মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে ব্যাংক কর্মকর্তাদের সম্মেলন

চট্টগ্রাম, ১১ এপ্রিল:

বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)-এর উদ্যোগে এবং অ্যাসোসিয়েশন অব অ্যান্টি মানি লন্ডারিং কমপ্লায়েন্স অফিসার্স অব ব্যাংকস ইন বাংলাদেশ (অ্যাকব)-এর সহায়তায় ব্যাংকগুলোর প্রধান পরিপালন কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি দিনব্যাপী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। চট্টগ্রামের হোটেল র‍্যাডিসন ব্লুতে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে অর্থ পাচার রোধ, প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন ও আর্থিক খাতে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

সম্মেলনের প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। সভাপতিত্ব করেন বিএফআইইউর প্রধান কর্মকর্তা এ জেড এম শহীদুল ইসলাম। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের চেয়ারম্যান সেলিম আর এফ হোসেন এবং অ্যাকবের চেয়ারম্যান মাহাদ জিয়াউল হাসান কাওলা।

গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেন, “অর্থ পাচার রোধ এবং বিদেশে পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার বিষয়টি বর্তমান সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। এ লক্ষ্যে অ্যান্টি-টাস্কফোর্স গঠন করে বিএফআইইউ ও অন্যান্য সরকারি সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করছে।”

তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে, যা অর্থ পাচারের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক। তবে মুদ্রানীতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার নিয়ে কিছু অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, যা সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে মোকাবিলা করা সম্ভব।

বিএফআইইউ প্রধান শহীদুল ইসলাম ব্যাংকিং খাতের অনিয়ন্ত্রিত ঋণপ্রবাহ, খেলাপি ঋণ, ঋণ জালিয়াতি এবং করপোরেট সুশাসনের অভাবকে অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি ও নীতিগত সিদ্ধান্তের ফলে ইতোমধ্যে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।”

অ্যাকবের চেয়ারম্যান মাহাদ জিয়াউল হক AML/CFT (অ্যান্টি মানি লন্ডারিং/কাউন্টার টেররিজম ফাইনান্সিং) কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানান। সেলিম আর এফ হোসেন ঝুঁকিভিত্তিক মনিটরিং জোরদার এবং প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসনের ঘাটতি নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলেন।

সম্মেলনে ৬০টি তফসিলি ব্যাংকের AML/CFT দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান ও উপ-প্রধান কর্মকর্তারা অংশ নেন। আলোচনায় ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, মানি লন্ডারিংয়ের নতুন ধারা, এবং তা প্রতিরোধের কৌশল নিয়ে পৃথক অধিবেশনও অনুষ্ঠিত হয়।

সম্মেলনের মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতে করপোরেট সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং অর্থ পাচার প্রতিরোধে ঐক্যবদ্ধ পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা আবারও উঠে আসে।

বাংলাদেশকে ১ বিলিয়ন ডলারের অর্থ সহায়তা দিচ্ছে ব্রিকস ব্যাংক

রিপোর্ট: ক্যাম্পাস মিরর ডেস্ক

বাংলাদেশের অর্থনীতি ও অবকাঠামো উন্নয়নে বড় অংকের অর্থ সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে ব্রিকস-এর নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (NDB)। সাংহাইভিত্তিক এই বহুপাক্ষিক উন্নয়ন ব্যাংক বাংলাদেশের জন্য ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ তহবিল অনুমোদনের পথে রয়েছে।

সম্প্রতি নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির কাজবেকভের সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে এই আলোচনা সম্পন্ন করেছেন দেশের প্রধান উপদেষ্টা ও নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনুস। বৈঠকে বাংলাদেশের অবকাঠামো খাতে বিশেষত গ্যাস খাতের উন্নয়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং সবুজ জ্বালানি ব্যবস্থাপনার দিকগুলোতে বিনিয়োগের বিষয়টি গুরুত্ব পায়।

এর আগে গত ২৬ মার্চ চীন সফরের সময় ড. ইউনুস মোংলা বন্দর আধুনিকীকরণ প্রকল্পে চীনের কাছ থেকে প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলারের ঋণ প্রতিশ্রুতি নিয়ে দেশে ফেরেন। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের বন্দর ব্যবস্থাপনায় একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশ এমন এক সময়ে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগিতার দ্বারস্থ হচ্ছে, যখন বৈদেশিক ঋণ প্রবাহ ও বৈশ্বিক মন্দার চাপ একসাথে মোকাবিলা করতে হচ্ছে। নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের এই সহায়তা দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অবকাঠামো উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে।

গণঅভ্যুত্থানে গণমাধ্যমের নির্লজ্জ ভূমিকা

২০১৭ সালে প্রথম আলোর উদ্যাগে বাংলাদেশে ১ হাজার ২০০ তরুণের মধ্যে একটি জরিপ করা হয়েছিল। সেখানে দেখা যায় ৮২ শতাংশ তরুণই তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন। জরিপে অংশ নেওয়া তরুণদের ৬৩ শতাংশই বলেছিলেন, তারা জানেন না তাদের জীবনের লক্ষ্য। ৫৬ শতাংশ তরুণ উদ্বিগ্ন নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে। রাজনীতি নিয়ে অধিকাংশ তরুণ অনাগ্রহের কথা জানিয়েছিলেন। কারণ রাজনীতি মানে বিদ্বেষ, আন্দোলনের নামে হয় নিরীহ মানুষের প্রাণহানি। স্বাধীনতা আনা সংগঠন নিজের হাতে সব কবর দিয়ে গেছে!

গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী আজও তা কঠিন বাস্তবতা। এর মাঝে জুলাই এসেছিল তারুণ্যের আশা-হতাশার মাস হিসেবে।

কত জীবনের অপূরণীয় ক্ষতি, সম্ভাবনার অকাল অবসান! আমি আপনি নিজের জায়গা থেকে, তাদের মা-বাবা, ভাইবোন, স্বজনদের কথা বিবেচনা করি। সাঈদ, মুগ্ধ, ওয়াসিম, তরুয়া ও মেহেদীদের মায়েরা কীভাবে সহ্য করবেন ব্যথা! বাবারা কীভাবে কাটাবে রাত? এমন পরিস্থিতিতে নবারুণ ভট্টাচার্যকে মনে করি-

“এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না।”

পরের অংশে বলেছেন-

“যে শিক্ষক বুদ্ধিজীবী কবি ও কেরাণী

প্রকাশ্যপথে এই হত্যার প্রতিশোধ চায় না

আমি তাকে ঘৃণা করি।”

মানব দেহে একদিনে ক্যান্সার হয় না, তেমনি দেশও তলানিতে যায় না। দেশটা যখন মৃত্যু উপত্যকায় পরিণত হচ্ছে তখনও চুপ ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষক, চুপ করে ছিলেন দেশের কবি-লেখক, সম্পাদক ও সাংবাদিক। ভাবছি বইমেলায় তাদের হাজার হাজার বই, কীভাবে দেখাবে মুখ নন্দলালের জীবন নিয়ে? প্রাইভেট ছাড়া পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক আছে ১৫ হাজার ২৩৬। তাদের মধ্যে অধ্যাপক রয়েছে ৪ হাজার ৬৬১ জন। তারা ব্যস্ত কীসে, কেউ কী জানেন? শিক্ষক নেতাদের নীরবতা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন শতশত শিক্ষার্থী। যারা পাশে দাঁড়িয়েছেন তারা শক্তি। আমাদের সমাজের লজ্জা নতুন কেউ শহীদ শামসুজ্জোহা হতে পারেননি, জাগতিক লোভে।

স্বৈরাচার প্রধানমন্ত্রীর এক সভায় সিনিয়র এক সাংবাদিক বলেছিলেন, “শেখ হাসিনার সঙ্গে আছেন, প্রয়োজনে যেকোনো কিছু করতে প্রস্তুত।” এতে সাংবাদিকদের সঙ্গে ক্ষমতার পারস্পরিক স্বার্থের সম্পর্ক আরও পরিষ্কার হয়েছে। যেন ছাত্রলীগের ভূমিকা রাখছে। আজ তারা কই, সবাই পালিয়েছেন। এ যেন কানার হাটবাজার। কেপিআই মানে সম্পদ নষ্ট হচ্ছে দেখানো হয়, হাজার হাজার মানুষের কোন খবর নেই, অনুতাপ নেই। ক্ষমতাপ্রীতি সাংবাদিকতায় একটি রোগ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই প্রজন্ম এদের নিন্দা, ধিক্কার জানিয়েছে।

তারা ভুলে গেছে- শিক্ষকতা, সাংবাদিকতা কোনো চাকরি না। এখানে দায় ও দায়িত্ব আছে। আছে নীতিবোধের চর্চা, জ্ঞানকা-ের ব্যবহার। শিক্ষক কবি সাংবাদিক এরা যখন নষ্ট হয়ে যায় তখন রাষ্ট্র ভালো থাকতে পারে না। তার উদাহরণ গণঅভ্যুত্থান আগের বাংলাদেশ।

যারা ঊনসত্তর, একাত্তর, পঁচাত্তর ও নব্বইয়ে কবিতা-গানে মাতিয়ে রেখেছেন দেশ, তারাও হারিয়ে গেছেন। বেঁচে থাকা উল্লেখযোগ্য কবি লেখকরা চুপ। পাঠকরা চায় তাদের লেখকরা কিছু বলুক, পাশে থাকুক। এক সময় বাংলা একাডেমিতে কর্মরত লেখকরাও কথা বলতেন, লিখতেন। আজ তারাও চুপ।

গ্রন্থাগার বিশেষজ্ঞ ফজলে রাব্বী এক বইতে উল্লেখ করছেন- “বাংলা একাডেমি একটা দ্বীপের মত। এটি জন্ম থেকেই সরকারের বিরুদ্ধে। সরকারও এর বিরুদ্ধে। এর কারণ বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠা হয়েছিলো একটি গণতান্ত্রিক দাবীর প্রেক্ষিতে, গণতান্ত্রিক সরকার কর্তৃক। এ দেশে সরকার ও জনতা পরস্পর বিরোধী। গণতন্ত্র ও সরকার সম্পূরক শক্তি নয় বরং বিরোধী। এর প্রাণ হচ্ছে লেখক গবেষক।” সেই প্রাণের আজ প্রাণ নেই। পদ-পদবি পুরষ্কারে মাতাল। অনুভূতি অনুভোতা হয়ে গেছে সে কতকাল আগে। সময় দেখে কেউ কেউ ভোল পাল্টাবে!

মানুষ সামাজিক জীব। ফলে সমাজের একপ্রান্তে কী ঘটছে, অন্যপ্রান্তের মানুষ তা জানতে চায়। তাই তো দেখা হলেই বলে ‘কি মিয়া, খবর কি! ভালো মন্দ জানাইয়ো’। এমনই মানুষের জীবন। পুরনো আলাপে না গিয়ে কেবল পঞ্চদশ শতক থেকে শুরু করি। এই দশকের মাঝামাঝি জার্মানে য়োহান গুটেনবার্গ ছাপাখানা আবিষ্কার করে পুরো জগৎ চেহারা পাল্টে দিলেন।

এই ছাপাখানা এনে দিলো বার্তা, ভাবনা, প্রচারণা, গণপ্রচারের অবাধ সুযোগ। ইতিহাসের চেনা ছক পাল্টে দেওয়ার পথে ছাপাখানার যুগান্তকারী প্রভাব পড়ল। এর মাঝে প্রভাবশালী উপাদান হলো মুদ্রিত খবরের কাগজ। মানুষের পৃথিবীতে এলো নতুন একটি বর্গ, যার নাম গণমাধ্যম।

গণমানুষ গণতন্ত্র গণমাধ্যম তিনটি শব্দে ‘গণ’ শব্দটি সাধারণ। গণমাধ্যম থেকে যদি ‘গণ’ উধাও হয়ে যায় তবে সেটি শুধুই একটি প্রচারমাধ্যমে পরিণত হয়। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান একটি পেশাকে গণমানুষের পক্ষে ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার জন্য দিয়েছে অবাধ স্বাধীনতা।

যদিও প্রমথ চৌধুরী বলেছিলেন, মুখ থেকে কলমে ভাষা যায়। প্রমথ চৌধুরীর সময় কলমের সংখ্যা কম ছিল। আজ অনেক কলম, অনেক দিক। কলমের সংখ্যা বেড়েছে। কলম থেকে মানুষের মুখে সংক্রমিত হওয়ার সংখ্যাও বেশি। প্রযুক্তির নতুন কিছু আসলে সঙ্গে সঙ্গে নতুন শব্দ হাজির হয়। গণমাধ্যম বা যারা লেখালেখি করেন তারা সেটা ভালোভাবে টের পান। প্রকাশ করেন ফেসবুকে বা পত্রিকা অথবা বইতে। প্রাত্যহিক জীবনের সঙ্গে গণমাধ্যম অন্যতম অংশ এখন। তার ভাষাভঙ্গি, জ্ঞান আচরণ ও সংস্কৃতি আমাদের নানানভাবে প্রভাবিত করে।

এর মাঝে টেলিভিশন দেশে যাত্রা শুরু করে ১৯৫০-এর দশকে। হলিউডের কারণে গণবিনোদনের তুমুল জনপ্রিয় অনুষঙ্গ হয়ে চলচ্চিত্র যাত্রা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের সীমানা ছাপিয়ে। বিভিন্ন দেশেও তখন চলছে রুপালি পর্দায় নিজের নিজের মতো করে উঠে দাঁড়ানোর প্রয়াস। বিজ্ঞাপনী প্রচারণার রঙে ইতিহাসটা অবশ্য এগুলোর মতো অভিনব নয়।

তবে ডিজিটাল মাধ্যমের বয়স দুই দশকের ঘরে। এর জন্ম সোনার চামচ মুখে দিয়ে-অপার সম্ভাবনাময় এই পরিসরটি পেয়েছে বিপুল বিনিয়োগ, প্রযুক্তির অনিঃশেষ উদ্ভাবনী চমকের আশীর্বাদ, আর সর্বশেষ করোনার অতিমারিতে বছরের পর বছর রুদ্ধ ঘরে বসে থেকেও পৃথিবীর সঙ্গে যুক্ত থাকার জন্য মানুষের মরিয়া আকুতি। এই যে পরিস্থিতি, তার প্রশ্রয়ে প্রায় মুদ্রিত গণমাধ্যমকে ডিজিটাল গণমাধ্যম দেড় দশকের মধ্যেই কাবু করে পেলেছে।

কোটা সংস্কারে গড়ে ওঠা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে বিশ্বজুড়ে আবু সাঈদ সাহসী প্রতিবাদী চরিত্র হয়ে থাকবে। এমন অসংখ্য ছাত্র-জনতার জীবনের ত্যাগে একক কর্তৃত্বের শাসনে স্বৈরাচারের পদত্যাগ ও দেশ ছাড়ার ঘটনা ঘটে। জুলাই থেকেই সরকার সম্পূর্ণভাবে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। পশ্চিমাকে শত্রু বানিয়ে শেষ পর্যায়ে ভূরাজনীতিতেও প্রায় একা হয়ে পড়েছিলেন। অবশেষে গণ–আন্দোলনের মুখে তার নির্মম পরিণতি দেখে বিশ্ব।

কিন্তু আরেকটি ঘটনা সচেতন মাত্র খেয়াল করেছে গণমাধ্যমের লজ্জাকর ভূমিকা। সবার চোখের সামনেই তরুণদের ক্রমবিস্তৃত একটা শান্তিপূর্ণ আন্দোলন ভয়ঙ্কর সহিংসতার শিকার হতে থাকল। অথচ অধিকাংশ গণমাধ্যম একে যথাযথ ‘ট্রিটমেন্ট’ দিল না। ন্যায্যা আন্দোলনকারীদের বলেছে দুর্বৃত্ত, ষড়যন্ত্রকারী, দেশবিরোধী, উন্নয়ন বিরোধী। সরকার বলছে, রাজাকারের নাতিপুতি, ছাত্রলীগ বলছে- কোটা আন্দোলনের প্রতি আমরা তীক্ষ্ণ নজর রাখছি। আন্দোলনের নামে পরিস্থিতি অশান্ত করে তোলার চেষ্টা হলে ছাত্রলীগ তার করণীয় ঠিক করবে।‘ এই আলাপের বাহিরে গিয়ে হাতেগোনা ৫-৭টি পত্রিকা, ২-৩টি চ্যানেল বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে প্রকৃত দায়িত্ব পালন করেছে

বিশ্লেষণ করলে দেখব- বাংলাদেশে ৪ ধরনের গণমাধ্যম রয়েছে। সংবাদপত্র, টেলিভিশন, রেডিও এবং অনলাইন নিউজ পোর্টাল। স্মার্টফোনের কারণে অবশ্য এর বাইরে সিটিজেন জার্নালিজমের এক বিশাল ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে ফেসবুক। এর মাঝে দেশের বেশিরভাগ গণমাধ্যম ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। গণমাধ্যমের উপর গণমানুষের আস্থা তলানিতে ঠেকেছে। গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র জনতার পক্ষে বেশিরভাগ গণমাধ্যম দাঁড়ায়নি। ফলে ক্ষুব্ধ জনতা বেশ কয়েকটি গণমাধ্যম অফিস ভাংচুর হয়েছে। যদিও এটি অপ্রত্যাশিত কিন্তু বাস্তবতা ছিল।

সাধারণ মানুষ ক্ষমতাহীন মানুষ প্রান্তিক মানুষের পক্ষে ক্ষমতাকে প্রশ্ন করে অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। ক্ষমতাহীনের পক্ষে এই স্বাধীনতার চর্চা যারা করেন তাদেরকে বলা হয় সাংবাদিক। ক্ষমতা যাতে সীমা ছাড়িয়ে স্বৈরাচার হতে না পারে সেজন্য সাংবাদিকরা ক্ষমতাকে চোখে চোখে রাখেন। তার ক্ষমতার উৎসও তাই গণমানুষ। এর আইনি ভিত্তি দিয়েছে সংবিধান। কিন্তু সেই ভিত্তি নিয়ে দালালি করেছি, গণ মানুষের পাশে দাড়ায়নি। স্বাভাবিক বিচার, বিবেচনাবোধ এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছি। এই কা-জ্ঞানহীন কাজটি আরও পরিষ্কার হয়েছে চব্বিশের জুলাই গণ অভ্যুত্থানে।

এমন দলবাজি, অপসাংবাদিকতা, হলুদ সাংবাদিকতা ও তথ্যসন্ত্রাস সাংবাদিকদের মর্যাদা ম্লান করে দিয়েছে। বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতাকে দখল করে নিয়েছে স্বার্থনির্ভর সাংবাদিকতা। কথা ছিল গণমাধ্যমকে সব সময় জনগণের পক্ষে থাকার। কিন্তু জনগণের সঙ্গে গণমাধ্যমের একটা দূরত্ব তৈরি হয়ে গেছে।

সবার মনে আছে নিশ্চয়, সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনাকে গুম-খুনের কথা জিজ্ঞেস না করে তৈলমর্দন করতেন অনেক দালাল সাংবাদিক। সেটা প্রধানমন্ত্রীর সংবর্ধনা সভায় পরিণত হতো। এভাবে শেখ হাসিনাকে স্বৈরাচার থেকে মহাস্বৈরাচার তৈরিতে সবচেয়ে বড় অবদান রাখে দালাল সাংবাদিকেরা।

আসলে দাসত্ব একবার গ্রহণ করলে বাকি জীবন মানুষের আচরণ করা সম্ভব হয় না, প্রমাণ বাংলাদেশের উল্লেখ্যযোগ্য অংশ সাংবাদিক সম্পাদকরা।

‘ভোটবঞ্চিত তারুণ্য’ অভূতপূর্ব অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ফেললেন। ঘোর আষাঢ়-শ্রাবণেও এমন প্লাবন এ দেশ দেখেনি। এ যেন নজরুলের উষার দুয়ারে আঘাত হেনে রাঙা প্রভাত আনার ছন্দময় বিপ্লব। বাংলাদেশের সঙ্গে ৩টি গণঅভ্যুত্থানের সময় স্মরণীয়।

৬৯ সালের বাঙালির স্বকীয়তাবোধে শ্লোগান ছিল-

‘তোমার দেশ আমার দেশ ,বাংলাদেশ বাংলাদেশ’

জ্বালো জ্বালো

আগুন জ্বালো’;

‘আইয়ুব-মোনায়েম ভাই ভাই

এক দড়িতে ফাঁসি চাই’,

‘পুলিশ তুমি যতই মারো

বেতন তোমার এক শ বারো’ প্রভৃতি।

৯০ এরশাদ পতনের আন্দোলনে স্লোগান ছিল

‘জনতার দাবি এক

এরশাদের পদত্যাগ’;

‘এক দফা এক দাবি

এরশাদ তুই কবে যাবি’;

‘এই মুহূর্তে দরকার

তত্ত্বাবধায়ক সরকার’।

পতনের পরপর স্লোগান উঠেছিল

‘এই মাত্র খবর এলো

এরশাদ পালিয়ে গেল’।

২০২৪ সালের ছাত্রজনতার আন্দোলনে

‘চাইলাম অধিকার হয়ে

হয়ে গেলাম রাজাকার’;

‘আপস না সংগ্রাম

সংগ্রাম সংগ্রাম’;

‘দালালি না রাজপথ

রাজপথ রাজপথ’;

‘আমার সোনার বাংলায়

বৈষম্যের ঠাঁই নাই’;

‘একাত্তরের হাতিয়ার

গর্জে ওঠো আরেকবার’;

‘যে হাত গুলি করে

সে হাত ভেঙে দাও’;

‘অ্যাকশন অ্যাকশন

ডাইরেক্ট অ্যাকশন’;

‘আমার ভাই কবরে

খুনিরা কেন বাইরে’;

‘আমার ভাই জেলে কেন’;

‘জাস্টিস জাস্টিস

উই ওয়ান্ট জাস্টিস’;

‘জ্বালো রে জ্বালো

আগুন জ্বালো’;

আমার খায়

আমার পরে

আমার বুকেই গুলি করে’;

‘লাশের ভেতর জীবন দে/

নইলে গদি ছাইড়া দে’;

‘এক দুই তিন চার

শেখ হাসিনা গদি ছাড়’;

‘লাখো শহীদের রক্তে কেনা

দেশটা কারো বাপের না’-

এর মতো কিছু স্লোগানও ওঠে। এমনকি ব্রিটিশবিরোধী লড়াইর সাড়া জাগানো ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগানটিও যেন এবার নতুন প্রাণ পেয়েছে।

এগুলো পত্রিকা কাভার করেছে বা করতে বাধ্য হয়েছে। মানুষের কথা কীভাবে কলমে চলে যায় বলা যায় না। তবে পত্রিকা কীভাবে ট্রিটমেন্ট দিয়েছে। তার কিছু নমুনা হাজির করছি। এ থেকে পাঠক ধারনা পাবেন গণমাধ্যমের ভাষাজ্ঞান ও জনগণের প্রতি দায় ও দরদ।

যুগান্তর ৫ আগস্ট লিখছে- ১৩ পুলিশকে ‘হত্যা’ আর ফেনীতে এক দফা কর্মসূচিতে সংঘর্ষ নিহত ৭। দেখা যাচ্ছে- পুলিশের ক্ষেত্রে ‘হত্যা’ আর ছাত্র-জনতার ক্ষেত্রে ‘নিহত’! পরদিন লিখছে- বিজয়ের দিনেও পুলিশের গুলি, হামলা, নিহত ১০৩ / রাজপথে ছাত্র-জনতার বিজয় উল্লাস, ভাষাভঙ্গি কতটা পরিবর্তন ঘটেছে।

অন্যদিকে আর একটি সংবাদের কয়েকটি নমুনা দিলাম। বিভিন্ন মামলায় ৪২ এইচএসসি পরিক্ষার্থীর জামিন আদেশ (জনকন্ঠ), আইনমন্ত্রীর উদ্যোগে ৪২ এইচএসসি পরীক্ষার্থীর জামিন (যুগান্তর), কোটা আন্দোলন : ৪২ এইচএসসি পরীক্ষার্থীর জামিন (নয়া দিগন্ত), কোটা আন্দোলন: কারাগারে থাকা ৪২ এইচএসসি পরীক্ষার্থীর জামিন (যমুনা টিভি), আন্দোলনে সহিংসতা: জামিন পেলেন ৪২ এইচএসসি পরীক্ষার্থী (বিডি নিউজ অনলাইন), কোটা সংস্কার আন্দোলন/ মামলায় জামিন পেলেন যেসব এইচএসসি পরীক্ষার্থী ও শিক্ষার্থী (প্রথম আলো)।

কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে সংঘাত, সংঘর্ষ ও সহিংসতার ঘটনায় করা মামলায় গ্রেপ্তার দেশের বিভিন্ন জেলার এইচএসসি পরীক্ষার্থী ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। অথচ জনকন্ঠ ও যুগান্তর পত্রিকা পড়ে বুঝার উপায় নেই, কেন তাদের জামিন কেন তাদের গ্রেফতার করেছে। এই হচ্ছে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা।

আর একটি দেখব- ৬ সমন্বয়ককে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করল ডিবি (ইত্তেফাক), ডিবি হেফাজত থেকে পরিবারের কাছে ৬ ‘সমন্বয়ক’- (বিডি নিউজ অনলাইন), ৬ সমন্বয়ককে ছেড়ে দিয়ে প্রহরায় না রাখার দাবি, নাগরিক সমাজ (প্রথম আলো)। কার শিরোনাম কেমন, কে কী এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে, বুঝা যায়?

শেষ আর একটি হাজির করি- মার্চ ফর জাস্টিস’ কর্মসূচি প– (জনকন্ঠ), পুলিশি বাঁধায় মার্চ ফর জাস্টিস কর্মসূচি প-, আটক ১৪ (ইনকিলাব), ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ কর্মসূচিতে পুলিশের বাধা- (বিডি নিউজ অনলাইন), মার্চ ফর জাস্টিস: বিভিন্ন জায়গায় মিছিল, পুলিশের বাধা- আটক (প্রথম আলো)

শিরোনামে বুঝা যায়, কে কার দিকে হেলে পড়ছে অথবা যথার্থটা তুলে আনছেন। ভাষা ও ভঙ্গিতে সীমাহীন লেজুড়বৃত্তির চর্চা পরিষ্কার। নিউজ ট্রিটমেন্টে আরও বুঝা যায় কার কী এজেন্ডা। এসব চর্চা দীর্ঘ সময় ধরে চর্চিত হতে হতে এখন প্রতিষ্ঠিত সেলফ সেন্সরশিপে রূপান্তরিত হয়েছে। অথচ বলা হয়- গণমাধ্যম আধুনিক সমাজের একটি অপরিহার্য অংশ। গণমাধ্যম জনগণকে প্রভাবিত করে, বিভিন্ন বিষয়ে সচেতন করে এবং স্বপ্ন দেখায়। গণমানুষ তাদের যাপিত জীবনের বিভিন্ন দিক নির্দেশনা পায় গণমাধ্যমের কাছ থেকে। সেই গণমাধ্যম অধরা!

পত্রিকাগুলোর মধ্যে কোন সমন্বয় নেই। যে যার মত করে বানান লিখছে। এমন বহু সংকটে চুপ অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, সাংবাদিক ও সম্পাদক। অনেক আগে মারা গেছেন অদ্ভুত উটের পিঠে চলছে স্বদেশের কবি, বেঁচে থেকেও চুপ দুঃশাসনবিরোধী কবিরা, কেউ কেউ মুখে কুলুপ এঁটে সুবিধা নিতে নিতে রীতিমতন রাজকবির পর্যায়ে পৌঁছে গেছেন।

তরুণ সাংবাদিকদের একটা অংশ জুলাইতে পেশাগত দায়িত্বপালনের সময় হামলার শিকার হয়েছেন। অনেককে শারীরিকভাবে নির্যাতন এবং কাজের সময় হাত থেকে ক্যামেরা ছিনিয়ে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে। আবার অফিস থেকে অসহযোগিতা পেয়েছেন এমন উদাহরণও আছে। সম্পাদক থেকে বার্তা প্রধান বা প্রধান প্রতিবেদক পর্যায়ের নেতারা বিক্রি হয়ে গেছে অনেক আগেই। তাদের কারণে প্রজন্মের পথচলা বিব্রতকর। শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি শহীদ সাংবাদিকদের।

আমরা আমরা বিগত সরকারের আমলে মিডিয়া হস্তক্ষেপ বা কণ্ঠরোধ করার সংস্কৃতি। এর মাঝেও জুলাই আন্দোলনের শুরু থেকে মাল্টিমিডিয়া সাংবাদিকরা ঝুঁকি নিয়ে কিছু কাজ করেছে। বিভিন্ন ক্যাম্পাসের খবর দিয়েছে।

সবচেয়ে খারাপ লাগার সংবাদ হচ্ছে- আন্দোলনে বিক্ষোভকারীদের ওপর চালানো গুলিতে পাঁচ সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। পুলিশের গুলিতে ১৮ই জুলাই হাসান মেহেদী নামের এক সাংবাদিক নিহত হন। তিনি ঢাকা টাইমস এই নিউজ পোর্টালে কর্মরত ছিলেন। ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে খবর সংগ্রহের সময় তিনি গুলিবিদ্ধ হন। একই দিনে ভোরের আওয়াজ নামের একটি দৈনিকের প্রতিবেদক শাকিল হোসাইন নিহত হন। ওই দিন দৈনিক নয়াদিগন্তের সিলেট প্রতিনিধি আবু তাহের মুহাম্মদ তুরাব নামের আরেক সাংবাদিক পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান। ২ আগস্ট তাহির জামান প্রিয় নামের আরেক ফ্রিল্যান্স ভিডিও সাংবাদিক গুলিবিদ্ধ হন। এর দুইদিন পর ৫ আগস্ট সিরাজগঞ্জে দৈনিক খবরপত্রের সাংবাদিক প্রদীপ কুমার ভৌমিক প্রাণ হারান। নিহত সাংবাদিকের সকলেই পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন। নিহতের পাশাপাশি অন্তত কয়েক ডজন সাংবাদিক আহত হয়েছেন।

আমি মনে করি শেখ হাসিনার চলে যাওয়াও কেবল তার দলের জন্য শিক্ষা না, সবার জন্য উচিৎ শিক্ষা। অহংকার ও শব্দের ব্যবহারে সতর্ক হতে হয়! না হলে কর্মের ফল হাতে হাতে পেতে হয়। সেই দীক্ষায় গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও সামাজিক সম্প্রীতি নিয়ে নতুন বাংলাদেশ নির্মাণে কাজ করে যেতে হবে। সজাগ থাকতে হবে চারপাশের গুজব নিয়েও। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন শেষ হয় না- এটা বিশেষ করে মনে রাখতে হবে সাংবাদিকদের।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাবের বার্ষিক প্রীতিসম্মিলন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাবের বার্ষিক প্রীতিসম্মিলনী গতকাল ২৩ জানুয়ারি ২০২৫ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। ক্লাবের সভাপতি অধ্যাপক মো. ফজলুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশা, প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ ও কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. এম. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন। ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী অনুষ্ঠান সঞ্চালন করেন।

(মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম)

পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত), জনসংযোগ দফতর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

হাসপাতালে ডাক্তারদের সাধারণ টেস্ট ও সেগুলো দাম!

এস. এম. এম. মুসাব্বির উদ্দিন

আমরা সাধারণত অসুস্থ হই বা কোনো শারীরিক কোনো সমস্যা থাকে, তখন আমরা হাসপাতাল বা ক্লিনিকে যাই। সেখানে ডাক্তাররা প্রেসক্রিপশন লেখার সময় কিছু টেস্ট দেয়, যা ডাক্তারি ভাষায় ইনভেস্টিগেশন বলে। এসব টেস্ট রিপোর্ট ভিত্তি করে ডাক্তার বলতে পারবে, আপনি কোন রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। ডাক্তাররা সাধারণত কিছু কমন টেস্ট দেয় যা সচরাচর আমরা হরে থাকি। সেসব টেস্টগুলো হলো: 

১) সিবিসি (কম্বাইন্ড ব্লাড কাউন্ট): এই টেস্ট সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। এই টেস্ট সাধারণ যেকোনো জ্বর, রক্তক্ষরণ, ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া ক্ষেত্রে দেওয়া হয়। সিবিসি করাতে ৫০০-৮০০ টাকা লাগে। 

২) এক্স-রে: যদি কোনো রোগী কাশি বা কোনো হাড়ের ফ্রাকচার বা হাড় ভেঙে গেলে ডাক্তাররা এক্স রে করায়। এক্স রে মাধ্যমে আমরা ফরেন পার্টিকেল বা কোথায় বা কতটুকু হাড় ভেঙ্গেছে সেটা নির্ণয় করে চিকিৎসা দেয়। তবে এই টেস্ট করাতে ১০০ থেকে ১৫০০ টাকার মধ্যে করানো হয়ে থাকে। যেমন: নরমাল বুকের এক্স রে করাতে লাগে ১০০-৪০০ টাকা, পেটের এক্স রে করাতে ১৫০০-২০০০ টাকা লাগতে পারে, যেকোনো জয়েন্ট এক্স রে করাতে ১০০০ টাকা উপরে লেগে যেতে পারে। 

৩) ইউরিন (Urine) টেস্ট: যেকোনো কিডনি, পেটের সমস্যা, লিভারের সমস্যা হলে ডাক্তাররা ইউরিন টেস্ট করায়। যেমন: ক্রিয়েটিনিন টেস্ট করাতে ৪০০-৭০০ টাকা লাগে, গ্লুকোজ টেস্ট করাতে লাগে ৩০০ টাকা, ক্যালসিয়াম টেস্ট করাতে ৮০০ টাকা লাগে। অর্থাৎ ইউরিন টেস্ট করাতে ৪০০-৫০০০ টাকার মধ্যে করানো হয়।

৪) ইসিজি (ইলেক্ট্রোকার্ডিওগ্রাফ): ইসিজি হলো হৃদপিন্ডের রোগ শনাক্তকরণ পদ্ধতি। এর মাধ্যমে ডাক্তাররা সহজে জানতে পারে যে হৃদপিণ্ড কি সমস্যা হয়েছে, কোথায় হচ্ছে এবং কি কারণে হচ্ছে। সাধারণত ইসিজি করাতে কমপক্ষে ৪০০ টাকা লাগে। তবে জরুরি রোগীর জন্য কখনো কখনো টাকার পরিমাণ বেশি হতে পারে। যেমন: হল্টার ইসিজি করাতে ৫০০০-৮০০০ টাকা লাগে। 

৫) আল্ট্রাসনোগ্রাম: আল্ট্রাসনোগ্রাম হলো শব্দ তরঙ্গের মাধ্যমে শরীরের অভ্যন্তরে ছবি পর্দা ব্যবহার করা। এর মাধ্যমে জানা যায় পেট কি সমস্যা হয়েছে। এটি সাধারণত গর্ভকালীন মহিলাদের বেশি ব্যবহৃত হয়। আল্ট্রাসনোগ্রাম করাতে ১২০০-৮০০০ টাকা লেগে যেতে পারে। গর্ভকালীন মহিলাদের ক্ষেত্রে ৩০০০-৮০০০ টাকার মধ্যে হয়ে থাকে। 

৬) ব্লাড ডোনেশন: কখনো কখনো রোগী রক্ত লাগে, সে ক্ষেত্রে আমরা ডোনারকে দিয়ে রক্ত সংগ্রহ করি। কিন্তু রক্ত সংগ্রহ করার আগে ডোনার ব্লাড নেওয়া, গ্রুপিং, স্ক্রিনিং করাতে ২১০০ টাকা লাগে। উন্নত হাসপাতালগুলোতে আরো বেশি হতে পারে। 

আশা করি আমার ছোট লেখা মাধ্যমে আপনারা সবাই জানতে পারবেন এবং সচেতন হতে পারবেন। অনেক রোগী এসব টেস্ট করাতে হিমশিম খাই। তাই এই লেখার মাধ্যমে আপনারা কিছুটা হলেও উপকৃত হতে পারবেন।

শিক্ষার্থী (সেশন: ২০২০২১)

ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ

প্রসঙ্গ ছাত্রসংসদ নির্বাচনঃ রাজনৈতিক দলের সদিচ্ছা নাকি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সক্রিয়তা

মিরর ডেস্ক।
গত জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতায় দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দাবি নতুন করে জোরদার হয়েছে। বিভিন্ন ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীরা এই দাবিতে সভা-সমাবেশ ও বিক্ষোভ করেছে, যা সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে উঠে এসেছে। এ বিষয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

শিক্ষার্থীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ডাকসু (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ) নির্বাচনের জন্য একটি কমিটি গঠন করেছে। এই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর আগে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ উপাচার্যকে স্মারকলিপি দিয়ে ডাকসু নির্বাচনের রোডম্যাপ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিল।

পাকিস্তান আমল থেকেই দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোতে নিয়মিত ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে আসছিল। কিন্তু স্বাধীনতার পর এই ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়ে। নব্বইয়ের দশকে স্বৈরাচারী শাসনের পতনের পর গণতান্ত্রিক সরকারগুলোও এই নির্বাচনী প্রক্রিয়া পুনঃস্থাপন করেনি। ফলে, ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনগুলো বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোতে নিজেদের প্রভাব ধরে রাখার জন্য দখলবাজি চালিয়ে গেছে।

আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে বিরোধী ছাত্রসংগঠনগুলো প্রায় পুরোপুরি ক্যাম্পাস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সাম্প্রতিক গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ছাত্রলীগ শুধু ক্যাম্পাস থেকে নয়, আইনি দৃষ্টিতেও নিষিদ্ধ হয়ে গেছে।গত ৩৪ বছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডাকসু নির্বাচন মাত্র একবার, ২০১৯ সালে অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে সেই নির্বাচনও সরকার-সমর্থিত ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের একগুঁয়েমি ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নির্লজ্জ পক্ষপাতদুষ্ট ভূমিকার কারণে কার্যকর হতে ব্যর্থ হয়।

বর্তমান পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ডাকসু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের মধ্যে তীব্র বিরোধ দেখা যাচ্ছে। একে অপরের বিরুদ্ধে নির্বাচনপ্রক্রিয়া ব্যাহত করার অভিযোগ তুলছে সংগঠনগুলো। বিশেষ করে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মধ্যে এখন স্পষ্টভাবে বিরোধ লক্ষ করা যাচ্ছে। এ ধরনের বিরোধ আরও কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখা দিয়েছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

এখানে একটি স্বাভাবিক প্রশ্ন উঠে আসে—যে সাধারণ শিক্ষার্থী এবং ছাত্রসংগঠনগুলো ঐক্যবদ্ধভাবে স্বৈরাচারী সরকারের পতন ঘটাতে ভূমিকা রেখেছে, তারা কেন ডাকসু এবং অন্যান্য ছাত্র সংসদ নির্বাচনের বিষয়ে একমত হতে পারছে না? এই বিভেদ ছাত্ররাজনীতির ভবিষ্যতের জন্য অশনিসংকেত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উচিত যত দ্রুত সম্ভব ডাকসু নির্বাচনের ব্যবস্থা করা। নীতিমালা প্রণয়নের নামে অযথা সময়ক্ষেপণ শিক্ষার্থীরা মেনে নেবে না।

ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দাবি শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সীমাবদ্ধ নেই। দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় ও পাবলিক কলেজগুলোতেও এই দাবির প্রতি সমর্থন বাড়ছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে গত সোমবার আয়োজিত এক সেমিনারে নতুন প্রজন্মের এক রাজনীতিক সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, জাতীয় নির্বাচনের আগেই ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে হবে।

এই বাস্তবতায়, প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত শিক্ষার্থীদের দাবি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা এবং সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে পুনরুজ্জীবিত করা।শুধু ডাকসু নয়, সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি। সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উচিত সক্রিয় ছাত্রসংগঠনগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুততম সময়ে এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া। একই সঙ্গে কলেজগুলোর ছাত্র সংসদ নির্বাচনের বিষয়েও যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। যদি আমরা সত্যিই যোগ্য ও দক্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্ব গড়ে তুলতে চাই, তবে বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ পর্যায়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন আয়োজনের কোনো বিকল্প নেই।

যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বায়ত্তশাসনের বিধান রয়েছে, সেখানে নির্বাচনের সিদ্ধান্ত বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষই নিতে পারে। তবে কলেজগুলোর ক্ষেত্রে এটি নির্ভর করবে সরাসরি সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর।

দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় রাজনীতিতে নতুন নেতৃত্বের অভাব যে প্রকট হয়ে উঠেছে, তার প্রধান কারণ হলো ছাত্র সংসদ নির্বাচন বন্ধ থাকা। শুধু জাতীয় নেতৃত্ব তৈরিই নয়, শিক্ষার্থীদের ন্যায্য অধিকার আদায় এবং শিক্ষাঙ্গনে একটি সুস্থ ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করতেও ছাত্র সংসদ নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সাধারণ শিক্ষার্থী ও ছাত্রসংগঠনগুলোর প্রতি আহ্বান থাকবে, তারা যেন এমন কোনো পদক্ষেপ না নেয় যা ছাত্র সংসদ নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করে। এই নির্বাচনের মাধ্যমেই একটি সমৃদ্ধ, গণতান্ত্রিক ও সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব।ছাত্র সংসদ নির্বাচন কেবল শিক্ষার্থীদের অধিকার নয়, এটি একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অন্যতম স্তম্ভ। দীর্ঘদিন ধরে এই নির্বাচন বন্ধ থাকায় শিক্ষাঙ্গনে সুস্থ রাজনৈতিক চর্চার অভাব স্পষ্ট হয়েছে, যা জাতীয় রাজনীতিতে যোগ্য নেতৃত্বের সংকট তৈরি করেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দাবি নতুনভাবে আলোচনায় এসেছে। শিক্ষার্থীরা সভা-সমাবেশ এবং বিক্ষোভের মাধ্যমে তাদের দাবির প্রতি সমর্থন জানাচ্ছেন। এই অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উচিত দেরি না করে যথাসম্ভব দ্রুত নির্বাচনের ব্যবস্থা করা।

বিশেষ করে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডাকসু নির্বাচন ঘিরে যে আলোচনা চলছে, তা শুধু এই প্রতিষ্ঠানের নয়, গোটা দেশের ছাত্র রাজনীতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ। প্রশাসনের গঠিত কমিটির সুপারিশ দ্রুত বাস্তবায়ন এবং সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।

এমনকি অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েও ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দাবির জোরালো প্রতিধ্বনি শোনা যাচ্ছে। যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বায়ত্তশাসন রয়েছে, সেসব প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষের উচিত নিজস্ব ক্ষমতার মধ্যেই নির্বাচন আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া। অন্যদিকে, কলেজগুলোতে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের জন্য সরকারের সরাসরি সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।

ছাত্র সংসদ নির্বাচন কেবল জাতীয় নেতৃত্ব তৈরির জন্য নয়, শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবি-দাওয়া পূরণ এবং শিক্ষাঙ্গনে একটি গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য অপরিহার্য।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে মনে রাখতে হবে, নির্বাচনের নীতিমালা প্রণয়ন বা প্রস্তুতির নামে সময়ক্ষেপণ শিক্ষার্থীরা মেনে নেবে না। সাধারণ শিক্ষার্থী ও ছাত্রসংগঠনগুলোর প্রতিও আহ্বান থাকবে, তারা যেন নির্বাচন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়—এমন কোনো পদক্ষেপ না নেয়।

ছাত্র সংসদ নির্বাচন শিক্ষার্থীদের জন্য গণতন্ত্রচর্চার সুযোগ এবং দক্ষ নেতৃত্ব গড়ে তোলার পথ। সময় এসেছে এই দাবিকে বাস্তবায়নের মাধ্যমে শিক্ষাঙ্গনে একটি সুষ্ঠু ও সমৃদ্ধ পরিবেশ ফিরিয়ে আনার।

সংবিধান সংস্কার: কিছু উপেক্ষিত জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়

0

খন্দকার তাসনীম।

জুলাই বিপ্লবের পর, দেশের সর্বস্তরের জনগণের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় ছিল ‘সংবিধান সংস্কার’। বিশেষ করে, ১৪২ ও ৭০ অনুচ্ছেদসহ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের দাবি ওঠে। তবে, সংবিধানের কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যেমন ২৮(২) ও ৩৩(৪) অনুচ্ছেদ প্রায়ই আলোচনার বাইরে থেকে যায়, যদিও এগুলো জনগণের মৌলিক অধিকার এবং বৈষম্য সম্পর্কিত।

৩৩(৪) অনুচ্ছেদ: নিবর্তনমূলক আটক এবং মানবাধিকার

সংবিধানের ৩৩(৪) অনুচ্ছেদ সরাসরি মানবাধিকার ও নাগরিকের মৌলিক অধিকারের সঙ্গে জড়িত। সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অনুচ্ছেদ সম্পূর্ণ অসাংবিধানিক ও অবৈধ। আইনের মূলনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো কিছু সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হলেই তা আইন হয়ে যায় না। উদাহরণস্বরূপ, সংসদ সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে যদি কোনো অনুচ্ছেদ অন্তর্ভুক্ত করে যে ‘বিকেল পাঁচটার সময় রাষ্ট্রের কোনো নাগরিক সুপেয় পানি পান করতে পারবে না’ তাহলেই তা আইন হয়ে যাবে না, কারণ, তা আইনের মূলনীতির (জুরিসপ্রুডেন্স) সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

নিবর্তনমূলক আটকের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের কোনো নাগরিককে বিচারের আওতায় না এনে যত দিন ইচ্ছা তত দিন পর্যন্ত, এমনকি সারা জীবন আটক রাখার ক্ষমতা রাষ্ট্রের রয়েছে। উক্ত অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘(৪) নিবর্তনমূলক আটকের বিধান–সংবলিত কোনো আইন কোনো ব্যক্তিকে ছয় মাসের অধিককাল আটক রাখিবার ক্ষমতা প্রদান করিবে না যদি………উপদেষ্টা-পর্ষদ উক্ত ছয় মাস অতিবাহিত হইবার পূর্বে তাঁহাকে উপস্থিত হইয়া বক্তব্য পেশ করিবার সুযোগদানের পর রিপোর্ট প্রদান না করিয়া থাকেন যে, পর্ষদের মতে উক্ত ব্যক্তিকে তদতিরিক্ত কাল আটক রাখিবার পর্যাপ্ত কারণ রহিয়াছে।’ অর্থাৎ উপদেষ্টা পর্ষদের কাছে যদি মনে হয় উক্ত ব্যক্তিকে তদতিরিক্ত কাল আটক রাখার পর্যাপ্ত কারণ রয়েছে, তাহলে ছয় মাসের অধিক আটক রাখা যাবে।

৩৩(৫) অনুচ্ছেদ: তথ্য প্রকাশের উপর বিধিনিষেধ

অনুচ্ছেদ ৩৩(৫)–এর বিধান নাগরিকের মানবাধিকারের জন্য আরও ভয়ংকর। যেখানে উল্লেখ আছে ‘(৫) ……তবে শর্ত থাকে যে, আদেশদানকারী কর্তৃপক্ষের বিবেচনায় তথ্যাদি-প্রকাশ জনস্বার্থবিরোধী বলিয়া মনে হইলে অনুরূপ কর্তৃপক্ষ তাহা প্রকাশে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করিতে পারিবেন।’ অর্থাৎ একজন ব্যক্তিকে সারা জীবন বিনা বিচারে আটক রাখার পর রাষ্ট্রের কাছে যদি মনে হয় তাকে কেন আটক রাখা হয়েছে, তা প্রকাশ করবে না, তাহলে সেই ক্ষমতাও বর্তমান সংবিধান নিশ্চিত করে।

সংবিধানের উক্ত অনুচ্ছেদ সম্পূর্ণ অসাংবিধানিক ও মানবাধিকার হরণকারী বিধান, যা অবশ্যই সংশোধন করতে হবে। রাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে এ ধরনের বিধান রাখা প্রয়োজনীয় হলেও আটক রাখার মেয়াদ সর্বোচ্চ ১৫ কিংবা ২০ দিন করা যেতে পারে এবং উক্ত সময়ের পর অপরাধে জড়িত রয়েছে মর্মে বিশ্বাসযোগ্য কারণ থাকলে তাকে অবশ্যই আদালত কর্তৃক বিচারের আওতায় আনতে হবে। তবে বাংলাদেশের মতো পারস্পরিক রাজনৈতিক অশ্রদ্ধাপূর্ণ দেশে এ ধরনের বিধান না থাকাটাই উত্তম। কারণ, ১৯৭২ সালে সংবিধান প্রবর্তন হওয়ার পর থেকে যখন যে সরকার ক্ষমতায় এসেছে, সেই সরকার তাদের দলীয় স্বার্থে এই অনুচ্ছেদের অপব্যবহার করেছে।

নারীদের সমান অধিকারের নিশ্চয়তা: সংবিধানে প্রয়োজন সংশোধন
২০২২ সালের আদমশুমারি রিপোর্ট অনুযায়ী দেশের মোট জনসংখ্যার ৫০ দশমিক ৪৫ শতাংশ নারী, যাঁদের পরিমাণ প্রায় ৮ কোটি ৫৬ লাখ এবং পুরুষের তুলনায় অধিক। অথচ বাংলাদেশের এই সর্ববৃহৎ জনগোষ্ঠীকে সংবিধানে অধিকার দেওয়ার ক্ষেত্রে উল্লেখ করা হয়েছে ‘রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারী-পুরুষের সমান অধিকার লাভ করিবেন।’

বাংলা অংশটি পড়ার সময় ‘নারী-পুরুষের’ শব্দ দুটি একত্র লিখিত হওয়ায় কিছুটা অস্পষ্টতা তৈরি হলেও ইংরেজি অনুচ্ছেদটি পড়লে সহজেই সেই অস্পষ্টতা দূর হয়ে যাবে। নারীদের অধিকার দেওয়ার ক্ষেত্রে পুরুষের অধিকার মানদণ্ড হিসেবে গণ্য করা পুরুষতান্ত্রিক সমাজের প্রভাব, যেমনটি বাংলাদেশের অন্যান্য প্রচলিত আইনে সেই প্রভাবের প্রতিচ্ছবি দেখা যায়। আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশের নারীরা যেখানে নিজেদের সক্ষমতার জানান দিচ্ছে; লেখাপড়া, খেলাধুলা, গবেষণা, সংস্কৃতি—প্রতিটি ক্ষেত্রে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করছে, সেখানে নারী ও পুরুষের সমান অধিকার সরাসরি স্বীকৃতি না দিয়ে কেন পুরুষের অধিকার মানদণ্ড গণ্য করে নারীকে অধিকার দিতে হবে! অনেক ক্ষেত্রে যুক্তি প্রদান করা হয় যে ‘যেভাবেই লেখা হোক অধিকার তো সমান পাচ্ছে’।

অধিকার সমান পেলেও উক্ত অনুচ্ছেদের মাধ্যমে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের শ্রেষ্ঠত্ব ফুটে ওঠে, পুরুষতান্ত্রিক সমাজের এই প্রভাব কতটা বৈষম্য সৃষ্টি করে, তা ‘দি মুসলিম ম্যারেজ এবং ডিভোর্সেস (রেজিস্ট্রেশন) অ্যাক্ট, ১৯৭৪’সহ বাংলাদেশের বিদ্যমান বিভিন্ন আইনে দেখা যায়। সংবিধান সংস্কার কমিশনকে এই অনুচ্ছেদ সংশোধনের মাধ্যমে নারীদের স্বাধীন অধিকার নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তাদের অধিকার সংকীর্ণ হয়ে যাবে না।

সংসদ সদস্যদের দক্ষতা ও যোগ্যতা: পেশাগোষ্ঠীর আধিপত্য রোধের প্রয়োজন
বাংলাদেশের সংবিধান অনুসারে সংসদ সদস্যদের মূল দায়িত্ব আইন প্রণয়ন করা। তবে, বিগত ১৫ বছরে সংসদ সদস্যদের মধ্যে আইন বিষয়ে মৌলিক ধারণা ছিল খুবই কম। বিশেষ করে ব্যবসায়ীদের উপস্থিতি সংসদে অত্যাধিক ছিল, যা আইন প্রণয়নের পেশাগত ভারসাম্যহীনতা তৈরি করেছে। সংবিধান সংস্কারের মাধ্যমে সংসদ সদস্য হওয়ার জন্য আইন-সংক্রান্ত ন্যূনতম যোগ্যতা নির্ধারণ করা প্রয়োজন, এবং সংসদ সদস্যদের আর্থিক ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা থেকে বিরত রাখার জন্য সংশোধন করা উচিত। এটি সংসদে দক্ষ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় সমন্বয় সাধন করবে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় সংস্কার ও জনকল্যাণ নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে।বাংলাদেশে ২০২৩ সালের আদমশুমারি রিপোর্ট অনুযায়ী, মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ শিশু (০-১৪ বছর বয়সী), কিন্তু এই বিশাল জনগোষ্ঠীর অধিকার এবং সুরক্ষা সংক্রান্ত কোনো স্পষ্ট বিধান সংবিধানে নেই। “আজকের শিশু, আগামী দিনের ভবিষ্যৎ” স্লোগান বাস্তবায়িত করতে হলে, শিশুদের সুরক্ষা এবং তাদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার জন্য সংবিধানে যথাযথ পরিবর্তন আনতে হবে। শিশু শ্রম নিরোধ এবং প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি, যাতে এই অধিকারগুলোর বাস্তবায়ন কার্যকর হতে পারে।

সুপ্রিম কোর্ট ও সংবিধানের অভিভাবকত্ব: বিচার বিভাগের স্বাধীনতা
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট সংবিধানের অভিভাবক হিসেবে কাজ করার কথা হলেও, বিভিন্ন সময়ে সরকার সুপ্রিম কোর্টের সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেছে, যার একটি উদাহরণ হল তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সম্পর্কে ৪ বনাম ৩ বিচারপতির রায়, যেখানে সুপ্রিম কোর্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অসাংবিধানিক বলে ঘোষণা করেছিল। এই রায়টির বিরুদ্ধে বা এর সমালোচনা করা এক প্রকার আদালত অবমাননা হিসেবে গণ্য হয়। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নিয়োগ নির্বাহী বিভাগের প্রভাব মুক্ত হতে হবে, যাতে বিচার বিভাগ সঠিকভাবে সংবিধানের অভিভাবক হিসেবে কাজ করতে পারে।

বাংলাদেশে বিচারপতি নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব থাকলে সুপ্রিম কোর্ট কখনোই সত্যিকার অর্থে সংবিধানের অভিভাবক হয়ে উঠতে পারবে না। উদাহরণস্বরূপ, গণতান্ত্রিক দেশের প্রধান বিচারপতি ‘গণভোট’কে অসাংবিধানিক বলে ঘোষণা করেছিলেন। নতুন বাংলাদেশের সংবিধানে আদালতের সমালোচনার অধিকার, ‘ফেয়ার ক্রিটিসিজম’ নিশ্চিত করা উচিত এবং আইন বিভাগের স্বাধীনতা সুরক্ষিত করতে হবে।

ক্ষমতার ভারসাম্য: বিচার বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ ও রাষ্ট্রপতির ভূমিকা
ক্ষমতার ভারসাম্য সাধারণত রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রী’র মধ্যে আলোচনা হয়ে থাকে, তবে সঠিক রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য আইন বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ, বিচার বিভাগ এবং প্রতিটি বিভাগের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নিয়োগে নির্বাহী বিভাগের প্রভাব মুক্ত করার জন্য সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের পরামর্শে রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে বিচারপতি নিয়োগ দেওয়া উচিত। সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল প্রধান বিচারপতি এবং আপিল বিভাগের দুইজন বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত হতে পারে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার হলে, প্রধান উপদেষ্টা এবং অন্যান্য উপদেষ্টা নিয়োগে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের কোনোভাবে সম্পৃক্ত করা উচিত নয়।সর্বোপরি রাষ্ট্র সঠিকভাবে পরিচালনা করার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সমঝোতা ও শ্রদ্ধাবোধ, যেখানে দেশপ্রেম হওয়া উচিত প্রধান চেতনা।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫৩ বছরের প্রায় ২৩ বছর (এরশাদ-৮ বছর, হাসিনা-১৫ বছর) স্বৈরাচারের শাসনের অধীন ছিল। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার ছিল ‘গণতন্ত্র’ এবং স্বাধীনতার পর থেকে যে রাজনৈতিক দল সবচেয়ে বেশি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সবক দিয়েছে, তারাই এ দেশে দীর্ঘতম সময় স্বৈরাচারী শাসন কায়েম করেছে।

রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ তৈরি না হলে সংবিধানের টেকসই উন্নয়ন কখনোই সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে উন্নত দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে আমরা শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি। যুক্তরাজ্যের অলিখিত সংবিধান থাকা সত্ত্বেও সেখানে স্বৈরাচার তৈরি হয় না। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান পৃথিবীর অন্যতম ছোট সংবিধান, যেখানে বাংলাদেশের মতো এত বেশি অধিকারের কথা উল্লেখ করতে হয় না। অথচ সবকিছু স্বাভাবিক নিয়মে চলছে শতাব্দী ধরে।

শিক্ষার্থী, আইন অনুষদ।

সম্পাদকীয়ঃ জানুয়ারী ২০২৫

প্রিয় পাঠকবৃন্দ, নতুন বছরের প্রথম প্রহরে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি সংখ্যাটি আমাদের সামনে নিয়ে এসেছে একটি অসামান্য সুযোগ—বিশ্বের পরিবর্তনশীল প্রেক্ষাপট এবং আমাদের নিজস্ব ঐতিহাসিক অর্জনকে পুনর্বিবেচনা করার। বিগত বছরটি যেমন চ্যালেঞ্জে পূর্ণ ছিল, তেমনি ছিল আশা ও পুনর্গঠনের জন্য অনুপ্রেরণামূলক। এই সংখ্যায় আমরা আলোকপাত করেছি এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমাদের জন্য বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।

‘জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র’ আমাদের জাতীয় জীবনের জন্য একটি আলোড়ন জন্ম দিয়েছে। জুলাই বিপ্লব শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়, এটি ছিল জনগণের চেতনার পুনর্জাগরণ এবং আত্মনির্ভরশীলতার একটি নতুন অধ্যায়। ঘোষণাপত্রটি জানুয়ারীর ১৫ তারিখ প্রকাশ হবে বলে আমরা আশা করি। এই সংখ্যায় যেসব লেখা প্রকাশিত হয়েছে, তা আমাদের সবার জন্য অনুপ্রেরণার উৎস।

আমাদের সংবিধান সংস্কারের প্রসঙ্গেও আমরা বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছি। প্রতিটি জাতির অগ্রগতির মূলে থাকে একটি শক্তিশালী ও যুগোপযোগী সংবিধান। বর্তমান পরিবর্তনগুলি কীভাবে আমাদের জাতীয় কাঠামোকে নতুন শক্তি ও স্থায়িত্ব প্রদান করবে, তা বিশ্লেষণ করা হয়েছে এই সংখ্যায়।

বিশ্বের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য দেশের সংবাদও আমরা অন্তর্ভুক্ত করেছি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চলমান উত্তেজনা এবং পরিবর্তনশীল গতি আমাদের ভবিষ্যতের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। আন্তর্জাতিক ডামাডোলের আলোচনায় উঠে এসেছে বৈশ্বিক কূটনীতির নতুন ধারাসমূহ এবং আমাদের করণীয় সম্পর্কে দিকনির্দেশনা।

ক্যাম্পাস নিউজ এই সংখ্যায় একটি বিশেষ স্থান পেয়েছে। আমাদের তরুণ প্রজন্মই ভবিষ্যতের পথপ্রদর্শক, এবং তাদের সৃষ্টিশীলতা, সংগ্রাম ও সাফল্যের কাহিনিগুলি আমাদের সবাইকে উজ্জীবিত করে। ছাত্রসংসদ নির্বাচনের দাবী সহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক ঘটনাগুলিকে আমরা তুলে ধরেছি, যা আমাদের শিক্ষাঙ্গনের চিত্র ফুটিয়ে তোলে।

আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি হলো—অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের পথে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে চলা। এই লক্ষ্যেই আমরা ২০২৫ সালকে আরও সমৃদ্ধ ও সম্ভাবনাময় করতে চাই। আসুন, ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার মাধ্যমে নতুন দিনের সূচনা করি। স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ হিসেবে যেন বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে, সেই শুভকামনা রইলো।

‘জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র’ অরাজকতা নাকি সম্ভাবনা?

বাংলাদেশের সমাজ-রাজনীতিতে জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসা অচলায়তন ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ভেঙে গেছে। এ অভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো গণতান্ত্রিক, মানবিক, ও বহুত্ববাদী একটি রাষ্ট্র গড়ার সম্ভাবনার পথ উন্মুক্ত হয়েছে। হাজারো প্রাণের আত্মত্যাগে অর্জিত এই ঐক্যের নেতৃত্ব দিয়েছে ছাত্রসমাজ; সর্বস্তরের মানুষ ও রাজনৈতিক দল এতে একত্রিত হয়ে অভ্যুত্থানকে সফল করে তুলেছে।

অভ্যুত্থানের প্রায় পাঁচ মাস পর, গত ৩১ ডিসেম্বর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে ‘জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র’ প্রকাশের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। এ কর্মসূচি জনসাধারণের মধ্যে কৌতূহল ও উদ্দীপনার জন্ম দিয়েছে। তবে, রাজনৈতিক মহলে বিশেষ করে বিএন[ইর পক্ষ থেকে এর প্রভাব নিয়ে কিছু প্রশ্নও উঠেছে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রথমে জানায়, এ কর্মসূচি একটি বেসরকারি উদ্যোগ এবং এর সঙ্গে সরকারের কোনো সরাসরি সম্পৃক্ততা নেই। তবে সরকারে থাকা ছাত্র নেতৃত্বের একটি অংশ এ কর্মসূচির প্রতি তাঁদের সমর্থন প্রকাশ করেছে। পরে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় অনুষ্ঠিত এক জরুরি প্রেস ব্রিফিংয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা ও জনগণের ঐক্য সংরক্ষণে একটি জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে ঘোষণাপত্র তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ঘোষণাপত্রে গণ-অভ্যুত্থানের অর্জন, ফ্যাসিবাদবিরোধী চেতনা এবং রাষ্ট্র সংস্কারের আকাঙ্ক্ষাকে সুসংহত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হবে।

৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের পর ৮ আগস্ট অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার শপথ নিয়ে যাত্রা শুরু করে। বিগত সরকারের অধীনে ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনীতি ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের চ্যালেঞ্জ সামনে রেখে, সরকার ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ খাতে সংস্কার কমিশন গঠন করে। এগুলো হলো নির্বাচনব্যবস্থা, পুলিশ, বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসন, সংবিধান, এবং দুর্নীতি দমন। পরবর্তীতে আরও কয়েকটি কমিশন গঠন করা হয়।

প্রথম ছয় কমিশন ইতোমধ্যে তাদের প্রস্তাব প্রায় চূড়ান্ত করেছে এবং অংশীজনদের মতামত গ্রহণ করেছে। এসব প্রস্তাবের ভিত্তিতে সরকারপ্রধান একটি “ঐকমত্য কমিশন” গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন, যার লক্ষ্য রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করা।

গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জনগণের মধ্যে যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা জন্ম নিয়েছে, তা পুরোনো ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থার স্পষ্ট প্রতিফলন। এই আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবে রূপ দিতে সংস্কার ও নির্বাচনের প্রশ্নে ঐক্যের প্রয়োজন। বিজয় দিবসের ভাষণ এবং ফোরাম ফর বাংলাদেশ স্টাডিজের উদ্বোধনীতে অধ্যাপক ইউনূস নির্বাচন নিয়ে প্রাথমিক ধারণা দিয়েছেন। তবে অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া পক্ষগুলোর ঐক্য ও সংহতি বজায় রাখাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরাচার শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের সমাজ-রাজনীতিতে গণতন্ত্র ও মানবিকতার একটি নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। এই অভ্যুত্থানের অন্যতম বড় অর্জন হলো একটি গণতান্ত্রিক, মানবিক, ও বহুত্ববাদী রাষ্ট্র গড়ার সামষ্টিক আকাঙ্ক্ষা, যা হাজারো প্রাণের আত্মত্যাগে সম্ভব হয়েছে।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটির নেতারা এ উদ্যোগকে স্বাগত জানান এবং ‘মার্চ ফর ইউনিটি’ কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এই কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে পালিত হওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের ধারাকে অব্যাহত রাখতে এবং মানবিক ও বহুত্ববাদী রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে আলাপ-আলোচনা ও সংলাপের মাধ্যমে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সামষ্টিক ঐক্য বজায় রেখে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার এ উদ্যোগই সবার প্রত্যাশিত।

জুলাই অভ্যুত্থানের পর সৃষ্ট গণতান্ত্রিক পরিবেশে জনগণ পরিবর্তনের প্রত্যাশা করছে। বিজয় দিবসের ভাষণে অধ্যাপক ইউনূস নির্বাচন আয়োজনের সম্ভাব্য সময় নিয়ে ইঙ্গিত দিয়েছেন। একইসঙ্গে, অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে ঐক্য বজায় রেখে সংস্কার ও নির্বাচনে অগ্রসর হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

এদিকে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ‘জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র’ প্রকাশের মাধ্যমে তাদের রাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করতে চায় বলে সন্দেহ করছে বিএনপি। তাদের মতে, এই আন্দোলন রাজনৈতিক দলগুলোকে বাদ দিয়ে একটি অরাজক পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করছে। তবে আন্দোলনকারীদের দাবির পেছনে কারা রয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। ‘মার্চ ফর ইউনিটি’ কর্মসূচি জনগণের মধ্যে কৌতূহল সৃষ্টি করলেও, শান্তিপূর্ণ ও সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গঠনে ঐক্য বজায় রাখা সবচেয়ে জরুরি।

৩০ ডিসেম্বর সোমবার রাতে গুলশানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ‘জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র’ প্রকাশের উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা হয়। এর ঘণ্টা দুই পর ছাত্ররা ঘোষণাপত্র প্রকাশ থেকে সরে আসার কথা জানায়। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার পক্ষ থেকে ঘোষণা দেওয়া হয় যে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে সরকারের তরফেই ঘোষণাপত্র প্রস্তুত করা হবে। বিএনপির মতে, এই পদক্ষেপের ফলে দেশ সম্ভাব্য নৈরাজ্য থেকে রক্ষা পেয়েছে।

বৈঠকে বিএনপি নেতারা ছাত্রদের ঘোষণাপত্র নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাদের মতে, ছাত্র আন্দোলনের পূর্ববর্তী দাবিগুলো—যেমন রাষ্ট্রপতিকে অপসারণের দাবি—দেশে সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক সংকট তৈরি করতে পারত। একইভাবে বাহাত্তরের সংবিধান বাতিলের দাবিও একটি নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা নস্যাৎ হতে পারে।

স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানান, তিনি প্রধান উপদেষ্টা এবং ছাত্র নেতাদের সঙ্গে আলাদা বৈঠক করেছেন। ছাত্রদের ঘোষণাপত্র প্রকাশের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোকে উপেক্ষা করার যে ঝুঁকি তৈরি হচ্ছিল, তা নিয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। বৈঠকে বিএনপি নেতারা মনে করেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের উদ্যোগ দেশের গণমানুষ ও রাজনৈতিক দলগুলোর স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এর পেছনে দৃশ্যমান কোনো পৃষ্ঠপোষকতা না থাকলেও, এটি বিএনপিকে রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্রের অংশ হতে পারে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মসূচি, তাদের অর্থায়ন এবং উদ্দেশ্য নিয়ে আলোচনা হয়। এক নেতা প্রশ্ন তোলেন, ছাত্রদের কর্মসূচি ঘিরে সারা দেশ থেকে ঢাকায় লোক আনতে যে অর্থ ব্যয় হচ্ছে, তার উৎস কী, কারণ ছাত্রদের নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিরা আর্থিকভাবে স্বচ্ছল নন।

আরেক নেতা বলেন, ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের অতীত পরিচয় নিয়ে সংশয় রয়েছে। কেউ ছাত্রলীগ বা ছাত্রশিবিরের সাথে জড়িত ছিলেন, যা তাদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে স্পষ্টতা আনে না। বিপ্লবের ঘোষণাপত্রও সময়ের দিক থেকে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে সমালোচনা হয়। এটি গণঅভ্যুত্থানের আগে প্রকাশ করলে জনগণ বিষয়টি নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারত। কিন্তু এখন এটি সংকট বাড়ানোর ঝুঁকি তৈরি করছে।

বৈঠকে ছাত্রদের রাজনৈতিক দল গঠনের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়। বিএনপি মনে করে, দল গঠন এবং নির্বাচনে অংশ নেওয়া গণতান্ত্রিক অধিকার। তবে যদি এটি ষড়যন্ত্রমূলক বা কর্তৃত্ববাদ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হয়, জনগণ এবং গণতান্ত্রিক দলগুলো তা মেনে নেবে না। ছাত্রদের উদ্যোগ রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় চালিত হলে বিএনপির আপত্তি থাকবে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’ আপাতত স্থগিত থাকলেও, এর পেছনে কারা আছে তা নিয়ে বিএনপির মধ্যে সন্দেহ এবং আলোচনা চলছে।

শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পাঁচ মাস পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঘোষণাপত্র প্রকাশের উদ্যোগ বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ ও সন্দেহ সৃষ্টি করেছে। অনেকেই মনে করেন, এই উদ্যোগের লক্ষ্য হতে পারে নির্বাচন বিলম্বিত করা। বৈষম্যবিরোধীরা শহীদ মিনারে ঘোষণাপত্রে ১৯৭২ সালের সংবিধান বাতিল এবং আওয়ামীলীগকে অপ্রাসঙ্গিক ঘোষণা করার কথা বললেও, শেষ মুহূর্তে তা স্থগিত করে। বিএনপির নেতারা এই উদ্যোগের পেছনে “বিশেষ রাজনৈতিক দল” বা অভ্যন্তরীণ স্বার্থ সংশ্লিষ্টতার সম্ভাবনা দেখলেও, কোনো বিদেশি শক্তির ইন্ধন খুঁজে পাননি।

বিএনপির নেতারা ১৯৭২ সালের সংবিধানকে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত শাসনতন্ত্র হিসেবে উল্লেখ করে, সেটি বাতিলের যে কোনো প্রচেষ্টার বিরোধিতা করেছেন। তারা মনে করেন, প্রয়োজনে সংবিধান যুগোপযোগী করে সংশোধন করা যেতে পারে, তবে এটি বাতিল করা অযৌক্তিক।

অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্বে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ছয়টি সংস্কার কমিশন গঠন করেছেন। বিএনপি সরকারকে সমর্থন জানালেও, তারা দ্রুত নির্বাচনের রোডম্যাপ প্রকাশের দাবি করে আসছে। প্রধান উপদেষ্টা ২০২৫ সালের শেষ বা ২০২৬ সালের শুরুর দিকে নির্বাচনের সম্ভাবনার কথা জানালেও, বিএনপি সুনির্দিষ্ট সময়সূচি চায়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিএনপি এই ঘোষণাপত্র উদ্যোগকে নির্বাচন বিলম্বিত করার কৌশল হিসেবে দেখছে। সংবিধান বাতিল বা পরিবর্তনের বিষয়ে তারা বরাবরই সতর্ক এবং সমালোচনামুখর।

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন আকস্মিকভাবে ‘জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র’ প্রকাশের ঘোষণা দিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোড়ন সৃষ্টি করে। শনিবার সামাজিক মাধ্যমে এই ঘোষণা আসার পর রবিবার সংবাদ সম্মেলনে হাসনাত আব্দুল্লাহ জানান, ঘোষণাপত্রে ১৯৭২ সালের সংবিধানকে “কবর দেওয়া” হবে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে এ উদ্যোগকে “ব্যক্তিগত উদ্যোগ” বলে উল্লেখ করা হয়।

বিএনপি তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। সোমবার রাতের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সভাপতিত্বে এই ইস্যু নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রধান উপদেষ্টার সাথে সাক্ষাৎ করে বিএনপির অবস্থান তুলে ধরেন। পরে সরকারের পক্ষ থেকে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে ঘোষণাপত্র তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়।

বৈষম্যবিরোধীরা দীর্ঘ আলোচনার পর ঘোষণাপত্র প্রকাশ স্থগিত করলেও শহীদ মিনারে সমাবেশ আয়োজন অব্যাহত রাখে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে ছাত্রদের এই উদ্যোগের পেছনে কারা উস্কানি দিচ্ছে এবং এর মাধ্যমে বর্তমান সরকারের ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার প্রচেষ্টা হচ্ছে কিনা, তা নিয়ে আলোচনা হয়। নেতারা মনে করেন, ঘোষণাপত্রের উদ্যোগ নির্বাচনের দাবিকে গুরুত্বহীন করার চেষ্টা হতে পারে।

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের আকস্মিক ‘জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র’ প্রকাশের ঘোষণা নিয়ে বিএনপির মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। দলটির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে নেতারা এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য ও অর্থের উৎস নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। অনেকেই মনে করেন, এটি নির্বাচনের সময় বিলম্বিত করার একটি প্রচেষ্টা এবং ক্ষমতায় থাকার সময় পেয়ে একটি নতুন রাজনৈতিক দল গোছানোর কৌশল হতে পারে।

বিএনপির নেতারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে বৈষম্যবিরোধীরা তাদের সমাবেশে বিএনপিসহ সব পক্ষকে উপস্থিত রেখে নিজেদের ‘কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা’ করতে চাইতে পারে। যদিও এ উদ্যোগে বিদেশি কোনো শক্তির সংশ্লিষ্টতা নেই বলে তারা মনে করেন, তবে দুটি দেশের জড়িত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। বৈঠকে অনেক নেতা মনে করেন, বৈষম্যবিরোধীরা ক্ষমতায় আসার লক্ষ্যে কাজ করছে এবং বর্তমান সরকারের সমর্থনে একটি নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলতে চাইছে। বিএনপি দ্রুততম সময়ে নির্বাচন দাবি করে আসলেও বৈষম্যবিরোধীরা এদিকে আগ্রহী নয় বলে মনে করছেন তারা।

সম্পাদক, দ্যা ক্যাম্পাস মিরর।

গুমের সাথে জড়িত আরও ২৪ কর্মকর্তার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা

0

ডেস্ক রিপোর্ট

গুমের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে ২৪ জন সরকারি কর্মকর্তার পাসপোর্ট স্থগিত করে তাদের দেশের বাইরে যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের দেওয়া চিঠির ভিত্তিতে এ নির্দেশনা কার্যকর করা হয়েছে।

বুধবার (১৮ ডিসেম্বর) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মো. কামরুজ্জামানের স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে এ আদেশ প্রদান করা হয়। আদেশে ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এবং পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) অতিরিক্ত আইজিপিকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, “গুম সংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারির অনুরোধ অনুযায়ী, দ্বিতীয় পর্যায়ে আরও ২৪ সরকারি কর্মকর্তার গুম সংক্রান্ত ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। তদন্তের প্রয়োজনে এই ব্যক্তিরা যাতে দেশ ত্যাগ করতে না পারেন, সে জন্য তাদের পাসপোর্ট স্থগিত করা হয়েছে এবং দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”

এর আগে, ১৫ ডিসেম্বর গুমের অভিযোগে আরও ২০ কর্মকর্তার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল।