বেঞ্চে পা তুলে বসাকে কেন্দ্র করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) বাংলা বিভাগের অভয় কুমার সিংহ নামের এক প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীকে শারীরিক নির্যাতন, মারধর ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের চার শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে। তারা সবাই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
গতকাল রবিবার (২৪ মে) জগন্নাথ হলের রবীন্দ্র ভবনের ফিজিক্যাল চ্যালেঞ্জড শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দকৃত এক কক্ষে এ ঘটনা ঘটে।
এ ঘটনায় অভিযুক্তরা হলেন- জগন্নাথ হল শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম-আহ্বায়ক চন্দন দাস (ফ্রেঞ্চ ল্যাঙ্গুয়েজ বিভাগ), যুগ্ম-আহ্বায়ক ঝলক দাস, যুগ্ম-আহ্বায়ক রিপন চন্দ্র সরকার (মার্কেটিং বিভাগ) এবং ছাত্রদলকর্মী ও ম্যানেজমেন্ট বিভাগের শিক্ষার্থী সাগর।
ভুক্তভোগী অভয় কুমার জানান, তিনি শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী (পায়ে সমস্যা)। তিনি গতকাল সন্ধ্যায় হলের এক চায়ের দোকানে পা তুলে বসে থাকার কারণে অভিযুক্তদের দ্বারা সংঘবদ্ধভাবে নিজ কক্ষে মারধরের শিকার হয়েছেন। বিষয়টি জানিয়ে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ফেসবুক গ্রুপ ‘ঢাবি শিক্ষার্থী সংসদ ২’-এ পোস্ট করে আজ সোমবার (২৫ মে) এ অভিযোগ তুলেছেন।
সেই ফেসবুক পোস্টে অভয় কুমার লেখেন, আমি অত্যন্ত কষ্ট, অপমান ও নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি নিয়ে এই পোস্টটি লিখতে বাধ্য হচ্ছি। ভার্সিটির শুরুতে যখন আমি হলে উঠি তখন সন্তোষ চন্দ্র ভট্টাচার্য ভবনে উঠি। পায়ের সমস্যা থাকার পরেও অনেক কষ্ট করে আমি সেই বিল্ডিংয়েই অবস্থান করি। আমাদের ব্যাচমেটরা মিলে আমরা অনেক ভালোই ছিলাম। কিন্তু পরবর্তীতে রবীন্দ্র ভবন খুলে দেওয়ায় ব্যাচমেটদের ছেড়ে একটু কষ্ট লাঘব করার আশায় ফিজিক্যাল চ্যালেঞ্জ শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্ধকৃত রুমে উঠি।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, ২৪ মে সন্ধ্যার সময় রবীন্দ্র ভবনের নিচে মনশ্রী হালদার চায়ের দোকানে পা তুলে বসে থাকার মতো একটি তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঝলক দাস(২০২১-২২), চন্দন দাস (২০২০-২১ ফ্রেঞ্চ ল্যাঙ্গুয়েজ) রিপন (২০২১-২২ মার্কেটিং) ও সাগর(২০২১-২২ ম্যানেজমেন্ট) আমার রুমে এসে আমাকে সংঘবদ্ধভাবে মারধর করেছে।
ঘটনার বর্ণনা জানিয়ে এ প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী লেখেন, শুরুতে আমি যখন চায়ের দোকানে বসে ছিলাম তখন কেউ না থাকায় আমি পা তুলে বসে ছিলাম, পায়ের হাঁটুতে সমস্যা থাকার কারণে। তখন চন্দন নামের এক ছেলে আর ঝলক দোকানে ঢুকে বসে। আমি পা তুলে দেওয়ার পরেও অনেক জায়গা থাকায় তারা ঠিকভাবেই বসতে পারে। পরবর্তীতে চন্দন নামের ছেলেটা আমাকে বলে পা নিচে নামিয়ে বসতে, এটা পা উপরে তোলার জায়গা না, নিজের রুমে গিয়ে পা তুলে বস ইত্যাদি কথা বলে। আমি বলি যে, ‘দাদা এখনো তো জায়গা ফাঁকাই আছে, যখন কেউ আসবে আমি তখন আমি পা নামিয়ে নিব’।
তিনি আরও বলেন, যদিও আমি একটি পা নিচে নামিয়ে রাখি। কারণ একটু পা অনেক বেশি সমস্যা ছিল, পাশাপাশি সেখানে বসার মতো কেউ ছিল না)। এছাড়াও ঝলকের সাথে দোকানে আমার কোন কথাই হয় নি। পরবর্তীতে আমি আমার রুমে এসে বঙ্গবাজার যাই। বঙ্গবাজার থেকে আসার পর আমি রুমে ঢুকা মাত্রই চন্দন, ঝলক দাশ, রিপন, সৌরভ এই চারজন আমার রুমে এসে আমার উপর শারীরিক নির্যাতন করে, থাপ্পর মারে। এছাড়াও হুমকি দিয়েছে যাতে আমাকে আর চায়ের দোকানের দিকে দেখা না যায়, নিচে যাতে দেখা না যায়।
অন্যদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদের (ডাকসু) কার্যনির্বাহী সদস্য ও জগন্নাথ হলেরই আবাসিক শিক্ষার্থী সর্ব মিত্র চাকমা ফেসবুকে লেখেন, গতকাল রাতে জগন্নাথ হলে ২০-২১ সেশনের এক প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীকে রুমে গিয়ে সংঘবদ্ধভাবে মারধর করা হয়েছে। তিনি জগন্নাথ হলে ফিজিক্যালি চ্যালেঞ্জড শিক্ষার্থীদের বরাদ্দকৃত রুমে থাকেন। কারণ, তার পায়ের হাঁটুতে সমস্যা থাকার কারণে হলের দোকানে পা উঠিয়ে রাখেন। অভিযুক্ত শিক্ষার্থীরা (ঝলক দাস, চন্দন দাস, রিপন, সাগর) পা নামাতে বলে।
তিনি আরও লেখেন, অভিযুক্তরা ছাত্রদলের রাজনীতির সাথে জড়িত। ছাত্রদলের শীর্ষ নেতৃত্ব ভিক্টিমকে কল দিয়ে তার দলের নাম এ ঘটনায় না আনতে অনুরোধ জানান।
সর্ব মিত্র চাকমা আরও বলেন, কিছুদিন আগেও জগন্নাথ হলে রুমে গিয়ে সংঘবদ্ধভাবে মারধরের ঘটনা ঘটেছে। গেস্টরুমের অতীত ইতিহাস থাকার কারণে সে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী বিষয়টি নিয়ে আগাতে পারেনি। এক হল সংসদ সদস্যও সে ঘটনায় জড়িত ছিলেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে রিপনকে কল দিলে তার ফুফুর কাছে মোবাইল দেওয়া হয়। পরে তার কাছ থেকে এ ব্যাপারে কিছু জানা যায়নি।
পরে ঝলক দাসকে কল দিলে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, মারধর করা হয়নি। তবে দোকানে পা তুলে বসাকে কেন্দ্র করে কথা কাটাকাটি হয়েছিল, পরে যখন জানতে পারি সে প্রতিবন্ধী, তখন রুমে তাকে সরি বলতে গিয়েছিলাম আমরা।
তিনি বলেন, বিষয়টাকে পলিটিক্যালি ফ্রেমিং করা হচ্ছে। আমরা মারামারি করিনি, কিন্তু বলা হচ্ছে, করেছি। আর আমরা ছাত্রদলের সঙ্গে রাজনীতি করছি, কিন্তু এ ঘটনায় ছাত্রদলের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
অন্যদিকে, অভিযুক্ত সাগরকে কল দিলে তিনি ‘একটু পরে কল দেব’ বলে ফোন কেটে দেন। পরে আর কল দেননি। এর বাইরে চন্দন দাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
বিষয়টি সম্পর্কে জানতে জগন্নাথ হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. দেবাশীষ পালকে কল দিয়ে পাওয়া যায়নি।
