নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজধানীর মগবাজারে আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একটি ভবনে থাকা বেকারি ও সেখানে জমে থাকা পানি নবজাতকদের মৃত্যুর ঘটনার সঙ্গে কোনোভাবে সম্পর্কিত কি না, তা খতিয়ে দেখার কথা জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন। একই দিন হাসপাতাল পরিদর্শন শেষে গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর হামলা ও ধাওয়ার অভিযোগ উঠেছে হাসপাতালের নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের বিরুদ্ধে।
শনিবার (৩০ মে) বিকেলে আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস এবং অতিরিক্ত মহাপরিচালক ডা. জাহিদ রায়হান।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী প্রথমে হাসপাতালের নিওনেটাল ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (এনআইসিইউ) পরিদর্শন করেন। পরে কলেজ ভবনের আটতলায় অবস্থিত একটি বেকারি ঘুরে দেখেন। শেষে তিনি দ্বিতীয় তলার পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ড পরিদর্শন করেন, যেখানে গত বুধবার ভর্তি থাকা ছয় নবজাতকের মৃত্যু হয়েছিল।
পরিদর্শন শেষে সরদার সাখাওয়াত হোসেন বলেন, হাসপাতালের পাশের একটি ভবনের আট বা নয়তলায় বেকারিটি অবস্থিত, যা একটি সেতুর মাধ্যমে হাসপাতালের সঙ্গে সংযুক্ত। সেখানে দুটি বৈদ্যুতিক ওভেন রয়েছে। পরিদর্শনের সময় তিনি কোনো বৈদ্যুতিক প্রকৌশলী পাননি, একজন যান্ত্রিক সহকারীকে পেয়েছেন। এছাড়া সেখানে ময়লা-আবর্জনা ও জমাট পানি দেখতে পেয়েছেন বলেও জানান তিনি।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, “ওই জমাট পানি এবং রুটির কারখানা থেকে এমন কোনো পদার্থ বা গ্যাস নির্গত হচ্ছে কি না, যা নবজাতকদের সহ্যক্ষমতার বাইরে, তা পরীক্ষা করা হবে। রুটির কারখানা থেকে কোনো ধরনের গ্যাস নির্গত হয়ে নবজাতকদের ক্ষতি করেছে কি না, সেটিও আমরা খতিয়ে দেখছি।”
তিনি জানান, বিষয়টি পরীক্ষা করতে বিশেষজ্ঞরা কাজ করছেন এবং রোববার আরও একটি বিশেষজ্ঞ দল কারখানাটি পরিদর্শন করবে।
তবে বেকারির অবস্থান ও কার্যক্রম নিয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন হাসপাতালটির পরিচালক সিদ্দিকুর রহমান। তিনি বলেন, বেকারিটি হাসপাতালের দ্বিতীয় তলার পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ড থেকে অনেক দূরে এবং কলেজ ভবনের আটতলায় অবস্থিত। সেখানে গ্যাস ব্যবহার করা হয় না, সবকিছু বৈদ্যুতিক যন্ত্রের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। বেকারিতে কিছু পানি জমে থাকলেও তা উৎপাদন কাজে ব্যবহৃত হয় না বলে দাবি করেন তিনি।
৩ জুন জমা হবে তদন্ত প্রতিবেদন
গত বুধবার সকালে হাসপাতালটির পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডে ভর্তি থাকা এক থেকে তিন দিন বয়সী ছয় নবজাতকের মৃত্যু হয়। কী কারণে তাদের মৃত্যু হয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ঘটনা তদন্তে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। শনিবার প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা থাকলেও সময় বাড়িয়ে আগামী ৩ জুন নির্ধারণ করা হয়েছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, তদন্ত কমিটি এ পর্যন্ত পাওয়া তথ্য উপস্থাপন করেছে। তবে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রস্তুতের জন্য মৃত নবজাতকদের মায়েদের বক্তব্য নেওয়া প্রয়োজন। অনেক মা দূরে অবস্থান করায় তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ ও সাক্ষাৎ সম্পন্ন করতে আরও কয়েক দিন সময় লাগবে।
ময়নাতদন্ত না হওয়ার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নবজাতকদের অভিভাবকেরা এতে সম্মতি দেননি। সিআইডিসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো তাঁদের রাজি করানোর চেষ্টা করলেও শোকাহত পরিবারের মানসিক অবস্থার কারণে তা সম্ভব হয়নি। তবে ময়নাতদন্ত ছাড়াও পরিবেশগত মূল্যায়নের ভিত্তিতে একটি প্রতিবেদন দেওয়া সম্ভব হবে বলে জানান তিনি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, তদন্ত কমিটিতে পরবর্তীতে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত বিভাগের একজন প্রকৌশলী এবং একজন নবজাতক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসককে যুক্ত করা হয়েছে। ফলে কারিগরি ও চিকিৎসাবিষয়ক সব দিক প্রতিবেদনে উঠে আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
এদিকে প্রাণ হারানো এক নবজাতকের বাবা হাবিবুর রহমান বুধবার রাতে রাজধানীর রমনা থানায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছেন। এজাহারে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলার অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলার পরিপ্রেক্ষিতে হাসপাতালের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ। তবে এখন পর্যন্ত কাউকে আটক করা হয়নি।
সাংবাদিকদের ধাওয়া ও মারধরের অভিযোগ
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পরিদর্শন শেষে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ হাসপাতালের সব প্রবেশপথ বন্ধ করে দেয় বলে অভিযোগ করেন গণমাধ্যমকর্মীরা। তারা ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করলে নিরাপত্তাকর্মীরা বাধা দেন এবং বাগ্বিতণ্ডার সৃষ্টি হয়।
পরে হাসপাতালের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাহিদ ইয়াসমিনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি সাংবাদিকদের জানান, স্বাস্থ্যমন্ত্রী বেকারিটি সিলগালা করে দিয়েছেন। এ কারণে সেখানে কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়া সম্ভব নয়।
এরপরও কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মী হাসপাতালের নিচতলায় অবস্থান করে বেকারির বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করেন। এ সময় পুলিশ ও র্যাব সদস্যরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। সাংবাদিকদের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতিতেই হাসপাতালের নিরাপত্তাকর্মী ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা তাদের ওপর চড়াও হন। একপর্যায়ে ধাওয়া দিয়ে হাসপাতাল থেকে বের করে দেওয়া হয় এবং কয়েকজনকে মারধর করা হয়।
এ ঘটনায় কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মী আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
