Wednesday, April 15, 2026
হোমফিচারঈদ সংস্কৃতি: নানান জাতের নানান রকম

ঈদ সংস্কৃতি: নানান জাতের নানান রকম

মুসলমানদের নিকট ঈদ মানেই এক আধ্যাত্মিক খুশির নাম। অঞ্চল ভেদে ঈদের আমেজে আছে ভিন্নতা, আছে বৈচিত্র্যতা। বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর ঈদ সংস্কৃতি নিয়ে আমাদের বিশেষ ফিচার। ফিচার তৈরিতে দৈনিক ইত্তেফাক, সময়ের আলো, ডেইলি স্টারে প্রকাশিত প্রতিবেদনের সহযোগিতা নেওয়া হয়েছে।

সৌদি আরব

ঈদুল ফিতর উপলক্ষে সৌদিরা বিভিন্ন উৎসবমুখর অনুষ্ঠান এবং বিনোদনমূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে আনন্দ ভাগাভাগি করে নেয়। দিনটি উদযাপনের অংশ হিসাবে দেশটি জাঁকজমক সাজে সাজানো হয়। পরিবার এবং বন্ধুরা সাধারণত ঈদের বিশেষ খাবারের জন্য একত্রিত হয়। সকালে খাবার পরিবেশন করার আগে পরিবারের বাচ্চারা বয়স্কদের থেকে ‘সালামি’ নেয়।

সৌদি আরবে ঈদে একটি অনন্য ঐতিহ্য হলো- স্থানীয়রা কম তুলনামূলক গরীব কিংবা সবার বাসার দরজায় প্রচুর পরিমাণে নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী ও খাবার রেখে যান। সৌদিতে ঈদের স্পেশাল খাবারের মধ্যে রয়েছে মুগলগাল, জেরিশ এবং ঘুরাইবাহ। মুগলগাল সৌদি আরবের অন্যতম বিখ্যাত খাবার। ঈদের সময় সাধারণত উপভোগ করা এই খাবারে মশলার সাথে ভাজা ভেড়ার মাংস, তাজা টমেটো, পেঁয়াজ এবং সবুজ মরিচ থাকে। দেশটিতে ঈদুল ফিতর ‘মিষ্টি ঈদ’ হিসাবেও পরিচিত। দিনটিতে বিভিন্ন ধরণের মিষ্টি খাবার খাওয়া হয়।

তুরস্ক

তুরস্কে ঈদুল ফিতর ‘সেকের বায়রাম’ নামেও পরিচিত, যার অর্থ ‘চিনির উৎসব’। দেশটিতে জাতীয়ভাবে উদযাপিত সমস্ত উত্সবকে ‘বায়রাম’ হিসাবে উল্লেখ করার ঐতিহ্য রয়েছে। ঈদ-বায়রামের আনন্দ দেশব্যাপী ঐতিহ্যের সাথে মিশে যায়। তুর্কিরা সাধারণত একে অপরকে ‘বায়রামিনিজ মুবারেক ওলসুন’ বা ‘বায়রামিনিজ কুতলু ওলসুন’ দিয়ে সম্বোধন করে।

প্রার্থনা এবং পারিবারিক সমাবেশ ঘটে দিনটিতে। সবাই মিলে বিশেষ করে শিশুরা দেশটির বিভিন্ন ঐতিহ্যগত আনন্দে মাতে। দিনের একটা অংশে আনন্দ-উদযাপন শেষে তুর্কিরা তাদের কাছের এবং প্রিয়জনদের সাথে দেখা করেন, শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। মূলত সবাই সবার প্রতি সৌহার্দ্যপূর্ণ আনন্দের মধ্য দিয়ে দিনটি পার করে।

মালেশিয়া
মালয়েশিয়ানরা ঈদের আগের দিন তাদের নিজ নিজ শহরে ভ্রমণে বের হয়। উত্সবের আগের দিনটি তাদের জন্য সবচেয়ে ব্যস্ত সময় থাকে। তারা পেলিটা’ (তেলের প্রদীপ) দিয়ে ঘর সাজায় এবং ঐতিহ্যবাহী নানা খাবার প্রস্তুত করে। কেতুপাট, কুইহ রায়া, লেমাং, রেন্ডিং ইত্যাদি দেশোটিতে ঈদের দিনের জনপ্রিয় খাবার। সবাই মিলেমিশে খাওয়াদাওয়া ও শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। মালয়েশিয়ার দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য হলো ‘উন্মুক্ত ঘর’। যেখানে খাবারের পাশাপাশি সবাই মিলে আনন্দ-আয়োজনের সঙ্গে ভালো সময় উপভোগ করার জন্য একত্রিত হয়।

মিশর
মিশরীয়রা ঈদ-উল-ফিতরের দিনটি পরিবার এবং বন্ধুদের সাথে ভোজ এবং সময় কাটানোর মাধ্যমে পার করে। দিনটিতে সবাই ‘ফাত্তার’ নামক বিশেষ খাবার প্রস্তুত করে। এটি ভাত, মাংস ও রুটির মিশ্রণ এবং কুনাফা, পনির দিয়ে তৈরি একটি মিষ্টান্ন। মিশরীয়দেরও তাদের সন্তানদের জন্য নতুন জামাকাপড় এবং নানা আয়োজনের ঐতিহ্য রয়েছে।

নিউজিল্যান্ড
নিউজিল্যান্ডে মসজিদ বা বাহিরের খোলা স্থানে নামাজের মধ্য দিয়ে ঈদ উদযাপন শুরু হয়। তারপর মুসলিমরা সমেবেত হন ও বিভিন্ন পরিবার উপহার বিনিময় করে। একসাথে ঐতিহ্যবাহী খাবারও খাওয়া হয়। সম্প্রতি অকল্যান্ড, ওয়েলিংটন এবং ক্রাইস্টচার্চের মতো বড় শহরগুলোতে ঈদ উত্সব আরও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, খাবারের স্টল এবং শিশুদের জন্য বিনোদনের ব্যবস্থা থাকে। দেশটির অকল্যান্ডে বাড়িঘর পরিচ্ছন্নতার মাধ্যমে দিন শুরু হয়। তারপর ইডেন পার্কে যান্ত্রিক ষাঁড়, হিউম্যান ফুসবল এবং বিভিন্ন স্থানে অস্থায়ীভাবে খাবার বিক্রি করা হয়। এই উদযাপন মুসলিম সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং বৃহত্তর নিউজিল্যান্ড সম্প্রদায়ের মিশ্রণকে প্রতিফলিত করে, দেশের বৈচিত্র্য এবং অন্তর্ভুক্তি প্রদর্শন করে।

ইন্দোনেশিয়ায়
ইন্দোনেশিয়ায় ঈদ-উল-ফিতরকে ‘হারি রায়া ঈদুল ফিতর’ বলা হয়। উদযাপন শুরু হয় তাকবির পাঠের মাধ্যমে, যা ঈদের আগের রাত থেকে শুরু হয়। ঈদের সকালে বিশাল খোলা মাঠে ঈদের নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। নামাজ শেষে আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের বাড়িতে গিয়ে ক্ষমা চাওয়া ও শুভেচ্ছা বিনিময় ইন্দোনেশিয়ার অন্যতম ঐতিহ্য।
দেশটিতে এই উৎসবের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ‘মুদিক’, যার অর্থ নিজের জন্মভূমিতে ফিরে যাওয়া। লাখো মানুষ ঈদের ছুটিতে শহর থেকে গ্রামে ফিরে পরিবার-পরিজনের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেন। মুদিক এত গুরুত্বপূর্ণ যে, সরকার বিনামূল্যে গণপরিবহনের ব্যবস্থা করে।

ইন্দোনেশিয়ার ঈদ শুধু ধর্মীয় আচার নয়, এটি পরিবার ও ঐতিহ্যের এক অপূর্ব মেলবন্ধন।

যুক্তরাষ্ট্র

যুক্তরাষ্ট্রে ঈদুল ফিতর মুসলিমদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব। দেশটিতে এই উৎসব বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নিয়ে উদযাপিত হয়। মুসলিমরা ঈদের নামাজ মসজিদ বা খোলা মাঠে আদায় করে এবং তারপর পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দ উদযাপন করে।

এছাড়া আমেরিকান মুসলিমরা সাধারণত ‘কমিউনিটি সার্ভিস প্রকল্পে’ অংশগ্রহণ করেন। যেখানে তারা অসহায়দের সাহায্য করতে কাজ করেন। যুক্তরাষ্ট্রে ঈদ উদযাপনগুলো সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক অপূর্ব মিশ্রণ, যেখানে ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরিধান, সঙ্গীত শোনা এবং ঐতিহ্যবাহী খাবার গ্রহণ করার রীতি পালন করা হয়।

নাইজেরিয়া

পশ্চিম আফ্রিকার দেশ নাইজেরিয়া। প্রায় ২২ কোটি জনসংখ্যার এই দেশটির অর্ধেক মুসলিম। আর তাই ঈদ বেশ ঘটা করেই পালিত হয় দেশটিতে। অধিকাংশ নাইজেরিয়ান মুসলমান থাকেন দেশটির উত্তর প্রান্তে, সেখানে রোজার ঈদের স্থানীয় নাম আস সাল্লাহ, যার অর্থ আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো।

আর আল্লাহকে কৃতজ্ঞতা জানাতে নতুন পোশাক পরে প্রতিটি পরিবারের নারী-পুরুষ ছেলে-বুড়ো সবাই মিলে ঈদের সকালে নামাজে যায়, যা স্থানীয় ভাষায় ‘দুরবার’ নামে পরিচিত।

ঐতিহ্যবাহী খাবারে মাঝে সুয়া (শিক কাবাবের মতো খাবার), জল্লফ রাইস (টমেটো, মশলা এবং নানা সবজি দিয়ে রান্না করা ভাত) এবং মইন মইন (সেদ্ধ মটরের পুডিং) ঈদের দিন খুব জনপ্রিয়।

উজবেকিস্তান

মধ্য এশিয়ার দেশ উজবেকিস্তানেও ঈদুল ফিতর অন্যতম এক আনন্দের দিন। স্থানীয়দের কাছে দিনটি পরিচিত ‘রুজা হায়িত’ নামে। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ থাকা উজবেকিস্তানে দীর্ঘদিন ঈদে কোনো ছুটি ছিল না। তবে স্বাধীনতা ঘোষণার পর দেশটিতে তিন দিনব্যাপী ছুটি নিয়ে ঈদ উদযাপন করা হয়। ঈদের আগের দিনটিকে তারা বলে আরাফা। আর এই দিনে প্রায় প্রতিটি উজবেক পরিবারে ঐতিহ্যবাহী প্যাস্ট্রি কুশ টিল, বুগিরসক; অভিজাত প্যাস্ট্রি ওরামা, চাক-চাক ইত্যাদি তৈরি করা হয়। আর রাতে ঘরে ঘরে উজবেক প্লভ রান্না হয়। এটি বিরিয়ানির মতো খাবার হলেও অঞ্চলভেদে রান্নায় অনেক বৈচিত্র্য থাকে। একে অপরের বাড়িতে প্লভ পাঠানোও জনপ্রিয় একটি রীতি।

ঈদের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, যে বাড়িতে নতুন বিবাহিত কনে আছে সেই বাড়িতে আত্মীয় প্রতিবেশীরা বেড়াতে আসেন। আবার বাচ্চারাও পাড়া ঘুরে নতুন বউয়ের প্রশংসা করে মিষ্টি-চকলেট আদায় করে নেয়।

তিউনিশিয়া

আফ্রিকার সর্বোত্তরের দেশ তিউনিশিয়ায় ঈদ অন্যতম আনন্দের উপলক্ষ্য। মুসলিম অধ্যুষিত দেশটিতে ঈদ শুরু হয়ে যায় অনেকটা আমাদের মতোই, চাঁদরাত থেকে। এমনিতেই রমজান জুড়ে অনেক রাত পর্যন্ত বাজার খোলা থাকে। কিন্তু চাঁদরাতে খাবার স্টল, দোকানপাট সব প্রাণবন্ত থাকে একদম ফজর পর্যন্ত।

নারী-পুরুষ-শিশু সবাই ঈদের আনন্দে রাতভর ঘুরে বেড়ায়। ঈদের নামাজের পর তিউনিশিয়ান মুসলিমদের পছন্দের খাবার হলো খেজুর আর অলিভ অয়েলে তৈরি মিষ্টি খাবার আসসিদা। আরও থাকে বাকলাভা, কাক ভারকা, ঘ্রাইবা, ম্লাবেস, মাকরৌদ ইত্যাদি ঐতিহ্যবাহী পেস্ট্রি। আর এসব তৈরি করার জন্য ঈদের কয়েক রাত আগে থেকেই সারা রাতজুড়ে বাড়ির মেয়েরা (বিশেষ করে বয়স্করা) গান গাইতে গাইতে কাজ করে যায়। আর ছেলেরা পেস্ট্রির মিক্সচার নিয়ে যায় স্থানীয় কোনো বেকারিতে। সেখানেই বড় চুল্লিতে চলে পেস্ট্রি বানানো। পুরো এলাকা পেস্ট্রির সুবাসে ভরে ওঠে।

এই সম্পর্কিত আরও আর্টিকেল দেখুন

একটি উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

সর্বাধিক পঠিত