এনটিআরসির ৬ষ্ঠ গণবিজ্ঞপ্তি: শিক্ষক নিয়োগে গতি এলেও শূন্যপদ অর্ধেকেরও বেশি

সাদী মোহাম্মদ সাদ
ক্যাম্পাস মিরর

দেশের বেসরকারি স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক সংকট দীর্ঘদিনের সমস্যা। অবশেষে ৬ষ্ঠ গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এনটিআরসিএ ৪১ হাজার ৬২৭ জনকে নিয়োগের সুপারিশ করেছে। তবে মোট শূন্যপদ ছিল এক লাখেরও বেশি। ফলে নিয়োগ-সুপারিশের পরও ৫৮ হাজারের বেশি পদ ফাঁকা রয়ে যাচ্ছে।

এই চিত্র শিক্ষাখাতের দীর্ঘদিনের আরেকটি সংকটকে সামনে আনে, পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় মানসম্মত শিক্ষা কার্যক্রম টেকসই হচ্ছে না।

গত ১৬ জুন এনটিআরসিএ প্রকাশ করে ৬ষ্ঠ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি। প্রায় এক লাখ আট শতাধিক শূন্যপদের বিপরীতে আবেদন আহ্বান করা হয়। নির্ধারিত সময়ে অনলাইনে আবেদন জমা পড়ে ৫৭ হাজার ৮৪০টি। পরে প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও মাউশি থেকে প্রেরিত আবেদন যাচাই-বাছাই শেষে ৭৮০টি শূন্যপদ বাতিল করা হয়। অবশিষ্ট ১ লাখ ৪২টি পদের বিপরীতে স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত হন ৪১ হাজার ৬২৭ জন।

কিন্তু এত বিপুলসংখ্যক শূন্যপদের বিপরীতে আবেদনকারীই ছিল তুলনামূলক কম। নারী প্রার্থীর সংখ্যা ২৪ হাজারের কিছু বেশি, আর পুরুষ আবেদনকারী প্রায় ৩৪ হাজার। অনেকেই নিজেদের নিবন্ধন সনদ বহির্ভূত বিষয়ে আবেদন করায় ১২৫ জন বাদ পড়েছেন। শিক্ষাবিদদের মতে, শুধু নিয়োগ-সুপারিশ দিয়ে শিক্ষার সংকট মিটবে না। শহরের বাইরে অনেক স্কুলে বিজ্ঞান, গণিত কিংবা ইংরেজির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে শিক্ষক নেই। ফলে শিক্ষার্থীরা নিয়মিত ক্লাস পাচ্ছে না, বরং পরীক্ষার সময় কোচিং বা প্রাইভেট টিউশনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সাবেক শিক্ষা বিশেষজ্ঞ বলেন, “যে সংখ্যক পদ ফাঁকা থেকে যাচ্ছে, তা আসলে শিক্ষাব্যবস্থার জন্য বড় হুমকি। শিক্ষকবিহীন প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার গুণগত মান কীভাবে রক্ষা করা যাবে?”

এনটিআরসিএর নিয়োগ সুপারিশে শিক্ষাখাতে এক ধরনের গতি এসেছে, এ কথা সংশ্লিষ্টরাও স্বীকার করেন। কিন্তু বাস্তবতায় সমস্যা থেকে যাচ্ছে বহাল তবিয়তেই। একদিকে নিবন্ধিত প্রার্থীর সংখ্যা শূন্যপদের তুলনায় কম, অন্যদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ভিত্তিক চাহিদা পূরণ হচ্ছে না। শিক্ষানীতির বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কেবল একটি গণবিজ্ঞপ্তি নয়, বরং ধারাবাহিক ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে। শূন্যপদ পূরণে নিয়মিত নিয়োগ, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং নতুন প্রজন্মকে শিক্ষকতায় উৎসাহিত করা এখন জরুরি

৪১ হাজার শিক্ষক নিয়োগ শিক্ষাখাতে স্বস্তির খবর বটে। তবে অর্ধেকেরও বেশি শূন্যপদ ফাঁকা থাকার বাস্তবতা উদ্বেগ বাড়ায়। শিক্ষার্থীরা কি প্রকৃত অর্থে মানসম্মত শিক্ষা পাচ্ছে? শিক্ষক-সংকটময় এ বাস্তবতায় শিক্ষা ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো কী পরিকল্পনা হাতে নেবে, এখন সেটিই মূল প্রশ্ন।

নর্দান ইউনিভার্সিটির ভিসি নিয়োগে গড়িমসি, নেপথ্যে ইউজিসি সদস্য

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নর্দান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের ভিসি নিয়োগ নিয়ে সময়ক্ষেপণ ও গড়িমসির অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর নেপথ্যে ইউজিসির বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সদস্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন রয়েছেন বলে অভিযোগ এনইউবি সংশ্লিষ্টদের।

সূত্র জানিয়েছে, নর্দান ইউনিভার্সিটিতে ভিসি নিয়োগের জন্য গত ১৫ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) এবং একই তারিখে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এরপর ২ ফেব্রুয়ারি প্রস্তাবিত ব্যক্তিদের তালিকা পাঠায় প্রতিষ্ঠানটি। এ প্রেক্ষিতে নর্দান ইউনিভার্সিটির চাহিদার আলোকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে ইউজিসির কাছে ‘ভাইস চ্যান্সেলর’ নিয়োগের বিষয়ে আইনগত দিক পর্যালোচনাপূর্বক মতামত/প্রতিবেদন’চেয়ে গত ১৪ জুলাই একটি চিঠি দেয়। কিন্তু ইউজিসি এখন পর্যন্ত শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে কোনো প্রতিবেদন না দিয়ে অতিউৎসাহী হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টির ‘প্রশাসক’নিয়োগে মতামত দিয়েছেন। যেটিকে ইউজিসির এখতেয়ার বহির্ভূত বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ইউজিসি লোগো

এদিকে ইউজিসির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, নর্দান ইউনিভার্সিটির বোর্ড অব ট্রাস্টিজ (বিওটি) নিয়ে মামলা চলমান থাকায় ভাইস চ্যান্সেলর নিয়োগের অগ্রগতি হচ্ছে না। তারা জানিয়েছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় প্রশাসক নিয়োগের বিষয় প্রাধান্য পেয়েছে।

তবে এনইউবি কর্তৃপক্ষ বলছে, অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন ভুয়া পক্ষকে ‘বিবাদমান পক্ষ’ বানাচ্ছেন। জেলা জজ চতুর্থ আদালত (মামলা নম্বর ১৭/২০২৫) অবৈধ ও প্রতারণামূলক নিবন্ধিত সাপ্লিমেন্টারি আইবিএটি এবং এনইউবি ট্রাস্টের সকল কাজে স্থগিতাদেশ দিয়েছে। তাদের অভিযোগ, সর্বশেষ চিঠি অনুযায়ী শিক্ষা মন্ত্রণালয় এনইউবিতে ভাইস চ্যান্সেলর নিয়োগের সুনির্দিষ্ট মতামত চেয়েছে। এরপর এই বিষয়ে মতামত ছাড়া অন্য কোনো বিষয়ে মতামত প্রদানে সংস্থাটির সুযোগ নেই। প্রচলিত আইন (বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন) অনুসারে, ভাইস চ্যান্সেলর প্যানেলভুক্ত শিক্ষকগণ ভাইস চ্যান্সেলর হওয়ার শর্ত পূরণ করেন কি না—তার বাইরে ইউজিসির মতামত প্রদান এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে না।

জানা গেছে, এ বিধিবহির্ভুতভাবে ইউজিসি অতি উৎসাহী হয়ে এনইউবিতে প্রশাসক হিসেবে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আব্দুল্লাহ আল ইউসুফের নাম প্রস্তাব করে। কিন্তু শিক্ষা উপদেষ্টা প্রস্তাবটি বাতিল করে চিঠিটি নথিজাত (বাজেয়াপ্ত) করে।

নর্দান ইউনিভার্সিটি সংশ্লিষ্টদের আরও অভিযোগ, ভুয়া ট্রাস্টি বোর্ডের কয়েকজন সদস্যের সঙ্গে যোগসাজশ করে ড. আনোয়ার হোসেন এনইউবিতে প্রশাসক নিয়োগের চেষ্টা করছেন। এর আগে এনইউবি নিয়ে তদন্ত কমিটি গঠনেও তিনি ছলচাতুরীর আশ্রয় নিয়েছেন। যা প্রমাণিত হওয়ার পর একটি তদন্ত কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়। দ্বিতীয় কমিটি করা হয়, কিন্তু সেই কমিটিতেও ছলচাতুরীর আশ্রয় নেওয়া হয়।

নর্দান ইউনিভার্সিটি সংশ্লিষ্টদের আরও অভিযোগ, ভুয়া ট্রাস্টি বোর্ডের কয়েকজন সদস্যের সঙ্গে যোগসাজশ করে ড. আনোয়ার হোসেন এনইউবিতে প্রশাসক নিয়োগের চেষ্টা করছেন। এর আগে এনইউবি নিয়ে তদন্ত কমিটি গঠনেও তিনি ছলচাতুরীর আশ্রয় নিয়েছেন। যা প্রমাণিত হওয়ার পর একটি তদন্ত কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়। দ্বিতীয় কমিটি করা হয়, কিন্তু সেই কমিটিতেও ছলচাতুরীর আশ্রয় নেওয়া হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত বছরের ৫ আগস্টের পর নিজেদের ট্রাস্টি পরিচয় দিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের দখল ফিরে পেতে আবেদন করেন বোরহান উদ্দিন ও লুৎফর রহমান নামে দুই ব্যক্তি। তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ইউজিসি তদন্ত কমিটি গঠন করে। সেই কমিটিতে প্রতারণামূলক, ভুয়া বিওটি গঠনকারীদের ঘনিষ্ঠ শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নোমান ফারুক নামে এক ব্যক্তিকে রাখা হয়। ভুয়া বিওটিদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা প্রমাণ সাপেক্ষে দ্বিতীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

এ দফায় গঠিত কমিটির আহ্বায়ক করা হয় সাবেক জেলা ও দায়রা জজ আলতাফ হোসেনকে—যিনি ভুয়া বিওটি গঠনকারীদের এলাকার লোক। এক সময়ে নর্দান ইউনিভার্সিটিতে ক্লাস নিতেন (খণ্ডকালীন)। এছাড়া আওয়ামী লীগের শাসনামলে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সচিব ও অগ্রণী ব্যাংকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সুবিধাভোগী হিসেবে চুক্তিভিত্তিক লিগ্যাল অ্যাডভাইজর ছিলেন। আলতাফ হোসেন কমিশনের অপর দুই সদস্যের সম্মতি ছাড়াই একটি মনগড়া প্রতিবেদন জমা দেন। কিন্তু হাইকোর্ট সেই প্রতিবেদন গ্রহণ করেনি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযোগ জানিয়ে পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক এনইউবির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, আমরা নিয়মনীতি মেনেই ভাইস চ্যান্সেলর প্যানেল ইউজিসিতে জমা দিয়েছি। এরকম কোনো আবেদন বা চিঠি গেলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় নিয়ম অনুসারে ইউজিসি মতামত চায়। কিন্তু ইউজিসি অজ্ঞাত কারণে মতামত দিচ্ছে না, আটকে রেখেছেন। আমরা খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছি, একটা গ্রুপ গত ৫ আগস্টের পর আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় দখলের পাঁয়তারা করছে। নানা অপচেষ্টা করেও তারা সফল হতে না পেরে তারা বিভিন্ন মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করেছে। যেগুলো তারা কোর্টেও প্রমাণ করতে পারেনি এবং কোথাও গ্রহণযোগ্য হয়নি। তারা নানাভাবে ঝামেলা করতে চাচ্ছে। এরই প্রেক্ষিতে তারা ভিসি নিয়োগ বিলম্বিত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, ইউজিসি ভুয়া পক্ষকে বিবদমান পক্ষ দেখাচ্ছে। অথচ আদালত সরকারি ও বেসরকারি দপ্তরে ওই বিওটির যেকোনো ব্যবহার নিষেধাজ্ঞা প্রদান করেছে। আর মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও ভাইস চ্যান্সেলরের পরিবর্তে ইউজিসি প্রশাসক নিয়োগের বিষয়ে মাথা ঘামাতে পারেনা। এটা বিধিবহির্ভূত।

বিশ্ববিদ্যালয়টির বর্তমান ট্রাস্টি বোর্ডের একজন সদস্য বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় দখলের অপচেষ্টাকারীদের দাবির মুখে পর পর গঠিত দুটি তদন্ত কমিটিতেই পক্ষপাতিত্ব করেছেন অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন। যার প্রেক্ষিতে প্রথমটি গ্রহণযোগ্যতা হারায় এবং দ্বিতীয়টির একপেশে প্রতিবেদনও আদালতে ভিত্তিহীন বলে প্রমাণিত হয়।

তিনি আরও বলেন, একটা ভুয়া ট্রাস্টি বানিয়ে সেখান থেকে দাবি জানানো হয়েছে যে, বিশ্ববিদ্যালয়ে যেন প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়। সেটা শিক্ষা মন্ত্রণালয় বাদ দিয়ে সর্বশেষ একটা চিঠির মাধ্যমে ভাইস চ্যান্সেলর নিয়োগের ব্যাপারে ইউজিসির কাছে আইনগত মতামত চায়। এ মতামতের বাইরে তো ইউজিসি কিছু করতে পারে না। কিন্তু ইউজিসির বেসরকারি ব্যবস্থাপনা বিভাগীয় প্রধান তালবাহানা করে সেই ভুয়া ট্রাস্টির এজেন্ডা বাস্তবায়নে কাজ করছেন।

তবে এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে ইউজিসির বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ম্যানেজমেন্ট বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন বলেন, ভাইস চ্যান্সেলর ইস্যুতে প্রতিবেদনের জন্য বোর্ড অব ট্রাস্টি (বিওটি) সংক্রান্ত তথ্য প্রয়োজন। এখন আমরা যদি বিওটি ইস্যু সম্পর্কে যদি কথা বলতে চাই তাহলে আমাদের বিভিন্ন বিষয়ে ভাবতে হয়। বিশেষ করে, এ সংক্রান্ত মামলা আদালতে চলমান রয়েছে।

বিওটি ইস্যুতে তদন্ত কমিটিতে প্রভাব বিস্তারের বিষয়ে তিনি বলেন, ইউজিসিতে আমার ব্যক্তিগত কোনো এজেন্ডা নেই। কোনো বিষয়ে কোথাও আমার প্রভাব বিস্তারের প্রশ্ন আসেনা।

প্রশাসক নিয়োগের অভিযোগ প্রসঙ্গে বক্তব্য জানতে চাইলে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় এ বিষয়ে মতামত দেওয়া হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। যদিও শিক্ষা মন্ত্রণালয় সর্বশেষ চিঠিতে সুনির্দিষ্ট করে ‘ভাইস চ্যান্সেলর’ নিয়োগ নিয়ে মতামত চেয়েছিল বলে জানা গেছে।

সার্বিক বিষয়ে বক্তব্য জানতে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এস এম এ ফায়েজকে একাধিকবার মুঠোফোনে কল দিয়েও পাওয়া যায়নি।

মোহাম্মদপুর-বছিলা রাস্তা সংস্কারের দাবীতে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত

0

প্রেস বিজ্ঞপ্তি

আজ ১৭ আগস্ট রবিবার সকাল ১০ঃ০০ ঘটিকায় রাজধানীর মোহাম্মদপুর বেড়ীবাঁধ মোড়ে মোহাম্মদপুর-বছিলা রাস্তা সংস্কারের দাবীতে সামাজিক সংগঠন নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা), আমাদের মোহাম্মদপুর, ডেমোক্রেটিক ইয়ুথ সোসাইটি(মোহাম্মদপুর), সোসাইটি ফর হিউম্যান রাইটস (এসএইচআর), ঐক্যবদ্ধ মোহাম্মদপুর ও বছিলা সোশ্যাল প্লাটফর্ম এর উদ্যোগে মানব বন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে।

উক্ত মানববন্ধনে সকল শ্রেণী-পেশার মানুষ তাদের দাবী আদায়ের লক্ষ্যে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ করে।

মানববন্ধন বাস্তবায়ন কমিটির আহবায়ক সাংবাদিক ও গবেষক আ ফ ম মশিউর রহমান এর সঞ্চালনায় বক্তব্য রাখেন সামাজিক সংগঠন আমাদের মোহাম্মদপুর এর সভাপতি ইসমাইল পাটোয়ারী, নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) এর মোহাম্মদপুরের উপদেষ্টা রবিউল ইসলাম রুবেল, শিক্ষক নেতা এস এম শাহীন, বছিলা সেশ্যাল প্লাটফর্ম এর এম এ রশিদ, শ্রমিক নেতা অহিদুর রহমান, সাইফুল্লাহ সেলীম, লিটন ও আব্দুল হামিদ।

মানববন্ধনে একাত্মতা প্রকাশ করে রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা ১৩ আসনের প্রার্থী মোবারক হোসেন, বিএনপির ঢাকা মহানগর উত্তরের আহবায়ক কমিটির সদস্য আহমদ আলী, ডাঃ শফিউর রহমান, আপ বাংলাদেশ নেতা রাজিবুল ইসলাম, ৩৩ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থী আলী আহমদ মজুমদারসহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন এর নের্তৃবৃন্দ।

বক্তারা বলেন, লাখো মানুষের দৈনন্দিন জাতায়াতের এই রাস্তাটি দীর্ঘদিন যাবত উন্নয়ন ছোঁয়ার বাহিরে। রাস্তায় খানাখন্দ, কাঁদা-পানি একাকারসহ নানা কারণে প্রতিদিন এক্সিডেন্ট, গাড়ী আটকে থাকা এবং দীর্ঘ জ্যামে মানুষের কর্মঘন্টা নষ্ট হওয়া যেনো স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে দাড়িয়েছে।

এমন রাস্তা আজকাল গ্রামেও দেখা মেলে না। পাশাপাশি ফোর লেন হবার উপযুক্ত রাস্তাটির বড় অংশজুড়ে আছে ইট-পাথর ব্যবসা, শুধু ফুটপাত দখল নয় বরং রাস্তার বড় অংশ জুড়ে ভ্রাম্যমান দোকানপাট।

বক্তারা দাবী করেন, এসকল বিষয় নজড়ে নিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয়, সিটি করপোরেশন এবং বিভাগগুলো যেনো অনতিবিলম্বে রাস্তা সংস্কার করে রাস্তাকে দখলমুক্ত করার কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহন করে। অন্যথায় তারা রাস্তা অবরোধ, স্মারকলিপি প্রদানসহ নানা কর্মসূচী গ্রহনের হুমকি দেন।

রিজার্ভ চুরিতে জড়িত ৫ দেশের নাগরিক

২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঘটা বহুল আলোচিত বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনা নতুন মোড় নিয়েছে। দীর্ঘ তদন্ত শেষে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডির অনুসন্ধানে বাংলাদেশ ছাড়াও অন্তত চার দেশের নাগরিকের এই অপরাধে জড়িত থাকার প্রমাণ মিলেছে। মামলার চার্জশিট প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে রয়েছে, শিগগিরই আদালতে দাখিল হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র ইউএনবিকে জানিয়েছে, অভিযুক্তদের মধ্যে শ্রীলঙ্কা, ফিলিপাইন, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক রয়েছেন। এ ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের আইটি বিভাগের তৎকালীন কয়েকজন কর্মকর্তা, কর্মচারী ছাড়াও ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন কর্মকর্তার গুরুতর গাফিলতি ছিল। এমনকি তাদের কারও কারও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততাও ছিল।

প্রতীকী ছবি/এআই

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিআইডির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, অত্যাধুনিক ম্যালওয়্যার ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক হ্যাকার চক্র এ চুরির ঘটনা ঘটায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের আইটি বিভাগ থেকে সচেতনভাবেই ওই ম্যালওয়্যারযুক্ত ফাইল খোলা হয়েছিল। এরপর বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার অবৈধভাবে স্থানান্তরিত হয়।

তিনি আরও বলেন, চার্জশিটে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (এফবিআই) বিস্তারিত প্রতিবেদন অন্তর্ভুক্ত থাকবে, যাতে বিদেশি নাগরিকদের সম্পৃক্ততার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ রয়েছে। ওই প্রতিবেদন আনুষ্ঠানিকভাবে পাঠাতে এরই মধ্যে এফবিআইকে অনুরোধ করা হয়েছে। সেটি হাতে পেলেই তদন্ত শেষ করে চার্জশিট জমা দেওয়া হবে।

২০১৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি (শুক্রবার) রাতে সংঘটিত বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি বিশ্বের অন্যতম বড় সাইবার ডাকাতির ঘটনা। সে সময় বাংলাদেশে ব্যাংক কার্যক্রম বন্ধ ছিল এবং যুক্তরাষ্ট্রেও সাপ্তাহিক ছুটি শুরু হয়েছিল। সেই সুযোগে হ্যাকাররা নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভে বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব থেকে প্রায় ১ বিলিয়ন বা ১০০ কোটি ডলার স্থানান্তরের চেষ্টা করে, তবে ১০১ মিলিয়ন বা ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার সরাতে পারে তারা।

চুরি হওয়া ওই অর্থের বড় অংশ দুর্বল নজরদারির ফাঁক গলে ফিলিপাইনের ক্যাসিনো শিল্পের গোপনীয়তা আইনের অধীনে পাচার হয়ে যায়। এর মধ্যে ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার ফিলিপাইনে এবং প্রায় ২ কোটি ডলার শ্রীলঙ্কায় পাঠানো হয়। পরে শ্রীলঙ্কায় প্রেরিত অর্থ ফেরত আনা সম্ভব হলেও ফিলিপাইন থেকে অর্থ উদ্ধার জটিল হয়ে পড়ে। এখন পর্যন্ত প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ ডলার উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে সরকার।

এ ঘটনার তদন্তে সিআইডির পাশাপাশি এফবিআই, ফিলিপাইনের ন্যাশনাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এনবিআই) এবং শ্রীলঙ্কার কেন্দ্রীয় ব্যাংক অংশ নেয়। পরবর্তীতে জাতিসংঘকেও এ অপরাধে ব্যবহৃত কৌশল ও লেনদেনের ধারা সম্পর্কে জানানো হয়।

ঘটনার ৩৯ দিন পর ওই বছরের ১৫ মার্চ বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব ও বাজেট বিভাগের তৎকালীন উপপরিচালক জোবায়ের বিন হুদা বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে মতিঝিল থানায় মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন এবং তথ্য ও প্রযুক্তি আইনে অভিযোগ এনে একটি মামলা করেন। পরে মামলাটি সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হয়।

প্রায় নয় বছরের তদন্তে দেশি-বিদেশি শতাধিক সাক্ষীর জবানবন্দি, আইপি ঠিকানা, নেটওয়ার্ক লগ, ব্যাংক লেনদেনের তথ্য এবং ড্রিডেক্স ম্যালওয়্যার কোডসহ বিস্তৃত প্রযুক্তিগত প্রমাণ খতিয়ে দেখা হয়েছে। এর ফলে হামলার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে বলে জানিয়েছেন তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা।

সিআইডির আরেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, এই তদন্তে আন্তর্জাতিক আর্থিক অপরাধ চক্রের কৌশল, তাদের দেশীয় সহযোগীদের ভূমিকা এবং আমাদের সাইবার নিরাপত্তার দুর্বলতার মতো বিষয়গুলো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা চার্জশিট এমনভাবে প্রস্তুত করতে চাই যাতে অপরাধীরা শুধু দেশে নয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়েও আইনের মুখোমুখি হয়।’

চার্জশিট দাখিলের মাধ্যমে বিশ্বের অন্যতম আলোচিত এ সাইবার ডাকাতির রহস্য উন্মোচিত হবে এবং বাংলাদেশের আর্থিক খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে বলে আশা করছেন তদন্ত কর্মকর্তারা।

সূত্র: ইউএনবি।

জাতীয় নাগরিক পার্টির পাঁচ নেতার শোকজ প্রত্যাহার

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) তাদের পাঁচ শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে কক্সবাজারে ভ্রমণের ঘটনায় দেওয়া শোকজ নোটিশ প্রত্যাহার করেছে। দলীয় শৃঙ্খলার ব্যত্যয় না ঘটায় এবং নেতাদের জবাব সন্তোষজনক হওয়ায় বিষয়টি চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি করেছেন দলের আহ্বায়ক মো. নাহিদ ইসলাম এবং সদস্য সচিব আখতার হোসেন।

শনিবার (১৬ আগস্ট) এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব (দপ্তর) সালেহ উদ্দিন সিফাত স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, গত ৬ আগস্ট এনসিপির মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলম, মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) হাসনাত আব্দুল্লাহ, মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব তাসনিম জারা এবং যুগ্ম আহ্বায়ক খালেদ সাইফুল্লাহর প্রতি পৃথকভাবে পাঁচটি কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠানো হয়েছিল।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, উল্লিখিত নেতারা দপ্তর মারফত আহ্বায়ক ও সদস্য সচিব বরাবর যথাসময়ে কারণ দর্শানোর জবাব প্রদান করেন। তাদের জবাব বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, দলীয় শৃঙ্খলার কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি। ফলে শোকজ নোটিশ প্রত্যাহার করে বিষয়টির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করা হয়েছে।

প্রসঙ্গত, গণ-অভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তিতে কক্সবাজারে ভ্রমণের বিষয়টি নিয়ে দেশজুড়ে সমালোচনা শুরু হয়। এর পরদিন, ৬ আগস্ট, দলীয় শৃঙ্খলা লঙ্ঘনের অভিযোগে তাদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সশরীরে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়। নেতারা নির্ধারিত সময়েই জবাব দেন।

জাতীয় নাগরিক পার্টির ফেসবুক পেজ থেকে নেওয়া ছবি

এর আগে, ৫ আগস্ট রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউয়ে জুলাই ঘোষণার দিনে দুপুরে খবর ছড়িয়ে পড়ে যে, উল্লিখিত নেতারা কক্সবাজারের একটি বিলাসবহুল হোটেলে বাংলাদেশে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের সঙ্গে গোপন বৈঠকে বসেছেন। যদিও পরে বিষয়টি গুজব প্রমাণিত হয়।

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দলের অভ্যন্তরে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, তা এখন নিরসন হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এনসিপি নেতৃত্বের এই সিদ্ধান্ত দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

নাগালবিহীন সবজির দাম, বিপাকে রাজধানীর ক্রেতারা

0

রাজধানীর বাজারে সবজির দাম বেড়ে ক্রেতাদের নাভিশ্বাস উঠেছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতিটি সবজির দাম কেজিতে ২০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এখন ৮০ টাকার নিচে কোনো সবজি নেই বললেই চলে। সরেজমিনে উত্তর বাড্ডা, মধ্য বাড্ডা, রামপুরা, মালিবাগ, শান্তিনগরসহ বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, দাম বৃদ্ধির কারণে অনেক ক্রেতাই পরিমাণ কমিয়ে সবজি কিনছেন।

ফাইল ছবি: বিভিন্ন ধরনের সবজি নিয়ে দোকান সাজিয়েছেন এক বিক্রেতা/সংগৃহীত

সবচেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে গোল বেগুন—কেজিপ্রতি ২২০-২৫০ টাকা, যা এক সপ্তাহ আগের তুলনায় দ্বিগুণ। লম্বা জাতের বেগুন ১৬০-১৮০ টাকা, সাদা জাতের বেগুন ১২০-১৪০ টাকা কেজি। ঝিঙা, ধুন্দল, শসা বিক্রি হচ্ছে ১০০ টাকা কেজিতে; ঢেঁড়স, পটল, কাকরোল ৮০ টাকা। একমাত্র পেঁপেই বিক্রি হচ্ছে ৪০ টাকা কেজিতে।

জালি কুমড়া প্রতি পিস ১০০-১২০ টাকা, লাউ ১০০-১৫০ টাকা। বরবটি ৮০-১০০ টাকা, কচুর লতি ৮০ টাকা, কচুমুখী ৭০-৮০ টাকা। কাঁচা মরিচের দামও বেড়েছে—কেজিপ্রতি ২২০-২৪০ টাকা, পাইকারি বাজারে ৫ কেজির পাল্লা বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার টাকায়।

উত্তর বাড্ডা বাজারে স্কুলশিক্ষিকা ইয়াসমিন আরা বলেন, “বেগুনের দাম শুনে রীতিমতো আকাশ থেকে পড়লাম। এক সপ্তাহে ১০০ টাকা বাড়ে কী করে!” তিনি বেগুন না কিনে পেঁপে কিনে বাসায় ফিরেছেন। আরেক ক্রেতা বলেন, “আজ তিন রকমের সবজি আধা কেজি করে কিনে নিয়ে যাচ্ছি। গত এক বছরে এমন দাম দেখিনি।”

বিক্রেতারা জানান, পাইকারি বাজারে দাম বেড়ে যাওয়ায় তাদেরও বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। ফলে ক্রেতারা কম পরিমাণে কিনছেন, কেউ কেউ না কিনেই ফিরে যাচ্ছেন। এতে বিক্রেতাদের মুনাফাও কমছে।

কাওরান বাজারে শুক্রবার ভোরে দেখা গেছে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা সবজির দাম ছিল বাড়তি। মৌসুমে ফলন কম হওয়ায় দাম বেড়েছে বলে জানান বিক্রেতারা। আড়তদার রহিম মিয়া বলেন, “পাল্লাপ্রতি সবজির দাম ১০০-২০০ টাকা বেড়েছে।” ব্যবসায়ী আবদুস সালাম বলেন, “মার্চ থেকে মাঠে সবজির পরিমাণ কমে, কিন্তু চাহিদা থাকে। এছাড়া পরিবহন খরচও বেড়েছে।”

সবজির পাশাপাশি পেঁয়াজের দামও বেড়েছে। গত সপ্তাহের ৭৫ টাকা থেকে বেড়ে এখন ৮৫-৯০ টাকা কেজি, পাইকারি বাজারে পাল্লাপ্রতি ৪০০-৪৩০ টাকা।

ফাইল ছবি: বিভিন্ন ধরনের সবজি নিয়ে দোকান সাজিয়েছেন বিক্রেতারা/সংগৃহীত

মাছের বাজারেও একই চিত্র। কেজিতে ৫০-২০০ টাকা বেড়েছে। কাঁচকি মাছ ৬০০ টাকা, চাপিলা ৪৫০-৫০০ টাকা, পোয়া ৫৫০-৭০০ টাকা, শিং-মাগুর ৫০০-৬০০ টাকা। বড় মাছের মধ্যে রুই ৩৮০-৪২০ টাকা, কাতল ৪০০-৪৮০ টাকা, কালিবাউশ ৪০০-৪৫০ টাকা, তেলাপিয়া ২৫০-২৮০ টাকা, চাষের পাঙাশ ২৫০ টাকা, নদীর পাঙাশ ৮০০-১,০০০ টাকা, বোয়াল ৮০০-১,২০০ টাকা, আঁড় মাছ ১,০০০ টাকা।

ইলিশের দামও বেড়েছে। এক কেজির নিচে মাঝারি ইলিশ ১,৮০০ টাকা, ছোট ইলিশ ১,২০০-১,৬০০ টাকা, এক কেজির ওপরে ইলিশ ২,০০০-২,৫০০ টাকা।

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সবজি ও পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে অন্যান্য পণ্যের ওপরও। তারা সিন্ডিকেটের কারসাজি, চাঁদাবাজি এবং বাজার মনিটরিং জোরদার করার দাবি জানিয়েছেন।

রাষ্ট্রপতিকে শপথ পড়ানো নিয়ে সাত অ্যামিকাস কিউরি নিয়োগ

0

বাংলাদেশের সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে রাষ্ট্রপতির শপথ গ্রহণে প্রধান বিচারপতির পরিবর্তে জাতীয় সংসদের স্পিকারকে দায়িত্ব দেওয়ার বিধান নিয়ে হাইকোর্টে রুল জারি হয়েছে। এই রুলের শুনানিতে মতামত দিতে আদালত সাতজন শীর্ষস্থানীয় আইনজীবীকে অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। আদালত আগামী ২৬ অক্টোবর শুনানির পরবর্তী দিন ধার্য করেছে।

গীতিকবি শহীদুল্লাহ ফরায়জী ২০২৫ সালের ১০ মার্চ একটি রিট আবেদন করেন, যেখানে তিনি ১৯৭২ সালের সংবিধানের মূল বিধান; রাষ্ট্রপতিকে প্রধান বিচারপতি শপথ পাঠ করাবেন- পুনর্বহালের নির্দেশনা চান। রিটের প্রাথমিক শুনানি শেষে ১১ মার্চ হাইকোর্ট একটি রুল জারি করে।

রুলে প্রশ্ন তোলা হয়:

  • পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে স্পিকারের শপথ পড়ানো সংক্রান্ত বিধান কেন ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করা হবে না?
  • সংশোধনীর এই অংশটি কেন শুরু থেকেই বাতিল বলে গণ্য হবে না?

হাইকোর্ট বেঞ্চ- বিচারপতি শশাঙ্ক শেখর সরকার ও বিচারপতি কে এম জাহিদ সারওয়ার নিম্নোক্ত এই সাতজন অভিজ্ঞ আইনজীবীকে অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে মনোনীত করেন:

  • জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জয়নুল আবেদীন
  • অ্যাডভোকেট প্রবীর নিয়োগী
  • ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন
  • ড. শাহদীন মালিক
  • অ্যাডভোকেট আহসানুল করিম
  • ব্যারিস্টার মোস্তাফিজুর রহমান খান
  • ব্যারিস্টার জ্যোর্তিময় বড়ুয়া
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জয়নুল আবেদীন
ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন
ড. শাহদীন মালিক
অ্যাডভোকেট আহসানুল করিম

অ্যামিকাস কিউরি আদালতের বন্ধু হিসেবে কাজ করেন, যারা পক্ষভুক্ত না হয়েও আদালতকে আইনি ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ দিয়ে সহায়তা করেন।

এই রুলের শুনানি খুব গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি সংবিধানের মৌলিক কাঠামো তত্ত্বক্ষমতার ভারসাম্য, এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। রাষ্ট্রপতির শপথ গ্রহণে প্রধান বিচারপতির পরিবর্তে স্পিকারের ভূমিকা বিচার বিভাগের মর্যাদা ও প্রতীকী গুরুত্বকে প্রভাবিত করতে পারে। এছাড়া, এই রুলের সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে সংবিধান সংশোধনের সীমা ও পদ্ধতি নির্ধারণে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।

রিটটি ১৪ আগস্ট আদালতের কার্যতালিকায় ২৫ নম্বর ক্রমিকে ওঠে। রিট আবেদনকারীর পক্ষে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ওমর ফারুক এবং রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ মেহেদি হাসান। আদালত রুলের ওপর আংশিক শুনানি শেষে অ্যামিকাস কিউরি নিয়োগ দিয়ে পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেন।

পাকিস্তানে প্রবল বৃষ্টির দাপট: আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে ৩২৮ জন নিহত

পাকিস্তানে মৌসুমি বৃষ্টির দাপটে আবারও প্রকোপ নেমে এসেছে। গত ৪৮ ঘণ্টায় দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে অন্তত ৩৪৪ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে কেবল এই প্রদেশেই নিহত হয়েছেন ৩২৮ জন। আহত হয়েছেন অন্তত ১২০ জন। শনিবার দেশটির কর্তৃপক্ষ এই মর্মান্তিক তথ্য প্রকাশ করেছে।

খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা জানায়, ধসে পড়া ঘরবাড়ি ও মাটির স্তূপের নিচ থেকে মরদেহ উদ্ধারে প্রায় দুই হাজার উদ্ধারকর্মী কাজ করছেন। নয়টি পাহাড়ি জেলায় জরুরি ত্রাণ কার্যক্রম চলছে। তবে প্রবল বর্ষণ উদ্ধার প্রচেষ্টা ব্যাহত করছে।
সংস্থার মুখপাত্র বিলাল আহমেদ ফয়েজি জানান, ভূমিধস ও সড়ক পানির তলে চলে যাওয়ায় ত্রাণসামগ্রী পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। ভারী যন্ত্রপাতি ও অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক স্থানে সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় উদ্ধারকর্মীরা পায়ে হেঁটে দুর্গম এলাকায় প্রবেশ করছেন।

বুনের, বাজৌর, সোয়াত, শাংলা, মানসেহরা ও বাট্টাগ্রামসহ ক্ষতিগ্রস্ত পাহাড়ি জেলাগুলোকে দুর্যোগপ্রবণ এলাকা ঘোষণা করেছে প্রাদেশিক সরকার। সোয়াত জেলার বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুতের খুঁটি উপড়ে পড়েছে, সড়ক কাদাপানিতে তলিয়ে গেছে, অনেক গাড়ি অর্ধেক কাদায় ডুবে আছে।
বুনের জেলার বাসিন্দা আজিজুল্লাহ ভয়াবহ মুহূর্তটির বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, “আমি মনে করেছিলাম কেয়ামত নেমে এসেছে। প্রচণ্ড শব্দের পর পাহাড় কেঁপে উঠতে দেখলাম, মনে হচ্ছিল মৃত্যু সামনে দাঁড়িয়ে আছে।”

জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ (এনডিএমএ) জানিয়েছে, পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে ১১ জন এবং গিলগিট-বালতিস্তানে আরও পাঁচজন প্রাণ হারিয়েছেন। এ ছাড়া ত্রাণসামগ্রী নিয়ে যাওয়ার সময় একটি হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়ে দুই পাইলটসহ পাঁচজন নিহত হয়েছেন।
সংস্থার কর্মকর্তা সৈয়দ মোহাম্মদ তায়েব শাহ জানান, এ বছর মৌসুমি বৃষ্টি স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে আগেই শুরু হয়েছে এবং অন্তত ১৫ দিন এর তীব্রতা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।

বর্ষা মৌসুমের প্রবল বৃষ্টিকে কর্তৃপক্ষ “অস্বাভাবিক” বলে আখ্যা দিয়েছে। চলতি মৌসুমে এখন পর্যন্ত ৬৫০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু এবং প্রায় ৯০০ জন আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
পাকিস্তান জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা শীর্ষ দেশগুলোর একটি। ঘন ঘন বন্যা, খরা ও চরম আবহাওয়ার শিকার হচ্ছে দেশটির জনগণ। মাত্র তিন বছর আগে, ২০২২ সালের মৌসুমি বন্যায় পাকিস্তানের এক-তৃতীয়াংশ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে গিয়েছিল। সেই দুর্যোগে প্রায় ১ হাজার ৭০০ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল এবং লাখ লাখ মানুষ গৃহহীন হয়েছিল।

বর্তমান পরিস্থিতি আবারও প্রমাণ করছে, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে পাকিস্তান মারাত্মক বিপদের মুখে। পাহাড়ি এলাকায় মানুষজন একদিকে প্রকৃতির ভয়াবহ আঘাত সামলাচ্ছেন, অন্যদিকে জীবনের অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন। আগামী দিনগুলোতে বৃষ্টির মাত্রা বাড়তে থাকলে মৃত্যু ও ধ্বংসযজ্ঞ আরও ভয়াবহ আকার নিতে পারে।

এই দেশ সবার, এখানে কোনো ভেদাভেদ থাকবে না: সেনাপ্রধান

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান জন্মাষ্টমী উপলক্ষে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির প্রাঙ্গণে আয়োজিত শোভাযাত্রার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বলেছেন, বাংলাদেশে কোনো ধর্ম, জাতি বা গোত্রের ভেদাভেদ থাকবে না। তার ভাষ্যে, “এই দেশ সবার, আমরা সবাই এই দেশের নাগরিক, এবং একসঙ্গে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করব।”

এই বক্তব্য শুধু একটি উৎসব উপলক্ষ্যে শুভেচ্ছা নয়, বরং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক-সামাজিক বাস্তবতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। আগস্ট মাসে জন্মাষ্টমীর শোভাযাত্রা সবসময়ই দেশের ধর্মীয় সম্প্রীতির প্রতীক হয়ে এসেছে। তবে এ বছর সেনাপ্রধানের উপস্থিতি ও বক্তব্য একটি ভিন্ন মাত্রা তৈরি করেছে। রাজনৈতিক পরিবর্তন, অস্থিরতা ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে যে প্রশ্নগুলো জনমনে ঘুরছে, সেসবের প্রেক্ষাপটে তার বার্তা কার্যত রাষ্ট্রীয় নিশ্চয়তার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বলেন, “বাংলাদেশ সম্প্রীতির দেশ। শত শত বছর ধরে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, পাহাড়ি, বাঙালি ও বিভিন্ন উপজাতি জনগোষ্ঠী এখানে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করে আসছে। আমাদের সবার সমান অধিকার রয়েছে এবং সেইভাবেই আমরা ভবিষ্যতের দিকে এগোতে চাই।” তার এই বক্তব্য একদিকে ঐতিহাসিক বহুত্ববাদী চর্চার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থায় সবার নিরাপত্তা ও অংশগ্রহণের প্রতি আস্থাও জোরদার করে।

শুধু প্রতীকী বার্তাতেই থেমে থাকেননি তিনি। সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা প্রসঙ্গে বলেন, “আমাদের অঙ্গীকার হবে শান্তিপূর্ণ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখা। সারা বাংলাদেশে সেনাবাহিনী মোতায়েন রয়েছে। আমরা জনগণের পাশে থাকব এবং এক হয়ে কাজ করে যাব।” এ বক্তব্য স্পষ্ট করে দেয় যে সামরিক নেতৃত্ব বর্তমানে শুধু প্রতিরক্ষা নয়, সামাজিক স্থিতিশীলতাকেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হিসেবে দেখছে।

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উদ্দেশে সেনাপ্রধান বলেন, “আপনারা নিশ্চিন্তে এই দেশে বসবাস করবেন এবং ধর্মীয় উৎসব আনন্দের সঙ্গে উদযাপন করবেন। আমরা একসঙ্গে এই আনন্দ ভাগাভাগি করব।” ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও অধিকার নিয়ে দীর্ঘদিনের উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ আশ্বাস।

অনুষ্ঠানে অন্য বাহিনী প্রধানরাও বক্তব্য দেন। বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খান বলেন, শ্রীকৃষ্ণের শিক্ষা ন্যায় ও সত্য প্রতিষ্ঠায় অনুপ্রেরণা যোগায়, স্বাধীনতা রক্ষায় সকলের দায়িত্ব রয়েছে। নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল এম নাজমুল হাসান বলেন, পারস্পরিক সহনশীলতা দেশকে শক্তিশালী করে, শ্রীকৃষ্ণের আদর্শ সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করুক।

শেষে তিন বাহিনী প্রধান প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের মাধ্যমে শোভাযাত্রার উদ্বোধন করেন। রাজধানীর পলাশী মোড় থেকে শুরু হয়ে বাহাদুর শাহ পার্কে গিয়ে শোভাযাত্রাটি শেষ হয়।

জন্মাষ্টমীর এ আয়োজন তাই শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং বহুত্ববাদী বাংলাদেশে সামরিক নেতৃত্বের অবস্থান ও রাষ্ট্রীয় সম্প্রীতির অঙ্গীকার পুনর্নিশ্চিত করার এক প্রকার প্রতীকী মুহূর্ত হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে রইল।

বাহ্যিকভাবে পরস্পর বিরোধী আয়াত সমূহের সমন্বয়

0

প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব

كِتَابٌ أَنْزَلْنَاهُ إِلَيْكَ مُبَارَكٌ لِيَدَّبَّرُوا اٰيَاتِهِ وَلِيَتَذَكَّرَ أُولُو الْأَلْبَابِ-

‘এটি এক বরকতমন্ডিত কিতাব, যা আমরা তোমার প্রতি নাযিল করেছি। যাতে লোকেরা এর আয়াত সমূহ অনুধাবন করে এবং জ্ঞানীরা উপদেশ গ্রহণ করে’ (ছোয়াদ-মাক্কী ৩৮/২৯)।

কুরআনের অনেক আয়াত রয়েছে যা বাহ্যিকভাবে পরস্পর বিরোধী। কিন্তু তার মর্ম অনুধাবন করলে উক্ত বাহ্যিক বিরোধ সমন্বয় করা সম্ভব। ফলে আর বিরোধ থাকে না।

উদাহরণ স্বরূপ :

(১) আল্লাহ বলেন, وَمَنْ أَصْدَقُ مِنَ اللهِ حَدِيثًا- ‘আর আল্লাহর চাইতে অধিক সত্যবাদী আর কে আছে? (নিসা-মাদানী ৪/৮৭)। অন্যত্র তিনি বলেন, وَمَنْ أَصْدَقُ مِنَ اللهِ قِيلاً- ‘আর আল্লাহর চাইতে কথায় অধিক সত্যবাদী আর কে আছে? (নিসা-মাদানী ৪/১২২)।

দু’টি আয়াতের মর্ম একই। অতএব দ্বিতীয়টি প্রথমটির নাসেখ বা হুকুম রহিতকারী। কেননা আল্লাহ বলেছেন,مَا نَنْسَخْ مِنْ آيَةٍ أَوْ نُنْسِهَا نَأْتِ بِخَيْرٍ مِنْهَا أَوْ مِثْلِهَا ‘আমরা কোন আয়াত রহিত করলে কিংবা তা ভুলিয়ে দিলে তদপেক্ষা উত্তম অথবা তদনুরূপ আয়াত আনয়ন করি’ (বাক্বারাহ-মাদানী ২/১০৬)। অতএব দুই আয়াতের মধ্যে কোন বিরোধ রইল না।

(২) আল্লাহ কুরআন সম্পর্কে বলেন, هُدًى لِلْمُتَّقِينَ- ‘আল্লাহভীরুদের জন্য পথ প্রদর্শক’ (বাক্বারাহ-মাদানী ২/২)। অন্যত্র তিনি বলেন,شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنْزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِلنَّاسِ، ‘রামাযান হ’ল সেই মাস, যাতে কুরআন নাযিল হয়েছে। যা মানুষের জন্য পথ প্রদর্শক’ (বাক্বারাহ-মাদানী ২/১৮৫)। ১ম আয়াতে ‘মুত্তাক্বীদের জন্য’ খাছ করা হয়েছে। পরের আয়াতে সাধারণভাবে ‘সকল মানুষকে’ বুঝানো হয়েছে। উভয় আয়াতের সমন্বয় এই যে, প্রথমটি হ’ল هداية التوفيق والانتفاع ‘তাওফীক ও উপকার লাভের’ হেদায়াত। দ্বিতীয়টি হ’ল هداية التبيين والإرشاد ‘ব্যাখ্যা ও সুপথ প্রদর্শনের’ হেদায়াত।

(৩) একই দৃষ্টান্ত রয়েছে নিম্নের দু’টি আয়াতে। যেমন আল্লাহ বলেন,إِنَّكَ لَا تَهْدِي مَنْ أَحْبَبْتَ وَلَكِنَّ اللهَ يَهْدِي مَنْ يَشَاءُ، ‘নিশ্চয়ই তুমি হেদায়াত করতে পারো না যাকে তুমি ভালবাস। বরং আল্লাহই যাকে চান তাকে হেদায়াত করে থাকেন’ (ক্বাছাছ-মাক্কী ২৮/৫৬)। অন্যত্র তিনি বলেন,وَإِنَّكَ لَتَهْدِي إِلَى صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ ‘আর নিশ্চয়ই তুমি প্রদর্শন করে থাক সরল পথ’ (শূরা-মাক্কী ৪২/৫২)। উভয় আয়াতের সমন্বয় এই যে, প্রথমটি হ’ল هداية التوفيق والانتفاع ‘তাওফীক ও উপকার লাভের’ হেদায়াত। দ্বিতীয়টি হ’লهداية التبيين والإرشاد ‘ব্যাখ্যা ও সুপথ প্রদর্শনের’ হেদায়াত।

(৪) আল্লাহ বলেন,شَهِدَ اللهُ أَنَّهُ لآ إِلٰهَ إِلاَّ هُوَ وَالْمَلآئِكَةُ وَأُولُو الْعِلْمِ قَائِمًا بِالْقِسْطِ، ‘আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, তিনি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই। আর ফেরেশতামন্ডলী ও ন্যায়নিষ্ঠ জ্ঞানীগণও’ (আলে ইমরান-মাদানী ৩/১৮)। অন্যত্র তিনি বলেন, إِنَّ هَذَا لَهُوَ الْقَصَصُ الْحَقُّ وَمَا مِنْ إِلٰهٍ إِلاَّ اللهُ، ‘নিশ্চয় এটিই হ’ল যথার্থ বিবরণ। বস্ত্তত আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই’ (আলে ইমরান-মাদানী ৩/৬২)। পক্ষান্তরে আল্লাহ বলেন, فَلاَ تَدْعُ مَعَ اللهِ إِلَهًا آخَرَ، ‘অতএব তুমি আল্লাহর সাথে অন্য উপাস্যকে আহবান করোনা’ (শো‘আরা-মাক্কী ২৬/২১৩)। অন্যত্র তিনি বলেন,فَمَا أَغْنَتْ عَنْهُمْ اٰلِهَتُهُمُ الَّتِي يَدْعُونَ مِنْ دُونِ اللهِ مِنْ شَيْءٍ، ‘অথচ যখন তোমার পালনকর্তার নির্দেশ এসে গেল, তখন তাদের উপাস্যরা তাদের কোন কাজে আসেনি যাদেরকে তারা ডাকত আল্লাহকে ছেড়ে’ (হূদ-মাক্কী ১১/১০১)।

প্রথম দু’টি আয়াতে আল্লাহ ব্যতীত অন্যের উলূহিয়াত নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পরের দু’টি আয়াতে অন্যের জন্য উলূহিয়াত সিদ্ধ করা হয়েছে। উভয়ের সমন্বয় এই যে, প্রথম দু’টিতে উলূহিয়াতকে আল্লাহর সত্য উলূহিয়াতের সাথে খাছ করা হয়েছে। শেষের দু’টিতে মিথ্যা উলূহিয়াত সাব্যস্ত করা হয়েছে। যেমন আল্লাহ বলেন,ذَلِكَ بِأَنَّ اللهَ هُوَ الْحَقُّ وَأَنَّ مَا يَدْعُونَ مِنْ دُونِهِ هُوَ الْبَاطِلُ، ‘এটা একারণেও যে, কেবলমাত্র আল্লাহই সত্য এবং তিনি ব্যতীত যাকে তারা ডাকে সবই মিথ্যা’ (হজ্জ-মাদানী ২২/৬২)।

(৫) আল্লাহ বলেন, قُلْ إِنَّ اللهَ لاَ يَأْمُرُ بِالْفَحْشَاءِ، ‘তুমি বল, আল্লাহ কখনো অশ্লীল কাজের নির্দেশ দেন না’ (আ‘রাফ-মাক্কী ৭/২৮)। অন্যত্র তিনি বলেন,وَإِذَا أَرَدْنَا أَنْ نُهْلِكَ قَرْيَةً أَمَرْنَا مُتْرَفِيهَا فَفَسَقُوا فِيهَا، ‘যখন আমরা কোন জনপদকে ধ্বংস করার ইচ্ছা করি, তখন আমরা সেখানকার নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের নির্দেশ দেই। তখন তারা সেখানে পাপাচারে মেতে ওঠে’ (ইসরা-মাক্কী ১৭/১৬)।

প্রথমোক্ত আয়াতে আল্লাহ ফাহেশা কাজে নির্দেশ দেননা বলা হয়েছে। কিন্তু দ্বিতীয় আয়াতের প্রকাশ্য অর্থে বুঝা যায় যে, আল্লাহ ফাসেকী কাজের নির্দেশ দেন। উভয় আয়াতের সমন্বয় এই যে, প্রথম আয়াতে ‘শারঈ বিধান’ প্রদত্ত হয়েছে। যেমন তিনি বলেছেন,إِنَّ اللهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالْإِحْسَانِ وَإِيتَاءِ ذِي الْقُرْبَى وَيَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنْكَرِ وَالْبَغْيِ، ‘নিশ্চয় আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা, সদাচরণ এবং আত্মীয়-স্বজনকে দান করার নির্দেশ দেন এবং অশ্লীলতা, অন্যায় ও অবাধ্যতা হ’তে নিষেধ করেন’ (নাহল-মাক্কী ১৬/৯০)। দ্বিতীয় আয়াতে আল্লাহর الأمر الكوني বা ‘সার্বজনীন বিধান’ বর্ণিত হয়েছে। যেমন তিনি বলেন,إِنَّمَا أَمْرُهُ إِذَا أَرَادَ شَيْئًا أَنْ يَقُولَ لَهُ كُنْ فَيَكُونُ- ‘যখন তিনি কিছু করতে ইচ্ছা করেন তখন তাকে কেবল বলেন, হও। অতঃপর তা হয়ে যায়’ (ইয়াসীন-মাক্কী ৩৬/৮২)। অতএব উভয় আয়াতের মধ্যে কোন বিরোধ নেই।

(৬) আল্লাহ বলেন,وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ- ‘যারা আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী বিচার বা শাসন করেনা, তারা কাফের’ (মায়েদাহ ৫/৪৪)। এর পরে ৪৫ আয়াতে রয়েছে ‘তারা যালেম’ এবং ৪৭ আয়াতে রয়েছে, ‘তারা ফাসেক’। একই অপরাধের তিন রকম পরিণতি : কাফের, যালেম ও ফাসেক। উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় আব্দুল্লাহ ইবনু আববাস (রাঃ) বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর নাযিলকৃত বিধানকে অস্বীকার করল সে কাফের। আর যে ব্যক্তি তা স্বীকার করল, কিন্তু সে অনুযায়ী বিচার করল না সে যালেম ও ফাসেক। সে ইসলামের গন্ডী থেকে বহির্ভূত নয়’।

(৭) আল্লাহ বলেন, قَالَ مَا مَنَعَكَ أَلاَّ تَسْجُدَ إِذْ أَمَرْتُكَ، ‘আল্লাহ বললেন, আমি যখন তোমাকে নির্দেশ দিলাম, তখন কোন্ বস্ত্ত তোমাকে বাধা দিল যে তুমি সিজদা করলে না?’ (আ‘রাফ-মাক্কী ৭/১২)। অথচ অন্যত্র এসেছে,مَا مَنَعَكَ أَنْ تَسْجُدَ لِمَا خَلَقْتُ بِيَدَيَّ ‘আমি যাকে আমার দু’হাত দিয়ে সৃষ্টি করেছি, তাকে সিজদা করতে কোন বস্ত্ত তোমাকে বাধা দিল? (ছোয়াদ-মাক্কী ৩৮/৭৫)। প্রথম আয়াতে لاَ শব্দটি ‘অতিরিক্ত’ হিসাবে এসেছে। যেমনটি এসেছে সূরা বালাদে।لاَ أُقْسِمُ بِهَذَا الْبَلَدِ ‘আমি শপথ করছি এই নগরীর’ (বালাদ-মাক্কী ৯০/১)। অর্থ أنا أقسم بهذا البلد ‘আমি এই নগরীর শপথ করে বলছি’। বাক্যের শুরুতে لاَ ‘না’ বোধক নয়। বরং ‘অতিরিক্ত’ হিসাবে আনা হয়েছে তম্বীহ ও তাকীদের জন্য এবং প্রতিপক্ষের ভ্রান্ত ধারণা জোরালোভাবে খন্ডন করার জন্য।

(৮) আল্লাহ বলেন, فَيَوْمَئِذٍ لَا يُسْأَلُ عَنْ ذَنْبِهِ إِنْسٌ وَلَا جَانٌّ- ‘সেদিন মানুষ ও জিন তাদের অপরাধ সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে না’ (রহমান-মাক্কী ৫৫/৩৯)। অন্যত্র বলা হয়েছে,وَإِذَا الْمَوْءُودَةُ سُئِلَتْ- ‘যেদিন জীবন্ত প্রোথিত কন্যা সন্তান জিজ্ঞাসিত হবে’ (তাকভীর-মাক্কী ৮১/৮)। এর অর্থالإستخبار والإستعلام ‘খবর নেওয়া’ এবং ‘কারণ কি সে বিষয়ে জ্ঞাত হওয়া’ (শানক্বীত্বী)। নিরপরাধ মযলূম মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করার অর্থ হ’ল যালেম পিতা-মাতাকে তার সামনে ধিক্কার দেওয়া। অথবা হত্যাকারীকে মেয়েটির সামনে ডেকে এনে ধমক দিয়ে বলা হবে, তুমি বলো, কেন মেয়েটি নিহত হ’ল? (ক্বাসেমী)।

(৯) আল্লাহ বলেন, قَالَ أَنْظِرْنِي إِلَى يَوْمِ يُبْعَثُونَ- قَالَ إِنَّكَ مِنَ الْمُنْظَرِينَ ‘সে বলল, আমাকে পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত অবকাশ দিন’। ‘আল্লাহ বললেন, তোমাকে অবকাশ দেওয়া হ’ল’ (আ‘রাফ-মাক্কী ৭/১৪-১৫)। অন্যত্র বলা হয়েছে,إِلَى يَوْمِ الْوَقْتِ الْمَعْلُومِ- ‘অবধারিত সময় উপস্থিত হওয়ার দিন পর্যন্ত’ (হিজর-মাক্কী ১৫/৩৮)। অধিকাংশ বিদ্বানগণের মতে এর অর্থ হ’ল ক্বিয়ামতের দিন প্রথম শিঙ্গায় ফুঁক দেওয়া (শানক্বীত্বী)।

(১০) আল্লাহ বলেন,وَإِذَا فَعَلُوا فَاحِشَةً قَالُوا وَجَدْنَا عَلَيْهَا آبَاءَنَا، ‘যখন তারা কোন অশ্লীল কর্ম করে তখন বলে, আমরা আমাদের পূর্ব পুরুষদের এরূপ করতে দেখেছি’ (আ‘রাফ-মাক্কী ৭/২৮)। কাফেররা তাদের অশ্লীল কর্মের পক্ষে এভাবে দলীল দিত। এটি ছিল তাদের তাক্বলীদী গোঁড়ামী বা অন্ধ অনুসরণ মাত্র। যেমনটি আল্লাহ অন্যত্র বলেন,إِنَّهُمْ أَلْفَوْا آبَاءَهُمْ ضَالِّينَ- فَهُمْ عَلَى آثَارِهِمْ يُهْرَعُونَ- ‘তারা তাদের বাপ-দাদাদের পেয়েছিল পথভ্রষ্ট রূপে’। ‘ফলে তারা তাদের পদাংক অনুসরণের প্রতি দ্রুত ধাবিত হয়েছিল’ (ছাফফাত-মাক্কী ৩৭/৬৯-৭০)।

(১১) আল্লাহ বলেন,أَلَمْ يَرَوْا أَنَّهُ لاَ يُكَلِّمُهُمْ وَلاَ يَهْدِيهِمْ سَبِيلاً اتَّخَذُوهُ وَكَانُوا ظَالِمِينَ- ‘অথচ তারা কি দেখে না যে সে তাদের সাথে কথা বলে না এবং তাদের কোন পথও দেখায় না? তারা সেটিকে উপাস্য বানিয়ে নিল। বস্ত্তত তারা ছিল সীমালংঘনকারী’ (আ‘রাফ-মাক্কী ৭/১৪৮)। অত্র আয়াতে মূসা (আঃ)-এর কওমের গোবৎস পূজার বিরুদ্ধে ধিক্কার দেওয়া হয়েছে। যেমন আল্লাহ পরের আয়াতেই বলেছেন,وَلَمَّا سُقِطَ فِي أَيْدِيهِمْ وَرَأَوْا أَنَّهُمْ قَدْ ضَلُّوا قَالُوا لَئِنْ لَمْ يَرْحَمْنَا رَبُّنَا وَيَغْفِرْ لَنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ- ‘আর যখন তারা তাদের কৃতকর্মের কারণে লজ্জিত হ’ল এবং দেখল যে, তারা নিশ্চিতভাবেই পথভ্রষ্ট হয়েছে, তখন তারা বলল, আমাদের প্রতিপালক যদি আমাদের প্রতি অনুগ্রহ না করেন এবং আমাদের ক্ষমা না করেন, তাহ’লে অবশ্যই আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব’ (আ‘রাফ-মাক্কী ৭/১৪৯)। অন্য আয়াতে আল্লাহ স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, أَلَمْ يَعِدْكُمْ رَبُّكُمْ وَعْدًا حَسَنًا أَفَطَالَ عَلَيْكُمُ الْعَهْدُ أَمْ أَرَدْتُمْ أَنْ يَحِلَّ عَلَيْكُمْ غَضَبٌ مِنْ رَبِّكُمْ فَأَخْلَفْتُمْ مَوْعِدِي- قَالُوا مَا أَخْلَفْنَا مَوْعِدَكَ بِمَلْكِنَا، ‘তোমাদের প্রতিপালক কি তোমাদেরকে এক উত্তম প্রতিশ্রুতি দেননি? তবে কি প্রতিশ্রুতির সময়কাল তোমাদের নিকট দীর্ঘ হয়ে গেছে? না কি তোমরা চেয়েছ যে, তোমাদের উপর তোমাদের প্রতিপালকের ক্রোধ অবধারিত হয়ে যাক। যে কারণে তোমরা আমার সাথে অঙ্গীকার ভঙ্গ করলে? (৮৫)। ‘তারা বলল, আমরা আপনার নিকট কৃত অঙ্গীকার স্বেচ্ছায় ভঙ্গ করিনি’ (ত্বোয়াহা-মাক্কী ২০/৮৫-৮৬)।

তাদের লজ্জিত হওয়ার পর গোবৎস পূজার শাস্তি হিসাবে আল্লাহ নাযিল করেন। যেমন তিনি বলেন,وَإِذْ قَالَ مُوسَى لِقَوْمِهِ يَاقَوْمِ إِنَّكُمْ ظَلَمْتُمْ أَنْفُسَكُمْ بِاتِّخَاذِكُمُ الْعِجْلَ فَتُوبُوا إِلَى بَارِئِكُمْ فَاقْتُلُوا أَنْفُسَكُمْ ذَلِكُمْ خَيْرٌ لَكُمْ عِنْدَ بَارِئِكُمْ فَتَابَ عَلَيْكُمْ إِنَّهُ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ- ‘আর (স্মরণ কর) যখন মূসা তার সম্প্রদায়কে বলল, হে আমার সম্প্রদায়! নিশ্চয়ই তোমরা গোবৎস পূজার মাধ্যমে নিজেদের উপর যুলুম করেছ। অতএব এখন তোমরা তোমাদের সৃষ্টিকর্তার নিকট তওবা কর এবং (শাস্তি স্বরূপ) পরস্পরকে হত্যা কর। এটাই তোমাদের জন্য কল্যাণকর তোমাদের সৃষ্টিকর্তার নিকট। অতঃপর তিনি তোমাদের তওবা কবুল করলেন। নিশ্চয়ই তিনি সর্বাধিক তওবা কবুলকারী ও দয়াবান’ (বাক্বারাহ-মাদানী ২/৫৪)।

কেবল মূসা (আঃ)-এর কওমের গোবৎস পূজারীরা নয়, বরং প্রাচীন ও বর্তমান যুগের সকল মূর্তিপূজারী, কবরপূজারী, ভাষ্কর্যপূজারী, ছবি ও প্রতিকৃতি পূজারী সকলের অবস্থা একই। বর্তমান যুগে সভ্যতার সর্বোচ্চ স্তরে এসেও নামধারী জ্ঞানী মানুষদের ধিক্কার দিয়ে কবি ‘আমর বিন মা‘দীকারিব (হি. পূ ৭৫-২১ হি.) বলেন,

لقد أسمعتَ لو ناديتَ حَيًّا + ولكن لا حياة لمن تنادي

ولو نارا نفختَ بها أضاءتْ+ ولكن أنتَ تنفخُ في الرماد

‘যদি তুমি জীবিত ব্যক্তিকে ডাকতে, তাহ’লে তুমি তাকে শুনাতে পারতে + কিন্তু যাকে তুমি ডাকছ তার কোন প্রাণ নেই’। ‘যদি তুমি আগুনে ফুঁক দিতে তাহ’লে সে আলো দিত + কিন্তু তুমি ফুঁক দিচ্ছ ছাইয়ের মধ্যে’।

(১২) আল্লাহ বলেন, فَلَنَقُصَّنَّ عَلَيْهِمْ بِعِلْمٍ وَمَا كُنَّا غَائِبِينَ- ‘অতঃপর আমরা তাদের নিকট সবকিছু বর্ণনা করব পূর্ণজ্ঞান সহকারে। আর আমরা তো তাদের থেকে অনুপস্থিত ছিলাম না’ (আ‘রাফ-মাক্কী ৭/১৪৯)। অন্যত্র আল্লাহ বলেছেন,وَمَا تَكُونُ فِي شَأْنٍ وَمَا تَتْلُو مِنْهُ مِنْ قُرْآنٍ وَلَا تَعْمَلُونَ مِنْ عَمَلٍ إِلَّا كُنَّا عَلَيْكُمْ شُهُودًا إِذْ تُفِيضُونَ فِيهِ وَمَا يَعْزُبُ عَنْ رَبِّكَ مِنْ مِثْقَالِ ذَرَّةٍ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي السَّمَاءِ وَلَا أَصْغَرَ مِنْ ذَلِكَ وَلَا أَكْبَرَ إِلَّا فِي كِتَابٍ مُبِينٍ- ‘আর যে অবস্থায় তুমি থাক না কেন, কিংবা যে প্রেক্ষিতে তুমি কুরআনের কোন অংশ পাঠ কর না কেন এবং যে কাজই তোমরা কর না কেন, আমরা সেখানে হাযির থাকি যখন তোমরা সে কাজে রত হও। বস্ত্তত নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের এক কণা পরিমাণও তোমার প্রতিপালকের অগোচরে নেই। তার চাইতে ছোট বা বড় সকল বস্ত্তই স্পষ্ট কিতাবে (লওহে মাহফূযে) লিপিবদ্ধ রয়েছে’ (ইউনুস-মাক্কী ১০/৬১)। অত্র আয়াত এবং অন্যান্য বহু আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ জানিয়ে দিয়েছেন যে, তিনি বান্দার গোপন ও প্রকাশ্য ছোট ও বড় সককিছুর পূর্ণ খবর রাখেন। তার জানার বাইরে বান্দা কিছুই করতে পারেন না। তিনি সৃষ্টি জগতের সব কিছুর ব্যাপারে সদা প্রহরী। কেবল লওহে মাহফূযে লিপিবদ্ধ রয়েছে তা নয়, বরং সর্বদা যখনই বান্দা কোন কাজ করে, তখনই আল্লাহ সেখানে হাযির থাকেন এবং তা জানতে পারেন। অত্র আয়াতে আল্লাহ তার ‘ইলম’ গুণকে নিজের জন্য সাব্যস্ত করেছেন।

মু‘তাযিলা সম্প্রদায়

অত্র আয়াতে মু‘তাযিলাদের ভ্রান্ত আক্বীদার প্রতিবাদ রয়েছে। যারা আল্লাহর গুণাবলীকে অস্বীকার করেন। একইভাবে তারা আল্লাহর ক্বাদের, মুরীদ, সামী‘, বাছীর, মুতাকাল্লিম সকলগুণকে অস্বীকার করেন। অথচ এগুলি অত্র আয়াতে এবং অন্যান্য আয়াতে তিনি নিজের জন্য সাব্যস্ত করেছেন।

(১৩) আল্লাহ বলেন,وَلَقَدْ مَكَّنَّاكُمْ فِي الْأَرْضِ وَجَعَلْنَا لَكُمْ فِيهَا مَعَايِشَ قَلِيلاً مَا تَشْكُرُونَ- ‘আর আমরা তোমাদেরকে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত করেছি এবং তোমাদের জন্য সেখানে জীবিকা সমূহ প্রদান করেছি। কিন্তু তোমরা খুব কমই কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে থাক’ (আ‘রাফ-মাক্কী ৭/১০)। অত্র আয়াতে জীবিকার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ব্যাখ্যা এসেছে অন্যান্য আয়াতে। যেমন আল্লাহ বলেন,فَلْيَنْظُرِ الْإِنْسَانُ إِلَى طَعَامِهِ- أَنَّا صَبَبْنَا الْمَاءَ صَبًّا- ثُمَّ شَقَقْنَا الْأَرْضَ شَقًّا- فَأَنْبَتْنَا فِيهَا حَبًّا- وَعِنَبًا وَقَضْبًا- وَزَيْتُونًا وَنَخْلًا- وَحَدَائِقَ غُلْبًا- وَفَاكِهَةً وَأَبًّا- مَتَاعًا لَكُمْ وَلِأَنْعَامِكُمْ- ‘অতঃপর মানুষ লক্ষ্য করুক তার খাদ্যের দিকে’ (২৪)। ‘আমরাই প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করি’ (২৫)। ‘অতঃপর ভূমিকে উত্তমভাবে বিদীর্ণ করি’ (২৬)। ‘অতঃপর তাতে উৎপন্ন করি খাদ্য-শস্য’ (২৭)। ‘আঙ্গুর ও শাক-সবজি’ (২৮)। ‘যায়তূন ও খর্জুর’ (২৯)। ‘ঘন পল্লবিত উদ্যানরাজি’ (৩১)। ‘এবং ফল-মূল ও ঘাস-পাতা’ (৩১)। ‘তোমাদের ও তোমাদের গবাদিপশুর ভোগ্যবস্ত্ত হিসাবে’ (‘আবাসা-মাক্কী ৮০/২৪-৩২)। অন্য আয়াতে এসেছে,وَالْأَنْعَامَ خَلَقَهَا لَكُمْ فِيهَا دِفْءٌ وَمَنَافِعُ وَمِنْهَا تَأْكُلُونَ- ‘তিনি গবাদিপশু সৃষ্টি করেছেন। তাতে তোমাদের জন্য শীত নিবারণের উপকরণ ও অন্যান্য কল্যাণ রয়েছে এবং সেসব থেকে তোমরা ভক্ষণ করে থাকো’ (নাহল-মাক্কী ১৬/৫)। রয়েছে মৌমাছি থেকে মানুষের জন্য খাদ্য সরবরাহের চমৎকার বিবরণ। যেমন আল্লাহ বলেন,وَأَوْحَى رَبُّكَ إِلَى النَّحْلِ أَنِ اتَّخِذِي مِنَ الْجِبَالِ بُيُوتًا وَمِنَ الشَّجَرِ وَمِمَّا يَعْرِشُونَ- ثُمَّ كُلِي مِنْ كُلِّ الثَّمَرَاتِ فَاسْلُكِي سُبُلَ رَبِّكِ ذُلُلاً يَخْرُجُ مِنْ بُطُونِهَا شَرَابٌ مُخْتَلِفٌ أَلْوَانُهُ فِيهِ شِفَاءٌ لِلنَّاسِ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَةً لِقَوْمٍ يَتَفَكَّرُونَ- ‘আর তোমার প্রতিপালক মৌমাছিকে প্রত্যাদেশ করলেন যে, তুমি তোমার গৃহ নির্মাণ কর পাহাড়ে, গাছে ও যেখানে মানুষ মাচান নির্মাণ করে’ (৬৮)। ‘অতঃপর তুমি সর্বপ্রকার ফল-মূল হ’তে ভক্ষণ কর। এরপর তোমার প্রভুর দেখানো পথ সমূহে প্রবেশ কর বিনীত ভাবে। তার পেট থেকে নির্গত হয় নানা রংয়ের পানীয়। যার মধ্যে মানুষের জন্য রয়েছে আরোগ্য। নিশ্চয়ই এর মধ্যে নিদর্শন রয়েছে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য’ (নাহল-মাক্কী ১৬/৬৮-৬৯)।

(১৪) ইবলীসের জওয়াব উল্লেখ করে আল্লাহ বলেন,قَالَ أَنَا خَيْرٌ مِنْهُ خَلَقْتَنِي مِنْ نَارٍ وَخَلَقْتَهُ مِنْ طِينٍ- ‘সে বলল, আমি তার চেয়ে উত্তম। আপনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন আগুন থেকে এবং তাকে সৃষ্টি করেছেন মাটি থেকে’ (আ‘রাফ-মাক্কী ৭/১২)। অন্যত্র আল্লাহ বলেন,وَخَلَقَ الْجَانَّ مِنْ مَارِجٍ مِنْ نَارٍ- ‘এবং জিনকে সৃষ্টি করেছেন অগ্নিস্ফুলিঙ্গ হ’তে’ (রহমান-মাক্কী ৫৫/১৫)। ‘অগ্নিস্ফুলিঙ্গ’ কথাটি কেবল ‘আগুন’ হ’তে বিশেষ বৈশিষ্ট্য মন্ডিত। অতএব দু’টি পৃথক। যা থেকে জিন জাতিকে সৃষ্টি করা হয়েছে।

(১৫) আল্লাহ বলেন,قَالَ فَاهْبِطْ مِنْهَا فَمَا يَكُونُ لَكَ أَنْ تَتَكَبَّرَ فِيهَا فَاخْرُجْ إِنَّكَ مِنَ الصَّاغِرِينَ- ‘আল্লাহ বললেন, এখান থেকে তুমি নেমে যাও। এখানে তুমি অহংকার করবে, তা হবে না। অতএব তুমি বেরিয়ে যাও। তুমি লাঞ্ছিতদের অন্তর্ভুক্ত’ (আ‘রাফ-মাক্কী ৭/১৩)। الصغار বা ‘লাঞ্ছনা’ কথাটিالذل والهوان বা ‘দীনতা’ ও ‘হীনতা’ হ’তে কঠিন। এর দ্বারা ‘নেমে যাও’ আদেশটির কঠোরতা ব্যাখ্যা করা হয়েছে। যেমন অন্য আয়াতে এসেছে,قَالَ اخْرُجْ مِنْهَا مَذْءُومًا مَدْحُورًا لَمَنْ تَبِعَكَ مِنْهُمْ لَأَمْلَأَنَّ جَهَنَّمَ مِنْكُمْ أَجْمَعِينَ- ‘আল্লাহ বললেন, তুমি এখান থেকে বেরিয়ে যাও ধিকৃত ও বিতাড়িত অবস্থায়। তাদের মধ্যে যারা তোমার অনুসরণ করবে, নিশ্চয়ই আমি তোমাদের সকলকে দিয়ে জাহান্নাম পূর্ণ করব’ (আ‘রাফ-মাক্কী ৭/১৮)। অত্র আয়াতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, অহংকারী ব্যক্তি তার কাম্যবস্ত্ত বড়ত্ব ও অহমিকা কখনই অর্জন করতে পারবে না। বরং সে তার বিপরীতটিই পাবে। যেমন আল্লাহ বলেছেন,أَلَيْسَ فِي جَهَنَّمَ مَثْوًى لِلْمُتَكَبِّرِينَ- ‘বস্ত্তত দাম্ভিকদের ঠিকানা কি জাহান্নামে নয়? (যুমার-মাক্কী ৩৯/৬০)।

(১৬) আল্লাহ বলেন,يَابَنِي آدَمَ لاَ يَفْتِنَنَّكُمُ الشَّيْطَانُ كَمَا أَخْرَجَ أَبَوَيْكُمْ مِنَ الْجَنَّةِ، ‘হে আদম সন্তান! শয়তান যেন তোমাদেরকে বিভ্রান্ত না করে। যেমন সে তোমাদের আদি পিতা-মাতাকে জান্নাত থেকে বের করেছিল’ (আ‘রাফ-মাক্কী ৭/২৭)। অন্যত্র আল্লাহ বলেন, فَقُلْنَا يَاآدَمُ إِنَّ هَذَا عَدُوٌّ لَكَ وَلِزَوْجِكَ فَلَا يُخْرِجَنَّكُمَا مِنَ الْجَنَّةِ فَتَشْقَى- ‘অতঃপর আমরা বললাম, হে আদম! এটি তোমার ও তোমার স্ত্রীর শত্রু। অতএব সে যেন কিছুতেই তোমাদেরকে জান্নাত থেকে বের না করে দেয়। তাহ’লে তুমি কষ্টে পতিত হবে’ (ত্বোয়াহা-মাক্কী ২০/১১৭)। প্রথম আয়াতে আদম সন্তান এবং পরের আয়াতে আদম বলে একই বিষয়ে বান্দাকে সাবধান করা হয়েছে। আর সেটি হ’ল শয়তানের ধোঁকা থেকে বেঁচে থাকা। যেটাতে আদম ব্যর্থ হয়েছে। তাকে আগেই সতর্ক করা সত্ত্বে সে সতর্ক হ’তে পারেনি। বান্দা যেন শয়তান থেকে সাবধান হয়।

(১৭) আল্লাহ বলেন,وَأَخَذَ بِرَأْسِ أَخِيهِ يَجُرُّهُ إِلَيْهِ قَالَ ابْنَ أُمَّ إِنَّ الْقَوْمَ اسْتَضْعَفُونِي، ‘এবং তার ভাইয়ের মাথা ধরে নিজের দিকে টানতে লাগল। তখন ভাই বলল, হে আমার সহোদর! সম্প্রদায়ের লোকেরা আমাকে দুর্বল ভেবেছিল’ (আ‘রাফ-মাক্কী ৭/১৫০)। অত্র আয়াতের ব্যাখ্যা অন্য আয়াতে এসেছে। যেমন আল্লাহ বলেন,وَلَقَدْ قَالَ لَهُمْ هَارُونُ مِنْ قَبْلُ يَاقَوْمِ إِنَّمَا فُتِنْتُمْ بِهِ وَإِنَّ رَبَّكُمُ الرَّحْمَنُ فَاتَّبِعُونِي وَأَطِيعُوا أَمْرِي- قَالُوا لَنْ نَبْرَحَ عَلَيْهِ عَاكِفِينَ حَتَّى يَرْجِعَ إِلَيْنَا مُوسَى- ‘আর অবশ্যই হারূণ তাদের আগেই বলেছিল, হে আমার সম্প্রদায়! এর দ্বারা তোমরা একটা পরীক্ষায় পতিত হয়েছ। তোমাদের প্রতিপালক দয়াময়। অতএব তোমরা আমার অনুসরণ কর এবং আমার আদেশ মেনে চল’ (৯০)। তারা বলল, মূসা আমাদের নিকট ফিরে না আসা পর্যন্ত আমরা এর পূজাতেই লেগে থাকব’ (ত্বোয়াহা-মাক্কী ২০/৯০-৯১)। অত্র আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ বনু ইস্রাঈলের পথভ্রষ্টতার ব্যাপারে নবী হারূণ (আঃ)-এর নিষ্পাপত্ব ও দায়মুক্তি বর্ণনা করেছেন।

(১৮) আল্লাহ বলেন,قُلْ يَاأَيُّهَا النَّاسُ إِنِّي رَسُولُ اللهِ إِلَيْكُمْ جَمِيعًا، ‘তুমি বল, হে মানবজাতি! আমি তোমাদের সকলের প্রতি আল্লাহর প্রেরিত রাসূল’ (আ‘রাফ-মাক্কী ৭/১৫৮)। এর দ্বারা শেষনবী (ছাঃ)-এর রিসালাতকে তৎকালীন আরবসহ আহলে কিতাবদের জন্য শামিল করা হয়েছে। যেমন অন্য আয়াতে তার ব্যাখ্যা এসেছে,وَقُلْ لِلَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ وَالْأُمِّيِّينَ أَأَسْلَمْتُمْ فَإِنْ أَسْلَمُوا فَقَدِ اهْتَدَوْا وَإِنْ تَوَلَّوْا فَإِنَّمَا عَلَيْكَ الْبَلَاغُ، ‘আর তুমি আহলে কিতাব ও (মুশরিক) উম্মীদের বল, তোমরা কি ইসলাম কবুল করলে? যদি করে, তবে তারা সরল পথ প্রাপ্ত হ’ল। আর যদি মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাহ’লে তোমার দায়িত্ব কেবল পৌঁছে দেওয়া’ (আলে ইমরান-মাদানী ৩/২০)। অন্য আয়াতে তার রিসালাত পৌঁছার সাথে সাথে কুরআন পৌঁছার কথা বলা হয়েছে। যেমন আল্লাহ বলেন,وَأُوحِيَ إِلَيَّ هَذَا الْقُرْآنُ لِأُنْذِرَكُمْ بِهِ وَمَنْ بَلَغَ، ‘আর আমার নিকট অহি করা হয়েছে এই কুরআন, যাতে এর দ্বারা আমি সতর্ক করি তোমাদের ও যাদের নিকট এটি পৌঁছবে’ (আন‘আম-মাক্কী ৬/১৯)। এর দ্বারা পৃথিবীর যে কোন প্রান্তে যে কোন রং, বর্ণ, ভাষা ও অঞ্চলের মানুষের জন্য কুরআন একমাত্র এলাহী গ্রন্থ এবং শেষনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ) একমাত্র রাসূল হিসাবে আল্লাহর পক্ষ থেকে মনোনীত হয়েছেন।

(১৯) আল্লাহ বলেন,وَمَا كُنَّا مُعَذِّبِينَ حَتَّى نَبْعَثَ رَسُولاً- ‘আর আমরা রাসূল না পাঠানো পর্যন্ত কাউকে শাস্তি দেই না’ (বনু ইস্রাঈল-মাক্কী ১৭/১৫)। অত্র আয়াতে বলা হয়েছে যে, প্রত্যেক জাতির নিকট নবী পৌঁছেছেন এবং তাদেরকে জাহান্নাম থেকে সতর্ক করেছেন। অথচ আল্লাহ অন্যত্র বলেছেন, وَكَذَلِكَ جَعَلْنَا فِي كُلِّ قَرْيَةٍ أَكَابِرَ مُجْرِمِيهَا لِيَمْكُرُوا فِيهَا وَمَا يَمْكُرُونَ إِلَّا بِأَنْفُسِهِمْ وَمَا يَشْعُرُونَ- ‘আর এভাবেই আমরা প্রত্যেক জনপদের শীর্ষ পাপীদের অনুমতি দেই যাতে তারা সেখানে চক্রান্ত করে। অথচ এর দ্বারা তারা কেবল নিজেদেরকেই প্রতারিত করে। কিন্তু তারা তা বুঝতে পারে না’ (আন‘আম-মাক্কী ৬/১২৩)। একদিকে আল্লাহ রাসূল পাঠাচ্ছেন, অন্যদিকে সেখানকার শীর্ষ পাপীদের পাপ কাজের অনুমতি দিচ্ছেন। এর অর্থ অনুমতি নয়, বরং পাপীদের পরীক্ষা করা। এজন্যেই বলা হয়ে থাকে, لِكُلِّ فِرْعَوْنَ مُوسَى ‘প্রত্যেক ফেরাউনের জন্য মূসা রয়েছেন’।[1] যারা ফেরাউনদের উপদেশ দেন। যাতে তারা আল্লাহর পথে ফিরে আসে। যেমন আল্লাহ বলেন,وَلَنُذِيقَنَّهُمْ مِنَ الْعَذَابِ الْأَدْنَى دُونَ الْعَذَابِ الْأَكْبَرِ لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ- ‘আর অবশ্যই আমরা তাদেরকে (আখেরাতে) কঠিন শাস্তির পূর্বে (দুনিয়াতে) লঘু শাস্তির স্বাদ আস্বাদন করাবো। যাতে তারা (আল্লাহর পথে) ফিরে আসে’ (সাজদাহ-মাক্কী ৩২/২১)।

শেষনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ) এসেছিলেন বিশ্বনবী হিসাবে ক্বিয়ামত অবধি বিশ্বের সকল মানুষের নিকটে। এমতাবস্থায় যদি কেউ তার নবুঅত ও রিসালাতকে অস্বীকার করে এবং ইসলামকে অমান্য করে, সে জাহান্নামী হবে। যেমন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,وَالَّذِى نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ لاَ يَسْمَعُ بِى أَحَدٌ مِّنْ هٰذِهِ الأُمَّةِ يَهُودِىٌّ وَلاَ نَصْرَانِىٌّ ثُمَّ يَمُوتُ وَلَمْ يُؤْمِنْ بِالَّذِى أُرْسِلْتُ بِهِ إِلاَّ كَانَ مِنْ أَصْحَابِ النَّارِ- ‘যাঁর হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ তাঁর কসম করে বলছি, ইহূদী হৌক বা নাছারা হৌক এই উম্মতের যে কেউ আমার আগমনের খবর শুনেছে, অতঃপর মৃত্যুবরণ করেছে, অথচ আমি যা নিয়ে প্রেরিত হয়েছি, তার উপরে ঈমান আনেনি, সে অবশ্যই জাহান্নামবাসীদের অন্তর্ভুক্ত হবে’ (মুসলিম হা/১৫৩; মিশকাত হা/১০)। অতএব কুরআনের উপরোক্ত পরস্পর বিরোধী আয়াত সমূহ আদৌ পরস্পর বিরোধী নয়। বরং পরস্পরের ব্যাখ্যা ও পরিপূরক।

আল্লাহ আমাদেরকে সার্বিক জীবনে তাঁর পূর্ণ অনুসারী হওয়ার তওফীক দিন।-আমীন!

[1]. মিরক্বাত হা/৪৯৮৫-এর আলোচনা, ৮/৩১২৩ পৃ.।