বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান জন্মাষ্টমী উপলক্ষে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির প্রাঙ্গণে আয়োজিত শোভাযাত্রার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বলেছেন, বাংলাদেশে কোনো ধর্ম, জাতি বা গোত্রের ভেদাভেদ থাকবে না। তার ভাষ্যে, “এই দেশ সবার, আমরা সবাই এই দেশের নাগরিক, এবং একসঙ্গে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করব।”
এই বক্তব্য শুধু একটি উৎসব উপলক্ষ্যে শুভেচ্ছা নয়, বরং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক-সামাজিক বাস্তবতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। আগস্ট মাসে জন্মাষ্টমীর শোভাযাত্রা সবসময়ই দেশের ধর্মীয় সম্প্রীতির প্রতীক হয়ে এসেছে। তবে এ বছর সেনাপ্রধানের উপস্থিতি ও বক্তব্য একটি ভিন্ন মাত্রা তৈরি করেছে। রাজনৈতিক পরিবর্তন, অস্থিরতা ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে যে প্রশ্নগুলো জনমনে ঘুরছে, সেসবের প্রেক্ষাপটে তার বার্তা কার্যত রাষ্ট্রীয় নিশ্চয়তার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বলেন, “বাংলাদেশ সম্প্রীতির দেশ। শত শত বছর ধরে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, পাহাড়ি, বাঙালি ও বিভিন্ন উপজাতি জনগোষ্ঠী এখানে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করে আসছে। আমাদের সবার সমান অধিকার রয়েছে এবং সেইভাবেই আমরা ভবিষ্যতের দিকে এগোতে চাই।” তার এই বক্তব্য একদিকে ঐতিহাসিক বহুত্ববাদী চর্চার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থায় সবার নিরাপত্তা ও অংশগ্রহণের প্রতি আস্থাও জোরদার করে।
শুধু প্রতীকী বার্তাতেই থেমে থাকেননি তিনি। সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা প্রসঙ্গে বলেন, “আমাদের অঙ্গীকার হবে শান্তিপূর্ণ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখা। সারা বাংলাদেশে সেনাবাহিনী মোতায়েন রয়েছে। আমরা জনগণের পাশে থাকব এবং এক হয়ে কাজ করে যাব।” এ বক্তব্য স্পষ্ট করে দেয় যে সামরিক নেতৃত্ব বর্তমানে শুধু প্রতিরক্ষা নয়, সামাজিক স্থিতিশীলতাকেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হিসেবে দেখছে।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উদ্দেশে সেনাপ্রধান বলেন, “আপনারা নিশ্চিন্তে এই দেশে বসবাস করবেন এবং ধর্মীয় উৎসব আনন্দের সঙ্গে উদযাপন করবেন। আমরা একসঙ্গে এই আনন্দ ভাগাভাগি করব।” ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও অধিকার নিয়ে দীর্ঘদিনের উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ আশ্বাস।
অনুষ্ঠানে অন্য বাহিনী প্রধানরাও বক্তব্য দেন। বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খান বলেন, শ্রীকৃষ্ণের শিক্ষা ন্যায় ও সত্য প্রতিষ্ঠায় অনুপ্রেরণা যোগায়, স্বাধীনতা রক্ষায় সকলের দায়িত্ব রয়েছে। নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল এম নাজমুল হাসান বলেন, পারস্পরিক সহনশীলতা দেশকে শক্তিশালী করে, শ্রীকৃষ্ণের আদর্শ সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করুক।
শেষে তিন বাহিনী প্রধান প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের মাধ্যমে শোভাযাত্রার উদ্বোধন করেন। রাজধানীর পলাশী মোড় থেকে শুরু হয়ে বাহাদুর শাহ পার্কে গিয়ে শোভাযাত্রাটি শেষ হয়।
জন্মাষ্টমীর এ আয়োজন তাই শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং বহুত্ববাদী বাংলাদেশে সামরিক নেতৃত্বের অবস্থান ও রাষ্ট্রীয় সম্প্রীতির অঙ্গীকার পুনর্নিশ্চিত করার এক প্রকার প্রতীকী মুহূর্ত হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে রইল।
