জাপানি রিকন্ডিশন্ড গাড়ি কেনার ক্ষেত্রে প্রতারণা এড়াতে করণীয় ও বিশেষ সতর্কতা

0

জাপানি সেকেন্ড হ্যান্ড গাড়ি, বিশেষ করে টয়োটা, হোন্ডা, নিসান, এবং সুজুকির মতো ব্র্যান্ডগুলি বাংলাদেশের বাজারে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। এই গাড়িগুলি প্রায়ই তাদের উন্নত গুণগত মান, মাইলেজে দক্ষতা, এবং দীর্ঘস্থায়ী ব্যবহারের জন্য পরিচিত। বর্তমানে, বিশ্বব্যাপী সেকেন্ড হ্যান্ড গাড়ির বাজারের বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বাংলাদেশেও বাজারেও লক্ষ্যণীয়। গাড়ির দাম বৃদ্ধি, নতুন গাড়ির উপর অতিরিক্ত খরচ এড়াতে, এবং পরিবেশগত কারণে সেকেন্ড হ্যান্ড গাড়ি কেনার প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। তবে, এই বাজারে প্রতারণার সম্ভাবনা রয়েছে, যা ক্রেতাদের জন্য একটি গুরুতর উদ্বেগের বিষয়।

সেকেন্ড হ্যান্ড গাড়ি কেনার সময় প্রতারণার শিকার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। অনেক সময় ক্রেতারা গাড়ির ইতিহাস, কাগজপত্র, এবং শারীরিক অবস্থার দিকে বিশেষ দৃষ্টি দিতে ব্যর্থ হন। এ কারণে, ক্রেতারা গাড়ির মেরামতের ইতিহাস, দুর্ঘটনার তথ্য এবং পূর্বের মালিকের সম্পর্কে সঠিক তথ্য না জানার কারণে প্রতারণার শিকার হতে পারেন। এটি কেবল আর্থিক ক্ষতি নয়, বরং নিরাপত্তার দিক থেকেও গুরুতর সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। অতএব, ক্রেতাদের জন্য সচেতনতা ও সঠিক তথ্য সংগ্রহ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

গাড়ি কেনার সময় সতর্কতা

গাড়ির ইতিহাস যাচাই

গাড়ির ইতিহাস যাচাই করা একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। ভিআইএন (VIN) নম্বর ব্যবহার করে গাড়ির ইতিহাস রিপোর্ট পাওয়া যায়। গাড়ির পূর্ব মালিকানা, দুর্ঘটনা, এবং মেরামতের তথ্য সংগ্রহ করতে এই নম্বর ব্যবহৃত হয়। সাধারণত, গাড়ির ইতিহাস রিপোর্ট পাওয়ার জন্য CarModsBD এর auction sheet verification এর মতো অনলাইন সেবা ব্যবহার করা হয়। এই রিপোর্টে গাড়ির মাইলেজ, দুর্ঘটনার ইতিহাস, এবং মেরামতের তথ্য সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ থাকে, যা ক্রেতাদের সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে।

ডিলারের বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই

ডিলারের বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের লাইসেন্স যাচাই করা এবং গ্রাহক রিভিউ পড়া উচিত। একজন ভালো ডিলার সাধারণত দীর্ঘমেয়াদী ব্যবসায়িক সম্পর্ক তৈরি করে এবং গ্রাহকদের সঠিক তথ্য প্রদান করে। প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস ও সুনাম যাচাই করা প্রয়োজন যাতে আপনি নিশ্চিত হতে পারেন যে আপনি একটি নিরাপদ এবং সঠিক ডিল করছেন। দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করছে এমন ডিলারদের কাছে গাড়ি কেনা সাধারণত বেশি নিরাপদ।

গাড়ির শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা

গাড়ির শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। বাইরের দিক, রঙের অমিল, দাগ, স্ক্র্যাচ ইত্যাদি পরীক্ষা করা উচিত। ইঞ্জিনের শব্দ, তেল লিকেজ, ব্রেক পরীক্ষা এবং অন্যান্য যান্ত্রিক অংশের কার্যকারিতা যাচাই করা অপরিহার্য। এছাড়াও, মাইলেজ ও রেজিস্ট্রেশন কাগজপত্র যাচাই করতে হবে। ওডোমিটার পড়া এবং কাগজপত্রে দেওয়া তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা উচিত, কারণ অনেক সময় প্রতারণা করতে কিছু বিক্রেতা ওডোমিটার পরিবর্তন করে।

গাড়ি কেনার সময় সাধারণ প্রতারণার চিহ্ন

অস্বাভাবিক দামের প্রস্তাব

গাড়ি কেনার সময় যদি দাম বাজারমূল্যের তুলনায় অনেক কম হয়, তাহলে এটি সন্দেহজনক হতে পারে। গাড়ির কার্যকারিতা, পারফরম্যান্স এবং ট্রামস এন্ড কন্ডিশন যাচাই করা উচিত। অনেক সময় ডিলারগণ গাড়ির মূল্য কমিয়ে দেয় কেবলমাত্র দ্রুত বিক্রি করার জন্য, যা পরবর্তীতে ক্রেতাদের জন্য সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। তাই, সঠিকভাবে তথ্য যাচাই করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অতিরিক্ত মেরামতের দাবি

গাড়ি কেনার সময় অতিরিক্ত মেরামতের দাবি করা হলে তা যাচাই করা প্রয়োজন। পূর্বের মালিকদের সাক্ষাৎকার নেওয়া এবং মেরামত কাজের সত্যতা যাচাই করা উচিত। যদি বিক্রেতা অতিরিক্ত মেরামত করার কথা বলে, তাহলে যাচাই করুন যে মেরামতগুলি সত্যিই প্রয়োজন ছিলো কিনা, এবং গাড়ির ইতিহাস রিপোর্টে এসব তথ্য স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে কিনা।

কাগজপত্রের অসঙ্গতি

গাড়ির কাগজপত্রের মধ্যে যদি কোনো অসঙ্গতি দেখা দেয়, তবে তা একটি বড় প্রতারণা চিহ্ন হতে পারে। মডেল, বর্ষ, মালিকানা ইত্যাদির মধ্যে অমিল থাকলে দ্রুত সতর্ক হওয়া উচিত। কাগজপত্রের তথ্য যাচাই করা এবং অনলাইন ডেটাবেস ব্যবহার করে সত্যতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় রেজিস্ট্রেশন অফিসের মাধ্যমে এসব তথ্য যাচাই করা সম্ভব।

গাড়ি কেনার পরের পদক্ষেপ

রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া

গাড়ি কেনার পর একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হল রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা। স্থানীয় আরটিও অফিসে গাড়ির রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া শেষ করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে হবে। সাধারণত, এই কাগজপত্রের মধ্যে আগে থেকে নিবন্ধিত মালিকের তথ্য, নতুন মালিকের পরিচয়পত্র, এবং গাড়ির পূর্বের রেজিস্ট্রেশন ডকুমেন্টস অন্তর্ভুক্ত থাকে। রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হলে, আপনি একটি নতুন রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট পাবেন, যা গাড়ির বৈধতা নিশ্চিত করে।

বীমা সংক্রান্ত নির্দেশনা

গাড়ি কেনার পরে বীমা করানো অপরিহার্য। স্থানীয় বীমা কোম্পানির সাথে যোগাযোগ করে সঠিক বীমা পরিকল্পনা নির্বাচন করা উচিত। বিভিন্ন কোম্পানির বীমার শর্তাবলী, প্রিমিয়াম এবং কভারেজের তুলনা করুন। মনে রাখবেন, সঠিক বীমা আপনার আর্থিক সুরক্ষা বৃদ্ধি করে এবং দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে সহায়তা করে। সাধারণত, তৃতীয় পক্ষের বীমা এবং কম্প্রিহেনসিভ বীমার মধ্যে নির্বাচন করা যায়।

রক্ষণাবেক্ষণ ও সেবা

নিয়মিত সেবা এবং মেরামতের জন্য স্থানীয় গ্যারেজের সন্ধান করা প্রয়োজন। গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ সঠিকভাবে না করা হলে দীর্ঘমেয়াদে সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। স্থানীয় মেকানিক বা গ্যারেজের খোঁজ নেওয়া এবং তাদের সেবার মান যাচাই করা উচিত। নিয়মিত চেকআপ, তেল পরিবর্তন, এবং অন্যান্য সেবা সময়মতো করানো গাড়ির কার্যকারিতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।

প্রতারণা এড়াতে বিশেষ সতর্কতা

নকল কাগজপত্র চিহ্নিত করা

গাড়ির কাগজপত্র যাচাই করার সময় মূল কাগজপত্রের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা উচিত। সরকারী কাগজপত্রের বৈশিষ্ট্য যাচাই করা এবং গাড়ির কাগজপত্রের সঠিকতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নকল কাগজপত্র চিহ্নিত করার জন্য স্থানীয় প্রশাসনের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে। এছাড়াও, গাড়ির পূর্বের মালিকের তথ্য যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ।

পরীক্ষামূলক ড্রাইভ

গাড়ি কেনার আগে পরীক্ষামূলক ড্রাইভ নেওয়া অপরিহার্য। গাড়ির কার্যকারিতা পরীক্ষা করা উচিত, যেন ড্রাইভিং অবস্থার বিভিন্ন দিক যাচাই করা যায়। গাড়ির ব্রেক, স্টিয়ারিং, সাসপেনশন, এবং অন্যান্য যান্ত্রিক অংশের কার্যকারিতা দেখা। পরীক্ষামূলক ড্রাইভের সময় গাড়ির আওয়াজ, শকের অবস্থা এবং অন্যান্য দিক লক্ষ্য করুন।

পেশাদার পরামর্শ গ্রহণ

গাড়ি কেনার আগে পেশাদার মেকানিক বা বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া উচিত। পেশাদার মেকানিকের মাধ্যমে গাড়ির মেকানিক্যাল চেকআপ করানো উচিত, কারণ তারা কোনো লুকানো সমস্যা চিহ্নিত করতে সক্ষম। মেকানিকের সাহায্যে আপনি গাড়ির শারীরিক অবস্থা, ইঞ্জিনের কার্যকারিতা, এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সুনির্দিষ্টভাবে যাচাই করতে পারবেন।

সফলভাবে একটি গাড়ি কেনার জন্য সচেতনতা এবং পূর্ব প্রস্তুতির গুরুত্ব অপরিসীম। সঠিক তথ্য, গবেষণা এবং যাচাইয়ের মাধ্যমে আপনি প্রতারণার শিকার হওয়া থেকে রক্ষা পেতে পারেন। প্রতারণা সনাক্তকরণ ও প্রতিকার সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা গাড়ি কেনার প্রক্রিয়াকে নিরাপদ এবং সাফল্যমন্ডিত করে। সর্বদা মনে রাখুন, সঠিক গাড়ি নির্বাচন আপনার সময়, অর্থ, এবং মানসিক সন্তুষ্টির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

Media Contact:

Shahriar Hosen

+8801627342851

hello@shahriarseo.com

https://shahriarseo.com

https://www.linkedin.com/in/shahriar-hosen

উত্তরা ইউনিভার্সিটিতে ‘পাথওয়েস টু এ সাসটেইনেবল ফিউচার’ শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত

টেকসই উন্নয়নের প্রতি অঙ্গীকার ব্যক্ত করে উত্তরা ইউনিভার্সিটিতে ‘পাথওয়েস টু এ সাসটেইনেবল ফিউচার’ শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। বুধবার (১১ ডিসেম্বর) বিশ্ববিদ্যালয়ের হলরুমে অনুষ্ঠানটির আয়োজন করা হয়। সেমিনারে দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, গবেষক ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা অংশগ্রহণ করেন।  

সেমিনারে বক্তারা টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মাণে নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার, পরিবেশ সংরক্ষণ, এবং জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করেন। তারা শিক্ষার্থীদের পরিবেশ রক্ষায় সচেতন ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করার আহ্বান জানান।  

আলোচনায় অংশ নেন পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ (পিএলসি)-এর চেয়ারম্যান ও ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সাবেক উপাচার্য প্রফেসর ড. এম রেজওয়ান খান, ইউএসটিসির সাবেক উপ-উপাচার্য প্রফেসর ড. নওসাদ আমিন, সিটি ইউনিভার্সিটির সাবেক উপ-উপাচার্য প্রফেসর ড. কাজী শাহাদাত কবীর রিমন, এবং ক্লাইমেট চেঞ্জ পলিসি ম্যানেজার ও উপদেষ্টা এ এস এম মারজান নূর।  

বক্তারা বলেন, টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যাওয়াই আমাদের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উত্তরা ইউনিভার্সিটির মাননীয় উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইয়াসমীন আরা লেখা এবং বিশেষ অতিথি ছিলেন উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. গৌর গোবিন্দ গোস্বামী। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন ইইই বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. শাকাওয়াত জামান সরকার।  

অনুষ্ঠানে বিভিন্ন অনুষদের ডিন, বিভাগীয় চেয়ারম্যান, সম্মানিত শিক্ষকমণ্ডলী এবং শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করেন।

ব্যাটল অব লেইট গালফঃ মানব ইতিহাসে সবচেয়ে বড় নৌ যুদ্ধ

0

সময়ের পরিক্রমায় বদলে গেছে ভূরাজনীতি, পরিবর্তিত হয়েছে যুদ্ধের কৌশল। তবে ইতিহাসে কিছু যুদ্ধ এখনো মানুষের কৌতূহল ও বিস্ময়ের বিষয় হয়ে রয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের “লেইট উপসাগরের যুদ্ধ” বা “ব্যাটল অব লেইট গালফ” তেমনই এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা, যা মানব সভ্যতার বৃহত্তম নৌযুদ্ধ হিসেবে পরিচিত।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মিত্রশক্তি ও অক্ষশক্তির দ্বন্দ্বের মধ্যে এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মিত্রশক্তির সঙ্গে থাকলেও ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে জাপান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির নেতৃত্বাধীন অক্ষশক্তির সঙ্গে যুক্ত হয়। যুদ্ধের শুরুতে অক্ষশক্তি শক্তিশালী অবস্থানে থাকলেও মিত্রশক্তি দৃঢ় প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ইউরোপে “অপারেশন ওভারলর্ড” জার্মানিকে দুর্বল করে ফেললেও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে জাপান তখনও প্রতিরোধ গড়ে রেখেছিল।

জাপানকে পরাজিত করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র একটি বড় নৌযুদ্ধের পরিকল্পনা করে, যা যা ১৯৪৪ সালের ২৩ থেকে ২৬ অক্টোবর ফিলিপাইনের লেইট উপসাগরে সংঘটিত হয় এবং ইতিহাসে “ব্যাটল অব লেইট গালফ” নামে স্মরণীয় হয়ে আছে।

এই যুদ্ধে প্রায় দুই লাখ নৌসেনা অংশ নেয় এবং জাপান প্রথমবারের মতো তাদের ভয়ংকর “কামিকাজে” কৌশল প্রয়োগ করে। এই কৌশলে আত্মঘাতী পাইলটরা যুদ্ধবিমান নিয়ে শত্রুপক্ষের জাহাজে আঘাত হানত, যা যুদ্ধের একটি ভয়াবহ দিক হয়ে ওঠে।

এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমানবাহী জাহাজ ইউএসএস প্রিন্সটন জাপানি বিমানের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একটি বোমার আঘাতে জাহাজের ভেতরে থাকা টর্পেডোগুলো বিস্ফোরিত হয়, যা যুদ্ধের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত হিসেবে ইতিহাসে লিপিবদ্ধ রয়েছে। এই ঘটনার একটি বিখ্যাত ছবি নিউ অরলিন্সের “দ্য ন্যাশনাল ওয়ার্ল্ড ওয়ার মিউজিয়ামে” সংরক্ষিত রয়েছে। লেইট উপসাগরের যুদ্ধ জাপানের জন্য এক বিশাল পরাজয় ছিল, যা কার্যত অক্ষশক্তির পতনের সূচনা করে এবং মিত্রশক্তির বিজয় নিশ্চিত করে। পৃথিবীর ইতিহাসে এত বড় নৌযুদ্ধ এর আগে কখনো হয়নি। এটি শুধুমাত্র কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং যুদ্ধবিদ্যার এক স্থায়ী উদাহরণ হিসেবে রয়ে গেছে।

১৯৩৯ সালে জার্মানি যখন পোল্যান্ড আক্রমণ করে, তখন ফ্রান্স ও ব্রিটেন তীব্র বিরোধিতা করে। তবে যুক্তরাষ্ট্র তখনও নিরপেক্ষ অবস্থানে ছিল। কিন্তু ১৯৪১ সালে, যখন জাপান অক্ষশক্তির পক্ষে যোগ দিয়ে পার্ল হারবারে আকস্মিক আক্রমণ চালায়, তখন যুক্তরাষ্ট্র বাধ্য হয়ে মিত্রশক্তির সঙ্গে যুদ্ধে জড়ায়।

যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণের ফলে ইউরোপের সংঘর্ষ বৈশ্বিক পরিসরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের রূপ নেয়। যুদ্ধের শুরুতে নাৎসি জার্মানির আক্রমণের মুখে মিত্রশক্তি অসহায় হয়ে পড়ে, এমনকি ফ্রান্সও তাদের দখলে চলে যায়। একই সময়ে দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় জাপান তাদের আধিপত্য বিস্তার করছিল। পার্ল হারবারের হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী বড় ধরনের ধাক্কা খায়, এবং প্রশান্ত মহাসাগরে জাপান শক্তিশালী অবস্থানে চলে যায়। তবে মিত্রশক্তি দ্রুত নিজেদের সংগঠিত করে এবং প্রতিরোধ গড়ে তোলে।

যুদ্ধের প্রথমদিকে প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে থাকা মিত্রশক্তি ধীরে ধীরে আক্রমণাত্মক কৌশল গ্রহণ করে। বিশেষ করে ১৯৪৪ সালে ফ্রান্স মুক্ত হওয়ার পর, ইউরোপে নাৎসি বাহিনী দুর্বল হয়ে পড়ে এবং পশ্চিম ইউরোপে মিত্রশক্তির জয় প্রায় নিশ্চিত হয়ে যায়। একই সময়ে, জাপান তাদের আগ্রাসী নীতি থেকে সরে এসে প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে যেতে বাধ্য হয়।

এই পরিস্থিতিতে, ইউরোপে যুদ্ধ প্রায় নিষ্পত্তির পথে থাকায় মিত্রশক্তির দৃষ্টি দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দিকে ঘুরে যায়। এবার তারা জাপানের নিয়ন্ত্রণে থাকা অঞ্চল পুনরুদ্ধার এবং তাদের শক্ত ঘাঁটিগুলো ধ্বংস করার পরিকল্পনা করে। মূল লক্ষ্য ছিল এমন স্থান আক্রমণ করা, যা জাপানের সামরিক অবস্থান দুর্বল করবে। তবে এই কৌশল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক মহলে মতবিরোধ দেখা দেয়।১৯৪৪ সালের পর মিত্রশক্তি এতটাই শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছে যায় যে, জাপানের যেকোনো ঘাঁটিতে আক্রমণ করার যথেষ্ট সামর্থ্য তাদের ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের চিফ অফ নেভাল অপারেশন, অ্যাডমিরাল আর্নেস্ট জে. কিং ফরমোজা দ্বীপ (আজকের তাইওয়ান) আক্রমণের পক্ষে মত দেন, কারণ এতে জাপানের জ্বালানি সরবরাহের পথ ব্যাহত হতো। তবে মিত্রশক্তির অভ্যন্তরে এই কৌশল নিয়ে মতবিরোধ থাকায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে কিছুটা সময় লাগে।

যুদ্ধের মঞ্চে একের পর এক অগ্রসর হতে থাকা মিত্রশক্তি ধাপে ধাপে জাপানের প্রতিরক্ষা দুর্বল করে তোলে এবং শেষ পর্যন্ত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়।

জেনারেল ডগলাস ম্যাকআর্থার  ফিলিপাইন দ্বীপপুঞ্জের লেইতে প্রাথমিক অবতরণের সময় তীরে হেঁটে আসছেন। ২০ অক্টোবর, ১৯৪৪। মার্কিন সেনাবাহিনী সিগনাল কর্পসের কর্মকর্তা গেটানো ফাইয়েস দ্বারা ধারণকৃত।

১৯৪৪ সালে জাপানের বিরুদ্ধে হামলার পরিকল্পনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রশক্তির মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। অ্যাডমিরাল আর্নেস্ট জে. কিং ও অ্যাডমিরাল চেস্টার নিমিত্জ ফরমোজা দ্বীপে আক্রমণের পক্ষে ছিলেন, যদিও নিমিত্জ একই সঙ্গে ফিলিপাইনেও হামলার পরিকল্পনা করেন। অন্যদিকে, আর্মির চিফ অফ স্টাফ জর্জ কাটলেট মার্শাল সরাসরি জাপানের হোনশু দ্বীপে আক্রমণের প্রস্তাব দেন।তবে জেনারেল ডগলাস ম্যাকআর্থার দৃঢ়ভাবে ফিলিপাইন আক্রমণের পক্ষে ছিলেন। তার এই সিদ্ধান্ত শুধু কৌশলগতভাবে নয়, ব্যক্তিগতভাবেও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ১৯৪২ সালে ফিলিপাইনে জাপানের কাছে পরাজিত হয়ে পিছু হটার সময় তিনি বলেছিলেন, “আমি আবারও ফিরে আসবো।” সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা এবং পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে তিনি অটল ছিলেন।

কৌশলগতভাবেও ম্যাকআর্থারের পরিকল্পনা ছিল বাস্তবসম্মত। যদি সরাসরি ফরমোজা আক্রমণ করা হতো, তাহলে জাপান সহজেই ফিলিপাইন থেকে সেনা ও রসদ পাঠিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারত। কিন্তু ফিলিপাইন দখল করলে জাপানের সবচেয়ে শক্তিশালী নৌঘাঁটি ধ্বংস করা সম্ভব হতো, যা পরবর্তীতে ফরমোজায় আক্রমণকে সহজ করে দিত। দীর্ঘ বিতর্কের পর, অবশেষে ম্যাকআর্থারের পরিকল্পনাই গৃহীত হয়, যদিও এটি চূড়ান্ত হতে দুই মাসেরও বেশি সময় লেগেছিল।

এদিকে, জাপান নিশ্চিত ছিল যে যুক্তরাষ্ট্র শিগগিরই আক্রমণ করবে, কিন্তু ঠিক কোথায় তা অনুমান করতে পারছিল না। তাই তারা সম্ভাব্য প্রতিরক্ষার জন্য চারটি পৃথক পরিকল্পনা তৈরি করে, যা সাংকেতিক নামে পরিচিত ছিল শোগো ১, ২, ৩, এবং ৪।

  • শোগো ১: ফিলিপাইনে আক্রমণ হলে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
  • শোগো ২: ফরমোজার জন্য প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা।
  • শোগো ৩ ও ৪: অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটির জন্য সংরক্ষিত প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা।

১২ অক্টোবর ১৯৪৪ সালে, অ্যাডমিরাল চেস্টার নিমিত্জ ফরমোজা দ্বীপের দিকে অভিযান পরিচালনার প্রস্তুতি নেন। জাপান মনে করেছিল, যুক্তরাষ্ট্র ফরমোজায় হামলা চালাবে এবং তারা শোগো ২ পরিকল্পনা কার্যকর করে। জাপান তাদের নৌবাহিনীর সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে নিমিত্জের বহর প্রতিহত করার প্রস্তুতি নেয়। এটি ছিল তাদের পুরনো যুদ্ধকৌশলের পুনরাবৃত্তি, যেখানে তারা একত্রিত আক্রমণের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করত। তবে এই কৌশলের দুর্বলতা ছিল—একবার পরাজিত হলে তা পুনরুদ্ধারের আর কোনো সুযোগ থাকত না।

যুক্তরাষ্ট্র এই পরিস্থিতিকে কৌশলগতভাবে কাজে লাগায়। নিমিত্জের অভিযান ছিল মূলত একটি বিভ্রান্তিমূলক আক্রমণ। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র জাপানকে ফরমোজায় প্রতিরক্ষা শক্তি কেন্দ্রীভূত করতে বাধ্য করে, যার ফলে ফিলিপাইনের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে। পরিকল্পনা সফল হয়, এবং মিত্রপক্ষ ফিলিপাইনে সহজেই আক্রমণ চালিয়ে বিজয় অর্জন করে।

এই সাজানো অভিযানের ফলে জাপান ভয়াবহ ক্ষতির সম্মুখীন হয়। যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় প্রায় ৬০০ জাপানি যুদ্ধবিমান ধ্বংস হয়ে যায়। এর ফলে ফিলিপাইনে জাপান ইম্পেরিয়াল নেভির আকাশ থেকে সুরক্ষা দেওয়ার মতো যথেষ্ট বিমান আর অবশিষ্ট থাকেনি।

জাপানি রণতরী ইয়ামাতো।

অবশেষে, ১৯৪৪ সালের ২০ অক্টোবর, যুক্তরাষ্ট্র ফিলিপাইনের লেইট উপসাগরীয় অঞ্চলে নোঙর করার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে জাপান তখনও পরাজয় মেনে নেয়নি এবং তাদের শোগো ১ পরিকল্পনা কার্যকর করে চূড়ান্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলে।জাপানের নৌবাহিনী একটি কৌশলগত পরিকল্পনা গ্রহণ করে, যার লক্ষ্য ছিল প্রথমে আমেরিকানদের লেইট উপসাগরে নোঙর করতে দেওয়া। এই সময় আমেরিকান অ্যাডমিরাল উইলিয়াম হ্যালসি পিছন থেকে প্রতিরক্ষার দায়িত্বে থাকবেন। জাপানের ভাইস অ্যাডমিরাল ওজাওয়া হ্যালসির বাহিনীর দিকে অগ্রসর হবেন, এবং যখন হ্যালসি তার মোকাবেলায় এগিয়ে আসবেন, তখন ওজাওয়া পিছু হটবেন। এতে হ্যালসির বহর ওজাওয়ার পিছু নেওয়ার জন্য বাধ্য হবে, আর এই ফাঁকে লেইট উপসাগরে অবস্থানরত আমেরিকান সৈন্যদের উপর চূড়ান্ত আক্রমণ চালানো হবে।

জাপানের এই কৌশল প্রায় সফল হতে যাচ্ছিল। তবে লেইট উপসাগরে পৌঁছানোর আগেই আমেরিকান বাহিনী বিমান থেকে জাপানিদের উপর প্রবল বোমা হামলা চালায়। এতে জাপানি বাহিনী উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং আমেরিকান সেনারা তীরে নামতে খুব বেশি প্রতিরোধের মুখোমুখি হয়নি।

২৩ অক্টোবরের প্রথম প্রহরে লেইট উপসাগরে মূল যুদ্ধ শুরু হয়। আমেরিকার নৌবাহিনীর সঙ্গে সরাসরি সম্মুখ লড়াইয়ে নেতৃত্ব দেন জাপানের ভাইস অ্যাডমিরাল তাকেও কুরিতা। তার বহরে ছিল ইয়ামাতো, যা শুধু জাপানের নয়, বরং বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী যুদ্ধজাহাজ হিসেবে পরিচিত। তবুও, এই শক্তিশালী বাহিনী নিয়েও শেষ পর্যন্ত জাপান পরাজিত হয়।

যদি জাপান এই যুদ্ধে জয়লাভ করত, তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আরও দীর্ঘায়িত হতে পারত। কিন্তু লেইট উপসাগরের যুদ্ধে পরাজয়ের ফলে জাপানের সামরিক শক্তি চূড়ান্তভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং এটি মিত্রশক্তির বিজয়কে আরও দ্রুত নিশ্চিত করে। লেইট উপসাগরের যুদ্ধ ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সবচেয়ে বড় নৌযুদ্ধ, এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন মিত্রশক্তি এবং জাপানের ইম্পেরিয়াল নৌবাহিনীর মধ্যে সংঘটিত হয়, যেখানে উভয় পক্ষের শতাধিক জাহাজ ও হাজারেরও বেশি বিমান অংশ নেয়। এটি ছিল জাপানের জন্য একটি চূড়ান্ত প্রান্তিক লড়াই, যেখানে তারা আত্মঘাতী “কামিকাজে” কৌশল প্রথমবারের মতো ব্যবহার করে। জাপান মূলত কৌশলগত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে চেয়েছিল, কিন্তু আমেরিকান নৌবাহিনীর শক্তিশালী আক্রমণের সামনে তারা টিকে থাকতে পারেনি। এই যুদ্ধ জাপানের পতনের পথ সুগম করে এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মিত্রশক্তির বিজয়কে প্রায় নিশ্চিত করে দেয়।

BRAC University Celebrates World Children’s Day with Creativity and Joy

Publish Date: 

December 1st, 2024

BRAC University hosted a vibrant celebration of World Children’s Day at its Merul Badda campus, embracing the global theme of the year, “Listen to the Future.” The event, held in collaboration with the Human Resources Department, BRAC Institute of Educational Development (BIED), and the Mental Health and Psychosocial Support (MHPSS) team, provided a platform for children and parents to engage in a day filled with creativity, learning, and family bonding.

The program featured interactive activities designed to inspire young minds while fostering connections between families. Through this initiative, BRAC University underscored its commitment to nurturing future generations and promoting mental well-being and education in alignment with the theme’s vision.

The celebration highlighted BRAC University’s dedication to nurturing young minds and reinforcing family bonds. The day commenced with children receiving handmade play materials crafted by BIED, designed to ignite their curiosity and creativity. Simultaneously, parents engaged in an interactive session led by MHPSS experts, gaining valuable guidance on supporting their children’s emotional and cognitive growth. This thoughtful approach reflected the university’s holistic commitment to the well-being and development of future generations.



Parents and children enthusiastically participated in hands-on activities such as toy-making and drawing, creating shared experiences that strengthened family bonds. A mesmerizing puppet-based storytelling session whisked the children into a magical world of imagination, followed by lively singing and dancing that filled the venue with laughter and joy. The celebrations reached a delightful peak as Professor Mohammad Mahboob Rahman, Treasurer of BRAC University and the Chief Guest, joined children and parents in cutting a cake to commemorate the joyous occasion of World Children’s Day.

Professor Mohammad Mahboob Rahman expressed his heartfelt appreciation, stating, “This event showcases BRAC University’s commitment to creating meaningful opportunities for children and their families to grow and thrive together. We are overjoyed to witness the happiness and learning this celebration has inspired.”

The program was also graced by the presence of Dr. David Dowland, Registrar, and Dr. Rubana Ahmed, Proctor, alongside Tahsina Rahman, Joint Director of Student Life. Dr. Dowland and Professor Rahman actively participated in the activities, engaging with children and parents to further strengthen the day’s spirit of connection, creativity, and joy.

Through initiatives like these, BRAC University reaffirms its unwavering commitment to shaping future leaders by fostering the holistic development of children and reinforcing the pillars of family and community care. Since its inception, the university has stood as a beacon of educational excellence, innovative research, and meaningful social engagement, continually striving to create a brighter and more inclusive future for everyone.

বর্জ্য ব্যবস্থাপনাঃ স্থপতির দৃষ্টিকোণ 

0

মশিউর রহমান মাহিন।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জরুরি বিষয়, বিশেষত ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোর জন্য। আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় প্রতিনিয়ত ব্যবহৃত প্রতিটি বস্তু থেকেই কিছু অপ্রয়োজনীয় উচ্ছিষ্ট অংশের উদ্ভব হয় যা ব্যবহারের অনুপযোগী, মূল্যহীন ও ত্রুটিপূর্ণ। এগুলোকে আমরা বর্জ্য পদার্থ বা ময়লা বলেই আখ্যায়িত করে থাকি। বর্জ্যের ধরন বিভিন্ন রকম হতে পারে, যেমন গৃহস্থালি বর্জ্য, বাণিজ্যিক বর্জ্য এবং শিল্প বর্জ্য।

স্থপতি হিসেবে বলব, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা শহরের নান্দনিকতা, জনস্বাস্থ্য এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সহায়ক একটি মৌলিক কাঠামোগত উপাদান। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নকশা প্রণয়নের সময় প্রথমেই বিবেচনায় আসে শহরের পরিবেশ এবং নগরবাসীর স্বাস্থ্য সুরক্ষা। ঢাকার মতো শহরগুলোর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কাঠামো পুনঃনির্মাণ করার সময় স্থপতি, প্রকৌশলী এবং নগর পরিকল্পনাকারীদের যৌথভাবে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা প্রয়োজন।

বর্জ্যের শ্রেণিবিন্যাস এবং তাদের প্রভাব:

বর্জ্য সাধারণত দুই ভাগে বিভক্ত—মিউনিসিপ্যাল কঠিন বর্জ্য এবং শিল্প বর্জ্য। মিউনিসিপ্যাল কঠিন বর্জ্য মানে হলো শহর বা পৌর এলাকায় উৎপন্ন গৃহস্থালি, বাণিজ্যিক ও কিছু প্রাতিষ্ঠানিক বর্জ্য, যা সিটি কর্পোরেশন দ্বারা সংগৃহীত হয়। অন্যদিকে শিল্প বর্জ্য প্রধানত কারখানা ও উৎপাদনশীল কার্যক্রম থেকে আসে যা রাসায়নিক এবং ভারী ধাতু দ্বারা দূষিত। একজন স্থপতি হিসেবে এ ধরনের শিল্প বর্জ্য সংরক্ষণের সময় বিশেষ ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করি, যাতে বর্জ্যের রাসায়নিক উপাদানগুলো নগরবাসীর বাসস্থানের কাছাকাছি পৌঁছাতে না পারে।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়ার প্রধান স্তরসমূহ:

বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রক্রিয়া মূলত পাঁচটি ধাপে বিভক্ত: বর্জ্য সংগ্রহ, পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পুনর্ব্যবহার ও চূড়ান্ত নিষ্পত্তি। ঢাকার মতো শহরে প্রতিটি স্তরে সচেতন এবং কাঠামোগত পদ্ধতির প্রয়োগ প্রয়োজন। সঠিক নকশা অনুসারে পরিকল্পিত সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশনগুলো বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ধারাবাহিকতার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

ল্যান্ডফিল ও পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে পরিবেশ সুরক্ষা:

বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চূড়ান্ত ধাপ হলো ল্যান্ডফিল বা ময়লার ভাগাড়, যেখানে বর্জ্য নিরাপদে নিষ্পত্তি করা হয়। একজন স্থপতি হিসেবে বলব, স্যানিটারি ল্যান্ডফিলের নকশা ও অবকাঠামো যদি সঠিকভাবে তৈরি করা হয়, তবে বর্জ্যের ক্ষতিকর প্রভাব পরিবেশে ছড়াতে বাধা দেয়া সম্ভব। লিচেট ও গ্যাস কালেক্টর ব্যবহারের মাধ্যমে দূষণ নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে, যা পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি শক্তি উৎপাদনেও সহায়ক হতে পারে।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বর্তমান অবস্থা এবং চ্যালেঞ্জসমূহ:

বাংলাদেশে অর্থনৈতিক উন্নতির সঙ্গে বর্জ্য উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে, কিন্তু এই খাতে অবকাঠামোগত উন্নতি তেমনভাবে দেখা যায় না। ঢাকায় প্রতিদিন যে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য উৎপন্ন হয়, সেগুলো যথাযথভাবে সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে না। এর ফলে যত্রতত্র উন্মুক্তভাবে বর্জ্য পড়ে থাকে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে। স্থপতি হিসেবে এ সমস্যার একটি কাঠামোগত সমাধান প্রয়োজন।

সিটি করপোরেশনের অধীনস্থ ল্যান্ডফিলের সমস্যা ও সমাধান:

ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অধীনে আমিনবাজার এবং মাতুয়াইল ল্যান্ডফিল রয়েছে। যদিও এ ল্যান্ডফিলগুলো স্যানিটারি ল্যান্ডফিল হওয়ার কথা, বাস্তবে এগুলো উন্নত উন্মুক্ত ল্যান্ডফিল হিসেবে কাজ করছে। এগুলোতে গ্যাস ও লিচেট সংগ্রহের সঠিক ব্যবস্থার অভাব রয়েছে, যা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। ভবিষ্যতে পরিকল্পিত নতুন ল্যান্ডফিলের নকশায় অত্যাধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ করা হলে এ সমস্যা নিরসন সম্ভব।

বর্জ্য সংগ্রহ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের প্রয়োজনীয়তা:

বাংলাদেশে সব ধরনের বর্জ্য একত্রে সংগ্রহ করা হয়, যা আলাদাভাবে সংগ্রহ করা উচিত। এলাকাভিত্তিক ভ্যানগুলো মাসিক অর্থের বিনিময়ে ময়লা সংগ্রহ করলেও অনেক নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার এ সুবিধা নিতে পারে না। সিটি করপোরেশন কর্তৃক সরকারি উদ্যোগে এ ভ্যান ব্যবস্থা পরিচালিত হলে নিম্নআয়ের পরিবারের জন্য এটি সহায়ক হবে।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সঠিক পরিকল্পনা ও প্রযুক্তিগত সহায়তার প্রয়োজন:

অবশেষে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগে পরিবেশ বিজ্ঞান এবং স্থপতিদের নিয়োগ দেয়া উচিত, যাতে আধুনিক এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে এ খাত পরিচালনা করা যায়। ঢাকায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য আধুনিক প্রযুক্তি এবং পরিকল্পনার মাধ্যমে টেকসই উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা শুধু পরিবেশ রক্ষার জন্য নয়, বরং জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই সরকারের পাশাপাশি জনগণের সচেতনতা এবং সক্রিয় অংশগ্রহণ জরুরি।

ইমাম আবূ হানীফার বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রেক্ষাপট।

0

বইঃ ইমাম আবূ হানীফা ও আল-ফিকহুল আকবার  

লেখকঃ ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর (রহ.)

আমরা আগেই উল্লেখ করেছি যে, তৃতীয় শতকে ইমাম আবূ হানীফার বিরুদ্ধে প্রচারণা ব্যাপকতা লাভ করে। বিশেষত মুতাযিলী শাসনের অবসানের পরে পরিস্থিতি আরো ঘোলাটে হয়। বাহ্যত এর কারণগুলি নিম্নরূপ:


৭. ১. প্রসারতা ও ক্ষমতার ঈর্ষা

আমরা আগেই বলেছি যে, তাবিয়ী যুগের অন্য কোনো ফকীহ ইমাম আবূ হানীফার মত প্রসিদ্ধি ও মর্যাদা লাভ করেন নি। তাঁর জীবদ্দশাতেই তাঁর মত প্রসিদ্ধি লাভ করে। আববাসী খলীফা মাহদীর যুগ (১৫৮-১৬৯হি) থেকে হানাফী ফিকহ রাষ্ট্রীয় ফিকহে পরিণত হয়। এ ফিকহে পারদর্শীগণই বিভিন্ন বিচারিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। পরবর্তী শতাব্দীর পর শতাব্দী এ নেতৃত্বের ও কর্তৃত্বের ধারা অব্যাহত থাকে। হানাফী বিরোধীদের ক্ষোভ এতে বাড়তে থাকে এবং তাঁদের বৈরী প্রচারণাও ব্যাপক হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এ প্রচারণা হানাফী ফিকহের বিরুদ্ধে না হয়ে ব্যক্তি আবূ হানীফার চরিত্র হননের দিকে ধাবিত হয়।


৭. ২. মুতাযিলী ফিতনা ও সম্পৃক্তি

২০০ হিজরীর দিকে আববাসী খলীফা মামুন (রাজত্ব ১৯৮-২১৮ হি) মুতাযিলী ধর্মবিশ্বাস গ্রহণ করেন এবং একে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ঘোষণা করেন। পরবর্তী খলীফা মু’তাসিম বিল্লাহ (২১৮-২২৭ হি) ও ওয়াসিক বিল্লাহ (২২৮-২৩২ হি) এ মতবাদ অনুসরণ করেন। গ্রীক দর্শন নির্ভর এ মতবাদে কুরআনের বিভিন্ন আয়াতের সাথে সুস্পষ্টভাবে সাংঘর্ষিক বিভিন্ন বিশ্বাস বিদ্যমান। এ সকল বিশ্বাসের মধ্যে রয়েছে ‘‘কুরআন সৃষ্ট বা মাখলূক’’। এ ছাড়া মুতাযিলীগণ আল্লাহর ‘‘বিশেষণগুলো’’ ব্যাখ্যা করে অস্বীকার করেন। এ মত প্রতিষ্ঠায় এ তিন খলীফা ছিলেন অনমনীয়। এ মত গ্রহণে অস্বীকৃতি জ্ঞাপনকারী আলিমদেরকে গ্রেফতার করে তাঁরা অবর্ণনীয় অত্যাচার করতে থাকেন। পরবর্তী শাসক মুতাওয়াক্কিল (২৩২-২৪৭ হি) এ অত্যাচারের অবসান ঘটান। সকলেই স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ ও পালনের সুযোগ পান।

প্রায় ত্রিশ বৎসরের মুতাযিলী শাসনের সময়ে স্বভাবতই প্রশাসন ও বিচার ব্যবস্থায় হানাফী ফকীহগণ ছিলেন। তাঁদের অনেকেই ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় মুতাযিলীদের সাথে সহযোগিতা করেছেন বা তাদের মত গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছেন। বিশেষত খলীফা মামুনের মুতাযিলী ফিতনার মূল স্থম্ভ বিশর আল-মারীসী: বিশর ইবন গিয়াস ইবন আবী কারীমা আব্দুর রাহমান (২১৮ হি) এবং বিচারপতি আহমদ ইবন আবী দুওয়াদ (আবী দাউদ) ইবন জারীর (১৬০-২৪০ হি) উভয়েই ফিকহী মতে ইমাম আবূ হানীফার অনুসারী হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিলেন। মুতাযিলী মতের প্রচার-প্রসার, দেশের সকল আলিমকে খলীফার দরবারে ডেকে মুতাযিলী মত গ্রহণে বাধ্য করা এবং ইমাম আহমদ ও মুতাযিলা মতবিরোধী অন্যান্য প্রসিদ্ধ ইমামগণের উপর নির্মম নির্যাতন ও হত্যাকান্ডের মূল হোতা ছিলেন তাঁরা।[1]

মুতাযিলী অত্যাচারের অবসানের পরেও হানাফী ফকীহগণ বিচারিক ও প্রশাসনিক দায়িত্বে নিয়োজিত থাকেন। এছাড়া মুতাযিলীগণ ‘হানাফী’ নামের ছত্রছায়ায় তাদের মত প্রচার করতে থাকেন। অপরদিকে হানাফী বিরোধীগণ আহলুস সুন্নাতের নামে, বিদআত বিরোধিতা বা মুতাযিলী বিরোধিতার নামে ইমাম আবূ হানীফা ও তাঁর অনুসারীদের বিরুদ্ধে কথা বলতে থাকেন। অনেকে এ বিষয়ে জালিয়াতির আশ্রয় নিতে থাকেন। অনেক সরলপ্রাণ প্রাজ্ঞ আলিমও এরূপ অপপ্রচারে প্রভাবিত হন।


৭. ৩. বিচার ও শাসন বনাম ইলম ও কলম

আমরা দেখেছি যে, দ্বিতীয় হিজরী শতকের শেষ দিক থেকেই হানাফী ফিকহ রাষ্ট্রীয় ফিকহে পরিণত হয়। হানাফী ফকীহগণ ফিকহ ও বিচারিক দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। তৃতীয় হিজরী শতক থেকে হাদীস চর্চায় হানাফী ফকীহগণের সম্পৃক্তি কমতে থাকে। এছাড়া ফিকহী বিষয়ে অতিরিক্ত মনোসংযোগের কারণে হাদীস বিষয়ে তাদের দুর্বলতা বাড়তে থাকে। এভাবে তাদের সাথে মুহাদ্দিসগণের দূরত্ব ও বিচ্ছিন্নতা বাড়তে থাকে।


৭. ৪. মাযহাবী গোঁড়ামি ও বিদ্বেষ

চতুর্থ হিজরী শতক থেকে মাযহাবী গোঁড়ামি ও বিদ্বেষ ব্যাপকতা লাভ করতে থাকে। এ সময়ে তিনটি মাযহাব প্রসিদ্ধ ছিল: হানাফী, মালিকী ও শাফিয়ী। মালিকী মাযহাব উত্তর আফ্রিকা ও স্পেনে বিস্তার লাভ করে। মুসলিম বিশ্বের প্রাণকেন্দ্র মিসর, ইরাক ও পারস্যে হানাফী-শাফিয়ী দ্বন্ধ ব্যাপক রূপ গ্রহণ করে। ক্ষমতা, প্রতিপত্তি ও প্রসারতা ছিল হানাফীদের বেশি। কিন্তু হাদীস চর্চা ও লিখনীতে শাফিয়ীগণ অগ্রগামী ছিলেন। মুহাদ্দিসগণের মধ্যে শাফিয়ী মাযহাব প্রসার লাভ করে। কোনো কোনো মুহাদ্দিস হানাফীদের ‘ঘায়েল’ করার জন্য তাদের ইমামকে ছোট করতে চেষ্টা করেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে সত্য, মিথ্যা, জাল-বানোয়াট সবকিছু সংকলন করেন।

এ প্রচারণার কারণে তৃতীয় শতকের মাঝামাঝি থেকে মুহাদ্দিসগণের মধ্যে তাঁর প্রতি কঠোর আপত্তি ও বিদ্বেষের ভাব জন্ম নিতে থাকে। এ সময়ে ‘‘আহলুস সুন্নাহ’’ ও মুহাদ্দিসদের মধ্যে বিদ্যমান অনুভূতি অনেকটা নিম্নরূপ: যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর হাদীস অস্বীকার করত!! হাদীসের বিপরীতে নিজের মত দিয়ে দীন তৈরি করত!!! সকল বিদআতী আকীদার প্রচারক ছিল!! সে কিভাবে এত প্রসিদ্ধি লাভ করল? তার মত কেন এত প্রসার লাভ করল? কোনো অজুহাতেই তাকে সহ্য করা যায় না!!!!

হানাফীগণ এ সকল অভিযোগ খন্ডন করেছেন। তবে মুহাদ্দিসগণের সাথে দূরত্বের কারণে তাঁদের মধ্যে তা তেমন প্রভাব বিস্তার করে নি। এছাড়া হানাফীগণ সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ার কারণে অনেক সময় ইলমী প্রতিবাদের চেয়ে শক্তির প্রতিবাদ বেশি জোরদার হয়েছে। কখনো বা ইমামের বিরুদ্ধে অভিযোগ খন্ডন করতে যেয়ে প্রতিপক্ষকে ছোট করার প্রবণতা দেখা দিয়েছে। কখনো তাঁর মর্যাদা প্রমাণ করার নামে তাঁর নামে প্রচলিত সবকিছু নির্ভুল ও নির্বিচারে গ্রহণযোগ্য বলে দাবি করা হয়েছে। পক্ষের-বিপক্ষের সকলেই আবেগ ও বাড়াবাড়িতে আক্রান্ত হয়েছেন।

আমরা জানি, ইমাম আবূ হানীফাকে হক্ক বলা আর তাঁর অন্ধ অনুসরণকে হক্ক বলা এক নয়। ইমাম আবূ হানীফাকে হক্ক বলার অর্থ তাঁকে নিষ্পাপ বা নির্ভুল বলা নয়। ইমাম আবূ হানীফাকে ভাল বলতে যেয়ে তাঁর বিরুদ্ধে যারা আপত্তিকর কথা বলেছেন তাদেরকে মন্দ বলাও ঠিক নয়। ইমাম আবূ হানীফাকে হক্ক বাতিলের মাপকাঠি বানিয়ে দেওয়াও ঠিক নয়।

এভাবে অভিযোগ ও প্রতিবাদ প্রক্রিয়া মাযহাবী আক্রোশের গন্ডি থেকে বের হতে পারে নি। হিজরী ৫ম শতক থেকে অন্য মাযহাবের কতিপয় আলিম এ সব অপপ্রচারের বিরুদ্ধে কলম ধরেন। এদের অন্যতম প্রসিদ্ধ মালিকী ফকীহ ও মুহাদ্দিস ইউসূফ ইবন আব্দুল্লাহ ইবন আব্দুল বার্র (৩৬৮-৪৬৩ হি)। তিনি ‘‘আল-ইন্তিকা ফী ফাদায়িলিল আয়িম্মাতিস সালাসাহ’’ নামক গ্রন্থে তিন ইমাম: আবূ হানীফা, মালিক ও শাফিয়ীর মর্যাদা ব্যাখ্যা করেন এবং তাঁদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার জ্ঞানবৃত্তিকভাবে খন্ডন করেন।

পরবর্তীকালে অন্যান্য মাযহাবের কতিপয় ফকীহ, মুহাদ্দিস, ঐতিহাসিক ও জারহ-তাদীল বিশেষজ্ঞ নিরপেক্ষ বিচার ও পর্যালোচনার চেষ্টা করেন। এদের মধ্যে রয়েছেন প্রসিদ্ধ হাম্বালী ফকীহ ও মুজতাহিদ শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়া আহমদ ইবন আব্দুল হালীম (৬৬১-৭২৮ হি), তাঁর তিন ছাত্র: প্রসিদ্ধ শাফিয়ী ফকীহ ও মুহাদ্দিস ইউসূফ ইবন আব্দুর রাহমান, আবুল হাজ্জাজ আল-মিয্যী (৬৫৪-৭৪২ হি), প্রসিদ্ধ শাফিয়ী-হাম্বালী ফকীহ ও মুহাদ্দিস ইমাম যাহাবী: মুহাম্মাদ ইবন আহমদ (৬৭৩-৭৪৮ হি), প্রসিদ্ধ শাফিয়ী ফকহী ও মুহাদ্দিস আবুল ফিদা ইসমাঈল ইবন উমার ইবন কাসীর (৭০১-৭৭৪ হি) এবং অষ্টম হিজরী শতকের প্রসিদ্ধ শাফিয়ী ফকীহ ও মুহাদ্দিস ইবন হাজার আসকালানী: আহমদ ইবন আলী (৭৭৩-৮৫২ হি)।

নীরব মহামারী সিফিলিস !

সিফিলিস হল এক প্রকার যৌনবাহিত সংক্রমণ (STD), যা Treponema pallidum নামে একটি ব্যাকটেরিয়ার কারণে হয়ে থাকে। এটি এক প্রকার বহুমাত্রিক রোগ, যা সাধারণত চারটি পর্যায়ে বিভক্ত। সিফিলিস রোগের সংক্রমণ দ্রুত ছড়ায় এবং এর প্রাথমিক পর্যায়ে সঠিক চিকিৎসা না করলে রোগটি দীর্ঘমেয়াদে বিপজ্জনক পরিণতির দিকে ধাবিত হতে পারে। বাংলাদেশে এই রোগের প্রাদুর্ভাব শতকরা ৫.৭ ভাগ। যৌনকর্মী, প্রবাসী ও বস্তিবাসী মধ্যে এই রোগ বেশি দেখা দেয়। 

সিফিলিসের কারণ ও সংক্রমণ

সিফিলিসের প্রধান কারণ হল যৌন সংস্পর্শ। Treponema pallidum ব্যাকটেরিয়া প্রধানত যৌনমিলনের সময় সংক্রামিত ব্যক্তির থেকে অন্য ব্যক্তির শরীরে প্রবেশ করে। এটি গর্ভবতী মায়ের শরীর থেকে নবজাতক শিশুর শরীরেও স্থানান্তরিত হতে পারে, যা জন্মগত সিফিলিস হিসেবে পরিচিত। অরক্ষিত যৌনমিলন, একাধিক যৌন সঙ্গীর সাথে সম্পর্ক এবং সঠিক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ার ফলে সিফিলিস সংক্রমণের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।

সিফিলিসের বিভিন্ন স্টেজ ও লক্ষণ: 

সিফিলিস প্রধানত চারটি পর্যায়ে বিকশিত হয়: প্রাইমারী, সেকেন্ডারি, লেটেন্ড, এবং টারশিয়ারি স্টেজ।

১) প্রাইমারী স্টেজ: প্রাইমারী স্টেজে সিফিলিসে আক্রান্ত হলে সংক্রমণের দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে সংক্রমণের স্থানে ছোট ক্ষত (চ্যানক্র) তৈরি হয়। এই ক্ষত সাধারণত ব্যথাহীন হয় এবং এটি কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সেরে যায়, যদিও সংক্রমণ শরীরে থেকে যায়।

২) সেকেন্ডারি স্টেজ: প্রাইমারী স্টেজের পর সিফিলিস সেকেন্ডারি স্টেজ প্রবেশ করে, যেখানে সারা শরীরে লালচে দানা বা ফুসকুড়ি দেখা দিতে পারে। এ সময় সর্দি-কাশি, গলাব্যথা, জ্বর, মাথাব্যথা, এবং অস্থিরতা অনুভূত হতে পারে। এই লক্ষণগুলো কয়েক সপ্তাহের জন্য বিদ্যমান থাকতে পারে এবং তারপর সেরে যায়।

৩) লেটেন্ড স্টেজ: সেকেন্ডারি স্টেজের পর সিফিলিস লেটেন্ড স্টেজে প্রবেশ করে, যেখানে সংক্রমণ সক্রিয় না থেকে গোপনে অবস্থান করে। এই পর্যায় কয়েক বছর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে এবং সঠিক চিকিৎসা না পেলে পরবর্তীতে তৃতীয় পর্যায়ে চলে যেতে পারে।

৪) টারশিয়ারি স্টেজ: সিফিলিসের সবচেয়ে বিপজ্জনক পর্যায় হলো টারশিয়ারি স্টেজ। এটি ত্বক, হৃদযন্ত্র, মস্তিষ্ক, স্নায়ুতন্ত্র এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এটি কখনো কখনো মৃত্যু ঘটাতে পারে।

সিফিলিস নির্ণয়

সিফিলিস রোগ নির্ণয় জন্য চিকিৎসক সাধারণত রক্ত এবং যেখান থেকে ঘা হয়েছে ঐ জায়গা থেকে তরল পদার্থ নিয়ে রোগ নির্ণয় করা হয়: 

১) মাইক্রোবায়োলজি টেস্ট: সাধারণ মাইক্রোস্কোপ থেকে সহজে সিফিলিস অণুজীব পাওয়া যায় না। এটা দেখার জন্য ডার্ক ফিল্ড মাইক্রোস্কোপ অথবা সিলভার স্টেনিং মাধ্যমে সিফিলিস অণুজীব দেখতে পারি। 

২) ভিডিআরএল (ভেনেরিয়াল ডিজিজ রিসার্চ ল্যাবরেটরি) টেস্ট: এই টেস্ট সাধারণত স্কিনিং এর কাজে ব্যবহার করা হয়। তবে এটি অনেক সময় অন্য রোগ থাকলে সেটি পজিটিভ হিসেবে গণ্য হবে। যেমন: যক্ষ্মা, সারকোইডোসিস ইত্যাদি অন্যান্য জীবাণুযুক্ত রোগ দেখা দেয়। 

৩) টিপিএইচএ (ট্রেপোনেমা প্যালিডাম পার্টিকেল অ্যাগ্লুটিনেশন অ্যাস) টেস্ট: এই টেস্ট মাধ্যমে নিশ্চিত জানা যায় যে, রোগী সিফিলিস রোগে আক্রান্ত। তবে যার একবার সিফিলিস হয়েছে, তারা যদি আরেকবার টেস্ট করাতে আসে তাহলে আজীবন পজিটিভ থাকবে। 

চিকিৎসা

সিফিলিসের চিকিৎসার জন্য মূলত পেনিসিলিন ব্যবহার করা হয়, যা সংক্রমণ দূরীকরণে অত্যন্ত কার্যকর। প্রাইমারী স্টেজে সঠিক চিকিৎসা গ্রহণ করলে সিফিলিস সম্পূর্ণভাবে নিরাময় করা সম্ভব। তবে সেকেন্ডারি বা টারশিয়ারি স্টেজে রোগটি নিরাময়যোগ্য হলেও কিছু ক্ষেত্রে স্থায়ী ক্ষতি থেকে যায়। চিকিৎসার সময় যৌন কার্যক্রম এড়িয়ে চলা উচিত এবং যৌন সঙ্গীদের সঠিকভাবে পরীক্ষা ও চিকিৎসা করার পরামর্শ দেওয়া হয়।

প্রতিরোধ

সিফিলিস প্রতিরোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সঠিক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ। অরক্ষিত যৌনমিলন এড়ানো, সঠিক যৌন শিক্ষার প্রসার, এবং নিয়মিত STD পরীক্ষা করানো অত্যন্ত জরুরি। এছাড়াও একাধিক যৌন সঙ্গীর সাথে সম্পর্ক স্থাপনে সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।

সিফিলিস একটি গুরুতর যৌনবাহিত রোগ, যা নির্দিষ্ট পর্যায়ে জীবনের জন্য হুমকিস্বরূপ হতে পারে। এ রোগের দ্রুত শনাক্তকরণ এবং প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। যৌন সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সামাজিক শিক্ষার মাধ্যমে সিফিলিসসহ অন্যান্য যৌনবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব কমানো সম্ভব।

নাম: এস. এম. এম. মুসাব্বির উদ্দিন

সেশন: ২০২০-২১

ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ

মার্কিন মুলুকের বৃষ্টিতে ‘আপা’র ছাতা ধরা ও কিছু কথা 

জোবায়ের সিদ্দিকী 

সম্পাদক, দ্যা ক্যাম্পাস মিরর। 

২০১৬ সালে প্রথমবার আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প গোটা বিশ্বকে চমকে দিয়েছিলেন। তখন অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেছিলেন যে, মার্কিন ভোটাররা হয়তো ভুল করে ফেলেছে। এবার, ২০২৪ সালে সেই ভুলের অজুহাতের সুযোগ নেই। মার্কিন জনগণ জানত যে ট্রাম্প একজন দোষী সাব্যস্ত অপরাধী, যিনি কথায় কথায় মিথ্যা বলেন, এবং যার বিরুদ্ধে বর্ণবিদ্বেষের অভিযোগ রয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, চার বছর আগে, তিনি ক্ষমতায় থাকা একটি গণতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাতের চেষ্টা করেছিলেন, যা ক্যাপিটলে হামলার মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল। সেই পরাজয় এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে মনে হয়েছিল তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শেষ হয়ে গেছে।

অন্যদিকে, কমলা হ্যারিসের মধ্যে আমেরিকা প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট হওয়ার সম্ভাবনা দেখেছিল। তবে তারপরও ভোটের ফলাফল বিস্ময়করভাবে ট্রাম্পের পক্ষে এসেছে। চার বছরের মধ্যে কীভাবে তিনি হোয়াইট হাউসে ফিরলেন, তা নিয়ে অনেকের মনেই প্রশ্ন। ভোটারদের মনস্তত্ত্ব, তার কৌশলী প্রচারণা, এবং বিরোধী শিবিরের দুর্বলতা হয়তো এই “ম্যাজিক” ফলাফলের পেছনে ভূমিকা রেখেছে। তবে এটুকু নিশ্চিত যে, ট্রাম্পের প্রত্যাবর্তন বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন প্রভাব ফেলতে চলেছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প, আর এর প্রভাব যেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলেও পড়েছে। নির্বাচনে ট্রাম্পের জয়লাভকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা চলছে। সদ্য ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ ইতোমধ্যেই ট্রাম্পের জয়কে স্বাগত জানিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছে, কারণ এটি তাদের মতে দলটির বাংলাদেশের ক্ষমতায় ফিরে আসার ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, বিশেষ করে ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকে আওয়ামী লীগের শাসনামল, একটি জটিল আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক পটভূমির সঙ্গে জড়িত ছিল। উইকিলিকসে ফাঁস হওয়া তথ্য এবং হিলারি ক্লিনটনের বক্তব্যের মাধ্যমে, বেশ কিছু রাজনৈতিক বিশ্লেষক ধারণা করেছিলেন যে, ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি সমন্বিত কৌশল ছিল, যার মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় বসানোর পেছনে এক ধরনের ইন্দো-মার্কিন ব্লুপ্রিন্ট কাজ করছিল।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রত্যাশা, মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার চেয়ে, তাদের জন্য ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ঠেকানো ছিল বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই কারণেই, পশ্চিমা দেশগুলো একাধিক নির্বাচন বা রাজনৈতিক সংকটের পরেও বাংলাদেশে স্বৈরশাসক শাসনকে সমর্থন দিতে ছিল প্রস্তুত। তারা বারবার নির্বাচনী পুনর্নির্বাচন এবং গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের দাবি জানালেও, মূলত ভারতকে নিজেদের অবস্থান সমর্থক রাখতে, কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

২০১৪ সালে, ক্ষমতায় আসার পর, আওয়ামী লীগ তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কঠোর দমনপীড়ন শুরু করে, বিশেষ করে ছাত্র আন্দোলন, গণতান্ত্রিক প্রতিবাদ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে। পুলিশের, র‌্যাব এবং বিজিবির মতো বাহিনীগুলোকে দলীয় বাহিনীতে পরিণত করা হয়, যা রাজনৈতিক সহিংসতা এবং গুম-খুনের ঘটনায় অবলম্বন হয়ে ওঠে। তবে, অবশেষে ছাত্র সমাজের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন, বিশেষত “বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন”, এক নতুন দিগন্ত সৃষ্টি করে, যা দেশের জনগণের মধ্যে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য এক অভূতপূর্ব বিপ্লবের সূচনা করে।

এ ধরণের পরিস্থিতিতে, ছাত্র-জনতা একসঙ্গে বিপ্লবী অভ্যুত্থানের পথে অগ্রসর হয়ে অবশেষে দেশের স্বৈরাচারের পতন ঘটাতে সক্ষম হয়। তারা এক ঐতিহাসিক সংগ্রামের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের নক্সাসকে ভেঙে দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যত গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি করেছিল।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশাল জয় নিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনার ঝড় বইছে। মার্কিন বিদেশনীতি কীভাবে গড়ে উঠবে, বিশেষ করে নতুন প্রশাসনের বিশ্বমঞ্চে কেমন অবস্থান হবে—এ নিয়েই আগ্রহ সর্বাধিক। ২০২৪ সালের এই নির্বাচনে ট্রাম্পের বিজয় বাংলাদেশে বিশেষভাবে আলোচিত, কারণ মাত্র তিন মাস আগেই, ৫ আগস্ট, শেখ হাসিনার দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে এবং ড. ইউনুসের নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠিত হয়।

ড. ইউনুসের সরকারের প্রতি নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কৌশল কী হবে, তা নিয়ে এখন রাজনৈতিক মহলে বিশ্লেষণ চলছে। নির্বাচনী প্রচারণার সময় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী এবং সমর্থকরা প্রকাশ্যেই ট্রাম্পের জয় কামনা করেছিলেন, কারণ তাদের মতে, তার বিজয় আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনে সহায়ক হতে পারে। ট্রাম্পের বিজয়ে আওয়ামী লীগ আশার সঞ্চার পেলেও, নতুন সরকারের প্রতি তার প্রশাসনের অবস্থান কী হবে তা সময়ই বলে দেবে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখা যাচ্ছে, দলের নেতাকর্মী ও সমর্থকরা ট্রাম্পের এই জয়ের জন্য অভিনন্দন জানাচ্ছেন এবং দোয়া করছেন। এমনকি শোনা যাচ্ছে যে, প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে সরে গিয়ে ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা নাকি তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ে ট্রাম্পের জন্য দোয়া করেছেন। ফেসবুকে এই বিষয়টি ঘিরে পোস্টার ও নানা মন্তব্য ঘুরে বেড়াচ্ছে। 

মার্কিন নির্বাচনের পর বাংলাদেশের সামাজিক মাধ্যমে যে আলোচনা চলছে, তা মূলত অপ্রাসঙ্গিক। মার্কিন রাজনীতিতে পরিবর্তন আসলেও, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও পরিস্থিতিতে তার তেমন প্রভাব পড়ে না; দেশের শাসনব্যবস্থা ও অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো অপরিবর্তিতই থেকে যায়। পরিবর্তনের যে আকাঙ্ক্ষা আমাদের ছিল, তা জুলাইয়ের আন্দোলনে তীব্রভাবে প্রতিফলিত হয়েছিল। সবস্তরের মানুষ উন্নয়ন ও সুশাসনের প্রত্যাশায় ছিল। তবে সাম্প্রতিক কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা সেই আশাকে ম্লান করে দিয়েছে। সুতরাং, মার্কিন প্রেক্ষাপটে কোনো পরিবর্তন এলেও দেশের ভেতরে নতুন কোনো আন্দোলন গড়ে উঠলে হয়তো আগের মতো সমর্থন পাওয়া সম্ভব হবে না।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প বিজয়ী হওয়ায় তার সমর্থকরা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছে, যদিও নির্বাচনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ডেমোক্র্যাট প্রার্থী কমলা হ্যারিসের সঙ্গে কড়া প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছিল। নির্বাচনে আগাম ভোটের পরিসংখ্যানে ডেমোক্র্যাটরা কিছুটা এগিয়ে থাকলেও ট্রাম্পের শেষ মুহূর্তের জয়ের মাধ্যমে ভোটারদের সমর্থন তিনি নিজের পক্ষে টানতে সক্ষম হয়েছেন।

এদিকে, গণআন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হওয়া বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে ট্রাইবুনাল। দেশে ফিরলে তাকে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। গণহত্যার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে কয়েকশত মামলা ইতোমধ্যেই দায়ের হয়েছে। ট্রাম্পের জয়কে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের কিছু সমর্থক আশাবাদী হলেও দেশের পরিস্থিতি শেখ হাসিনার জন্য চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠেছে।

বাস্তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের পুনঃনির্বাচন আওয়ামী লীগের জন্য কাঙ্ক্ষিত ফল বয়ে আনবে না। কারণ, বাংলাদেশ বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগের প্রতি সহানুভূতিশীল হবে না। যুক্তরাষ্ট্র আর আগের মতো বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ভারতের অবস্থানকে অন্ধভাবে সমর্থন করবে না। ২০০১ সালে প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দিয়ে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র ঘনিষ্ঠতা বাড়ালেও ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদের শেষ দিকে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের পথ তৈরি করেন। পরে, ২০২১ সালের আগস্টে জো বাইডেনের সময়কালে এই অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে। এর ফলে দক্ষিণ এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ভারতের গুরুত্ব আগের তুলনায় কমে আসে।

ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের আরেকটি প্রধান স্তম্ভ ছিল চীনবিরোধী অবস্থান, কিন্তু সাম্প্রতিক ব্রিকস সম্মেলনে (২২-২৪ অক্টোবর, ২০২৪) ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং নিজেদের পুরোনো বিরোধ ভুলে ব্যবসায়িক সম্পর্কের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সহজলভ্য চীনা ঋণ ভারতকে উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় আকৃষ্ট করছে, এবং এর ফলে ভারত এখন চীনের সাথে আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। ভারতের দৃষ্টিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনবিরোধী অবস্থান ধরে রাখার চেয়ে চীনের ঘনিষ্ঠতা লাভজনক হবে।

এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে মিলে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রভাব বিস্তারের পুরোনো কৌশল ভারতের জন্য ততটা কার্যকর বা প্রয়োজনীয় নয়। ফলে, বাংলাদেশ ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত আগের মতো ঐক্যবদ্ধ থাকবে না, এবং ট্রাম্প প্রশাসন বাংলাদেশের ওপর প্রভাব বিস্তারে ভারতীয় সহায়তার উপর নির্ভর করবে না। এ অবস্থায় আওয়ামী লীগের আশা পূরণ হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ।ভারত বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তার সম্পর্ককে নতুনভাবে মূল্যায়ন করছে, এবং এই দৃষ্টিভঙ্গি পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্করের সাম্প্রতিক বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন জয়লাভের দ্বারপ্রান্তে, জয়শঙ্কর তখন ক্যানবেরায় ভারত-অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড ত্রিদেশীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্মেলনে বলেন, “যিনিই প্রেসিডেন্ট হন না কেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন একক পথে চলার চেষ্টা করছে, যা তাকে বিশ্ব থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। অতীতে যে মার্কিন প্রাধান্য ছিল, তা আর আগের মতো চলবে না।” জয়শঙ্করের এই মন্তব্যে প্রতিফলিত হয় যে ভারত একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থায় নিজেদের জন্য প্রস্তুত করছে, যেখানে মার্কিন প্রভাব পূর্বের তুলনায় কমে আসতে পারে।

ভারত বর্তমানে চীন ও রাশিয়ার নেতৃত্বাধীন ব্রিকস জোটের মাধ্যমে এই নয়া বিশ্বব্যবস্থায় প্রবেশ করতে চাইছে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর ভারত রাশিয়ার কাছ থেকে শক্তি ও বাণিজ্যে সুবিধা নিচ্ছে, আর একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখছে। তবে ট্রাম্প পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর ভারতকে তার এই দ্বিমুখী কৌশল পরিত্যাগের চাপ দিতে পারেন, বিশেষ করে যদি তিনি চীন ও রাশিয়া-বিরোধী অবস্থানকে আরও কঠোর করেন। এটি ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন করে মনোমালিন্যের জন্ম দিতে পারে, কারণ ভারত তার স্বার্থ রক্ষায় স্বাধীন ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অবলম্বনে অগ্রসর হচ্ছে।

এমন পরিস্থিতিতে ভারতের সামনে চ্যালেঞ্জ হবে যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মধ্যে থেকেও চীন ও রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক ধরে রাখা। ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক নতুন ধরনের পরীক্ষার মুখোমুখি হতে পারে, যেখানে ভারত হয়তো তার স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের পুনর্মূল্যায়ন করতে বাধ্য হবে।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের পুনঃনির্বাচনের পর তার সম্ভাব্য পররাষ্ট্রনীতি বুঝতে হলে প্রথমে তার আগের মেয়াদের (২০১৬-২০২০) পদক্ষেপগুলোর দিকে ফিরে তাকানো জরুরি। ট্রাম্পের নীতির মূল লক্ষ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক সংঘাত থেকে দূরে রাখা এবং সামরিক উপস্থিতি কমিয়ে এনে দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা। আব্রাহাম অ্যাকোর্ডের মাধ্যমে তিনি মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত হ্রাস করতে উদ্যোগ নেন এবং আফগানিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহারের পরিকল্পনাও তিনিই চূড়ান্ত করেন। তিনি রাশিয়ার সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটো সম্পর্কে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করতেন। তার কৌশল ছিল দ্বিরাষ্ট্রিক সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং যেকোনো ধরনের জোটবদ্ধ সামরিক উদ্যোগ এড়িয়ে চলা।

ট্রাম্প তার জাতীয়তাবাদী ধারণা থেকে “মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন” নীতি অনুসরণ করেন, যা মূলত যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার দিকে মনোযোগী। তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে অর্থনৈতিকভাবে মজবুত করতে চান, চীনের বাণিজ্যিক উত্থানকে প্রতিহত করতে চান, এবং অন্য দেশের জন্য যুদ্ধের বোঝা নিতে নারাজ। চীনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা মোকাবিলা করার বিষয়টি ট্রাম্পের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

মধ্যপ্রাচ্যে ট্রাম্পের নীতি ইসরাইলের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও ইরানের প্রতি কঠোরতা বজায় রাখা, তবে অন্য মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের প্রতি মনোযোগ দেওয়া। সম্ভবত এবারও, তিনি মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখবেন, তবে অন্যান্য মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও জোরদার করবেন। এ প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশও ট্রাম্প প্রশাসনের অগ্রাধিকার তালিকায় থাকবে, এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়া ও এরশাদের আমলের মতো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সুসম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে।

ড. ইউনূসের মতো একজন ব্যক্তিত্ব সরকার পরিচালনায় আসুক—এমন আকাঙ্ক্ষা আমার মতো অনেকেরই ছিল। তবে বাস্তবতা বলছে, এমন একটি সরকার গঠিত হলেও তার স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা সহজ হবে না। অতীতের সরকারগুলো লাগামহীন ক্ষমতার অপব্যবহার, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, এবং জনগণের অধিকার দমনের মাধ্যমে শাসনব্যবস্থাকে যে স্থানে নিয়ে গেছে, তারই প্রতিফলন আমরা ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে দেখেছি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে এখনো একই ধরনের প্রতিহিংসার রাজনীতি চলছে। স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী দল হিসেবে আওয়ামী লীগের আজকের এই পরিস্থিতি দুঃখজনক। অন্তর্বর্তী সরকার সর্বদলীয় অংশগ্রহণে গঠিত হওয়া উচিত ছিল, কিন্তু এখানে বিদ্বেষের পথই বেছে নেওয়া হয়েছে।

আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ধারণা ছিল যে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে নরেন্দ্র মোদির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে, যা জো বাইডেন বা কমলা হ্যারিসের সাথে এতটা দৃঢ় নয়। তাদের বিশ্বাস, মোদির অনুরোধে ট্রাম্প বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে আগ্রহী হতে পারেন, যা শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। এমন এক অদ্ভুত সমীকরণের ভিত্তিতেই আওয়ামী লীগের অনেক নেতা-কর্মী ট্রাম্পের জয় কামনা করছিলেন।

অবশেষে, ট্রাম্প বিজয়ী হওয়ার পর আওয়ামী শিবিরে উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়ে। তড়িঘড়ি করে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অভিনন্দন জানানো হয়, এবং তার বিজয়কে রাজনৈতিকভাবে নিজেদের জন্য ইতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি আদৌ তাদের প্রত্যাশার সাথে কতটা সঙ্গতিপূর্ণ হয়।

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, বিশেষ করে নতুন সরকারের অধীনে দেশের পুলিশ বাহিনীকে জনবান্ধব হিসেবে গড়ে তোলার প্রক্রিয়া এবং সেনাবাহিনীর সঙ্গে সমন্বিত কাজের উদ্যোগ, দেশের মানুষের জন্য একটি নতুন দিগন্তের সূচনা করছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার, দেশের ৯৫% মানুষের সমর্থনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, এবং এটি একটি বিপ্লবী পরিবর্তনের মাধ্যমে গঠিত হয়েছে। এই সরকারের একান্ত লক্ষ্য হল দেশের জনগণের স্বার্থে কাজ করা এবং স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন ঘটেছে, তার অব্যাহত প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা।

তবে, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ক্ষমতার জন্য প্রতিযোগিতা এবং বিভক্তির বিষয়টি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে ষড়যন্ত্রকারীরা সুবিধা নিতে পারে এবং দেশকে পুনরায় অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিতে পারে। মৌলিক জাতীয় প্রশ্নে রাজনৈতিক বিভাজন দেশকে বিপথগামী করতে পারে, বিশেষ করে ঐতিহাসিক দৃষ্টিতে ভারত বা বিদেশি শক্তির হাতে দেশের ভাগ্য ছেড়ে দেওয়া হলে তা জাতির স্বাধীনতাকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে।

তবে, দেশের মুক্তিকামী জনগণ একত্রিত থাকলে, তারা যেকোনো ষড়যন্ত্র ও বিভেদকে পরাস্ত করতে সক্ষম হবে। তারা স্বাধীনতার জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছে এবং তারা জানে, বিভাজন সৃষ্টিকারী রাজনৈতিক শক্তির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই করলে অন্য কোনো শক্তি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব এবং স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। বাংলাদেশের জনগণ, বিশেষ করে বিপ্লবী ছাত্র-জনতা, এই সময়ে ঐক্য ও সংহতির মাধ্যমে দেশের ভবিষ্যত নিশ্চিত করার প্রতিজ্ঞা করেছে।

সম্পাদকীয়- নভেম্বর ২০২৪

প্রিয় পাঠক, আশা করি সুস্থ আছেন। উত্তাল চব্বিশের শেষ দিকে উপস্থিত হয়ে আমরা নভেম্বর মাসের এই সময়ে, জুলাই পটপরিবর্তনের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে নানা বড় পরিবর্তন এবং চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি আমাদের দেশের জনগণ। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন, দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা, গার্মেন্টস শিল্পে অশান্তি এবং খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি এ সব কিছুই আমাদের ভাবনায় প্রভাব ফেলছে।

পতিত স্বৈরাচারের কুশীলবদের দিক মাথায় রেখে ও দেশের আভ্যন্তরীণ নীতি এবং জনগণের স্বার্থের কথা মাথায় রেখে, এই পরিবর্তনগুলিকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করা প্রয়োজন। আর সেই সাথে আমাদের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলার বিষয়ে গভীর মনোযোগ দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। গত কয়েক বছরে দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি যেমন অস্থিতিশীল হয়েছে, তেমনি পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর আস্থা কমেছে। জনগণের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কার্যকর ও উন্নত ব্যবস্থা গ্রহণে সরকারের দ্রুত পদক্ষেপ প্রয়োজন।

এর পাশাপাশি, দেশের অন্যতম বড় শিল্প খাত গার্মেন্টস সেক্টরে অশান্তি চলতে থাকা একটি বড় সংকট হিসেবে দাঁড়িয়ে রয়েছে। শ্রমিকদের চলমান আন্দোলন এবং অস্থিরতার কারণে এই সেক্টরের ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মুখে পড়েছে। দেশের অর্থনীতির বৃহত্তর স্বার্থে, এটি জরুরি যে সরকারের পাশাপাশি গার্মেন্টস মালিকরা শ্রমিকদের অধিকার ও শর্তগুলো পুনঃমূল্যায়ন করে, যাতে উৎপাদনশীলতা এবং শৃঙ্খলা বজায় থাকে। এর সঙ্গে যদি মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব যুক্ত হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের জীবনে চাপ বাড়বে, যা জাতীয় অস্থিরতার কারণ হতে পারে। তাই খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রীয় নীতির পরিবর্তন অত্যন্ত জরুরি।

এছাড়া, চব্বিশের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। তাদের আত্মত্যাগের কারণে আজ আমরা স্বাধীন রাষ্ট্রে বাস করছি। স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের জন্য তাদের সংগ্রামের সত্যিকার মূল্যায়ন করতে হবে, যাতে আমরা তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নে একটি সুশাসিত সমাজ গড়তে পারি।

প্রিয় শিক্ষার্থীরা, আপনারাই জাতির ভবিষ্যৎ, জুলাই বিপ্লবের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে আপনাদের দায়িত্বপূর্ণ ভূমিকায় এগিয়ে আসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক স্থিতিশীলতা, ন্যায়বিচার, এবং জাতীয় ঐক্য রক্ষা করতে হলে, আমাদের সবার একযোগ প্রচেষ্টা প্রয়োজন। যদি আমরা সঠিক পথে এগিয়ে যেতে পারি, তবে তা আমাদের দেশকে আরও উন্নত ও সমৃদ্ধ করবে।

মুসমেসি সেতু

পতেঞ্জা নদীর ওপর দাঁড়িয়ে থাকা মুসমেসি সেতু যেন প্রকৃতি, নান্দনিকতা এবং ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের এক অসাধারণ সম্মিলন। এটি কেবল একটি সেতুই নয়, বরং এমন একটি শিল্পকর্ম যা স্থাপত্য ও প্রকৌশলের সীমাকে ছাড়িয়ে প্রকৃতির সঙ্গে গভীর সংযোগ তৈরি করেছে। ‘ভায়াডোত্তো ডেল’ইন্ডাস্ট্রিয়া’ (ইন্ডাস্ট্রি ভায়াডাক্ট) যা ‘বাসেন্টো নদীর উপর সেতু’ বা মুসমেসি ব্রিজ নামেও পরিচিত, এটি পতেঞ্জা , ব্যাসিলিকাটা এবং ইতালিকে সংযুক্ত করেছে।

এই সেতুর মাধ্যমে মুসমেসি স্থাপত্যের এক নতুন ধারার সূচনা করেন, যা পরিচিত হয় ‘প্যারামেট্রিজম’ নামে। প্রকৃতি থেকে অনুপ্রাণিত হলেও এই ধারার ডিজাইন সম্পূর্ণ মানুষের ব্যবহারের জন্য নির্মিত।  যদিও এতে খরচ কিছুটা বেশি হয়, তবে যা তৈরি হয়, তা একদমই অন্যরকম। মুসমেসি সেতু তাই কেবল একটি স্থাপনা নয়, বরং প্রকৃতি ও মানুষের সৃজনশীলতার এক অনন্য মেলবন্ধন।  

মুসমেসি সেতু পৃথিবীর অন্যতম সুন্দর সেতুগুলোর একটি। ১৯৬৭ সালে এটি ডিজাইন করেছিলেন প্রতিভাবান ইঞ্জিনিয়ার সার্জিও মুসমেসি, এবং নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয় ১৯৭১ থেকে ১৯৭৬ সালের মধ্যে। চমৎকার এই সেতুটি দাঁড়িয়ে আছে দুইবার ভাঁজ হওয়া একটি প্যাঁচানো কংক্রিট কলামের ওপর, যার গভীরতা মাত্র ৩০ সেন্টিমিটার বা ১ ফুট। ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে লোড ডিস্ট্রিবিউশন ও স্ট্রেস ডাইনামিকস শব্দ দুটি প্রায়ই ব্যবহৃত হয়। এই সেতুতে সেই লোড ডিস্ট্রিবিউশন দক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন হয়েছে কলামের অনন্য আকৃতির মাধ্যমে। 

মুসমেসি সেতুটি ডিজাইন করেছেন একটি ব্যতিক্রমী ভি-আকৃতির কলামের মাধ্যমে। এই ডিজাইনের পেছনে তিনি নদীর স্রোতের ধারণা কাজে লাগিয়েছিলেন এবং ভেবেছিলেন সেতুটি যেন পানির গতিপথের প্রতিফলন হয়। তার লক্ষ্য ছিল নদী ও রেলপথ উভয়কেই সমান গুরুত্ব দেওয়া, যা সেতুটিকে প্রকৃতির সঙ্গে মিশে যেতে সাহায্য করেছে। এর ফলে, স্ট্রাকচারটি এমন এক স্বাভাবিক রূপ পেয়েছে যেন এটি সেই স্থানেই হাজার বছর ধরে দাঁড়িয়ে আছে।