গাজীপুরে সাংবাদিককে কুপিয়ে হত্যা

ক্যাম্পাস মিরর প্রতিবেদক

গাজীপুরে দুর্বৃত্তদের হাতে নির্মমভাবে খুন হয়েছেন এক সাংবাদিক। নিহত সাংবাদিক মো. আসাদুজ্জামান তুহিন (৩৮) স্থানীয় দৈনিক প্রতিদিনের কাগজ-এর গাজীপুর প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতেন। বৃহস্পতিবার (৭ আগস্ট) রাত সাড়ে আটটার দিকে গাজীপুর মহানগরের ব্যস্ততম চান্দনা চৌরাস্তা এলাকায় এ হত্যাকাণ্ড ঘটে।

পুলিশ জানায়, পাঁচ-ছয়জন দুর্বৃত্ত ধারালো অস্ত্র নিয়ে তাকে ধাওয়া করে। আতঙ্কিত তুহিন দৌড়ে গিয়ে ঈদগাঁ মার্কেটের একটি চায়ের দোকানে আশ্রয় নেন। কিন্তু দুর্বৃত্তরা সেখানেই দোকানের ভেতরে ঢুকে প্রকাশ্যে তাকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে হত্যা করে পালিয়ে যায়।

গাজীপুরে ভিডিও ধারণ করতে গিয়েই সাংবাদিক তুহিন হামলার শিকার হয়েছেন বলে দাবি পুলিশের। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে হামলাকারীদের শনাক্ত করা হয়েছে বলেও তারা জানিয়েছে।
ভিডিও ধারণ করতে গিয়েই সাংবাদিক তুহিন হামলার শিকার হয়েছেন বলে দাবি পুলিশের। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে হামলাকারীদের শনাক্ত করা হয়েছে বলেও তারা জানিয়েছে।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় দোকানদার খায়রুল ইসলাম জানান, “তুহিন ভাই হঠাৎ দৌড়ে এসে দোকানে ঢুকে পড়েন। এরপর তিনজন ভিতরে ঢুকে তাকে কুপিয়ে চলে যায়। বাইরে আরও দুজন ছিল, যারা রামদা হাতে পাহারা দিচ্ছিল। আমি বাধা দিতে গেলে আমাকেও কুপিয়ে মারার হুমকি দেয়।”

পুলিশের উপস্থিতি ও নজরদারি থাকা সত্ত্বেও এ হত্যাকাণ্ড ঘিরে গাজীপুরজুড়ে সাংবাদিক মহল ও সাধারণ মানুষের মধ্যে নিন্দা ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকেই বলছেন, এটি কেবল একজন সাংবাদিক নয়—স্বাধীন মতপ্রকাশ ও পেশাগত দায়িত্ব পালনের ওপরই আঘাত।

ঘটনার পরপরই হত্যাকাণ্ডের একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যা দেখে অনেকেই ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। গাজীপুর মহানগর পুলিশের উপকমিশনার মো. রবিউল হাসান বলেন, “ঘটনার ভিডিও ফুটেজ ও কিছু ক্লু আমাদের হাতে এসেছে। আমরা অভিযানে নেমেছি। এমন নির্মম হত্যাকাণ্ড দুঃখজনক ও নিন্দনীয়।”

বাসন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহিন খান জানান, নিহতের মরদেহ উদ্ধার করে গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দিন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।

সাংবাদিক আসাদুজ্জামান তুহিনের বাড়ি ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার ভাটিপাড়া গ্রামে। সাহসী প্রতিবেদনের জন্য সহকর্মীদের কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন। তার মৃত্যু গণমাধ্যমের জন্য এক বড় ধরনের শোক এবং উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সাংবাদিক সমাজ ও মানবাধিকারকর্মীরা দ্রুত বিচার ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

সোসাইটি ফর হিউম্যান রাইটস-এর নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি গঠিত

সরকার নিবন্ধিত মানবাধিকার সংগঠন সোসাইটি ফর হিউম্যান রাইটস (এসএইচআর) ২০২৫-২৬ সেশনের জন্য ৬১ সদস্যের কেন্দ্রীয় কার্যকরী কমিটি গঠন করেছে। সম্প্রতি সংগঠনটির প্রধান কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সাধারণ সভায় সদস্যদের প্রত্যক্ষ ভোটে এই কমিটি গঠিত হয়।

নতুন কমিটির চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন এডভোকেট সোহেল মো. ফজলে রাব্বী। সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হয়েছেন সাংবাদিক ও গবেষক আ ফ ম মশিউর রহমান। সাধারণ সম্পাদক পদে দায়িত্ব পেয়েছেন এডভোকেট মুহা. সাইদুর রহমান এবং কোষাধ্যক্ষ নির্বাচিত হয়েছেন মো. জাহাঙ্গীর আলম। এছাড়া এডভোকেট আব্দুল আউয়াল শামীম পাটওয়ারী সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং মো. আওলাদ হোসেন নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন।

কমিটিতে বিভিন্ন মত ও পেশার, বিশেষত মানবাধিকার রক্ষায় সোচ্চার ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে জানানো হয়। সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, মানুষের অধিকার সুরক্ষায় সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণকে গুরুত্ব দিয়ে এই কমিটি গঠন করা হয়েছে।

সোসাইটি ফর হিউম্যান রাইটস (এসএইচআর) ২০২৫-২৬ সেশনের জন্য ৬১ সদস্যের নতুন কেন্দ্রীয় কার্যকরী কমিটি গঠন করেছে। মানবাধিকার রক্ষায় সোচ্চার ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত এই কমিটি মানুষের অধিকার সুরক্ষায় কাজ করবে।

প্রায় দুই দশক ধরে মানবতার সেবায় কাজ করে আসা এসএইচআর নিয়মিতভাবে ফ্রি আইনি সহায়তা, মেডিকেল ক্যাম্পিং, সামাজিক ও আন্তর্জাতিক দিবস পালন, সেমিনার-সভা আয়োজন, শিক্ষা সহায়তা, শীতবস্ত্র ও খাদ্য বিতরণের মতো কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।

মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় তাদের এ ধারাবাহিক প্রচেষ্টা আগামীতেও চলমান থাকবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন নবনির্বাচিত নেতৃবৃন্দ।

নতুন কমিটির চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন এডভোকেট সোহেল মো. ফজলে রাব্বী। সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হয়েছেন সাংবাদিক ও গবেষক আ ফ ম মশিউর রহমান। সাধারণ সম্পাদক পদে দায়িত্ব পেয়েছেন এডভোকেট মুহা. সাইদুর রহমান এবং কোষাধ্যক্ষ নির্বাচিত হয়েছেন মো. জাহাঙ্গীর আলম।

উত্তপ্ত সচিবালয় এবং এনবিআর কার্যালয় পাড়া

সচিবালয় এবং এনবিআর এ যেন এক সোনার হরিণের গল্প। দুর্নীতি আর চোরাকারবারি মহা ক্ষেত্রে। সামান্য পিয়নও যেন কোটি টাকার মালিক বনে যায় এক গায়েবি লিলা খেলায়।

দীর্ঘ ১৫ বছর খুনি হাসিনার মদদে চলা ভারতের কলোনাইজেশন যেখানে ছিলো না কোনো সত্য দেখা,শোনা কিংবা বলার অধিকার। ২০২৪ এর জুলাই ছাত্র-জনতার গনঅভ্যুত্থান  বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ পালাবদল। এরই ধারাবাহিকতায় ড. ইউনুস স্যার প্রধান উপদেষ্টা হিসাবে দেশের সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ এবং মর্যাদাপূর্ণ আসনে অধিষ্ঠ হন। এসেই শুরু হয় দেশ সংস্কার এর কার্যক্রম। 

যার দরুন বাংলাদেশ সরকার ২০২৫ সালের ২৬ মে ‘সরকারি চাকরি (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করেছে, যা সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর সংশোধন হিসেবে কার্যকর হয়েছে  ।

নতুন অধ্যাদেশে সরকারি কর্মচারীদের জন্য চারটি আচরণকে অসদাচরণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে: 

১. অনানুগত্য বা শৃঙ্খলা ভঙ্গের মতো কাজে লিপ্ত হওয়া বা অন্যদের এমন কাজে প্ররোচিত করা।

২. ছুটি ছাড়া বা যুক্তিসংগত কারণ ছাড়া কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা বা কর্তব্যে অবহেলা করা।

৩. অন্য কর্মচারীদের কর্মবিরতি বা কর্তব্যে অবহেলার জন্য উসকানি দেওয়া।

৪. অন্য কর্মচারীদের কর্তব্য পালনে বাধা প্রদান করা  ।

এই অপরাধগুলোর জন্য শাস্তি হিসেবে নিম্নপদে অবনমন, চাকরি থেকে অপসারণ বা বরখাস্ত করার বিধান রাখা হয়েছে। 

শাস্তি প্রক্রিয়া ও আপিল:

  • অভিযোগ গঠনের সাত দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিতে হবে।
  • অভিযুক্ত কর্মচারীকে দোষী সাব্যস্ত করা হলে আরও সাত কর্মদিবসের মধ্যে শাস্তির কারণ দর্শানোর নোটিশ দিতে হবে।
  • শাস্তি আরোপের পর, দণ্ডিত কর্মচারী ৩০ কর্মদিবসের মধ্যে আপিল করতে পারবেন। তবে রাষ্ট্রপতির আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করা যাবে না, যদিও পুনর্বিবেচনার জন্য আবেদন করা যাবে  ।

NBR(National Board of Revenue) এর সংস্কার কার্যক্রম হিসাবে ২০২৫ সালে বাংলাদেশের রাজস্ব খাতে একটি বড় ধরনের সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যার ফলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বিলুপ্ত করে দুটি নতুন বিভাগ গঠন করার পরিকল্পনা করা হয়েছে: রাজস্ব নীতি বিভাগ (Revenue Policy Division – RPD) এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ (Revenue Management Division – RMD)। 

সংস্কারের মূল বৈশিষ্ট্য:

দুটি নতুন বিভাগ: ২০২৫ সালের ১৩ মে জারি করা “রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ, ২০২৫” অনুযায়ী, এনবিআর ও অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ (IRD) বিলুপ্ত করে দুটি নতুন বিভাগ গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

রাজস্ব নীতি বিভাগ (RPD): এই বিভাগের দায়িত্ব হবে কর নীতিমালা প্রণয়ন, রাজস্ব সংক্রান্ত গবেষণা ও আন্তর্জাতিক চুক্তি মূল্যায়ন।

রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ (RMD): এই বিভাগ রাজস্ব সংগ্রহ, শুল্ক ও ভ্যাট বাস্তবায়ন, এবং সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগের দায়িত্ব পালন করবে।  

কর্মচারীদের প্রতিক্রিয়া : 

উক্ত অধ্যাদেশটি জারির পর থেকেই সরকারি কর্মচারীরা এর বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেছেন।  তাদের দাবি, এই অধ্যাদেশ কর্মচারীদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও আন্দোলনের অধিকার হরণ করে।  তারা এটিকে ‘কালো আইন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন এবং অবিলম্বে বাতিলের দাবি জানিয়েছেন।

এই সংস্কার উদ্যোগের বিরুদ্ধে এনবিআর-এর কর্মকর্তারাও তীব্র প্রতিবাদ জানান।  তারা এনবিআর বিলুপ্তির সিদ্ধান্ত বাতিল, এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আব্দুর রহমান খানের অপসারণ, এবং রাজস্ব সংস্কার উপদেষ্টা কমিটির সুপারিশ প্রকাশের দাবি জানান।  এই দাবিতে তারা ১৪ মে থেকে কলম বিরতি ও পূর্ণ কর্মবিরতি পালন করেন, যা দেশের রাজস্ব আদায় ও বাণিজ্য কার্যক্রমে বিঘ্ন সৃষ্টি করে।

সোমবার (২৬ মে) মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নতুন ভবনের নিচে আয়োজিত জরুরি সমাবেশে এ কর্মসূচির ঘোষণা করেছেন সচিবালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সব সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত ‘ঐক্য ফোরাম’ এর নেতারা। ঐক্য ফোরামের কো-চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ সচিবালয় কর্মকর্তা-কর্মচারী সংযুক্ত পরিষদের আরেকাংশের সভাপতি মুহা. নূরুল ইসলাম বলেন, সারা দেশের কর্মচারীরা তাদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন।

বিশ্লেষণ : 

২০২৪ এর জুলাই আন্দোলনের সময় যখন দেশবাসী সাক্ষী হচ্ছিলো এক নরপিশাচিনীর নির্মম হত্যাকাণ্ডের,ঠিক তখন-ই সাড়ে ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদের আষ্টেপৃষ্টে গড়ে ওঠা এই গৃহপালিত আমলাকূল সেই নির্মম গণহত্যাকে সমর্থন দিয়ে খুনি হাসিনার পক্ষ অবলম্বন করে কালো ব্যাচ পরে খুনি হাসিনাকে সমর্থন দিয়েছিলো। আজ যখন আওয়ামী লীগ নামক সন্ত্রাসী সংগঠনটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে তখন যেন তাদের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। ড. ইউনুস স্যারের সংস্কার কর্যক্রমকে বাধা দেওয়ার জন্য সকল পায়তারা ও ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে তারা। এর প্রেক্ষিতে জুলাই আন্দোলনের প্রথম সারির সমন্বয়ক এবং NCP এর দক্ষিণাঞ্চলীয় মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন,ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকার টিকে গেলে আপনারা ঠিকই পদলেহন করে চাকরি করতেন। সুতরাং ৫-ই আগস্ট পরবর্তী বাংলাদেশে আপনারা যদি জনগণের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এ সরকারকে হুমকি দেন ও সংস্কার কার্যক্রমে বাধা দেন, তবে মনে রাখবেন, জনগণই আপনাদের বিকল্প খুঁজে নেবে। হাসনাত বলেন, ‘৫ই আগস্টের আগে কোনো সচিব, কোনো আমলা বা কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী কি পদত্যাগ করেছেন। একজনও কি পদত্যাগ করেছেন। রাস্তার মধ্যে নাগরিকদের যে এভাবে গুলি করে হত্যা করছিল, তখন কি একজন সচিব বা আমলার পদত্যাগের খবর এসেছিল? কিন্তু এই সরকারের কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর তারা সহযোগিতা না করে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছেন। সরকারকে জিম্মি করলে পরিস্থিতি ভালো হবে না বলে মন্তব্য করেন হাসনাত আবদুল্লাহ। 

বাংলাদেশ ইসলামি ছাত্রশিবির এর কেন্দ্রীয় সাহিত্য সম্পাদক মোহাম্মদ নাঈম বলেন,’বাংলাদেশে দুর্নীতির সবচেয়ে বড় আখড়া হচ্ছে এনবিআর। এদের যোগসাজশে হাজার হাজার কোটি টাকা কর ফাঁকি ও দুর্নীতি হয়। সচিবালয়ের পিয়নের শত কোটি টাকার সম্পদের চিত্র আমরা দেখেছি। এই দুই জায়গায় সংস্কার করতে না পারলে, দেশের সার্বিক সংস্কার কখনোই সম্ভব হবে না।কঠোর হন,প্রয়োজনে ১৪৪ ধারা জারি করুন, অধ্যাদেশ প্রয়োগ করুন। দুর্নীতিবাজদের ছাঁটাই করুন। দুদককে কাজে লাগিয়ে সম্পদের হিসাব চান। তারা ঠান্ডা হতে বাধ্য হবে।’

উক্ত আমলাদের এই বিভ্রান্তমূল দাবি ঠেকাতে ইতিমধ্যে আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েছেন ফ্যাসিবাদ বিরোধী সকল ঔক্য জোট। সচিবালয়ের সংস্কারবিরোধী আমলাদের অপসারন ও ফ্যাসিবাদের দোসরদের বিচারের দাবিতে ‘গণসমাবেশ’ এর ঘোষণা দিয়েছেন তারা আব্দুল গণি রোড (ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনের সামনে)। যার সময় তারা ২৭ মে ২০২৫, সকাল ১১:৩০ মিনিট নির্ধারণ করেছেন। 

সরকারি কর্মচারীদের জবাবদিহিতার আওতায়  আনা রাষ্ট্রের একটি বড় সংস্কার । এই সংস্কার কার্যক্রমকে যারা বাধাগ্রস্থ করতে চায় তারাই মূলত ফ্যাসিবাদ জিইয়ে রাখতে চায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিভিন্ন নেটিজেনরা বলছেন, জনগণের উচিত সরকারের পাশে দাড়ানো এবং এদের প্রতিহত করতে নানান কর্মসূচি দেওয়া। যদিও প্রথম সারির বৃহৎ রাজনৈতিক দলসমূহ এখনো এই বিষয় নিয়ে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেনি। রাজনৈতিক দলদের পরবর্তী পদক্ষেপেই নির্ধারণ করে দেবে কারা ফ্যাসিবাদ  প্রথা বিলুপ্তি চায় আর কারা জিইয়ে রাখতে চায়।

 

শিক্ষার্থী, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি।

সম্পাদকীয়- জুন ২০২৫

প্রিয় পাঠক,
জুন মাস আসছে মুসলমানদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আজহা নিয়ে, পাশাপাশি ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের বাজেটের আলোচনাও তুঙ্গে। পবিত্র ঈদ যেমন ত্যাগ ও মানবিকতার অনুশীলন, তেমনি বাজেট এক রাষ্ট্রের উন্নয়ন দিকনির্দেশনার প্রতিফলন। এই দুই উপলক্ষ আমাদের ব্যক্তিজীবন ও জাতীয় জীবনের দুটি ভিন্ন মাত্রায় ছাপ ফেলে-একটি আত্মার, আরেকটি রাষ্ট্রচিন্তার।
চলতি বাজেটে তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও উদ্যোক্তাসহায়ক বরাদ্দের প্রতিশ্রুতি এসেছে। তবে প্রশ্ন থেকেই যায়-বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা কতটা দৃঢ়? অতীতে আমরা বারবার দেখেছি, প্রতিশ্রুতির ফর্দ থাকলেও বাস্তবায়নের দুর্বলতা শিক্ষাব্যবস্থা, গবেষণা কিংবা চাকরির বাজারে উন্নয়ন ব্যাহত করেছে। ফলে, তরুণরা আশাবাদী হলেও ভরসা করতে পারছে না নিঃশর্তভাবে।


মে মাসে জাতীয় জীবনে দুইটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা আমাদের নতুন করে ভাবিয়েছে। গার্মেন্ট শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও সুযোগ-সুবিধা নিয়ে সৃষ্ট অসন্তোষ রূপ নেয় বিক্ষোভে, যা ঢাকাসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতা সৃষ্টি করে। গেলো মে মাসে রাজনৈতিক অস্থিরতার যেমন দেখা দিয়েছে, তেমনি শিক্ষাঙ্গনেও ঘটেছে কয়েকটি উদ্বেগজনক ঘটনা। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা একযোগে আন্দোলনে নেমেছে দীর্ঘদিনের ক্যাম্পাস, গণপরিবহন সংকট, আবাসন সমস্যা এবং নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে। আর একই সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটে সাম্য হত্যাকাণ্ড-একজন শিক্ষার্থীকে নির্মমভাবে প্রাণ দিতে হলো, যার রেশ গোটা জাতির হৃদয়ে নাড়া দিয়েছে। এসব ঘটনা শুধু শোক নয়, আমাদের শিক্ষাঙ্গনের কাঠামো ও নেতৃত্ব ব্যবস্থার দীনতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।


সচিবালয়ে সরকারি কর্মচারীদের নজিরবিহীন আন্দোলন এবং পুরনো স্মৃতি ‘আয়নাঘর-এর আলোচনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়-রাষ্ট্রযন্ত্রের ভিতরেই জমে আছে বহুদিনের আওয়ামী দলদাস। এই সংখ্যায় আমরা দেখেছি আয়নাঘরের কথা, রাষ্ট্রযন্ত্র কিভাবে একসময় নাগরিকদের ভয় ও নিস্তব্ধতায় ঠেলে দিয়েছিল। সেই সময়ে নিখোঁজ, নির্যাতন ও নিস্তব্ধতার এক নিষ্ঠুর সংস্কৃতি ছিল, যার ভয়াল ছায়া আজও ইতিহাসের পাতায় জেগে আছে। ‘আয়নাঘর’ শুধু একটি নির্যাতনকেন্দ্র নয়, বরং একটি রাষ্ট্রীয় মানসিকতার প্রতীক-যেখানে ভিন্নমত মানেই অপরাধ। এসব অধ্যায় নতুন প্রজন্মকে স্মরণ করিয়ে দেয়, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের জায়গায় আপস নয়, সাহসী উচ্চারণই হতে পারে সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ।
এই সব সংকট, প্রতিরোধ ও আশা নিয়ে আমরা এবারের “ক্যাম্পাস মিরর”-এ তুলে ধরেছি দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীদের কণ্ঠস্বর-যেখানে আছে প্রতিবাদ, সৃষ্টিশীলতা, বঞ্চনা ও সাহসের কথা। ক্যাম্পাস মিরর বরাবরই তরুণদের চোখ দিয়ে সময়কে দেখতে চায়। ঈদের এই সময়ে আমাদের অঙ্গীকার-আমরা থাকব সত্যের পাশে, মানবিকতার পক্ষে, এবং নির্যাতনের বিরুদ্ধে সাহসী উচ্চারণ হয়ে।

ঢাকা কলেজ আর সিটি কলেজের নিত্য লড়াইয়ের নেপথ্যে কী?

আগের দিনের এক সহপাঠীকে মারধরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে মঙ্গলবার ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীরা দলবদ্ধ হয়ে ঢাকা সিটি কলেজে হামলা চালান। দুপুরের দিকে দুই কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত সাতজন আহত হন এবং সিটি কলেজে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। তবে ভাঙচুর রোধে পুলিশ কোনো পদক্ষেপ নেয়নি বলে অভিযোগ করেছে সিটি কলেজ কর্তৃপক্ষ।

সংঘর্ষের কারণ সম্পর্কে পুলিশ জানায়, গতকাল সায়েন্স ল্যাব মোড়ে ঢাকা কলেজের পোশাক পরা (উচ্চমাধ্যমিক) এক শিক্ষার্থীকে কয়েকজন মারধর করে। এতে ওই শিক্ষার্থী পড়ে গিয়ে গুরুতর আহত হন। সিসি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, হামলাকারীদের শরীরে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পোশাক ছিল না। তবে ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীরা দাবি করেন, এতে সিটি কলেজের শিক্ষার্থীরা জড়িত। এ অভিযোগের ভিত্তিতে আজ বেলা ১১টার পর তারা সিটি কলেজের ফটকে এসে হামলা ও ভাঙচুর চালায়। এরপর থেকেই দুই পক্ষের মধ্যে তিন ঘণ্টার বেশি সময় ধরে সংঘর্ষ চলে।

ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীদের হামলার পর দুপুর পৌনে ১২টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত দুই কলেজের শিক্ষার্থীরা দফায় দফায় লাঠিসোঁটা হাতে মুখোমুখি অবস্থান নেন। এ সময় চলে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ছুড়ে শিক্ষার্থীদের সড়ক থেকে সরিয়ে দেয়। বেলা ৩টার পর পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়। সংঘর্ষে আহত অন্তত সাতজনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়, তবে তাঁরা কোন কলেজের শিক্ষার্থী—তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

ঢাকা কলেজ ও সিটি কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে তুচ্ছ ঘটনার কারণে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও আহত শিক্ষার্থীদের বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে

ঢাকা ও সিটি কলেজ কী কারণে মা’র’ধ’র করলো, এরা আর আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না।-ডিসি মাসুদ। 

রমনা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মাসুদ আলম সাংবাদিকদের জানান, আগের দিনের মারধরের ঘটনার জেরে আজ ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীরা সিটি কলেজে এসে ভাঙচুর চালান। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে এসে দুই পক্ষকে আলাদা করে। প্রথমে ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাসে ফিরিয়ে দেওয়া হয়, পরে সিটি কলেজের শিক্ষার্থীরাও রাস্তায় নামেন। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট ছোড়ে। এরপর পুলিশ তাঁদের বুঝিয়ে কলেজে ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। কেউ শুনেছে, কেউ শোনেনি। একপর্যায়ে ব্যাপক ইটপাটকেল ছোড়ার ঘটনায় পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর সায়েন্স ল্যাব এলাকায় ঢাকা কলেজ ও সিটি কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষের সময় এক পক্ষের শিক্ষার্থীরা মারমুখী ভঙ্গিতে অবস্থান নেয়। এ বিষয়ে রমনা বিভাগের উপকমিশনার মাসুদ আলম বলেন, তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বারবার দুই কলেজের মধ্যে সংঘর্ষ ঘটছে, যা এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। তিনি জানান, ঢাকা কলেজ ও সিটি কলেজের শিক্ষকদের সঙ্গে কথা হয়েছে এবং এ সমস্যার একটি স্থায়ী সমাধান জরুরি। পুলিশের ২০–২৫ জন সদস্য এই সংঘর্ষে আহত হয়েছেন বলেও জানান তিনি। “এটা কত দিন চলবে? বারবার বলা হচ্ছে, সমাধান দরকার। যেকোনো সময় বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যেতে পারে, কেউ তো এমনটা চান না,” বলেন তিনি। উল্লেখ্য, এর আগে সর্বশেষ ১৫ এপ্রিল একইভাবে দুই কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ হয়েছিল। পুলিশের মতে, এমন ঘটনা প্রায়ই ঘটছে।

পুলিশ পদক্ষেপ নিলে এমন ভাঙচুর হতো না: সিটি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ

ঢাকা সিটি কলেজে হামলার সময় পাশেই ৫০ থেকে ১০০ জন পুলিশ সদস্য দাঁড়িয়ে ছিলেন, কিন্তু তারা কোনো পদক্ষেপ নেননি—এমন অভিযোগ তুলেছেন কলেজটির ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোবারক হোসেন। মঙ্গলবার বিকেলে কলেজের সামনে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আমাদের কলেজে যখন হামলা হয়, তখন থানার প্রশাসনের লোকজন, প্রায় ৫০ বা ১০০ জন পুলিশ পাশে ছিল। আমার মনে হয়, তারা যদি সময়মতো ব্যবস্থা নিত, তাহলে এভাবে কলেজে ভাঙচুর হতো না।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা আশা করি প্রশাসন কঠোর হাতে দুষ্কৃতকারীদের দমন করবে। শুধু আমার কলেজ নয়, ঢাকা কলেজ, আইডিয়াল কলেজ—সব প্রতিষ্ঠানের স্থাপনা ও এলাকার জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা থানা-পুলিশের দায়িত্ব। আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করা শিক্ষকদের কাজ নয়, এটি প্রশাসনের কাজ।’

আজকের হামলা, ভাঙচুর ও সংঘর্ষ নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে সিটি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোবারক হোসেন বলেন, “গতকাল (সোমবার) একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনায় ঢাকা কলেজের এক শিক্ষার্থী আহত হন। কে বা কারা তাকে আক্রমণ করেছে, আমরা তা জানি না। এ ঘটনার পর আমরা ঢাকা কলেজের শিক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তাঁরা আশ্বাস দিয়েছিলেন, তাঁদের শিক্ষার্থীরা কোনো বিশৃঙ্খলায় জড়াবে না কিংবা কোনো অন্যায় করবে না।” তিনি জানান, সিটি কলেজের শিক্ষকরা নিজ কলেজের শিক্ষার্থীদেরও সতর্ক রাখার চেষ্টা করেছেন যাতে তারা কোনো অপ্রীতিকর ঘটনায় জড়িত না হয়।

ছাত্র নামধারী দুষ্কৃতকারী! 

“কিন্তু হঠাৎ বেলা ১১টার দিকে দেখা যায়, কিছু ছাত্র নামধারী দুষ্কৃতকারী ঢাকা সিটি কলেজের স্থাপনায় বর্বর হামলা চালায়, ভাঙচুর করে, এমনকি স্থাপনার কিছু অংশ খুলে নিয়ে যায়। এ ধরনের ন্যাক্কারজনক ঘটনা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না,” বলেন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, রোজার আগেও এভাবে সিটি কলেজের ওপর হামলা হয়েছিল। ঘটনার প্রতিকার চেয়ে তিনি বলেন, “সমগ্র দেশবাসী, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, মাউশি, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রধান উপদেষ্টা, শিক্ষা উপদেষ্টা, থানা প্রশাসন, ডিসি—সব স্টেকহোল্ডারের প্রতি আমাদের আহ্বান, দুষ্কৃতকারীদের চিহ্নিত করে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করুন। আমাদের শিক্ষার্থীরা কারও কলেজে ভাঙচুর করতে যায়নি—এই এলাকার জনগণই তার সাক্ষী।”

মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর সায়েন্স ল্যাব এলাকায় ঢাকা কলেজ ও সিটি কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষ থামাতে পুলিশ এক পক্ষের শিক্ষার্থীদের ধাওয়া দেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সক্রিয় ভূমিকা নিলেও, বারবার এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সিটি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোবারক হোসেন।

তিনি বলেন, “এখানে ঢাকা সিটি কলেজে প্রায় ১২ হাজার, ঢাকা কলেজে সাত–আট হাজার এবং আইডিয়াল কলেজে পাঁচ–সাত হাজার শিক্ষার্থী রয়েছে। অর্থাৎ প্রায় ২৫ হাজার শিক্ষার্থীর আনাগোনা এই এলাকায়। তারা রাস্তায় দাঁড়িয়ে গল্প করে, আড্ডা দেয়। এর মধ্যে কিছু শিক্ষার্থী বিভিন্ন ফেসবুক গ্রুপে একে অপরকে কটাক্ষ করে। এসব থেকেই ছোটখাটো ঝগড়া শুরু হয়, যা পরে বড় ধরনের সংঘর্ষে রূপ নেয়। বিষয়টি এখন একেবারে অনিয়ন্ত্রিত।”

সমস্যার সমাধানে উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, “ঢাকা কলেজ ও আইডিয়াল কলেজের শিক্ষকদের সঙ্গে আমরা একসঙ্গে কাজ করছি। সবাই আন্তরিকভাবে চাচ্ছেন সমস্যার সমাধান হোক। এখন প্রশাসনের পক্ষ থেকে সক্রিয় হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।”

উপসংহার:

ঢাকা কলেজ ও সিটি কলেজ—দুটি প্রথিতযশা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের মধ্যে এভাবে ঘন ঘন সংঘর্ষ শুধু শিক্ষাব্যবস্থার পরিবেশকেই কলুষিত করছে না, বরং রাজধানীর জনসাধারণের নিরাপত্তা ও চলাচলেও ব্যাঘাত সৃষ্টি করছে। শিক্ষার্থীদের হাতে ইটপাটকেল কিংবা লাঠিসোঁটা থাকার কথা নয়, তাদের হাতে থাকার কথা বই, খাতা, কলম। অথচ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কটাক্ষ, গুজব কিংবা চরম প্রতিক্রিয়ার সংস্কৃতি আজ শিক্ষাঙ্গনকেও উত্তপ্ত করে তুলছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য শুধু কলেজ প্রশাসনের আন্তরিকতা যথেষ্ট নয়—প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগের। শিক্ষক, অভিভাবক, পুলিশ প্রশাসন ও স্থানীয় সরকারসহ সব পক্ষের মধ্যে পারস্পরিক সমঝোতা ও বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা জরুরি হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে সহনশীলতা, শ্রদ্ধাবোধ এবং সহপাঠীদের প্রতি দায়িত্ববোধ গড়ে তোলার দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। অন্যথায়, সামান্য ভুল বোঝাবুঝিও ভবিষ্যতে বড় বিপর্যয়ের রূপ নিতে পারে—যার খেসারত দিতে হবে পুরো সমাজকে।

সহকারী সম্পাদক, দ্যা ক্যাম্পাস মিরর। 

টক-মিষ্টি লটকন: ছোট ফল, অসাধারণ উপকারিতা

বর্ষাকালের জনপ্রিয় একটি ফল লটকন। ছোট আকৃতির এই টক-মিষ্টি ফলটি শুধু স্বাদেই নয়, পুষ্টিগুণেও দারুণ সমৃদ্ধ। সাধারণত গাছ থেকে ঝুলে থাকা অবস্থায় বিক্রি হওয়া এই ফল শহর ও গ্রামের মানুষ সবার কাছেই পরিচিত। কিন্তু অনেকেই জানেন না, এই ফলটির ভেতরে লুকিয়ে আছে নানা ধরনের জৈব সক্রিয় যৌগ এবং স্বাস্থ্য উপকারিতা।

পুষ্টিগুণে ভরপুর

লটকন ফলে রয়েছে ফাইটোকেমিক্যালস যেমন ফেনোলিক্স, ফ্ল্যাভোনয়েড এবং ক্যারোটিনয়েডস, যা শরীরের কোষকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করে। এতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি, ভিটামিন এ, ফোলেট, পটাসিয়াম, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম এবং ডায়েটারি ফাইবার। এসব উপাদান শরীরের নানা ধরনের জৈবিক কার্যক্রমে সহায়তা করে।

অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের ভাণ্ডার

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথের গবেষণায় দেখা গেছে, লটকনে রয়েছে প্রচুর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, বিশেষ করে পলিফেনল, ফ্ল্যাভোনয়েড ও ভিটামিন-সি। এই উপাদানগুলো শরীরে জমে থাকা ফ্রি র‍্যাডিক্যাল ধ্বংস করে, যা কোষের ক্ষতি ও অক্সিডেটিভ স্ট্রেসের মূল কারণ। অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমলে হৃদরোগ, ক্যানসার, ডায়াবেটিস এবং বয়সজনিত রোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। নিয়মিত অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসমৃদ্ধ খাবার খেলে ত্বকও থাকে উজ্জ্বল ও সুস্থ।

 রক্তশূন্যতায় আয়রনের উৎস

লটকন আয়রনের একটি প্রাকৃতিক উৎস, যা শরীরে হিমোগ্লোবিন তৈরিতে অপরিহার্য। হিমোগ্লোবিন রক্তে অক্সিজেন পরিবহন করে, ফলে শরীরের প্রতিটি কোষে শক্তি পৌঁছায়। আয়রনের ঘাটতি হলে ক্লান্তি, দুর্বলতা, মাথা ঘোরা, এমনকি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যেতে পারে।
কারা বেশি উপকৃত হবেন?

  • গর্ভবতী নারী
  • কিশোরী মেয়েরা
  • রক্তশূন্যতায় ভোগা রোগীরা
    টিপস: লটকনের সঙ্গে ভিটামিন-সি সমৃদ্ধ খাবার (যেমন লেবু বা কমলা) খেলে আয়রন শোষণ আরও ভালো হয়।

 রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি

লটকনে প্রচুর ভিটামিন-সি থাকে, যা ইমিউন সিস্টেমকে শক্তিশালী করে। ভিটামিন-সি শ্বেত রক্তকণিকার কার্যকারিতা বাড়ায়, যা ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ?

  • সর্দি-কাশি প্রতিরোধে সহায়ক
  • ক্ষত দ্রুত শুকাতে সাহায্য করে
  • শরীরে অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের মাত্রা বাড়ায়
    টিপস: মৌসুমি রোগের সময় প্রতিদিন ৩-৪টি লটকন খেলে ইমিউন সাপোর্ট পাওয়া যায়।

 হাইড্রেশনের প্রাকৃতিক উৎস

লটকনের ৮০% এর বেশি অংশ জলীয় উপাদানে গঠিত, যা শরীরকে হাইড্রেটেড রাখতে সহায়তা করে। গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় ঘামের মাধ্যমে শরীর থেকে পানি বের হয়ে যায়, তখন লটকন খেলে পানিশূন্যতা রোধ হয়।
কার জন্য উপকারী?

  • যারা বাইরে কাজ করেন
  • খেলোয়াড় বা শারীরিক পরিশ্রমকারী
    টিপস: গরমের দিনে ফ্রিজে ঠান্ডা করে লটকন খেলে তা শরীর ঠান্ডা রাখতেও সাহায্য করে।

রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক

লটকনে থাকা পটাসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম রক্তনালীর স্থিতিস্থাপকতা বজায় রাখে এবং সোডিয়ামের ক্ষতিকর প্রভাব কমায়। ফলে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ?

হৃদরোগ প্রতিরোধে সহায়ক
টিপস: লবণ কমিয়ে লটকন খেলে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আরও ভালো ফল পাওয়া যায়।

উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি কমায়

ত্বক ও মানসিক স্বাস্থ্যের যত্নে

বর্ষাকালে ত্বকে ফাংগাল ইনফেকশন ও চর্মরোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। লটকনে থাকা প্রাকৃতিক অ্যান্টিসেপটিক উপাদান ত্বকের রোগ প্রতিরোধে সহায়তা করে। পাশাপাশি, কিছু গবেষণায় দেখা গেছে লটকনের বায়োঅ্যাকটিভ যৌগ মেজাজ ভালো রাখতে ও মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে।

পরিপাক ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে

লটকনে রয়েছে খাদ্যআঁশ (ডায়েটারি ফাইবার), যা হজম প্রক্রিয়া উন্নত করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধে সহায়তা করে। এতে অতিরিক্ত চিনি নেই, ফলে এটি রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে। ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য এটি একটি নিরাপদ ফল।

অতিরিক্ত স্বাস্থ্য উপকারিতা

✔ লটকনে থাকা ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস হাড় ও দাঁতের গঠন মজবুত করে।
✔ এতে থাকা ভিটামিন-বি কমপ্লেক্স স্নায়ুতন্ত্রের কার্যকারিতা উন্নত করে।
✔ লটকনের প্রাকৃতিক অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি উপাদান শরীরের প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে।

সতর্কতা ও পরিমিত সেবন

লটকন উপকারী হলেও অতিরিক্ত খাওয়া উচিত নয়। প্রতিদিন ৩-৪টি লটকন খাওয়া নিরাপদ। অতিরিক্ত খেলে ক্ষুধামন্দা বা হজমের সমস্যা হতে পারে। এছাড়া এতে পটাসিয়ামের পরিমাণ বেশি থাকায় কিডনি রোগীদের জন্য সীমিত পরিমাণে গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হয়। কিডনির রোগী হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে লটকন খাওয়া উচিত।

শেষ কথা

ছোট আকারের হলেও লটকন প্রকৃতির এক আশ্চর্য উপহার। এতে রয়েছে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ভিটামিন, খনিজ ও ফাইবার, যা শরীর ও মনের সুস্থতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই মৌসুমে লটকন খেতে ভুলবেন না।

বনভূমি ইজারাঃ ২.৫ লাখ একর জমি বেদখল।

দেড় লক্ষাধিক দখলদারের দখলে রয়েছে আড়াই লাখ একরের বেশি বনভূমি, যার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ১২ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে সংরক্ষিত বনভূমি দখল হয়েছে ১ লাখ ৩৮ হাজার একরের বেশি এবং অন্যান্য ভূমি দখল হয়েছে প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার একর। এসব বনের জায়গায় গড়ে উঠেছে রিসোর্ট, কটেজ, ঘরবাড়ি, শিল্পকারখানা, দোকানপাট, গবাদি পশুর খামারসহ নানা স্থাপনা। এমনকি সরকারি প্রতিষ্ঠানের দখলেও রয়েছে বিপুল পরিমাণ বনভূমি। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বনভূমি উদ্ধারে জোরালো পদক্ষেপ নিয়েছে। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বরাদ্দকৃত জমি ফেরত আনার উদ্যোগ চলছে। বনভূমি উদ্ধারে গঠন করা হয়েছে বিশেষ টাস্কফোর্স। তবে গত নয় মাসে উদ্ধার হয়েছে মোট জমির ১ শতাংশেরও কম।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান গণমাধ্যমকে বলেন, ‘দখলদারদের পেছনের শক্তি অনেক বেশি। আমাদের যে লজিস্টিক সাপোর্ট আছে, তা দিয়ে রাতারাতি এত জমি উদ্ধার সম্ভব নয়। অনেক জায়গায় বনভূমি দখল করে শিল্পকারখানা গড়ে উঠেছে। তিন পুরুষ ধরে বনের জমি ভোগদখল করছে অনেকে। এসব জমি নিয়ে অসংখ্য মামলা রয়েছে। আদালতের স্থগিতাদেশ থাকায় উচ্ছেদ করা যাচ্ছে না। গাজীপুরের বেদখল ৮৮ একর বনভূমি থেকে ৫০ একর উদ্ধার করতেই নয় মাস লেগেছে। তাই আমরা নতুন দখল উচ্ছেদে মনোযোগ দিচ্ছি। পাশাপাশি উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ দেওয়া জমি ফেরত আনার কাজ চলছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমান সরকার সীমিত সময় বিবেচনায় কয়েকটি কাজ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে করছে। কক্সবাজারে বিভিন্ন সংস্থার জন্য বরাদ্দ করা প্রায় ১২ হাজার একর বনভূমি ফেরত দেওয়া হচ্ছে। আমার লক্ষ্য অন্তত ২০ হাজার একর বনভূমি উদ্ধার করা এবং আরও ১০ হাজার একর উদ্ধারের পথ তৈরি করে যাওয়া।’

বন অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশে জবরদখল হওয়া বনভূমির পরিমাণ ২ লাখ ৫৭ হাজার ১৫৮ একর। দখলদারদের সংখ্যা ১ লাখ ৬০ হাজার ৫৬৬ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে স্থায়ী স্থাপনাসহ কলকারখানার দখলে রয়েছে ১ হাজার ৭২২ একর। হাটবাজার, দোকানপাট, রিসোর্ট, কটেজ, কৃষি ফার্ম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দখলে আছে ১৩ হাজার ৪৩৫ একর। ব্যক্তিমালিকানাধীন ঘরবাড়ি গড়ে উঠেছে ১ লাখ ৮ হাজার ৪৫৮ একরে এবং স্থায়ী স্থাপনাবিহীন (কৃষিজমি, চারণভূমি, বাগান, লবণ চাষ, পতিত ভূমি ইত্যাদি) দখলে আছে ১ লাখ ৩৩ হাজার ৫৪৩ একর। এসব বনভূমি উদ্ধারে বন বিভাগের দায়ের করা মামলার সংখ্যা ৮ হাজার ৬০৬টি। তবে অনেক মামলা বছরের পর বছর ঝুলে আছে। সূত্র জানায়, মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তিতে বন বিভাগের আগ্রহ কম, কারণ অধিকাংশ জমি বেদখলের পেছনে বন বিভাগের কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততা রয়েছে।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, গত বছরের আগস্ট থেকে মার্চ পর্যন্ত অভিযানে উদ্ধার হয়েছে ১ হাজার ৭১৬ দশমিক ৯৮ একর বনভূমি, যার বেশিরভাগ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে। এ ছাড়া কক্সবাজারে লোকপ্রশাসন একাডেমির জন্য বরাদ্দকৃত ৭০০ একর সংরক্ষিত বনভূমির বরাদ্দ বাতিল করা হয়েছে। ফুটবল ফেডারেশনের জন্য ২০ একর বনভূমি অবমুক্তকরণ প্রজ্ঞাপনও বাতিল করা হয়েছে। সোনাদিয়া দ্বীপে বেজার অনুকূলে বরাদ্দ দেওয়া জমি বন বিভাগের অনুকূলে ফেরত আনার উদ্যোগ চলছে। কক্সবাজারে শহীদ এ টি এম জাফর আলম ক্যাডেট কলেজের জন্য বরাদ্দ ১৫৫.৭০ একর বনভূমি বাতিল করা হয়েছে। মিরসরাই রেঞ্জে বেজার অনুকূলে বন্দোবস্ত দেওয়া ২২ হাজার ৩৩৫ একরের মধ্যে গাছপালা বিদ্যমান ৪ হাজার ১০৪ একর ফেরতের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন দখলের খবর পেয়ে ২৬ এপ্রিল গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার সাতখামাইর বিটে যৌথ বাহিনীর অভিযানে সদ্যনির্মিত ৫৬টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে প্রায় ২০ কোটি টাকা মূল্যের ৪ একর বনভূমি উদ্ধার করা হয়।

ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)-এর সদস্যসচিব শরীফ জামিল বলেন, ‘বাংলাদেশের সব জায়গায় জমির দাম সমান নয়। কোথাও বেশি, কোথাও কম। সম্প্রতি গাজীপুরে ৪ একর বনভূমি উদ্ধার করা হয়েছে, যার মূল্য ২০ কোটি টাকা বলে গণমাধ্যমে এসেছে। এ হিসেবে ১০ থেকে ১২ লাখ কোটি টাকার বনভূমি জবরদখলে আছে। তবে দাম মুখ্য নয়, বনভূমি উদ্ধারটাই বড় বিষয়। সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দখলেই প্রচুর বনভূমি রয়েছে। আগে সেগুলো উদ্ধার করা হলে বাকিগুলোও সহজ হবে।’

গ্রীষ্মের পুষ্টিকর স্বস্তি: তিনটি ফলের লাচ্ছি ও অতিরিক্ত কিছু ভাবনা

গ্রীষ্মের দাবদাহে যখন সূর্য মাথার ওপরে তেতে থাকে, তখন শরীর ও মন দুটোরই দরকার একটু স্বস্তি ও সতেজতা। এই সময় ডিহাইড্রেশনের সমস্যা বেড়ে যায়, যা ক্লান্তি, মাথা ঘোরা এবং হজমের গোলমাল তৈরি করতে পারে। পানীয় হিসেবে লাচ্ছি শুধু স্বাদের জন্য নয়, স্বাস্থ্য রক্ষার জন্যও এক অসাধারণ পুষ্টিকর উপায়। এতে রয়েছে প্রোবায়োটিক, যা হজমে সহায়তা করে, সঙ্গে দেয় ঠান্ডা অনুভূতি।

বাড়িতে আমরা অনেকেই নিয়মিত টক বা মিষ্টি দই দিয়ে সাধারণ লাচ্ছি বানাই। কিন্তু প্রতিদিন একঘেয়েভাবে একই স্বাদ খেতে কার ই বা ভালো লাগে? একটু ভিন্ন স্বাদের খোঁজে, গ্রীষ্মকালীন মৌসুমি ফল দিয়ে তৈরি লাচ্ছি হতে পারে আপনার সেরা সঙ্গী। নিচে তিনটি সহজ ও স্বাস্থ্যকর ফলভিত্তিক লাচ্ছির রেসিপি দেওয়া হলো, সঙ্গে কিছু অতিরিক্ত টিপস ও বিকল্পের কথাও থাকল—

১. বেলের লাচ্ছি

উপকরণ: পাকা বেল – ১টি, টক দই – ১ কাপ, চিনি – স্বাদমতো, বিট লবণ – ১ চা চামচ, লেবুর রস – সামান্য, বরফ কুচি – প্রয়োজনমতো

প্রস্তুত প্রণালী: বেল ভালোভাবে ধুয়ে খোসা ছাড়িয়ে সামান্য পানি দিয়ে কিছুক্ষণ ভিজিয়ে রাখুন। তারপর বিচি আলাদা করে বেলের পাল্প, টক দই, চিনি, বিট লবণ, লেবুর রস ও বরফ কুচি একসঙ্গে ব্লেন্ডারে দিয়ে ভালোভাবে মিশিয়ে নিন। ঠান্ডা গ্লাসে ঢেলে পরিবেশন করুন।

গ্রীষ্মে পুষ্টিকর ও ঠান্ডা অনুভূতির জন্য বেল, কলা ও তরমুজের লাচ্ছি রেসিপি ও স্বাস্থ্য টিপস। সহজ, ফলভিত্তিক, সুস্বাদু লাচ্ছি
গ্রীষ্মে পুষ্টিকর ও ঠান্ডা অনুভূতির জন্য বেল, কলা ও তরমুজের লাচ্ছি রেসিপি ও স্বাস্থ্য টিপস। সহজ, ফলভিত্তিক, সুস্বাদু লাচ্ছি

স্বাস্থ্য টিপ: বেল হজমশক্তি বাড়ায় এবং অন্ত্র পরিষ্কার রাখে। এটি বিশেষ করে ডায়রিয়ার প্রতিরোধে কার্যকর।

২. কলার লাচ্ছি

উপকরণ: মাঝারি আকারের পাকা কলা – ৪টি। টক দই – ১ কাপ। গরুর দুধ – ১ কাপ। চিনি বা চিনির সিরাপ – স্বাদমতো। বরফ কুচি – প্রয়োজনমতো।

প্রস্তুত প্রণালী:

পাকা কলা ছোট ছোট টুকরো করে নিন। এরপর ব্লেন্ডারে কলা, দই, দুধ, চিনি এবং বরফ কুচি দিয়ে ভালোভাবে ব্লেন্ড করে গ্লাসে পরিবেশন করুন।

স্বাস্থ্য টিপ: কলায় পটাশিয়াম ও ফাইবার থাকে, যা হার্ট সুস্থ রাখে এবং দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখে।

৩. তরমুজের লাচ্ছি

উপকরণ: তরমুজের টুকরো – ২ কাপ। টক দই – ১ কাপ।গরুর দুধ – ১ কাপ। চিনি – স্বাদমতো। বিট লবণ – ১ চা চামচ। লেবুর রস – সামান্য। বরফ কুচি – প্রয়োজনমতো

প্রস্তুত প্রণালী: সব উপকরণ একসঙ্গে ব্লেন্ডারে দিয়ে ভালোভাবে মিশিয়ে নিন। তারপর ঠান্ডা গ্লাসে ঢেলে পরিবেশন করুন।

স্বাস্থ্য টিপ: তরমুজে প্রচুর পানি থাকে যা শরীরকে হাইড্রেটেড রাখে। এটি তাপপ্রবাহের বিরুদ্ধে দেহকে ঠান্ডা রাখে।

অতিরিক্ত টিপস ও বিকল্প ভাবনা:

চিনি না চাইলে: আপনি মধু, খেজুরের গুড় বা স্টেভিয়া ব্যবহার করতে পারেন স্বাস্থ্যের কথা ভেবে।

দুধের বিকল্প: যারা দুধ হজম করতে পারেন না, তারা বাদাম দুধ বা নারকেল দুধ ব্যবহার করতে পারেন।

আরও ফলের লাচ্ছি: আম, পেঁপে, আনারস, লিচু কিংবা কিউই দিয়েও তৈরি করা যায় সুস্বাদু ও পুষ্টিকর লাচ্ছি।

সাজানোর জন্য: গ্লাসের মুখে লেবুর স্লাইস বা পুদিনা পাতার ছোট টুকরো দিয়ে পরিবেশন করলে দেখতেও লাগবে সুন্দর।

গ্রীষ্মকালে শুধু ঠান্ডা খাবার নয়, ঠান্ডা মনও দরকার। এই তিন ধরনের ফলের লাচ্ছি শুধু শরীরকে ঠান্ডা রাখে না, মনকেও করে আনন্দিত। তাই প্রতিদিন একঘেয়েমির পরিবর্তে রোজ একটু ভিন্ন স্বাদের অভিজ্ঞতায় দিনটাকে করে তুলুন আরও সতেজ ও প্রাণবন্ত। এই গ্রীষ্মে পান করুন স্বাস্থ্যকর, ফলভিত্তিক লাচ্ছি — সুস্থ থাকুন, শান্ত থাকুন।

মখদুম শাহ দৌলার মাজার ও মসজিদ

 

সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর পৌর শহরের দরগাপাড়ায় অবস্থিত হজরত মখদুম শাহ দৌলা শহীদ ইয়েমেনি (রহ.)-এর মসজিদ ও মাজার শরিফ শুধু ধর্মীয় স্থান নয়, এটি এক ঐতিহাসিক নিদর্শন। বিশ্বাস করা হয়, ইয়েমেনের রাজপুত্র হজরত মখদুম শাহ দৌলা (রহ.)-এর নামেই এই অঞ্চলের নামকরণ হয়েছে ‘শাহজাদপুর’।

সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে হজরত মখদুম শাহ দৌলা (রহ.)-এর মসজিদ ও মাজার, ঐতিহাসিক নিদর্শন ও ইসলাম প্রচারের কেন্দ্রবিন্দু

কথিত আছে, ১১৯১-৯২ সালের দিকে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে তিনি আরবের ইয়েমেন থেকে যাত্রা শুরু করে প্রথমে বোখারায় আসেন এবং সেখানকার ওলি হজরত জালাল উদ্দিন বোখারির (রহ.) সাহচর্যে কিছু সময় কাটান। বিদায়ের সময় তিনি তাঁর হাতে এক জোড়া কবুতর দেন, যা পরবর্তীতে ‘জালালি কবুতর’ নামে পরিচিত হয়। আজও ওই কবুতরের বংশধররা মখদুমিয়া জামে মসজিদের কার্নিশে বসবাস করে।

পানি পথে শাহজাদপুর অঞ্চলে পৌঁছে, দীর্ঘ সময় ভূমির সন্ধান না পেয়ে একসময় জাহাজ মাটিতে আঘাত করে থেমে যায়। সেখানেই তিনি জাহাজ নোঙর করেন—এই জায়গাটির নামকরণ হয় ‘পোতাজিয়া’ (পোঁত অর্থ গাড়া, আওজিয়া অর্থ ভেরা)। কবুতর জোড়া ছেড়ে দিয়ে তিনি মাটি ও মানুষের অস্তিত্ব নিশ্চিত করেন এবং ইসলাম প্রচার শুরু করেন।

তৎকালীন সুবা-বিহারের অমুসলিম রাজা বিক্রম কিশোরী ইসলাম প্রচারে বাধা দিতে সেনাবাহিনী পাঠান, তবে মখদুম শাহ দৌলার সঙ্গীদের কাছে তারা বারবার পরাজিত হয়। কিন্তু এক গুপ্তচরের বিশ্বাসভঙ্গের কারণে শেষ যুদ্ধে তিনি শহীদ হন। কথিত আছে, আসরের নামাজে সিজদারত অবস্থায় গুপ্তচর তাঁর মাথা কেটে রাজার কাছে নিয়ে গেলে অলৌকিকভাবে তাঁর কণ্ঠ থেকে ‘সুবহানা রাব্বি আল আ’লা’ উচ্চারিত হয়। এ ঘটনা দেখে রাজা আতঙ্কিত হয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং তাঁর মাথা ‘ছের মোকাম’ নামে খ্যাত স্থানে সমাহিত করার নির্দেশ দেন। লাশ দাফন করা হয় শাহজাদপুরে, যা পরবর্তীতে নদীভাঙনে বর্তমান স্থানে সরিয়ে আনা হয়।

মখদুম শাহ দৌলার অন্যতম সঙ্গী হজরত ইউসুফ শাহ (রহ.) এ অঞ্চলের মুসলিম শাসনকর্তা নিযুক্ত হন এবং এ অঞ্চল ‘পরগণা ইউসুফ শাহী’ নামে পরিচিতি পায়। মখদুম শাহ (রহ.)-এর মাজার ছাড়াও এখানে রয়েছেন তাঁর ভাগ্নে খাজা নূর (রহ.), হজরত ইউসুফ শাহ (রহ.) এবং তাঁর ওস্তাদ হজরত শামসুদ্দিন তাবরেজি (রহ.)-এর মাজার। তাবরেজি ছিলেন বিখ্যাত সুফি জালাল উদ্দিন রুমির (রহ.) ওস্তাদ।

এছাড়া, করতোয়ার ওপারে রয়েছে হজরত শাহ হাবিবুল্লাহ ইয়েমেনি (রহ.)-এর মাজার, যেটি ‘বাদল বাড়ি’ নামে পরিচিত। স্থানীয় কিংবদন্তি অনুযায়ী, আরও কয়েকজন ওলির মাজার হুড়াসাগর নদীতে বিলীন হয়ে গেছে।

মাজারের পাশেই রয়েছে সুলতানী আমলের এক অসাধারণ স্থাপত্য—মখদুমিয়া জামে মসজিদ। ইট-চুন-সুরকির তৈরি এই মসজিদটি পাঁচটি দরজা, ১৫টি গম্বুজ এবং ২৪টি কালো পাথরের স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ধারণা করা হয়, এটি হজরত মখদুম শাহ দৌলা শহীদ ইয়েমেনি (রহ.)-এর নির্দেশে নির্মিত।

শিক্ষার্থী, স্থাপত্য বিভাগ, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি।

ক্রান্তিকালীন বিধানাবলি অসাংবিধানিক শাসন রোধ করতে পারেনি

0

সংবিধান যে কোনো রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন। একটি রাষ্ট্রের মূলনীতি কী হবে, জাতীয়তা ও ভাষা কী হবে, নাগরিকরা কোন্ কোন্ মৌলিক অধিকার ভোগ করবেন, রাষ্ট্রের শাসনপদ্ধতি কী হবে, আইনসভা কীভাবে গঠিত হবে, সাংবিধানিক পদসমূহে কীভাবে নিয়োগ দেয়া হবে, নির্বাচন পদ্ধতি কী হবে, কখন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব কে পালন করবে, শাসন বিভাগ, আইন বিভাগ ও বিচার বিভাগের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য কীভাবে রক্ষা করা হবে, প্রজাতন্ত্রের পদস্থ সামরিক-বেসামরিক পদসমূহ পূরণে কী পদ্ধতি অনুসৃত হবে, রাষ্ট্রের সরকারি হিসাব-নিরীক্ষার দায়িত্ব কার ওপর থাকবে প্রভৃতি সবিস্তারে সংবিধানে উল্লেখ থাকে।

বাংলাদেশে ক্রান্তিকালীন ও অস্থায়ী বিধানাবলি সংবিধান ও সামরিক শাসনের ইতিহাস, বৈধতা ও সাংবিধানিক প্রভাবের বিশ্লেষণ
বাংলাদেশে ক্রান্তিকালীন ও অস্থায়ী বিধানাবলি সংবিধান ও সামরিক শাসনের ইতিহাস, বৈধতা ও সাংবিধানিক প্রভাবের বিশ্লেষণ

কোনো রাষ্ট্রের শাসন কার্যসহ অপরাপর কর্মকাণ্ড সংবিধান অনুযায়ী পরিচালিত হলে তাকে সাংবিধানিক শাসন বলা হয়। গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এমন রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে সাংবিধানিক শাসনের মাধ্যমে দেশ পরিচালনায় কোনোরূপ ব্যাঘাত ঘটতে দেখা যায় না। যে কোনো কারণে গণতান্ত্রিক শাসনে ব্যাঘাত ঘটলে সেটি অতিক্রমের জন্য কোনো কোনো দেশের সংবিধানে ক্রান্তিকালীন ও অস্থায়ী বিধানাবলির অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে আমাদের দেশও ব্যতিক্রম নয়; তবে আমাদের সংবিধানে এ বিধানটিতে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সময়সীমা নির্ধারণ করে দিয়ে উক্ত সময়সীমা বহির্ভূত কোনো অসাংবিধানিক শাসনকে ক্রান্তিকালীন ও অস্থায়ী বিধানাবলি দ্বারা বৈধতা দেয়ার পথ রুদ্ধ করে দেয়া হয়েছে।

আমাদের দেশের উচ্চাদালত কর্তৃক সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণাসংক্রান্ত রায়কে অবলম্বন করে সংবিধানে পঞ্চদশ সংশোধনী আনয়নের সূত্রপাত ঘটানো হয়। উক্ত রায়ে ক্রান্তিকালীন ও অস্থায়ী বিধানাবলির ব্যাপ্তি কতটুকু হবে সে বিষয়ে আলোকপাত করা হয়। তাই ক্রান্তিকালীন ও অস্থায়ী বিধানাবলির ব্যাপ্তি নির্ধারণে রায়ের দিকনির্দেশনা যে মুখ্য নিয়ামক সে বিষয়ে কারো মধ্যে সংশয় থাকার কথা নয়। এখন দেখা যাক ক্রান্তিকালীন ও অস্থায়ী বিধানাবলি বিষয়ে ৭২’র সংবিধানে কী বলা ছিল এবং দেশের দীর্ঘ পরিক্রমায় এ বিধানাবলিতে কী কী বিষয় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

সংবিধানের ১৫০ অনুচ্ছেদ ক্রান্তিকালীন ও অস্থায়ী বিধানাবলি সংক্রান্ত। ৭২’র সংবিধানে বলা ছিল- এ সংবিধানের অন্য কোনো বিধান সত্তে¡ও চতুর্থ তফসিলে বর্ণিত ক্রান্তিকালীন ও অস্থায়ী বিধানাবলি কার্যকর হবে। ৭২’র সংবিধানের চতুর্থ তফসিলে ক্রান্তিকালীন ও অস্থায়ী বিধানাবলি হিসেবে ১৭টি বিষয়ের উল্লেখ ছিল। এ বিষয়গুলো হলো- ১. গণপরিষদ ভঙ্গকরণ ২. প্রথম নির্বাচন ৩. ধারাবাহিকতা রক্ষা ও অন্তর্বর্তী ব্যবস্থাবলি ৪. রাষ্ট্রপতি ৫. প্রধানমন্ত্রী ও অন্যান্য মন্ত্রী ৬. বিচার বিভাগ ৭. আপিলের অধিকার ৮. নির্বাচন কমিশন ৯. সরকারি কর্ম কমিশন ১০. সরকারি কর্ম ১১. পদে বহাল থাকার জন্য শপথ ১২. স্থানীয় শাসন ১৩. কর আরোপ ১৪. অন্তর্বর্তী আর্থিক ব্যবস্থাসমূহ ১৫. অতীত হিসাবের নিরীক্ষা ১৬. সরকারের সম্পত্তি পরিসম্পৎ, স্বত্ব, দায়িত্ব ও বাধ্যবাধকতা এবং ১৭. আইনের উপযোগীকরণ ও অসুবিধা দূরীকরণ। মূলত এ ১৭টি বিষয়ের মাধ্যমে সংবিধান প্রণয়ন পূর্ববর্তী এসব বিষয়ে যেসব বিধানাবলি ছিল তার কার্যকারিতা কোন কোন ক্ষেত্রে কীভাবে অক্ষুণ্ণ থাকবে এবং সংবিধানের বিধানাবলির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার জন্য কী সময়সীমা দেয়া থাকবে তার উল্লেখ রয়েছে।

সংবিধানের ৪র্থ সংশোধনীর মাধ্যমে চতুর্থ তফসিল হতে ১২ অনুচ্ছেদে উল্লিখিত ‘স্থানীয় সরকার’ বিষয়টি অবলুপ্ত করা হয়, যা পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে পুনঃ একই অনুচ্ছেদে প্রতিস্থাপিত হয়।

পরবর্তীতে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধন আইন, ১৯৭৯ এর মাধ্যমে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট হতে ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল তারিখের মধ্যে প্রণীত সব সামরিক ফরমান এবং ফরমান বলে সংবিধানে আনীত সংশোধনী ও প্রণীত আইন এবং কৃত সব ধরনের কর্মকাণ্ডকে বৈধতাদান করে আদালতে এসব বিষয়ে প্রশ্ন উত্থাপনের পথ রুদ্ধ করে এটি চতুর্থ তফসিলের ১৮ অনুচ্ছেদ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়।

অতঃপর ১৯৮২ সালে দেশ পুনঃসামরিক শাসনের কবলে পড়লে সংবিধানের ৭ম সংশোধন আইন, ১৯৮৬ এর দ্বারা ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চের সামরিক ফরমান এবং উক্ত ফরমান বলে ১৯৮৬ সালের ১১ নভেম্বর অবধি সম্পাদিত সব কার্যক্রমকে বৈধতা দান করে আদালতে যে কোনো ধরনের প্রশ্ন উত্থাপনের পথ রুদ্ধ করে চতুর্থ তফসিলে ১৯ অনুচ্ছেদ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়।

এরপর সংবিধান নবম সংশোধন আইন, ১৯৮৯ এর মাধ্যমে সংবিধানের চতুর্থ তফসিলের ২০ অনুচ্ছেদে উপরাষ্ট্রপতি সম্পর্কিত বিধান অন্তর্ভুক্ত করে বলা হয়, এ সংশোধনীটি আনয়নের পূর্বে যিনি উপরাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন তিনি উক্ত পদে বহাল থাকবেন এবং উক্ত সময়কালে যিনি রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন তার পদের মেয়াদ যে তারিখে শেষ হবে উক্ত তারিখে উপরাষ্ট্রপতির মেয়াদও শেষ হবে।

সংবিধানের নবম সংশোধনীর মাধ্যমে আনীত উপরাষ্ট্রপতি সম্পর্কিত এ বিধানটি সংবিধান দ্বাদশ সংশোধন আইন, ১৯৯১ এর দ্বারা অবলুপ্ত করা হয়।

নবম সংশোধন পরবর্তী সংবিধান একাদশ সংশোধন আইন, ১৯৯১ এর মাধ্যমে চতুর্থ তফসিলে অনুচ্ছেদ ২১ ও ২২ অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

অনুচ্ছেদ ২১ এর মাধ্যমে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর তারিখে তদানীন্তন রাষ্ট্রপতি কর্তৃক উপরাষ্ট্রপতি হিসেবে বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতিকে নিয়োগ ও শপথ প্রদান এবং তার কাছে পদত্যাগ প্রদান এবং ৬ ডিসেম্বর হতে সংবিধান একাদশ সংশোধন আইন, ১৯৯১ প্রবর্তনের তারিখে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে কার্যভার গ্রহণ করা অবধি সময়কালের মধ্যে উক্ত উপরাষ্ট্রপতি অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে যেসব কার্য সম্পন্ন করেছেন তার অনুমোদন ও সমর্থন দেয়া হয় এবং আইন অনুযায়ী সম্পন্ন করা হয়েছে মর্মে ঘোষিত হয়। তা ছাড়া উক্ত উপরাষ্ট্রপতিকে পুনঃপ্রধান বিচারপতি পদে প্রত্যাবর্তনের অনুমোদন দেয়া হয়।

অনুচ্ছেদ ২২ এ বলা হয়- সংবিধান দ্বাদশ সংশোধন আইন, ১৯৯১ প্রবর্তনের অব্যবহিত পূর্বে যে সংসদ কর্মরত ছিল অর্থাৎ পঞ্চম সংসদ তা সংবিধান ও আইন অনুযায়ী যথাযথভাবে নির্বাচিত ও গঠিত হয়েছে বলে গণ্য হবে এবং তা সংবিধানের ৭২ অনুচ্ছেদের বিধান অনুযায়ী বহাল থাকবে।

সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদে মহিলা সদস্য সম্পর্কিত অস্থায়ী বিশেষ বিধান প্রণয়ন করে বলা হয় সংবিধানের চতুর্দশ সংশোধন আইন, ২০০৪ প্রবর্তনকালে বিদ্যমান সংসদের অবশিষ্ট মেয়াদের জন্য ৫০টি আসন কেবল মহিলা সদস্যদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে এবং তারা আইন অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের দ্বারা সংসদে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে একক হস্তান্তরযোগ্য ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হবেন। উক্ত অনুচ্ছেদে আরো উল্লেখ করা হয় প্রত্যক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত ৩০০ সদস্য এবং তাদের ভোটে নির্বাচিত ৫০ মহিলা সদস্য সমন্বয়ে সংসদ গঠিত হবে। অতঃপর ২০১৮ সালে সংবিধানের সপ্তদশ সংশোধনীর মাধ্যমে একাদশ সংসদে উক্ত সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়া পরবর্তী ২৫ বছরের জন্য এ সময় বর্ধিত করা হয়।

সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে চতুর্থ তফসিল হতে অনুচ্ছেদ ১৮, ১৯, ২০, ২১, ২২ ও ২৩ অবলুপ্ত করে পূর্বের ১৫০ অনুচ্ছেদের পরিবর্তে দু’টি দফা সমন্বয়ে গঠিত ১৫০ অনুচ্ছেদ প্রতিস্থাপন পূর্বক (১) দফায় বলা হয়- এ সংবিধানের অন্য কোনো বিধান সত্তে¡ও ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর তারিখে এ সংবিধান প্রণয়নকালে সংবিধানের চতুর্থ তফসিলে বর্ণিত বিধানাবলি ক্রান্তিকালীন ও অস্থায়ী বিধানাবলি হিসেবে কার্যকর থাকবে।

একই অনুচ্ছেদে দফা (২) এ বলা হয়- ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ হতে ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর অবধি এ সংবিধান প্রবর্তন হওয়ার অব্যবহিত সময়কালের মধ্যে সংবিধানের পঞ্চম তফসিলে বর্ণিত ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ তারিখে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে দেয়া শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণ, ষষ্ঠ তফসিলে বর্ণিত ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ তারিখে শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার টেলিগ্রাম এবং ৭ম তফসিলে বর্ণিত ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল তারিখে মুজিবনগর সরকারের জারিকৃত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র হলো বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তি সংগ্রামের ঐতিহাসিক ভাষণ ও দলিল যা উক্ত সময়কালের জন্য ক্রান্তিকালীন ও অস্থায়ী বিধানাবলি বলে গণ্য হবে।

১৯৭২ সালের সংবিধান প্রণয়ন হতে পঞ্চদশ সংশোধনী প্রবর্তন পূর্ববর্তী সংবিধানে চারটি তফসিলের বিষয়ে উল্লেখ ছিল। এ চারটি তফসিলের মধ্যে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনসংক্রান্ত দ্বিতীয় তফসিল সংবিধান চতুর্থ সংশোধন আইন, ১৯৭৫ এর মাধ্যমে অবলুপ্ত করা হয়। সংবিধানে পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তম তফসিল পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে অন্তর্ভুক্ত হয়। প্রথম, তৃতীয় ও চতুর্থ তফসিলে অন্তর্ভুক্ত বিষয়সমূহ সংবিধানের বিভিন্ন সংশোধনীর মাধ্যমে সংযোজিত, বিয়োজিত ও প্রতিস্থাপিত হয়।

সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধন পরবর্তী অনুচ্ছেদ ১৫০ এর বিধানাবলি, চতুর্থ তফসিল হতে অনুচ্ছেদ ১৮, ১৯, ২০, ২১, ২২ ও ২৩ এর অবলুপ্তি এবং পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তম হিসেবে তিনটি নতুন তফসিলের অন্তর্ভুক্তি পর্যালোচনায় প্রতীয়মান হয় ক্রান্তিকালীন ও অস্থায়ী বিধানাবলি বলতে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ হতে ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর অবধি ও সংবিধান প্রবর্তনকালে সংবিধানের চতুর্থ তফসিলে যেসব বিষয়ের উল্লেখ ছিল উক্ত বিষয়াবলিসহ পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তম তফসিলে উল্লিখিত বিষয়গুলো গণ্য হবে।

স্পষ্টত পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে প্রতিস্থাপিত ১৫০ অনুচ্ছেদে যে সীমারেখা দেয়া হয়েছে উক্ত সীমারেখায় যে তারিখে সংবিধান প্রণীত হয়েছে সে তারিখের পরবর্তী কোনো অসাংবিধানিক শাসনকে ক্রান্তিকালীন ও অস্থায়ী বিধানাবলি দ্বারা অনুমোদন সমর্থন করে না। উল্লেখ্য যে, যদিও উচ্চাদালতের সিদ্ধান্তের অনুবলে পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে অনুমোদিত ৭৫’র সামরিক শাসন এবং সপ্তম সংশোধনীর মাধ্যমে অনুমোদিত ৮২’র সামরিক শাসনকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে এবং সে অবৈধ ঘোষণা চতুর্থ তফসিল হতে ৫ম ও ৭ম সংশোধনীর অনুবলে সংযোজিত অনুচ্ছেদ ১৮ ও ১৯ অবলুপ্তির কারণের উদ্ভব ঘটিয়েছে কিন্তু একাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সন্নিবেশিত অনুচ্ছেদ ২১ ও ২২ বিষয়ে আদালতে কোনো মামলা না হলেও সংসদ তা স্বীয় এখতিয়ার বলে চতুর্থ তফসিল হতে অবলুপ্ত করে।

এ কথাটি অস্বীকার করার উপায় নেই যে, আদালত কর্তৃক পঞ্চম ও সপ্তম সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করা হলেও উভয় সংশোধনীর মাধ্যমে উচ্চাদালতের বিচারকদের জন্য যেসব সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছিল তা অজানা আকাক্সক্ষায় অক্ষুণ্ণ রাখা হয়। এ অক্ষুণ্ণ রাখা হতে ধারণা করা যায় পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে প্রতিস্থাপিত ১৫০ অনুচ্ছেদের ক্রান্তিকালীন ও অস্থায়ী বিধানাবলি দ্বারা বেসামরিক বা সামরিক ব্যক্তি কর্তৃক অসাংবিধানিক শাসনের পথ রুদ্ধ করা গেলেও তা কি সাংবিধানিক পদধারী কর্তৃক অসাংবিধানিক শাসনের পথ রুদ্ধ করতে পারবে? আর রুদ্ধ করতে পারবে না বলেই দেখা গেল ২০০৭ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি হতে ২০০৯ সালের ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শাসনের বিষয়টি তত্ত্বাবধায়ক সরকার অবৈধ সংক্রান্ত মামলার বিষয়বস্তুতে অন্তর্ভুক্ত না হওয়া সত্তে¡ও আদালত অযাচিতভাবে উক্ত সরকারকে অবৈধ ঘোষণা করে এবং সংসদকে পাশ কাটিয়ে উক্ত সরকারের কার্যকলাপের বৈধতা দান করে। এ বৈধতা দ্বারা অনুমিত হয় সংসদও ক্ষেত্রবিশেষে অজানা আকাক্সক্ষার কাছে অসহায়।

বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার সংবিধানবিষয়ক যেকোনো সংশোধনী আনতে চাইলে তাকে অবশ্যই আগামী সংসদ নির্বাচনে যারা বিজয়ী হবেন তাদের সাথে সমঝোতায় উপনীত হয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায় সাংবিধানিক সঙ্কট দেখার সমূহ সম্ভাবনা থেকেই যায়।

লেখক : সাবেক জজ, সংবিধান, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক