Introduction Assalamu alaikum, everyone! Today, we’ll discuss an essential ingredient for effective public speaking: credibility. Whether you’re presenting in class, giving a keynote speech, or participating in a debate, your audience must trust and believe in you. So, how do you establish credibility?
Let’s break it down into three key strategies:
explaining your competence, establishing common ground, and delivering with fluency and conviction.
1. Explain Your Competence First, you need to demonstrate your expertise on the topic. Why should the audience listen to you?
This doesn’t mean you have to be a world-renowned expert. Instead, share your knowledge, research, or personal experience. Let me give you an example: Imagine a student giving a speech about UFOs. Instead of just saying, “UFOs are interesting,” they could explain how they’ve spent months researching UFO sightings, reviewing expert opinions, and analyzing historical reports. That makes their argument credible.
As a speaker, you need to show your audience that you’ve put in the work and that you know what you’re talking about.
2. Establish Common Ground Next, connect with your audience by showing that you understand and respect their values, concerns, and experiences. People are more likely to trust you when they feel like you’re “one of them.”
Let’s say you’re addressing a group of students about a potential tuition increase. Instead of jumping straight into financial jargon, start by acknowledging how everyone in the room values education quality and is concerned about affordability. You’re creating a bridge of trust by aligning your message with their shared experiences.
Remember, empathy and connection go a long way in building credibility.
3. Deliver with Fluency and Conviction Finally, your delivery matters. You might have all the knowledge and empathy in the world, but if you sound uncertain or disinterested, you’ll lose your audience.
Practice is key. Rehearse your speech to ensure smooth transitions, a confident tone, and natural pacing. And, most importantly, believe in your message. Enthusiasm is contagious! If you’re passionate about your topic, your audience will feel it too.
A dynamic delivery shows that you’re not just reading off a script—you’re genuinely invested in your message.
Takeaway So, to recap:
Competence: Show that you’ve done your homework.
Connection: Find common ground with your audience.
Conviction: Deliver your speech with confidence and enthusiasm.
These three elements—competence, connection, and conviction—form the foundation of credibility in speeches. Remember, a credible speaker isn’t just heard; they’re trusted.
আমাদের জীবনের এক অমীমাংসিত বিষয় হচ্ছে সময়। সময় বলতে আমরা অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যৎ বুঝলেও বিজ্ঞান সময়কে একটু অন্যভাবে দেখে। অতীত কেবলই আমাদের স্মৃতি। বাস্তবে আমরা শুধু বর্তমানকেই দেখি আর বর্তমানের অভিজ্ঞতার আলোকে আমরা কোন ঘটনার ভবিষ্যৎ কল্পনা করতে পারি। সময় নিয়ে বিজ্ঞানে বিতর্কের শুরু নিউটনীয় পদার্থবিদ্যা বা ক্লাসিকাল পদার্থবিদ্যা থেকে যেখানে সময়কে ধ্রুব ধরা হয়েছিলো। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে আইনস্টাইন দেখান যে সময় ধ্রুব রাশি নয়। ‘বিগ ব্যাং’ এর সূচনাই সময়ের সূচনা। তখন থেকেই ঘটনার প্রবাহ মহাবিশ্বের অন্তিম পরিণতির দিকে ধাবিত হচ্ছে। তা পৃথিবীর হিসেবে আনুমানিক 13.8 বিলিয়ন বছর পূর্বে। এই সময়ের যেহেতু শুরু আছে তাহলে শেষটাও নিশ্চয়ই থাকার থাকা। যে বিন্দুতে এসে মহাবিশ্বের সকল ঘটনা ঘটে যাবে সেটাই সময়ের Ending Point. একটা সময় মহাবিশ্বের সকল শক্তি ভরে পরিনত হবে। সমস্ত কিছু ধীরে ধীরে ঠান্ডা হতে থাকবে। সমস্ত জায়গায় তাপমাত্রা একই বিন্দুতে চলে আসবে। সমস্ত নক্ষত্র নিভে যাবে। পুরো মহবিশ্বে শক্তি বলতে কিচ্ছু থাকবে না। তখন মহাবিশ্ব অন্ধকারাচ্ছন্ন অসীম ভর ছাড়া আর কিছুই নয়। এই point এ এসে সময় অর্থহীন হয়ে যাবে। আর কোনো ঘটনা ঘটার বাকি নেই। এখানেই সময়ের শেষ।
কেউ কেউ ভাবেন সময় বলে আসলে কিছু নেই। যেমন- সূর্য উঠেও না, অস্তও যায় না। আমরাই সূর্যের চারদিকে ঘুরি। অন্য ভাবে চিন্তা করলে- পৃথিবী সৃষ্টির আগেও সময় ছিল, পৃথিবী ধ্বংসের পরও সময় থাকবে। সময়কে ঘড়ি দিয়ে হিসেব করে কোন ফায়দা নেই। ঘড়ি অথবা ইতিহাস কিছুই সময়কে শেষ পর্যন্ত ধরে রাখতে পারবে না। সময় চলতে থাকবে অমীমাংসিত কোন রহস্যে।
এই যে রহস্যজনক এ সময় আমরা অতিবাহিত করছি, সেটা কি আসলেই আমারা কাজে লাগাতে পারছি? সময়কে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করছেন এর উপরই নির্ভর করছে আপনার জীবনের সফলতা/ব্যার্থতা। আমরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ জায়গা থেকে সময়কে নিজের মতো করে নিতে চাই। আমরা চাই সময় হোক স্ব-ময়। কিন্তু সেটা আমরা করতেইবা পারছি কজন? নিজেকে ঠিক যেখানটাতে রাখতে চেয়েছেন সেখানে কি আদৌ রাখতে পেরেছেন নিজেকে? নিজেকে দেয়া হাজারো প্রতিশ্রুতির কতটুকুই বা রক্ষা হয়েছে!
উইলিয়াম শেক্সপিয়ার এর একটা বিখ্যাত উক্তি আমরা অনেকেই জানি, যেটি হচ্ছে- আমি নষ্ট করেছি সময়, এখন সময় নষ্ট করছে আমায়।
একটু চিন্তা করলে দেখবেন যে আমাদের জীবনের অনেক সময় আমরা মনের অজান্তেই নষ্ট করে এসেছি, এখনো করছি এবং ভবিষ্যতেও নষ্ট হবে। সময় নষ্ট করার জন্য আমাদের সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা করে আমাদের মস্তিষ্ক। বিষয়টা এমন না যে আমরা অলসতার কারণে সময় নষ্ট করছি। আমাদের সময় নষ্ট হচ্ছে কারণ আমরা সময় সম্পর্কে অসচেতন। আমাদের অধিকাংশেরই জীবনের পারপাস এবং স্বচ্ছতা নেই। যার ফলে আমাদের সময় বেশি নষ্ট হচ্ছে। এমন নয় যে আপনি কোন এক দিকে তাকিয়ে আপনার দিন পার করে দিচ্ছেন অথবা চোখ বন্ধ করে থেকে দিন কাটাচ্ছেন। চিন্তা করে দেখুন আপনি এমন কিছুই করছেন যা আপনার মস্তিষ্ক কাজ বলে স্বীকৃতি দিচ্ছে এবং আপনিও সেটা সানন্দে করেই যাচ্ছেন।
ধরুন আপনি সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হতে চান। কিন্তু আপনি সারাদিনে আপনার রুম পরিষ্কার করছেন, অথবা এ সপ্তাহে কোন কোন পোশাক পরে ভার্সিটি যাবেন সেটার পরিকল্পনা করছেন, অথবা রান্না শিখছেন ইত্যাদি ইত্যাদি। কাজগুলো নিঃসন্দেহে ভালো, কিন্তু এই কাজগুলো আপনাকে আদৌতে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হতে কোন প্রকার সহযোগিতা করছে না। কাজগুলো প্রথম প্রথম আপনাকে আত্মতৃপ্তি দিলেও মাস দশেক অথবা বছর ঘুরতেই মনে হবে আপনি আপনার ট্রেক থেকে সরে গিয়েছেন। আপনি অনেকগুলো সময় নষ্ট করে ফেলেছেন এবং আপনাকে আবারও প্রথম থেকে শুরু করতে হবে।
বিষয়টা কারো কারো ক্ষেত্রে এমনও হতে পারে যে- আপনি সারাদিন খুবই প্রোডাক্টিভ কাজ করেছেন কিন্তু দিন শেষে আপনার কাছে মনে হচ্ছে আপনি সময় নষ্ট করছেন। কারণ একটাই, আপনি নিজের জন্য যে টার্গেট নির্ধারণ করেছেন আজকের দিনে আপনি সেই টার্গেট ফুলফিল করতে পারেননি।
আমাদের সবার জীবনেই কিছু না কিছু উদ্দেশ্য সেট করা আছে। আমরা কেউ ডাক্তার হতে চাই, কেউ ইঞ্জিনিয়ার, কেউ উদ্যোক্তা ইত্যাদি। এমন নয় যে আমাদের উদ্দেশ্য নেই বলেই সময় নষ্ট হচ্ছে। যেমন ধরুন- আপনি শীতের সকালে বাজার করতে যাবেন। বিছানা থেকে উঠেই ভাবছেন এই শীতের সকালে কি গায়ে দিয়ে বাজারে যাবেন, কি কি কিনবেন, বাজার থেকে আসতে কত সময় লাগবে, এসে কোন কাজগুলো করবেন ইত্যাদি ইত্যাদি। আসল বিষয় হচ্ছে আপনাকে বাজারে যেতে হবে এবং আপনি যাবেনও। কিন্তু মাঝখানে বসে বসে যে এই বেহুদা চিন্তা করে সময় নষ্ট করলেন তা কিন্তু আপনার মস্তিষ্ক কর্তৃক সায় দিয়েছে বলেই করেছেন। এই চিন্তাগুলো আপনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ, তবে বাস্তবে এর কোন ভ্যালু আপনার জীবনে যুক্ত হচ্ছে না। সুতরাং এই সময়টুকু আপনি চিন্তা করেই নষ্ট করলেন।
আমাদের সমগ্র শরীরের মধ্যে মস্তিষ্কই হচ্ছে সবচেয়ে সহজ-সরল ও বোকা প্রকৃতির। তাকে আপনি যেভাবে কমান্ড দেন, সেভাবেই সে পরিচালিত হয়। মস্তিষ্কে পজিটিভ বা নেগেটিভ যেরূপ ইনফরমেশনই পাঠানো হয়, মস্তিষ্ক সেরূপ তরঙ্গই সৃষ্টি করে এবং শরীরে তার প্রতিফলন ঘটায়। আমরা যখন মস্তিষ্কে নতুন ইনফরমেশন পাঠাই, তখন মস্তিষ্কের নিউরনের মধ্যে নতুন যোগাযোগের পথ তৈরি হয়।
মূলকথা হচ্ছে- আপনার ভালো চিন্তাই পারে সময়কে স্ব-ময় করতে। এজন্যই বলা হয়- Your thought is your energy and energy is the power। বাংলা প্রবচনেও আছে- যেমন চিন্তা তেমন কর্ম, যেমন কর্ম তেমন ফল। চিন্তাশক্তি দিয়েই মানুষ বড় হয়, সুখী হয়, সফল ও সমৃদ্ধ হয়। প্রকৃতপক্ষে মানুষ তত বেশি বড়, যার চিন্তার শক্তি যত বেশি। অর্থাৎ চিন্তার প্রখরতা-গভীরতা ও দূরদৃষ্টি যার যত বেশি, তিনি তত বড় মাপের মানুষ এবং তার জীবন তত সমৃদ্ধ। আবার চিন্তার দারিদ্র্যের কারণেই মানুষের জীবনে ঘটে এর উল্টোটা।
প্রতিটি মানুষ কমবেশি ভালো চিন্তা করে, আবার সচেতন বা অবচেতনভাবে খারাপ চিন্তাও করে; যদিও অধিকাংশ ক্ষেত্রে খারাপ চিন্তা করার কথা স্বীকার করতে চায় না। Positive চিন্তা মানুষকে Positive দিকে পরিচালিত করে, আর Negative চিন্তা মানুষকে নিয়ে যায় Negative পথে। সংগত কারণেই ভালো কাজের পূর্বশর্ত হলো ভালো ভালো চিন্তা। খারাপ বা Negative চিন্তা থেকে ভালো কাজ আশা করা যায় না। Positive thoughts & ideas beget positive results and negative thoughts beget negative results -এ সূত্র চিরন্তন এবং সব মানুষের ক্ষেত্রেই সমান প্রযোজ্য।
প্রশ্ন হতে পারে চিন্তা তাহলে কোথা থেকে আসে? চিন্তার উৎস হচ্ছে মানুষের মস্তিষ্কে থাকা তথ্যভান্ডার; যে তথ্য সঞ্চয়নের শুরু মাতৃগর্ভে থাকা অবস্থায় মায়ের চিন্তা, শোনা ও বলা থেকে। প্রকৃতপক্ষে জন্মের পর থেকে এ ভান্ডার পরিপূর্ণ হতে থাকে; অনেকটা কম্পিউটারের মতো। কম্পিউটার আমাদেরকে যে আউটপুট দেয়, তা নির্ভর করে কম্পিউটারে আমরা যে ডাটা ইনপুট করেছি, সেই ডাটার ওপর। আমাদের ইনস্টল করা ডাটা ও সফটওয়্যারের বাইরে সে কোনোরূপ আউটপুট দিতে পারে না। তেমনি মস্তিষ্কে ডাটা ইন্সটলেশনের ওপর এবং মস্তিষ্কের গড়ন ও প্রকৃতির ওপর মানুষের চিন্তার ধরন ও গুণ নির্ভর করে। মস্তিষ্কে ভালো তথা Positive ডাটা ইনপুট হলে চিন্তার ধরন ভালো বা Positive হতে থাকবে, আর ডাটা খারাপ বা Negative হলে চিন্তা বা কর্ম নেতিবাচক বা খারাপ হতে থাকবে।
আমরা যা চিন্তা করি, তা-ই পরিণত হয় কর্মে। অনুরূপ কর্ম দীর্ঘমেয়াদে পরিণত হয় অভ্যাসে। অভ্যাসের মাধ্যমেই নির্ধারিত হয় ব্যক্তিত্বের ধরন। এই ব্যক্তিত্ব বা চরিত্রই আমাদেরকে পৌঁছে দেয় গন্তব্যে। সে গন্তব্য হতে পারে আগরতলা অথবা উগিরতলা; হতে পারে রাজরানি অথবা চাকরানি। তাই বলাই যায়, মানব জীবনে সফলতা বা ব্যর্থতার একক ও মূল চালিকাশক্তি হচ্ছে চিন্তা। চিন্তা শক্তির উন্নয়নের মাধ্যমেই মানুষের জীবনে ব্যাপক সাফল্যের দুয়ার উন্মোচিত হয়। তাই আমাদের চিন্তা সঠিক পথে পরিচালিত করা এবং মস্তিষ্কে থাকা অতীতের খারাপ তথ্যের স্থলে ভালো তথ্য ইনপুট করার কলাকৌশল জানা থাকলে যে কেউ সহজেই উন্নততর মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। Positive belief বা Positive thought -এর মাধ্যমে নিজের মধ্যে প্রচুর Energy তৈরি করা এবং সে Energy দিয়ে নিজকে Powerful being তথা শক্তিশালী মানুষরূপে গড়ে তোলা কঠিন কিছু নয়। আমরা নিজেরাও জানি আমরা সঠিক সময়ে সঠিক চিন্তা করছি না।
আমরা ভুলের মধ্যে আছি এবং ভুল করে সময়গুলো নষ্ট করছি। কিন্তু আসল সমস্যা হচ্ছে আমরা এই ভুলগুলোকে অভ্যাসে পরিণত করছি।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাংলাদেশের আইনি কাঠামোতে এক বহুল আলোচিত ও সমালোচিত অধ্যায়। স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের সংবিধান সর্বোচ্চ আইন, যার সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ যেকোনো আইন বাতিল বলে গণ্য হয়…
বাংলাদেশ স্বাধীন ও সার্বভৌম একটি রাষ্ট্র। সংবিধান হলো রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন। বাংলাদেশের সংবিধানের ৭(২) নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংবিধানের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ যেকোনো আইন বাতিল বলে গণ্য হবে। কোনো আইন তৈরি করতে হলে অবশ্যই এই বিষয়টি মাথায় রেখেই তৈরি করতে হবে অন্যথায় সেটি বাতিলযোগ্য বলে বিবেচিত হবে।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮ বহুল আলোচিত-সমালোচিত একটি আইন। বাংলাদেশ বা বিশ্বের যেকোনো দেশে বসে বাংলাদেশের কোন নাগরিক যদি এই আইন লঙ্ঘন করেন, তাহলেই তার বিরুদ্ধে এই আইনের অধীনে বিচার করা যাবে। এ আইন নিয়ে প্রথম থেকেই সর্বস্তরে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে পাস হওয়া ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন’ এর বিলে সই না করার জন্য তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদকে আহবান জানিয়েছিলেন সাংবাদিকদের আন্তর্জাতিক সংগঠন কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে)। সম্পাদক পরিষদ ইতোমধ্যে এ আইনটিকে প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা আইনের ৮,২১,২৫,২৮,২৯,৩১,৩২ ও ৪৩ ধারা নিয়ে আপত্তি জানায় যা সংবাদপত্র ও বাক স্বাধীনতাকে বিঘ্নিত করে। অথচ সংবিধানের ৩৯(২) নং অনুচ্ছেদ সংবাদপত্র ও ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতাকে নিশ্চিত করে। বর্তমান আইনমন্ত্রী এ আপত্তিগুলোকে যৌক্তিক বলে জানিয়ে তা সংশোধনের আশ্বাস দিয়েছিলেন। সম্প্রতি এটি সংশোধনের প্রস্তাব এসেছে। প্রস্তাবিত নতুন আইনের নাম হবে সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩। নতুন এই আইনে কিছু বিষয়ে সংশোধনীর কথা বলা হয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের দুটি ধারা যথা ২১ ও ২৮ ধারা বাতিলের আহবান জানিয়েছিল। প্রস্তাবিত আইনে এই দুটি ধারা বাতিল না করে সাজা ও জামিনের ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা হয়েছে। মূলত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে সবচেয়ে বড় সমালোচনার জায়গাই ছিল, যে কেউ যে কারোর বিরুদ্ধে এই আইনের অধীনে মামলা করতে পারবে যদিও সে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। যদিও প্রস্তাবিত আইনে মানহানির মামলায় কারাদণ্ডের বিষয়টি বাদ দিয়ে শুধু জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। এর কিছু ধারা অজামিনযোগ্য ছিল যেগুলোকে জামিনযোগ্য করা হয়েছে। তবে এতেও সংবাদপত্র ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতা ব্যাহত হবে বলে মতামত ব্যক্ত করেছেন সাংবাদিকদের কিছু ইউনিয়ন।
Credit: The Daily Star
প্রস্তাবিত সাইবার নিরাপত্তা আইনেও কিছু ত্রুটির কথা উল্লেখ করেছেন সচেতন মহল যা মৌলিক অধিকারকে খর্ব করে। সংবিধানের ২৬ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মৌলিক অধিকারের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ আইন বাতিল বলে গণ্য হবে। তাই কোনো আইন তৈরি করতে হলে এই বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় তা দেশ ও জাতির জন্য দুর্দশার কারণ হবে। বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক বার্কার বলেছেন, “আইনকে আদর্শ (Ideal) হতে হলে তা কেবল রাষ্ট্রীয় সংগঠন কর্তৃক স্বীকৃত, ঘোষিত ও প্রযোজ্য হলেই হবে না, তা ন্যায়সঙ্গত এবং যুক্তসংগতও হতে হবে।” তবেই তা দেশ ও জাতির জন্য কল্যাণজনক হবে।
লেখক, শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি।
ভাবলেশহীন একটা জীবন। এ যেন বানের পানিতে ভেসে চলা নিষ্প্রাণ খড়কুটো! বানের পানি যেদিকে যায়, নিষ্প্রাণ খড়কুটোগুলো সেদিকেই ভেসে চলে।
আমাদের সমাজে প্রচলিত কথিত ট্রেন্ডগুলোর অবাধ গড্ডলিকা প্রবাহে ভাসতে ভাসতে এ প্রজন্মের তরুণেরা যেন দ্বীন থেকে যোজন যোজন মাইল দূরে হারিয়ে যাচ্ছে। সবচে ভয়ের কথা হলো যে, এ ব্যাপার দুটো যেন তরুণদের এক চক্রাবর্ত নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেন অদ্ভুত একটা প্যারাডক্স। তরুণেরা ট্রেন্ডের পেছনে ছুটছে বলে দ্বীন থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। আবার দ্বীন থেকে দূরে থাকার দরুণ না বুঝেই ট্রেন্ডের জোয়ারে ভাসছে!
এই ট্রেন্ড ফলো করার মিছিলের তালিকাটা অনেক দীর্ঘ। আমাদের তরুণেরা পা থেকে শুরু করে মাথা পর্যন্ত ট্রেন্ডের মোড়কে মুড়ে নিতে পারলেই নিজেকে স্মার্ট ভাবে । ঘুম থেকে ওঠা হতে শুরু করে আবার ঘুমোতে যাওয়া পর্যন্ত ট্রেন্ডসিক উম্মাদনায় মেতে থাকাকে প্রজন্মের তরুণেরা কুলনেস মনে করে । যেন ট্রেন্ড ফলো করতে পারাটাই জগতের বড় সফলতা!
এই অবাধ ট্রেন্ড ফলোয়িং-এর পেছনে খুব কমন একটা অজুহাত কাজ করে।
-‘ সবাই তো করে!! আমি না করলে কেমন দেখায়!সার্কেলের সবাই তো গেম খেলে। আমি না খেললে কেমন দেখায়! টাইম পাসের জন্য না হয় অল্প একটু গেম খেললাম আমি!’
জাস্ট এমন কিছু ভেবেই প্রজন্মের বড় একটা অংশ গেমিং ট্রেন্ডের অবাধ জলে নাকানি চুবানি খেয়ে বেড়াচ্ছে! সামান্যতম সিরিয়াস হয়ে এতোটুকু ভাবেনা যে আমি একটা গেমের একশোটা লেভেল শেষ করে এই পৃথিবীকে কি দিতে পারছি বা আমি নিজে কি পাচ্ছি!
অবশ্য এই ট্রেন্ডসিক প্রজন্মকে নিয়ে সবচে বেশি আফসোস করেন আমাদের বড়রাই। সত্তর আশির দশকের কিশোরেরা শুধু আশাহত মুখ নিয়ে বলেই যান যে, প্রজন্ম গেল হায়! গেল হায়! অথচ তারা একটাবারও ভেবে দেখেন না যে, আমরা কি তাদের মত পেয়েছি অবারিত সবুজ মাঠ? গ্রীষ্মের ভরদুপুরে এলাকার সবচেয়ে বড় পুকুরটাতে ডুবসাঁতারের প্রতিযোগিতা করার সুযোগ? কিংবা সুযোগ পেয়েছি কি জোছনাস্নাত সন্ধ্যায় উঠোনে পাটি বিছিয়ে প্রাণভরে গল্প করবার?
কিভাবে পাবো আমরা? আমাদের কিশোরদের সকালের শিশির তো শুকিয়ে যায় কোনো এক কোচিং-এ ছুটতে ছুটতে! মিথ্যে বিনোদনে ভরা শ্রান্ত দুপুর শেষে বিকেলটাও কেটে যায় কোনো এক কোচিং-এ একজন কমার্শিয়াল মানুষের লেকচার নোট করতে করতে…। আর জোৎস্নাভরা সন্ধ্যাটা তো কবেই হোমটিউটরকে লিখে দিতে হয়েছে আমাদের! এই যে সুস্থ বিনোদনের উৎসগুলোকে যে পানিতে চুবিয়ে চুবিয়ে মেরে মেরে ফেলা হচ্ছে সেদিকেই বা ক’জন তাকান!
যেই ছেলেটি কোনো এক সান্ধ্য কোচিং-এ তার ব্যাচমেটকে রেড রোজ দিয়ে প্রোপোজ করে বলে
-” উই’ল ইউ বি মাই লাইফ পার্টনার? “, সে জানে না সাইমুম কিবা তিন গোয়েন্দা সিরিজের শিহরণ জাগানো রোমাঞ্চটুকু। সে জানে না কেবল একটা মেয়ের সম্ভ্রম রক্ষা করতে আরব সাগর পাড়ি দিয়ে সিন্ধুতে ছুটে আসা মুহাম্মদ বিন কাসিমের জলজ্যান্ত থ্রিলারটুকু। সে জানে না মুহাম্মাদ বিন কাসিমের জীবন গতিপথ বদলে দেয়া দুর্বিনীত মহাকাব্যের ফিকশনটুক! জানবে কি করে? সে তো টিভি সিরিজে রোমাঞ্চ বলে রেড রোজ ছাড়া আর কিছুই দেখেনি! থ্রিলার বলতে পাড়ায় পাড়ায় মাস্তানি করে বেড়ানো ছাড়া আর কিছুই জানেনি।
এ প্রজন্মের মুখ থুবড়ে পড়ার বড় একটি কারণ হলো সোশ্যাল মিডিয়ার অপব্যবহার। খালি গলায় অনুপম সুর তুলতে পারা মেয়েটিও হতাশ হয়ে যায় টিকটকে অটিজমসুলভ অঙ্গভঙ্গি করা মেয়েটার লাখখানেক ফলোয়ার দেখে। এলাকার ক্রিকেটে অনবদ্য ব্যাটিং করতে পারা বা ডুব সাঁতারে অনবদ্য সাঁতারু ছেলেটিও হতাশা বয়ে বেড়ায় ফ্রি ফায়ার আর পাবজিতে চিকেন ডিনার না পেয়ে।
আবার, খুব সিরিয়াসলি চিন্তা করে এমন একদল তরুণও আছে আমাদের সমাজে । তবে তারা গা ভাসিয়েছে কথিত ক্যারিয়ার গঠন নামক ট্রেন্ডের জোয়ারে। নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে খুব করে ভাবলেও যেন দ্বীনের ব্যাপারে কোন খেয়ালই নেই তাদের। ক্যারিয়ার শব্দটা মাথায় এলেই একটা কবিতা মনে পড়ে…
” বাবার ইচ্ছে ইঞ্জিনিয়ার মায়ের ইচ্ছে ডাক্তারি,
দাদু ইচ্ছে উকিল হব জেঠুর ইচ্ছে মাস্টারি
ইচ্ছেগুলো কেমন যেন ভেবেই আমি ‘থ ‘
কেউ আমায় বললে না তো খোকা মানুষ হ! “[১]
‘কাঞ্চন দাশের’ কবিতায় ‘খোকা’ তো মানুষ হতে চেয়েছিল, কিন্তু এখনকার খোকারা আর মানুষ তো হতে চায়ই না। ‘মুমিন’ তো অনেক দূরের কথা!
ট্রেন্ডের জোয়ারে ভাসতে থাকা তরুণদের সবচে ভয়াবহ রোগটি হল রোস্টিং আর ট্রলিং ট্রেন্ড। সোশ্যাল মিডিয়ায় আমরা একজন আরেকজনকে ক্ষেপিয়ে কিংবা রাগিয়ে প্রচুর আনন্দ পাই।অথচ এ প্রজন্মের আমরা এই আয়াতটি কখনো হৃদয় দিয়ে পড়িই-নি!
وَيْلٌ لِّكُلِّ هُمَزَةٍ لُّمَزَةٍ”
Woe to every scorner and mocker
“উপস্থিতিতে কিংবা অনুপস্থিতিতে ,মানুষকে নিন্দাকারী প্রত্যেকের জন্য ধ্বংস” [২]
আর এই ট্রল কিবা রোস্টের মোড়কে ছোট্ট ছোট্ট অশ্লীলতাকে সমাজে একেবারে স্বাভাবিক করে তুলি আমরা। অথচ রবের এই বাণীটা কি কখনো আমরা হৃদয় দিয়ে পড়তে পেরেছি!
Indeed, those who like that immorality should be spread [or publicized] among those who have believed will have a painful punishment in this world and the Hereafter. And Allah knows and you do not know.
“নিশ্চয় যারা এটা পছন্দ করে যে, মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ুক, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখেরাতে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব। আর আল্লাহ জানেন এবং তোমরা জানো না।”[৩]
কেউ কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে হয়তো অশ্লীলতার প্রচার প্রসার চান না। তবুও অনেকেই স্রোতে গা ভাসিয়ে নিজের অজান্তেই অশ্লীলতার প্রোমোট করে বেড়ান। একবার ফেইসবুকে এক ফ্রেন্ডের পোস্টে এমন একটা অশ্লীলতার বিপক্ষে কমেন্ট করেছিলাম
ও বলল,
– “আরে এত ছোট্ট একটা ব্যাপারকে এত বড় করে দেখছো কেন?”
বললাম, ” জানো! মানুষ কখনও পাহাড়ের সাথে হোচট খায়না ছোট পাথরের সাথেই খায়”[৪]
তারপর মেসেঞ্জারে নক দিয়ে বলল,-
-” আচ্ছা তবে বড় পাপ করলে কি হোঁচট খেতে হবে না?” বললাম,বড় পাহাড়ের উপর থেকে ছিটকে পড়ে দৃশ্যটা কল্পনা করতে পারো!
ও চুপ হয়ে গেল। কিন্তু আমি থেমে গেলাম না। ফোনে সরাসরি কল দিয়ে বললাম,
-আচ্ছা, তোমাকে একটা কবিতা শোনাই।আমার লেখা নয়। ইবনুল মু’তাজের লেখা….
لا تحقرن صغيرة أن ,
الجبال من الحصى[৫]
আরবি পঙতি শুনে ও একটু হকচকিয়ে গেল। তারপর তার বাঙলায়নটুকুও শোনালাম।
” ‘ছোট পাপ’ বলে কিছু অবহেলা নয়,
ছোট নুড়িকণা মিলেই পর্বত হয়! “[৬]
তারপর ওর সাথে আরো কিছু কথা হলো। ওর কন্ঠে যেন অদ্ভুত এক ঘোরলাগা অনুভূতি টের পেলাম। নিজ থেকেই বলে উঠলো এখন থেকে এমনটা আর কখনোই করবেনা।
গল্পটাতো শুনলেন।ফেসবুকীয় এই অশ্লীলতাকে রোধ করতে আপনাকে ‘ডোর টু ডোর’ কাজ করতে হবে। নিজেকে পরিশুদ্ধ করার চেষ্টা চালানোর পাশাপাশি ধীরে ধীরে নিজের সার্কেলটাকেও পরিশুদ্ধ করার চেষ্টা করতে হবে। এভাবে এক সার্কেল থেকে অন্য সার্কেল চলতেই থাকবে পরিশুদ্ধতার জোয়ার।
যুগ পরিক্রমায় আমরা পথ চলতে চলতে পৌঁছেছি এক ভঙুর পাটাতনে। এখনকার সময়ে সবথেকে বড় ট্রেন্ড হলো একটা ব্র্যান্ডেড লাইফ লিড করা।একটা আসুসের ল্যাপটপ ছাড়া হয় নাকি! টপ মডেলের ফোন , শহরের সেরা ব্র্যান্ডের টি-শার্ট আর সু ছাড়া তো চলাই যায় না!
নিজের পা থেকে মাথা পর্যন্ত একটা করে ব্রান্ডের মোড়ক মুড়িয়ে দিতে পারলেই ভাবি, একটাই তো জীবন! এই জীবনে এতোটুকু ছাড়া আর কিবা দরকার!
এই তাল-লয়হীন জীবনটা নিয়ে আমরা আলাদা করে কিছুই ভাবি না। অথচ আমাদের জীবনাচারের প্রতিভাস হওয়া উচিত ছিল কুরআন ও সুন্নাহ। জীবন ব্যাকরণের অভিধা হওয়া উচিত ছিল একমাত্র ইসলামই!ফররুখের ‘ডাহুক’ কবিতায় আমরা ট্রেন্ড বর্জনের নিমন্ত্রণ পাই..
“এই ম্লান কদর্য দলে তুমি নও
তুমি বও
তোমার শৃঙ্খলমুক্ত পূর্ণ চিত্তে জীবনমৃত্যুর
পরিপূর্ণ সুর।”[৭]
কবি ফররুখের এই আমন্ত্রণে সাড়া দেয়া খুব দরকার। সত্যিই দরকার। কিন্তু কিভাবে…!
[দুই]
আমাদের তরুণ প্রজন্ম যখন অনিঃশেষ সমস্যার অথৈ জলে নাকানিচুবানি খায়, তখন একটু মাথা উঁচু করে তাকাবার চেষ্টা করি….
এ সমস্যার সমাধান কোথায়??
হ্যাঁ সমাধান আমাদের তরুণদের কাছেই আছে।
দ্বীন থেকে দূরে সরে গেলে জীবন অনিবার্যভাবেই উশৃংখল হয়ে পড়বে। এজন্য দরকার তরুণ প্রজন্মের সাথে দ্বীনের একটা শক্তিশালী সেতুবন্ধন। আর সেতুবন্ধন তৈরি করতে পারে দ্বীন নিয়ে চলা তরুণেরাই!
তরুণদের কাজ খুব বেশি নয়। শুধুমাত্র বন্ধুদের উঠতে বসতে দ্বীনের কথাটা স্মরণ করিয়ে দিতে হবে। বোঝাতে হবে জীবনাচারের সাথে দ্বীনকে যুক্ত করলেই জীবনটা হয়ে ওঠে সার্থক আর প্রাণোচ্ছল! তাদেরকে বোঝাতে হবে যে, স্বাদ আর বিস্বাদের মাঝে একটা স্থির বিন্দু আছে। সেই বিন্দুর খোঁজ পায় কেবল মুমিনরাই। এই স্থির বিন্দু মুমিনকে কখনোই অস্থির হতে দেয় না। ওয়াল্লাহি! এতেই কাজ হবে..। স্বয়ং প্রভুই বলে দিয়েছেন।
“আপনি স্মরণ করিয়ে দিন নিশ্চয়ই এতে উপকার আছে” [৮]
প্রিয় নবীর হাদিসও আমাদের এ সমস্যা থেকে উত্তরণের পাঠ দেয়…।
” একটি বাণী হলেও তুমি পৌছে দাও” [৯]
যতটুকু জানি ততটুকুই পৌঁছে দিতে হবে। বিশ্বাস করুন মাত্র একটি বাক্যই মানুষের জীবনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনে দিতে পারে। মহা সাইক্লোন হয়ে উড়িয়ে দিতে পারে হৃদয়ের অলিন্দে জমে থাকা ধুলোবালি আর মরচেপড়া সব আস্তরণ!
ওমর ইবনুল খাত্তাবকে তো নিশ্চয়ই চেনা আছে আপনার? কি এমন হয়েছিল তার সাথে জানা আছে? রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হত্যা করতে রওনা হওয়া ওমরেরর পাথর দিল গলে গিয়েছিলো কেবল একটা আয়াত শুনেই!!
এক বাক্যের ধাক্কার একটা গল্প শোনা যাক। রুপকথার কোনো গল্প নয়।বরং সত্যিকারের গল্প। এক দেশে এক ডাকাত বাস করতো। সেই ডাকাতের ভয়ে এলাকাবাসীকে দিন রাত তটস্থ থাকতে হতো।কখন কি করে বসে! একবার এলাকার এক সুন্দরী রমনীর উপর সেই ডাকাতের নজর পড়লো। ধীরে ধীরে সেই সুন্দরী পড়শীর প্রেমে পড়ে গেলো সে। একদিন রাতে সেই মেয়েটির বাড়িতে ঢোকার জন্য মেয়েটির বাড়ির দিকে রওনা করলো সে। যখন সেই ডাকাত দেয়াল টপকে ভেতরে ঢুকছিলো ঠিক তখনই তার কানে অদ্ভুত এক সুর ভেসে এলো।সেই সুরের সাথে ভেসে আসা বাক্যবান তার অন্তরকে তছনছ করে দিলো।যেন মুহুর্তেই বদলে গেলো তার সব পাপের আকাঙ্খা। দূর থেকে সুললিত কন্ঠে কে যেন তেলাওয়াত করছে…
Has the time not come for those who have believed that their hearts should become humbly submissive at the remembrance of Allah and what has come down of the truth?
“যারা ঈমান এনেছে তাদের হৃদয় কি আল্লাহর স্মরণে এবং যে সত্য নাযিল হয়েছে তার কারণে বিগলিত হওয়ার সময় হয়নি ?” [৯]
ব্যস! একটা আয়াতই তার অন্তরকে বিগলিত করে দিল। তিনি চিৎকার করে বলে উঠলেন অবশ্যই ফিরে আসার সময় হয়েছে। তার নাম ছিল ফুজাইল ইবনু ইয়াজ। তিনি ছিলেন একজন বিখ্যাত তাবেয়ী। একটি আয়াতেই যেন তার জীবন বদলে গিয়েছিলো।রবের স্মরণে বিগলিত হয়েছিল তার হৃদয়! [১১]
এই গল্পটা বলার একটা কারণ আছে। প্রজন্মের তরুণেরা ট্রেন্ডের সাগরে ডুবসাতার দিয়ে জীবনের প্রাপ্তি খোঁজে, জীবনের সফলতা খুঁজে বেড়ায় ক্যারিয়ার গঠন নামক মরিচিকার ফাঁদে পড়ে এক গাদা তোতাবুলি শেখার মাধ্যমে।অথচ অনন্ত কালের প্রকৃত প্রাপ্তির সমীকরণটাই যেন তাদের কাছে অজানা। এইযে সাদামাটা জীবনাচারের সাথে দ্বীনের যোগফলটা যে প্রাপ্তি আর প্রতিফলে ভরপুর, এটাই বোঝাতে হবে দ্বীনবিমুখী তরুণ প্রজন্মকে। জাস্ট মনে করিয়ে দিতে হবে। একটা রিমাইন্ডারই অন্তরে ঝড় তুলতে পারে। জাগিয়ে তুলতে পারে ঘুমন্ত হৃদয়কে।
ট্রেন্ডসিক প্রজন্মকে সমাধানের পথ দেখাতে দ্বীনকে ছড়িয়ে দিতে হবে। হোক সেটা সোশ্যাল মিডিয়ায়, ফ্রেন্ড সার্কেলের আড্ডায় অথবা সাহিত্য রচনায়। নিজেকে একজন ভ্রাম্যামান দাওয়াহ সেন্টার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।এ দায়িত্ব আমার আপনার সকলেরই।
কোনো মতাদর্শ প্রচারের সবচে বুদ্ধিদীপ্ত উপায় হলো সেই মতাদর্শকে জীবন্ত করে তোলা। একটা বাস্তবিক অবয়বে সেই মতাদর্শের সরুপ ফুটিয়ে তোলা।নিজের ভেতরে ইসলামের সরূপ ফুটিয়ে তুলতে শুরু করে দিন। ইনশাআল্লাহ আপনার কথাগুলো কান ভেদ করে অন্তরে পৌছে যাবে। কাজ করতে করতে হতাশ হবারও কোনো সুযোগ নেই। আমার আপনার রব অন্তর দেখতে পারেন। আপনার আমার প্রচেষ্টাই সুনবুলার[১২] মতো সাতশ গুন হয়ে প্রতিদান হিসেবে জমা হয়ে থাকবে। ইনশাআল্লাহ
লাল ও হলুদ রঙের প্রচ্ছদে আবৃত একটি কাব্যগ্রন্থ। নাম “লাভায় লালশাক পুবের আকাশ”। নামের বিশালতায় ও উৎসর্গের পংক্তিমালা দেখে বেশ আগ্রহ নিয়ে কয়েকটা কবিতা পাঠ করলাম। কাব্যগ্রন্থটা বেশ ইতিহাস মিশ্রিত মনে হলো। সম্পূর্ণ কাব্যগ্রন্থ বেশ কয়েক বার পাঠ করার পর ভাবলাম, ইতিহাস মিশ্রিত অতীতের আলাপ নিয়ে বিদ্রোহী ও বজ্র কালির ফোঁটামাখা কাব্যগ্রন্থটা রিভিউ করি। কাব্যগ্রন্থের ৩২ টি কবিতার মধ্যে বেশ কিছু কবিতা’র রিভিউ দেওয়ার চেষ্টা করছি। তার আগে পুরো কাব্যগ্রন্থের সারমর্ম তুলে ধরছি।
সারমর্ম
উদীয়মান তরুণ কবি সীমান্ত শরীফ তার বিশ্বাস ও দীক্ষা শিক্ষায় মিশ্রিত এই কাব্যগ্রন্থটি তারই অনন্য প্রতিফলন বলে মনে হয়েছে। তিনি তার কাব্যগ্রন্থের কবিতামালায় আলাপ তুলেছেন, মুসলিমদের ঈমানের অংশ আল কুদস নিয়ে, বিবরণ দিয়েছেন নির্যাতনের, দ্রোহ তুলেছেন পাশ্চাত্য সভ্যতা ও ইয়াহুদীদের প্রতি। আলাপ তুলেছেন দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে। এই বয়সে এসে কবির বেশ করে মনে পরলো ছাত্রাবাসের দিনগুলির কথা। একটি কবিতায় তিনি তুলে ধরেছেন – মৃত্যুর পরে তার মায়ের আবদার, বাবাকে নিয়ে আলাপ তুলেছেন অন্য একটি কবিতায়। তার কাব্যগ্রন্থে প্রেম প্রীতি ভালবাসাও স্থান পেয়েছে ভীষণভাবে।
এবার গুটিকয়েক কবিতার রিভিউ দেওয়ার চেষ্টা করবো।
আমায় ছিঁড়ে খাও হে শকুন
কবি তার এই কবিতায় তাকে হত্যা করার আকুতি জানিয়েছেন। কবিতার পংক্তিতে ফুটিয়ে তুলেছেন, মুদ্রাস্ফীতি দ্রব্যমূলের ঊর্ধ্বগতি ও রাষ্ট্রের নানান অসঙ্গতি নিয়ে। সম্রাজ্যবাদীদের শকুনের সাথে তুল্য করে নামপর উন্নয়নের সমালোচনা করেন। তিনি বলেছেন – দোজখের ভয়ে তিনি আত্মহত্যা করতে চান না। তাই এই রাষ্ট্র নামক জাহান্নামে তাকে হত্যা করা হোক।
মায় মরণে ছবি আঁকে
এই কবিতায় কবি তার মায়ের সাথে সংলাপ করছেন, তার মা কবিকে প্রশ্ন করে যাচ্ছে, তিনি মৃত্যুবরণ করলে তার কবর কোথায় হবে? কে পড়বে তার জানা? বাড়ির দরজায় মসজিদে কি আর নামাজ পড়বে না মানুষ? নানান প্রশ্নের তালে তিনি আদেশও করে যাচ্ছেন। মৃত্যুর পরে যেন বেশি মানুষ জড়ো করা না হয়। নিকট আত্মীয়দের খবর দেওয়া হয়। মৃত্যুর পরে কবি যেন তার মায়ের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে সূরা পাঠ করে।
অতঃপর কবি তার মায়ের এই সকল প্রশ্ন আর আদর্শের প্রেক্ষিতে বলেন। মায়েরা ও মৃত্যুবরণ করবে, তাদের আদেশ আমাদের কাছে প্রেসক্রিপশনের মতো। তবে কবির আকুতি, আলিপের মতো মা’র শরীরটা বাঁকা হয়ে গেলেও মা যেন আর ক’টা দিন বেঁচে থাকেন। মাটির চুলায় রান্না করেন। মৃত্যু হলে যেন দু’জনের একসাথেই হয়। কবির এ কবিতায় মায়ের প্রতি নিদারুন ভালোবাসা ফুটে উঠেছে।
আকসার কয়লা
বাইতুল মাকদিস আমাদের ঈমানের অংশ। নবীদের পরশে আবৃত হয়ে আছে কুদসের প্রতিটি কংক্রিট। কবি তার এই কবিতায়, গাজার বিমর্ষ চিত্র তুলে ধরেছে। তিনি বলেছেন – মায়েরা বাচ্চাদের পায়ে নাম লিখে রাখছে। যেন লাশ হওয়ার পরে চিনতে পারে । শিশুদের ছেঁড়াপাটা কলিজা আর রক্তাক্ত দেহ সহকারে কবরস্থ করার পর বিদ্রোহ করে কবি বলেন – খোদা ফেরেশতারা কি ভূমধ্য সাগরের চিনে না? কসম তেল আবিবের সেদিন বৃষ্টি হবে ছোপ ছোপ কলিজা গন্ধে কালো বৃষ্টি। একদিন আমাদের বিজয় হবে। সেই দিন শহীদের রক্তগুলো মেঘ হয়ে আরশে জড়ো হবে। কবি তার এই কবিতায় বাইতুল মাকদিসের মুক্তি প্রত্যাশা করেছেন।
সার্বভৌমত্ব
ছোট্ট কয়েক লাইনের এই কবিতাটা খুব বেশি উপলব্ধির। তিনি তার মায়ের সাথে দেশের সার্বভৌমত্ব কে তুল্য করেছেন। তিনি যেমন সব সময় তার মায়ের আষ্টেপৃষ্ঠে লেগে থাকতে চান। তেমনি সব সময় মাতৃভূমির সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত হোক এটাই কামনা করেন। কবি’র এই কবিতায় নাগরিকদের অধিকারের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন।
বোডিং
কবি তার এই কবিতায় পড়াশুনার জন্য শৈশবে বাড়ি ছাড়ার স্মৃতি তুলে ধরেছেন। চৈত্র মাসে রোদের মধ্যে তার বাবা আসবাবপত্র মাথায় নিয়ে
রওনা হয়েছেন ছাত্রাবাসের দিকে। এদিকে তার মা’ রওনা হওয়ার সময় নানান উপদেশ আর সাহস দিয়ে রওনা করিয়ে দিলেও তিনি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে ছিলেন। কবি পাঠশালায় হাজির হওয়ার পর পুরানা শিক্ষার্থীরা তাকে ভয় দেখাচ্ছিলেন।
“অসুখ হলে ছুটি নাই। কাঁদলে নাম কাটা।”
গভীর রাতে কবি স্বপ্ন দেখলেন, তার মা তার জন্য কান্না করছে। কবি তার এই কবিতায় পড়াশোনার জন্য শৈশবে বাড়ি ছাড়ার স্মৃতি তুলে ধরেছেন।
প্রেমোগ্রাফি
এই কবিতাটি পুরো কাব্যগ্রন্থের মধ্যে আমার কাছে অনন্য বলে মনে হয়েছে। কবি প্রেম বলতে এখানে বুঝিয়েছেন, শত লাবণ্যতায় হৃদয়ে চির ধরার প্রত্যাবর্তনের মতো। কবি তার অর্ধাঙ্গির শূন্য ডিসটেন্স কে প্রেম বলেছেন। তিনি মনে করেন প্রেমের কোন বিছানা হয় না। তিনি প্রেম বলতে বুঝেন একটি প্রতিরোধের আঙিনা। তিনি অবৈধ প্রেমকে সাহারা মরুভূমি ও পাপের প্রাসাদের সাথে তুল্য করেছেন।
~ আমি কবিদের দর্পন মনে করি। তারা মানুষের আচার আচরণ চিন্তা চরিত্র কবিতার মাধ্যমে সমাজের কাছে তুলে ধরে। কবিদের কবিতা সমূহ যখন সময়ের কথা বলে, মাটি ও মানুষের অধিকারের কথা বলে। তাদের কবিতা সমূহের পংক্তি থেকে পংক্তিমালা তরুণ যুবকদের মস্তিষ্কে সৃষ্টি করে সচেতনতা ও অধিকার আদায়ের আন্দোলন। তবেই কবি মনে করি সে কবি কবিতা ও কাব্যগ্রন্থ সময়ের আলোকে প্রাসঙ্গিক। তেমনি শত কাব্যগ্রন্থের মধ্যে ‘ লাভায় লালশাক পুবের আকাশ’ কাব্যগ্রন্থটি সময়ের কাব্যগ্রন্থ। যে গ্রন্থে সমাজ সংস্কৃতি দেশীয় ও বিশ্বরাজনীতির আলাপ তুলে প্রেম ও ভালোবাসা দিয়ে মানুষ কে মাখিয়ে দিয়েছেন।
~ আমি নিয়মিতই নানান ধরনের কাব্যগ্রন্থ পাঠ করি। যদিও বহুদিনের ইচ্ছে আবৃত্তি করার। তাল সুর কোন কিছুই আমার মিলে না তাই আবৃত্তি করা হয় না। তবে যে কাব্যগ্রন্থ গুলো খুব অনুভবের তা উপলব্ধি করি পর্যবেক্ষণ করি ভীষণভাবে। ঠিক তেমনি “লাভায় লালশাক পুবের আকাশ” কাব্যগ্রন্থটি আমার কাছে ভীষণ উপলব্ধির মনে হয়েছে। পুরো কাব্যগ্রন্থ বেশ কয়েকবার পাঠ করলেও এখন অবধি সব ছন্দের রং বুঝতে পারিনি। তবে কবি খুব কঠিন করে লিখেন নি। কিন্তু, কবিতামালা’র বেশ গভীরতা রয়েছে। তিনি তার এই কাব্যগ্রন্থে আলাপ তুলেছেন দেশ থেকে দেশান্তরে। তার কবিতাগুলো স্পর্শ করেছে সচেতন নাগরিকদের হৃদয়ে। আপনিও পাঠ করতে পারেন, বিদ্রোহী কন্ঠে আবৃত্তি করতে পারেন কবি সীমান্ত শরীফের ব্যতিক্রমী এই কাব্যগ্রন্থটি।
এইচআইভি (হিউম্যান ইমিউনোডেফিসিয়েন্সি ভাইরাস) এমন একটি ভাইরাস যা মানবদেহের ইমিউন সিস্টেমকে দুর্বল করে ফেলে। এটি মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়, যার ফলে দেহ সহজেই বিভিন্ন সংক্রমণ এবং রোগে আক্রান্ত হয়। এইচআইভি শরীরে প্রবেশের পর ধীরে ধীরে ইমিউন সিস্টেমের সেল বা কোষগুলোকে ধ্বংস করতে শুরু করে, বিশেষ করে সিডি৪ (CD4) কোষগুলোকে, যা শরীরকে সংক্রমণের বিরুদ্ধে রক্ষা করতে সাহায্য করে।
এইচআইভির ইতিহাস
এইচআইভির প্রথম সনাক্ত হয় ১৯৮০ সালের দিকে। তবে বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই ভাইরাসটি ১৯২০-এর দশক থেকেই আফ্রিকার কঙ্গো অঞ্চলে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। তখন ভাইরাসটি একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল। এরপর, এটি বিভিন্ন মাধ্যমে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে।
১৯৮১ সালে প্রথমবারের মতো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এইচআইভি-সংক্রান্ত রোগ অ্যাকোয়ার্ড ইমিউনোডেফিসিয়েন্সি সিন্ড্রোম (এইডস) চিহ্নিত করা হয়। তখন থেকে এইচআইভি এবং এইডসের গবেষণা শুরু হয় এবং ভাইরাসটি সম্পর্কে ধীরে ধীরে অনেক তথ্য প্রকাশিত হয়।
সংক্রমণ পদ্ধতি
এইচআইভি প্রধানত রক্ত, বীর্য, যোনিপথের তরল, এবং বুকের দুধের মাধ্যমে একজন ব্যক্তির শরীর থেকে অন্য ব্যক্তির শরীরে প্রবেশ করতে পারে। এই ভাইরাসটি সাধারণত নিম্নলিখিত পদ্ধতিতে ছড়ায়:
১) অসুরক্ষিত যৌনমিলন: এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে কনডম ছাড়া যৌনমিলন করলে এই ভাইরাসটি সহজেই সংক্রমিত হতে পারে।
২) সংক্রামিত রক্ত: রক্ত সংবহন বা রক্ত গ্রহণের সময় যদি সংক্রামিত রক্ত ব্যবহার করা হয়, তবে এই ভাইরাসটি শরীরে প্রবেশ করতে পারে।
৩) সংক্রমিত সুচ বা ইনজেকশন: যদি সংক্রমিত ব্যক্তি যে সুচ বা ইনজেকশন ব্যবহার করে, সেটি অন্য কেউ ব্যবহার করে, তাহলে তার মধ্যেও এইচআইভি প্রবেশের সম্ভাবনা থাকে।
৪) মায়ের থেকে শিশুর মধ্যে: গর্ভাবস্থায়, প্রসবের সময়, বা বুকের দুধের মাধ্যমে একজন সংক্রমিত মায়ের কাছ থেকে তার শিশুর মধ্যে এই ভাইরাসটি ছড়াতে পারে।
লক্ষণ
এইচআইভি সংক্রমণের প্রথম কয়েক সপ্তাহ বা মাসে কোন লক্ষণ নাও দেখা যেতে পারে, বা কিছু ক্ষেত্রে ফ্লুর মতো হালকা উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তবে সংক্রমণ বাড়তে থাকলে এবং ইমিউন সিস্টেম দুর্বল হতে শুরু করলে বিভিন্ন ধরনের জটিল রোগ দেখা দিতে পারে। কিছু সাধারণ লক্ষণ হল:
– দীর্ঘমেয়াদী জ্বর
– অস্বাভাবিক ওজন হ্রাস
– ক্লান্তি
– ত্বকে দাগ বা র্যাশ
– দীর্ঘমেয়াদী ডায়রিয়া
– লসিকা গ্রন্থি ফুলে যাওয়া
এইচআইভি এবং এইডস
এইচআইভি এবং এইডস (AIDS – Acquired Immunodeficiency Syndrome) এক নয়, কিন্তু তারা পরস্পরের সাথে সম্পর্কিত। এইচআইভি হল সেই ভাইরাস যা শরীরের ইমিউন সিস্টেমকে আক্রমণ করে, আর এইডস হল সেই অবস্থা যখন শরীরের ইমিউন সিস্টেম এতটাই দুর্বল হয়ে যায় যে, বিভিন্ন রোগ সহজেই আক্রমণ করতে পারে।
এইডস মূলত এইচআইভি সংক্রমণের শেষ পর্যায়ে দেখা যায়। যদি কেউ দীর্ঘ সময় ধরে এইচআইভি সংক্রমিত থাকে এবং সঠিক চিকিৎসা না নেয়, তবে তার ইমিউন সিস্টেম ভেঙ্গে পড়ে এবং সেই অবস্থায় তাকে এইডস আক্রান্ত বলা হয়। এইডস রোগীর বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়, যেমন নিউমোনিয়া, টিউবারকুলোসিস (যক্ষা), এবং কিছু ক্যান্সার।
চিকিৎসা ও প্রতিরোধ
এইচআইভি সংক্রমণের কোন স্থায়ী চিকিৎসা নেই, তবে উন্নত চিকিৎসা পদ্ধতি (যেমন অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপি – ART) দ্বারা ভাইরাসটির বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করা যায়। অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল ওষুধগুলি এইচআইভি ভাইরাসের সংখ্যা কমিয়ে দেয় এবং ইমিউন সিস্টেমকে সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহায্য করে।
চিকিৎসা:
১) অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপি (ART): এই চিকিৎসা পদ্ধতিতে বিভিন্ন ধরনের অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল ওষুধ একসাথে ব্যবহার করা হয়, যা ভাইরাসের বৃদ্ধি প্রতিরোধ করে এবং রক্তে ভাইরাসের পরিমাণ কমিয়ে দেয়।
২) প্রি-এক্সপোজার প্রোফিল্যাক্সিস (PrEP): এই চিকিৎসা পদ্ধতি বিশেষত তাদের জন্য যারা এইচআইভি সংক্রমণের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। PrEP হল প্রতিদিন একটি ওষুধ সেবন করা যা এইচআইভি সংক্রমণের ঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়ে দেয়।
৩) পোস্ট-এক্সপোজার প্রোফিল্যাক্সিস (PEP): এই চিকিৎসা পদ্ধতি সেসব ব্যক্তিদের জন্য যারা সম্ভাব্যভাবে এইচআইভি সংক্রমণের পরপরই (৭২ ঘণ্টার মধ্যে) সংক্রমণ প্রতিরোধ করতে চান। এটি এক মাসব্যাপী একটি ওষুধ সেবন পদ্ধতি যা ভাইরাস সংক্রমণের সম্ভাবনা কমিয়ে দেয়।
প্রতিরোধ:
১) নিরাপদ যৌনমিলন: কনডম ব্যবহার করে যৌনমিলন করলে এইচআইভি সংক্রমণের ঝুঁকি কমে যায়। এছাড়াও, একাধিক যৌনসঙ্গী থাকার পরিবর্তে একজন নির্দিষ্ট সঙ্গীর সাথে যৌনমিলন করা নিরাপদ।
২) রক্ত গ্রহণে সতর্কতা: রক্ত গ্রহণের সময় অবশ্যই সংক্রামিত রক্ত পরীক্ষা করা উচিত। রক্তদান কেন্দ্রগুলিকে নিশ্চিত করতে হবে যে, রক্তগুলি এইচআইভি মুক্ত।
৩) ইনজেকশন ও সুচের ব্যবহার: ব্যবহৃত সুচ ও ইনজেকশন পুনরায় ব্যবহার করা উচিত নয়। এগুলি সঠিকভাবে নিষ্পত্তি করা উচিত এবং একবার ব্যবহৃত হলে তা পুনরায় ব্যবহার করা উচিত নয়।
৪) গর্ভবতী মায়েদের জন্য চিকিৎসা: যদি একজন মায়ের এইচআইভি পজিটিভ থাকে, তবে তাকে প্রসবের সময় এবং গর্ভাবস্থায় বিশেষ চিকিৎসা দেওয়া উচিত যাতে তার শিশুর মধ্যে ভাইরাসটি সংক্রমিত না হয়।
এইচআইভি নিয়ে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি
এইচআইভি সংক্রমিত ব্যক্তিদের প্রায়ই সমাজে অবহেলার শিকার হতে হয়। তাদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয় এবং তাদেরকে সামাজিকভাবে একঘরে করে রাখা হয়। তবে এটি একটি ভুল ধারণা। এইচআইভি সংক্রমণ সাধারণত দৈনন্দিন কার্যকলাপের মাধ্যমে ছড়ায় না। যেমন কোলাকুলি করা, হাত মেলানো, একই খাবার খাওয়া বা একই বাসনপত্র ব্যবহার করা ইত্যাদি দ্বারা এই ভাইরাসটি ছড়ায় না।
এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তিরা সমাজের অন্যান্য লোকদের মতই সাধারণ জীবনযাপন করতে পারে, যদি তারা সঠিক চিকিৎসা এবং পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করে। তাদের প্রতি সহানুভূতি এবং সমর্থন প্রদর্শন করা উচিত, এবং সমাজকে সচেতন করতে হবে যে, এইচআইভি কোনও বিচারযোগ্য অপরাধ নয়, এটি একটি রোগ।
এইচআইভি একটি গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যা যা বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করছে। তবে সঠিক চিকিৎসা এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করলে এই ভাইরাসের সংক্রমণ রোধ করা সম্ভব। সমাজে এইচআইভি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সংক্রমিত ব্যক্তিদের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি।
এইচআইভি সম্পর্কে আরও গবেষণা এবং উন্নত চিকিৎসা পদ্ধতির মাধ্যমে আশা করা যায় যে, ভবিষ্যতে এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে একটি স্থায়ী সমাধান খুঁজে পাওয়া যাবে। ততক্ষণ পর্যন্ত, প্রতিরোধ এবং সচেতনতাই এর বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকরী হাতিয়ার।
ক্ষমতাবান রাজা বাদশাহরা অনেক সময় নিজেদের হারেমে প্রচুর নারী রাখতেন, যাদের মূলত উপভোগের উদ্দেশ্যে রাখা হতো। এসব নারীদের ‘রক্ষিতা’ বলা হতো। প্রাচীন চীনে হারেমে প্রায় ২০ হাজার নারী ছিল। রক্ষিতা রাখার মূল কারণ ছিল জৈবিক চাহিদা পূরণ এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য ছিল বেশি সন্তান উৎপাদন করা, যাতে রাজকীয় রক্তে অধিক পরিমাণ উত্তরাধিকারী জন্মায় এবং রাজ পরিবার কখনো বিলুপ্ত না হয়।
এই নারীদের অনেক সময় জোর করে ধরে আনা হতো কিংবা পরিবার থেকে ছিনিয়ে আনা হতো। তাদের যাতে পালিয়ে যেতে না পারে বা ভেতরে কোনো সমস্যা সৃষ্টি না হয়, তাই পাহারাদার রাখা হতো। তবে এখানে একটি সমস্যা ছিল, কারণ পাহারাদার হিসেবে যারা পুরুষ থাকতেন, তাদের মধ্যে অনেকেই রক্ষিতাদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ফেলতেন।
রক্ষিতাদের ঔরসে শুধুই রাজ রক্তের উত্তরাধিকার তৈরি হবার পাশাপাশি বাইরের রক্ত মিশ্রিত হয়ে যাবার একটা ভয় থেকেই যায়। এই সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য রাজারা একটা পথ বেছে নেয়। পাহারাদারদের যৌন ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়া। যৌন ক্ষমতা নষ্ট করে দেবার প্রক্রিয়াকেই বলে খোজাকরণ। যাদের যৌন ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়া হয় তাদের বলে ‘খোজা’। ইংরেজি Eunuch শব্দের প্রতিশব্দ হচ্ছে খোজা। ইউনাক শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দ Eunoukhos থেকে, যার অর্থ শয়নকক্ষের পাহারাদার।
প্রাচীন চীনের রাজসভা এবং সামাজিক ব্যবস্থার এক অন্ধকার দিক ছিল খোজাকরণ (Eunuch System)। খোজাকরণ বলতে এমন প্রথাকে বোঝানো হয়, যেখানে পুরুষদের যৌনাঙ্গ অপসারণ করে রাজসভায় বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থানে চাকরির জন্য প্রস্তুত করা হতো। এই নিষ্ঠুর প্রথা হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে চীনা সমাজে প্রচলিত ছিল এবং বিভিন্ন রাজবংশের অধীনে এর ভয়াবহ রূপ দেখা যায়।
খোজাকরণের প্রচলন চীনে প্রায় ৩,০০০ বছর আগেও ছিল বলে ধারণা করা হয়। খ্রিস্টপূর্ব ১৬০০ থেকে ১০৪৬ অব্দ পর্যন্ত শাং রাজবংশের (Shang Dynasty) আমলে এর অস্তিত্ব পাওয়া যায়। তবে এটি বৃহৎ পরিসরে চালু হয় হান রাজবংশ (Han Dynasty, ২০২ খ্রিস্টপূর্ব – ২২০ খ্রিস্টাব্দ) থেকে।
খোজাকরণের মূল কারণ ছিল:
রাজসভার বিশ্বস্ত চাকর: রাজপরিবারে চাকরি পেতে হলে পুরুষদের খোজা হতে হতো, যাতে তারা রানী, উপপত্নী এবং রাজকন্যাদের সঙ্গে অবৈধ সম্পর্ক গড়ে তুলতে না পারে।
শাস্তি হিসেবে: কিছু ক্ষেত্রে দোষী ব্যক্তিদের শাস্তি দিতে তাদের খোজা করে দাসত্বে বাধ্য করা হতো।
উন্নতির পথ: দরিদ্র পরিবার থেকে অনেকেই রাজসভায় ভালো অবস্থান পাওয়ার জন্য স্বেচ্ছায় খোজাকরণ করত।
রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে: খোজা পুরুষরা সরাসরি রাজপরিবারের ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠত, যা রাজনীতিতে তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সহায়তা করত।
খোজাকরণের প্রক্রিয়া ছিল অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং বিপজ্জনক। ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, খোজাকরণ করার সময় পুরুষের পুরুষাঙ্গ সম্পূর্ণভাবে কেটে ফেলা হতো। এই প্রক্রিয়া ছিল অত্যন্ত কষ্টদায়ক এবং প্রায়শই সংক্রমণের কারণে মৃত্যু হতো।
প্রক্রিয়াটি নিম্নরূপ ছিল:
একজন ব্যক্তি রাজসভায় চাকরির জন্য খোজাকরণে সম্মতি দিলে, তাকে প্রথমে এক নির্দিষ্ট ঘরে রাখা হতো।
এরপর অপারেশনের জন্য প্রস্তুত করা হতো। সাধারণত স্থানীয় হাতুড়ে চিকিৎসকরা এটি সম্পন্ন করত।
কোনো রকম অবেদনহীন অবস্থায় ধারালো ছুরি দিয়ে পুরুষাঙ্গ সম্পূর্ণভাবে কেটে ফেলা হতো।
রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে ওষুধের পরিবর্তে কখনও কখনও গরম তেল বা ছাই ব্যবহার করা হতো।
সফলভাবে বেঁচে গেলে, তাকে কয়েক মাস পর রাজসভায় চাকরির জন্য নেওয়া হতো।
খোজাকরণের ফলে একজন ব্যক্তি যৌন ক্ষমতা হারালেও, তার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা অক্ষুণ্ণ থাকত। ফলে চীনের রাজসভার খোজারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অবস্থান করত।
প্রধান প্রশাসনিক দায়িত্ব: রাজপরিবারের ব্যক্তিগত সহকারী, উপদেষ্টা ও কূটনীতিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করত।
গোপন তথ্যের রক্ষক: খোজারা সরাসরি সম্রাটের কাছে থাকত, ফলে তারা অনেক গোপন তথ্য জানত।
রাজপরিবারের সুরক্ষা: রাজপরিবারের মহিলাদের দেখাশোনা করত এবং তাদের চাহিদা পূরণ করত।
ক্ষমতার দখল: কিছু ক্ষেত্রে খোজারা রাজপরিবারকে নিয়ন্ত্রণ করত এবং সম্রাটের ক্ষমতার ছায়া হয়ে উঠত।
প্রাচীন চীনে অনেক খোজা পুরুষ ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এদের মধ্যে কয়েকজন হল:
প্রাচীন চীনে কিছু এমন ব্যক্তিত্বের উত্থান হয়েছিল, যাদের কর্মকাণ্ড ও প্রভাব ইতিহাসে গভীর ছাপ ফেলেছে। তাদের মধ্যে জাং রাং, ওয়েই ঝংসিয়ান এবং চেং হো উল্লেখযোগ্য। এই নিবন্ধে আমরা এই তিন ব্যক্তির জীবনী, তাদের ক্ষমতা ও প্রভাব, এবং চীনা সমাজ ও রাজনীতিতে তাদের অবদান সম্পর্কে বিস্তারিত জানব।
জাং রাং (Zhang Rang):
জাং রাং ছিলেন পূর্ব হান রাজবংশের শেষ পর্যায়ের একজন ক্ষমতাশালী কৌঁসুলি। তার প্রভাব এতটাই বৃদ্ধি পায় যে সম্রাটও তার বিরুদ্ধে কিছু করতে পারতেন না। জাং রাংয়ের শাসনামলে দুর্নীতি ও অরাজকতা বেড়ে যায়, যা রাজবংশের পতনের অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
ওয়েই ঝংসিয়ান (Wei Zhongxian):
মিং রাজবংশের আমলে, ওয়েই ঝংসিয়ান ছিলেন একজন ক্ষমতাশালী কৌঁসুলি। তার শাসনামলে তিনি প্রায় পুরো সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করতেন এবং তার নিষ্ঠুরতার জন্য তিনি ভয়ানক feared ছিলেন। ওয়েই ঝংসিয়ানের শাসনামলে দুর্নীতি ও অরাজকতা বেড়ে যায়, যা মিং রাজবংশের পতনের অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
চেং হো (Zheng He):
চেং হো ছিলেন মিং রাজবংশের বিখ্যাত নৌ-অভিযাত্রী। তিনি বিশাল সমুদ্র অভিযান পরিচালনা করেন, যা চীনের বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক প্রভাব বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। চেং হোয়ের অভিযানে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক বৃদ্ধি পায়, যা চীনের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।
এই তিন ব্যক্তিত্বের কর্মকাণ্ড ও প্রভাব প্রাচীন চীনের ইতিহাসে গভীর ছাপ ফেলেছে। তাদের জীবন ও কর্ম চীনা সমাজ, সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রেখেছে, যা আজও পাঠ্য ও গবেষণার বিষয়।
চীনের সাধারণ জনগণ খোজাদের প্রতি মিশ্র মনোভাব পোষণ করত। যদিও তারা রাজসভায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করত, তবুও সমাজের অন্যান্য অংশে তাদের অবজ্ঞার দৃষ্টিতে দেখা হতো। খোজাদের অনেকেই উচ্চপদে অধিষ্ঠিত হলেও তারা সামাজিকভাবে অবাঞ্ছিত হিসেবে গণ্য হতো।
১৯১২ সালে কুইং রাজবংশের (Qing Dynasty) পতনের পর চীনে আনুষ্ঠানিকভাবে খোজাকরণ নিষিদ্ধ করা হয়। শেষ খোজাকৃত পুরুষের নাম ছিল সুয়ান জি (Sun Yaoting), যিনি ১৯৯৬ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
প্রাচীন চীনের খোজাকরণের ইতিহাস ছিল এক নিষ্ঠুর বাস্তবতা, যা সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার গভীর অসঙ্গতি প্রকাশ করে। রাজসভার অভ্যন্তরে এই খোজারা ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করলেও, তাদের জীবন ছিল অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক ও দুর্বিষহ। সময়ের বিবর্তনে এই প্রথা বিলুপ্ত হলেও, ইতিহাসে এটি এক ভয়াবহ নিদর্শন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
আমাদের দরজায় আবারো কড়া নাড়ছে ফেব্রুয়ারি। ফেব্রুয়ারি মানেই রক্তঝরা এক মাস। বাংলা ভাষার বিজয়ের মাস। ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার মাস। ১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের পর থেকেই পাকিস্তানের পশ্চিমাঞ্চলের শাসকগোষ্ঠী পূর্বাঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিকে তাদের অধীন করে রাখার পরিকল্পনা করেছিল। এর অংশ হিসেবে প্রথমেই তারা বাঙালিদের ভুলিয়ে দিতে চেয়েছিল তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষাই হওয়া উচিত রাষ্ট্রভাষা- এ বাস্তব সত্য অস্বীকার করে বাংলার পরিবর্তে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল তারা। উদ্দেশ্য ছিল- মাতৃভাষা কেড়ে নিয়ে বাঙালির জাতিসত্তাকে পঙ্গু করে দেয়া। কিন্তু এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠে বাঙালি। শুরু হয় বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। এরই একপর্যায়ে ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি বিক্ষোভরত ছাত্র-জনতার ওপর চালানো হয় গুলি। শহীদ হন বরকত, সালাম, রফিক, জব্বারসহ অনেকে। বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনে যোগ করে নতুন মাত্রা। শহীদদের রক্ত তাদের প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে প্রেরণা জোগায়। এর পরের ইতিহাস পর্যায়ক্রমিক আন্দোলনের। ‘৫৪-র নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের বিজয়, আইয়ুব খানের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, ‘৬২-র শিক্ষা আন্দোলন, ‘৬৬-র স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই, ‘৬৯-র গণঅভ্যুত্থান, ‘৭০-এর জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জয়লাভ এবং ‘৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠা লাভ করে বাঙালির স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশ। বাঙালি মুক্ত হয় ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণ থেকে। বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের প্রতিটি পর্যায়ে ‘৫২-র ভাষা আন্দোলন অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। তাই একুশ আমাদের জাতীয় জীবনে এক অন্তহীন প্রেরণার উৎস। স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার অর্ধশত বছর পূর্ণ হয়ে গেল। এ দীর্ঘ সময়ে আমাদের অর্জন কী- এ প্রশ্নের উত্তরের মধ্যেই নিহিত রয়েছে আমরা একুশের শহীদদের প্রতি যথাযথ শ্রদ্ধা দেখাতে পারছি কি না। দেশ অনেকটাই এগিয়েছে বলা যায়; কিন্তু একুশে ফেব্রুয়ারির আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে যেসব তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়, সেগুলোর কি নিষ্পত্তি করতে পেরেছি আমরা? বাংলা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে সত্য; কিন্তু তা কি চালু করা সম্ভব হয়েছে সর্বস্তরে? একুশের অন্যতম চেতনা ছিল রাষ্ট্রীয় জীবনে অসাম্যবৈষম্য, দুর্বলের ওপর সবলের আধিপত্য ইত্যাদির অবসান। এই মহৎ আকাক্সক্ষার বাস্তবায়ন ঘটেছে কি? বাঙালির ঐতিহ্য, কৃষ্টি, আবহমানকালের সংস্কৃতি ইত্যাদি সমুন্নত রাখার ঐক্যবদ্ধ সমন্বিত প্রচেষ্টা কি লক্ষ করা যাচ্ছে সমাজে? চিন্তার দিক থেকে আমরা হব আন্তর্জাতিক, কিন্তু পরিচয়ে থাকব বাঙালি- এই ধারায় কি যাপন করছি জীবন? এসব প্রশ্নের উত্তর সন্তোষজনক নয়। বিতর্ক রয়েছে, বিশ্বায়নের যুগে ভিন্ন সভ্যতা, ভিন্ন সংস্কৃতির যে অবাধ প্রবাহ, তাতে আমরা অবগাহন করব কি না। আকাশ সংস্কৃতির ফলে ভিনদেশের যেসব বিষয় আমাদের বিনোদিত করে, সেগুলো আমরা গ্রহণ করব কি না। এ বিতর্কের মীমাংসা হতে পারে বিষয়টিকে আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বিচারের মাধ্যমে। প্রথমত, আমরা যেহেতু বাঙালি, সেহেতু বাঙালিত্বকে সমুন্নত রাখতে হবে। পাশাপাশি স্বতন্ত্র একটি জাতি হিসেবে নিজস্ব সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য সমুন্নত রেখেই ভিন্ন সংস্কৃতি-কৃষ্টির সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া ঘটাতে হবে। ভাষার প্রশ্নে বলতে হয়- আমাদের জীবন চলবে মাতৃভাষার মাধ্যমে। তবে আন্তর্জাতিক যোগাযোগের জন্য শিখতে হবে সাধ্যমতো অন্য ভাষাও। একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। এর অর্থ পৃথিবীর সব মাতৃভাষাই স্ব স্ব জাতির নিজস্ব ও অপরিবর্তনযোগ্য ভাষা। সব মাতৃ ও আঞ্চলিক ভাষাকেই সমান মর্যাদা দিয়ে সংরক্ষণের দায়িত্ব রয়েছে বিশ্ববাসীর। একুশের শহীদদের প্রতি জানাই আমাদের গভীর শ্রদ্ধা। শহীদ স্মৃতি অমর হোক।
“I hope that someday the practice of producing cowpox in human beings will spread over the world when that day comes, there will be no more smallpox.” গোধূলির আবছায়া শাড়ির আঁচলে ছেয়ে গেছে সারাটি বিকেল। সূর্য আকাশ থেকে অবকাশ যাপনের পথ খুঁজে বেরোচ্ছে। সাথে যুবক ছেলেটিও। শীতের মৌসুম। ঠাণ্ডার তীব্রতায় স্থবির হয়ে পড়েছে চারপাশ। পথে ঘাটে নেই মানুষের চলাচল। রাতের সাথে সাথে শীতের তীব্রতাও যেন ক্রমশ বেড়েই চলেছে। নীড় হারা ধবল বকের মত উদগ্রীব হয়ে পা চালাচ্ছে বাড়িফেরত মানুষগুলো। তাল মিলিয়ে এগিয়ে চলছে সেই তরুণ যুবক ছেলেটিও।
বয়সের বিয়োগ ও জীবনের ভাগের হিসেবে তরুণ হলে-ও চিকিৎসক হিসেবে শহরজুড়ে রয়েছে তার ব্যাপক পরিচিতি। তাই ইংল্যান্ডের আধো শহর বার্কলেতে বসবাস করলে-ও দূর দূরান্ত থেকে রোগীদের ভিড় লেগেই থাকত তাঁর কাছে। তবে আজকে একটুখানি বাইরে বের হতে হয়েছে তাকে। দূরের এক রোগীকে দেখতে গিয়েই বাড়ি ফিরতে হয়ে গেলো অনেক রাত। কিন্তু তাতে আক্ষেপ নেই তাঁর। তাঁর কাছে দায়িত্ব এবং মানবসেবার চেয়ে বড় কিছু নেই। ক্লান্ত পরিশ্রান্ত শরীরে ঘোড়ার গাড়ি থেকে নামতেই দেখলেন বাড়ির গেইটের সামনে দাড়িয়ে আছে কালো পোশাকে ঢাকা এক ভদ্র মহিলা। মহিলার চোখে মুখে ভয়ের ছাপ। তড়িঘড়ি করে সামনে এগুতেই মহিলাটি তাঁর পায়ের কাছে বসে পড়ল। কাতর কণ্ঠে বলতে লাগল, “আমার ছেলেকে বাঁচান সাহেব। এই দুঃখীনি মায়ের অন্ধের যষ্টি মানিকটাকে বাঁচান ডাক্তার সাহেব।” যুবক ছেলেটি মহিলাকে তুলে বললেন, “কোথায় আপনার ছেলে?” “ওকে বাড়িতে রেখে এসেছি ডাক্তার সাহেব। অপয়মন্ত এই আমার চারটা ছেলে আগে মারা গিয়েছে। ও-ই আমার শেষ সম্বল। ওকে বাঁচান ডাক্তার সাহেব।”
সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত রোগী দেখে পরিশ্রান্ত সেই তরুণ ছেলেটি হার মানলেন মহিলার আকুতিভরা কান্নার কাছে। শরীরে অবসাদের হাতুড়ির অভিঘাত উপেক্ষা করেই বাড়ি চলে গেলেন তার সাথে। হাঁটতে লাগলেন অন্ধকার পথ ধরে। গলির শেষভাগে ছোট্ট একটা ঘর, কোনরকমে প্রদীপ তার জীবনের শেষ আলোক টুকুন প্রতিফলিত করে যাচ্ছে সেই ঘরে। তার কোণে বিছানার উপর শুয়েছিল ছোট্ট একটি বাচ্চা। সাড়া শরীর কাপড়ে আবৃত। তরুণ ছেলেটি গায়ের ঢাকা খুলতেই শিহরিত হয়ে উঠলেন। শিশুটির শরীর জুড়ে গুটি বসন্তের অনিয়ন্ত্রিত বসবাস। গুটি বসন্তে ভরে গিয়েছে সমস্ত শরীর, সাথে প্রচন্ড রকমের জ্বর। মনে হচ্ছে যেন, জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে শরীরের জীবন্ত সকল কোষ। ঔষধের বাক্স নিয়ে শিশুটির শিয়রে জেগে রইলেন সারাটি রাত।
পাশে উৎকণ্ঠা ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে বুকে তার খেউড়ের মত করে লেন্টে আছে ভয়, মুখে তার একটিই কথা। আমার ছেলেকে বাঁচান সাহেব, আমার ছেলেকে বাঁচান। তরুণ ছেলেটিও হার মেনে নেবার নয়। পারতে তাকে হবেই। মিথ অব সিসিফাসের নায়কের মত পরাভবকে স্বীকার করতে চায় না সে। শুরু হলো তাঁর সাধনা। নিরবে নিভৃতে চলতে লাগলো তার গবেষণার কাজ। একদিন সুদিন নয় দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর চলতে লাগলো তার সাধনা। নেই ক্লান্তি কিংবা অবসাদের ভয়, চিতে তার সাফল্যের নেশা, লক্ষ্য তার জয়। সিসিফাসের মত যার সাধনা ও অধ্যবসায় সেই মানুষ কি কখনো হারতে পারে? অবশেষে সফলতার সূর্য সে ছিনিয়েই আনলেন। আর সেই সূর্যে আলোকিত হয়ে উঠলো জরাগ্রস্ত পৃথিবীলোক। জয়ী হয়ে গেলো মানুষের সাধনা, অধ্যবসায় ও পরিশ্রম।
গুটি বসন্তের ভয়াবহ মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পেলো পৃথিবী। সেই মানুষটির নিরলস সাধনায় পরাজিত হলো ভয়াবহ এই ব্যাধি। মেডিক্যাল সাইন্সে তার অবদান এতটাই সুদুরপ্রসারি যে তাঁকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের বরপুত্র বললেও অত্যুক্তি হবে না। তাঁর কাজ সম্পর্কে বলা হয়, “saved more lives than the work of any other human” এবং তাঁকে ইমিউনলজি বা রোগ-প্রতিরোধ বিদ্যার জনকও বলা হয়ে থাকে। ১৭ই মে, ১৭৪৯ সালে ইংল্যান্ডের গৌচেস্টারশায়ারের বার্কলেতে পিতা মাতার কোল আলোকিত করে মেদিনীর বুকে পদার্পণ করে সেই ছেলেটি। ছিলেন পিতা-মাতার নয় সন্তানের মধ্যে অষ্টম।
জন্মের পর পিতা রেভারেন্ড স্টিজন জেনার ছেলের নাম রাখলেন এডওয়ার্ড জেনার। কে জানতো সেই ছেলেটিই একদিন হয়ে উঠবে চিকিৎসা বিজ্ঞানের বরপুত্র, যিনি হয়ে উঠবেন গুটিবসন্ত রোগের ভ্যাকসিন আবিষ্কারের পথিকৃৎ, যেটি হবে পৃথিবীর প্রথম ভ্যাকসিন। জেনারের বাধা ছিলেন স্থানীয় ধর্মযাজক। বার্কলের জনগণের খুব প্রিয় পাত্র-ও ছিলেন তিনি। ধর্ম প্রচারের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের সুখে-দুঃখে তিনি ছিলেন তাদের অকৃত্রিম বন্ধু। দুঃখী মানুষের প্রতি ছিল তার অমিত ভালোবাসা।
এডওয়ার্ড জেনার ছিলেন চিকিৎসা বিজ্ঞানের বরপুত্র, যিনি আবিষ্কার করেছিলেন পৃথিবীর প্রথম ভ্যাক্সিন বা টিকা গুটি বসন্তের প্রতিষেধক।
গিতার সংস্পর্শে থেকে এই চরিত্রের প্রতিফলন ঘটতে থাকে শিশু জেনারের মধ্যেও। কিন্তু পিতার সান্নিধা বেশিদিন গাওয়ার সৌভাগ্য হয়নি তার। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে পিতাকে হারিয়ে তার ধর্মযাজক এক বড় ভাইয়ের স্নেহ ছায়াতেই বড় হতে লাগলেন জেনার। শৈশবে জেনার ভর্তি হোম ক্যাখারিনের উটন আন্ডার এ শহরের বার্কলেজ স্কুলে এবং পরিবর্তীকালে অধ্যয়ন করেন সাইরেন্সেস্টার স্কুলে। সাইরেন্সেস্টার স্কুলে পড়ার সময় তিনি আক্রান্ত হয় গুটি বসন্তে এবং তাঁকে ভ্যারিওলেশন করা হয় যা তার স্বাস্থ্যে চমৎকারী প্রভাব ফেলেছিল।
জেনার যেখানে থাকতেন সেই বার্কলেতে ছিল না কোন প্রতিষ্ঠিত ডাক্তার। ১৪ বছর বয়সে তাকে শিক্ষানবিশ হিসেবে সার্জন ড্যানিয়েল লুডলর কাছে পাঠানো হয়, যেখানে তিনি নিজে সার্জন হিসেবে প্রয়োজনীয় সমস্ত শিক্ষা এবং অভিজ্ঞতা লাভ করেন। এরপর জেনার চলে আসন লন্ডনে। সে সময় লন্ডনের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও প্রসিদ্ধ চিকিৎসক ছিলেন জন হান্টার। তাঁর কাছেই ছাত্র হিসেবে ভর্তি হলেন জেনার। অল্পদিনের মধ্যেই জেনারের মেধা, অধ্যবসায় ও নিষ্ঠায় বিমুগ্ধ হয়ে গেলেন হান্টার। দীর্ঘ ছয় বছর। হান্টারের কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ শেষে ১৭৭৩ সালে ২৪ বছর বয়সে চিকিৎসক হিসেবে জেনার ফিরে এলেন তার জন্মভূমি বার্কলেতে।
চিকিৎসক হিসেবে একদিকে জেনার ছিলেন যেমন মেধাবী, তেমনি রোগীদের প্রতি ছিল তার আন্তরিক মমত্ববোধ অল্পদিনের মধ্যেই চিকিৎসক হিসেবে সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়লো তার। সেই সময় মরণব্যাধি বসন্তের কালো হাতে জর্জরিত জনজীবন। তখন ইংল্যান্ডের জনসংখ্যার ১০% গুটিবসন্তে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছিল, যে সংখ্যাটা শুধু শহরেই ছিল ২০% পর্যন্ত বেশি, সংক্রমণ সহজেই হওয়া ছিল যার প্রধান কারণ। ছিল না এর কোন প্রতিষেধক কিংবা চিকিৎসা।
কিভাবে মুক্তি পাওয়া যায় সেই রোগ থেকে সে সমন্ধে ছিল না কারো ধারণা। শুধুমাত্র ছিল কিছু প্রচলিত ধারণা ও বিশ্বাস। যারা গরুর দুধ দোহন করত তাদের নাকি একবার গো বসন্ত হয়ে আর কখনো গুটি বসন্ত হত না। এ তথ্যের যদিও কোন প্রমাণ ছিল না কিন্তু এ ধারণাই প্রচলিত ছিল তৎকালীন সমাজে। এদিকে জেনারের কাছে বসন্তের রোগীরা আসলেও কিছুই করতে পারতেন না জেনার। চোখের সামনে অসহায়ের মত অবলোকন করতে হত মৃত্যুর মিছিল। নিরুপায় হয়ে জেনার সেই সময়ের খ্যাতিমান সব চিকিৎসকদের সাথে যোগাযোগ করলেন কিভাবে নির্মূল করা যায় এই রোগ। কিন্তু খালি হাতেই ফিরতে হল তাকে। কেউ পারলো না রোগমুক্তির সন্ধান দিতে।
জেনার অনুভব করতে লাগলেন, এবার তাকেই এগিয়ে আসতে হবে, কিছু করতে হবে। শুরু হলো তার পড়াশোনা, গবেষণা। বিভিন্ন পুঁথি ও বইপত্র থেকে জেনার জানতে পারলেন, পূর্বে চীন দেশের লোকেরা বসন্ত নিরাময়ের জন্য একধরণের টিকা ব্যবহার করত। বসন্ত আক্রান্ত রোগীর দেহ থেকে খানিকটা খুঁজ অন্যের শরীরে প্রবেশ করানো হলে সুস্থ মানুষটি সামান্য অসুস্থ হলেও তার আর কোনদিন বসন্ত হত না। কিন্তু একাজে খুঁজ ঢোকাবার সময় বেশিরভাগ মানুষই অসুস্থ হয়ে মারা যেত।
এবিষয়েই শুরু বিজ্ঞান। হয় তার গবেষণা। মনেপ্রাণে ভাবতে লাগলেন প্রচলিত এই পদ্ধতিতে কোথাও সত্য লুকিয়ে আছে কিনা তা যাচাই করে দেখা প্রয়োজন। দীর্ঘদিনের গবেষণা শেষে ১৭৮৬ সালে জেনার উপলব্ধি করলেন গো বসন্ত সমন্ধে প্রচলিত সেই ধারনাটি কিছুটা সত্য। এই রোগটি সাধারণত গরুকে আক্রান্ত করে। অবশ্য এতে গরুর বিশেষ ক্ষতি হয় না। বিভিন্ন ধরনের গরুর বসন্তের পুঁজ এনে পরীক্ষা করে দেখলেন, শুধুমাত্র এক ধরনের গো বসন্তের খুঁজই গুটি বসন্তের বিপক্ষে কার্যকর।
কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রে এটি কতটা কর্মক্ষম হবে সে বিষয়ে সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারলেন না। এদিকে দেশজুড়ে ক্রমশ বসন্তের বিস্তার। প্রতিনিয়ত মৃত্যুর ভিড়ে জেনার ভাবতে লাগলেন, কবে শেষ হবে এই মৃত্যুর কান্না? নেলনিস নামক এক গোয়ালিনী জেনারের বাড়িতে আসত দুধ দিতে। একদিন তার কাছে জেনার জানতে পারলেন, বাসার সবাই বসন্তে আক্রান্ত হলেও, তার কিছুই হয়নি তার হাতে। ছোট ছোট গুটি বের হয়েছে মাত্র।
জেনার অনুমান করলেন যেহেতু কয়েকমাস আগে নেলনিসের যো বসন্ত হয়েছে, তাই গুটিবসন্ত তাকে আক্রমণ করতে পারেনি।। অতঃপর কুড়ি বছরের গবেষণা শেষে ১৭৯৬ সালের ১৪ ই মে জেনার প্রথমে সারা নেলনিসের হাতের গুটি থেকে ইনজেকশনে করে সামান্য পুঁজ নিয়ে সেই খুঁজ জেমস ফিলিপ নামে আট বছর বয়সের একটি বাচ্চা ছেলের শরীরে প্রবেশ করিয়ে দেখলেন টিকা নেওয়ার দুএকদিন পরেই যেখানে টিকা নেওয়া হয়েছে সে জায়গায় খায়ের মত ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে। ইতোপূর্বে জেমসের বসন্ত হয়নি।
কয়েকদিন ধরে জেমসকে নিয়ে বসন্ত রোগীদের মধ্যে চিকিৎসার কাজ সারলেন। কিন্তু জেমসের বসন্ত হলো না। তিনি অনুভব করতে লাগলেন, এবার তাহলে সফল হয়েছে ভার দীর্ঘদিনের সাধনা। তিনি বুঝতে পারলেন এভাবে গুটিবসন্তের কবল থেকে কোটি কোটি মানুষকে বাঁচানো সম্ভব। তিনিই প্রথম সফলভাবে গুটিবসন্তের টিকা আবিষ্কার করেন। পরবর্তীতে এই টিকা পদ্ধতি আরো উন্নত হয়েছে এবং বিভিন্ন ছোঁয়াচে রোগের ক্ষেত্রে সফলভাবে ব্যবহৃত হয়েছে।
এই টিকাদান পদ্ধতি প্রথমে ব্রিটেনে এবং পরবর্তীকালে পৃথিবীর সকল দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। এমনকি নেপোলিয়ান তাঁকে এই জন্য পুরস্কৃত করেন এবং সমস্ত ফরাসি সৈনিকদের টিকা গ্রহণ করান। একবার এক যুদ্ধে ইংল্যান্ডের বন্ধু সৈনিককে বন্দী করে রেখেছিলেন সম্রাট নেপোলিয়ন । সেই বন্দীদের মুক্তিনা জন্য চিঠি লিখে লিখে পাঠালেন জেনার। সামরিক দপ্তর থেকে সেই চিঠি গিয়ে পৌছাল নেপোলিয়নের হাতে। চিঠি পেয়ে নেপোলিয়ন বললেন, এই মানুষটির থেকে কোন অনুরোধ এলে তা আমাদের পক্ষে ফেরানো সম্ভব নয়।
১৭৯৮ সালে জেনার একটি বই প্রকাশ করেন। বইটির নাম ছিল “An enquiry into the causes and effects of the variolae vaccine.” ভ্যাকসিন আবিষ্কারের সময় তাঁর ক্রমাগত গবেষণার ফলে নিয়মিত চিকিৎসাদান সম্ভব হচ্ছিল না। ১৮০২ সালে পার্লামেন্টের তরফ থেকে দশ হাজার পাউন্ড তাঁকে দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীকালে ১৮০৬ সালে আরো কুড়ি হাজার পাউন্ড দেওয়া হয়েছিল তাঁর গবেষণা চালিয়ে যাওয়ার জন্য। ১৮০২ সালে তিনি আমেরিকান অ্যাকাডেমি অফ আর্টস অ্যান্ড সায়েন্সেস এবং রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস এর সম্মানজনক বিদেশি সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন।
১৮০৩ সালে তিনি জেনারিয়ান সোসাইটির সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। এই সোসাইটির উদ্দেশ্য ছিল গুটিবসন্তের টিকা সবার কাছে পৌঁছে দেওয়া। ১৮০৮ সালে সরকারি সাহায্য নিয়ে প্রতিষ্ঠা করা হয় ন্যাশনাল ভ্যাকসিন স্টাবলিশমেন্ট। কিন্তু মতবিরোধের কারণে পরে তিনি পরিচালক পদ থেকে সরে দাঁড়ান। পরবর্তীকালে তিনি ন্যাচারাল হিস্ট্রির ওপর তাঁর গবেষণা চালিয়ে যান। এর ফলস্বরূপ ১৮২৩ সালে তিনি তাঁর ‘অবজারভেশন অন দা মাইগ্রেশন অফ বার্ড’ গবেষণাপত্রটি রয়্যাল সোসাইটিতে পেশ করেন।
১৮২১ সালে জেনার রাজা চতুর্থ জর্জের প্রধান চিকিৎসক হিসেবে নিযুক্ত হন। এছাড়াও এই সময়ে তিনি বার্কলের মেয়র ও ‘জাস্টিস অফ দি পিস’ এর পদেও নিযুক্ত হন। ২০০২ সালে বিবিসি এডওয়ার্ড জেনারকে ১০০ গ্রেটেস্ট ব্রিটেনস এর তালিকায় স্থান দেয়। জেনার সময় পেলেই স্ত্রী পুত্রকে নিয়ে দূরে কোথাও ছুটি। কাটাতে যেতেন। তিনি চেয়েছিলেন ছেলেও যেন তার মত চিকিৎসক হিসেবে নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করুক। কিন্তু ১৮১০ সালে আকস্মিকভাবে ছেলের মৃত্যু এবং ১৮১৫ সালে স্ত্রীর মৃত্যুতে একেবারে ভেঙে পড়ে তার জীবন। সেই সময় তার বন্ধুকে দেওয়া একটি চিঠিতে জেনার লিখেছিলেন, আমার চারদিকে সব যেন শূন্য হয়ে গেলো।”
মৃত্যুর বেদনা ভুলতে জেনার ফিরে গেলেন প্রকৃতির সংসর্গে। জীবনের শেষ লেখাটিও লিখেছিলেন পরিযায়ী পাখিদের নিয়ে। সেসময় একটি মানুষের কথা খুব মনে পড়ত তাঁর। বহু বছর আগে দেখা সেই অসুস্থ সন্তানের মা, যার চোখের পানি তরুণ জেনারকে অনুপ্রেরণা দিয়েছিল ভ্যাক্সিন আবিষ্কারের এই মহান কাজটি সম্পন্ন করতে। বহুদিন যাবত জেনার খুঁজেছে সেই মাকে। জীবনের শেষ মুহূর্তে এসেও জেনারের যেন কোন দুঃখ কষ্ট ছিল না। কারণ সেই মায়ের কান্না চিরদিনের জন্য মুছে দিতে পেরেছিলেন জেনার। কিন্তু পৃথিবীকে কাঁদিয়ে ১৮২৩ সালের ২৬ শে জানুয়ারি চির বিদায় নিলেন।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের বরপুত্র, মানব দরদী এডওয়ার্ড জেনার। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৩ বছর। চিরদিনের জন্য নিভে গো গেলো তার জীবনের দীপশিখার আলো। কিন্তু কীর্তিমানের কি মৃত্যু হয়? মৃত্যু এডওয়ার্ড জেনারের জীবনকে সংক্ষিপ্ত করেছে সত্য কিন্তু তার মহৎ কর্মের জলস্রোতে ত্যাগ ও মানবসেবার অবিসম্বাদিত অব্যয় অক্ষয় যে আদর্শকে তিনি রেখে গিয়েছেন, তা চির বহমান থাকবে নিরন্তর।