মনির আহমদ শিহাব, কুবি প্রতিনিধি:
মধ্যরাত। শীতল আবহে টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে। মুক্তমঞ্চ জুড়ে ছড়িয়ে আছে ছাতার রঙিন সারি। কেউ বৃষ্টিতে ভিজেই বসে আছেন, কেউ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়ে। অথচ কারও চোখে বৃষ্টির অস্বস্তি নেই। সবার দৃষ্টি নিবদ্ধ বিশাল এলইডি স্ক্রিনে। বল পায়ে এগোচ্ছে প্রিয় দলের ফুটবলার, আর তার সঙ্গে ওঠানামা করছে শত শত শিক্ষার্থীর হৃদস্পন্দন। গোলের সুযোগ তৈরি হতেই নিস্তব্ধতা, আর বল জালে জড়াতেই মুহূর্তেই ফেটে পড়ছে বজ্রধ্বনির মতো উল্লাস। মনে হচ্ছে, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তমঞ্চ নয়, যেন বিশ্বকাপের কোনো স্টেডিয়ামের গ্যালারিতেই বসে আছেন হাজারো ফুটবলপ্রেমী।
মুক্তমঞ্চ এখন যেন এক অস্থায়ী স্টেডিয়াম। গ্যালারির মতো সারিবদ্ধভাবে বসে থাকা শিক্ষার্থী, চারপাশে দাঁড়িয়ে শত শত দর্শক। খেলার প্রতিটি পাস, প্রতিটি আক্রমণ, প্রতিটি সেভ আর প্রতিটি গোলের সঙ্গে বদলে যাচ্ছে দর্শকদের অভিব্যক্তি। মাঠে উপস্থিত না থেকেও আবেগে তারা যেন ম্যাচেরই অংশ হয়ে উঠছেন।
মুক্তমঞ্চের সেদিন আর্জেন্টিনা বনার মিশরের মধ্যাকার ম্যাচের চিত্র ছিলো এটি। বিশ্বের এক প্রান্তে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর মাটিতে গড়াচ্ছে ফুটবল বিশ্বকাপের ২৩তম আসর। কিন্তু সেই উত্তেজনার ঢেউ থেমে নেই হাজারো মাইল দূরের কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়েও। ক্যাম্পাসজুড়ে এখন ফুটবলের রঙ, আবেগ আর উন্মাদনারই প্রতিচ্ছবি।
বিশ্বকাপ এলেই যেন বদলে যায় ক্যাম্পাসের চিত্র।
প্রিয় দলকে ঘিরে আনন্দ, প্রতিপক্ষকে নিয়ে খুনসুটি, রাত জেগে খেলা দেখা, গোল হলেই একসঙ্গে চিৎকার করে ওঠা, সব মিলিয়ে উৎসবের আবহ তৈরি হয়েছে পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেই আবহকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলেছে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের উদ্যোগে মুক্তমঞ্চে স্থাপন করা বিশাল এলইডি স্ক্রিন।
প্রিয় দলের জয় নিশ্চিত হতেই মুহূর্তে মুখর হয়ে ওঠে পুরো প্রাঙ্গণ। আর্জেন্টিনা সমর্থকদের উল্লাসের জবাবে ব্রাজিল সমর্থকদের খুনসুটি, আবার কখনো উল্টো চিত্র। প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও সবকিছুই সীমাবদ্ধ বন্ধুত্বপূর্ণ হাসি-ঠাট্টা আর ফুটবলপ্রেমে। খেলা শেষ হলেও আলোচনা থামে না। সেই রেশ ছড়িয়ে পড়ে আবাসিক হল, চায়ের দোকান, করিডর কিংবা বন্ধুদের আড্ডায়।
ক্যাম্পাসে একত্রে বড় পর্দায় খেলা দেখার আয়োজনকে ইতিবাচকভাবেই দেখছেন শিক্ষার্থীরা। দর্শক সারিতে থাকা লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী আফতাব উল হক বলেন, “এই আয়োজন আমার কাছে সত্যিই দারুণ লেগেছে। মুক্তমঞ্চে এত বড় স্ক্রিনে সবাই মিলে বিশ্বকাপের খেলা দেখার আনন্দ একেবারেই অন্য রকম। খেলার সময় যখন কোনো দল গোল করে, তখন পুরো মুক্তমঞ্চ করতালি আর উল্লাসে মুখর হয়ে ওঠে। আবার নিজের প্রিয় দল জয়ী হলে সবাই মিলে সেই আনন্দ উদযাপন করি। বিভিন্ন দলের সমর্থকদের মধ্যে মজার মজার তর্ক-বিতর্ক ও খুনসুটিও চলে, যা পুরো পরিবেশকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।”
এলইডি স্কিনে খেলা দেখানোর আয়োজন নিয়ে কুবি ছাত্রদলের আহ্বায়ক মোস্তাফিজুর রহমান শুভ জানান, “পৃথিবীর প্রতিটি দেশে বিশ্বকাপের যে আমেজ চলছে, সেই আমেজকে ধরে রাখার জন্য শিক্ষার্থীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সকলের সুবিধার্থে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের আয়োজনে আমরা এলইডি স্ক্রিনে খেলা দেখার আয়োজন করেছি। বিশ্বকাপের সবগুলো ম্যাচ আমরা সুশৃঙ্খলভাবে দেখানোর আয়োজন করবো। আমরা আশা করছি সকল শিক্ষার্থী এটি উপভোগ করবে এবং আগামীতেও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল শিক্ষার্থীদের যেকোনো সহযোগিতায় পাশে থাকবে।”
বৃষ্টি, গভীর রাত কিংবা ক্লাসের ব্যস্ততা, কোনো কিছুই যেন থামাতে পারছে না ফুটবলপ্রেমীদের এই মিলনমেলা। শেষ বাঁশি বাজলেও উল্লাস, তর্ক, বিশ্লেষণ আর স্মৃতির রেশ থেকে যায় দীর্ঘক্ষণ। তাই কুবির শিক্ষার্থীদের কাছে বিশ্বকাপ শুধু ৯০ মিনিটের একটি ম্যাচ নয়, বরং বন্ধুত্ব, আবেগ আর একসঙ্গে উদযাপনের এক অনন্য উৎসব।
