গ্রেডিং সিস্টেম পরিবর্তনের দাবিতে উত্তাল ইউআইইউ

0

বর্তমান প্রচলিত গ্রেডিং সিস্টেম সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন রাজধানীর বেসরকারি ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (ইউআইইউ) শিক্ষার্থীরা। বিগত কয়েক দিন ধরে এই পরিবর্তন চেয়ে আন্দোলন করে আসছে শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) নীতিমালা অনুযায়ী অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে মিলিয়ে এই গ্রেডিং সিস্টেম চালুর দাবি জানান তারা

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আন্দোলনরত একজন শিক্ষার্থী জানান, সারাদেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে একই ধরনরে গ্রেডিং সিস্টেম প্রচলিত থাকলেও শুধু ছয়টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় তাদের নিজেদের মতো করে গ্রেডিং সিস্টেম চালু রেখেছে। এ ব্যাপারে ইউজিসির নীতিমালা তারা মানছে না।

আরেক শিক্ষার্থীর ভাষ্যমতে, ৮০ শতাংশ নম্বরে যেখানে আমি আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে সিজিপিএ-৩.০০ পাচ্ছি, সেখানে অন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেউ ৪.০০ পাচ্ছেন। ৭৩ শতাংশ নম্বরে আমি ২.৩৩ পেলেও অন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেউ ৭০ শতাংশ পেয়ে ৩.৫০ পাচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়ার পর দু’জনের সিজিপিএ আকাশ পাতাল পার্থক্য হচ্ছে একই মার্ক পাওয়ার পরেও। সেজন্য চাকরির আবেদনসহ উচ্চশিক্ষায় তারা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) বলছে, পরীক্ষায় মূল্যায়নে এভাবে ভিন্ন গ্রেডিং পদ্ধতি অনুসরণ করায় বঞ্চিত ও বৈষম্যের শিকার হচ্ছে ছাত্রছাত্রীরা। বিশেষ করে চাকরির বাজার কিংবা বিদেশে উচ্চশিক্ষায় যাওয়ার ক্ষেত্রে উপেক্ষিত হচ্ছেন তারা। এমনকি কখনো কখনো কম সিজিপিএ এর জন্য তারা চাকুরিতে আবেদন পর্যন্ত করতে পারছে না।এ নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভের অন্ত নেই। বিষয়টি সুরাহার জন্য অনেকেই ইউজিসিতে আবেদন করছে।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের নীতিমালা স্পষ্ট ভঙ্গ করার ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থীরা। তারা সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের আইন মেনে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান। এই বিষয়ে রিপোর্ট প্রকাশ করা অবধি যোগাযোগ করেও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।

ফরজ নামাজের ইকামত হয়ে গেলে কোন সুন্নাত নেই!

0

ফজরের নামাযের সময় মসজিদে অনেককে দেখা যায়, আযানের জন্য ইকামত দেওয়া হয়ে গেছে অথবা জামাতে নামাজ পড়ানো হচ্ছে, আর তারা সুন্নত নামাজ পড়ছেন। অনেকের স্পর্ধা এতো বেশি যে, মসজিদে এসে দেখে ইমাম সাহেব ফরয নামাজ পড়াচ্ছেন, আর তারা জামায়াতে শরীক না হয়ে আলাদা সুন্নত পড়া শুরু করে?

নামাজ কি নিজের ইচ্ছামতো পড়লে কবুল হবে নাকি, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর তরীকা মোতাবেক পড়লে কবুল হবে?? ফরয নামাজের জন্য ইকামত দেওয়া হয়ে গেলে অন্য কোনো নফল বা সুন্নত নামাজ পড়া সম্পূর্ণ হারাম ও সুন্নত বিরোধী!! রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, “যখন ইকামত দেওয়া হয়, তখন ফরয ছাড়া অন্য কোন নামাজ নেই”। সহিহ মুসলিম, হাদীস নং- ১৫৩১।

এখন যদি কেউ বলে “আমি হানাফী মাযহাবের আর আমার মাযহাবে আছে ফযরের সুন্নত পড়া যাবে”।

আমি বলবো, আপনি আসল হানাফী মাযহাব অনুসরণ করছেন না, আপনি আসলে “হানাফী মাযহাব” নাম দিয়ে অন্য কারো মাযহাব অনুসরণ করছেন!! কারণ ইমাম আবু হানীফা স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন, “ইযা সাহহাল হাদীস, ফাহুয়া মাযহাবি” – জেনে রাখো যখন কোনো সহীহ হাদীস পাবে সেইটাই আমার মাযহাব।

এখন, সহীহ হাদীস মোতাবেক ফরয নামাযের জন্য ইকামত দেওয়া হয়ে গেলে আর কোনো সুন্নত নামাজ চলবেনা – সুতরাং ইমাম আবু হানীফার মাযহাবও সেটাই হবে। আর আপনি উলটা কাজ করে “হানাফী মাযহাব” হওয়ার দাবী করবেন, আপনি নিজেই বিবেচনা করুন আপনি কতটুকু সত্যিকারে হানাফী মাযহাব অনুসরণ করছেন? কেউ কষ্ট পেয়ে থাকলে তার জন্য দুঃখিত। আমার উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষকে সুন্নত জানানো।

আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যখন নামাযের জন্য ইকামাত দেওয়া হয় তখন ফরয নামাজ ছাড়া অন্য কোন নামাজ নেই। —সহীহ। ইবনু মাজাহ– (১১৫১), মুসলিম।

এ অনুচ্ছেদে ইবনু বুহাইনা, আবদুল্লাহ ইবনু আমর, আবদুল্লাহ ইবনু সারজিস, ইবনু আব্বাস ও আনাস (রাঃ) হতেও হাদীস বর্ণিত আছে। আবু ঈসা বলেনঃ আবু হুরাইরার হাদীসটি হাসান। আইউব, ওয়ারাকা ইবনু উমার, যিয়াদ ইবনু সা’দ, ইসমাঈল ইবনু মুসলিম এবং মুহাম্মাদ ইবনু জুহাদা সম্মিলিতভাবে এ হাদীসটি আমর ইবনু দীনার হতে, তিনি আতা হতে, তিনি আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে মারফু’ হিসাবে বর্ণনা করেছেন। হাম্মাদ ইবনু যায়িদ ও সুফিয়ান ইবনু উআইনা তাদের সনদ পরম্পরায় আমর ইবনু দীনার-এর সূত্রে এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন, কিন্তু তারা মারফু’ হিসাবে বর্ণনা করেননি। তবে মারফু’ হিসাবে বর্ণিত হাদীসটিই আমাদের মতে বেশি সহীহ।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবী ও অন্যান্যরা এ হাদীস অনুসারে আমল করেছেন। তারা বলেছেন, নামাযের জন্য ইকামাত দেওয়া হলে কোন ব্যক্তিই ফরয নামাজ ব্যতীত অন্য কোন নামাজ আদায় করবে না। সুফিয়ান সাওরী, ইবনুল মুবারাক, শাফিঈ, আহমাদ এবং ইসহাকও একই রকম কথা বলেছেন। আরো কয়েকটি সূত্রে আবু হুরাইরার নিকট হতে এ হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে। ’আইয়্যাশ ইবনু আব্বাস আবু সালামা হতে তিনি আবু হুরাইরা হতে তিনি নবী সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে অনুরূপ বর্ণনা করেছেন।

বিঃদ্রঃ অনেকে মনে করেন, ফযরের সুন্নত নামাজ আগে না পড়লে, ফরয বাদে আর পড়া যাবেনা। এধারণাটা ঠিক না!! যদি ফযরের ফরয নামাজের পর ওয়াক্ত থাকে তাহলে সুন্নত পড়া যাবে। আর ওয়াক্ত না থাকলে সূর্য ওঠার পর পড়া যাবে।

কায়েস বিন আ’মর (রাঃ) বলেন, “রাসুলুল্লাহ (সাঃ) (ফযরের নামাযের জন্য) বের হয়ে আসলেন আর ইকামত দেয়া হলো। আমি তাঁর (সাঃ) সাথে ফযরের নামাজ পড়লাম। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) নামাজ শেষ করে দেখলেন আমি নামাজ পড়ছি। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) আমাকে বললেন, ধীরে কায়েস! দুই রাকাত এক সাথেই? আমি বললাম, ইয়া রাসুলুল্লাহ (সাঃ) আমি ফযরের আগে দুই রাকাত পড়িনাই। তখন রাসুলুল্লাহ “না, তাহলে পরে ঠিক আছে”। আবু দাউদের বর্ণনায় আছে, “অতঃপর রাসুলুল্লাহ (সাঃ) নীরব থাকলেন”। সুনানে আত-তিরমিযী ৪২২, আবু দাউদ ১২৬৭।

এই হাদীস থেকে বুঝা যাচ্ছে, ফযরের নামাজের আগে দুই রাকাত সুন্নত নামাজ পড়তে না পারলে, ফরয নামাযের পরেও পড়া যাবে। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) চুপ থাকা মানে তিনি নীরব থেকে কায়েস (রাঃ) কে মৌন সম্মতি দিলেন। আর রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর মৌন সম্মতি মানে হলো – সুন্নাহ।

মসজিদে যেকোনো নামাযের আগে লক্ষ্য করবেন কতটুকু সময় বাকি আছে, ২-১ মিনিট সময় যাতে করে অন্তত ২ রাকাত পড়া যাবেনা, তাহলে সুন্নত নামায শুরু করবেন না। সুন্নত পড়া শুরু করবেন যদি এতটুকু সময় হাতে থাকে যে ২ রাকাত শেষ করতে পারবেন। আর কখনো যদি এমন হয় সুন্নত পড়া অবস্থায় ইকামত দেওয়া শুরু করলঠা আপনি ২য় রাকাতে আছেন, একটু সময় নিলেই নামায পূর্ণ করে ফেলতে পারবেন তাহলে দ্রুত নামায পূর্ণ করে সালাম ফেরাবেন। আর যদি ১ম রাকাতে থাকেন তাহলে নামায ছেড়ে দিয়ে জামাতে শরীক হবেন।

আল্লাহ আমাদের জীবনের প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে কুরআন ও সুন্নাহ মেনে জীবন পরিচালনা করার তোওফিক দান করুন, আমীন ইয়া রাব্বুল আ’লামীন।

লেখক,

শিক্ষার্থী, কামিল (হাদিস), মোমেনশাহী দারুস সুন্নাত কামিল মাদ্রাসা ।

ক্ষমা পাওয়া ১৪ বাংলাদেশি আমিরাত থেকে দেশে ফিরছেন

বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলাকালে সংযুক্ত আরব আমিরাতে সংহতি প্রকাশ করে বিক্ষোভে অংশ নেয়ায় বিভিন্ন দন্ডে দন্ডিত হয়েছিলেন ৫৭ বাংলাদেশি। পরে দেশটির প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান তাদের ক্ষমা করেন। ক্ষমা পাওয়ার পর প্রথম ধাপে সেই ৫৭ জনের ১৪ জন আজ দেশে ফিরছেন।

প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের ক্ষমা পাওয়া ১৪ জন বাংলাদেশি অভিবাসীর প্রথম দলটি আজ সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং রাত ১০টায় চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ফিরে আসবেন বলে আশা করা হচ্ছে।’

এর আগে ৩ সেপ্টেম্বর অন্তর্বতী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে সম্মান জানিয়ে আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট সাজাপ্রাপ্ত ৫৭ বাংলাদেশির সবাইকে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন। নোবেল বিজয়ী ড. ইউনূস সাজাপ্রাপ্ত বাংলাদেশিদের দন্ড মওকুপ করার জন্য আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানকে অনুরোধ করেন। পরবর্তীতে শেখ জাহেদ বাংলাদেশিদের সাজা মওকুফ করেন।

সম্পাদকীয়ঃ সেপ্টেম্বর ২০২৪

প্রিয় পাঠক, দীর্ঘ এক মাস পরে হাজির হলাম গুরুত্বপুর্ণ অনেকগুলি বিষয় নিয়ে। আশা করি আমাদের এ আয়োজন আপনাদের মনে কার্যকর চিন্তার খোরাক জোগাবে। ইতিহাসের প্রতিটা স্বৈরশাসকের পতন আমাদের স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার নির্মম পরিণতির কথা মনে করিয়ে দিলেও আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের গণতন্ত্রের আড়ালে স্বৈরতন্ত্রের ভয়াবহ চর্চা হয়, যা শেষ হয় অভ্যুত্থান-বিপ্লবের মাধ্যমে। 

ইতিহাসে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন নতুন কিছু নয়। ১৭৮৯’র ফরাসি বিপ্লব, ১৯১৭’র বলশেভিক বিপ্লব, কিংবা ১৯৭৯’র ইরানের ইসলামিক বিপ্লব ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে সফলতম বিপ্লব। যার মাধ্যমে দীর্ঘদিনের স্বৈরতন্ত্রের পতন হয়। এই বিপ্লবগুলো কালের সাক্ষী হয়ে স্বৈরাচারের নির্মম পতনকে স্মরণ করিয়ে দেয়। তবে আমাদের ২৪’র জুলাই বিপ্লব সম্পূর্ন ভিন্নধর্মী একতা বিপ্লব হিসেবে বিবেচিত হবে। কারন, এখানে যে বিপ্লব বা গণ-অভ্যুত্থানগুলোর কথাগুলো বললাম, সবগুলোই ছিল কোনো না কোনো রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তির নেতৃত্বে। আর ছাত্র-জনতার জুলাই বিপ্লবের নেতৃত্বে ছিল একদল অরাজনৈতিক তরুণ শিক্ষার্থী। 

বাংলাদেশ তথা পুরো পৃথিবীর ইতিহাসে শুধু একদল শিক্ষার্থীর নেতৃত্বে এত বড় বিপ্লব বিরল। এ আন্দোলনে স্থায়িত্বকাল ছিল মাত্র এক মাসের মতো, অথচ অনেক বেশি রক্তক্ষয়ী। বাংলাদেশের ইতিহাসে এত অল্পসময়ে এত ব্যাপক আর নৃশংস রক্তক্ষয়ী বিপ্লব আর দেখা যায়নি, যেখানে হাসিনার লেলিয়ে দেয়া ছাত্রলীগ- টোকাই আর উর্দিপড়া পুলিশ-র‍্যাব-বিজিবি-সিক্রেট এজেন্সি নির্বিচারে গণহত্যা চালিয়েছে, এমনকি পরাজয় নিশ্চিত হবার পরেও গণহত্যা করে লাশ স্তুপিকৃত করে পুলিশ ভ্যানে নিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছে প্রমাণ লোপাট করতে। যা এ বিপ্লবকে আর সব বিপ্লব থেকে ইতিহাসে ব্যতিক্রম হিসেবে জায়গা দিয়েছে। এখানে সত্যিই অবাক করার মতো, আন্দোলনের শুরু থেকে শিক্ষার্থীরা কর্মসূচি দিচ্ছে এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো বাধ্য ও অনুগত হয়ে সে কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেছে। 

শিক্ষার্থীরা রাষ্ট্র সংস্কারের কথা বলছেন। অর্থাৎ রাষ্ট্রের প্রতিটি সেক্টরকে ঢেলে সাজাতে হবে। শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তনই নয়, এই তরুণরা বাংলাদেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের কথা বলছেন। দারুণ এক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যেখানে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে।

পাঠক, মনে রাখা দরকার, এ বিপ্লবটি শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে শুরু হলেও পর্যায়ক্রমে এখানে সর্বস্তরের মানুষ অংশগ্রহণ করেছে; ধর্ম,বর্ণ, পেশা নির্বিশেষে। এই বিপ্লব ছিল হাসিনার প্রতি জনক্ষোভের এক ভয়াল বহিঃপ্রকাশ, যার জন্য ঝড়েছে হাজারো প্রাণ, গুলিবিদ্ধ হয়েছেন প্রায় পনেরো হাজার বিক্ষুব্ধ মানুষ। 

বিপ্লবকে যেকোনো মূল্যে জারি রাখতে হবে, এই শহীদেরা যেন উজ্জ্বল আভা দিতে পারেন, যেন এই আহতদের মুখে হাসি ফোঁটে সত্যিকারের স্বাধীন বাংলা দেখে; আর কোনো স্বৈরাচার যেন মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে; সেই দিকে সজাগ থাকুক ছাত্ররা। 

সম্পাদকীয়- সেপ্টেম্বর ২০২৩

সম্মানিত জ্ঞান পিপাসু পাঠক! বরাবরের মতো আমরা আপনাদের দিগদর্শন; চিন্তার লেয়ারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করার প্রয়াস হিসেবে এ সংখ্যায় আমরা পিএইচডি জগতের দিকে চিন্তার খোরাক দিচ্ছি। পিএইচডি- এই অক্ষর তিনটি সম্মান এবং প্রশংসার নির্দেশ দেয়। উচ্চ শিক্ষার বিশাল পরিসরে peak of Mount Intellect এর স্কেল হিসাবে পিএইচডিকে ধরা হয়। এটি শুধু অক্ষরের কোনো আদিম সংমিশ্রণ নয়; এটি একটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে আপনার সমস্ত মত দেওয়ার জন্য মহাবিশ্ব আপনার করতলে ক্ষমতা অর্পন করে, যা বলিষ্ঠ কণ্ঠে চিৎকার করে, “I did my homework, and now I’m the authority!!”

কিন্তু বাস্তবতার নিরিখে বলতে গেলে, পিএইচডি-র যাত্রা কোনো আনন্দভ্রমণ নয়। এটিকে একটি দুর্দান্ত দুঃসাহসিক অভিযান হিসাবে ভাবতে হয়, যেখানে আপনি জ্ঞানের আবিষ্কার- সন্ধানের নায়ক। এটি একটি রহস্য বা একটি প্রশ্ন দিয়ে শুরু হয় যা আপনাকে অনুপ্রাণিত বা উত্তেজিত করছে। এবং তারপরে আপনি উত্তর খুঁজে পেতে বই, পরীক্ষা এবং গভীর চিন্তাভাবনার মাধ্যমে একটি গুপ্তধনের সন্ধান কাজ চালিয়ে যাবেন। কল্পনা, প্রচেষ্টা এবং গভীর রাতের কর্মযজ্ঞ একটি বিশাল ধাঁধাকে একত্রিত করে গড়ে তুলে আপনার কল্পনার আর বাস্তবের সেতু!

প্রিয় পাঠক, যখন আপনি অবশেষে আপনার কাঙ্ক্ষিত সেই পিএইচডি-টি অর্জন করেন, তখন এটি জ্ঞান আকাশের অনন্য স্তরে অগ্রসর হওয়ার মতো। আপনি একজন ছাত্র থেকে একজন পূর্ণাঙ্গ পণ্ডিত হয়ে উঠছেন। এটা শুধু একটা জানার বিষয় নয়; এটি বিশ্বের সামনে নতুন পয়েন্ট অব ভিউ আর পারস্পেক্টিভ সম্পর্কে আপনার আবিষ্কার করা সমস্ত দুর্দান্ত জিনিস গর্বিতভাবে প্রদর্শন করার সক্ষমতাকে উজ্জ্বল থেকে ক্রমশঃ প্রত্যুজ্জ্বল করে।

এখানেই আসে মুগ্ধতা; একটি পিএইচডি শুধুমাত্র কিছু একাডেমিক পয়েন্ট সংগ্রহ নয়, এটি একটি জাদুর কাঠির মতো যা ইতিহাসকে নতুন আকার দিতে পারে। পিএইচডি গবেষণার মাধ্যমে শুরু হওয়া সেই সমস্ত গতিশীল আবিষ্কার এবং পট পরিবর্তনকারী উদ্ভাবনগুলিকে আমরা ক্রেডেনশিয়াল হিসাবে গ্রহণ করি। আমরা যুগের সাথে বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির কথা বলছি যা সম্পূর্ণরূপে শিল্প বিপ্লবের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে এবং প্রত্যেকের জীবনকে আরও উন্নততর করেছে।

পাঠক! পিএইচডি কেবল গবেষক হিসেবে অর্জনের একটি চকচকে লেবেল নয়। এটি এমন একটি দুঃসাহসিক কাজ যা নব আবিষ্কার, যুগের চ্যালেঞ্জ অর্জন এবং আপনার সম্পূর্ণ মস্তিষ্কের শক্তিমত্তা প্রকাশের বিষয়ে বদ্ধপরিকর।

চিন্তাশীল বন্ধুরা, বড় স্বপ্ন দেখতে থাকুন, স্থিরতার হৃদয় ভরে যাক এবং মহাকালের অধ্যয়নগুলিকে কাজে লাগান, এবং সর্বদা মনে রাখবেন—আপনি একজন সত্যিকারের জ্ঞান যোদ্ধা হওয়ার পথে আছেন!  

সাম্যবাদের বুলি ও বাস্তবতা

কেউ খাবে আর কেউ খাবে না, তা হবে না তা হবে না। সমাজতন্ত্রের ধ্বজাধারীরা সাধারণত এই স্লোগান দিয়ে থাকে। উক্তিটি নিঃসন্দেহে ভালো, এতে কোনো সন্দেহ নেই। বাংলাদেশের সংবিধানের ১০ নং অনুচ্ছেদেও সমাজতন্ত্রের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি এটিকে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে। সমাজতন্ত্র, যাকে সাম্যবাদও বলা হয়ে থাকে। কিন্তু আমরা বাস্তবে কি দেখতে পাই? যারা এই মতাদর্শের ধারবাহক তাদের দেশে কি জনগণ এই অধিকার যথাযথ পায়? তারা কি আদৌ মানুষের মাঝে সমতা বিধান কায়েম করছে? এ মতাদর্শের গডফাদার ভলাদিমির লেনিনের দেশ সোভিয়েত ইউনিয়ন, সেখানে একসময় যে পরিমাণ ফল ও খাদ্যশস্য উৎপাদন হতো তা দিয়ে প্রায় পুরো এশিয়ার চাহিদা মেটানো সম্ভব ছিল, কিন্তু তারা এগুলো পচিয়ে নষ্ট করেছে তবুও অন্য রাষ্ট্রে সেগুলো সরবরাহ করেনি। এমনকি ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশের দুর্ভিক্ষে তারা কোনো খাদ্যের সরবরাহ করেনি। এই হচ্ছে তাদের সাম্যবাদ। শুধু তাই নয়, তারা তাদের এই কথিত সাম্যবাদের নামে যুগের পর যুগ দখলে রেখেছে এশিয়ার বহু রাষ্ট্র। ১৯১৭ সালে রুশ বিপ্লবের নামে তারা কাজাখস্তান, তাজিকিস্তান, তুর্কিমিনিস্তান, কিরগিজস্তান, উজবেকিস্তান এর মতো স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহ দখলে নেয়। এই মতাদর্শে ধর্মীয় স্বাধীনতার কোনো স্থান নেই। এর প্রতিষ্ঠাতা খোদ কার্ল মার্ক্স ধর্মকে আফিমের সাথে তুলনা করেছেন। তার মতে ধর্মই সমস্ত শোষণ ও অত্যাচারের হাতিয়ার। অথচ এ মতাদর্শে পরিচালিত রাষ্ট্রগুলোই যুগের পর যুগ তাদের আয়ত্তে থাকা বিভিন্ন অঞ্চল দখলে রাখার মাধ্যমে অত্যাচার-নিপীড়ন চালিয়েই যাচ্ছে। চেচনিয়া, পূর্ব তুর্কিস্তান এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

এ আদর্শে উজ্জীবিত নেতৃবৃন্দ মুখে সাম্যের কথা বললেও তারা স্বভাবতই একনায়কতন্ত্র (Dictatorship) কায়েম করে আসছেন। মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশও এর ছিটেফোঁটার বাইরে নয়। সিরিয়ার ক্ষমতাসীন সরকার আসাদ পরিবার, ইরাকের বাথ পার্টি এর মধ্যে অন্যতম, যদিও তারা পুরোপুরি সমাজতন্ত্রের আদর্শে বিশ্বাসী নয়।

এ মতাদর্শের অনুসারীরা মানুষের সাম্যের কথা বলে থাকে। তাদের বিখ্যাত একটি স্লোগান হলো “দুনিয়ার মজদুর, এক হও হও”। কিন্তু তাদের এই সাম্যের পেছনে রয়েছে জুলুম-নিপীড়নের ভয়াল ধাবা, যা সোভিয়েত ইউনিয়ন ও গণচীন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাই। তাদের এই মতবাদ পরিত্যাজ্য হওয়ায় তা একসময় নিজ গৃহেই আত্মহত্যা করে। যার ফলে সোভিয়েত ইউনিয়ন বিভক্ত হয়ে যায় ১৫ টি ভিন্ন রাষ্ট্রে। পরবর্তীতে পুঁজিবাদ নামক আরেক প্রান্তিক মতবাদ এর স্থান দখল করে যদিও এর কুফল বর্তমানে বিদ্যমান। এ যেন একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ এর ন্যায়। সমাজতন্ত্রে যেখানে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের তেমন সুযোগ ছিল না, পুঁজিবাদে ঠিক তার উল্টো (যেখানে ব্যক্তি মালিকানাই মুখ্য, অনিয়ন্ত্রিত বাজার, নেই রাষ্ট্র কর্তৃক বাধা-ধরা সুস্পষ্ট নিয়ম)। যার ফলে সমাজে ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বিরাজ করা দুষ্কর। বর্তমানে কিছু দেশ কাগজে-কলমে সমাজতান্ত্রিক হলেও পুঁজিবাদের অনেক দর্শন অনুসরণ করে থাকে।

বিংশ ও একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বের চরম প্রতিদ্বন্দ্বি দুই দেশ রাশিয়া ও আমেরিকার দ্বন্দ্বের অন্যতম কারণ এটি। সমাজতন্ত্রকে নির্মূল করতেই মূলত সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধে আমেরিকা আফগানিস্তানকে সহায়তা করে। এমনকি যেকোনো সময় এই দুই মতাদর্শের অনুসারী রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে যুদ্ধ লাগলে এক দেশ ওই আদর্শিক রাষ্ট্রকে সমর্থন করে থাকে। দু প্রান্তিক মেরুতে অবস্থিত এই সমাজতন্ত্র ও পুঁজিবাদ মানবজাতির জন্য কখনো স্থায়ী সমাধান বয়ে আনতে পারেনি। তাদের এই দ্বন্দ্ব মূলত সমগ্র বিশ্বে যুদ্ধ ও অশান্তির ইতিহাস। অথচ আমরা আজ এর পিছনে হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার মতো ছুটছি। কবে হুশ ফিরবে আমাদের?আর চাপিয়ে দেওয়া বস্তপঁচা মাল কুড়াবো আমরা? এখনও কি সময় আসেনি জনতার কল্যাণের নতুন ইশতেহার গড়ার?

-লেখক
শাহরুক হোসেন তন্ময়

বাংলাদেশের বিরাজমান পরিস্থিতিতে অংশীদারিত্ব চুক্তির আলোচনা স্থগিত করেছে ইইউ

মিরর ডেস্ক।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং বাংলাদেশের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি হিসেবে বিবেচিত ‘অংশীদারিত্ব ও সহযোগিতা চুক্তি-পিসিএ’ নিয়ে পরবর্তী আলোচনা স্থগিত করেছে ২৭ দেশের এই জোট। ইইউর একজন মুখপাত্র গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন যে বাংলাদেশের বর্তমান অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আলোচনা সেপ্টেম্বরে ঢাকায় হওয়ার কথা থাকলেও তা স্থগিত করা হয়েছে।

ইইউর মুখপাত্র জানান, বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে সংস্থাটির অবস্থান বোঝাতে গত ৩০ জুলাই ইউরোপীয় ইউনিয়নের হাই-রিপ্রেজেন্টেটিভ জোসেপ বোরেলের বিবৃতির প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। উক্ত বিবৃতিতে তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছিলেন যে ইইউ-বাংলাদেশ সম্পর্কের মূল ভিত্তি গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। এ কারণে চলমান সংকটের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সরকারের প্রতিটি পদক্ষেপ ইইউ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে। একই সঙ্গে, ইইউ আশা প্রকাশ করেছিল যে বাংলাদেশ সরকার মানবাধিকারের প্রতি পূর্ণাঙ্গ শ্রদ্ধা বজায় রাখবে।

সেগুনবাগিচা ও ব্রাসেলসের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের বরাতে জানা গেছে, গত বছরের অক্টোবরে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেইন এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল।

যার আওতায় প্রথম স্লটেই ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বিভিন্ন প্রকল্পে বাংলাদেশের ন্যূনতম ৪৭০ মিলিয়ন ইউরো সহযোগিতা পাওয়ার  কথা ছিল। তাছাড়া এটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতার পথকে আরও প্রশস্ত করতো। অংশীদারিত্ব ও সহযোগিতা চুক্তিটি ঢাকা ও ব্রাসেলসের মধ্যে সই হলেও জোটের সব সদস্যের জন্য এটি মেনে চলার আইনগতভাবে বাধ্যবাধকতা রয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে গোটা ইউরোপের সমর্থন সহযোগিতা পেতে এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি।

সেই চুক্তির পরবর্তী আলোচনা স্থগিত হওয়ার প্রেক্ষাপটে সেগুনবাগিচা এটা স্বীকার করেছে যে, বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে খুবই সমালোচনামুখর রয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ মানবাধিকার সংবেদনশীল পশ্চিমা বিশ্ব। চলমান কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে সৃষ্ট উত্তেজক পরিস্থিতিতে প্রকাশ্যে কোনো রকম বিবৃতি না দিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি অনুরোধ করেছিল বাংলাদেশ সরকার। আন্দোলনের শুরুর দিকে তারা এ নিয়ে কোনো বিবৃতি না দিলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তরফে বেপরোয়া গুলি বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের লাশ পড়ে যাওয়ায় পর থেকে কাছের এবং দূরের প্রায় সব রাষ্ট্রেই প্রতিক্রিয়া হয়েছে। ইউরোপের দেশগুলো জোটবদ্ধভাবে এবং ঢাকায় থাকা দেশগুলোর প্রতিনিধিরা  পশ্চিমা অন্য রাষ্ট্র, জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থা-সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মিলে দফায় দফায় এ নিয়ে উদ্বেগ ব্যক্ত করে চলেছেন। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে সংঘটিত বেআইনি হত্যা ও ঘোষিত ‘শুট অন সাইট পলিসি’ বা দেখামাত্র গুলির ঘোষণায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ইইউ’র পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোসেপ বোরেল। 

জোসেপ বোরেল বাংলাদেশে বিক্ষোভ দমনে সরকারি বাহিনীর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। শুধু বিবৃতিতেই সীমাবদ্ধ না থেকে, তিনি গত ২৭ জুলাই লাওসে অনুষ্ঠিত আসিয়ানের মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকের ফাঁকে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতা, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেনের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং বাংলাদেশের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে প্রতিবাদকারী শিক্ষার্থী, সাংবাদিক, শিশু এবং সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের প্রতিটি ঘটনা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। দোষীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে এবং আন্দোলন দমনে নির্বিচারে গ্রেপ্তার বা আটকের ক্ষেত্রে ‘যথাযথ প্রক্রিয়া’ অনুসরণ করতে হবে।

আলোচনা স্থগিত প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন গণমাধ্যমকে জানান, বাংলাদেশ ইইউর সঙ্গে আলোচনায় থাকবে এবং তারা নিশ্চয়ই নতুন সময়সূচি দেবে। উল্লেখ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ব্যবসায়িক অংশীদার, যেখানে বাংলাদেশের রপ্তানির ২০ শতাংশের বেশি ইউরোপীয় দেশগুলোতে পাঠানো হয়।

এদিকে, বাংলাদেশ পরিস্থিতির কারণে অস্ট্রেলিয়াও ঢাকার সঙ্গে একাধিক বৈঠক স্থগিত করেছে। গত ২৪ ও ২৫ জুলাই ফরেন অফিস কনসালটেশন এবং বাণিজ্য সংক্রান্ত দুটি বৈঠক হওয়ার কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে তা স্থগিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সেগুনবাগিচা।

স্টুডেন্ট লাইফে ইনকাম

“ছাত্রজীবন সুখের জীবন; যদি না থাকতো পরীক্ষা। ছাত্রজীবনে এটি একটি মুখরোচক বাক্য। পরীক্ষা শুধু লেখাপড়ায়ই নয়, আমরা সর্ব অবস্থায়ই পরীক্ষার সম্মুখীন হচ্ছি এবং পরীক্ষা দিচ্ছি। যেই পরীক্ষা মাতৃগর্ব থেকেই শুরু হয়। কারণ কেউ দশ মাসে ভূমিষ্ঠ হচ্ছে, কেউ আবার আরো কম সময়ে ভূমিষ্ঠ হচ্ছে। কোন বাচ্চ মেধাধী বেশি হচ্ছে, কোন বাচ্চা মেধা কম নিয়ে জন্ম লাভ করছে। কেউ ভালো ছাত্র হয়ে উঠছে, কেউ স্কুল কলেজের বারান্দায়ই যাচ্ছে না। আমরা সব সময় পরীক্ষার মধ্য দিয়েই যাচ্ছি। কেউ সেখানে সফল কেউ সেখানে বিফল।

কেউ পরীক্ষা দিচ্ছে জীবন যুদ্ধে, কেউ পরীক্ষা দিচ্ছে বাতিলের বিরুদ্ধে। আপনি পরীক্ষা না দিতে চাইলেও আপনাকে অসংখ্য পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হবে এবং হচ্ছেনও। আপনি পরীক্ষার হলে নকল করছেন, সেটা অন্যকে স্পাই দিবেন কি না, সেটাও পরীক্ষা। ইনকাম করতে গিয়ে অসৎ পথে না সৎ পথে ইনকাম করবেন, সেটাও একটা পরীক্ষা। কেউ সুদ, ঘোষ ও দুর্ণীতিতে জড়িয়ে পড়ছে, কেউ তা এড়িয়ে চলছে, এটাও পরীক্ষা। আর সব পরীক্ষার সেরা পরীক্ষা জীবন যুদ্ধের পরীক্ষা।

আর জীবন যুদ্ধের জন্য চাই ইনকাম বা টাকা। আমাদের ক্ষণস্থায়ী জীবনে ইনকাম না থাকলে জীবন চালানো কষ্টকরই নয়, মহা কষ্টের। কেউ ছাত্রজীবনে ইনকামের কথা চিন্তাই করতে পারে না। আবার কেউ কেউ ছাত্রজীবনেই তার ইনকামের ভিত গড়ে তলেছে। অপরদিকে অনেক ছাত্রছাত্রীরা ইনকামে জড়িয়ে পড়লে, ছাত্রজীবন নষ্ট করে ফেলছে। এটাও তার জন্য পরীক্ষা। ছাত্রজীবনে কোন কোন পন্থায় ইনকাম করা যায় দেখে নেয়া যাক:

  • টিউশনি করা।
  • অনলাইনে ব্যবসা বা সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যবসা করা।
  • কনটেন্ট তৈরী করা।
  • ফ্রিল্যান্সিং করা।
  • পার্ট টাইম জব করা।

ছাত্রজীবনে ইনকাম হতে লেখাপড়াবান্ধব। যেখানে সময় ব্যয় করলে আপনার সময়ও বিফলে যাবে না, অন্যদিকে ইনকামও আসবে। ছাত্রজীবনে ইনকামের সর্বোত্তম পথ হচ্ছে, টিউশনি। আপনি যে ক্লাসেই অধ্যয়ন করেন না কেন আপনার নিচের শ্রেণীর ছাত্রছাত্রীদের আপনি টিউশনি করবেন। এছাড়াও কোন কোচিং সেন্টারের সাথে জড়িত থাকতে পারেন। তাতে আপনি শিক্ষার পরিবেশের মধ্যেই থাকবেন। আপনি যেসকল ক্লাস শেষ করে এসেছেন, এতে যা শিখেছেন, তার চেয়ে বেশি শিখবেন ঐ ক্লাসের ছাত্রদের টিউশনি করালে। গরীব, নিম্নবিত্ত ছাত্রছাত্রীরা তো বটেই, উচ্চবিত্ত ছেলেমেয়েদেরও টিউশনি করা উচিত। তাতে সে তার ক্যারিয়ার ও শিক্ষা জীবনে উন্নতি লাভ করবে। কারণ আপনি যেটা লেখাপড়া করে শিখেছেন, সেটা যখন অন্য কাউকে শিখাবেন, তা আপনার জন্যই বেশি উপকৃত হবে। সেখান থেকে ঐ ছাত্রের চেয়ে আপনি অধিক পরিমাণে শিখবেন। কারণ ভালো ছাত্র হলেই ভালো শিক্ষক হওয়া যায় না।

টিউশনি ছাড়াও ছাত্রজীবনের সেরা ইনকামের পথ হচ্ছে, কনটেন্ট লেখা। কনটেন্ট লেখার মাধ্যমে আপনায় মেধা আরো বিকশিত হবে। অনেক ছাত্রছাত্রী আছে, যারা কিন্তু কোন লেখাপড়ায় ভালো কিছু গুছিয়ে লিখতে পারে না। অনেকে চিঠি ও দরখাস্তও গোছিয়ে লিখতে পারে না। কনটেন্ট লেখার পরে তাতে অবশ্যই উন্নতি ঘটবে। ফ্রিল্যান্সিং এর মাধ্যমে বাস্তব জীবনের সাথে পরিচিত হবেন এবং আপনার কমিউনিকেশন স্কিল বাড়বে। কমিউনিকেশন স্কিল ডেভেলপ করা মানে আপনার জীবনটাইকেই ডেভেলপ করা।

অনলাইন ব্যবসাও ছাত্রদের জন্য বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করতে পারে। অনেক ছাত্ররাই অবসর সময়ে ভিডিও দেখা, চেটিং করা, বন্ধু-বান্ধবদের সাথে আড্ডা দেওয়া ছাড়া আর কিছুই করে না। তাতে করে তার ছাত্রজীবনের অতি মূল্যবান সময় নষ্ট করে। এ সময় যদি সে অনলাইন ব্যবসার সাথে জড়িত থেকে বিভিন্ন ধরণের পন্যের ছবি ও পন্য সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে অনলাইনে (বিভিন্ন প্লাটর্ফমে) পোস্ট করলে অর্ডার আসবেই। পন্যটি সুবিধামত সময়ে ডেলিভারী দিয়ে ইনকাম করতে পারে। তাতে তার অবসর সময় ও লেখাপড়ার মাঝের অবসর সময়ের যথাযথ মূল্যায়ন করতে পারলো, তথাপি ইনকামও হলো। সে খরচের হাত থেকেও রক্ষা পাবে, কারণ অবসর সময়ে আড্ডা দিলে সেখানে খরচ হবেই। তাতে কর্মবান্ধব সুষ্ঠু ও সুন্দর সমাজ গড়ে উঠবে। কারণ যেখানে কাম আছে, সেখানে আকাম কম হয়। কথায় আছে না; অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা। বসে বসে অলস সময় পাড় করলে শয়তান সেখানে নানাভাবে অসামাজিক কার্যলাপে প্রলুব্ধ করবেই।

পার্ট টাইম জব করাও ছাত্রজীবনে ইনকামের অন্যতম পথ। লেখাপড়ার ফাঁকে ফাঁকে কিছুটা সময় সরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে কাজ করা যায়। সরকারী কাজ যেমন ভোটার তথ্য হালনাগাদ করা, আদমশুমারীর কাজ করা, বিভিন্ন গবেষণামূলক কাজের প্রাথমিক তথ্য কালেক্ট করা ইত্য্যাদি।

এছাড়াও বেসরকারী প্রতিষ্ঠানেও কাজ কাজ করা যায়। দেশে অনেক দেশি-বিদেশী এনজিও প্রতিষ্ঠান আছে, যাদের কাজই হচ্ছে গবেষনা ও রির্পোট প্রদান বা প্রকাশ করা। আর গবেষনা করতে গেলে অবশ্যই ডাটা কালেক্ট করতে হয়, ডাটা এন্ট্রি করতে হয়। এসমস্ত কাজ ছাত্রছাত্রী অনায়াসে করতে পারে।

অনেকেউ বলতে পারেন যে, কিভাবে শুরু করবো? তোমাকে মনে রাখতে হবে যে, তোমার পথ তোমাকেই দেখতে হবে, তোমার পথ তোমাকেই তৈরী করতে হবে, কেউ শিখিয়ে-গিলিয়ে বলে দিবে না। তোমার যে কাজ করার মন মাসিকতা আছে এবং তা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ তা তোমাকে প্রকাশ করতে হবে, অন্যকে সেটা বুঝাতে হবে, এমনকি কোন বিনিময় ছাড়াও কাজ করতে ইচ্ছুক থাকতে হবে। যেখানে তুমি বিনিময় ছাড়া অবসর সময়টা কোন প্রতিষ্ঠানে দিবে, এক সময় তোমাকে বিনিময় দিয়েও রাখতে পারবে না। কারণ ততক্ষণে তোমার ডিমান্ড অনেকে বেড়েছে। এমন ক্যারিয়ার গঠন করতে হবে।

উপরোক্ত কাজগুলো ছাড়াও ট্যুরিস্ট গাইড, বিদেশী ভাষা শিখা ও শিখানো, পরামর্শক প্রতিষ্ঠান (আইটি, সিভিল, আইন ইত্যাদি) এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা, একুশে বই মেলায় পার্ট টাইম জব করা যেতে পারে। কর্মবান্ধব সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে সমাজ তথা দেশ উন্নত হতে বাধ্য।

লেখক,

-শাহজাহান আলী মূসা

বাজেট ২০২৪-২৮ঃ রাজনীতির বাজেট নাকি বাজেটের রাজনীতি

আজিজুল হক

দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আকারের বাজেট পাস হলো সংসদে, এমন একটি সময় বর্তমান অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী: জাতিকে উপহার দিলেন- যখন মূল্যস্ফীতির চাপ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পতন, ব্যাংক খাতে বিশৃঙ্খলা, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে দুর্বলতা ইত্যাদি সব ক্ষেত্রে যে অর্থনৈতিক সংকট বিরাজ করছে, এর ফলে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা আরও অনেক বেশি ভঙ্গুর হয়ে গেছে। সংবাদপত্রে উঠে আসা রিপোর্ট বলছে, নিত্যপণ্যের বাড়তি দামের কারণে কষ্টে আছে মানুষ।

মে মাসেও মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ শতাংশের কাছাকাছি। আছে ডলার-সংকট। এ কারণে পণ্য আমদানি সংকুচিত করে রাখা হয়েছে। গত বছরের মে মাসের তুলনায় এ বছরের মে মাসে রপ্তানি আয় কমে গেছে ১৬ শতাংশ। আবার রাজস্ব আয়েও ভালো প্রবৃদ্ধি নেই। বাড়ছে দেশি-বিদেশি দেনা পরিশোধের চাপ।

কিন্তু এতসবের পরেও, অর্থনীতির জটিল হিসাব-নিকাশ বোঝেন না শ্রমজীবীসহ সমাজের নিম্নআয়ের মানুষরা। ক্ষুধার তাড়নায় খাদ্য জোগাতে হিমশিম খাওয়া মানুষজন বোঝেন প্রতি বছর বাজেট মানেই ব্যয়ের নতুন নতুন খাত তৈরি হওয়া। তাই বাজেট নিয়ে তাদের উৎসাহ কম, বরং আতঙ্কটাই বেশি।

জাতীয় সংসদে বাজেট বক্তব্যের শুরুর দিকে অনেক প্রতিশ্রুতি থাকে, ভালো ভালো কথা থাকে। কিন্তু শুভংকরের ফাঁকিতে তা আর কাজে লাগানো হয় না। বরং সুবিধাবাদীদের স্বার্থ রক্ষায় বিভিন্ন ধরনের বিচিত্র সব করের প্রস্তাব দেয়া হয়। এ ধরনের নৈতিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তিহীন দর্শন যে বাজেটে থাকে, তাতে সংবিধানে উল্লেখিত বৈষম্যহীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তোলার মূল উদ্দেশ্য ধূলিসাৎ হয়ে যায়।

আমরা একটি দীর্ঘকাল ধরে দেশের অর্থনীতির চরকায় যে সুতো কাটতে দেখেছি- মোটাদাগে সেগুলোর নাম যদি আমরা ধরে নেই নীতিমালা: সেগুলো তিন ধরনের-নীতির ভ্রান্তি ও দুর্বলতা, নীতি গ্রহণে দ্বিধা-দ্বৈত নীতি। এসবের সুনিপুণ মেলবন্ধনে হয়েছে নীতির অসারতা- সারমর্ম হিসেবে যা অকার্যকর হয়ে গেছে। গত দুইটা বছর ধরে টানা নজিরবিহীন মূল্যস্ফীতি ও রিজার্ভ পতনে রাষ্ট্র নির্বিকার, মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনে নিদারুণ পুরবস্থা চলছে।

কিন্তু এই সংকটে আমরা কী নীতি গ্রহণ করলাম? সংকাটকালীন সময় কোনো উদ্ভাবনী নীতি কাজে আসে না, প্রথাগত নীতি বাস্তবায়ন করতে হয়। মূল্যস্ফীতি কমানোয় মৌলিক নীতি হলো বাজারে মুদ্রা সরবরাহ কমানো ও নির্দিষ্ট খাত অনুসারে সুদের হার বাড়িয়ে দেয়া। সারা বিশ্ব এ নীতি অনুসরণ করেছে। ভেঙে পড়া শ্রীলঙ্কা আমাদের সামনে ভুলন্ত আমরা তো এ এ পথে অগ্রসর হবো না। আমাদের খুল্লাম যুল্লা সুদহারের নয়-ছয় নীতি প্রণয়ন হয়। কাদের সঙ্গে আলাপ করে এটি করা হয়ে সেটিও আমরা জানি- যা এখন ওপেন সিক্রেট। কিন্তু এর ফলে কি বৈদেশিক বিনিয়োগ এসেছে? কিংবা বাজি খাতে কর্মসংস্থান বেড়েছে? উত্তর হচ্ছে, না, এমন কিছুই ঘটেনি। একদিকে আমরা বাজারভিত্তিক অর্থনীতির কথা বলছি, অন্যদিকে চরম নিয়ন্ত্রণমূলক অর্থনৈতিক নীতিমালা বজায় রেখেছি। যার ফলে মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরা যায়নি।

পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র শ্রীলংকার মূল্যস্ফীতি প্রায় ৭০ শতাংশে পৌঁছেছিল। শ্রীলংকা কীভাবে খাদ থেকে উত্তরণে সফল হলো? আমাদের দেশে বিরাজমান উচ্চ মূল্যস্ফীতিই বলে দিচ্ছে আমরা যথাসময়ে সঠিক নীতি গ্রহাণ ব্যর্থ হয়েছি।

অকার্যকর নীতি বাস্তবায়ন করতে চাওয়ার আরেকটি বড় উদাহরণ হলো বৈদেশিক মুদ্রার ব্যাপক রিজার্ভ পতন। আমাদের মোট জাতীয় রিজার্ভ ক্রমেই নিম্নমুখী। এ পরিস্থিতির কোনো দৃশ্যমান উন্নতি নেই। আমরা ডলার বিনিময় হারের বিপরীতে টাকার মূল্যমান ধরে রাখতে চেয়েছি যেন জিডিপিতে মাথাপিছু আয় বেশি দেখানো যায়। আমাদের পলিসিমেকারদের মধ্যে এটি এক ধরনের ধারণাগত ভুল। যেখানে বিশ্বের অন্যতম দোলাচালে থাকা রাষ্ট্রের তালিকায় ভারত, চীন, ভিয়েতনামসহ অন্য দেখ ডলারের বিপরীতে মুদ্রার মান অবমূল্যায়ন করল, সেখানে আমাদের দেশে দীর্ঘ সময় টাকা শক্তিশালী করে রাখা হয়। এরপর হঠাৎ করেই টাকার মানের অবমূল্যায়ন করা হলে সেই চাপ গিয়ে পড়ে আমদানিতে। রিজার্ভ ক্ষয় বাড়তে থাকে। পরবর্তী সময়ে এ পরিস্থিতি উন্নয়নের জন্য যেসব পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে (বাজারভিত্তিক সুদহার ও ক্রলিং গেগ) সেগুলোও সময়মতো গ্রহণ হ্যালি, হলেও অণেক দেরিতে গ্রহণ করা হয়েছে, সেটিও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) চাপে। অথচ দেশের অর্থনীতিবিদরা এসব সুপারিশ অনেক আগে থেকেই করে আসছেন যা গ্রহণে আমাদের এক ধরনের মানসিক প্রতিবন্ধকতা দেখা যায়।

মনে রাখা দরকার মুদ্রানীতি এককভাবে কাজ করে না। আর্থিক নীতির সামঞ্জস্যতা রক্ষা করা প্রয়োজন। অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে বিবেচনায় নেয়া হয়নি। সমন্বিত অর্থনৈতিক সূচকের দিক না তাকিয়ে আইএমএফের চাপে তাদের কথাই যোগ-বিয়োগ করে নতুন বাজেট করা হয়েছে এখানেও আইএমএফ কম আকারের বাজেট দিতে বলেছিলো, যা বাস্তবায়ন হয়নি কাগজ কলমেও।

ঘোষিত এই বাজেটে দুটি সমস্যাকে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দেয়া যেত মূল্যস্ফীতি কমানো ও সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দেয়া। প্রস্তাবিত বাজেটে উন্নয়ন বাজেট ও পরিচালন ব্যয় সমন্বয় করা হয়নি, উন্নয়ন বাজেটও কমানো যেত। কারণ জাতীয় সংকটের সময়ে সাধারণ ঐকিক নিয়মের মধ্যেই কৃচ্ছ্রসাধন হয়।

এই বাজেটের আরেকটি বিতর্কিত ব্যাপার হচ্ছে বড় বড় মেগা প্রকল্প নেয়া। অর্থনীতিবিদ এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতারা যেগুলো নিয়ে ব্যাপক কথাবার্তা বলছেন। এই মেগা প্রকল্পগুলোর মধ্যে চারটি এ বছর আর ছয়টি ২০২৫ সালে শেষ হওয়ার কথা। প্রতি প্রাক্কলিত ব্যায়ের বাইরে বরাদ্দ দিয়ে প্রকল্পগুলোকে চলমান রাখার তো কোনো দরকার নেই। বরং যেগুলো শেষের পথে কেবল সেগুলোর বরাদ্দ দিয়ে প্রকল্প দ্রুত সম্পন্ন করা যেত। পরিচালন ও উন্নয়ন বাজেট সমন্বয়ের অভাবে আসন্ন অর্থবছরেও বাজেট ঘাটতি রাখা হয়েছে জিডিপির ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। গত বছর এটি ছিল জিডিপির ৪ দশমিক ৭ শতাংশ। তাহলে মূল্যস্ফীতি কমানোর চেষ্টা কীভাবে করা হলো? আর মানুষকে স্বস্তি দেয়া যেত সামাজিক নিরাপত্তা খাতের বরাদ্দের মাধ্যমে। কিন্তু এ খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে মাত্র ১২ শতাংশ। সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর বিষয়টি যদি জিডিপির শেয়ারে বা মোট বাজেটের আকারে দেখিড়সামান্য একটু পরিবর্তন হয়েছে। বাজেটের হিসাবে দেখলে গত বছর যেটা ১৭ শতাংশ, এ বছর সেটা ১৭ দশমিক ১ শতাংশ। জিডিপির আকারে দেখলে সেক্ষেত্রেও সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী খাতে ২ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে ২ দশমিক ৪৩ শতাংশ বেড়েছে। কিন্তু এখানে শুভঙ্করের ফাঁকি আছে। এ খাতের বরাদ্দ ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানো হয়েছে।

বিস্তারিত দেখলে সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর মধ্যে রয়েছে সরকারি কর্মচারী ও তাদের পরিবারদের পেনশনের টাকা, সঞ্চয়পত্রের সুদের অর্থ, কৃষি খাতে ভর্তুকি, মুক্তিযোদ্ধাদের যে বিভিন্ন প্রকল্প রয়েছে সেগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এ খাতে। এগুলো করার ফলে এ খাতের বরাদ্দে একটা বড় অ্যামাউন্ট দেখা যায়। কিন্তু সেগুলো যদি বাদ দেয়া যায় তাহলে কিন্তু খুব একটা বাড়েনি, বরং কমেছে। তবে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে মূল্যস্ফীতি কমানোর জন্য সরকার বেশকিছু পণ্যের ওপর কর ছাড়ের প্রস্তাবও করেছে। এটি একটি ভালো প্রস্তাব। কিন্তু বিষয়টি হচ্ছে কীভাবে তা বাস্তবায়ন হবে। দেখা যায় কর কমানোর পর বাজারে পণ্যের দাম সেই অনুপাতে কমে না, এক্ষেত্রে বাজার ব্যবস্থাপনার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। করের দোহাই দিয়েই মূল্য বাড়িয়ে দেয়া হয়, বাজার মনিটরিং করা হয় না।

বাজেটের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে প্রতি বছরই জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে দেয়া লক্ষ্যমাত্রা ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে। যদিও রাজস্ব বোর্ডের ওপর দেয়া লক্ষ্যমাত্রা গত ১০ বছরে কোনোভাবেই পরিপালন করা সম্ভব হয়নি। চলতি বছরে যে লক্ষ্যমাত্রা দেয়া হয়েছিল সেটার তুলনায় আগামী অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হয়েছে। অথচ চলতি বছরের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ঘাটতি রয়ে গেছে। তাই লক্ষ্যমাত্রাটা বাস্তবসম্মতভাবে করা উচিত। রাজস্ব আহরণের জন্য অনেক প্রচেষ্টা দেখছি। দেশে উৎপাদিত বিভিন্ন জুসের ওপর, মোবাইল ফোনের টকটাইমের ওপর, পার্কে প্রবেশ ফির ওপরে দেয়া হচ্ছে। এগুলো তো ভোক্তাদের ওপরে গিয়ে পড়ে। বিদ্যমান কাঠামো দিয়ে বেশি রাজস্ব আহরণ সম্ভব নয়। এছাড়া করনীতি ও কর প্রশাসন এখনো আলাদা নয়। আবার অনেকে কর দিতেও চান, ভাবেন সৎভাবে বেঁচে থাকার কথা। কিন্তু তা নেয়ার সক্ষমতা নেই সরকারের। তাই কর কাঠামোর সংস্কার প্রয়োজন। কর কাঠামোর সঙ্গে প্রযুক্তির সংযোগ ঘটিয়ে এ ব্যবস্থার সরলীকরণ আবশ্যক। আরেকটি সংস্কারের কথা অর্থনীতিবিদরা সর্বদাই বলে আসছেন তা হলো ব্যাংক খাতের সংস্কার। ব্যাংক খাতকে অর্থনীতির ‘প্রাণকেন্দ্র’ বলা হয়। বিভিন্ন খাতকে চলমান রাখার জন্য দরকার ভালো ব্যাংক খাত। অথচ খাতটি ভঙ্গুর থেকে ভঙ্গুরতর হয়ে গেছে। এ খাতে সাধারণ মানুষের জন্য কিছু নেই, আস্থাও নেই। কিছু ব্যাংক আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে গড়িমসি করে। ব্যাংক খাত গোষ্ঠীস্বার্থ রক্ষা করে চলছে। এ খাতে চালু হয়েছে ঋণ পুনঃতফসিল করার সংস্কৃতি এবং নতুন নতুন কায়দায় তা করা হচ্ছে। ২ শতাংশ অর্থ জমা দিয়ে বারবার পুনঃতফসিল করার সুযোগ দেয়া হয়েছে কোনো ধরনের যাচাই-বাছাই ছাড়া। এতে মানুষের আস্থার জায়গাটা ভেঙে গেছে। জনপ্রতিনিধিরা কীভাবে তা ফিরিয়ে আনবেন, সেটাও এ বাজেটের একটা লক্ষ্য হওয়া উচিত।

আমরা কেবল প্রবৃদ্ধির কথা বলছি। কিন্তু এ প্রবৃদ্ধি আমাদের কী দিল? আয়বৈষম্য তো বাড়ছেই। পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টির সক্ষমতা কমে গেছে অর্থনীতির। বলা হচ্ছে, বেকারত্বের হার ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। এ হিসাব কীভাবে করা হয়, তা তো আমরা জানি। সপ্তাহে ১ ঘণ্টা কাজ করলেও তা যুক্ত হচ্ছে। বাস্তবে বেকারত্বের হার ১০ দশমিক ৬ শতাংশ। কিছুদিন আগে একটি পত্রিকায় এসেছে, চাকরির জন্য এসএসসি পাস দরকার, অথচ আবেদন বেশি এসেছে মাস্টার্স পাস প্রার্থীদের কাছ থেকে। এর পরও যে চাকরিগুলো সৃষ্টি হচ্ছে সেগুলো অনানুষ্ঠানিক খাতে। যতটুকু প্রবৃদ্ধি হয়েছে, তার বেশির ভাগই অনানুষ্ঠানিক খাত থেকে আসা। শিল্প খাতে ৯০ শতাংশের বেশি এবং সেবা খাতে ৬৭ শতাংশের বেশি অনানুষ্ঠানিক খাতের অবদান। অথচ অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মীদের আয় কম ও কাজের নিশ্চয়তা নেই। তবু বাজেটে শ্রমবাজার সংস্কারের কোনো লক্ষ্যমাত্রা নেই। আরেকটি সংস্কারের কথা না বললেই নয়ড়প্রশাসনিক সংস্কার। আগেও একবার বলেছি বড় বড় মেগা প্রকল্প সময়মতো শেষ হয় না। অথচ অর্থ বরাদ্দ হচ্ছে, ব্যয় হচ্ছে। এ খাতে জবাবদিহির সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। সরকারি সেবা দেব, কিন্তু জবাবদিহির বাইরে থাকব, তা ঠিক নয়। নিজেরা জবাবদিহির বাইরে থাকলে অন্যদের কীভাবে এর মধ্যে আনবেন? ক্ষমতাসীন ও দুর্নীতিবাজদের সুবিধা দেব, অন্যদেরও ছিটেফোঁটা এদিক-সেদিক দেব-এমন অনুমিতি ও দর্শনের ওপর ভিত্তি করেই বাজেট করা হয়েছে। অন্যরা তা গ্রহণ করলে করুক, চিৎকার করলে করুক, তা নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই সরকারের। এসব পদক্ষেপের নৈতিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তি নেই। নৈতিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তিকে অবজ্ঞা করে বৈষম্যমূলক সমাজ সৃষ্টির কাজ করা হচ্ছে।

রাষ্ট্রীয় সম্পদ, সৌভাগ্য তথা স্বাধীনতার সুফল সবার মধ্যে সুষম বণ্টন ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও সুনিশ্চিত সুশাসন এবং জবাবদিহির সুযোগ ছাড়া গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থা গড়ে ওঠে না। গণতান্ত্রিক মূলবোধ প্রতিষ্ঠায় অযুত ত্যাগ স্বীকারের প্রকৃত প্রতিফল অর্জন সম্ভব হয় না সুশাসন সুনিশ্চিত না হলে। সম্পদ অর্জনের নৈতিক ভিত্তি বা প্রক্রিয়া স্বচ্ছ না হলে বণ্টন ব্যবস্থাপনা সুষ্ঠু হয় না। সমাজে বণ্টনবৈষম্য দূর করতে সুশাসন প্রেরণা ও প্রভাবক ভূমিকা পালন করে থাকে। এটি দায়িত্ববোধ গড়ে তোলার জন্যও জরুরি। যেমন- আজকাল এক দেশ বা অর্থনীতির প্রচুর অর্থ বিদেশে কিংবা অন্য অর্থনীতিতে দেদার পাচার হয়ে থাকে। বিনা বিনিয়োগে বা বিনা পরিশ্রমে প্রকৃত পণ্য ও সেবা উৎপাদন ব্যতিরেকে অর্থ অর্জিত হলে অবৈধভাবে অর্জিত সেই অর্থ পাচার হবেই। অর্থ বৈধ পন্থায় উপার্জিত না হলে সে অর্থের মালিকানার প্রতি দায়-দায়িত্ববোধও গড়ে ওঠে না। জাতীয় ঐক্য ও সংহতি শক্তিশালীকরণেও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিমূলক পরিবেশের আবশ্যকতা রয়েছে। কেননা, সমাজে একপক্ষ বা কতিপয় ব্যক্তি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির মধ্যে থাকলে, আর বেশির ভাগের কারো কাছে কোনো জবাবদিহিতা না থাকলে অর্থাৎ একই যাত্রায় ভিন্ন আচরণে নিষ্ঠ হলে পারস্পরিক অভিযোগের নাট্যশালায় জাতীয় ঐক্য গড়ে ওঠে না। সমতা বিধানে, সবার প্রতি সমান আচরণের (যা গণতন্ত্রের মর্মবাণী) জন্যও স্বচ্ছতা তথা আস্থার পরিবেশ প্রয়োজন। আরেকটি বিষয়, সুশাসনের অবর্তমানে জবাবদিহিহীন পরিবেশে, আয়-ব্যয় ব্যবস্থাপনায় অস্বচ্ছতার অবয়বের অন্যতম প্রতিফল হলো দুর্নীতি। দুর্নীতি শুধু ব্যক্তিবিশেষ অর্থাৎ যে দুর্নীতি করে তাকে ন্যায়নীতিহীনতার জন্য ক্ষতিগ্রস্ত করে তা নয়, তার দ্বারা সমাজকে নেতৃত্বদান বা যেকোনো ক্ষেত্রে দৃঢ়চিত্ত অবস্থান গ্রহণে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালনকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে দেয়। সর্বত্র তাকে দুর্বল করে দেয়। দুর্নীতিবাজ নেতৃত্বের জন্য বা কারণে সমাজে আস্থার সঙ্কট সৃষ্টি হয়। নেতৃত্বের এ অধোগতির প্রেক্ষাপট প্রত্যক্ষভাবে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাবজনিত পরিবেশ নির্মাণ করে। নেতৃত্বের কার্যকলাপে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি না থাকলে সমাজে সংসারে সে নেতৃত্বের অধীনে আস্থার সঙ্কট সৃষ্টি হয়। এটি পরস্পর প্রযুক্ত সমস্যা। স্বচ্ছতা-জবাবদিহির অনুপস্থিতির অবসরে আত্মঘাতী পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যেমন- যেকোনো সেবা প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ। যেমন- স্বেচ্ছাচারিতায়, নানান অনিয়ম ও অবৈধ লেনদেনের মাধ্যমে শিক্ষায়তনে শিক্ষক, সুশীল সেবক, হাসপাতালে চিকিৎসক কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে কর্মীবাহিনী নিয়োগ। অর্থ বিনিময় ও নানান অনিয়মের কারণে যোগ্যতা ও মেধার ভিত্তিতে ভালো এবং যোগ্য সুশীল সেবক, চিকিৎসক, শিক্ষক, আইনরক্ষক নিয়োজিত হতে পারে না। সুশীল সেবক, চিকিৎসক অমেধাবী ও অযোগ্য শিক্ষক এবং আইন রক্ষকের কাছ থেকে গুণগত মানসম্পন্ন প্রশাসনিক সেবা, চিকিৎসা, শিক্ষা বা তালিম বা অনুসরণীয় আদর্শ লাভ সম্ভব হয় না। নানা আঙ্গিকে পরীক্ষা-পর্যালোচনায় দেখা যায়, শিক্ষক, চিকিৎসক, আইনজীবী, ব্যবসায়ী এমনকি চাকরিজীবীদেরও বাঞ্ছিতভাবে জবাবদিহির আওতায় আনা সম্ভব হয় না। অতিমাত্রায় কোটারি, সিন্ডিকেট বা দলীয় বা রাজনীতিকীকরণে পেশাজীবী, সংস্থা সংগঠন এবং এমনকি সুশীলসেবকরাও প্রজাতন্ত্রের হয়ে দলনিরপেক্ষ অবস্থানে থাকতে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে, গলদঘর্ম হতে হচ্ছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে এমন একটি পরিবেশ তৈরি হয় যার ছত্রছায়ায় বিভিন্নভাবে অবৈধ অর্জন চলতে এর পথ সুগম হতে পারে। সেবক প্রভুতে পরিণত হলে সম্পদ আত্মসাৎ, ক্ষমতার অপব্যবহারের দ্বারা অর্জিত অর্থ দখলের লড়াইয়ে অর্থায়িত হয়ে এভাবে একটি ঘূর্ণায়মান দুষ্টচক্রবলয় হয়ে থাকে। অর্থাৎ সুশাসনের অভাবে স্বচ্ছতার অস্বচ্ছতায় ঘুরেফিরে পুরো প্রক্রিয়া বিষিয়ে তোলে। সুতরাং সব ক্ষেত্রে সর্বাগ্রে উচিত স্বচ্ছতা-জবাবদিহি নিশ্চিত করা। এটি প্রয়োজন গণতন্ত্র ও সার্বিক উন্নয়নের স্বার্থে। বলার অপেক্ষা রাখে না, সুশাসন স্বচ্ছতা-জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে সত্যিকার উন্নয়ন হবে না। এটি পরস্পরের পরিপূরক। স্বচ্ছতার অস্বচ্ছতায় যে উন্নয়ন হয় তাতে জনগণের সুফল নিশ্চিত হয় না। এ উন্নয়নের কোনো উপযোগিতা বা রিটার্ন নেই। এটি এক ধরনের আত্মঘাতী ভেল্কিবাজি। জিডিপি প্রবৃদ্ধির মূল কথা হলো- যে অর্থই ব্যয় করা হোক না কেন, সেই আয়-ব্যয় বা ব্যবহারের দ্বারা অবশ্যই পণ্য ও সেবা উৎপাদিত হতে হবে। পণ্য ও সেবা উৎপাদনের লক্ষ্যে যে অর্থ আয় বা ব্যয় হবে সেটিই বৈধ। আর যে আয়-ব্যয় কোনো পণ্য ও সেবা উৎপাদন করে না সেটি অবৈধ, অপব্যয়, অপচয়। জিডিপিতে তার থাকে না কোনো ভূমিকা। আরো খোলাসা করে বলা যায়, যে আয় পণ্য ও সেবা উৎপাদনের মাধ্যমে অর্জিত হয় না এবং যে ব্যয়ের মাধ্যমে পণ্য ও সেবা উৎপাদিত হয় না সেই আয়-ব্যয় জিডিপিতে কোনো অবদান রাখে না। কোনো প্রকার শ্রম বা পুঁজি বিনিয়োগ ছাড়া মওকা যে আয় তা সম্পদ বণ্টন বৈষম্য সৃষ্টিই শুধু করে না সেভাবে অর্জিত অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রেও সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ধার ধারা হয় না। ফলে তা সৃষ্টি করে আর্থিক বিচ্যুতি। এভাবে যে অর্থ আয় বা খরচ করা হয় তা প্রকারান্তরে অর্থনীতিকে পঙ্গু ও পক্ষাঘাতগ্রস্ত করে।

-লেখক

কলামিস্ট ও অর্থনীতি বিশ্লেষক

অনিবার্য বিপ্লবের ইশতেহার’র কবি আসাদ বিন হাফিজ আর নেই

শরফুদ্দীন আহমেদ

‘অনিবার্য বিপ্লবের ইশতেহার’ খ্যাত কবি; বাংলা কে সাহিত্যের অন্যতম প্রধান ও ৮০-এর দশকের খ্যাতিমান কবি আসাদ বিন হাফিজ (৬৬) পহেলা জুলাই মহান রবের দরবারে পাড়ি জমিয়েছেন। আর আগের কয়েক দিন ধরেই তিনি জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে লাইফ সাপোর্টে ছিলেন। রোববার সন্ধ্যার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় শোকে ভেঙে পড়েন তার ভক্ত-অনুরাগীরা। দিবাগত রাত ১২টা ৫৫ মিনিটে আনুষ্ঠানিকভাবে তার মৃত্যুর সংবাদ ঘোষণা করেন চিকিৎসকরা। এ সংবাদে তার অনুরাগী অগণিত পাঠক, কবি, সাহিত্যিক ও সাস্কৃতিক কর্মীদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। খাতিম্যান এই কবি স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়েসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। পরদিন জোহর নামাজের পর জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে তার প্রথম নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।

নামাজে জানাজা শেষে তার লাশ নিজ গ্রামের বাড়ি গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার মোক্তারপুর ইউনিয়নের বড়গাঁও গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আসরের নামাজের পর দ্বিতীয় নামাজে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে বড় ভাই অধ্যাপক ইউসুফ আলীর কবরের পাশে তাকে দাফন করা হয়।

প্রিয় কবি ১৯৫৮ সনের ১ জানুয়ারি গাজীপুরের কালীগঞ্জের মোক্তারপুরের বড়গাঁও এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবে তিনি নিজ গ্রাম বড়গাঁও প্রাইমারি স্কুলে এবং বাড়ির পাশের

মক্তবে আরবি শেখেন। ১৯৮০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতক (সম্মান) ও ১৯৮৩ সালে বাংলা সাহিত্যে মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করেন তিনি। শিক্ষাজীবন শেষ করে তিনি বাংলার শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন তা’মীরুল মিল্লাত মাদরাসায়। পরে মানারাত স্কুল অ্যান্ড কলেজে বাংলার প্রভাষক পদে যোগদান করেন। এছাড়াও তিনি মাসিক পৃথিবী পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক, সাইমুম শিল্পীগোষ্ঠীর পরিচালক, বাংলা সাহিত্য পরিষদের নির্বাহী, প্রীতি প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সদস্য ছিলেন।

কবি ফররুখ আহমেদের অনুসারী কবি আসাদ বিন হাফিজ ছোটবেলা থেকেই ইসলামিক সাংস্কৃতিক চর্চায় মনোনিবেশ করেন। তারই ধারাবাহিকতায় তিনি তার সাহিত্যে বাংলার মুসলিম সমাজের পুনর্জাগরণ এবং বিপ্লবের অনুপ্রেরণা প্রকাশ করেছেন। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের সৃজনশীলতার পাশাপাশি তিনি সাহিত্যে ইসলামিক দৃষ্টিভঙ্গির ব্যবহারেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তার সাহিত্যে বিপ্লবী চিন্তা চেতনার প্রকাশ ঘটে। তিনি ইসলামী সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সাথে জড়িত ছিলেন।

কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, শিশুসাহিত্য, গবেষণা, সম্পাদনাসহ সাহিত্যের সব শাখাতেই তিনি অসামান্য প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। তার লেখা প্রায় ৮১টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। তার উল্লেখযোগ্য ও আলোচিত কাব্যগ্রন্থ ‘কি দেখো দাঁড়িয়ে একা সুহাসিনী ভোর’ এবং ‘অনিবার্য বিপ্লবের ইশতেহার’।

কবির সাহিত্য রচনার ভাষা অত্যন্ত সহজ-সরল, দুর্বোধ্যতামুক্ত। এ কবির কাব্যসৌধ গড়ে উঠেছে সুবোধ্যতার ভিতের ওপর। কবির শ্রেষ্ঠ রচনা হল ‘অনিবার্য বিপ্লবের ইশতেহার’। এই গ্রন্থে কবিতা ‘অনিবার্য বিপ্লবের ইশতেহার’ কবিতাটি সমগ্র বাংলা সাহিত্যের মধ্যেই একটি অন্যতম সেরা কবিতা। তিনি যে-সমাজের স্বপ্ন দেখেন তার অসাধারণ এক কাব্যিক রূপ দিয়েছেন এই কবিতায়। যা বাংলা সাহিত্যে আর কোনো কবির কলমে এ রকমভাবে ফুটে উঠেনি। তার এ কবিতার কয়েকটি চরণ-

“আমি আপনাদেরকে আরেকটি অনিবার্য বিপ্লবের জন্য

প্রস্তুতি নেয়ার কথা বলছি।

বিপ্লবে প্রতিটি নাগরিকের জীবন হয় যে

একেকজন যোদ্ধার জীবন

প্রাপ্ত বয়স্ক প্রতিটি মানুষ হয়

একেকজন আমূল বিপ্লবী

প্রতিটি যুবক

নারীর বাহুর পরিবর্তে স্বপ্ন দেখে উত্তপ্ত মেশিনগানের

আর রমণীরা

সুগন্ধি রুমালের পরিবর্তে পুরুষের হাতে তুলে দেয়

বুলেট, গ্রেনেড।”

উপরিউক্ত চরণগুলোতে কবির সাহিত্যিক দ্যোতনা প্রকাশ পেয়েছে। আবার কবির আদর্শের বিপ্লবের ব্যঞ্জনা ধ্বনিত হয়েছে নিম্নোক্ত চরণগুলোতে-

“আমি আমার জনগণকে

আসন্ন সেই বিপ্লবে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য উদাত্ত আহ্বান

জানাচ্ছি।

যেখানে অন্ধকার

সেখানেই বিপ্লব

যেখানে ক্লেদাক্ত পাপ ও পঙ্কিলতার সয়লাব সেখানেই বিপ্লব

যেখানে নগ্নতা ও বেহায়াপনার যুগল উল্লাস

সেখানেই বিপ্লব

যেখানে মিথ্যার ফানুস

সেখানেই বিপ্লব

বিপ্লব সকল জুলুম, অত্যাচার আর নির্যাতনের বিরুদ্ধে বিপ্লব অন্তরের প্রতিটি কুচিন্তা আর কুকর্মের বিরুদ্ধে।”

কাব্যগ্রন্থঃ ১. কি দেখো দাঁড়িয়ে একা সুহাসিনী ভোর (১৯৯০) ২. অনিবার্য বিপ্লবের ইশতেহার (১৯৯৬) শিশুতোষ গ্রন্থঃ ১. হরফ নিয়ে ছড়া (১৯৮৯) ২. আলোর হাসি ফুলের গান (১৯৯০) ৩. কুক কু রুকু (১৯৯২) ৪. ইয়াগো মিয়াগো (১৯৯৪) ৫. আল্লাহ মহান (২০০১) ৬. কারবালা কাহিনী (২০০১) অনুবাদ কাব্যগ্রন্থঃ ১. নাতিয়াতুন নবী (২০০৩) ছড়াঃ ১. রাজনীতি ধুমধাম (১৯৮০) ২. হিরালালের ছড়া (২০০৩) গবেষণা গ্রন্থঃ ১. আল-কুরআনের বিষয় অভিধান (১৯৯২) ২. ইসলামী সংস্কৃতি ৩. ছন্দের আসর ঐতিহাসিক গ্রন্থঃ ১. ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস (১৯৯০) গল্প গ্রন্থঃ ১. পনেরই অগাস্টের গল্প (১৯৯০) জীবনী গ্রন্থঃ ১. আপোষহীন এক সংগ্রামী নেতা (১৯৯২) ২. নাম তার ফররুখ (১৯৯৭) কিশোর সাহিত্য সম্পাদনাঃ ১. নতুন পৃথিবীর স্বপ্ন (১৯৯২) ২. আলোর পথে এসো (১৯৯৯) ঐতিহাসিক দুঃসাহসিক অভিযান সিরিজঃ ১. গাজী সালাউদ্দীনের দুঃসাহসিক অভিযান (১৯৯৭) ২. সালাউদ্দীনের কমান্ডো অভিযান (১৯৯৭) ৩. সুবাক দুর্গে আক্রমণ (১৯৯৭) ৮. ভয়ংকর শিরযন্ত্র (১৯৯৭) ৯. ভয়াল রজনী (১৯৯৮) ১০. আবারো সংগ্রাম (২০০০) ১১. দুর্গ পতন (২০০০) ১২. ফেরাউনের গুপ্তধন (২০০১) ১৩. উপকূলে সংঘর্ষ (২০০১) ১৪. সর্প কেল্লার খুনী (২০০১) ১৫. চারিদিকে চক্রান্ত (২০০২) ১৬. গোপন বিদ্রোহ (২০০২) ১৭. পাপের ফল (২০০২) ১৮. তুমুল লড়াই (২০০২) ১৯. উফ্র দরবেশ (২০০২) ২০. টার্গেট ফিলিস্তিন (২০০২) ২১. গাদ্দার (২০০৩) ২২. বিষাক্ত ছোবল (২০০৩) ২৩. খুনী চক্রের আস্তানায় (২০০৩) ২৪. পাল্টা ধাওয়া (২০০৩) ২৫. ধাপ্পাবাজ (২০০৪) ২৬. হেমস এসর যোদ্ধা (২০০৪) ২৭. ইহুদী কন্যা (২০০৪) ২৮. সামনে বৈরুত (২০০৪) ২৯. দূর্গম পাহাড় (২০০৪) ৩০. রক্তাক্ত মরুভূমি (২০০৪) ৩১. ছোট বেগম (২০০৬) ৩২. রক্তস্রোত (২০০৬) ৩৩. যাযাবর কন্যা (২০০৬) ৩৪. মহাসমর (২০০৬)

কবি আসাদ বিন হাফিজ তার বর্ণাঢ্য কর্মজীবনে সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ কলম সেনা পুরস্কার (১৯৯৪), কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন এমইউ আহমেদ পুরস্কার (১৯৯৭), বাংলাদেশ সাহিত্য সংস্কৃতি সংসদ পুরস্কার (১৯৯৭), ছড়ার ডাক পদক ও সম্মাননা (২০০৪), মেলোডি শিল্পীগোষ্ঠী পদক (২০০৪), কিশোরকণ্ঠ সাহিত্য পুরস্কার (২০০৪), গাজীপুর সংস্কৃতি পরিষদ কৃতী সংবর্ধনা (২০০৪), মরহুম ওমর ফারুক সম্মাননা স্মারক ‘কাব্যরত’ ২০১৬ ও সাহিত্যচর্চা সম্মাননা পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।

বাংলা ও ইসলামী সাহিত্যে তার অবদান অতুলনীয়।

খ্যাতিমান, বিশ্বাসী কবি ও সাহিত্যিক আসাদ বিন হাফিজের ইন্তেকালে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সাংবাদিক সংগঠন গভীর শোক প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছে। দ্যা ক্যাম্পাস মিরর পরিবারও গভীর শোক প্রকাশ করে রূহের মাগফিরাত কামনা করছে।

-লেখক

সম্পাদনা সহযোগী

দ্যা ক্যাম্পাস মিরর