ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনী ফলাফল ও পর্যবেক্ষণ 

মুনিম মুবাশশির

গণতান্ত্রিক উত্তরণের প্রত্যাশা ও প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা পুনর্গঠনের প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে প্রতিভাত হয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থান এর ফলে দীর্ঘ ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদী আমলের পরিসমাপ্তি ঘটে। পরপর ৩ টা জাতীয় নির্বাচনকে কৌতুকে পরিণত করা বিগত সরকারের প্রায় সকল এমপি, মন্ত্রীরা নিজ দেশ থেকে পালাতে বাধ্য হয়। সন্ত্রাসী কার্যক্রমের জন্যে আওয়ামী লীগ এর দলীয় কার্যক্রমও নিষিদ্ধ করা হয়। ৫০ টি নিবন্ধিত দলের মধ্যে আওয়ামীলীগসহ ১০ টি দল এবারের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১২ কোটি ৭৭ লক্ষ নিবন্ধিত ভোটার ২৯৯টি সংসদীয় আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী ২,০২৮ জন প্রার্থীর মধ্য থেকে তাঁদের প্রতিনিধিকে নির্বাচিত করার সুযোগ লাভ করেন। দীর্ঘ সময় ধরে ন্যূনতম গ্রহণযোগ্যতা নির্বাচন অনুপস্থিত থাকার ফলে এ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উচ্চমাত্রার আগ্রহ ও প্রত্যাশা সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে এবারের নির্বাচনের ভোটারদের একটা বড় অংশ ফার্স্ট টাইম ভোটার হিসেবে ভোট প্রদান সম্পন্ন করেছেন। তাই নির্বাচনটি উৎসবমুখর পরিবেশেই সম্পন্ন হয়েছে বলে জনসাধারণ তাদের মতামত প্রকাশ করেছে। 

উল্লেখযোগ্য যে, নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলোর ১,৭৫৫ জন প্রার্থীর পাশাপাশি ২৭৩ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হন, যা প্রতিযোগিতামূলক বহুদলীয় অংশগ্রহণের একটি পরিসংখ্যানগত চিত্র উপস্থাপন করে। তবে একজন প্রার্থীর আকস্মিক মৃত্যুর কারণে শেরপুর-৩ আসনে ভোটগ্রহণ স্থগিত থাকায় অবশিষ্ট ২৯৯টি আসনে সকাল ৭:৩০ মিনিট থেকে বিকেল ৪:০০টা পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্নভাবে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়।

এ নির্বাচনের সাথে সমান্তরালভাবে একইদিনে রাষ্ট্র সংস্কার-সংক্রান্ত একটি গণভোট আয়োজন করা হয়, যা নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে কেবল প্রতিনিধিত্বমূলক ক্ষমতা হস্তান্তরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না রেখে প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তরের প্রশ্নের সাথে সংযুক্ত করে। নির্বাচন কমিশনের প্রাথমিক প্রতিবেদনে প্রায় ৬০ শতাংশ ভোটার উপস্থিতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যা অংশগ্রহণের মাত্রা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

উপর্যুক্ত প্রেক্ষাপটে, এ প্রবন্ধে নির্বাচনটির গুণগত মান, অংশগ্রহণের প্রকৃতি, প্রতিযোগিতার বাস্তবতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক নিরপেক্ষতার প্রশ্নসমূহের একটি বস্তুনিষ্ঠ ও বিশ্লেষণধর্মী পর্যালোচনা উপস্থাপনের প্রয়াস গ্রহণ করা হয়েছে।

নির্বাচনী পর্যবেক্ষণ: একটি সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ

১) শক্তিশালী সরকার গঠন:

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি মোট ২৯৯ আসনের মাঝে ২০৯ টি আসনে জয় লাভ করে। সংসদীয় রাজনীতিতে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা বা জোটবদ্ধ সংহতি সরকারকে নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত গ্রহণে একচ্ছত্র শক্তি প্রদান করেছে। এটি রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা দূর করে প্রশাসনে গতিশীলতা ফিরিয়ে আনছে। নবগঠিত সরকারের শক্তিশালী ম্যান্ডেট বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়া। একটি শক্তিশালী সরকারের অধীনেই কেবল দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও বৈদেশিক বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা সম্ভব। বিএনপি জোট থেকে মাত্র ২ জন এমপি জয় লাভ করেছেন যারা বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের, এবং বিএনপি ব্যতীত ভিন্ন কোনো দলের।

২) দ্বি-দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো কার্যকর দ্বি-দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার উত্থান। ওয়েস্টমিনস্টার পদ্ধতির একটি সীমাবদ্ধতা হচ্ছে বহুমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্রে খুব কম ভোট পেয়েও প্রার্থীর জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বিগত নির্বাচনগুলোতে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত ও জাতীয় পার্টি- এই চার দলের মধ্যে তুলনামূলক ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা লক্ষ করা যেত। তবে এবারের নির্বাচনে বিএনপি জোট ও জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট সম্মিলিতভাবে প্রায় ৯০% ভোট অর্জন করে এবং ২৮৯টি আসনে প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে, যা দ্বিমেরু রাজনীতির দিকে একটি কাঠামোগত রূপান্তরের ইঙ্গিত বহন করে। ৩য় বিশ্বের দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনে রাজনৈতিক দ্বি-দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বীতার চর্চা ইতিবাচক পরিবর্তন।

৩) তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা: নির্বাচনে অধিকাংশ আসনেই প্রত্যাশার তুলনায় অধিক প্রতিযোগিতাপূর্ণ হয়েছে। বিএনপি জোট ও জামায়াত জোট এর প্রার্থীরা নির্বাচনে জয়ী হওয়ার জন্য একে উপরের সাথে তীব্র প্রতিযোগিতায় নেমেছিলো। অল্প কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা বাদ দিলে নির্বাচন কেন্দ্রিক সহিংসতা পূর্বের তুলনায় অনেকটাই কমেছে। জুলাই পরবর্তী বাংলাদেশে সাধারণ জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রত্যেক প্রার্থীকেই সর্বোচ্চ ইফোর্টস দিতে হয়েছে। এই প্রবণতা প্রতিযোগিতামূলক গণতন্ত্রের বিকাশে ইতিবাচক সূচক হিসেবে বিবেচ্য।

৪) নির্বাচনের মাঠে জামায়াতের শক্তিশালী উত্থান: দীর্ঘ ৮০ বছরের বেশি সময় ধরে রাজনীতি করে আসা রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। অতীতে পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে সর্বোচ্চ ১২.৩ শতাংশ ভোট পেয়ে ১৮ টি আসনে জয়ী হয়। সরকারের অংশ হলেও একক নির্বাচনেও তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য সফলতা দেখতে পারেনি সংগঠনটি। সহযোগী শক্তি হিসেবে দীর্ঘদিন রাজনীতি করে আসা দল এবার প্রধানধারার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এর মাধ্যমে জামায়াত তাৎপর্যপূর্ণ সাফল্য প্রদর্শন করেছে। সিটি কর্পোরেশন অঞ্চলের ৪৫টি আসনের মধ্যে ১০টিতে জামায়াত জোটের জয় বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ উত্থান করে।

৫) ক্ষুদ্র দলগুলোর এলার্মিং ভোটের হার: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী ৫০টি দলের মধ্যে মাত্র পাঁচটি দল এক শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছে(বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ)। ফলে তুলনামূলক ক্ষুদ্ দলগুলোর টিকে থাকার সম্ভাবনা সংকুচিত হয়েছে। প্রায় ৪৫ টা দলই দেশব্যাপী ১% এর নিচে জনসমর্থন পেয়েছে।

৬) স্বল্প ব্যবধানে নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণ: এ নির্বাচনের বহু আসনে জয়ের ব্যবধান ছিল খুবই কম। ফলাফল নির্ধারণে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অনিশ্চয়তা বজায় ছিল। ইসির তথ্যানুযায়ী, প্রায় ২৩টি আসনে পাঁচ হাজারের কম ভোটের ব্যবধানে নির্বাচনী ফল নির্ধারিত হয়, যা নির্বাচনকে উচ্চমাত্রার প্রতিযোগিতাপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে। এই অনিশ্চয়তা আদর্শ নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ একটি নির্দেশক।

৭) স্বতন্ত্র প্রার্থীদের অগ্রগতি: ত্রয়োদশ নির্বাচনে ভালো সংখ্যক স্বতন্ত্র প্রার্থীর বিজয় এ নির্বাচনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক। অধিকাংশই দলীয় মনোনয়নবঞ্চিত হলেও তাঁরা সংগঠিত দলীয় প্রার্থীদের সঙ্গে সমানতালে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়লাভ করেছেন। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে যে ৭ প্রার্থী জয়ী হয়েছেন, সকলেই বিএনপির সাথে কোনো না কোনো সময় যুক্ত ছিলো। এটি নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় তুলনামূলক সমান সুযোগ ও ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার কার্যকারিতা নির্দেশ করে। ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও ইউনিক নির্বাচনী প্রচারণার ফলে জাতীয় নির্বাচনের মতো গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে এই স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয় নিশ্চিত করেছে।

৭) অঞ্চলভেদে দলীয় প্রভাব ফলাফলেও লক্ষণীয়: উক্ত নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অঞ্চলভেদে ফলাফলের একটা প্যাটার্ন লক্ষ্য করা যায়। খুলনা, রংপুর ও রাজশাহী বিভাগে ১১-দলীয় জোটের প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল, অন্যদিকে বিএনপি বিশেষ করে চট্টগ্রাম, সিলেট ও বরিশালে তাদের শক্তিশালী প্রভাব প্রদর্শন করে।

৮) বামদলগুলোর ললজ্জাজনক হার: বাম ও আদর্শভিত্তিক দলগুলোর ভোট ও আসনপ্রাপ্তি ছিল অত্যন্ত সীমিত, যা তাদের সাংগঠনিক দূর্বলতা ও ভোটার-আকর্ষণের ঘাটতির প্রতিফলন। ফলে নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হলেও বাম রাজনীতির প্রভাব ছিল না বললেই চলে। বেশির ভাগ আসনে জামানত বাজেয়াপ্ত হয়ে লজ্জাজনক হারের অভিজ্ঞতা অর্জন করে। বাংলাদেশে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাম দলগুলোর প্রভাব ধীরে ধীরে কমে আসছে।

৯) কারসাজির অভিযোগ ও ভোট পুনর্গণনার দাবি: নির্বাচনের রাতে ভোট গণনার সময় কিছু আসনে ফলাফল নিয়ে বেশ আপত্তি উঠতে থাকে। ভোট গণনাকে কেন্দ্র করে উভয় জোটই একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে থাকে। আলোচনায় আসে, “ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং” টার্মটা। আসলেই কি ইঞ্জিনিয়ারিং হয়েছে? হলেও সেটা কিভাবে হয়েছে? বিস্তারিত জানা যাবে ইলেকশনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ডাটা ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ফ্যাক্টর এর চুলচেড়া বিশ্লেষণ এর পরে। পরবর্তীতে প্রায় ৩০টি আসনে পুনর্গণনার দাবি উত্থাপিত হয়েছে। অভিযোগ উত্থাপিত হওয়া মানেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনিয়মের প্রমাণ নয়। তবুও এর ফলে নির্বাচনী স্বচ্ছতা নিয়ে আংশিক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।

১০) জাতীয় পার্টির হতাশাজনক ফলাফল: এ নির্বাচনে প্রায় ১৯৯টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেও ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের ঘনিষ্ঠ মিত্র জাতীয় পার্টির ১ শতাংশেরও কম ভোট প্রাপ্তি তাদের রাজনৈতিক প্রভাবের তীব্র অবনমন নির্দেশ করে। অতীতে উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও এবারের নির্বাচনে তাদের ভরাডুবি ভোটার পছন্দের পুনর্বিন্যাস এবং নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের প্রতিফলন হিসেবে প্রতীয়মান। জাতীয় পার্টির শক্তিশালী ভূমি হিসেবে পরিচিত রংপুরেও হারের স্বাদ নিতে হয়।

লেখক: সাবেক সদস্য, দুদক সংস্কার কমিশন।

এবার ফুয়েল কার্ড চালুর পরিকল্পনা

  ডেস্ক রিপোর্ট: দেশে জ্বালানি তেল নিয়ে চলমান অস্থিরতা ও কারসাজি মোকাবিলায় সব ধরনের যানবাহনের জন্য ‘ফুয়েল কার্ড’ চালুর পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে ইতোমধ্যে প্রাথমিক কাজও শুরু করেছে জ্বালানি বিভাগ। ফুয়েল কার্ড মূলত একটি বিশেষ পেমেন্ট কার্ড, যা পেট্রোল, ডিজেলসহ অন্যান্য জ্বালানি কেনার জন্য ব্যবহৃত হয়। এটি ক্রেডিট বা ডেবিট কার্ডের মতো কাজ করলেও এর মাধ্যমে জ্বালানি ব্যবহারের পরিমাণ নির্ধারণ, খরচ নিয়ন্ত্রণ এবং ডিজিটাল রেকর্ড সংরক্ষণের সুবিধা পাওয়া যায়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশকে বড় ধরনের চাপে পড়তে হতে পারে। এরই মধ্যে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী তেল মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। এ  প্রসঙ্গে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানিয়েছেন, দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। ইরান যুদ্ধের আগের মতোই সরবরাহ অব্যাহত থাকলেও হঠাৎ চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় দ্রুত পাম্প থেকে তেল শেষ হয়ে যাচ্ছে। তার মতে, এই পরিস্থিতির পেছনে মজুতদারদের ভূমিকাই বড় কারণ। এই প্রেক্ষাপটে তেল অপচয় ও অবৈধ মজুত ঠেকাতে ‘ফুয়েল কার্ড’ ব্যবস্থাকে কার্যকর সমাধান হিসেবে বিবেচনা করছে সরকার। প্রস্তাবিত এই কার্ডের মাধ্যমে মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার, বাস ও ট্রাকের মালিকরা নির্ধারিত সীমার মধ্যে জ্বালানি নিতে পারবেন। প্রতিটি কার্ডে একটি কিউআর কোড থাকবে, যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট পাম্প থেকে তেল সংগ্রহ করা যাবে।  

আমেরিকায় ট্রাম্প বিরোধী ’নো কিংস’ আন্দোলন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্রে আবারও ‘নো কিংস’ নামে বড় আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়েছে। এই আন্দোলনের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা হবে। আয়োজকরা জানিয়েছে, শনিবার (২৮ মার্চ) সারা দেশে ৩ হাজারের বেশি বিক্ষোভ কর্মসূচি হবে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিক্ষোভের দিনগুলোর একটি হতে পারে। এর আগে ২০২৫ সালের জুন ও অক্টোবর মাসেও এই আন্দোলন হয়। তখন লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমেছিল। আয়োজকদের দাবি, জুনে প্রায় ৫০ লাখ মানুষ এবং অক্টোবরে প্রায় ৭০ লাখ মানুষ অংশ নেয়।

এবারের বিক্ষোভে অনেক বিষয় নিয়ে প্রতিবাদ হবে। এর মধ্যে আছে ট্রাম্পের অভিবাসনবিরোধী নীতি এবং ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ।

ওয়াশিংটন ডিসি, মিনিয়াপোলিস, শিকাগো এবং সান ফ্রান্সিসকোতে বড় বিক্ষোভ হওয়ার কথা রয়েছে। ছোট অঙ্গরাজ্য ভারমন্টেও ৪০টির বেশি বিক্ষোভের পরিকল্পনা করা হয়েছে। রাজ্যটিতে মাত্র ৬ লাখ ৪৬ হাজার মানুষ বাস করে। তারপরও সেখানে এত কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। আয়োজকরা জানায়, এটি আমেরিকার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিক্ষোভের দিনগুলোর একটি হতে পারে।      

নেপালের ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী আটক

    আন্তর্জাতিক ডেস্ক: নেপালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলিকে শনিবার (২৮ মার্চ) গ্রেপ্তার করেছে দেশটির পুলিশ। দেশটিতে গত সেপ্টেম্বরে জেন-জি’র নেতৃত্বে হওয়া বিক্ষোভে বহু মানুষের মৃত্যুর ঘটনায় তার দায় আছে কিনা তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। এর আগে গত ৮ ও ৯ সেপ্টেম্বর দুর্নীতিবিরোধী যুব আন্দোলনে অন্তত ৭৭ জন নিহত হন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা জারির প্রতিবাদ থেকে এই আন্দোলনের সূচনা হলেও এর পেছনে দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক অসন্তোষ কাজ করেছিল। বিক্ষোভের প্রথম দিনেই দমন-পীড়নে অন্তত ১৯ জন তরুণ প্রাণ হারান। ওলির দল কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপালের (ইউএমএল) জ্যেষ্ঠ নেতা মিন বাহাদুর শাহি বলেন, ‘শনিবার সকালে তাকে তার বাসভবন থেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।’ পুলিশের মুখপাত্র ওম অধিকারী ওলি এবং তার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রমেশ লেখকের আটক হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এদিকে গত ৫ মার্চ সংসদ নির্বাচনে জয়ী হওয়া র‌্যাপার বালেন্দ্র শাহ শুক্রবার (২৭ মার্চ) প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। আর নতুন সরকার শপথ নেয়ার একদিন পরই ওলিকে গ্রেপ্তার করা হলো।  

স্বাধীনতা দিবস: সার্বভৌমত্বের প্রতিশ্রুতি ও গণমানুষের বঞ্চনা

  ড. মাহরুফ চৌধুরী ২৬শে মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস। এই দিনটি কেবল ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ নয়, বরং জাতীয় জীবনে একটি গভীর ঐতিহাসিক তাৎপর্যবাহী মুহূর্ত। দিনটি আমাদের জন্য একই সঙ্গে একটি রাজনৈতিক অঙ্গীকার, নৈতিক দায়বদ্ধতা এবং একটি চলমান, কিন্তু এখনো অসমাপ্ত জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্রগঠনের প্রকল্পের মূর্তপ্রতীক। ১৯৭১ সালের এই দিনে স্বাধীনতা ঘোষণার মধ্য দিয়ে রক্তাক্ত সংগ্রামের পথ ধরে আমরা অর্জন করি বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। লাল-সবুজের পতাকা নিয়ে বিশ্বের মানচিত্রে অভ্যুদয়ের মাধ্যমে আমাদেরকে দু’বার স্বাধীনতা অর্জন করতে হয়েছিল। আমাদের এই অর্জন ছিল উপনিবেশিক এবং উপনিবেশ-উত্তর শাসনব্যবস্থার দীর্ঘস্থায়ী শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ঐতিহাসিক মুক্তির ঘোষণা। সেই ঘোষণার মধ্যে নিহিত ছিল একটি ন্যায্য, সমতাভিত্তিক এবং মানবিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়। কিন্তু স্বাধীনতার ৫৫ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর যে প্রশ্নটি আজ আরও তীক্ষ্ণ, আরও অনিবার্য হয়ে ওঠে, সেটি হলো, এই রাষ্ট্র কি সত্যিই জনগণের রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে, নাকি ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় কেবল শাসকের হাতবদল ঘটেছে, যেখানে ক্ষমতার কেন্দ্র অপরিবর্তিত থেকেছে, আর প্রান্তিক মানুষ রয়ে গেছে একই বাস্তবতায় আবদ্ধ? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে রাষ্ট্র ও সার্বভৌমত্বের ধারণাকে কেবল আবেগের আলোকে নয়, বরং তাত্ত্বিক ও দার্শনিক কাঠামোর মধ্য দিয়ে বিশ্লেষণ করা জরুরি। ইংরেজ চিন্তক টমাস হবস (১৫৮৮-১৬৭৯) তাঁর ‘লেভিয়াথান’-এ রাষ্ট্রকে একটি সর্বময় ক্ষমতাসম্পন্ন সত্তা হিসেবে কল্পনা করেছিলেন, যার প্রধান দায়িত্ব হলো বিশৃঙ্খলা রোধ করে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা। তাঁর দৃষ্টিতে, মানুষের স্বাভাবিক অবস্থা ছিল সংঘাতপূর্ণ; তাই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব অপরিহার্য। কিন্তু এই ধারণা পরবর্তীকালে অপর ইংরেজ চিন্তক জন লক (১৬৩২-১৭০৪) সংশোধন করেন। লক যুক্তি দেন যে রাষ্ট্রের বৈধতা কোনো পরম ক্ষমতায় নয়, বরং জনগণের সম্মতি ও তাদের প্রাকৃতিক অধিকার তথা জীবন, স্বাধীনতা ও সম্পত্তির সুরক্ষার ওপর নির্ভরশীল। রাষ্ট্র যদি এই মৌলিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, তবে জনগণের সেই রাষ্ট্রকে পরিবর্তনের অধিকার রয়েছে। অন্যদিকে, সুইস চিন্তক জাঁ-জাক রুশো (১৭১২–১৭৭৮)‘সাধারণ ইচ্ছা’ (জেনারেল উইল)-র ধারণার মাধ্যমে রাষ্ট্র ও সার্বভৌমত্বকে আরও গভীরভাবে ব্যাখ্যা করেন। তাঁর মতে, প্রকৃত সার্বভৌমত্ব কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হাতে নয়; এটি নিহিত থাকে জনগণের সম্মিলিত ইচ্ছা ও অভিন্ন স্বার্থে। রাষ্ট্র তখনই বৈধ ও কার্যকর হয়ে ওঠে, যখন তা এই সাধারণ ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে সক্ষম হয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে স্পষ্ট হয় যে, যদি রাষ্ট্র জনগণের প্রত্যাশা, প্রয়োজন ও অধিকারকে প্রতিফলিত না করে, তবে তা কেবল একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে সীমাবদ্ধ থাকে, অর্থাৎ নামমাত্র রাষ্ট্র হিসেবে বিদ্যমান থাকে, কিন্তু প্রকৃত অর্থে সার্বভৌম হয় না। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা এই তাত্ত্বিক কাঠামোর সঙ্গে এক গভীর ও স্পষ্ট বৈপরীত্য সৃষ্টি করে। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রের মালিকানা গণমানুষের হাতে ন্যস্ত হওয়ার কথা থাকলেও, বাস্তব অভিজ্ঞতা আমাদের ভিন্ন এক চিত্র দেখায় যেখানে ক্ষমতা ধীরে ধীরে একটি সীমিত, কেন্দ্রাভিমুখী গোষ্ঠীর ভেতরে সঙ্কুচিত হয়ে পড়েছে। রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়া এবং সম্পদ বণ্টনের ধরন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সাধারণ নাগরিকের অংশগ্রহণ প্রায়ই প্রতীকী স্তরে সীমাবদ্ধ থেকেছে। কার্যত রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রটি থেকে তারা বহুলাংশে বিচ্ছিন্ন। এই প্রেক্ষাপটে ইতালীয় মার্কসবাদী চিন্তাবিদ আন্তোনিও গ্রামসির (১৮৯১-১৯৩৭) ‘হেজিমনি’ (আধিপত্য)-র ধারণা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। তিনি দেখিয়েছেন, শাসকশ্রেণী কেবল বলপ্রয়োগ বা রাষ্ট্রীয় দমননীতির মাধ্যমে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখে না; বরং তারা সাংস্কৃতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও আদর্শিক ক্ষেত্রকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এমন এক সম্মতিনির্ভর বাস্তবতা তৈরি করে, যেখানে তাদের আধিপত্য স্বাভাবিক, এমনকি অপরিহার্য বলে প্রতীয়মান হয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই আধিপত্য কেবল রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি শিক্ষা, গণমাধ্যম, প্রশাসন এবং সামাজিক মূল্যবোধের মধ্য দিয়েও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে। ফলে একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর কর্তৃত্ব সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এমনভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়েছে যে, তা অনেকের কাছেই প্রশ্নাতীত সত্য হিসেবে প্রতিভাত হয়। এখানে ফরাসী ঐতিহাসিক ও চিন্তক মিশেল ফুকোর (১৯২৬–১৯৮৪) ‘ক্ষমতা তত্ত্ব’ (পাওয়ার থিওরি) এই আলোচনাকে আরও গভীরতা প্রদান করে। তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন যে ক্ষমতা কোনো একক কেন্দ্র বা শীর্ষস্তরে সীমাবদ্ধ নয়; এটি বহুমাত্রিক, বিস্তৃত এবং সমাজের প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে থাকে। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, আইনব্যবস্থা, এমনকি ভাষা ও দৈনন্দিন চর্চার মধ্য দিয়েও ক্ষমতা নিজেকে ক্রমাগত পুনরুৎপাদন করে। ফলে ক্ষমতার দৃশ্যমান রূপ, যেমন সরকার বা নেতৃত্বের পরিবর্তন ঘটলেও, অদৃশ্য কাঠামোগত সম্পর্কগুলো অপরিবর্তিত থেকে যেতে পারে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সরকার পরিবর্তনের মধ্য দিয়েও প্রশাসনিক কাঠামো, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং ক্ষমতা প্রয়োগের পদ্ধতিতে একটি লক্ষণীয় ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। এই ধারাবাহিকতা আমাদের সামনে একটি গভীর কাঠামোগত সংকটের ইঙ্গিত দেয়। এটি কেবল কোন রাজনৈতিক ব্যক্তি বা দলের ব্যর্থতা নয়; বরং একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও সাংস্কৃতিক জটিলতা, যেখানে ক্ষমতার বিন্যাস এমনভাবে স্থায়ী রূপ পেয়েছে যে, তা সহজে পরিবর্তিত হয় না। ফলে স্বাধীনতার পর যে রাষ্ট্র জনগণের সার্বভৌমত্বের প্রতিফলন হওয়ার কথা ছিল, তা বাস্তবে এক সীমাবদ্ধ ক্ষমতার পুনরুৎপাদনের ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে যেখানে জনগণের মাঝে পরিবর্তনের প্রত্যাশা বারবার জাগ্রত হলেও, কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতার কারণে তা পূর্ণতা পায় না। ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করলে দেখা যায়, বাংলার শাসকগোষ্ঠীর গণবিচ্ছিন্নতা কেবল সাম্প্রতিক কোনো বাস্তবতা নয়; বরং এটি একটি দীর্ঘকালীন প্রক্রিয়ার ফল, যা বর্তমান সংকটকে আরও গভীর ও জটিল করে তুলেছে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে যে রাষ্ট্রকাঠামো গড়ে উঠেছিল, তা মূলত একটি ‘শোষণমূলক রাষ্ট্র’ যার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল উপনিবেশ থেকে সম্পদ আহরণ এবং কেন্দ্রীয় ক্ষমতার স্বার্থ সংরক্ষণ। এই কাঠামোয় জনগণের অংশগ্রহণ ছিল নগণ্য, আর প্রশাসন ছিল জনগণের সেবক নয়, বরং শাসকের হাতিয়ার। পাকিস্তান আমলেও এই একই ধারা বহুলাংশে অব্যাহত থাকে, যেখানে পূর্ব বাংলার জনগণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রান্তিক অবস্থায় থেকে যায়। স্বাধীনতার মাধ্যমে সেই শোষণমূলক কাঠামো ভেঙে দিয়ে জনগণের মনে একটি ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা ছিল এক গভীর ঐতিহাসিক আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ। এই প্রত্যাশার কেন্দ্রে ছিল এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ হবে এবং উন্নয়ন ও সম্পদের সুফল দেশের সব মানুষের মাঝে সমভাবে বণ্টিত হবে। কিন্তু বাস্তবতা আমাদের দেখিয়েছে ভিন্ন এক চিত্র। রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে বহু ক্ষেত্রে সেই পুরোনো শোষণমূলক প্রবণতার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে যেখানে ক্ষমতা ও সম্পদ একটি সীমিত গোষ্ঠীর মধ্যে কেন্দ্রীভূত থেকে গেছে, আর সাধারণ মানুষ কাঙ্ক্ষিত অধিকার ও সুযোগ থেকে সবসময়ই বঞ্চিতই রয়ে গেছে। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর মৌলিক দুর্বলতা হলো দলীয় ও পরিবারতান্ত্রিক বৃত্তবদ্ধতা, যা সর্বস্তরের মানুষের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণকে প্রকৃত অর্থে সীমিত করে ফেলে। এ প্রসঙ্গে জার্মান বংশোদ্ভুত সমাজতাত্ত্বিক রবার্ট মিখেলসের (১৮৭৬-১৯৩৬) ‘অলিগার্কের লৌহ আইন’ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি দেখিয়েছেন, যে কোনো সংগঠন, তা যতই গণতান্ত্রিক আদর্শে প্রতিষ্ঠিত হোক না কেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেটা একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর নেতৃত্বে ও নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। ক্ষমতাবান এই গোষ্ঠী নিজেদের অবস্থান সংরক্ষণে এমন সব কলাকৌশল অবলম্বন করে, যা সংগঠনের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রকে ক্রমশ সংকুচিত করে ফেলে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো এই তত্ত্বের এক সুস্পষ্ট প্রতিফলন। এখানে দলীয় কাঠামোর ভেতরেই এমন এক অলিগার্কিক নিয়ন্ত্রণ গড়ে উঠেছে, যেখানে নেতৃত্বের পরিবর্তন বা বিকল্প নেতৃত্বের বিকাশ অত্যন্ত সীমিত, এমনকি প্রায় অসম্ভব। পরিবারতান্ত্রিক প্রভাব, আনুগত্যভিত্তিক রাজনীতি এবং ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন- এসব উপাদান মিলিয়ে একটি সংকীর্ণ বৃত্ত তৈরি হয়েছে, যা রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রবাহকে সাধারণ জনগণের দিকে না নিয়ে সেই নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যেই আবদ্ধ রাখে। ফলে গণতন্ত্রের আনুষ্ঠানিক কাঠামো বিদ্যমান থাকলেও, তার কার্যকারিতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্র প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। এই প্রেক্ষাপটে স্পষ্ট হয় যে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় সংকট কেবল সাময়িক বা ব্যক্তিনির্ভর নয়; এটি গভীরভাবে প্রোথিত একটি ঐতিহাসিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতা, যেখানে শোষণমূলক কাঠামো এবং অলিগার্কিক নিয়ন্ত্রণ একে অপরকে শক্তিশালী করে চলেছে। এর ফলে স্বাধীনতার মৌলিক প্রতিশ্রুতি তথা জনগণের ক্ষমতায়ন ও রাষ্ট্রের সর্বত্র সার্বভৌমত্বের প্রতিষ্ঠা আজও পূর্ণতা লাভ করতে পারেনি। সাম্প্রতিক জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে এই দীর্ঘস্থায়ী কাঠামোগত সংকটের প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করলে তা কেবল একটি তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক ঘটনারূপে নয়, বরং গণমানুষের সঞ্চিত বঞ্চনা, ক্ষোভ এবং প্রত্যাশার এক প্রতীকী বিস্ফোরণ হিসেবে প্রতিভাত হয়। এটি ছিল এমন এক মুহূর্ত, যখন প্রাতিষ্ঠানিকভাবে উপেক্ষিত মানুষেরা নিজেদের অস্তিত্ব, অধিকার এবং অংশগ্রহণের প্রশ্নকে নতুন করে সামনে নিয়ে আসে। এই অর্থে, ঘটনাটিকে জাঁ-জাক রুশোর ‘সাধারণ ইচ্ছা’ (জেনারেল উইল) অর্থাৎ জনগণের সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষা ও ন্যায্য দাবির এক ধরনের পুনরুত্থান হিসেবেও দেখা যেতে পারে, যেখানে রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের ন্যায্য অধিকার পুনরায় উচ্চারিত হয়েছে। তবে এই জাগরণ, যা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রত্যাশা তৈরি করেছিল, তা রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রত্যাশিত প্রতিফলন পায়নি। অঙ্গীকার থাকা সত্ত্বেও বর্তমান সরকারের ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নে অনীহা, বিলম্ব এবং নানা কৌশলগত তালবাহানার আশ্রয় নেওয়া ইঙ্গিত দেয় যে বিদ্যমান ক্ষমতাকাঠামোকে ভেঙে তা পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে অনিচ্ছুক, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে প্রতিরোধী। রাষ্ট্রসংস্কারের প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে দ্বিধা, দ্বন্দ্ব, অবিশ্বাস ও পারস্পরিক প্রতিযোগিতা দেখা যায়, তা এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে তোলে যে পরিবর্তনের দাবি যতই জোরালো হোক না কেন, ক্ষমতার বর্তমান বিন্যাস তা গ্রহণের জন্য প্রস্তুত নয়। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ‘পথের উপর নির্ভরতা’ (পাথ ডিপেন্ডেন্সি) তত্ত্বের আলোকে বিশ্লেষণ করা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, অতীতের প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং ক্ষমতার বিন্যাস এমন এক ধারাবাহিকতা তৈরি করে, যা ভবিষ্যতের সম্ভাব্য পথগুলোকে সীমাবদ্ধ করে দেয়। ফলে পরিবর্তনের সম্ভাবনা থাকলেও তা সহজে বাস্তবায়িত হয় না, কারণ বিদ্যমান কাঠামো নিজেকে টিকিয়ে রাখতে নানা কলাকৌশলের প্রয়োগ ও বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় সক্রিয় থাকে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই নির্ভরতা কেবল প্রশাসনিক কাঠামোতেই নয়, বরং রাজনৈতিক আচরণ, নীতিনির্ধারণের ধরণ এবং ক্ষমতার চর্চার মধ্যেও গভীরভাবে প্রোথিত। এর ফলে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্য তৈরি হয় অর্থাৎ ব্যক্তি, পরিবার বা দল পরিবর্তিত হয়, কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্রের শাসনের ধরন অপরিবর্তিত থেকে যায়। গণতন্ত্রের আনুষ্ঠানিক রূপ বিদ্যমান থাকলেও, তার ভেতরকার চর্চা ও কার্যকারিতা ক্রমশ সীমিত হয়ে পড়ে। এই অবস্থাকে অনেকাংশে এমন এক রাজনৈতিক বাস্তবতা হিসেবে দেখা যায়, যেখানে গণতন্ত্রের ভাষ্য বজায় রেখেই এক ধরনের কাঠামোগত স্বৈরতন্ত্র পুনরুৎপাদিত হয় যা জনগণকে প্রতিশ্রুতি দেয় মুক্তির, কিন্তু বাস্তবে তাদের আবদ্ধ করে রাখে একটি পুনরাবৃত্তিমূলক, পরিত্রাণহীন নিয়তির মধ্যে। এই দুষ্টচক্র ভাঙতে হলে প্রয়োজন একটি মৌলিক রাষ্ট্রসংস্কার প্রক্রিয়ার বাস্তবায়ন যা কেবল প্রশাসনিক কাঠামোর আংশিক পরিবর্তনের প্রয়াসে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি, রাজনৈতিক দর্শন এবং ক্ষমতার বিন্যাসের একটি সামগ্রিক পুনর্গঠন নিশ্চিত করবে। এখানে প্রশ্নটি কেবল কে শাসন করবে, তা নয়; বরং কিভাবে শাসন পরিচালিত হবে এবং সেই শাসনের উদ্দেশ্য কী হবে- এই মৌলিক প্রশ্নগুলোর পুনর্বিবেচনা অপরিহার্য। মার্কিন চিন্তক জন রলস (১৯২১-২০০২) তাঁর ‘ন্যায্যতা হিসেবে ন্যায় বিচার’ (জাস্টিস এজ ফেয়ারনেস) তত্ত্বে যে ধারণা তুলে ধরেছেন, তা এই প্রেক্ষাপটে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর মতে, একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজে রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান এমনভাবে গঠিত হওয়া উচিত, যাতে তা সর্বপ্রথম এবং সর্বাধিকভাবে সমাজের সবচেয়ে দুর্বল ও বঞ্চিত মানুষের স্বার্থ রক্ষা করে। অর্থাৎ উন্নয়ন, নীতি এবং সম্পদ বণ্টনের মানদণ্ড নির্ধারিত হবে ক্ষমতাবানদের সুবিধা নয়, বরং প্রান্তিক মানুষের কল্যাণকে কেন্দ্র করে। এই তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গিকে বাস্তব রূপ দিতে হলে রাষ্ট্রের পাশাপাশি নাগরিক সমাজের ভূমিকাও অপরিহার্য হয়ে ওঠে। একটি সক্রিয়, সচেতন এবং সংগঠিত নাগরিক সমাজই পারে রাষ্ট্রের ওপর কার্যকর জবাবদিহিতা আরোপ করতে, ক্ষমতার অপব্যবহার প্রতিরোধ করতে এবং ন্যায্যতার প্রশ্নে জনমত গড়ে তুলতে। গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পেশাজীবী সংগঠন এবং সামাজিক আন্দোলন- এই সবগুলো ক্ষেত্র সম্মিলিতভাবে একটি সমালোচনামূলক নাগরিক চেতনা নির্মাণে ভূমিকা রাখতে পারে, যা রাষ্ট্রকে তার প্রতিশ্রুতির প্রতি দায়বদ্ধ রাখতে সক্ষম হবে। এই প্রেক্ষাপটে আমাদের স্বাধীনতা দিবসের তাৎপর্য নতুন করে অনুধাবন করা প্রয়োজন। এটি কেবল জাতির জন্য অতীতের গৌরবময় অর্জন স্মরণের দিন নয়; বরং একটি অসমাপ্ত সংগ্রামের পুনঃঘোষণা, একটি নৈতিক দায়বদ্ধতার নবায়ণ। স্বাধীনতা তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন সার্বভৌমত্ব কেবল সংবিধানের ভাষায় সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং প্রতিটি নাগরিকের দৈনন্দিন জীবনে প্রতিফলিত হবে যেখানে মানুষ নিজেকে রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক হিসেবে অনুভব করবে, এবং রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নীতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় বাইরের প্রভাব ও আগ্রাসন থেকে মুক্ত থাকবে। অতএব, স্বাধীনতা দিবসে গণমানুষের ভাগ্যের প্রকৃত পরিবর্তনই হোক আমাদের স্বাধীনতার মূল অঙ্গীকার। এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন সুদৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কার্যকর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং সর্বোপরি একটি জাগ্রত, দায়িত্বশীল ও অংশগ্রহণমূলক নাগরিক সমাজ। অন্যথায় স্বাধীনতা একটি প্রতীকী অর্জন হিসেবেই থেকে যাবে, কিন্তু তার বাস্তব রূপ চিরকালই আমাদের নাগালের বাইরে রয়ে যাবে। তাই স্বাধীনতা দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক- স্বাধীনতাকে কেবল অতীতের একটি সাফল্য হিসেবে নয়, বরং একটি চলমান, ক্রমবিকাশমান প্রকল্প হিসেবে দেখা; এবং সেই প্রকল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে গণমানুষের মুক্তি, মানবিক মর্যাদা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা। লেখক: ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য।  

ইরান আমাকে সর্বোচ্চ নেতা বানাতে চেয়েছিল: ট্রাম্প

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক চাঞ্চল্যকর দাবি করে বলেছেন, ইরানের নেতৃত্ব তাকে দেশটির পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল, কিন্তু তিনি সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছেন। বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) ওয়াশিংটনে ন্যাশনাল রিপাবলিকান কংগ্রেসনাল কমিটির (এনআরসিসি) বার্ষিক তহবিল সংগ্রহ অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প এই দাবি করেন। তিনি বলেন, আমেরিকা ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেই নিহত হওয়ার পর তেহরানের পক্ষ থেকে অনানুষ্ঠানিকভাবে তাকে এই পদের জন্য প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। ট্রাম্প রসিকতা করে বলেন, ‘বিশ্বের কোনো দেশের প্রধানই ইরানের প্রধান হওয়ার মতো কম আকর্ষণীয় কাজ আর চাইবেন না। তারা আমাকে বলেছিল যে তারা আমাকে পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা বানাতে চায়, কিন্তু আমি বলেছি— না ধন্যবাদ, আমি এটি চাই না।’ এনডিটিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্পের এই দাবির বিপরীতে বাস্তব চিত্র হলো— আলী খামেনেইর মৃত্যুর পর ইরান ইতিমধ্যে তাঁর ছেলে মোজতবা খামেনেইকে দেশের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে স্থলাভিষিক্ত করেছে। তবে ট্রাম্প তাঁর বক্তব্যে জোর দিয়ে বলেছেন, তেহরান বর্তমানে পর্দার আড়ালে ওয়াশিংটনের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধের জন্য মরিয়া হয়ে আলোচনা করছে, যদিও জনসমক্ষে তারা তা অস্বীকার করছে। ট্রাম্পের মতে, ইরানি কর্মকর্তারা চুক্তির জন্য অত্যন্ত আগ্রহী হলেও তারা নিজেদের দেশের জনগণের হাতে নিহত হওয়ার ভয়ে বা অভ্যুত্থানের আশঙ্কায় সেটি স্বীকার করতে পারছেন না। একই সঙ্গে তারা মার্কিন বাহিনীর হাতেও প্রাণ হারানোর ভয়ে তটস্থ রয়েছেন বলে ট্রাম্প দাবি করেন।

এদিকে হোয়াইট হাউস থেকেও দাবি করা হয়েছে, ইরানের সঙ্গে শান্তি আলোচনা এখনো চলমান রয়েছে। যদিও তেহরান প্রকাশ্যে আমেরিকার সব প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে এবং সংঘাত নিরসনে নিজেদের নতুন কিছু কঠোর শর্তারোপ করেছে।

ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যম ‘প্রেস টিভি’-র তথ্যমতে, তেহরান যুদ্ধ বন্ধের জন্য বেশ কিছু গ্যারান্টি চেয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে ভবিষ্যতে আমেরিকা ও ইসরায়েল আর কখনো হামলা করবে না এমন নিশ্চয়তা, যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানের নিরঙ্কুশ কর্তৃত্বের স্বীকৃতি। এই দাবিগুলো পূরণ না হওয়া পর্যন্ত ইরান যুদ্ধে পিছু হটার কোনো লক্ষণ দেখাচ্ছে না। গত এক মাস ধরে চলা এই ভয়াবহ যুদ্ধে আমেরিকা ও ইসরায়েলের নিরবচ্ছিন্ন বোমাবর্ষণ সত্ত্বেও ইরান তাদের সামরিক অবস্থান বজায় রেখেছে। ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী ইরানে বর্তমানে একটি বড় ধরনের ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হয়েছে এবং দেশটির নেতৃত্ব চরম বিশৃঙ্খলার মধ্যে রয়েছে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ট্রাম্পের ‘সর্বোচ্চ নেতা’ হওয়ার এই দাবি মূলত ইরানের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি এবং অভ্যন্তরীণ বিভেদ উসকে দেওয়ার একটি কৌশল। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের অস্থিরতা এবং মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়া এই যুদ্ধের ভবিষ্যৎ এখন ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার এই স্নায়ুযুদ্ধের ওপর নির্ভর করছে। সূত্র: এনডিটিভি

একটি ভোরের নাম স্বাধীনতা।

একটি ভোরের নাম স্বাধীনতা রোভার জাহিদুল হক শ্রাবণ একটি জাতির জন্মের সাক্ষী। ১৯৭১ সালের এই রাতে যখন সারা দেশ ঘুমিয়ে ছিল, তখন ইতিহাস তার সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়টি লিখতে বসেছিল। একদিকে ছিল বন্দুকের নল, অন্যদিকে ছিল একটি নিরস্ত্র জাতির বুকভরা স্বপ্ন। সেই রাতেই জন্ম নিয়েছিল একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের ধারণা, যার নাম বাংলাদেশ। এই দিনটা যতবার ফিরে আসে, ততবার মনে করিয়ে দেয় স্বাধীনতা কোনো উপহার নয়, এটি অর্জন করতে হয়। রক্ত দিয়ে, জীবন দিয়ে, সবকিছু হারিয়ে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী “অপারেশন সার্চলাইট” নামের এক নৃশংস গণহত্যা শুরু করেছিল সেই রাতে। ঢাকার আকাশ ছিল আগুনে লাল। লক্ষ লক্ষ মানুষ ভয়ে কাঁপছে, তবুও তাদের বুকে একটাই স্বপ্ন, একটি স্বাধীন দেশ। সেই স্বপ্নের নামই বাংলাদেশ। স্কাউট আন্দোলন একটাই কথা শেখায় সেবা, একতা আর দায়িত্ববোধ। এই তিনটি কথা শুধু স্কাউটের নীতি নয়, এটি একটি সুস্থ জাতির ভিত্তি। যে জাতি নিজের ইতিহাস মনে রাখে, নিজের শহীদদের সম্মান করে। সেই জাতিকে কেউ দাবিয়ে রাখতে পারে না। স্বাধীনতা মানে শুধু একটি পতাকা নয়। স্বাধীনতা মানে সেই মায়ের কান্না, যার ছেলে ১৯৭১-এ ঘর থেকে বেরিয়ে আর ফেরেনি। স্বাধীনতা মানে সেই কৃষকের ঘামে ভেজা মাটি, যে মাটির জন্য ত্রিশ লক্ষ মানুষ জীবন দিয়েছিল। স্বাধীনতা মানে এই দেশের একজন সাধারণ মানুষের কলম ধরার অধিকার নিজের কথা বলার সাহস। ১৯৭১-এর সেই তরুণেরা কি জানত, তারা ইতিহাস লিখছে? হয়তো না। তারা শুধু জানত, চুপ থাকা সম্ভব না। অন্যায়ের সামনে মাথা নত করা সম্ভব না। সেই রুখে দাঁড়ানোর সাহসটাই আমাদের জাতির সবচেয়ে বড় পরিচয়। ২৬শে মার্চ কোনো উৎসবের দিন নয় এটি একটি প্রতিজ্ঞার দিন। যারা এই দেশের জন্য সব দিয়ে গেছেন, তাদের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব আমাদের সবার। একজন নাগরিক হিসেবে, একজন স্কাউট হিসেবে সেই দায়িত্ব প্রতিদিন মনে রাখা দরকার। প্রতিটি কাজে, প্রতিটি আচরণে, প্রতিটি পদক্ষেপে। এই ভোর শুধু একটি দিনের শুরু নয় এই ভোরের নাম স্বাধীনতা। লেখক: অগ্নিবীণা রেলওয়ে মুক্ত স্কাউট গ্রুপ, বাংলাদেশ স্কাউটস আখাউড়া রেলওয়ে জেলা।

১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে কারণে আমরা বাঙালি বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি।

১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে কারণে আমরা বাঙালি বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। এস. এম. এম. মুসাব্বির উদ্দিন ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের কারণেই আজ আমি গর্বের সঙ্গে নিজেকে বাঙালি বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। আমি সরাসরি মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি, তবে বিভিন্ন জ্ঞানী ও গুণী মানুষের কাছ থেকে সেই সময়ের ইতিহাস, সংগ্রাম এবং স্বাধীনতার সূচনার কথা জেনেছি। তাদের বর্ণনা শুনে বুঝেছি এই স্বাধীনতা কোনো সাধারণ অর্জন নয়, এটি ত্যাগ, সাহস এবং অগণিত মানুষের আত্মবলিদানের ফল। জীবনে কয়েকটি দেশ ভ্রমণের সুযোগ হয়েছে, আর সেই অভিজ্ঞতা আমাকে নতুনভাবে উপলব্ধি করিয়েছে নিজের দেশের পরিচয়ের মূল্য। বিদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে যখন নিজের দেশকে প্রতিনিধিত্ব করেছি, তখন এক গভীর গর্ব অনুভব করেছি। কারণ, একজন মানুষ যত বড় কিছুই অর্জন করুক না কেন, নিজের দেশকে প্রতিনিধিত্ব করার মতো গৌরবের অনুভূতি খুব কমই পাওয়া যায়। এই সুযোগ সবার ভাগ্যে জোটে না, কিন্তু যারা পায়, তারা এর গুরুত্ব সত্যিই উপলব্ধি করতে পারে। একবার ভেবে দেখলে প্রশ্ন জাগে, “আমাদের দেশ যদি স্বাধীন না হতো, তাহলে কি আমরা বিশ্বের মানচিত্রে বাঙালি হিসেবে নিজেদের পরিচয় তুলে ধরতে পারতাম? আমরা কি বিদেশে গিয়ে গর্বের সঙ্গে বলতে পারতাম আমরা বাংলাদেশি?” নিশ্চয়ই না। তখন আমাদের নিজস্ব রাষ্ট্রীয় পরিচয় থাকত না, আমাদের কণ্ঠস্বরও হয়তো এত শক্তিশালী হতো না। তাই ৩০ লাখ শহীদের রক্ত এবং ৩ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীনতা আমাদের জন্য অমূল্য। ১৯৭১ সালের এই স্বাধীনতা আমাদের জাতির জীবনের সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায়। এই অধ্যায় ধারণ করা এবং এর মর্যাদা রক্ষা করা আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের। আমাদের উচিত এই স্বাধীনতার চেতনা হৃদয়ে ধারণ করে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য কাজ করা। শহীদদের আত্মত্যাগ যেন কখনো বৃথা না যায়, সেটিই হওয়া উচিত আমাদের অঙ্গীকার। স্বাধীনতা আমাদের শুধু একটি ভূখণ্ড দেয়নি, এটি আমাদের দিয়েছে আত্মপরিচয়, আত্মসম্মান এবং আত্মবিশ্বাস। এই স্বাধীনতার কারণেই আমরা আজ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে গিয়ে নিজের দেশের কথা বলতে পারি, দেশের সুনাম বৃদ্ধির চেষ্টা করতে পারি। আমাদের প্রতিটি সাফল্য দেশের পরিচয়কে আরও উজ্জ্বল করে তোলে। “আমরা বাঙালি, আমরা বাংলাদেশি” এই কথার মধ্যেই লুকিয়ে আছে আমাদের হাজার বছরের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং আত্মপরিচয়ের গভীরতা। আমাদের সংস্কৃতি অত্যন্ত সমৃদ্ধ এবং বৈচিত্র্যময়। পহেলা বৈশাখ, রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের সাহিত্য ও সংগীত, লোকসংস্কৃতি এসবই আমাদের পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা বিশ্ব দরবারে বিশেষ মর্যাদা পেয়েছে।

তবে দুঃখজনকভাবে দেখা যায়, বর্তমানের অনেক তরুণ নিজেদের সংস্কৃতির চর্চা না করে অন্ধভাবে পশ্চিমা সংস্কৃতির অনুকরণে বেশি আগ্রহী হয়ে উঠছে। বিশ্ব সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়া অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু নিজের শিকড় ভুলে যাওয়া কখনোই কাম্য নয়। এভাবে চলতে থাকলে একসময় আমাদের স্বকীয়তা ক্ষয় হয়ে যেতে পারে।

তাই বর্তমান প্রজন্মকে মনে রাখতে হবে এই দেশ আমরা পেয়েছি লাখো শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে। আমাদের দায়িত্ব এই স্বাধীনতার মর্যাদা রক্ষা করা, নিজের সংস্কৃতিকে লালন করা এবং দেশের সুনাম অক্ষুণ্ণ রাখা। তাহলেই সত্যিকার অর্থে আমরা বলতে পারব “আমরা বাঙালি, আমরা বাংলাদেশি।” লেখক: এস. এম. এম. মুসাব্বির উদ্দিন সাবেক রোভার মেট আমরা স্কাউট গ্রুপ, ঢাকা

দৌলতদিয়া ফেরীঘাটে যাত্রীবাহী বাস উল্টে নদীতে, বহু হ-তা-হ-তে-র আশংকা

  ডেস্ক রিপোর্ট: রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ঘাটে ফেরিতে ওঠার সময় সৌহার্দ্য পরিবহনের যাত্রীবাহী একটি বাস উল্টে নদীতে পড়ার ঘটনা ঘটেছে। এতে বহু হতাহতের আশঙ্কা করা হচ্ছে। বুধবার (২৫ মার্চ) বিকেল সোয়া ৫টার দিকে ৩ নং পল্টুন থেকে সৌহার্দ্য পরিবহনের একটি বাস ফেরীতে ওঠার সময় পড়ে যায়।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বাসটিতে ৫০ থেকে ৫৫ যাত্রী ছিলেন। নদীতে পড়ে যাওয়ার কিছু সময় পর পাঁচ থেকে সাতজন যাত্রী পাড়ে উঠতে সক্ষম হন। বাসটিতে থাকা অন্য যাত্রীদের এখনো হদিস পাওয়া যায়নি। 

এদিকে, ঘটনাস্থলে ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশের সদস্যরা পৌঁছে উদ্ধার কাজ শুরু করেছেন। উৎসুক জনতাদের জটলাও বেড়েছে।

“ঈদ বকশিশ” দেওয়ার কথা বলে ডেকে নিয়ে যুবককে হত্যা, বিএনপি নেতা বহিষ্কার

ডেস্ক রিপোর্ট:

সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে সোহেল রানা (২৫) নামের এক যুবককে গলা কেটে হত্যার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ইউনিয়ন বিএনপির এক নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। বুধবার (২৫) মার্চ বিকেলে জেলা বিএনপির দপ্তর সম্পাদক তানভীর মাহমুদ পলাশ সই করা এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও সড়াতৈল গ্রামের সোহেল রানা হত্যায় জড়িত সন্দেহে অভিযোগ উত্থাপিত হওয়ায় এবং নিহতের মায়ের দায়ের করা মামলায় আসামি করায় দলীয় সব পদ থেকে সাইফুল ইসলামকে বহিষ্কার করা হলো। যা ইতিমধ্যে জেলা বিএনপির সভাপতি রুমানা মাহমুদ ও সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমান বাচ্চু অনুমোদন দিয়েছেন বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

এর আগে গত ২১ মার্চ ঈদের দিন সকালে বাড়ির অদূরে একটি ধানক্ষেত থেকে নিহত সোহেল রানার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। সোহেল রানা উপজেলার কায়েমপুর ইউনিয়নের সড়াতৈল গ্রামের আজাদ মন্ডলের ছেলে।

বহিষ্কৃত সাইফুল ইসলাম উপজেলার কায়েমপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং সড়াতৈল গ্রামের আদম ব্যাপারীর ছেলে।

শাহজাদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, অভিযুক্ত সাইফুল ইসলামকে গ্রেপ্তারে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চলছে।আশা করছি, দ্রুত সময়ের মধ্যে তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে।

প্রসঙ্গত, ঈদের আগের শুক্রবার সন্ধ্যায় ঈদ বকশিশ দেওয়ার কথা বলে সোহেল রানাকে বাড়ি থেকে ডেকে আনা হয়। রাতে সে আর বাড়ি ফেরেনি। ঈদের দিন সকালে এলাকার একটি ধানক্ষেতে সোহেল রানার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

তাকে গলা কেটে এবং মাথা ও গালসহ কয়েকটি স্থানে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় নিহতের মা রুবি আক্তার বাদী হয়ে বিএনপি নেতা সাইফুল ইসলামের নাম উল্লেখসহ ও অজ্ঞাত তিনজনের বিরুদ্ধে থানায় মামলা করেছেন।