সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর পৌর শহরের দরগাপাড়ায় অবস্থিত হজরত মখদুম শাহ দৌলা শহীদ ইয়েমেনি (রহ.)-এর মসজিদ ও মাজার শরিফ শুধু ধর্মীয় স্থান নয়, এটি এক ঐতিহাসিক নিদর্শন। বিশ্বাস করা হয়, ইয়েমেনের রাজপুত্র হজরত মখদুম শাহ দৌলা (রহ.)-এর নামেই এই অঞ্চলের নামকরণ হয়েছে ‘শাহজাদপুর’।

কথিত আছে, ১১৯১-৯২ সালের দিকে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে তিনি আরবের ইয়েমেন থেকে যাত্রা শুরু করে প্রথমে বোখারায় আসেন এবং সেখানকার ওলি হজরত জালাল উদ্দিন বোখারির (রহ.) সাহচর্যে কিছু সময় কাটান। বিদায়ের সময় তিনি তাঁর হাতে এক জোড়া কবুতর দেন, যা পরবর্তীতে ‘জালালি কবুতর’ নামে পরিচিত হয়। আজও ওই কবুতরের বংশধররা মখদুমিয়া জামে মসজিদের কার্নিশে বসবাস করে।
পানি পথে শাহজাদপুর অঞ্চলে পৌঁছে, দীর্ঘ সময় ভূমির সন্ধান না পেয়ে একসময় জাহাজ মাটিতে আঘাত করে থেমে যায়। সেখানেই তিনি জাহাজ নোঙর করেন—এই জায়গাটির নামকরণ হয় ‘পোতাজিয়া’ (পোঁত অর্থ গাড়া, আওজিয়া অর্থ ভেরা)। কবুতর জোড়া ছেড়ে দিয়ে তিনি মাটি ও মানুষের অস্তিত্ব নিশ্চিত করেন এবং ইসলাম প্রচার শুরু করেন।
তৎকালীন সুবা-বিহারের অমুসলিম রাজা বিক্রম কিশোরী ইসলাম প্রচারে বাধা দিতে সেনাবাহিনী পাঠান, তবে মখদুম শাহ দৌলার সঙ্গীদের কাছে তারা বারবার পরাজিত হয়। কিন্তু এক গুপ্তচরের বিশ্বাসভঙ্গের কারণে শেষ যুদ্ধে তিনি শহীদ হন। কথিত আছে, আসরের নামাজে সিজদারত অবস্থায় গুপ্তচর তাঁর মাথা কেটে রাজার কাছে নিয়ে গেলে অলৌকিকভাবে তাঁর কণ্ঠ থেকে ‘সুবহানা রাব্বি আল আ’লা’ উচ্চারিত হয়। এ ঘটনা দেখে রাজা আতঙ্কিত হয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং তাঁর মাথা ‘ছের মোকাম’ নামে খ্যাত স্থানে সমাহিত করার নির্দেশ দেন। লাশ দাফন করা হয় শাহজাদপুরে, যা পরবর্তীতে নদীভাঙনে বর্তমান স্থানে সরিয়ে আনা হয়।
মখদুম শাহ দৌলার অন্যতম সঙ্গী হজরত ইউসুফ শাহ (রহ.) এ অঞ্চলের মুসলিম শাসনকর্তা নিযুক্ত হন এবং এ অঞ্চল ‘পরগণা ইউসুফ শাহী’ নামে পরিচিতি পায়। মখদুম শাহ (রহ.)-এর মাজার ছাড়াও এখানে রয়েছেন তাঁর ভাগ্নে খাজা নূর (রহ.), হজরত ইউসুফ শাহ (রহ.) এবং তাঁর ওস্তাদ হজরত শামসুদ্দিন তাবরেজি (রহ.)-এর মাজার। তাবরেজি ছিলেন বিখ্যাত সুফি জালাল উদ্দিন রুমির (রহ.) ওস্তাদ।

এছাড়া, করতোয়ার ওপারে রয়েছে হজরত শাহ হাবিবুল্লাহ ইয়েমেনি (রহ.)-এর মাজার, যেটি ‘বাদল বাড়ি’ নামে পরিচিত। স্থানীয় কিংবদন্তি অনুযায়ী, আরও কয়েকজন ওলির মাজার হুড়াসাগর নদীতে বিলীন হয়ে গেছে।
মাজারের পাশেই রয়েছে সুলতানী আমলের এক অসাধারণ স্থাপত্য—মখদুমিয়া জামে মসজিদ। ইট-চুন-সুরকির তৈরি এই মসজিদটি পাঁচটি দরজা, ১৫টি গম্বুজ এবং ২৪টি কালো পাথরের স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ধারণা করা হয়, এটি হজরত মখদুম শাহ দৌলা শহীদ ইয়েমেনি (রহ.)-এর নির্দেশে নির্মিত।
শিক্ষার্থী, স্থাপত্য বিভাগ, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি।
