প্রিয় পাঠক, আশা করি সুস্থ আছেন। উত্তাল চব্বিশের শেষ দিকে উপস্থিত হয়ে আমরা নভেম্বর মাসের এই সময়ে, জুলাই পটপরিবর্তনের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে নানা বড় পরিবর্তন এবং চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি আমাদের দেশের জনগণ। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন, দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা, গার্মেন্টস শিল্পে অশান্তি এবং খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি এ সব কিছুই আমাদের ভাবনায় প্রভাব ফেলছে।
পতিত স্বৈরাচারের কুশীলবদের দিক মাথায় রেখে ও দেশের আভ্যন্তরীণ নীতি এবং জনগণের স্বার্থের কথা মাথায় রেখে, এই পরিবর্তনগুলিকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করা প্রয়োজন। আর সেই সাথে আমাদের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলার বিষয়ে গভীর মনোযোগ দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। গত কয়েক বছরে দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি যেমন অস্থিতিশীল হয়েছে, তেমনি পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর আস্থা কমেছে। জনগণের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কার্যকর ও উন্নত ব্যবস্থা গ্রহণে সরকারের দ্রুত পদক্ষেপ প্রয়োজন।
এর পাশাপাশি, দেশের অন্যতম বড় শিল্প খাত গার্মেন্টস সেক্টরে অশান্তি চলতে থাকা একটি বড় সংকট হিসেবে দাঁড়িয়ে রয়েছে। শ্রমিকদের চলমান আন্দোলন এবং অস্থিরতার কারণে এই সেক্টরের ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মুখে পড়েছে। দেশের অর্থনীতির বৃহত্তর স্বার্থে, এটি জরুরি যে সরকারের পাশাপাশি গার্মেন্টস মালিকরা শ্রমিকদের অধিকার ও শর্তগুলো পুনঃমূল্যায়ন করে, যাতে উৎপাদনশীলতা এবং শৃঙ্খলা বজায় থাকে। এর সঙ্গে যদি মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব যুক্ত হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের জীবনে চাপ বাড়বে, যা জাতীয় অস্থিরতার কারণ হতে পারে। তাই খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রীয় নীতির পরিবর্তন অত্যন্ত জরুরি।
এছাড়া, চব্বিশের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। তাদের আত্মত্যাগের কারণে আজ আমরা স্বাধীন রাষ্ট্রে বাস করছি। স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের জন্য তাদের সংগ্রামের সত্যিকার মূল্যায়ন করতে হবে, যাতে আমরা তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নে একটি সুশাসিত সমাজ গড়তে পারি।
প্রিয় শিক্ষার্থীরা, আপনারাই জাতির ভবিষ্যৎ, জুলাই বিপ্লবের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে আপনাদের দায়িত্বপূর্ণ ভূমিকায় এগিয়ে আসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক স্থিতিশীলতা, ন্যায়বিচার, এবং জাতীয় ঐক্য রক্ষা করতে হলে, আমাদের সবার একযোগ প্রচেষ্টা প্রয়োজন। যদি আমরা সঠিক পথে এগিয়ে যেতে পারি, তবে তা আমাদের দেশকে আরও উন্নত ও সমৃদ্ধ করবে।
পতেঞ্জা নদীর ওপর দাঁড়িয়ে থাকা মুসমেসি সেতু যেন প্রকৃতি, নান্দনিকতা এবং ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের এক অসাধারণ সম্মিলন। এটি কেবল একটি সেতুই নয়, বরং এমন একটি শিল্পকর্ম যা স্থাপত্য ও প্রকৌশলের সীমাকে ছাড়িয়ে প্রকৃতির সঙ্গে গভীর সংযোগ তৈরি করেছে। ‘ভায়াডোত্তো ডেল’ইন্ডাস্ট্রিয়া’ (ইন্ডাস্ট্রি ভায়াডাক্ট) যা ‘বাসেন্টো নদীর উপর সেতু’ বা মুসমেসি ব্রিজ নামেও পরিচিত, এটি পতেঞ্জা , ব্যাসিলিকাটা এবং ইতালিকে সংযুক্ত করেছে।
এই সেতুর মাধ্যমে মুসমেসি স্থাপত্যের এক নতুন ধারার সূচনা করেন, যা পরিচিত হয় ‘প্যারামেট্রিজম’ নামে। প্রকৃতি থেকে অনুপ্রাণিত হলেও এই ধারার ডিজাইন সম্পূর্ণ মানুষের ব্যবহারের জন্য নির্মিত। যদিও এতে খরচ কিছুটা বেশি হয়, তবে যা তৈরি হয়, তা একদমই অন্যরকম। মুসমেসি সেতু তাই কেবল একটি স্থাপনা নয়, বরং প্রকৃতি ও মানুষের সৃজনশীলতার এক অনন্য মেলবন্ধন।
মুসমেসি সেতু পৃথিবীর অন্যতম সুন্দর সেতুগুলোর একটি। ১৯৬৭ সালে এটি ডিজাইন করেছিলেন প্রতিভাবান ইঞ্জিনিয়ার সার্জিও মুসমেসি, এবং নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয় ১৯৭১ থেকে ১৯৭৬ সালের মধ্যে। চমৎকার এই সেতুটি দাঁড়িয়ে আছে দুইবার ভাঁজ হওয়া একটি প্যাঁচানো কংক্রিট কলামের ওপর, যার গভীরতা মাত্র ৩০ সেন্টিমিটার বা ১ ফুট। ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে লোড ডিস্ট্রিবিউশন ও স্ট্রেস ডাইনামিকস শব্দ দুটি প্রায়ই ব্যবহৃত হয়। এই সেতুতে সেই লোড ডিস্ট্রিবিউশন দক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন হয়েছে কলামের অনন্য আকৃতির মাধ্যমে।
মুসমেসি সেতুটি ডিজাইন করেছেন একটি ব্যতিক্রমী ভি-আকৃতির কলামের মাধ্যমে। এই ডিজাইনের পেছনে তিনি নদীর স্রোতের ধারণা কাজে লাগিয়েছিলেন এবং ভেবেছিলেন সেতুটি যেন পানির গতিপথের প্রতিফলন হয়। তার লক্ষ্য ছিল নদী ও রেলপথ উভয়কেই সমান গুরুত্ব দেওয়া, যা সেতুটিকে প্রকৃতির সঙ্গে মিশে যেতে সাহায্য করেছে। এর ফলে, স্ট্রাকচারটি এমন এক স্বাভাবিক রূপ পেয়েছে যেন এটি সেই স্থানেই হাজার বছর ধরে দাঁড়িয়ে আছে।
ভারতের আশ্রয় নেতা পতিত শেখ হাসিনার বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র থামছেই না। একের পর এক ষড়যন্ত্র করে এ দেশীয় এজেন্টদের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করছেন। ‘ডিসেম্বরে দেশে ফিরবেন’ ‘২২৭ জনকে হত্যা করবেন’ গাইবান্ধার এক নেতার সঙ্গে অডিও সংলাপে এ ঘোষণা দেয়ার পর ফের গার্মেন্টস সেক্টরে বিশৃঙ্খলার চেষ্টা করছেন। আর হাসিনার বিশৃঙ্খলার রোডম্যাপ বাস্তবায়নে কয়েকজন গার্মেন্টস মালিক, শ্রমিক নামধারী কিছু ছাত্রলীগ-যুবলীগ ক্যাডার ফের মাঠে নেমেছে।৩১ অক্টোবর রাজধানীর মিরপুর ১৪ নম্বরে রাস্তা অবরোধ করে দু’টি গার্মেন্টসের কর্মীর আবরণে আওয়ামী সন্ত্রাসীরা।
এ সময় তারা আশপাশের আরো আটটি গার্মেন্টসসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে হামলা চালায়। পুলিশ ও যৌথবাহিনী বাধা দিতে গেলে তাদের ওপরও চড়াও হয়। এতেই ক্ষান্ত হয়নি শ্রমিকের আড়ালে থাকা সন্ত্রাসীরা। রাস্তা অবরোধমুক্ত করতে গেলে সেনাবাহিনী ও পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর শেষে তাতে আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে দু’টি গাড়ি সম্পূর্ণ পুড়ে যায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, যারা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছে তাদের কিছু শ্রমিক থাকলেও বেশির ভাগই যুগলীগের কর্মী। আর গার্মেন্টস মালিকদের অনেকেই শ্রমিকদের উসকে দিতে ইচ্ছে করে বেতন-ভাতা আটকে রেখে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে।গার্মেন্টস শিল্প ধ্বংসের পাঁয়তারা ও পরিস্থিতি ঘোলাটে করতে এবার শ্রমিকবেশে মাঠে নেমেছে ছাত্রলীগ-যুবলীগসহ পতিত আ.লীগ সরকারের প্রেতাত্মারা। আর অন্তরালে থেকে এসব সন্ত্রাসীদের অর্থ ও নাশকতার উপাদানের জোগান দিচ্ছে আওয়ামী লীগের কতিপয় গার্মেন্টস ব্যবসায়ী।
সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে কুচক্রী মহল আশুলিয়া-সাভারের পর এবার ঢাকার গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠানসমূহে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে। এই কুচক্রী মহল এ ধরনের আরো ঘটনা ঘটানোর ষড়যন্ত্র চালাচ্ছে। যেকোনো সময় তারা ভিন্নরূপে অন্য কোনো আন্দোলনের নামেও নাশকতার অপচেষ্টা চালাতে পারে বলেও শঙ্কা রয়েছে।
এরই অংশ হিসেবে ৩১ অক্টোবর বৃহস্পতিবার ঠুনকো দাবিতে আন্দোলনের নামে রাজধানীর মিরপুর ১৪ নম্বরে রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছে দু’টি গার্মেন্টেসের কর্মীরা। এ সময় তারা আশপাশের আরো আটটি গার্মেন্টসসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে হামলা চালায়। পুলিশ ও যৌথবাহিনী বাধা দিতে গেলে তাদের ওপরও চড়াও হয়। এতেই ক্ষান্ত হয়নি শ্রমিকের আড়ালে থাকা সন্ত্রাসীরা। রাস্তা অবরোধমুক্ত করতে গেলে সেনাবাহিনী ও পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর শেষে তাতে আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে দু’টি গাড়ি সম্পূর্ণ পুড়ে যায়। পুলিশের সাথ দফায় দফায় ধাওয়া পাল্টা-ইটপাটকেল নিক্ষেপের পর পুলিশ টিয়ারশেল ও পরে রাবার বুলেট ছুটতে বাধ্য হয়। এতে মিরপুর-১৪ নম্বরের কাফরুল ও ভাষানটেক থানার কিছু এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। পুলিশের গুলিতে এ সময় দুজন শ্রমিক আহত হয়। প্রায় ছয় ঘণ্টা পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। এর আগে আন্দোলনের নামে সন্ত্রাসীদের রাস্তা অবরোধের কারণে অফিসগামী মানুষদের চরম ভোগান্তির শিকার হতে হয়। বিড়ন্বনার শিকার বেশির ভাগ মানুষ পায়ে হেঁটে গন্তব্যে পৌঁছেন। অনেকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় আটকে থাকেন।
সরকারের নানামুখী উদ্যোগ সত্ত্বেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ঘাটতি, ঝুটসহ কারখানা সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ, কিছু কারখানার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তৎপরতা, বেতন ভাতা সংক্রান্ত সমস্যা এবং বাইরের ইন্ধনসহ বিভিন্ন কারণে পোশাক কারখানাগুলোতে অস্থিরতা বন্ধ হচ্ছে না। পাঁচই অগাস্টের পট পরিবর্তনের পর শিল্প জোনগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্বের শিকার হচ্ছে পোশাক খাত।
কয়েকটি কারখানার মালিক, শ্রমিক নেতা ও কারখানা সংশ্লিষ্ট স্থানীয়দের সাথে কথা বলে এমন ধারণা পাওয়া গেছে। বিজেএমইএ ও পোশাক খাতের নেতারা বলছেন গত কিছুদিনে অন্তত ২৫টি কারখানা বন্ধ হয়ে পড়েছে। তবে এর মধ্যে কয়েকটি খোলার প্রক্রিয়া চলছে। যদিও পরিস্থিতির উন্নতি না হলে আগামী দু মাসে আরও কিছু কারখানা বন্ধ হওয়ারও আশঙ্কা করছেন কেউ কেউ। এ অবস্থায় চাকুরিতে নিয়োগ ও পুনর্বহালসহ বিভিন্ন দাবিতে গাজীপুর এলাকায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধের পর অন্তত দশটি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করতে হয়েছে বুধবার।
গত মাসেও বিভিন্ন দাবিতে আশুলিয়া অঞ্চলের পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা বিক্ষোভ করেছেন। শ্রমিকদের টানা বিক্ষোভের জের ধরে শেষ পর্যন্ত তাদের ১৮ দফা দাবি বাস্তবায়নে সম্মত হয় মালিকপক্ষ। ২৪শে সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার মালিক ও শ্রমিকেরা একটি যৌথ ঘোষণাও দিয়েছেন। এতে বলা হয়েছিলো, দেশের পোশাক শিল্পের সব কারখানার শ্রমিকদের মাসিক হাজিরা বোনাস ২২৫ টাকা বাড়ছে। টিফিন ও রাত্রিকালীন ভাতাও (নাইট বিল) বাড়বে। আগামী অক্টোবরের মধ্যে বিদ্যমান ন্যূনতম মজুরি বাস্তবায়ন করা হবে।
আশুলিয়া জোনে এখন দু পক্ষই নিয়ন্ত্রণে আছে বলে জানাচ্ছেন স্থানীয়রা। মূলত ঝুট ব্যবসাসহ পোশাক কারখানা সংশ্লিষ্ট আরও কিছু ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করতেই স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিরা নানাভাবে চেষ্টা করেন সবসময়। এতদিন যারা কোটি কোটি টাকার ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে আসছিলো তাদের অনেকেই এখন পলাতক। এছাড়া শ্রমিকদের মধ্যেও বিভিন্ন রাজনৈতিক দল সমর্থিত ব্যক্তিরা আছেন। কারখানাগুলোতে গত দুই দশক ধরেই মধ্যম পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সাথে শ্রমিকদের দূরত্ব ছিল। দাবি দাওয়া উত্থাপনে শ্রমিকদের মধ্যে একটি ভয়ের সংস্কৃতি কাজ করতো। এখন সরকার পরিবর্তনের পর শ্রমিকরা কথা বলতে শুরু করেছেন বলে জানিয়েছেন গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য পরিষদের কেন্দ্রীয় নেতা মমিনুর রহমান।
“আইনশৃঙ্খলা সমন্বয়েও ঘাটতি আছে। এছাড়া লেবার লিডার, রাজনৈতিক দল, বাইরের ইন্ধনসহ বিভিন্ন ইস্যু আছে। তবে আশা করি আগামী দশদিনে পরিস্থিতির উন্নতি হবে,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ৩২১ অক্টোবর সকালে মিরপুর-১৪ নম্বরের ‘গার্মেন্ট ক্রিয়েটিভ ডিজাইনার্স লি.’ নামে একটি পোশাক কয়েকশ শ্রমিক কচুক্ষেতে রাস্তায় জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করে। এ সময় তারা সড়ক অবরোধের চেষ্টা করে। শ্রমিকরা কাছাকাছি আরো আটটি গার্মেন্টে হামলা ও ভাঙচুরের চেষ্টা করে। সেনাবাহিনী তাদের ফাঁকা গুলি ছুুড়ে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। কিন্তু তারা আবারো জড়ো হয়ে সড়ক অবরোধ করে। একপর্যায়ে যৌথ বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়। সকাল সাড়ে ৮টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত আড়াই ঘণ্টা ধরে সংঘর্ষ চলে।
সংঘর্ষ মিরপুর ১৪ নম্বর থেকে কচুক্ষেত পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। এতে মিরপুর ১৪ নম্বর সড়কের সঙ্গে সংযোগ সড়কগুলোর যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। একপর্যায়ে পুলিশ পোশাক শ্রমিকদের লাঠিপেটা করে। বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা সেনাবাহিনীর একটি গাড়ি ও পুলিশের একটি গাড়িতে ভাঙচুর চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।গাড়িতে আগুন লাগানোর পরেও আন্দোলনের নামে সন্ত্রাসীরা পুলিশ ও সেনাবাহিনীকে লক্ষ করে এলোপাতাড়ি ইটপাটকেল নিক্ষেপ করলে পুলিশ একপর্যায়ে কাঁদানে গ্যাসের শেল ও গুলি চালায়। এতে দুই পোশাক শ্রমিক গুলিবিদ্ধ হন। এরা হলেনÑ আল আমিন (১৮) ও ঝুমা আক্তার (১৫)। এদের মধ্যে আল আমিনের দুই কাঁধে ও ঝুমার ডান পায়ের গোড়ালিতে গুলি লাগে। তাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। দুপুর ১২টার পর পরিস্থিতি ধীরে ধীরে শান্ত হয়। স্বাভাবিক হয় যান চলাচল।
শ্রমিকবেশের আন্দোলনরতদের তা ছিল কাফরুল ও ভাষানটেক থানার বেশ কিছু অংশজুড়ে। পুলিশের ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় কাফরুল থানায় একটি মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে। মামলাটির বাদি হবে পুলিশ। তবে আসামিদের ব্যাপারে তিনি মুখ খুলতে চাচ্ছেন না। তবে পুলিশের একটি সূত্র বলেছে, যারা যৌথ বাহিনীর ওপর হামলা ও গাড়ি পুড়িয়েছে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরায় মাধ্যমে তাদের শনাক্ত করা গেছে। এসব চিহ্নিত অপরাধীদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।
প্রায় একই ধরনের কথা বলেন ভাষানটেক থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহ মোহাম্মদ ফয়সাল। তিনি বলেন, পুলিশ লাইনের গাড়ি পোড়ানোর দায়ে তার থানায় মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে। যেকোনো ধরনের অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা এড়াতে ঘটনাস্থলে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন রয়েছে। এ ছাড়া ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতারেও অভিযান চলছে।
এদিকে ঘটনাস্থলে থাকা গোয়েন্দা সংস্থার এক সদস্য জানিয়েছেন, গতকালের ঘটনাটি আসলে গার্মেন্টস শ্রমিকদের আন্দোলন ছিল না। কারণ তাদের সুনির্দিষ্ট কোনো দাবি ছিল না। ঠুনকো দাবি তুলে তারা রাস্তায় নেমেছে। মূলত তাদের উসকে দিয়েছে একটি চক্র। যে চক্রটি বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালিয়েছে। ছাত্রদের ওপর গুলি চালিয়েছে। তারাই এখন আড়ালে থেকে শ্রমিকদের উসকে দিচ্ছে। এরা ছাত্রলীগ-যুবলীগ ও ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকারের আশ্রিত সন্ত্রাসী। তাদের উদ্দেশ্য দেশকে অস্থিতিশীল করা। সরকারকে বেকায়দায় ফেলে ঘোলা পানিতে মাছ ধরার অপচেষ্টা। এ জন্য চক্রটি মোটা অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করছে। এর পেছনে আওয়ামী লীগের একাধিক গার্মেন্টস ব্যবসায়ী জড়িত রয়েছেন। পুলিশ ইতোমধ্যে এদের সম্পর্কে তদন্ত শুরু করেছে।
কচুক্ষেত এলাকায় মৌসুমি অ্যান্ড ভুঁইয়া নামে একটি ভবনের নিরাপত্তাকর্মী জানান, তিন দিন আগে ওই ভবনের একটি পোশাক কারখানায় এক নারী পোশাক শ্রমিককে মারধর করা হয়। এর প্রতিবাদ জানাতে গেলে একজন পুরুষ শ্রমিককেও মারধর করা হয়। গতকাল সকালে শ্রমিকরা ওই কারখানায় গেলে কারখানা বন্ধ দেখেন। এ ঘটনার বিচার দাবিতে ও কারখানা বন্ধের প্রতিবাদে শ্রমিকরা বিক্ষোভ করে।
গত তিন মাসে বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পে বিভিন্ন বিক্ষোভ ও সংঘর্ষের ঘটনাগুলোর বিস্তারিত নীচে দেয়া হলো:
৩১ আগস্ট, ২০২৪:
ঢাকার সাভারে শ্রমিকরা বেতন বৃদ্ধির দাবি জানিয়ে বিক্ষোভ করেন। জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়ায় শ্রমিকরা তাদের ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির দাবি তোলেন। এদিন পুলিশের সাথে সংঘর্ষে শ্রমিকদের কয়েকজন আহত হন।
১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৪:
গাজীপুরে শ্রমিকদের দাবির প্রেক্ষিতে আরও একটি বড় আন্দোলন হয়। উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাব এবং ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে শ্রমিকরা সড়ক অবরোধ করেন। পুলিশের সাথে সংঘর্ষ চলাকালে কিছু শ্রমিক আহত হন।
২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৪:
নারায়ণগঞ্জে শ্রমিকরা বকেয়া মজুরির দাবিতে একটি গার্মেন্টস কারখানায় তালা লাগিয়ে দেন। শ্রমিকরা জানান যে তাদের মাসের পর মাস বেতন প্রদান করা হচ্ছে না, যা তাদের জীবনে সংকট তৈরি করছে।
৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৪:
আশুলিয়ায় শ্রমিকদের এক বিক্ষোভে একজন শ্রমিক নিহত হন। ন্যূনতম মজুরি ও বেতন বৃদ্ধির দাবিতে শ্রমিকরা আন্দোলনে অংশ নিলে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে।
৮ অক্টোবর, ২০২৪:
তেজগাঁওয়ে শ্রমিকরা বেতন ও উৎসব ভাতার দাবিতে সড়ক অবরোধ করেন, যা শহরের বেশ কিছু জায়গায় যানজটের সৃষ্টি করে। সংঘর্ষে শ্রমিকদের কয়েকজন আহত হন।
২১ অক্টোবর, ২০২৪:
চট্টগ্রামে অতিরিক্ত কাজের জন্য বিশেষ ভাতার দাবি জানিয়ে শ্রমিকরা আন্দোলনে নামেন। এ সময় কারখানার নিরাপত্তা কর্মীদের সাথে সংঘর্ষ ঘটে। শ্রমিকরা সপ্তাহান্তে অতিরিক্ত কাজের জন্য ভাতা দাবি করেন।
২৫ অক্টোবর, ২০২৪:
সাভারে শ্রমিকরা তাদের ন্যূনতম মজুরি ১৫,০০০ টাকা করার দাবি জানিয়ে ব্যাপক বিক্ষোভ করেন। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এই মজুরি কাঠামো দিয়ে জীবন চালানো কঠিন হওয়ায় শ্রমিকরা সরকারের কাছে তাদের দাবি তুলে ধরেন।
৩ নভেম্বর ২০২৪ ‘গুলি করা ৭৪৭ পুলিশ চিহ্নিত’ আজকের পত্রিকার প্রথম পাতার শিরোনাম। এ খবরে বলা হয়েছে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমাতে রাজধানী ঢাকা ও বন্দরনগরী চট্টগ্রামে প্রাণঘাতী অস্ত্র থেকে গুলিবর্ষণকারী পুলিশ সদস্যদের তালিকা হচ্ছে। ইতিমধ্যে পুলিশের অন্তত ৭৪৭ সদস্যকে চিহ্নিত করা হয়েছে বলে সংবাদটিতে বলা হয়েছে। কনস্টেবল থেকে সহকারী পুলিশ সুপার পদমর্যাদার এসব কর্মকর্তা গত ১৮ থেকে ২১শে জুলাই গুলি করেছেন।
শনিবার (২ নভেম্বর) পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. ময়নুল ইসলাম সংবাদমাধ্যমকে বলেন, অতি বলপ্রয়োগকারী পুলিশ সদস্যদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন গ্রেপ্তার হয়েছেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা অনেকের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে তদন্ত করছে।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে ১৮ থেকে ২১ জুলাই পর্যন্ত ১৫০ জনের বেশি নিহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন থানায় অন্তত ১১৫টি মামলা হয়। এগুলোর মধ্যে ১০০টির এজাহার পর্যালোচনা করে ‘লয়ার ফর এনার্জি, এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ নামে আইনজীবীদের একটি সংগঠন। সেই পর্যালোচনার একটি প্রতিবেদন সংগঠনটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থাকে দিয়েছে। সেখানেই ওই চার দিনে প্রাণঘাতী গুলিবর্ষণকারী পুলিশ সদস্যদের চিহ্নিত করে তালিকা করা হয়েছে।
লয়ার ফর এনার্জি, এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের অন্যতম সংগঠক আব্দুল্লাহ আবু নোমান বলেন, ১৮-২১ জুলাইয়ের ঘটনায় পুলিশের করা মামলাগুলোর এজাহারে গুলিবর্ষণকারী পুলিশ সদস্যদের নাম ও গুলির পরিমাণ উল্লেখ করা হয়েছে। এসব মামলায় আসামি করা হয়েছিল অজ্ঞাতনামা সাধারণ শিক্ষার্থীদের। মামলাগুলোতে তখন বেশ কিছু শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকার সেই মামলাগুলো প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয়।
ওই তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, শিক্ষার্থীদের ওপর গুলিবর্ষণকারী হিসেবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ৭৫৪ জন সদস্যকে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাদের মধ্যে পুলিশ সদস্য হলেন ৭৪৭ জন। যাদের মধ্যে কনস্টেবল ৪৬৭ জন, সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) ১০৬, উপপরিদর্শক (এসআই) ১৫৭, পরিদর্শক দুজন এবং এএসপি পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা রয়েছেন। বাকি ১৪ জন পুলিশের নায়েব, সুবেদার ও চালক।
জানা যায়, ১৮-২১ জুলাই ঢাকা মহানগর পুলিশের ১২টি থানা ও চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের ১০টি থানা এলাকায় ছাত্র-জনতার ওপর অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ ও নির্বিচার গুলিবর্ষণের অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে। পুলিশ প্রাণঘাতী গুলি, রাবার বুলেটসহ অন্তত ২৬ হাজার ২৩টি গুলি ছোড়ে। এর মধ্যে শটগানের শিসা কার্তুজ ১২ হাজার ৩৪০টি, চীনের সেভেন পয়েন্ট সিক্সটু এমএম, এসএমজি, টরাস নাইন এমএম ও অন্যান্য আগ্নেয়াস্ত্রের গুলি ৪ হাজার ৩১৬টি, পিস্তলের গুলি ২৫৬টি, ৮ হাজার ৯৯৪টি রাবার বুলেট, ১৬টি হ্যান্ড গ্রেনেড, ৯৮৪টি সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ার গ্রেনেড, মাল্টি ইম্প্যাক্ট, কাইনেটিভ ও ভারী বল কার্তুজ রয়েছে। এসব ছুড়েছেন ৭৪৭ জন পুলিশ সদস্যসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ৭৫৪ সদস্য। এর মধ্যে প্রাণঘাতী গুলি ছিল ১৬ হাজার ৯১২টি।
ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার সূত্র বলছে, আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি করার ক্ষেত্রে শটগান, পিস্তল ও চায়নিজ রাইফেলের ব্যবহার বেশি হয়েছে। কোথাও কোথাও এসএমজি (সাব-মেশিনগান) ও এলএমজির (লাইট মেশিনগান) মতো অস্ত্রও ব্যবহৃত হয়েছে। এসব অস্ত্র বাংলাদেশ পুলিশ ব্যবহার করে। এই চার দিনে নিহত ১২০ জনের মৃত্যুর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ৯৭ জনের শরীরে প্রাণঘাতী গুলির চিহ্ন ছিল। তাঁদের অনেকে ‘এইম ফায়ার’ বা লক্ষ্যবস্তু করে গুলির শিকার হয়েছেন।
পুলিশ প্রবিধানের ১৫৩ ধারা অনুযায়ী, তিন ক্ষেত্রে পুলিশ আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করতে পারবে। এগুলো হলো ব্যক্তির আত্মরক্ষা ও সম্পদ রক্ষার অধিকার প্রয়োগ, বেআইনি সমাবেশ ছত্রভঙ্গ করা ও গ্রেপ্তার কার্যকর করার জন্য। এ ছাড়া দণ্ডবিধির ১০২ ধারা অনুযায়ী, যখনই ক্ষতির আশঙ্কা শেষ হবে, তখন আত্মরক্ষার জন্য শক্তি প্রয়োগের অধিকারও শেষ হবে। অভিযোগ রয়েছে, আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর গুলিবর্ষণের ক্ষেত্রে এসব নিয়ম মানেননি পুলিশ সদস্যরা। এ কারণে প্রাণহানিও অনেক বেশি হয়েছে।
সাবেক আইজিপি নূর মোহাম্মদ বলেন, লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে গুলি করা পুলিশের কাজ নয়। এই আন্দোলন দমন করতে গিয়ে পুলিশ বেশ কিছু অপেশাদার কাজ করে ফেলেছে।
আন্দোলন দমাতে গুলিবর্ষণকারী পুলিশ সদস্যদের চিহ্নিত করার বিষয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার কোনো কর্মকর্তা সরাসরি কিছু বলেননি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সদস্য জানান, ছাত্র-জনতার আন্দোলন নির্মূলে গণহত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধে সম্পৃক্ততার অভিযোগে কয়েক শ পুলিশ সদস্যের তালিকা পাওয়া গেছে। তাঁদের সম্পৃক্ততার বিষয়টি যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে গুলি চালানোর নির্দেশদাতা বেশ কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।
জুলাই-আগস্টের গণহত্যার অভিযোগে ইতিমধ্যে পুলিশের দুই কর্মকর্তা ডিএমপির মিরপুর বিভাগের সাবেক উপকমিশনার জসীম উদ্দিন মোল্লা ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সাভার সার্কেল) শহীদুল ইসলামকে গ্রেপ্তার দেখানোর পর কারাগারে পাঠিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।
খবর অনুযায়ী, ওই চার দিনে হতাহতের ঘটনায় পুলিশের করা মামলাগুলোর এজাহার থেকেই গুলি-বর্ষণকারী পুলিশ সদস্যদের চিহ্নিত করা হয়েছে। তারা গুলি করার ক্ষেত্রে কোনো নিয়ম মানেননি। গুলি করার নির্দেশদাতা বেশ কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
সূত্র বলেছে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ১৮ জুলাই সারা দেশে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ আহ্বান করেছিল। ১৮ থেকে ২১ জুলাই—এ চার দিনে দেশে সবচেয়ে বেশি গুলি চলে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে। পুলিশের ৩৫৭ সদস্য এ সময় প্রায় ৮ হাজার প্রাণঘাতী গুলি করেন। এতে অনেক বিক্ষোভকারী নিহত এবং কয়েক শ আহত হয়।
তালিকাটি যাচাই – বাছাই করছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। সূত্রের বরাত দিয়ে সংবাদে বলা হয়েছে, ওই চার দিনে হতাহতের ঘটনায় পুলিশের করা মামলাগুলোর এজাহার থেকেই গুলিবর্ষণকারী পুলিশ সদস্যদের চিহ্নিত করা হয়েছে।
প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরেকটি মেয়াদে জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা বিশ্ব অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছে। তার প্রশাসনের আক্রমনাত্মক বাণিজ্য নীতি, নিয়ন্ত্রণহীনতা এবং অনন্য বিদেশী কূটনীতির ট্র্যাক রেকর্ডের সাথে, তাৎক্ষণিক এবং দীর্ঘমেয়াদী উভয় প্রভাব বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত। এই নিবন্ধটি বাণিজ্য সম্পর্ক, বিদেশী বিনিয়োগ, মুদ্রার ওঠানামা এবং বৃহত্তর সামাজিক পরিণতি বিশ্লেষণ করে এই ধরনের বিজয়ের সম্ভাব্য প্রভাবগুলি পরীক্ষা করে।
শুল্কনীতি এবং বাণিজ্য যুদ্ধ ট্রাম্পের অতীত রাষ্ট্রপতি বাণিজ্য, বিশেষ করে চীনের সাথে একটি দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতির দ্বারা চিহ্নিত করা হয়েছিল। দ্বিতীয় মেয়াদ বাণিজ্য যুদ্ধ বাড়বে নাকি আরও স্থিতিশীল কাঠামোর দিকে নিয়ে যাবে তা নিয়ে অর্থনীতিবিদরা বিভক্ত। অফিস অফ ট্রেড অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারিং পলিসির প্রাক্তন ডিরেক্টর পিটার নাভারোর মতে, “আমেরিকান ম্যানুফ্যাকচারিং এর উপর একটি দৃঢ় ফোকাস মার্কিন কর্মীদের সাহায্য করে আরও অনুকূল বাণিজ্য ভারসাম্যের দিকে নিয়ে যেতে পারে।” যাইহোক, সমালোচকরা যুক্তি দেন যে আরোপিত শুল্ক ব্যবসায়িক অংশীদারদের কাছ থেকে প্রতিশোধ নিতে পারে, যা বিশ্বব্যাপী গ্রাহকদের জন্য সম্ভাব্য মূল্য বৃদ্ধির দিকে পরিচালিত করতে পারে। এই ধরনের কর্মের প্রতিক্রিয়া প্রতিষ্ঠিত সরবরাহ শৃঙ্খলকে অস্থিতিশীল করতে পারে, বিশেষ করে এশিয়ায়, যেখানে অনেক দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির উপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করে। শুল্ক আরোপের সম্ভাবনা ট্রাম্পের প্রশাসন পূর্বে যেমন চীনের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপ করেছিল, তেমনই তাঁর পুনঃনির্বাচনের পরও এমন নীতির পুনরাবৃত্তি হতে পারে। তিনি আমদানি করা পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়ানোর পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অস্থিরতা সৃষ্টি করবে। বিশেষ করে, চীনের মতো দেশগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি হলে তারা পাল্টা ব্যবস্থা নিতে পারে, যা বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। বাণিজ্য চুক্তির পুনর্বিবেচনা ট্রাম্পের প্রশাসন পূর্ববর্তী বাণিজ্য চুক্তিগুলে- ার পুনর্বিবেচনা করতে পারে। যেমন, উত্তর আমেরিকার মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (ঘঅঙ্কঞঅ) এবং ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ (এচচ) এর মতো চুক্তিগুলোকে নতুন করে আলোচনার টেবিলে আনা হতে পারে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পর্কের কাঠামো পরিবর্তিত হতে পারে। বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা মার্কেটের প্রতিক্রিয়া ট্রাম্পের বিজয়ের ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। বিনিয়োগকারীরা তাঁর নীতিগুলোর প্রতিক্রিয়া হিসেবে শেয়ার বাজারে উদ্বেগ প্রকাশ করতে পারেন। যদি ট্রাম্প আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে কঠোর অবস্থান নেন, তবে তা বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। মূল্যস্ফীতি এবং মুদ্রাস্ফীতি শুল্ক আরোপের ফলে আমদানি করা পণ্যের দাম বৃদ্ধি পাবে, যা মূল্যস্ফীতির দিকে নিয়ে যাবে। এর ফলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাবে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে বাধা সৃষ্টি হবে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এই পরিস্থিতি আরও গুরুতর হতে পারে।আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিবর্তন যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক ট্রাম্পের বিজয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্ক আরও জটিল হতে পারে। তিনি চীনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে পারেন, যা দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক উত্তেজনা বৃদ্ধি করবে। এই পরিস্থিতি বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষ করে প্রযুক্তি খাতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিক্রিয়া ইউরোপীয় ইউনিয়ন ট্রাম্পের বিজয়ে উদ্বিগ্ন হতে পারে, কারণ তাঁর নীতি ইউরোপের অর্থনীতির জন্য একটি বড় ধাক্কা হতে পারে। ইউরোপীয় দেশগুলো মার্কিন পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপ করতে পারে, যা দুই অঞ্চলের মধ্যে বাণিজ্য সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রভাব বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশ বাংলাদেশসহ অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশগুলো ট্রাম্পের নীতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক বাজারে কঠোর হয়, তবে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে গার্মেন্টস শিল্প, যা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং সাহায্যের সংকোচন ট্রাম্প প্রশাসন বিদেশি সাহায্য ও সহযোগিতার ক্ষেত্রে সংকোচন করতে পারে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে মার্কিন সাহায্যের পরিমাণ কমে গেলে তা তাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করবে। প্রযুক্তি খাতে প্রভাব প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে যুক্তরাষ্ট্র প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে চীনকে প্রতিযোগী হিসেবে দেখছে। তিনি প্রযুক্তি সংস্থাগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারেন যাতে তারা চীন থেকে পণ্য আমদানি কমায় বা উৎপাদন স্থানান্তর করে। এর ফলে বৈশ্বিক প্রযুক্তি সরবরাহ শৃঙ্খলে পরিবর্তন আসতে পারে। গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ কমে যেতে পারে যদি ট্রাম্প প্রশাসন বিদেশি গবেষণা প্রকল্পগুলোর প্রতি আগ্রহ হারায়। এটি বৈশ্বিক উদ্ভাবনী ক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। শ্রম বাজারে অস্থিরতা চাকরি হারানোর সম্ভাবনা ট্রাম্পের বাণিজ্য নীতির ফলে অনেক শিল্পে চাকরি হারানোর আশঙ্কা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে যদি আমদানি শুল্ক বৃদ্ধি পায়, তবে উৎপাদকরা তাদের উৎপাদন খরচ কমাতে বাধ্য হতে পারেন, যা কর্মী ছাঁটাইয়ের দিকে নিয়ে যেতে পারে। এই পরিস্থিতি মার্কিন শ্রম বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করবে এবং বেকারত্বের হার বাড়াতে পারে। অবৈধ অভিবাসীদের ওপর চাপ ট্রাম্পের কঠোর অভিবাসন নীতির ফলে অবৈধ অভিবাসীদের ওপর চাপ বৃদ্ধি পেতে পারে। এটি শ্রম বাজারে আরও অস্থিরতা সৃষ্টি করবে, কারণ অনেক ক্ষেত্রেই অবৈধ শ্রমিকরা কম খরচে কাজ করেন। তাঁদের চলে যাওয়ার ফলে কিছু শিল্পে শ্রমিকের অভাব দেখা দিতে পারে, যা উৎপাদন খরচ বাড়াবে। বিনিয়োগের অনিশ্চয়তা বিদেশি বিনিয়োগ হ্রাস বিদেশি বিনিয়োগকারীরা যদি মার্কিন বাজারকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করেন, তবে তারা বিনিয়োগ কমিয়ে দিতে পারেন। এটি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিদেশি বিনিয়োগ হ্রাস পাওয়ার ফলে নতুন প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের প্রবাহও কমে যাবে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে ৭ নভেম্বর, ১৯৭৫ একটি স্মরণীয় দিন। ৭ নভেম্বর বিপ্লবের তাৎপর্য সুদূরপ্রসারী। এই বিপ্লবের প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশে ফিরে আসে প্রকাশ্য রাজনীতি, গঠিত হয় রাজনৈতিক দল, পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয় নির্বাচনী প্রক্রিয়া ও বহুদলীয় গণতন্ত্রের ধারা। এই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে চক্রান্তমুক্ত হয়ে সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ও ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়। এই বিপ্লবের ধারায় ভারতীয় স্বার্থের পরিপূরক অবস্থান থেকে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব অর্জিত হয়। এদিন সিপাহী ও জনতা এক হয়ে বিদ্রোহের মাধ্যমে এক নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা করে, যা “জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস” নামে পরিচিত।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা-উত্তর রাজনৈতিক সংকটকালে এই বিদ্রোহের মাধ্যমে জিয়াউর রহমানের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় এবং দেশের স্থিতিশীলতা ও জাতীয় ঐক্যের ভিত মজবুত হয়। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ নামের যে জাতিরাষ্ট্র বা নেশন স্টেটটি জন্ম নিয়েছিল সেই রাষ্ট্রের নাগরিকরা রাষ্ট্রভিত্তিক, আধুনিক ও বাস্তবসম্মত এক জাতীয় পরিচয় অর্জন করে। আত্মপরিচয় লাভের মাধ্যমে নবউদ্দীপ্ত ও আত্মোপলব্ধির মাধ্যমে নবোত্থিত এই বাংলাদেশী জাতিসত্তার অভিষেকের দিন ৭ নভেম্বর। আর সিপাহী-জনতার মিলিত বিপ্লবের মহান শিক্ষা ও তাৎপর্যকে আত্মস্থ করে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য, স্বকীয়তা, মর্যাদা, নিজস্ব সংস্কৃতি ও গৌরব নিয়ে সামনের দিকে এই জাতিসত্তাকে এগিয়ে চলার প্রশস্ত নতুন মহাসড়ক গড়ে দিয়ে গেছেন জিয়াউর রহমান।
এই ঘটনায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ড থেকে শুরু করে ৭ নভেম্বর পর্যন্ত ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো বাংলাদেশের ইতিহাসে গভীর ছাপ ফেলে। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সুবহে সাদেকের সময় রাজপথে সূচিত সৈনিক-জনতার সংহতির মধ্য দিয়ে যে বিপ্লব সম্পন্ন হয়েছিল তাতে পরাস্ত হয়েছিলো একদল কুচক্রী। সেদিন শুধু নয়, ওই ঘটনার পর অনেক দিন পর্যন্ত তাদেরকে প্রকাশ্যে সমর্থন জানাবার সাহস এ দেশের কোনো রাজনৈতিক কিংবা সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর ছিলো না। সময়ের বিবর্তনে অনেক পরে এসে বিশেষ গোষ্ঠীটি ৭ নভেম্বরের ইতিহাস বিকৃতভাবে প্রচার শুরু করে। আরো পরে শুরু হয় সিপাহী জনতার বিপ্লব ও সংহতির বিরুদ্ধে বিষোদ্গার।
এই চক্রটি সিপাহী জনতার বিপ্লব ও সংহতি দিবসকে ‘সৈনিক হত্যা দিবস’ নামে অভিহিত করতে থাকে। জাসদের এককালীন সশস্ত্র শাখা গণবাহিণীর নেতা অবসরপ্রাপ্ত কর্ণেল আবু তাহেরকে ৭ নভেম্বরের হিরো এবং শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে বিশ্বাসঘাতক হিসেবে চিত্রিত করাই ওই প্রচারণার আসল উদ্দেশ্য। এ ধরণের বিভ্রান্তি, মিথ্যা প্রচার ও ইতিহাস বিকৃতি যখন চলছে এবং সিপাহী জনতার বিপ্লবে পরাজিত শক্তির সমর্থকরা আজ যখন রাষ্ট্র ক্ষমতায় বসে ৭ নভেম্বরের চেতনাকে ভূলুণ্ঠিত করতে চাইছে, সেই মুহূর্তে এই দিনটিকে বিশেষভাবে স্মরণ করা এবং বিপ্লব-সংহতির শিক্ষা ও চেতনাকে আরো দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরা খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে।
প্রেক্ষাপট: স্বাধীনতা-পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতা
৭ নভেম্বরের বিপ্লব ও সংহতির স্বরূপ ও অনিবার্যতা বুঝতে হলে এর সংক্ষিপ্ত পটভূমি জানা দরকার। এ জন্য আমাদের ফিরে তাকাতে হবে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ সংগ্রাম এবং চূড়ান্ত পরিণতিতে সংঘটিত সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের দিকে। মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জন্ম হয়। কিন্তু স্বাধীনতার পরপরই নতুন দেশটিতে রাজনৈতিক সংকট, অর্থনৈতিক সমস্যাবলী এবং সামাজিক বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে দেশ পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা চললেও নানা প্রতিকূলতার কারণে চ্যালেঞ্জগুলো দিনে দিনে আরও গভীর হয়। রুশ-ভারতঘেঁষা বলে পরিচিত তাজউদ্দিনকে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে দিয়ে তিনি সরকারপদ্ধতি বদল করে নিজেই প্রধানমন্ত্রী হন। কিছুদিনের মধ্যেই তাজউদ্দিনকে তিনি মন্ত্রিসভা থেকেও ড্রপ করে দিয়ে খন্দকার মোশতাক আহমাদ ও অন্যান্য মার্কিনপন্থীদের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়েন। বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহারের জন্যও তিনি ইন্দিরা গান্ধীকে অনুরোধ করেন এবং সফল হন।চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যসহ মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের উদ্দেশ্যে তিনি গোপনে লবিয়িং শুরু করেন। পাকহানাদার বাহিনীর সদস্যদের বিচারের দাবিও তিনি ত্যাগ করেন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধীদের জন্য ঘোষণা করেন সাধারণ ক্ষমা। এগুলো সবই ছিলো পাকিস্তান ও মার্কিন প্রশাসনকে দেয়া তার অঙ্গীকার বাস্তবায়নের পদক্ষেপ। কিন্তু বেশি দূর এগুনো সম্ভব ছিলো না তার পক্ষে। কেননা সদ্য প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ তখন রুশ-ভারত প্রভাব বলয়ে আষ্ট্রেপৃষ্ঠে বাঁধা। ক্ষমতাসীন দল ও প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদ এবং অবস্থানগুলো তখন ভারতপন্থীদের কব্জায়। ফলে শেখ মুজিবকেই তাদের কাছে আত্মসমর্পিত হতে হলো। ওয়াদা ভাঙলেন শেখ মুজিব। ভোল পাল্টালেন। নিজের আজন্মলালিত বিশ্বাসের বিরুদ্ধে সাজলেন সমাজতন্ত্রী।
১৯৭৫ সালের আগে বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিভক্তি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, এবং আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সমস্যার সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে বঙ্গবন্ধু চার মূলনীতির ভিত্তিতে দেশ চালানোর জন্য একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে বাকশাল গঠন করেন। এই সিদ্ধান্ত দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক সৃষ্টি করে এবং জনগণের একটি অংশের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়।
১৫ আগস্ট ১৯৭৫: শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ড
সশস্ত্র বাহিনীর সমান্তরাল বাহিনী হিসেবে প্রভূত ক্ষমতা ও সুযোগ-সুবিধা দিয়ে গঠন করা হয়েছিল জাতীয় রক্ষীবাহিনী। এ কারণে প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যরা নিজেদের উপেক্ষিত ভাবতে শুরু করেছিলেন। দেশের সার্বিক পরিস্থিতি এবং অভ্যন্তরীণ কিছু বিক্ষিপ্ত ঘটনায়ও সেনাবাহিনীর অনেক সদস্য সরকারের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিলেন। তারা যখন দেখলেন যে, সরকার পরিবর্তনের শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক সব রাস্তা বন্ধ করে দিয়ে ক্ষমতাকে চিরস্থায়ীভাবে পাকাপোক্ত করার সব আয়োজন শেখ সাহেব সম্পন্ন করেছেন, তখন তারা ক্রুব্ধ হয়ে ওঠেন। সেনাবাহিনীর এই উত্তেজিত অংশটিকে ব্যবহার করে আওয়ামী লীগের মার্কিনপন্থী অংশটি এক রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট প্রত্যুষে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে।
১৫ আগস্ট, ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের সদস্যদের এক নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে হয়। দেশের অভ্যন্তরে থাকা কিছু সেনা সদস্য এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিল, এবং তাদের নেতৃত্বে কিছু সংখ্যক উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে। এই হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে এক নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা হয় এবং দেশে এক অভূতপূর্ব সংকট তৈরি হয়। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর খোন্দকার মোশতাক আহমেদকে দেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব প্রদান করা হয়, যিনি পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের সাথে সহযোগিতা করেন এবং তাদের শাসনক্ষমতায় আসার সুযোগ করে দেন।
খোন্দকার মোশতাকের শাসন এবং সামরিক বিভ্রান্তি
খোন্দকার মোশতাক আহমেদের ক্ষমতাগ্রহণের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যায়। সদ্য ক্ষমতাচ্যুত বাকশালের রুশ-ভারতপন্থী অংশটি এই পরাজয়কে মেনে নিতে পারেনি। তারা পাল্টা আঘাত হানার প্রস্তুতি নিতে থাকে।
মুজিব বাকশাল করে সব দল নিষিদ্ধ করেছিলেন। আর সিভিল পলিটিশিয়ান মোশতাকের নেতৃত্বাধীন আধাসামরিক সরকার বাকশালও বাতিল করে। ফলে দেশ থেকে রাজনৈতিক দলতো বটেই, রাজনীতিও বিলুপ্ত হয়ে যায়। এই রাজনীতিহীন সময়ে স্বার্থান্বেষী বিভিন্ন মহল সশস্ত্রবাহিনীকে তাদের উদ্দেশ্য হাসিলের মাধ্যম হিসেবে বেছে নেয়।
স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রতীক প্রতিরক্ষা বাহিনীর শৃঙ্খলা এবং চেইন অব কমান্ড ভেঙ্গে পড়ে। এ ধরনের বিশৃঙ্খল অবস্থার সুযোগে সেনাবাহিনীর উচ্চাভিলাষী ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ তার অনুগত কতিপয় অফিসারের সমর্থনে খন্দকার মোশতাককে হটিয়ে ক্ষমতা দখলের উদ্দেশ্যে বিদ্রোহ করেন।
৩ নভেম্বর সংঘঠিত ওই বিদ্রোহের হোতারা সেনাবাহিনীপ্রধান জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দী করেন। চেইন অব কমান্ড ভেঙ্গে সম্পূর্ণ বেআইনীভাবে অধস্তন কর্মকর্তা খালেদ সেনাপ্রধান পদ থেকে জিয়াকে অপসারিত করেন এবং নিজেকে নয়া সেনাপ্রধান ঘোষনা করেন। মোশতাক আহমেদ বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন এবং তাদের বিরুদ্ধে কোনো কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি, বরং তাদের পুরস্কৃত করেছিলেন। এর ফলে দেশের অভ্যন্তরে অসন্তোষ সৃষ্টি হয় এবং সাধারণ জনগণের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা অনুভূত হতে থাকে।
অন্যদিকে সেনাবাহিনীর সদস্যদের মধ্যেও বিভ্রান্তি এবং ভীতি বিরাজ করছিল। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর সামরিক বাহিনী দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে। সেনাবাহিনীতে নানা গোষ্ঠী এবং আদর্শের অনুসারীরা ভিন্নমত পোষণ করতে শুরু করে। এই সময়ে সেনাবাহিনীতে মেজর জিয়াউর রহমানের মতো নেতার উত্থান ঘটে, যিনি জনপ্রিয়তা এবং আদর্শিকভাবে দৃঢ় ছিলেন।
স্বাধীনতার সত্যিকারের ঘোষক, বীর মুক্তিযোদ্ধা, স্বাধীনতা যুদ্ধের মুক্তি বাহিনীর জেড ফোর্সের অধিনায়ক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়ার সততা, দেশ প্রেম, রাষ্ট্রপরিচালনায় সফলতা, আওয়ামী দুর্ণীতিবাজদের আমলে ‘তলা বিহীণ ঝুড়ি’ বানানো দেশটাকে উন্নতির দিকে ধাবিত করাটাই পরজীবি, ভারতীয় দালাল আওয়ামী লীগারদের গাত্র দাহের কারণ।
সিপাহী বিদ্রোহ এবং ৭ নভেম্বর বিপ্লব
সিপাহি জনতার বিপ্লব ও জিয়া
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের পেছনে খালেদের সক্রিয় সমর্থন থাকা সত্ত্বেও ৩ নভেম্বর তিনি মুজিব ভক্তদের বুঝিয়েছিলেন যে, মোশতাকের সরকার অবৈধ। এই সরকারকে আঘাত করে মুজিব হত্যার বদলা নিতে চান তিনি। তার কথায় মুজিবভক্তরা বলেছিলেন, মোশতাককে অপসারণের পর মুজিবের ভাইস প্রেসিডেন্ট সৈয়দ নজরুলকে ক্ষমতায় বসাতে হবে। কিন্তু মোশতাককে অপসারণের সঙ্গে যুগপৎভাবে ঘটে যায় রহস্যঘেরা জেলহত্যাকান্ড। একদল সৈন্য জেলে ঢুকে নজরুলসহ বিলুপ্ত বাকশালের চার শীর্ষনেতাকে খুন করে। এই হত্যাকান্ডের ব্যাপারে খালেদ অজ্ঞতা প্রকাশ করলেও অনেকেই তাকে সন্দেহ করতে থাকে।
দেশের এই অনিশ্চিত এবং অস্থিতিশীল অবস্থার মধ্যে ৭ নভেম্বর, ১৯৭৫ সালে সিপাহী-জনতা বিদ্রোহের সূচনা হয়। সেনাবাহিনীর নিচু স্তরের সৈনিকদের মধ্যে তৎকালীন সেনাবাহিনীর কিছু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের প্রতি অসন্তোষ ছিল, যারা বঙ্গবন্ধু হত্যার পরে ক্ষমতা গ্রহণের পেছনে ছিলেন। এই অসন্তোষের ফলে সিপাহীরা বিদ্রোহ করে এবং কর্নেল তাহেরের প্ররোচনায় তারা একটি বড় ধরনের আন্দোলন গড়ে তোলে।
খালেদ সবখানে তার নিজের কর্তৃত্বকে সংহত করতে পারেনি। সামরিক শাসন বলবৎ করা সত্ত্বেও ক্ষমতার শীর্ষপদে তিনি এক মুহূর্তের জন্যও বসতে পারেননি। বঙ্গভবন দখল করতে গিয়ে ক্যান্টনমেন্টেই তার কর্তৃত্ব আলগা হয়ে যায়। সাধারণ সৈনিক ও অফিসাররা খালেদের রহস্যজনক কার্যকলাপের ব্যাপারে প্রকাশ্যেই ক্ষোভ, সংশয় ও সন্দেহ প্রকাশ করতে থাকেন। এ ধরনের পরিস্থিতিতে সশস্ত্র বাহিনীতে রক্তক্ষয় ও সংঘাত এড়াতে জেনারেল ওসমানীর হস্তক্ষেপে একটি মাঝামাঝি পদক্ষেপ নেন খালেদ, কিন্তু এতেও শেষ রক্ষা হয়নি তার। রুশ-ভারতপন্থীরা পুনরুত্থানের পথ খুঁজছিল।
খালেদের বিদ্রোহে উল্লসিত হয়ে ওঠে তারা। মুজিব ভক্তরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সমবেত হয়ে সভা করে। সেখান থেকে মুজিবের ফটো নিয়ে মিছিল করে, তারা ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কে নিহত নেতার বাসভবনে গিয়ে তার প্রতি শ্রদ্ধা জানায়। ওই সমাবেশ থেকে খালেদের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করা হয়। মিছিলে খালেদের মা এবং ভাই (আওয়ামীলীগ সরকারের সাবেক ভূমি প্রতিমন্ত্রী মরহুম রাশেদ মোশাররফ) শরিক হন। এই খবর প্রচারিত হলে সেনাবাহিনীসহ সবখানে ক্ষোভের সঞ্চার হয়। সৈনিক ও অফিসাররা বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করে পারস্পরিক যোগাযোগ স্থাপন ও মতবিনিময় করে খালেদের ক্ষমতার স্বপ্নকে গুঁডিয়ে দেয়ার সিন্ধান্ত নেন।
৭ নভেম্বর প্রথম প্রহর থেকে সারা দেশের সেনা ছাউনিগুলোর চেহারা বদলে যায়। সৈনিকেরা অস্ত্রহাতে গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে বেরিয়ে আসেন রাজপথে। প্রত্যেক ক্যান্টনমেন্ট থেকে একদল করে সশস্ত্র সৈন্যকে পাঠিয়ে দেয়া হয় রাজধানীর দিকে। রাত্রির শেষপর্বে তারা ঢাকায় এসে পৌঁছে। মধ্যরাত্রির পর ঢাকা সেনানিবাসেও শুরু হয়ে যায় সৈনিকদের অভ্যুত্থান। ব্যারাক থেকে গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে তারা বেরিয়ে আসেন। বন্দী সেনাপ্রধান জিয়াকে মুক্ত করে কাঁধে তুলে সাধারণ সৈনিকরা বেরিয়ে আসেন রাজপথে। অবস্থা বেগতিক দেখে বঙ্গভবন থেকে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পালাতে গিয়ে ঢাকার রাজপথে সৈনিকদের হাতে ধরা পড়েন খালেদ তার কয়েকজন দোসরসহ। ক্রুদ্ধ সৈনিকেরা তাদেরকে গুলি করে হত্যা করেন।
এর অল্প কিছু আগে খালেদের সমর্থক কর্নেল মালেক, শাফায়াত জামিল, জাফর ইমাম, মেজর হাফিজ প্রমুখ কয়েকজন অফিসার পরিস্থিতি অনুধাবন করে তাকে ছেড়ে নিরাপদে পালিয়ে গিয়েছিলেন।
“বাংলাদেশ জিন্দাবাদ, কুচক্রিরা নিপাত যাক, জিয়াউর রহমান জিন্দাবাদ” ধ্বনি দিয়ে সৈনিকেরা ৭ নভেম্বর সুবহে সাদেকের সময়ে রাজপথে নেমে এলে তাদের প্রতি স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন জানাতে সারা দেশের জনগণ রাজপথে নেমে আসেন। শ্রেণীপেশা নির্বিশেষে আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা দেশরক্ষার সৈনিকদের সঙ্গে কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে স্লোগান তোলেন। সেনাদলগুলিকে বিপুল করতালি দিয়ে অভিনন্দিত করতে থাকে রাজপথের দু’পাশে অপেক্ষমাণ লাখো মানুষ। জনসমুদ্র থেকে বর্ষিত পুষ্পবৃষ্টিতে ছেয়ে যায় ট্যাংক, সাঁজোয়া যান। কামানের নলে সাধারণ মানুষেরা মালা পরিয়ে দেন। সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য!বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পর আর এমন দৃশ্যের অবতারণা কখনো হয়নি।
বিদ্রোহীরা মেজর জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করে তাকে নেতৃত্বে আসতে আহ্বান জানায়। জিয়াউর রহমান সেই সময় দেশের স্থিতিশীলতা এবং জাতীয় সংহতির জন্য নতুন করে নেতৃত্ব প্রদান করেন। এই বিদ্রোহের মাধ্যমে খোন্দকার মোশতাকের শাসনের অবসান ঘটে এবং মেজর জিয়া দেশের জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে ক্ষমতায় আসেন।
জিয়াউর রহমানের নেতৃত্ব: জাতীয় ঐক্যের ভিত্তি
৭ নভেম্বরের ঘটনাবলি মেজর জিয়াউর রহমানকে দেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে এক দৃঢ় নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। ’৭১-এ ২৫ মার্চের গণহত্যার সূচনায় আওয়ামীলীগের নেতারা আত্মসমর্পণ ও পালানোর পথ বেছে নিলে নেতৃত্বশূণ্য ও আক্রান্ত জনগণ মারাত্মক অসহায় হয়ে পড়েছিলেন। সেই ঘোর দুঃসময়ে ইথারে ভেসে এসেছিলো একটি কণ্ঠ : ‘আমি মেজর জিয়া বলছি…।’ চট্টগ্রামের কালুরঘাট রেডিও স্টেশন মারফত স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচার করে জিয়া জাতিকে দিয়েছিলেন বরাভয় আর পথনির্দেশ। শুধু মৌখিক ঘোষণা নয়, শুরু করে দিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধ। একইভাবে ’৭৫-এর ৭ নভেম্বর প্রত্যুষেও জনগণ আবার বেতার তরঙ্গে শুনলো সেই একই কণ্ঠ : ‘আমি জিয়া বলছি’।
জাতীয় দুর্যোগের কান্ডারী জিয়ার নির্দেশনা কান পেতে শুনলো সবাই। তিনি জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে দেশকে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনের সমন্বয়ে পরিচালিত হতে থাকে।
জিয়াউর রহমানের অধীনে দেশে জাতীয় ঐক্যের ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, দেশের স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য সকল শ্রেণির জনগণকে একত্রিত হওয়া জরুরি। তার প্রচেষ্টায় দেশের অর্থনীতি পুনর্গঠন করা হয় এবং কৃষি, শিল্প, ও বাণিজ্য খাতে ব্যাপক সংস্কার সাধিত হয়।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা
দেশের জাতীয়তাবাদী ধারাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ সালে “বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল” (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন। বিএনপি ছিল একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল, যা দেশের স্বাধীনতার চেতনাকে ধরে রেখে জনকল্যাণে কাজ করার প্রতিশ্রুতি নেয়।
বিএনপির মাধ্যমে জিয়াউর রহমান দেশের জাতীয়তাবাদী দর্শনকে জনগণের মাঝে জনপ্রিয় করেন এবং এটি পরবর্তীতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দল হিসেবে গড়ে ওঠে। বিএনপি গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে জনগণের অধিকার ও কল্যাণের কথা বলত এবং দেশের উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিত।
জিয়াউর রহমানের শাহাদাতঃ নিছক বিদ্রোহ না অন্যকিছু?
জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে দেশ এক নতুন উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে একটি সামরিক বিদ্রোহের সময় বিদ্রোহী সৈন্যদের হাতে তিনি শহীদ হন। তার মৃত্যুতে দেশ হারায় এক দৃঢ়চেতা এবং দেশপ্রেমিক নেতাকে, যিনি দেশের স্বার্থকে সর্বদা অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে জিয়া প্রবর্তিত উন্নয়নের রাজনীতির কতিপয় সাফল্য:
সকল দলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান।
জাতীয় সংসদের ক্ষমতা বৃদ্ধি।
বিচার বিভাগ ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেয়া।
দেশে কৃষি বিপ্লব, গণশিক্ষা বিপ্লব ও শিল্প উৎপাদনে বিপ্লব।
সেচ ব্যবস্থা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে স্বেচ্ছাশ্রম ও সরকারি সহায়তার সমন্বয় ঘটিয়ে ১৪০০ খাল খনন ও পুনর্খনন।
গণশিক্ষা কার্যক্রম প্রবর্তন করে অতি অল্প সময়ে ৪০ লক্ষ মানুষকে অক্ষরজ্ঞান দান।
গ্রামাঞ্চলে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় সহায়তা প্রদান ও গ্রামোন্নয়ন কার্যক্রমে অংশগ্রহণের জন্য গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী (ভিডিপি) গঠন।
গ্রামাঞ্চলে চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি বন্ধ করা।
হাজার হাজার মাইল রাস্তা-ঘাট নির্মাণ।
২৭৫০০ পল্লী চিকিৎসক নিয়োগ করে গ্রামীণ জনগণের চিকিৎসার সুযোগ বৃদ্ধিকরণ।
নতুন নতুন শিল্প কলকারখানা স্থাপনের ভেতর দিয়ে অর্থনৈতিক বন্ধ্যাত্ব দূরীকরণ।
কলকারখানায় তিন শিফট চালু করে শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি।
কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও দেশকে খাদ্য রপ্তানীর পর্যায়ে উন্নীতকরণ।
যুব উন্নয়ন মন্ত্রাণালয় ও মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয় সৃষ্টির মাধ্যমে দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে যুব ও নারী সমাজকে সম্পৃক্তকরণ।
ধর্ম মন্ত্রণালয় প্রতিষ্টা করে সকল মানুষের স্ব স্ব ধর্ম পালনের সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধিকরণ।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সৃষ্টি করে প্রযুক্তির ক্ষেত্রে অগ্রগতি সাধন।
তৃণমূল পর্যায়ে গ্রামের জনগণকে স্থানীয় প্রশাসন ব্যবস্থা ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করণ এবং সর্বনিম্ন পর্যায় থেকে দেশ গড়ার কাজে নেতৃত্ব সৃষ্টি করার লক্ষ্যে গ্রাম সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন।
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশের আসনলাভ।
তিন সদস্যবিশিষ্ট আল-কুদস কমিটিতে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি।*.দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে ‘সার্ক’ প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগ গ্রহণ।
বেসরকারিখাত ও উদ্যোগকে উৎসাহিতকরণ।
জনশক্তি রপ্তানি, তৈরি পোশাক, হিমায়িত খাদ্য, হস্তশিল্পসহ সকল অপ্রচলিত পণ্যোর রপ্তানীর দ্বার উন্মোচন।
শিল্পখাতে বেসরকারি বিনিয়োগের পরিমাণ বৃদ্ধি ও বিনিয়োগ ক্ষেত্রের সম্প্রসারণ।
ব্যক্তিস্বার্থের উর্ধে উঠে দেশের জন্য নিবেদিত প্রান জিয়াউর রাহমানকে আজকাল না জেনে অনেকেই অহেতুক দোষারোপ করে যায়। এই জঘন্য ঘৃনিত মনোবৃত্তি কোথা থেকে এসেছে সেই আসল সত্যটা কেউ আজকাল ইতিহাস পড়ে দেখে না। শুধু শহীদ জিয়া নন, বঙ্গবীর জেনারেল ওসমানী, সেক্টর কমান্ডার জলিল সহ এরকম অনেকেই সেই ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ চলাকালেই ভারতের রোশানলে পড়েন। তাদের দোষ ছিল মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রে থাকতে চাওয়া। কিন্তু শফিউল্লাহ, একে খন্দকার বা এই রকমের কিছু কোলাবোরেটর ছিল যারা ভারতের অধীনতা গ্রহণ করায় তারা সর্বদাই দিল্লীর প্রিয় পাত্র।
আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে তাজউদ্দিন ভারতের সাথে ৭ দফা ২৫বছরের অধীনতামূলক চুক্তি করেছিল। শহীদ জিয়া এগুলোর বেশীর ভাগ অগ্রাহ্য করে মধ্যপ্রাচ্য, চীনের সাথে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক গড়ে। এটাই ইন্দিরা গান্ধী মেনে নিতে পারেনি। ইন্দিরা গান্ধীর উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশকে হয় ভারতে ফিরিয়ে নিবে নতুবা আজীবন করদরাজ্য করে রাখবে। কিন্তু জিয়াউর রহমান এতে বাধ সাধেন; ওই নোংরা চাওয়ার মুখে লাত্থি দিয়েছিলেন। এই জন্যই শহীদ জিয়ার নামে কুৎসা রটনা আর কেউ করেনা, করে ভারতের কিছু দালাল।
৭ নভেম্বরের জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস বাংলাদেশে একটি ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সূচনা করে। এই দিনটি শুধু সিপাহী-জনতার বিদ্রোহের প্রতীক নয়, বরং এটি জাতীয় ঐক্য এবং সংহতির মর্মার্থকেও প্রতিফলিত করে। মেজর জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে দেশের যে উন্নয়ন এবং জাতীয়তাবাদী ভাবধারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তা আজও বাংলাদেশের ইতিহাসে সম্মানের সঙ্গে স্মরণ করা হয়।
বাংলা একাডেমির নির্বাহী পরিষদের সদস্য নিযুক্ত হয়েছেন ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশের (আইইউবি) পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এবং গবেষণা ও স্নাতকোত্তর অধ্যয়ন বিভাগের পরিচালক আরশাদ মোমেন। তিন বছরের জন্য সদস্যপদ কার্যকর থাকবে। আরশাদ মোমেন যুক্তরাষ্ট্রের সিরাকিউজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে পিএইচডি এবং মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। আইইউবিতে যোগদানের আগে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। তিনি একজন বিশিষ্ট লেখকও, যিনি বিজ্ঞানের বিভিন্ন ধারণাকে সাহিত্যিক অন্বেষণের সঙ্গে সংমিশ্রিত করেছেন, বিশেষ করে প্রবন্ধে। তাঁর সাহিত্যকর্মের মাধ্যমে তিনি জটিল বৈজ্ঞানিক ধারণাকে সাধারণ মানুষের কাছে আরও সহজবোধ্য করার চেষ্টা করেন। বিজ্ঞপ্তি
১৮তম শিক্ষক নিবন্ধনের মৌখিক পরীক্ষার তারিখ জানিয়ে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে। আগামী রোববার (২৭ অক্টোবর) থেকে এ নিবন্ধনের ভাইভা শুরু হবে।
মঙ্গলবার (২২ অক্টোবর) বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) পরিচালক (পরীক্ষা মূল্যায়ন ও প্রত্যয়ন) কাজী কামরুল আহছান স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরো বলা হয়েছে, মৌখিক পরীক্ষার জন্য নির্বাচিত প্রার্থীদের মৌখিক পরীক্ষার তারিখ, সময় ও স্থান টেলিটকের মাধ্যমে প্রার্থীদের মুঠোফোনে খুদে বার্তার মাধ্যমে জানিয়ে দেয়া হবে।
মৌখিক পরীক্ষার সময় সকল শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ, জাতীয় পরিচয়পত্র ও লিখিত পরীক্ষার প্রবেশপত্র সঙ্গে আনতে হবে।
এবার ১০টি বোর্ডে মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হবে। প্রতিটি বোর্ডে তিনজন করে দায়িত্বে থাকবেন। এদের মধ্যে একজন বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা, একজন অধ্যাপক বা সহযোগী অধ্যাপক এবং এনটিআরসিএ’র একজন কর্মকর্তা থাকবেন। প্রতিদিন ৭০০ জন প্রার্থীর ভাইভা নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এক্ষেত্রে একটি বোর্ড প্রতিদিন ৭০ জনের ভাইভা নেবেন।
তথ্যমতে, ১৮তম শিক্ষক নিবন্ধনের লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন ৮৩ হাজার ৮৬৫ জন। এর মধ্যে স্কুল ও সমপর্যায়ের ৫৫ হাজার ৮৯০ জন, স্কুল-২ পর্যায়ের ৫ হাজার ৩২৩ জন এবং কলেজ ও সমপর্যায়ের ২২ হাজার ৬৫২ জন পরীক্ষার্থী লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়।
মানুষ যা সত্য বলে বিশ্বাস করে এবং যাকে সে দীন হিসাবে গ্রহণ করে তাই তার আকীদা। এ আকীদাটি যদি আল্লাহ তা‘আলার প্রেরিত রসূলগণের দীন এবং তার নাযিলকৃত কিতাবসমূহ অনুযায়ী হয়, তাহলে তা সহীহ আকীদা হিসাবে গণ্য হয়। তার মাধ্যমে আল্লাহর আযাব থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে এবং দুনিয়া ও আখিরাতে সৌভাগ্য লাভ করা যাবে।
আর এ আকীদা যদি আল্লাহ তা‘আলার প্রেরিত রসূলগণের আনীত আকীদার বিরোধী হয় এবং তার নাযিলকৃত আসমানী কিতাবসমূহের পরিপন্থী হয়, তাহলে তার অনুসারীরা আযাবের সম্মুখীন হবে এবং দুনিয়া ও আখিরাতে হতভাগ্য হবে।
কেউ পরিশুদ্ধ আকীদা গ্রহণ করলে দুনিয়াতে তার জান-মাল নিরাপদ থাকবে এবং অন্যায়ভাবে তার উপর আক্রমণ করা নিষিদ্ধ হবে।
‘‘আমাকে মানুষের সাথে জিহাদ করার আদেশ দেয়া হয়েছে যতক্ষণ না তারা এ সাক্ষ্য দিবে যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর রসূল এবং সালাত প্রতিষ্ঠা করবে ও যাকাত দিবে। যখন তারা এ কাজগুলো সম্পাদন করবে তখন তারা আমার হাত থেকে নিজেদের জান ও মাল নিরাপদ করে নিবে’’।[1]
‘‘যে ব্যক্তি ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলবে এবং আল্লাহ ব্যতীত অন্যান্য বাতিল মাবুদের ইবাদতকে অস্বীকার করবে, তার জান-মাল মুসলিমদের নিকট সম্পূর্ণ নিরাপদ থাকবে এবং তার অন্তরে লুকায়িত বিষয়ের হিসাব আল্লাহর উপরই ন্যস্ত হবে’’।[2]
এ পরিশুদ্ধ আকীদাই কিয়ামতের দিন বান্দাকে আল্লাহর আযাব থেকে বাঁচাবে। মুসলিম শরীফে জাবের রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে মারফু সূত্রে বর্ণিত হয়েছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
‘‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক না করে মৃত্যু বরণ করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর যে ব্যক্তি তার সাথে কাউকে শরীক করে মৃত্যু বরণ করবে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে’’।[3]
ইমাম বুখারী ও মুসলিম সাহাবী ইতবান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেছেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
‘‘আল্লাহ তা‘আলা এমন ব্যক্তির উপর জাহান্নামের আগুন হারাম করে দিয়েছেন, যে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে লা- ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলেছে’’।[4]
শাইখ ড. ছলিহ ইবনে ফাওযান আল ফাওযানের লেখা ‘আল ইরশাদ- সহীহ আকীদার দিশারী’ বইটি ইসলামের সঠিক আকীদা, তাওহীদ, শিরক থেকে মুক্ত থাকার গুরুত্ব এবং কুরআন-হাদীসের আলোকে সহীহ বিশ্বাসের দিকনির্দেশনা প্রদান করে।
পরিশুদ্ধ আকীদার মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলা মানুষের সমস্ত গুনাহ মোচন করে দেন। ইমাম তিরমিযী আনাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন যে, আমি রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, আল্লাহ তা‘আলা হাদীছে কুদছীতে বলেছেন,
‘‘হে বনী আদম! তুমি যদি যমীন পরিপূর্ণ গুনাহ্ নিয়ে আমার কাছে আগমন করো এবং আমার সাথে অন্য কিছুকে শরীক না করে মিলিত হও, তাহলে যমীন পরিপূর্ণ ক্ষমাসহ আমি তোমার সাথে সাক্ষাৎ করবো।[5]
হাদীছের শব্দ قرابها অর্থ হলো ملؤها অর্থাৎ যমীন ভর্তি বা তার কাছাকাছি। সুতরাং আল্লাহ তা‘আলার ক্ষমা পাওয়ার শর্ত হলো শিরকমুক্ত পরিশুদ্ধ আকীদা থাকা চাই। চাই শিরকের পরিমাণ বেশী হোক বা কম হোক, ছোট শিরক হোক বা বড় শিরক হোক। যার আকীদা শিরকমুক্ত হবে সেই মুক্ত ও পরিশুদ্ধ অন্তরের মালিক বলে গণ্য হবে। এ শ্রেণীর লোকের ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
‘‘সেদিন ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি কোনো উপকারে আসবে না; কিন্তু যে পরিশুদ্ধ অন্তর নিয়ে আল্লাহর কাছে আসবে’’। (সূরা শুআরা: ৮৮-৮৯)
আল্লামা ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম রহিমাহুল্লাহ ইতবান ইবনে মালেকের হাদীছের ব্যাখ্যায় বলেন, সেসব পরিশুদ্ধ তাওহীদের অধিকারীগণ ক্ষমাপ্রাপ্ত হবে, যারা তাদের তাওহীদের সাথে শিরক মিশ্রিত করেনি। আর যাদের অবস্থা শিরকমুক্ত হবে না, তারা ক্ষমাপ্রাপ্তও হবে না।
সুতরাং তাওহীদপন্থী যে লোক আল্লাহর সাথে কোনো কিছুকে শরীক না করা অবস্থায় যমীন ভর্তি গুনাহ নিয়ে সাক্ষাৎ করবে, আল্লাহ তা‘আলা তার সাথে যমীন ভর্তি ক্ষমা নিয়ে সাক্ষাৎ করবেন। যার তাওহীদ ত্রুটিযুক্ত হবে, সে এ ফযীলত অর্জন করতে পারবে না। সুতরাং যে খাঁটি তাওহীদের সাথে শিরক মিশ্রিত হয় না, তার সাথে কোনো গুনাহ অবশিষ্ট থাকে না। কেননা পরিশুদ্ধ আকীদা আল্লাহ তা‘আলার ভালোবাসা, তার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, তার ভয়, একমাত্র তার নিকট আশা-ভরসা ইত্যাদিকে আবশ্যক করে। আর এটি নিঃসন্দেহে গুনাহ মোচন হওয়ার কারণ। যদিও এটা যমীন ভর্তি হোক না কেন। সুতরাং শিরকের নাপাকী আসতেই পারে। কিন্তু তাকে দূর করার খুব শক্তিশালী মাধ্যম ও উপায় রয়েছে। ইমাম ইবনুল কাইয়্যিমের কথা এখানেই শেষ।
আকীদা বিশুদ্ধ থাকলে আমল কবুল হয় এবং আমল দ্বারা বান্দা উপকৃত হয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
‘‘যে পুরুষ বা নারীই সৎকাজ করবে, সে যদি মুমিন হয়, তাহলে তাকে আমি দুনিয়ায় পবিত্র-পরিচ্ছন্ন জীবন দান করবো এবং আখিরাতে তাদের প্রতিদান দেবো তাদের সর্বোত্তম কাজ অনুসারে’’। (সূরা আন নাহাল: ৯৭)
আর যদি আকীদা পরিশুদ্ধ না হয়, তাহলে বিপরীত হবে। কেননা বাতিল আকীদা সমস্ত আমল বরবাদ করে দেয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
‘‘তোমার প্রতি এবং তোমার পূর্ববর্তীদের প্রতি প্রত্যাদেশ করা হয়েছে, যদি আল্লাহর সাথে শরীক করো, তবে তোমার কর্ম নিস্ফল হবে এবং তুমি ক্ষতিগ্রস্থদের অন্তর্ভুক্ত হবে’’। (সূরা আয যুমার: ৬৫)
‘‘তারা যদি শিরক করতো, তাহলে তাদের আমলসমূহ বরবাদ হয়ে যেতো’’। (সূরা আনআম: ৮৮)
শিরকপূর্ণ বাতিল আকীদার কারণে বানদার জন্য জান্নাত হারাম হয়ে যায় ও সে আল্লাহ তা‘আলার ক্ষমা হতে বঞ্চিত হয়। এর কারণে মানুষ আল্লাহর আযাবের সম্মুখীন হবে এবং চিরকাল জাহান্নামে থাকবে।
‘‘নিশ্চয় আল্লাহ তার সাথে শিরক করার গুনাহ মাফ করবেন না। শিরক ছাড়া অন্যান্য যেসব গুনাহ রয়েছে সেগুলো যাকে ইচ্ছা তিনি ক্ষমা করে দিবেন’’। (সূরা আন নিসা: ৪৮)
নিশ্চয় যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শিরক করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দেন এবং তার বাসস্থান হয় জাহান্নাম। বস্ত্তত যালেমদের কোনো সাহায্যকারী নেই। (সূরা আল মায়েদা: ৭২)
বাতিল আকীদা পোষণকারীর জান ও মালের কোনো নিরাপত্তা থাকে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
‘‘তোমরা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কর ফিতনা (শিরক) অবসান না হওয়া পর্যন্ত এবং দীন পরিপূর্ণরূপে আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট না হওয়া পর্যন্ত’’। (সুরা আল আনফাল: ৩৯)
‘‘অতঃপর মুশরিকদের হত্যা করো। যেখানেই তাদেরকে পাও, তাদেরকে বন্দী এবং অবরোধ করো। আর প্রত্যেক ঘাঁটিতে তাদের সন্ধানে ওঁৎ পেতে বসে থাকো। কিন্তু যদি তারা তাওবা করে, সালাত কায়েম করে এবং যাকাত প্রদান করে তাহলে তাদের রাস্তা ছেড়ে দাও। নিশ্চয়ই আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’’। (সূরা আত তাওবা: ৫)
অপরপক্ষে মানুষের অন্তর, সামাজিক আচার-আচরণ ও জীবন-যাপনে পরিশুদ্ধ আকীদার বিরাট প্রভাব রয়েছে। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যামানায় দু’দল লোক মসজিদ নির্মাণ করেছিল। একদল লোক সৎ নিয়ত ও আল্লাহ তা‘আলার প্রতি সহীহ আকীদা পোষণ করে মসজিদ নির্মাণ করেছিল। অন্য একটি দল অসৎ উদ্দেশ্যে এবং বাতিল আকীদার উপর একটি মসজিদ নির্মাণ করেছিল। অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা তার নবীকে ঐ মসজিদে সালাত আদায় করার আদেশ করলেন, যা তাকওয়া এবং পরিশুদ্ধ ঈমানের উপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আর যে মসজিদ কুফুরী করার জন্য এবং অসৎ উদ্দেশ্যে নির্মিত হয়েছে, তাতে তিনি তার নবীকে সালাতের জন্য দাঁড়াতে নিষেধ করেছেন।
‘‘যারা সত্যের দাওয়াতকে ক্ষতিগ্রস্থ করার উদ্দেশ্যে, কুফুরী করার জন্য, মুমিনদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করার লক্ষ্যে এবং ঐ ব্যক্তির জন্য গোপন ঘাটি বানাবার উদ্দেশ্যে একটি মসজিদ নির্মাণ করেছে যে ইতিপূর্বে আল্লাহ ও তার রসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, তারা অবশ্যই কসম খেয়ে বলবে, ভালো ছাড়া আর কোনো ইচ্ছাই আমাদের ছিল না। কিন্তু আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, তারা একেবারেই মিথ্যাবাদী। তুমি কখনো সেখানে দাঁড়াবে না, তবে যে মসজিদের ভিত্তি স্থাপন করা হয়েছে তাকওয়ার উপর প্রথম দিন থেকেই, সেটিই তোমার দাঁড়াবার যোগ্য স্থান। সেখানে রয়েছে এমন লোক, যারা পবিত্রতা অর্জন করাকে ভালোবাসে। আর আল্লাহ পবিত্র লোকদের ভালবাসেন। তুমি কি মনে করো, যে ব্যক্তি আল্লাহ ভীতি ও তার সন্তুষ্টি অর্জনের উপর নিজের ইমারতের ভীত্তি স্থাপন করলো সে ভাল, না যে ব্যক্তি তার ইমারতের ভিত উঠালো পতনমুখী একটি গর্তের কিনারায়, অতঃপর তা তাকে নিয়ে সোজা জাহান্নামের আগুনে গিয়ে পড়লো? এ ধরণের যালেমদেরকে আল্লাহ কখনো সোজা পথ দেখান না’’। (সূরা আত তাওবা: ১০৭-১০৯)
[1] . বুখারী, অধ্যায়: কিতাবুল ঈমান।
[2] . মুসলিম, অধ্যায়: লা-ইলাহা পাঠ না করা পর্যন্ত লোকদের সাথে জিহাদ করার আদেশ।
[3]. সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: যে ব্যক্তি শিরক করে মৃত্যু বরণ করল, সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।
[4] . বুখারী, অধ্যায়: বাড়িঘরে সালাতের স্থান নির্ধারণ করা, মুসলিম, অধ্যায়: জামা‘আতের সাথে সালাত পড়া হতে বিরত থাকার অনুমতি।
[5] . তিরমিযী, অধ্যায়: গুনাহ্ করার পর বান্দার জন্য আল্লাহর ক্ষমা। ইমাম আলবানী (রহি.) হাদীছটিকে সহীহ বলেছেন। দেখুন: সিলসিলায়ে সহীহা, হা/১২৭।
পতিত স্বৈরাচারের ঢেলে সাজানো প্রশাসনের কর্তারা আওয়ামী মন্ত্রীদের দুর্নীতির নানা দলিলপত্র গোপন করে ফেলার খবর পাওয়া যাচ্ছে। রাষ্ট্র চালানোর নানা ইস্যুতে সাম্প্রদায়ক দাঙ্গা- দ্বন্দ্ব সৃষ্টির চেষ্টা অব্যাহত রেখে অস্থিরতা তৈরির ষড়যন্ত্র হচ্ছে। প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্র্তী সরকারকে ব্যর্থ করার জন্য সমন্বিত ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। এর অংশ হিসেবে দেশের রফতানি আয়ের প্রধান উৎস পোশাক খাতে অস্থিরতা তৈরি করা হচ্ছে। নিত্যপণ্যের সরবরাহ লাইনে বিঘ্ন ঘটানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। প্রশাসন যাতে সঠিকভাবে কাজ করতে না পারে, তার জন্য পতিত স্বৈরাচারের অনুগতদের মাঠ প্রশাসনসহ গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোয় বসানোর আয়োজন করা হচ্ছে।
ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম বলেছেন, “বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রায় দুই মাস সময় পূর্ণ করেছে। এই সরকারের কাছে জনগণের আশা আকাঙ্খা অনেক। তবে এখনো মানুষের মধ্যে এক ধরনের উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তা কাজ করছে। কারণ সংস্কার কর্মকাণ্ডে অগ্রগতি আশানুরূপ নয়।” তিনি বলেন, “কোনো অবস্থাতেই দেশের মানুষকে নিরাশ করা যাবে না। আমাদের সবাইকে সরকারকে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে আসতে হবে। যৌথ প্রচেষ্টার মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে এবং সংস্কারের কাজ সম্পন্ন করতে হবে।”
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে নিহত ব্যক্তিদের নিয়ে রাজনীতি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন জাতীয় নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। তিনি অভিযোগ করে বলেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল টাকার বিনিময়ে জঘন্যভাবে শহীদদের কোরবানির পশুর হাটের মতো কেনাবেচা করছে। কোনো দলের নাম উল্লেখ না করে তিনি বলেন, ‘সেসব রাজনীতিবিদকে আমরা ধিক্কার জানাচ্ছি। আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসার নামে যাঁরা রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার জন্য ঘৃণ্য-জঘন্য কাজে লিপ্ত হয়েছেন, আপনাদের চাপিয়ে দেওয়া এই জঘন্য কৃষ্টি-কালচার অতি সত্বর পরিত্যাগ না করলে তরুণসমাজ আপনাদের ডাস্টবিনে ছুড়ে ফেলবে। সব রাজনৈতিক দলের প্রতি আহ্বান, এখনো সময় আছে, জনগণ, তরুণ ও শিক্ষার্থীদের পালস (মন) বোঝার চেষ্টা করুন।’
এ সময় সরকারের সমালোচনাও করে নাসীরুদ্দীন বলেন, ফেনী, কুমিল্লাসহ কয়েক জেলায় বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো অকার্যকর ছিল। দুই মাস পেরিয়ে গেলেও শহীদদের পরিবারের পুনর্বাসনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। আহত ব্যক্তিদের অনেকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালগুলোতে ঘুরছেন, অনেকে অন্ধ ও পঙ্গু হয়ে যাচ্ছেন। তাঁদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে তিনি শ্রমিক অঙ্গন ও পাহাড়ে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানান।
নাগরিক কমিটির সদস্যসচিব আখতার হোসেন বলেন, এখন পর্যন্ত গণহত্যার বিচার শুরু হয়নি। সরকারের কাছে আহ্বান, যারা গণহত্যা করেছে, গুলি করেছে, যারা হুকুম দিয়েছে, আদালতে বিচারপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রত্যেকের যেন শাস্তি নিশ্চিত করা হয়৷ সরকারের ভারতনীতি প্রসঙ্গে আখতার হোসেন বলেন, বর্তমান সরকার কোনোভাবেই ভারতের সঙ্গে নতজানু নীতিতে থাকতে পারে না। এই সরকারকে ভারতের সঙ্গে চোখে চোখ রেখে কথা বলার সাহস রাখতে হবে৷
বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করলে মনে হয়, তাদের অনেকেই ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতি দুর্বল। অথচ ঐ আওয়ামী স্বৈরাচারী সরকার গণআন্দোলনের সময় ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। বিশেষত গত ১৫ বছরে গণতন্ত্রকে নিশ্চিহ্ন ও ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠা করেছে। অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আইন, বিচার ব্যবস্থা ও নির্বাচন পদ্ধতি ধ্বংস করেছে। সর্বস্তরে আত্মীকরণ ও দলীয়করণ, মানবাধিকার লঙ্ঘন, গুম-খুন, জনগণের ওপর নির্যাতন-জুলুম, মেগা প্রকল্পের আড়ালে ব্যাপক দুর্নীতি, বিশাল ঋণ নিয়ে লুটপাট এবং বিদেশে লক্ষ কোটি টাকা পাচার এসব নজিরবিহীন অপরাধ সংঘটিত করেছে।
সচেতন মহল প্রশ্ন করছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে, গণশত্রু আওামীলীগের নিবন্ধন বাতিল করার জন্য আরও কত মানুষ শহীদ হওয়ার প্রয়োজন ছিল? প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী তাতে এ যাবৎ সর্বমোট ১৫৮১ জন শহীদ হয়েছে। সরকারের উচিত, কত জন ছাত্র-ছাত্রী, কোন বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শহীদ হয়েছে, কোনো রাজনৈতিক দলের কত জন শহীদ হয়েছে এবং সাধারণ মানুষ কত জন শহীদ হয়েছে- তা জনসম্মুখে তুলে ধরা উচিত। এছাড়া অনুরূপভাবে আহতদের তালিকাও প্রস্তুত করা প্রয়োজন। এতে জনগণ একটি সুস্পষ্ট ধারণা পাবে। পতিত স্বৈরাচারের সুবিধাভোগী কর্মকর্তা গণতন্ত্র হত্যা, মানবাধিকার লংঘন এবং দেশের অর্থনৈতিক দুরবস্থার জন্য দায়ী, তাদেরকে এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার করা হয় নাই। যেমন ড. মশিউর রহমান, কবির বিন আনোয়ার এবং তথাকথিত মেজর জেনারেল তারেক সিদ্দিক, এদেরকে গ্রেপ্তার না হওয়ার কারণ কেউ জানেনা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল ৫ আগস্ট স্বৈরাচার হাসিনা সরকারের পতনের পরপরই হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে ইউনিফর্ম পরা কয়েকশ ব্যক্তি দৌড়ে ভারতের বিশেষ বিমানের মাধ্যমে পালিয়ে যায়। এরা কারা, তা নিয়েও জনমনে প্রশ্ন রয়েছে।
বিডিনিউজ টুয়েন্টিফোর ওয়েবসাইট থেকে নেয়া।
দেশে ব্যবসায়ীদের মধ্যে ৮-১০ জন বড় ক্রিমিনাল রয়েছে। যারা একনায়কত্ব কায়েম করার জন্য শেখ হাসিনাকে অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়েছে। এই ক্রিমিনালগুলো দেশের ব্যবসাবাণিজ্য এবং অর্থনীতি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করেছে, বড় বড় প্রকল্প নিয়ন্ত্রণ করেছে। এদের মধ্যে অনেকে অনৈতিক কাজেও লিপ্ত ছিল। নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য দেশের অর্থনীতি এবং গণতন্ত্রকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করেছে। রাজনীতিবিদরা তাদের মাধ্যমে বিদেশে টাকা পাচার করেছে। অন্যদিকে তাদের চুরির টাকাও বিদেশে পাচার করে ব্যাংকগুলোকে ঋণগ্রস্ত করেছে।
এত কিছুর পরও প্রফেসর ইউনূসের সরকারের প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বিস্ময়কর সমর্থনের কারণে কোনো ষড়যন্ত্রই খুব বেশি অগ্রসর হতে পারছে না। প্রধান উপদেষ্টা জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশন উপলক্ষে তার সংক্ষিপ্ত যুক্তরাষ্ট্র সফরে ৫৭টি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছেন। প্রতিটি অনুষ্ঠানে তাকে বিপুলভাবে স্বাগত জানানো হয়েছে। উন্নয়ন সহযোগী দেশ ও সংস্থাগুলো বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংকটে সহায়তার জন্য উদারভাবে এগিয়ে এসেছে।
বিডিনিউজ টুয়েন্টিফোর ওয়েবসাইট থেকে নেয়া।
এ সময় বাংলাদেশে সংস্কার বিষয়ে জাতিসংঘ সব ধরনের সহায়তার অঙ্গীকার করেছে। বলা হয়েছে, নতুন বাংলাদেশ গঠনের জন্য ঢাকার পাশে থাকবে জাতিসংঘ। জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস নিউইয়র্কে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সাথে দেখা করেন। সেই আলোচনার সময় বাংলাদেশ ও জাতিসংঘের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার প্রশংসা করেন তিনি। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বিশেষ ভূমিকার কথা তিনি উল্লেখ করেন। সেই সঙ্গে বাংলাদেশে রাজনৈতিক সংস্কারের বিষয়ে সব ধরনের সহায়তাদানের প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি।
এ সময়ে প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন, চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী, ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ, নেপালের প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলিসহ অনেক বিশ্বনেতার সাথে সাইডলাইনে সাক্ষাৎ ও বৈঠক করেছেন। তারা অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি সব ধরনের সমর্থন জ্ঞাপন করেন।
প্রাপ্ত তথ্যানুসারে, এসব তৎপরতার মাধ্যমে সরকারের পতন ঘটানো না গেলে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা ভারতীয় লবিকে ব্যবহার করে ঢাকার সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করা হবে। এর মধ্যে অন্তর্বর্তী প্রশাসনে যাতে ভারতপন্থীরা বহাল থাকে, তার জন্য একটি নেটওয়ার্ক তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে জনপ্রশাসনে সচিব ও যুগ্ম সচিব এপিডিসহ কর্মকর্তাদের একটি নেটওয়ার্ক তৈরি করা হয়েছে। তারা প্রধান উপদেষ্টার জনপ্রশাসন বিষয়ক উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার ও তার একান্ত সচিব আওয়ামী লীগ অনুগত কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিকে দিয়ে আগের সরকারের সব সচিবকে স্বপদে বহাল রাখার চেষ্টা করছে। সম্প্রতি জেলা প্রশাসক নিয়োগের ক্ষেত্রে তাদের সাফল্য এসেছে বলে জানা গেছে।
সাবেক সরকারের অনুগত প্রশাসনিক কর্মকর্তারা সরকারের ভেতরে থেকে সরকারকে ব্যর্থ করার জন্য সন্তর্পণে এজেন্ডা বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করছে। তারা মনে করছে, প্রফেসর ইউনূসের সরকারকে ব্যর্থ করা গেলে এরপর যে সরকারই আসুক না কেন, স্বৈরাচারের গণহত্যা ও অন্যান্য লুটপাটের বিচার থেকে তারা রেহাই পাবে। স্বৈরাচারের মন্ত্রী ও প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের পালিয়ে যেতেও তারা সহায়তা করেছে বলে জানা গেছে।
মূলকথা হচ্ছে, সংস্কারটা খুব জরুরি দরকার। কারণ এ দেশের মানুষ গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা, সুশাসন, বৈষম্যহীন সমাজ, সমৃদ্ধি, শান্তি-শৃঙ্খলা আর ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখে। কিন্তু বারবারই আমরা দেখেছি মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটেছে। স্বেচ্ছাচারিতা, ঘুষ-দুর্নীতি, লুণ্ঠন, অর্থপাচার, আত্মসাৎ, চাঁদাবাজি, পেশিশক্তির ব্যবহার, অবৈধ কর্মকাণ্ড, বৈষম্য, মানবাধিকার লঙ্ঘন থেমে থাকেনি। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন হওয়ার পর খুব স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার পারদ ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। মানুষ ভেবেছে, নতুন সরকার রাষ্ট্রযন্ত্র সংস্কার করবে। উদার, গণতান্ত্রিক, বৈষম্যহীন, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের ভিত রচনা করবে। একনায়কতন্ত্র ও স্বৈরশাসনের পুনরাবৃত্তি বন্ধ করে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করবে। দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনবে। অর্থনীতিতে আস্থা ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করে দেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেবে। বৈষম্যহীন সমাজ গড়বে। দারিদ্র্য নির্মূল করবে। জীবনমানের উন্নয়ন ঘটাবে।
অতীত অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো রাজনৈতিক সরকারই জনগণের প্রত্যাশিত উদার অসাম্প্রদায়িক গণতন্ত্র; বৈষম্যহীন সমাজ; বাকস্বাধীনতা, মানবাধিকার, সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট হয়নি। এ অবস্থায় অন্তর্বর্তী সরকারকেই রাষ্ট্রযন্ত্রের সংস্কার সম্পন্ন করার দায়িত্ব নিতে হবে।
আমাদের প্রত্যাশা যথাসময়ে সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়িত হবে।