে ঘড়ি দিয়ে হিসেব করে কোন ফায়দা নেই। ঘড়ি অথবা ইতিহাস কিছুই সময়কে শেষ পর্যন্ত ধরে রাখতে পারবে না। সময় চলতে থাকবে অমীমাংসিত কোন রহস্যে।

এই যে রহস্যজনক এ সময় আমরা অতিবাহিত করছি, সেটা কি আসলেই আমারা কাজে লাগাতে পারছি? সময়কে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করছেন এর উপরই নির্ভর করছে আপনার জীবনের সফলতা/ব্যার্থতা। আমরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ জায়গা থেকে সময়কে নিজের মতো করে নিতে চাই। আমরা চাই সময় হোক স্ব-ময়। কিন্তু সেটা আমরা করতেইবা পারছি কজন? নিজেকে ঠিক যেখানটাতে রাখতে চেয়েছেন সেখানে কি আদৌ রাখতে পেরেছেন নিজেকে? নিজেকে দেয়া হাজারো প্রতিশ্রুতির কতটুকুই বা রক্ষা হয়েছে!

উইলিয়াম শেক্সপিয়ার এর একটা বিখ্যাত উক্তি আমরা অনেকেই জানি, যেটি হচ্ছে- আমি নষ্ট করেছি সময়, এখন সময় নষ্ট করছে আমায়।

একটু চিন্তা করলে দেখবেন যে আমাদের জীবনের অনেক সময় আমরা মনের অজান্তেই নষ্ট করে এসেছি, এখনো করছি এবং ভবিষ্যতেও নষ্ট হবে। সময় নষ্ট করার জন্য আমাদের সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা করে আমাদের মস্তিষ্ক। বিষয়টা এমন না যে আমরা অলসতার কারণে সময় নষ্ট করছি। আমাদের সময় নষ্ট হচ্ছে কারণ আমরা সময় সম্পর্কে অসচেতন। আমাদের অধিকাংশেরই জীবনের পারপাস এবং স্বচ্ছতা নেই। যার ফলে আমাদের সময় বেশি নষ্ট হচ্ছে। এমন নয় যে আপনি কোন এক দিকে তাকিয়ে আপনার দিন পার করে দিচ্ছেন অথবা চোখ বন্ধ করে থেকে দিন কাটাচ্ছেন। চিন্তা করে দেখুন আপনি এমন কিছুই করছেন যা আপনার মস্তিষ্ক কাজ বলে স্বীকৃতি দিচ্ছে এবং আপনিও সেটা সানন্দে করেই যাচ্ছেন।

ধরুন আপনি সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হতে চান। কিন্তু আপনি সারাদিনে আপনার রুম পরিষ্কার করছেন, অথবা এ সপ্তাহে কোন কোন পোশাক পরে ভার্সিটি যাবেন সেটার পরিকল্পনা করছেন, অথবা রান্না শিখছেন ইত্যাদি ইত্যাদি। কাজগুলো নিঃসন্দেহে ভালো, কিন্তু এই কাজগুলো আপনাকে আদৌতে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হতে কোন প্রকার সহযোগিতা করছে না। কাজগুলো প্রথম প্রথম আপনাকে আত্মতৃপ্তি দিলেও মাস দশেক অথবা বছর ঘুরতেই মনে হবে আপনি আপনার ট্রেক থেকে সরে গিয়েছেন। আপনি অনেকগুলো সময় নষ্ট করে ফেলেছেন এবং আপনাকে আবারও প্রথম থেকে শুরু করতে হবে।

বিষয়টা কারো কারো ক্ষেত্রে এমনও হতে পারে যে- আপনি সারাদিন খুবই প্রোডাক্টিভ কাজ করেছেন কিন্তু দিন শেষে আপনার কাছে মনে হচ্ছে আপনি সময় নষ্ট করছেন। কারণ একটাই, আপনি নিজের জন্য যে টার্গেট নির্ধারণ করেছেন আজকের দিনে আপনি সেই টার্গেট ফুলফিল করতে পারেননি।

আমাদের সবার জীবনেই কিছু না কিছু উদ্দেশ্য সেট করা আছে। আমরা কেউ ডাক্তার হতে চাই, কেউ ইঞ্জিনিয়ার, কেউ উদ্যোক্তা ইত্যাদি। এমন নয় যে আমাদের উদ্দেশ্য নেই বলেই সময় নষ্ট হচ্ছে। যেমন ধরুন- আপনি শীতের সকালে বাজার করতে যাবেন। বিছানা থেকে উঠেই ভাবছেন এই শীতের সকালে কি গায়ে দিয়ে বাজারে যাবেন, কি কি কিনবেন, বাজার থেকে আসতে কত সময় লাগবে, এসে কোন কাজগুলো করবেন ইত্যাদি ইত্যাদি। আসল বিষয় হচ্ছে আপনাকে বাজারে যেতে হবে এবং আপনি যাবেনও। কিন্তু মাঝখানে বসে বসে যে এই বেহুদা চিন্তা করে সময় নষ্ট করলেন তা কিন্তু আপনার মস্তিষ্ক কর্তৃক সায় দিয়েছে বলেই করেছেন। এই চিন্তাগুলো আপনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ, তবে বাস্তবে এর কোন ভ্যালু আপনার জীবনে যুক্ত হচ্ছে না। সুতরাং এই সময়টুকু আপনি চিন্তা করেই নষ্ট করলেন।

আমাদের সমগ্র শরীরের মধ্যে মস্তিষ্কই হচ্ছে সবচেয়ে সহজ-সরল ও বোকা প্রকৃতির। তাকে আপনি যেভাবে কমান্ড দেন, সেভাবেই সে পরিচালিত হয়। মস্তিষ্কে পজিটিভ বা নেগেটিভ যেরূপ ইনফরমেশনই পাঠানো হয়, মস্তিষ্ক সেরূপ তরঙ্গই সৃষ্টি করে এবং শরীরে তার প্রতিফলন ঘটায়। আমরা যখন মস্তিষ্কে নতুন ইনফরমেশন পাঠাই, তখন মস্তিষ্কের নিউরনের মধ্যে নতুন যোগাযোগের পথ তৈরি হয়।

মূলকথা হচ্ছে- আপনার ভালো চিন্তাই পারে সময়কে স্ব-ময় করতে। এজন্যই বলা হয়- Your thought is your energy and energy is the power। বাংলা প্রবচনেও আছে- যেমন চিন্তা তেমন কর্ম, যেমন কর্ম তেমন ফল। চিন্তাশক্তি দিয়েই মানুষ বড় হয়, সুখী হয়, সফল ও সমৃদ্ধ হয়। প্রকৃতপক্ষে মানুষ তত বেশি বড়, যার চিন্তার শক্তি যত বেশি। অর্থাৎ চিন্তার প্রখরতা-গভীরতা ও দূরদৃষ্টি যার যত বেশি, তিনি তত বড় মাপের মানুষ এবং তার জীবন তত সমৃদ্ধ। আবার চিন্তার দারিদ্র্যের কারণেই মানুষের জীবনে ঘটে এর উল্টোটা।

প্রতিটি মানুষ কমবেশি ভালো চিন্তা করে, আবার সচেতন বা অবচেতনভাবে খারাপ চিন্তাও করে; যদিও অধিকাংশ ক্ষেত্রে খারাপ চিন্তা করার কথা স্বীকার করতে চায় না। Positive চিন্তা মানুষকে Positive দিকে পরিচালিত করে, আর Negative চিন্তা মানুষকে নিয়ে যায় Negative পথে। সংগত কারণেই ভালো কাজের পূর্বশর্ত হলো ভালো ভালো চিন্তা। খারাপ বা Negative চিন্তা থেকে ভালো কাজ আশা করা যায় না। Positive thoughts & ideas beget positive results and negative thoughts beget negative results -এ সূত্র চিরন্তন এবং সব মানুষের ক্ষেত্রেই সমান প্রযোজ্য।

প্রশ্ন হতে পারে চিন্তা তাহলে কোথা থেকে আসে?
চিন্তার উৎস হচ্ছে মানুষের মস্তিষ্কে থাকা তথ্যভান্ডার; যে তথ্য সঞ্চয়নের শুরু মাতৃগর্ভে থাকা অবস্থায় মায়ের চিন্তা, শোনা ও বলা থেকে। প্রকৃতপক্ষে জন্মের পর থেকে এ ভান্ডার পরিপূর্ণ হতে থাকে; অনেকটা কম্পিউটারের মতো। কম্পিউটার আমাদেরকে যে আউটপুট দেয়, তা নির্ভর করে কম্পিউটারে আমরা যে ডাটা ইনপুট করেছি, সেই ডাটার ওপর। আমাদের ইনস্টল করা ডাটা ও সফটওয়্যারের বাইরে সে কোনোরূপ আউটপুট দিতে পারে না। তেমনি মস্তিষ্কে ডাটা ইন্সটলেশনের ওপর এবং মস্তিষ্কের গড়ন ও প্রকৃতির ওপর মানুষের চিন্তার ধরন ও গুণ নির্ভর করে। মস্তিষ্কে ভালো তথা Positive ডাটা ইনপুট হলে চিন্তার ধরন ভালো বা Positive হতে থাকবে, আর ডাটা খারাপ বা Negative হলে চিন্তা বা কর্ম নেতিবাচক বা খারাপ হতে থাকবে।

আমরা যা চিন্তা করি, তা-ই পরিণত হয় কর্মে। অনুরূপ কর্ম দীর্ঘমেয়াদে পরিণত হয় অভ্যাসে। অভ্যাসের মাধ্যমেই নির্ধারিত হয় ব্যক্তিত্বের ধরন। এই ব্যক্তিত্ব বা চরিত্রই আমাদেরকে পৌঁছে দেয় গন্তব্যে। সে গন্তব্য হতে পারে আগরতলা অথবা উগিরতলা; হতে পারে রাজরানি অথবা চাকরানি। তাই বলাই যায়, মানব জীবনে সফলতা বা ব্যর্থতার একক ও মূল চালিকাশক্তি হচ্ছে চিন্তা। চিন্তা শক্তির উন্নয়নের মাধ্যমেই মানুষের জীবনে ব্যাপক সাফল্যের দুয়ার উন্মোচিত হয়। তাই আমাদের চিন্তা সঠিক পথে পরিচালিত করা এবং মস্তিষ্কে থাকা অতীতের খারাপ তথ্যের স্থলে ভালো তথ্য ইনপুট করার কলাকৌশল জানা থাকলে যে কেউ সহজেই উন্নততর মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। Positive belief বা Positive thought -এর মাধ্যমে নিজের মধ্যে প্রচুর Energy তৈরি করা এবং সে Energy দিয়ে নিজকে Powerful being তথা শক্তিশালী মানুষরূপে গড়ে তোলা কঠিন কিছু নয়। আমরা নিজেরাও জানি আমরা সঠিক সময়ে সঠিক চিন্তা করছি না।

আমরা ভুলের মধ্যে আছি এবং ভুল করে সময়গুলো নষ্ট করছি। কিন্তু আসল সমস্যা হচ্ছে আমরা এই ভুলগুলোকে অভ্যাসে পরিণত করছি।

মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম রোমান
সাবেক সহকারী সম্পাদক,

দ্যা ক্যাম্পাস মিরর

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন : নতুন মোড়কে সাইবার নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ

0

শাহরুখ হোসেইন তন্ময়

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাংলাদেশের আইনি কাঠামোতে এক বহুল আলোচিত ও সমালোচিত অধ্যায়। স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের সংবিধান সর্বোচ্চ আইন, যার সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ যেকোনো আইন বাতিল বলে গণ্য হয়…

বাংলাদেশ স্বাধীন ও সার্বভৌম একটি রাষ্ট্র। সংবিধান হলো রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন। বাংলাদেশের সংবিধানের ৭(২) নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংবিধানের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ যেকোনো আইন বাতিল বলে গণ্য হবে। কোনো আইন তৈরি করতে হলে অবশ্যই এই বিষয়টি মাথায় রেখেই তৈরি করতে হবে অন্যথায় সেটি বাতিলযোগ্য বলে বিবেচিত হবে। 

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮ বহুল আলোচিত-সমালোচিত একটি আইন। বাংলাদেশ বা বিশ্বের যেকোনো দেশে বসে বাংলাদেশের কোন নাগরিক যদি এই আইন লঙ্ঘন করেন, তাহলেই তার বিরুদ্ধে এই আইনের অধীনে বিচার করা যাবে। এ আইন নিয়ে প্রথম থেকেই সর্বস্তরে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে পাস হওয়া ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন’ এর বিলে সই না করার জন্য তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদকে আহবান জানিয়েছিলেন সাংবাদিকদের আন্তর্জাতিক সংগঠন কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে)। সম্পাদক পরিষদ ইতোমধ্যে এ আইনটিকে প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা আইনের ৮,২১,২৫,২৮,২৯,৩১,৩২ ও ৪৩ ধারা নিয়ে আপত্তি জানায় যা সংবাদপত্র ও বাক স্বাধীনতাকে বিঘ্নিত করে। অথচ সংবিধানের ৩৯(২) নং অনুচ্ছেদ সংবাদপত্র ও ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতাকে নিশ্চিত করে। বর্তমান আইনমন্ত্রী এ আপত্তিগুলোকে যৌক্তিক বলে জানিয়ে তা সংশোধনের আশ্বাস দিয়েছিলেন। সম্প্রতি এটি সংশোধনের প্রস্তাব এসেছে। প্রস্তাবিত নতুন আইনের নাম হবে সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩। নতুন এই আইনে কিছু বিষয়ে সংশোধনীর কথা বলা হয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের দুটি ধারা যথা ২১ ও ২৮ ধারা বাতিলের আহবান জানিয়েছিল। প্রস্তাবিত আইনে এই দুটি ধারা বাতিল না করে সাজা ও জামিনের ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা হয়েছে। মূলত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে সবচেয়ে বড় সমালোচনার জায়গাই ছিল, যে কেউ যে কারোর বিরুদ্ধে এই আইনের অধীনে মামলা করতে পারবে যদিও সে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। যদিও প্রস্তাবিত আইনে মানহানির মামলায় কারাদণ্ডের বিষয়টি বাদ দিয়ে শুধু জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। এর কিছু ধারা অজামিনযোগ্য ছিল যেগুলোকে জামিনযোগ্য করা হয়েছে। তবে এতেও সংবাদপত্র ও ভাব প্রকাশের  স্বাধীনতা ব্যাহত হবে বলে মতামত ব্যক্ত করেছেন সাংবাদিকদের কিছু ইউনিয়ন। 

Credit: The Daily Star

প্রস্তাবিত সাইবার নিরাপত্তা আইনেও কিছু ত্রুটির কথা উল্লেখ করেছেন সচেতন মহল যা মৌলিক অধিকারকে খর্ব করে। সংবিধানের ২৬ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মৌলিক অধিকারের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ আইন বাতিল বলে গণ্য হবে। তাই কোনো আইন তৈরি করতে হলে এই বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় তা দেশ ও জাতির জন্য দুর্দশার কারণ হবে। বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক বার্কার বলেছেন, “আইনকে আদর্শ (Ideal) হতে হলে তা কেবল রাষ্ট্রীয় সংগঠন কর্তৃক স্বীকৃত, ঘোষিত ও প্রযোজ্য হলেই হবে না, তা ন্যায়সঙ্গত এবং যুক্তসংগতও হতে হবে।” তবেই তা দেশ ও জাতির জন্য কল্যাণজনক হবে। 

লেখক, শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি।

ট্রেন্ডিং জীবন ও প্রজন্ম :তৃতীয় নয়নে

ভাবলেশহীন একটা জীবন। এ যেন বানের পানিতে ভেসে চলা নিষ্প্রাণ খড়কুটো! বানের পানি যেদিকে যায়, নিষ্প্রাণ খড়কুটোগুলো সেদিকেই ভেসে চলে। 

আমাদের সমাজে প্রচলিত কথিত ট্রেন্ডগুলোর অবাধ গড্ডলিকা প্রবাহে ভাসতে ভাসতে এ প্রজন্মের তরুণেরা যেন দ্বীন থেকে যোজন যোজন মাইল দূরে হারিয়ে যাচ্ছে। সবচে ভয়ের কথা হলো যে, এ ব্যাপার দুটো যেন তরুণদের এক চক্রাবর্ত নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেন অদ্ভুত একটা প্যারাডক্স। তরুণেরা ট্রেন্ডের পেছনে ছুটছে বলে দ্বীন থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। আবার দ্বীন থেকে দূরে থাকার দরুণ না বুঝেই ট্রেন্ডের জোয়ারে ভাসছে!

এই ট্রেন্ড ফলো করার মিছিলের তালিকাটা অনেক দীর্ঘ। আমাদের তরুণেরা পা থেকে শুরু করে মাথা পর্যন্ত ট্রেন্ডের মোড়কে মুড়ে নিতে পারলেই নিজেকে স্মার্ট ভাবে । ঘুম থেকে ওঠা হতে শুরু করে আবার ঘুমোতে যাওয়া পর্যন্ত ট্রেন্ডসিক উম্মাদনায় মেতে থাকাকে প্রজন্মের তরুণেরা কুলনেস মনে করে । যেন ট্রেন্ড ফলো করতে পারাটাই জগতের বড় সফলতা!

এই অবাধ ট্রেন্ড ফলোয়িং-এর পেছনে খুব কমন একটা অজুহাত কাজ করে।

-‘ সবাই তো করে!! আমি না করলে কেমন দেখায়!সার্কেলের সবাই তো গেম খেলে। আমি না খেললে কেমন দেখায়! টাইম পাসের জন্য না হয় অল্প একটু গেম খেললাম আমি!’

জাস্ট এমন কিছু ভেবেই প্রজন্মের বড় একটা অংশ গেমিং ট্রেন্ডের অবাধ জলে নাকানি চুবানি খেয়ে বেড়াচ্ছে! সামান্যতম সিরিয়াস হয়ে এতোটুকু ভাবেনা যে আমি একটা গেমের একশোটা লেভেল শেষ করে এই পৃথিবীকে কি দিতে পারছি বা আমি নিজে কি পাচ্ছি! 

অবশ্য এই ট্রেন্ডসিক প্রজন্মকে নিয়ে সবচে বেশি আফসোস করেন আমাদের বড়রাই। সত্তর আশির দশকের কিশোরেরা শুধু আশাহত মুখ নিয়ে বলেই যান যে, প্রজন্ম গেল হায়! গেল হায়! অথচ তারা একটাবারও ভেবে দেখেন না যে, আমরা কি তাদের মত পেয়েছি অবারিত সবুজ মাঠ? গ্রীষ্মের ভরদুপুরে এলাকার সবচেয়ে বড় পুকুরটাতে ডুবসাঁতারের প্রতিযোগিতা করার সুযোগ? কিংবা সুযোগ পেয়েছি কি জোছনাস্নাত সন্ধ্যায় উঠোনে পাটি বিছিয়ে প্রাণভরে গল্প করবার?

কিভাবে পাবো আমরা? আমাদের কিশোরদের সকালের শিশির তো শুকিয়ে যায় কোনো এক কোচিং-এ ছুটতে ছুটতে! মিথ্যে বিনোদনে ভরা শ্রান্ত দুপুর শেষে বিকেলটাও কেটে যায় কোনো এক কোচিং-এ একজন কমার্শিয়াল মানুষের লেকচার নোট করতে করতে…। আর জোৎস্নাভরা সন্ধ্যাটা তো কবেই হোমটিউটরকে লিখে দিতে হয়েছে আমাদের! এই যে সুস্থ বিনোদনের উৎসগুলোকে যে পানিতে চুবিয়ে চুবিয়ে মেরে মেরে ফেলা হচ্ছে সেদিকেই বা ক’জন তাকান!

যেই ছেলেটি কোনো এক সান্ধ্য কোচিং-এ তার ব্যাচমেটকে রেড রোজ দিয়ে প্রোপোজ করে বলে 

-” উই’ল ইউ বি মাই লাইফ পার্টনার? “, সে জানে না  সাইমুম কিবা তিন গোয়েন্দা সিরিজের শিহরণ জাগানো রোমাঞ্চটুকু। সে জানে না কেবল একটা মেয়ের সম্ভ্রম রক্ষা করতে আরব সাগর পাড়ি দিয়ে সিন্ধুতে ছুটে আসা মুহাম্মদ বিন কাসিমের জলজ্যান্ত থ্রিলারটুকু। সে জানে না মুহাম্মাদ বিন কাসিমের জীবন গতিপথ বদলে দেয়া দুর্বিনীত মহাকাব্যের ফিকশনটুক! জানবে কি করে? সে তো টিভি সিরিজে রোমাঞ্চ বলে রেড রোজ ছাড়া আর কিছুই দেখেনি! থ্রিলার বলতে পাড়ায় পাড়ায় মাস্তানি করে বেড়ানো ছাড়া আর কিছুই জানেনি।

এ প্রজন্মের মুখ থুবড়ে পড়ার বড় একটি কারণ হলো সোশ্যাল মিডিয়ার অপব্যবহার। খালি গলায় অনুপম সুর তুলতে পারা মেয়েটিও হতাশ হয়ে যায় টিকটকে অটিজমসুলভ অঙ্গভঙ্গি করা মেয়েটার লাখখানেক ফলোয়ার দেখে। এলাকার ক্রিকেটে অনবদ্য ব্যাটিং করতে পারা বা ডুব সাঁতারে অনবদ্য সাঁতারু ছেলেটিও হতাশা বয়ে বেড়ায় ফ্রি ফায়ার আর পাবজিতে চিকেন ডিনার না পেয়ে।

ট্রেন্ডসিক তরুণদের দ্বীনবিমুখতা ও সামাজিক বিপর্যয়ের বিশ্লেষণ; স্মরণ করিয়ে দেয় দ্বীনের আলোয় জীবনের সার্থকতা ও আত্মশুদ্ধির পথ।

আবার, খুব সিরিয়াসলি চিন্তা করে এমন একদল তরুণও আছে আমাদের সমাজে । তবে তারা গা ভাসিয়েছে কথিত ক্যারিয়ার গঠন নামক ট্রেন্ডের জোয়ারে। নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে খুব করে ভাবলেও যেন দ্বীনের ব্যাপারে কোন খেয়ালই নেই তাদের। ক্যারিয়ার শব্দটা মাথায় এলেই একটা কবিতা মনে পড়ে…

 ” বাবার ইচ্ছে ইঞ্জিনিয়ার মায়ের ইচ্ছে ডাক্তারি,

  দাদু ইচ্ছে উকিল হব জেঠুর ইচ্ছে মাস্টারি

  ইচ্ছেগুলো কেমন যেন ভেবেই আমি ‘থ ‘

 কেউ আমায় বললে না তো খোকা মানুষ হ! “[১]

‘কাঞ্চন দাশের’ কবিতায় ‘খোকা’ তো মানুষ হতে চেয়েছিল, কিন্তু এখনকার খোকারা আর মানুষ তো হতে চায়ই না। ‘মুমিন’ তো অনেক দূরের কথা!

ট্রেন্ডের জোয়ারে ভাসতে থাকা তরুণদের সবচে ভয়াবহ রোগটি হল রোস্টিং আর ট্রলিং ট্রেন্ড। সোশ্যাল মিডিয়ায় আমরা একজন আরেকজনকে ক্ষেপিয়ে কিংবা রাগিয়ে প্রচুর আনন্দ পাই।অথচ এ প্রজন্মের আমরা এই আয়াতটি কখনো হৃদয় দিয়ে পড়িই-নি! 

وَيْلٌ لِّكُلِّ هُمَزَةٍ لُّمَزَةٍ”   

Woe to every scorner and mocker

 “উপস্থিতিতে কিংবা অনুপস্থিতিতে ,মানুষকে নিন্দাকারী প্রত্যেকের জন্য ধ্বংস” [২]

আর এই ট্রল কিবা রোস্টের মোড়কে ছোট্ট ছোট্ট অশ্লীলতাকে সমাজে একেবারে স্বাভাবিক করে তুলি আমরা। অথচ রবের এই বাণীটা কি কখনো আমরা হৃদয় দিয়ে পড়তে পেরেছি!

إِنَّ ٱلَّذِينَ يُحِبُّونَ أَن تَشِيعَ ٱلْفَٰحِشَةُ فِى ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ فِى ٱلدُّنْيَا وَٱلْءَاخِرَةِۚ وَٱللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ 

Indeed, those who like that immorality should be spread [or publicized] among those who have believed will have a painful punishment in this world and the Hereafter. And Allah knows and you do not know.

“নিশ্চয় যারা এটা পছন্দ করে যে, মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ুক, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখেরাতে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব। আর আল্লাহ জানেন এবং তোমরা জানো না।”[৩]

কেউ কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে হয়তো অশ্লীলতার প্রচার প্রসার চান না। তবুও অনেকেই স্রোতে গা ভাসিয়ে নিজের অজান্তেই অশ্লীলতার প্রোমোট করে বেড়ান। একবার ফেইসবুকে এক ফ্রেন্ডের পোস্টে এমন একটা অশ্লীলতার বিপক্ষে কমেন্ট করেছিলাম 

ও বলল,

– “আরে এত ছোট্ট একটা ব্যাপারকে এত বড় করে দেখছো কেন?” 

বললাম, ” জানো! মানুষ কখনও পাহাড়ের সাথে হোচট খায়না ছোট পাথরের সাথেই খায়”[৪]

তারপর মেসেঞ্জারে নক দিয়ে বলল,-

-” আচ্ছা তবে বড় পাপ করলে কি হোঁচট খেতে হবে না?” বললাম,বড় পাহাড়ের উপর থেকে ছিটকে পড়ে দৃশ্যটা কল্পনা করতে পারো!

ও চুপ হয়ে গেল। কিন্তু আমি থেমে গেলাম না। ফোনে সরাসরি কল দিয়ে বললাম,

-আচ্ছা, তোমাকে একটা কবিতা শোনাই।আমার লেখা নয়। ইবনুল মু’তাজের লেখা….

لا تحقرن صغيرة أن ,

الجبال من الحصى[৫]

আরবি পঙতি শুনে ও একটু হকচকিয়ে গেল। তারপর তার বাঙলায়নটুকুও শোনালাম।

 ” ‘ছোট পাপ’ বলে কিছু অবহেলা নয়, 

 ছোট নুড়িকণা মিলেই পর্বত হয়! “[৬]

তারপর ওর সাথে আরো কিছু কথা হলো। ওর কন্ঠে যেন অদ্ভুত এক ঘোরলাগা অনুভূতি টের পেলাম। নিজ থেকেই বলে উঠলো এখন থেকে এমনটা আর কখনোই করবেনা।

গল্পটাতো শুনলেন।ফেসবুকীয় এই অশ্লীলতাকে রোধ করতে আপনাকে ‘ডোর টু ডোর’ কাজ করতে হবে। নিজেকে পরিশুদ্ধ করার চেষ্টা চালানোর পাশাপাশি ধীরে ধীরে নিজের সার্কেলটাকেও পরিশুদ্ধ করার চেষ্টা করতে হবে। এভাবে এক সার্কেল থেকে অন্য সার্কেল চলতেই থাকবে পরিশুদ্ধতার জোয়ার।

যুগ পরিক্রমায় আমরা পথ চলতে চলতে পৌঁছেছি এক ভঙুর পাটাতনে। এখনকার সময়ে সবথেকে বড় ট্রেন্ড হলো একটা ব্র্যান্ডেড লাইফ লিড করা।একটা আসুসের ল্যাপটপ ছাড়া হয় নাকি! টপ মডেলের ফোন , শহরের সেরা ব্র্যান্ডের টি-শার্ট আর সু ছাড়া তো চলাই যায় না!

নিজের পা থেকে মাথা পর্যন্ত একটা করে ব্রান্ডের মোড়ক মুড়িয়ে দিতে পারলেই ভাবি, একটাই তো জীবন! এই জীবনে এতোটুকু ছাড়া আর কিবা দরকার!

এই তাল-লয়হীন জীবনটা নিয়ে আমরা আলাদা করে কিছুই ভাবি না। অথচ আমাদের জীবনাচারের প্রতিভাস হওয়া উচিত ছিল কুরআন ও সুন্নাহ। জীবন ব্যাকরণের অভিধা হওয়া উচিত ছিল একমাত্র ইসলামই!ফররুখের ‘ডাহুক’ কবিতায় আমরা ট্রেন্ড বর্জনের নিমন্ত্রণ পাই..

 “এই ম্লান কদর্য দলে তুমি নও

 তুমি বও

তোমার শৃঙ্খলমুক্ত পূর্ণ চিত্তে জীবনমৃত্যুর

পরিপূর্ণ সুর।”[৭]

কবি ফররুখের এই আমন্ত্রণে সাড়া দেয়া খুব দরকার। সত্যিই দরকার। কিন্তু কিভাবে…!

[দুই]

আমাদের তরুণ প্রজন্ম যখন অনিঃশেষ সমস্যার অথৈ জলে নাকানিচুবানি খায়, তখন একটু মাথা উঁচু করে তাকাবার চেষ্টা করি….

এ সমস্যার সমাধান কোথায়?? 

  • হ্যাঁ সমাধান আমাদের তরুণদের কাছেই আছে।

দ্বীন থেকে দূরে সরে গেলে জীবন অনিবার্যভাবেই উশৃংখল হয়ে পড়বে। এজন্য দরকার তরুণ প্রজন্মের সাথে দ্বীনের একটা শক্তিশালী সেতুবন্ধন। আর সেতুবন্ধন তৈরি করতে পারে দ্বীন নিয়ে চলা তরুণেরাই!

তরুণদের কাজ খুব বেশি নয়। শুধুমাত্র বন্ধুদের উঠতে বসতে দ্বীনের কথাটা স্মরণ করিয়ে দিতে হবে। বোঝাতে হবে জীবনাচারের সাথে দ্বীনকে যুক্ত করলেই জীবনটা হয়ে ওঠে সার্থক আর প্রাণোচ্ছল! তাদেরকে বোঝাতে হবে যে, স্বাদ আর বিস্বাদের মাঝে একটা স্থির বিন্দু আছে। সেই বিন্দুর খোঁজ পায় কেবল মুমিনরাই। এই স্থির বিন্দু মুমিনকে কখনোই অস্থির হতে দেয় না। ওয়াল্লাহি! এতেই কাজ হবে..। স্বয়ং প্রভুই বলে দিয়েছেন। 

“আপনি স্মরণ করিয়ে দিন নিশ্চয়ই এতে উপকার আছে” [৮]

প্রিয় নবীর হাদিসও আমাদের এ সমস্যা থেকে উত্তরণের পাঠ দেয়…।

” একটি বাণী হলেও তুমি পৌছে দাও”  [৯]

যতটুকু জানি ততটুকুই পৌঁছে দিতে হবে। বিশ্বাস করুন মাত্র একটি বাক্যই মানুষের জীবনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনে দিতে পারে। মহা সাইক্লোন হয়ে উড়িয়ে দিতে পারে হৃদয়ের অলিন্দে জমে থাকা ধুলোবালি আর মরচেপড়া সব আস্তরণ!

ওমর ইবনুল খাত্তাবকে তো নিশ্চয়ই চেনা আছে আপনার? কি এমন হয়েছিল তার সাথে জানা আছে? রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হত্যা করতে রওনা হওয়া ওমরেরর পাথর দিল গলে গিয়েছিলো কেবল একটা আয়াত শুনেই!! 

এক বাক্যের ধাক্কার একটা গল্প শোনা যাক। রুপকথার কোনো গল্প নয়।বরং সত্যিকারের গল্প। এক দেশে এক ডাকাত বাস করতো। সেই ডাকাতের ভয়ে এলাকাবাসীকে দিন রাত তটস্থ থাকতে হতো।কখন কি করে বসে! একবার এলাকার এক সুন্দরী রমনীর উপর সেই ডাকাতের নজর পড়লো। ধীরে ধীরে সেই সুন্দরী পড়শীর প্রেমে পড়ে গেলো সে। একদিন রাতে সেই মেয়েটির বাড়িতে ঢোকার জন্য মেয়েটির বাড়ির দিকে রওনা করলো সে। যখন সেই ডাকাত দেয়াল টপকে ভেতরে ঢুকছিলো ঠিক তখনই তার কানে অদ্ভুত এক সুর ভেসে এলো।সেই সুরের সাথে ভেসে আসা বাক্যবান তার অন্তরকে তছনছ করে দিলো।যেন মুহুর্তেই বদলে গেলো তার সব পাপের আকাঙ্খা। দূর থেকে সুললিত কন্ঠে কে যেন তেলাওয়াত করছে…

أَلَمْ يَأْنِ لِلَّذِينَ ءَامَنُوٓا۟ أَن تَخْشَعَ قُلُوبُهُمْ لِذِكْرِ ٱللَّهِ وَمَا نَزَلَ مِنَ ٱلْحَقِّ  

Has the time not come for those who have believed that their hearts should become humbly submissive at the remembrance of Allah and what has come down of the truth? 

“যারা ঈমান এনেছে তাদের হৃদয় কি আল্লাহর স্মরণে এবং যে সত্য নাযিল হয়েছে তার কারণে বিগলিত হওয়ার সময় হয়নি ?” [৯]

ব্যস! একটা আয়াতই তার অন্তরকে বিগলিত করে দিল। তিনি চিৎকার করে বলে উঠলেন অবশ্যই ফিরে আসার সময় হয়েছে। তার নাম ছিল ফুজাইল ইবনু ইয়াজ। তিনি ছিলেন একজন বিখ্যাত তাবেয়ী। একটি আয়াতেই যেন তার জীবন বদলে গিয়েছিলো।রবের স্মরণে বিগলিত হয়েছিল তার হৃদয়! [১১]

এই গল্পটা বলার একটা কারণ আছে। প্রজন্মের তরুণেরা ট্রেন্ডের সাগরে ডুবসাতার দিয়ে জীবনের প্রাপ্তি খোঁজে, জীবনের সফলতা খুঁজে বেড়ায় ক্যারিয়ার গঠন নামক মরিচিকার ফাঁদে পড়ে এক গাদা তোতাবুলি শেখার মাধ্যমে।অথচ অনন্ত কালের প্রকৃত প্রাপ্তির সমীকরণটাই যেন তাদের কাছে অজানা। এইযে সাদামাটা জীবনাচারের সাথে দ্বীনের যোগফলটা যে প্রাপ্তি আর প্রতিফলে ভরপুর, এটাই বোঝাতে হবে দ্বীনবিমুখী তরুণ প্রজন্মকে। জাস্ট মনে করিয়ে দিতে হবে। একটা রিমাইন্ডারই অন্তরে ঝড় তুলতে পারে। জাগিয়ে তুলতে পারে ঘুমন্ত হৃদয়কে।

ট্রেন্ডসিক প্রজন্মকে সমাধানের পথ দেখাতে দ্বীনকে ছড়িয়ে দিতে হবে। হোক সেটা সোশ্যাল মিডিয়ায়, ফ্রেন্ড সার্কেলের আড্ডায় অথবা সাহিত্য রচনায়। নিজেকে একজন ভ্রাম্যামান দাওয়াহ সেন্টার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।এ দায়িত্ব আমার আপনার সকলেরই।

কোনো মতাদর্শ প্রচারের সবচে বুদ্ধিদীপ্ত উপায় হলো সেই মতাদর্শকে জীবন্ত করে তোলা। একটা বাস্তবিক অবয়বে সেই মতাদর্শের সরুপ ফুটিয়ে তোলা।নিজের ভেতরে ইসলামের সরূপ ফুটিয়ে তুলতে শুরু করে দিন। ইনশাআল্লাহ আপনার কথাগুলো কান ভেদ করে অন্তরে পৌছে যাবে। কাজ করতে করতে হতাশ হবারও কোনো সুযোগ নেই। আমার আপনার রব অন্তর দেখতে পারেন। আপনার আমার প্রচেষ্টাই সুনবুলার[১২] মতো সাতশ গুন হয়ে প্রতিদান হিসেবে জমা হয়ে থাকবে। ইনশাআল্লাহ 

আচ্ছা, আজকের লেখাটা কার জন্য?? কার প্রতি? 

সে উত্তর দিতে প্রিয় দুটি লাইন দিয়ে শেষ করি…. 

 “এই লেখার আমি শুধু আমি নই তুমিও,

  এই লেখার তুমি শুধু তুমি নও আমিও! “[১৩]

=======

তথ্যসূত্র:

১)কবিতা- ইচ্ছে: কাঞ্চন দাস।

২)সুরা হুমাজাহ, ১০৪:০১ 

৪)সুরা আন নুর ২৪:১৯

৪)আলী ইবনু আবি তালিব, 

৫)তাফসিরে ইবনে কাসির, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ২১.

৬)শেষরাত্রির গল্পগুলো, পৃ.১২৬ আব্দুল্লাহ মাহমুদ নজীব। 

৭)সাত সাগরের মাঝি, পৃ.৩৪, ফররুখ আহমদ। 

৮)সুরা আ’লা, ৮৭:০৯

৯)সহীহ বুখারি, ৩৪৬১

১০)সুরা হাদিদ ৫৭:১৬

১১)তারিখু দিমাশক, খন্ড ৪৮,পৃ.৩৮৪

 তারিখু বাগদাদ, খন্ড ০৬, পৃ.১৪০

১২)সুরা বাকারা ০২:২৬১

১৩) শাহাদাত খান ফয়সাল রাহিমাহুল্লাহ, ২৪,জানুয়ারি ২০১৯

লাভায় লালশাক পুবের আকাশ 

কাব্যগ্রন্থটি লিখেছেন, সীমান্ত শরিফ।

লাল ও হলুদ রঙের প্রচ্ছদে আবৃত একটি কাব্যগ্রন্থ। নাম “লাভায় লালশাক পুবের আকাশ”। নামের বিশালতায় ও উৎসর্গের পংক্তিমালা দেখে বেশ আগ্রহ নিয়ে কয়েকটা কবিতা পাঠ করলাম। কাব্যগ্রন্থটা বেশ ইতিহাস মিশ্রিত মনে হলো। সম্পূর্ণ কাব্যগ্রন্থ বেশ কয়েক বার পাঠ করার পর ভাবলাম, ইতিহাস মিশ্রিত অতীতের আলাপ নিয়ে বিদ্রোহী ও বজ্র কালির ফোঁটামাখা কাব্যগ্রন্থটা রিভিউ করি। কাব্যগ্রন্থের ৩২ টি কবিতার মধ্যে বেশ কিছু কবিতা’র রিভিউ দেওয়ার চেষ্টা করছি। তার আগে পুরো কাব্যগ্রন্থের সারমর্ম তুলে ধরছি। 

সারমর্ম

 উদীয়মান তরুণ কবি সীমান্ত শরীফ তার বিশ্বাস ও দীক্ষা শিক্ষায়  মিশ্রিত এই কাব্যগ্রন্থটি তারই অনন্য প্রতিফলন বলে মনে হয়েছে। তিনি তার কাব্যগ্রন্থের কবিতামালায় আলাপ তুলেছেন, মুসলিমদের ঈমানের অংশ আল কুদস নিয়ে, বিবরণ দিয়েছেন নির্যাতনের, দ্রোহ তুলেছেন পাশ্চাত্য সভ্যতা ও ইয়াহুদীদের প্রতি। আলাপ তুলেছেন দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে। এই বয়সে এসে কবির বেশ করে মনে পরলো ছাত্রাবাসের দিনগুলির কথা। একটি কবিতায় তিনি তুলে ধরেছেন – মৃত্যুর পরে তার মায়ের আবদার, বাবাকে নিয়ে আলাপ তুলেছেন অন্য একটি কবিতায়। তার কাব্যগ্রন্থে প্রেম প্রীতি ভালবাসাও স্থান পেয়েছে ভীষণভাবে। 

এবার গুটিকয়েক কবিতার রিভিউ দেওয়ার চেষ্টা করবো।  

আমায় ছিঁড়ে খাও হে শকুন

কবি তার এই কবিতায় তাকে হত্যা করার আকুতি জানিয়েছেন। কবিতার পংক্তিতে ফুটিয়ে তুলেছেন, মুদ্রাস্ফীতি দ্রব্যমূলের ঊর্ধ্বগতি ও রাষ্ট্রের নানান অসঙ্গতি নিয়ে। সম্রাজ্যবাদীদের  শকুনের সাথে তুল্য করে নামপর উন্নয়নের সমালোচনা করেন। তিনি বলেছেন – দোজখের ভয়ে তিনি আত্মহত্যা করতে চান না। তাই এই রাষ্ট্র নামক জাহান্নামে  তাকে হত্যা করা হোক। 

মায় মরণে ছবি আঁকে

এই কবিতায় কবি তার মায়ের সাথে সংলাপ করছেন, তার মা কবিকে প্রশ্ন করে যাচ্ছে, তিনি মৃত্যুবরণ করলে তার কবর কোথায় হবে? কে পড়বে তার জানা? বাড়ির দরজায় মসজিদে কি আর নামাজ পড়বে না মানুষ? নানান প্রশ্নের তালে তিনি আদেশও করে যাচ্ছেন। মৃত্যুর পরে যেন বেশি মানুষ জড়ো করা না হয়। নিকট আত্মীয়দের খবর দেওয়া হয়। মৃত্যুর পরে কবি যেন তার মায়ের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে সূরা পাঠ করে। 

অতঃপর কবি তার মায়ের এই সকল প্রশ্ন আর আদর্শের প্রেক্ষিতে বলেন। মায়েরা ও মৃত্যুবরণ করবে, তাদের আদেশ আমাদের কাছে প্রেসক্রিপশনের মতো। তবে কবির আকুতি, আলিপের মতো মা’র শরীরটা বাঁকা হয়ে গেলেও মা যেন আর ক’টা দিন বেঁচে থাকেন।  মাটির চুলায় রান্না করেন। মৃত্যু হলে যেন দু’জনের একসাথেই হয়। কবির এ কবিতায় মায়ের প্রতি নিদারুন ভালোবাসা ফুটে উঠেছে। 

আকসার কয়লা

বাইতুল মাকদিস আমাদের ঈমানের অংশ। নবীদের পরশে আবৃত হয়ে আছে কুদসের প্রতিটি কংক্রিট। কবি তার এই কবিতায়, গাজার বিমর্ষ চিত্র তুলে ধরেছে। তিনি বলেছেন – মায়েরা বাচ্চাদের পায়ে নাম লিখে রাখছে। যেন লাশ হওয়ার পরে চিনতে পারে । শিশুদের ছেঁড়াপাটা কলিজা আর রক্তাক্ত দেহ সহকারে কবরস্থ করার পর বিদ্রোহ করে কবি বলেন – খোদা ফেরেশতারা কি ভূমধ্য সাগরের চিনে না? কসম তেল আবিবের সেদিন বৃষ্টি হবে ছোপ ছোপ কলিজা গন্ধে কালো বৃষ্টি। একদিন আমাদের বিজয় হবে। সেই দিন শহীদের রক্তগুলো মেঘ হয়ে আরশে জড়ো হবে। কবি তার এই কবিতায় বাইতুল মাকদিসের মুক্তি প্রত্যাশা করেছেন। 

সার্বভৌমত্ব

ছোট্ট কয়েক লাইনের এই কবিতাটা খুব বেশি উপলব্ধির। তিনি তার মায়ের সাথে দেশের সার্বভৌমত্ব কে তুল্য করেছেন। তিনি যেমন সব সময় তার মায়ের আষ্টেপৃষ্ঠে লেগে থাকতে চান। তেমনি সব সময় মাতৃভূমির সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত হোক এটাই কামনা করেন। কবি’র এই কবিতায় নাগরিকদের অধিকারের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। 

বোডিং

কবি তার এই কবিতায় পড়াশুনার জন্য শৈশবে বাড়ি ছাড়ার স্মৃতি তুলে ধরেছেন। চৈত্র মাসে রোদের মধ্যে তার বাবা আসবাবপত্র মাথায় নিয়ে 

রওনা হয়েছেন ছাত্রাবাসের দিকে। এদিকে তার মা’ রওনা হওয়ার সময় নানান উপদেশ আর সাহস দিয়ে রওনা করিয়ে দিলেও তিনি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে ছিলেন। কবি পাঠশালায় হাজির হওয়ার পর পুরানা শিক্ষার্থীরা তাকে ভয় দেখাচ্ছিলেন। 

“অসুখ হলে ছুটি নাই। কাঁদলে নাম কাটা।”

গভীর রাতে কবি স্বপ্ন দেখলেন, তার মা তার জন্য কান্না করছে। কবি তার এই কবিতায় পড়াশোনার জন্য শৈশবে বাড়ি ছাড়ার স্মৃতি তুলে ধরেছেন। 

প্রেমোগ্রাফি

এই কবিতাটি পুরো কাব্যগ্রন্থের মধ্যে আমার কাছে অনন্য বলে মনে হয়েছে। কবি প্রেম বলতে এখানে বুঝিয়েছেন, শত লাবণ্যতায় হৃদয়ে চির ধরার প্রত্যাবর্তনের মতো। কবি তার অর্ধাঙ্গির শূন্য ডিসটেন্স কে প্রেম বলেছেন। তিনি মনে করেন প্রেমের কোন বিছানা হয় না। তিনি প্রেম বলতে বুঝেন একটি প্রতিরোধের আঙিনা। তিনি অবৈধ প্রেমকে সাহারা মরুভূমি ও পাপের প্রাসাদের সাথে তুল্য করেছেন। 

~ আমি কবিদের দর্পন মনে করি। তারা মানুষের আচার আচরণ চিন্তা চরিত্র কবিতার মাধ্যমে সমাজের কাছে তুলে ধরে। কবিদের কবিতা সমূহ যখন সময়ের কথা বলে, মাটি ও মানুষের অধিকারের কথা বলে। তাদের কবিতা সমূহের পংক্তি থেকে পংক্তিমালা তরুণ যুবকদের মস্তিষ্কে সৃষ্টি করে সচেতনতা ও অধিকার আদায়ের আন্দোলন। তবেই কবি মনে করি সে কবি কবিতা ও কাব্যগ্রন্থ সময়ের আলোকে প্রাসঙ্গিক। তেমনি শত কাব্যগ্রন্থের মধ্যে ‘ লাভায় লালশাক পুবের আকাশ’ কাব্যগ্রন্থটি সময়ের কাব্যগ্রন্থ। যে গ্রন্থে সমাজ সংস্কৃতি দেশীয় ও বিশ্বরাজনীতির আলাপ তুলে প্রেম ও ভালোবাসা দিয়ে মানুষ কে মাখিয়ে দিয়েছেন।

~  আমি নিয়মিতই নানান ধরনের কাব্যগ্রন্থ পাঠ করি। যদিও বহুদিনের ইচ্ছে আবৃত্তি করার। তাল সুর কোন কিছুই আমার মিলে না তাই আবৃত্তি করা হয় না। তবে যে কাব্যগ্রন্থ গুলো খুব অনুভবের তা উপলব্ধি করি পর্যবেক্ষণ করি ভীষণভাবে। ঠিক তেমনি “লাভায় লালশাক পুবের আকাশ” কাব্যগ্রন্থটি আমার কাছে ভীষণ উপলব্ধির মনে হয়েছে। পুরো কাব্যগ্রন্থ বেশ কয়েকবার পাঠ করলেও এখন অবধি সব ছন্দের রং বুঝতে পারিনি। তবে কবি খুব কঠিন করে লিখেন নি। কিন্তু, কবিতামালা’র বেশ গভীরতা রয়েছে। তিনি তার এই কাব্যগ্রন্থে আলাপ তুলেছেন দেশ থেকে দেশান্তরে। তার কবিতাগুলো স্পর্শ করেছে সচেতন নাগরিকদের হৃদয়ে। আপনিও পাঠ করতে পারেন, বিদ্রোহী কন্ঠে আবৃত্তি করতে পারেন কবি সীমান্ত শরীফের ব্যতিক্রমী এই কাব্যগ্রন্থটি।

কাব্যগ্রন্থ – লাভায় লালশাক পুবের আকাশ। 

রিভিউয়ার- আসিফ মাহামুদ 

এইচআইভি একটি মরণব্যাধি ভাইরাস

এস. এম. এম. মুসাব্বির উদ্দিন

এইচআইভি (হিউম্যান ইমিউনোডেফিসিয়েন্সি ভাইরাস) এমন একটি ভাইরাস যা মানবদেহের ইমিউন সিস্টেমকে দুর্বল করে ফেলে। এটি মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়, যার ফলে দেহ সহজেই বিভিন্ন সংক্রমণ এবং রোগে আক্রান্ত হয়। এইচআইভি শরীরে প্রবেশের পর ধীরে ধীরে ইমিউন সিস্টেমের সেল বা কোষগুলোকে ধ্বংস করতে শুরু করে, বিশেষ করে সিডি৪ (CD4) কোষগুলোকে, যা শরীরকে সংক্রমণের বিরুদ্ধে রক্ষা করতে সাহায্য করে।

এইচআইভির ইতিহাস

এইচআইভির প্রথম সনাক্ত হয় ১৯৮০ সালের দিকে। তবে বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই ভাইরাসটি ১৯২০-এর দশক থেকেই আফ্রিকার কঙ্গো অঞ্চলে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। তখন ভাইরাসটি একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল। এরপর, এটি বিভিন্ন মাধ্যমে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। 

১৯৮১ সালে প্রথমবারের মতো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এইচআইভি-সংক্রান্ত রোগ অ্যাকোয়ার্ড ইমিউনোডেফিসিয়েন্সি সিন্ড্রোম (এইডস) চিহ্নিত করা হয়। তখন থেকে এইচআইভি এবং এইডসের গবেষণা শুরু হয় এবং ভাইরাসটি সম্পর্কে ধীরে ধীরে অনেক তথ্য প্রকাশিত হয়। 

সংক্রমণ পদ্ধতি

এইচআইভি প্রধানত রক্ত, বীর্য, যোনিপথের তরল, এবং বুকের দুধের মাধ্যমে একজন ব্যক্তির শরীর থেকে অন্য ব্যক্তির শরীরে প্রবেশ করতে পারে। এই ভাইরাসটি সাধারণত নিম্নলিখিত পদ্ধতিতে ছড়ায়:

১) অসুরক্ষিত যৌনমিলন: এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে কনডম ছাড়া যৌনমিলন করলে এই ভাইরাসটি সহজেই সংক্রমিত হতে পারে।

২) সংক্রামিত রক্ত: রক্ত সংবহন বা রক্ত গ্রহণের সময় যদি সংক্রামিত রক্ত ব্যবহার করা হয়, তবে এই ভাইরাসটি শরীরে প্রবেশ করতে পারে।

৩) সংক্রমিত সুচ বা ইনজেকশন: যদি সংক্রমিত ব্যক্তি যে সুচ বা ইনজেকশন ব্যবহার করে, সেটি অন্য কেউ ব্যবহার করে, তাহলে তার মধ্যেও এইচআইভি প্রবেশের সম্ভাবনা থাকে।

৪) মায়ের থেকে শিশুর মধ্যে: গর্ভাবস্থায়, প্রসবের সময়, বা বুকের দুধের মাধ্যমে একজন সংক্রমিত মায়ের কাছ থেকে তার শিশুর মধ্যে এই ভাইরাসটি ছড়াতে পারে।

লক্ষণ

এইচআইভি সংক্রমণের প্রথম কয়েক সপ্তাহ বা মাসে কোন লক্ষণ নাও দেখা যেতে পারে, বা কিছু ক্ষেত্রে ফ্লুর মতো হালকা উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তবে সংক্রমণ বাড়তে থাকলে এবং ইমিউন সিস্টেম দুর্বল হতে শুরু করলে বিভিন্ন ধরনের জটিল রোগ দেখা দিতে পারে। কিছু সাধারণ লক্ষণ হল:

– দীর্ঘমেয়াদী জ্বর

– অস্বাভাবিক ওজন হ্রাস

– ক্লান্তি

– ত্বকে দাগ বা র‍্যাশ

– দীর্ঘমেয়াদী ডায়রিয়া

– লসিকা গ্রন্থি ফুলে যাওয়া

এইচআইভি এবং এইডস

এইচআইভি এবং এইডস (AIDS – Acquired Immunodeficiency Syndrome) এক নয়, কিন্তু তারা পরস্পরের সাথে সম্পর্কিত। এইচআইভি হল সেই ভাইরাস যা শরীরের ইমিউন সিস্টেমকে আক্রমণ করে, আর এইডস হল সেই অবস্থা যখন শরীরের ইমিউন সিস্টেম এতটাই দুর্বল হয়ে যায় যে, বিভিন্ন রোগ সহজেই আক্রমণ করতে পারে। 

এইডস মূলত এইচআইভি সংক্রমণের শেষ পর্যায়ে দেখা যায়। যদি কেউ দীর্ঘ সময় ধরে এইচআইভি সংক্রমিত থাকে এবং সঠিক চিকিৎসা না নেয়, তবে তার ইমিউন সিস্টেম ভেঙ্গে পড়ে এবং সেই অবস্থায় তাকে এইডস আক্রান্ত বলা হয়। এইডস রোগীর বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়, যেমন নিউমোনিয়া, টিউবারকুলোসিস (যক্ষা), এবং কিছু ক্যান্সার।

চিকিৎসা ও প্রতিরোধ

এইচআইভি সংক্রমণের কোন স্থায়ী চিকিৎসা নেই, তবে উন্নত চিকিৎসা পদ্ধতি (যেমন অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপি – ART) দ্বারা ভাইরাসটির বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করা যায়। অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল ওষুধগুলি এইচআইভি ভাইরাসের সংখ্যা কমিয়ে দেয় এবং ইমিউন সিস্টেমকে সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহায্য করে। 

চিকিৎসা: 

১) অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপি (ART): এই চিকিৎসা পদ্ধতিতে বিভিন্ন ধরনের অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল ওষুধ একসাথে ব্যবহার করা হয়, যা ভাইরাসের বৃদ্ধি প্রতিরোধ করে এবং রক্তে ভাইরাসের পরিমাণ কমিয়ে দেয়।

২) প্রি-এক্সপোজার প্রোফিল্যাক্সিস (PrEP): এই চিকিৎসা পদ্ধতি বিশেষত তাদের জন্য যারা এইচআইভি সংক্রমণের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। PrEP হল প্রতিদিন একটি ওষুধ সেবন করা যা এইচআইভি সংক্রমণের ঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়ে দেয়।

৩) পোস্ট-এক্সপোজার প্রোফিল্যাক্সিস (PEP): এই চিকিৎসা পদ্ধতি সেসব ব্যক্তিদের জন্য যারা সম্ভাব্যভাবে এইচআইভি সংক্রমণের পরপরই (৭২ ঘণ্টার মধ্যে) সংক্রমণ প্রতিরোধ করতে চান। এটি এক মাসব্যাপী একটি ওষুধ সেবন পদ্ধতি যা ভাইরাস সংক্রমণের সম্ভাবনা কমিয়ে দেয়।

প্রতিরোধ: 

১) নিরাপদ যৌনমিলন: কনডম ব্যবহার করে যৌনমিলন করলে এইচআইভি সংক্রমণের ঝুঁকি কমে যায়। এছাড়াও, একাধিক যৌনসঙ্গী থাকার পরিবর্তে একজন নির্দিষ্ট সঙ্গীর সাথে যৌনমিলন করা নিরাপদ।

২) রক্ত গ্রহণে সতর্কতা: রক্ত গ্রহণের সময় অবশ্যই সংক্রামিত রক্ত পরীক্ষা করা উচিত। রক্তদান কেন্দ্রগুলিকে নিশ্চিত করতে হবে যে, রক্তগুলি এইচআইভি মুক্ত।

৩) ইনজেকশন ও সুচের ব্যবহার: ব্যবহৃত সুচ ও ইনজেকশন পুনরায় ব্যবহার করা উচিত নয়। এগুলি সঠিকভাবে নিষ্পত্তি করা উচিত এবং একবার ব্যবহৃত হলে তা পুনরায় ব্যবহার করা উচিত নয়।

৪) গর্ভবতী মায়েদের জন্য চিকিৎসা: যদি একজন মায়ের এইচআইভি পজিটিভ থাকে, তবে তাকে প্রসবের সময় এবং গর্ভাবস্থায় বিশেষ চিকিৎসা দেওয়া উচিত যাতে তার শিশুর মধ্যে ভাইরাসটি সংক্রমিত না হয়।

এইচআইভি নিয়ে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি

এইচআইভি সংক্রমিত ব্যক্তিদের প্রায়ই সমাজে অবহেলার শিকার হতে হয়। তাদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয় এবং তাদেরকে সামাজিকভাবে একঘরে করে রাখা হয়। তবে এটি একটি ভুল ধারণা। এইচআইভি সংক্রমণ সাধারণত দৈনন্দিন কার্যকলাপের মাধ্যমে ছড়ায় না। যেমন কোলাকুলি করা, হাত মেলানো, একই খাবার খাওয়া বা একই বাসনপত্র ব্যবহার করা ইত্যাদি দ্বারা এই ভাইরাসটি ছড়ায় না। 

এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তিরা সমাজের অন্যান্য লোকদের মতই সাধারণ জীবনযাপন করতে পারে, যদি তারা সঠিক চিকিৎসা এবং পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করে। তাদের প্রতি সহানুভূতি এবং সমর্থন প্রদর্শন করা উচিত, এবং সমাজকে সচেতন করতে হবে যে, এইচআইভি কোনও বিচারযোগ্য অপরাধ নয়, এটি একটি রোগ।

এইচআইভি একটি গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যা যা বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করছে। তবে সঠিক চিকিৎসা এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করলে এই ভাইরাসের সংক্রমণ রোধ করা সম্ভব। সমাজে এইচআইভি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সংক্রমিত ব্যক্তিদের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। 

এইচআইভি সম্পর্কে আরও গবেষণা এবং উন্নত চিকিৎসা পদ্ধতির মাধ্যমে আশা করা যায় যে, ভবিষ্যতে এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে একটি স্থায়ী সমাধান খুঁজে পাওয়া যাবে। ততক্ষণ পর্যন্ত, প্রতিরোধ এবং সচেতনতাই এর বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকরী হাতিয়ার।

শিক্ষার্থী (সেশন: ২০২০-২১)

ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ