রোজা থাকতে হবে না;চাঁদ দেখা গেছে, নতুন চাঁদ!

  দ্যা ক্যাম্পাস মিরর কথা বলেছে দৈনিক যুগান্তর সম্পাদক বিশিষ্ট নজরুল গবেষক কবি আবদুল হাই শিকদার স্যারের সাথে। তার কথায় উঠে এসেছে শৈশবের ঈদ স্মৃতি, সেসময়কার ঈদ সংস্কৃতি এবং বর্তমান সময়ের ঈদ সংস্কৃতির তফাৎ। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছে দ্যা ক্যাম্পাস মিররের সহকারী সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল মারুফ।   মিররঃ আসালামু আলাইকুম স্যার। কেমন আছেন? আবদুল হাই শিকদারঃ ওয়ালাইকুম আসসালাম।আমি আছি বাংলাদেশের মতো। মিররঃ বাংলাদেশের মতো! দেশের গতিপথ মুহূর্তে মুহূর্তে চেঞ্জ হচ্ছে। আবদুল হাই শিকদারঃ আমারও চেঞ্জ হয়। দেশ যেভাবে চলে, আমরা তো সেভাবেই চলি। মিররঃ শুরুতেই আমরা ক্যাম্পাস মিরর থেকে আপনাকে অগ্রিম ঈদের শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। আবদুল হাই শিকদারঃআপনাদেরকেও ঈদ মোবারক। মিররঃ শৈশবের কোন বিশেষ ঈদ স্মৃতি মনে পড়ে? আবদুল হাই শিকদারঃ অনেক স্মৃতি আছে ঈদের। যেমন;আমাদের আব্বা যখন নতুন জামা-কাপড় কিনে দিতেন, আমরা ওই জামা-কাপড় আর জুতা কাউকে দেখতে দিতাম না;ভাবতাম ঈদের দিন দেখাবো। কিন্তু মাঝে মাঝে জুতা-জামা পরে বিছানার ওপর হাঁটাহাঁটি করতাম। জুতা নিয়ে নিচে নামলে তো  জুতায় ময়লা লাগবে;এটা একটা খুব আনন্দের ব্যাপার ছিল। নতুন কাপড় পেয়ে আমরা খুব উদ্বেলিত হতাম, আনন্দিত হতাম। আর কাউকে না দেখিয়ে বিছানার ওপর জুতা পরে হাঁটা;এই মজাটাও ছিল। মিররঃ বিছানার উপর হাটঁলে কেউ দেখলে? আবদুল হাই শিকদারঃ  মা দেখতেন, আব্বা দেখতেন;কিছু মনে করতেন না; উৎসাহ দিতেন। নতুন জুতা তো, ময়লা লাগেনি। মিররঃ ঈদে সালামি দেওয়ার সংস্কৃতি কি আপনাদের শৈশবে ছিল কিনা? আবদুল হাই শিকদারঃ এগুলো একটু নাগরিক কালচার ছিল। গ্রামবাংলার সাথে এইভাবে সম্পর্কটা নাই। আমরা এমনিতেই সালাম দিতাম। অনেক সময় মুরুব্বিরা সালামি দিলে সেটা দিয়ে বিকালবেলা কটকটি,মজা কিনে খেতাম। মিররঃ চাঁদ রাতের উত্তেজনা তখন কেমন ছিল? আবদুল হাই শিকদারঃ ওরে বাপরে বাপ! আমরা তো গ্রামের বাইরে চলে যেতাম;মাঠের মাঝখানে, বিলের মাঝখানে। শুকনা বিল তো বেশিরভাগ সময় থাকতো। গ্রামের যত ছেলেপেলে আছে সবাই বসে বসে চাঁদ দেখতাম;চাঁদ কোথায়? এইটা চাঁদের মতো লাগতেছে না? এটা চাঁদ না, ওইটা চাঁদ;এই করে মাগরিব পর্যন্ত চলতো চাঁদ খোঁজা। তারপর বাসায় গিয়ে ইফতার করে আবার মাঠে চলে আসতাম;এখন দেখা যায় কিনা। অন্ধকার হয়ে গেলে আবার খুঁজতাম। এই চাঁদ দেখার আনন্দটা ছিল অসাধারণ;মানে আর রোজা থাকতে হবে না, চাঁদ দেখা গেছে, নতুন চাঁদ! মিররঃ  ঈদের দিনের কোনো বিশেষ খাবার ছিল কিনা আপনাদের? আবদুল হাই শিকদারঃ প্রচুর। আমাদের মা ছিলেন খুব অভিজাত পরিবারের মানুষ। মা নানান ধরনের ভ্যারাইটিজ রান্না করতেন; গুড়ের ক্ষীর, তারপর চিনি দিয়ে দুধ দিয়ে পায়েশ। আর আমাদের একটা প্রিয় খাবার ছিল গরুর ভুনা দিয়ে মুড়ি খাওয়া। মিরর: গরুর ভুনা দিয়ে মুড়ি খাওয়া? আবদুল হাই শিকদার: আমরা তো খুব শখ করে খেতাম। গরুর ভুনার মধ্যে একটু ঝোলঝোল থাকতো, ওটার মধ্যে মুড়ি মাখা;মজা করে খেতাম। তারপর গ্রামবাংলায় সকালবেলা এ বাড়ি-ও বাড়ি লেনদেন হতো;ওরা পায়েশ রান্না করে আমাদের বাড়িতে পাঠাল, আমরা আবার নিয়ে আরেক বাসায় দিয়ে আসলাম। এভাবে খুব আন্তরিক আর প্রাণবন্ত ঈদ উদযাপন করতাম। মিররঃ বর্তমান সময়ের সংস্কৃতির মধ্যে বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করছেন কিনা? আবদুল হাই শিকদারঃ লক্ষ্য তো করছি। এখন তো নানা রাজনীতিকরণ হয়েছে। যেমন গত ১৫ বছর ফ্যাসিবাদী শাসনে বাংলাদেশ যেভাবে পর্যুদস্ত হয়েছে; রাষ্ট্র আর রাজনীতি যখন দূষিত হয়ে যায়, তখন তার ছাপ পড়ে জীবনের সর্বস্তরে, সংস্কৃতিতেও। আমরা বিজাতীয় বা অপসংস্কৃতিকে নিজের সংস্কৃতি মনে করে নিজেদের সংস্কৃতিকে দূরে ঠেলে দিয়েছিলাম; এরকম টানাপোড়েন চলছে। এখনো দেখবেন;এই যে মোদির জামা-কোট গায়ে দিয়ে ঘুরে বেড়ায় বাংলাদেশের ছেলেরা; দেখলে খারাপ লাগে। জানেও না যে কোটটা যেখানেই জন্ম হোক, এখন “মোদি কোট” নামে ওয়ার্ল্ডওয়াইড ব্র্যান্ডেড। সবাই জেনে গেছে মোদির কোট। সেই কোট পরে আমাদের ছেলেপেলেরা ঘুরে বেড়ায়; এগুলো আগ্রাসনের এক একটা চিত্র। জীবনে আমরা ভাবতেই পারতাম না যে ডিজে পার্টি হয়, ব্যান্ড হয়, ফুর্তির জন্য। আমাদের ঈদের আনন্দ ছিল সকালবেলা দল বেঁধে গোসল করে ফ্রেশ হয়ে নতুন জামাকাপড়-জুতা পরে ঈদগায় যেতাম। আমার আব্বা ছিলেন সরকারি কর্মকর্তা এবং এগ্রিকালচারিস্ট। অখণ্ড ভারতের ইতিহাসে আসাম থেকে যে দুই-তিনজন ছাত্র কৃষিতে গ্র্যাজুয়েশন করেছিল, তার একজন ছিলেন আমার বাবা। আব্বা হাই মাদ্রাসার ছাত্র ছিলেন। ফারসি, আরবি, উর্দু, ইংরেজি, বাংলা;অনর্গল বলতে পারতেন। আরবি স্পিকিং জানতেন। আব্বা ঈদগায় গেলে ঈদের মূল খুতবার আগে বাংলায় ভাষণ দিতেন। এইটা শোনার জন্য গ্রামের মানুষ মুখিয়ে থাকতো। আব্বা যদি কোনো ঈদে বাড়ি আসতে না পারতেন, গ্রামজুড়ে হাহাকার পড়ে যেত;“উনি কোথায়?” এইসব বলতো। আমরা ঈদের নামাজ পড়তাম, আব্বা বক্তৃতা করতেন;আমরা খুব প্রাউড ফিল করতাম। আব্বা ফারসি-আরবি-উর্দু ও বাংলায় নানা কবিতার উদ্ধৃতি দিতেন;হাফিজের, শেখ সাদির; এগুলো দিয়ে বক্তৃতা করতেন। ঈদগাহ থেকে বাড়ি ফিরে আসার পর দল বেঁধে বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেড়ানো, দৌড়াদৌড়ি, খেলা;নানান ঝামেলায় জড়িয়ে পড়তাম। অনেক সময় দুপুরের খাবারের কথাও ভুলে যেতাম। মাঠে ছোটাছুটি করতাম। ঈদের সময় গ্রামগুলোতে মেলার মতো বসতো;দুই-তিন গ্রামের মাঝখানে। আমরা দল বেঁধে যেতাম। খুব ব্যস্ত সময় কাটতো। মিররঃ দুপুরে না খেয়ে বাসায় আসলে মা বকা দিত না? আবদুল হাই শিকদারঃ ঈদের দিন তো! কান ধরে টানতো;“খাওয়া বাদ দিয়ে বাইরে ঘুরছিস কেন? এত সুস্বাদু রান্না বান্না করেছি; খা!” আরেকটা জিনিস আমরা করতাম ছোটবেলায়। আমার আরেক বন্ধু ছিল;মাহমুদুল হাসান বুলবুল। আমরা দুই বন্ধুর নেতৃত্বে ভোরবেলা বেরিয়ে পড়তাম। আমাদের সাথে আরও ১০-১৫ জন ছেলে থাকতো। প্রত্যেক বাড়ি থেকে পায়েশ আর ক্ষীর জোগাড় করতাম। সবাই জানতো যে এই বাহিনী আসবে;ইয়াং বাহিনী। ক্ষীর-পায়েশ আমাদের হাঁড়ি ভরে যেত। মসজিদে রেখে আবার আরেক পাড়ায় যেতাম, সেখান থেকেও জোগাড় করে মসজিদে রাখতাম। ঈদের নামাজের পরে হুজুর সবার মধ্যে বিতরণ করে দিতেন। কলার পাতার মধ্যে বসে সবাই মজা করে খেত। এটা ছিল আমাদের তরুণদের একটা বড় কাজ;আমরা আনন্দ করে করতাম। আমার আব্বা খুব উৎসাহ দিতেন;ভালো কাজ তোমরা করতেছো। গরিব মানুষ অনেক সময় ঠিকমতো খেতে পারত না;দারিদ্র ছিল অসহনীয়। আব্বা দারুণভাবে সহযোগিতা করতেন। খাবার কম জুটলে আব্বা মাকে দিয়ে আলাদা রান্না করে মসজিদে পাঠাতেন। মিররঃ ইয়াং বাহিনীর কোনো বিশেষ নাম ছিল কিনা? আবদুল হাই শিকদারঃ আমরা কোনো নাম দিতাম না। সবাই বলতো; “বাচ্চু বাহিনী।” আমার ডাকনাম ছিল বাচ্চু;সবাই আদর করত বাচ্চু বাহিনীকে। মানুষ জানতো ছেলেগুলো ভালো;মানুষের খাওয়ার ব্যবস্থা করে। কোরবানির সময়ও এই কাজ করতাম;বাড়ি বাড়ি থেকে মাংস কালেকশন করে গরিবদের মধ্যে বিতরণ করতাম। মিররঃ বর্তমানে ঈদে সাংস্কৃতিক দিকটা সরকারি মহল থেকে যেভাবে উপেক্ষিত থাকে; এ বিষয়ে মন্তব্য? আবদুল হাই শিকদারঃ ঈদ তো ঈদই। কিন্তু গত ১৫ বছরের দুঃশাসনে ঈদকে করা হয়েছে রাজনীতিকরণ। ঈদের মাঠে খুতবার সময়ও দেখা যেত শেখ মুজিবের নাম চলে আসতো;ইসলাম প্রচারে শেখ মুজিবের অবদান; এমন অদ্ভুত কাণ্ডকারখানা হতো। লোক দেখানো হয়ে গেছে বেশি। তারপরেও আমি মনে করি ঈদ তার সত্ত্বা হারায় নাই। কোথাও জানি আমাদের নিজস্বতা টিকে আছে। এর জন্য সাধারণ মানুষের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। মিররঃ তরুণদের জন্য সুস্থ সংস্কৃতির মাধ্যমে ঈদ উদযাপন নিয়ে কোনো বিশেষ বার্তা আছে? আবদুল হাই শিকদারঃ বিশেষ বার্তা হলো;আমি মনে করি, আমাদের প্রফেট, আমাদের রসূলের জীবনকে অনুসরণ করা;তিনি ঈদের দিন সকালবেলা কী করতেন, সারাদিন কী করতেন;সেগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে সেই কাজগুলো করা খুব গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। ঈদ খালি ব্যক্তিগতভাবে খুশি হওয়া বা ফুর্তি করা না;সোসাইটির সবাইকে নিয়ে উদযাপনের আবহ তৈরি করতে হবে। মিররঃ যেমনটি বলছিলেন;প্রতিবেশীদের মধ্যে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতেন, এখন সে সংস্কৃতি অনেকটা বিলুপ্ত। সেটা আবার কীভাবে ফিরিয়ে আনা যায়? শহরের কালচার ভিন্ন;শহরে যারা ঈদ উদযাপন করে তারা পাড়া-প্রতিবেশীদের সাথে মিশে না। এটা কিভাবে ফেরানো যায়? আবদুল হাই শিকদারঃ এটা ফেরানোর প্রথম কথা হলো;আমার শৈশব কেটেছে ম্যাট্রিকুলেশন/এসএসসি পর্যন্ত পাকিস্তান আমলে। এইচএসসি পরীক্ষা দেওয়ার আগেই যুদ্ধ লেগে গেল। তারপর আমরা আসলাম বাংলাদেশে;ডিফারেন্ট হয়ে গেল জিনিসগুলো। পাকিস্তান আমলে গ্রামবাংলায় মানুষের আন্তরিকতা ছিল অঢেল। মানুষ মানুষকে সত্যি আন্তরিকভাবে ভালোবাসতো। মুক্তিযুদ্ধের পরে অতিমাত্রায় রাজনৈতিক ঝাঁজ ঢুকে গেল। অনেক গুরুত্বপূর্ণ হুজুর, যারা আগে ওয়াজ করতেন, ঈদের নামাজ পড়াতেন;তাদের অনুপস্থিতি ফিল করতাম। এখন বাস্তব কারণেই মানুষ অনেক বেশি আত্মকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। আত্মকেন্দ্রিকতার প্রধান কারণ হলো রাষ্ট্র তাদের পাশে দাঁড়ায় না। রাষ্ট্র মানুষের জীবনের নিরাপত্তা দিতে পারে না, আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটেছে। আর ঈদের সময় দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। পৃথিবীতে মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র দেশ বাংলাদেশ;যেখানে ঈদের সময়, রোজার সময় জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে দেয় অসাধু ব্যবসায়ীরা। এটা নিষ্ঠুর অমানবিক আচরণ। পাকিস্তান আমলে আমি এটা কখনো দেখিনি। তখন জিনিসপত্রের দাম সহনীয় থাকতো। অনেক দোকানদার সেল দিত;যেমন ১০ টাকার জিনিস ৮ বা ৭ টাকায় দিত। চাল-ডাল-নুন-চিনি ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণে থাকতো। বাংলাদেশ হওয়ার পরে অসাধু ব্যবসায়ীদের সাথে যুক্ত হলো রাজনীতিবিদরা, রাজনীতিবিদদের সাথে যুক্ত হলো সামাজিক দুর্বৃত্তরা। এই অসাধু চক্র মানুষের ধর্মকে কেন্দ্র করে ধর্ম পালনের জায়গাটাকে সংকুচিত করে এবং ধর্মকে সামনে রেখে লোভের লালসায় সমাজকে দূষিত করে। এই জায়গাগুলোকে এড্রেস করতে হবে। সুশৃঙ্খল গণতান্ত্রিক জীবন ফিরে আসলে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হলে, দ্রব্যমূল্য সহনীয় থাকলে;আস্তে আস্তে আমরা আবার আগের জায়গায় ফিরে যেতে পারব। মিররঃ বর্তমানে এই প্রজন্ম চাঁদ রাতে ককটেল, বাজি ইত্যাদি ফোঁটায়, আপনাদ সময় এগুলো ছিল না। এ নিয়ে ছোট্ট বার্তা? আবদুল হাই শিকদারঃ আমি ছোটখাটো বাজি ফোটানোকে অপরাধ হিসেবে দেখি না। ফেস্টিভালের একটা চেহারা দিতে হবে। এখন ধরেন বদরের যুদ্ধ হয়েছিল;সে যুদ্ধের অস্ত্র দিয়ে আজ আমেরিকার মোকাবেলা সম্ভব? না। তাহলে বদরের যুদ্ধ থেকে নিতে হবে শিক্ষা;স্পিরিট। সেই স্পিরিট নিয়ে এগোতে হবে। তারপর এটাকে মোকাবেলা করার মতো আধুনিকায়ন করা;বিজ্ঞানভিত্তিক জীবন, প্রযুক্তিকে সম্মান জানানো। তখন হয়তো আমরা স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরে যাব। আর বাজি ফোটানো বা আতশবাজি যদি পাবলিক নুইসেন্স ক্রিয়েট না করে, জনজীবন ব্যাহত না করে;ইয়াং ছেলেরা ফুর্তি করার জন্য করে;এটা বাধা দেওয়াটা খুব বেশি প্রাসঙ্গিক মনে করি না। ইয়াংরা যদি ফুর্তি করতে না পারে, যাবে কোথায়? আমরা শবে বরাতে আগে তারাবাতি জ্বালাতাম, মজা করতাম। শিশুদের এই মজা থেকে বঞ্চিত করছে সমাজ। এক শ্রেণির কুপমণ্ডক হুজুর;সবাই না;এক শ্রেণির অন্ধ মাওলানা এগুলোর বিরুদ্ধে আজেবাজে কথা বলে। আগে শবে বরাতে সারারাত রান্না করে বাড়ি বাড়ি রুটি বিতরণ হতো, হালুয়া বিতরণ;এগুলো সামাজিক আনন্দের অংশ ছিল। সারারাত মসজিদে নামাজ পড়তাম। এটাকে এখন নানা অজুহাতে ব্যাহত করা হয়েছে। ভারতে যখন ইসলাম ঢুকলো, সুফি সাধকরা এসে দেখল এখানে নানা উৎসব;১২ মাসে ১৩ উৎসব। লোকদেরকে ফিরাতে হলে ফেস্টিভাল দিতে হবে, উৎসব দিতে হবে। আমাদের ছিল দুই ঈদ;তাছাড়া সারা বছরে আর কিছু নাই। তখনকার বিচক্ষণ ইসলামী দার্শনিক/ধর্ম প্রচারকরা এর সাথে যুক্ত করলেন মহররম, শবে বরাত, শবে কদর;ফেস্টিভালের চেহারা দিলেন। ধর্ম থাকলোই। কিন্তু সমাজের সবাইকে নিয়ে ইনজয় করার আবহ তৈরি হলো;বাড়ি বাড়ি রুটি বিতরণ। শবে বরাত নিয়ে নজরুলের কবিতা আছে, গোলাম মোস্তফার বিখ্যাত কবিতা আছে;এসব আমাদের পাঠ্য ছিল। এগুলো সামাজিকভাবে মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত না করলে অপরাধটা কোথায়?   মিররঃ এই বয়সে এসে শহুরে ঈদ কিভাবে উদযাপন করেন? আবদুল হাই শিকদারঃ এখন তো আর সেই দিল্লিও নেই, সেই আগ্রাও নাই। এখনকার ঈদ বয়স্ক লোকদের ঈদ;সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে গোসল করে ফ্রেশ হয়ে জামাকাপড় পরে নামাজ পড়তে যাওয়া, তারপর এসে ঘুম। আত্মীয়স্বজন এলে তাদের সাথে আড্ডা, বন্ধুবান্ধব এলে আড্ডা। আমাদের এখন আর ওই জৌলুশটা থাকে না। কিন্তু শিশুরা যখন আনন্দ করে তখন ভালো লাগে। আমি খুব আগ্রহ করে শিশুদের সালামির ব্যবস্থা করি। বিশেষ করে এক্সট্রা-অর্ডিনারি খাম রাখি;খামের মধ্যে কিছু টাকা (৫০০, ১০০০, বা ১০০/২০০);ব্যাংক থেকে চকচকা নোট এনে খামে ভরে গিফট করলে বাচ্চারা মহাখুশি হয়। একটা উদাহরণ দিই;আব্বা বলতেন, যে শিশুরা সত্য কথা বলে, সৎপথে চলে, নামাজ পড়ে, ঈদগাহে যায়, জুম্মার নামাজ পড়ে;আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন এবং তাদের জন্য উপহার পাঠান। কী উপহার? অন্য উপহার তো আছেই;পরীক্ষার রেজাল্ট ভালো হবে, খেলতে ভালো পারবে;সব আছে। কিন্তু আরেকটা জিনিস;মাঝে মাঝে রহমতের ফেরেশতা দিয়ে আল্লাহ লজেন্স-চকলেট এসব বাড়িতে বাড়িতে দিয়ে যায়, আর যারা ভালো ছেলে তাদের বালিশের নিচে অনেক সময় থাকে। একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে আমার ছোটটা চিৎকার শুরু করল;“আব্বা আব্বা, আমাদের বাড়িতে রহমতের ফেরেশতা আসছিল!” কী হয়েছে? “আমার বালিশের নিচে অনেকগুলো চকলেট!” তখন আব্বা বললেন;“দেখছো, তুমি কালকে নিয়ত করছিলা না;আজকে জুম্মার নামাজে আমার সাথে যাবে;আল্লাহ খুশি হয়ে এটা পাঠিয়ে দিয়েছে।” মিররঃ আপনার ছোট ভাইয়ের উদাহরণ দিলেন; বাহ বাহ!। আবদুল হাই শিকদারঃ হ্যাঁ, আব্বা আমাদের ভাই-বোনদেরকে উৎসাহিত করার জন্য এই কাজ করতেন। আমরা অবাক হয়ে ভাবতাম ফেরেশতা চকলেট দিয়ে গেছে। চকলেট ভালোবাসতাম। আব্বা কিনে এনে বালিশের নিচে রেখে দিতেন;রূপকথার মতো সাজিয়ে দিতেন;আর আমরা খুশির ঠেলায় মসজিদে যাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে যেতাম। রাতে বলতাম;“আল্লাহর কাছে আজ কী চাইবো;সকালবেলা যদি এরকম পাই কেমন হয়!” সকালে উঠে চকলেট পেতাম। মিরর: অনেক বেশি ধন্যবাদ স্যার, ক্যাম্পাস মিররকে সময় দেওয়ার জন্য। আবারও ঈদের শুভেচ্ছা। আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ। আবদুল হাই শিকদারঃ ওয়ালাইকুম আসসালাম।    

বন্ধ আল আকসা, সড়কে ঈদের জামাত!

  1. অনলাইন ডেস্ক:
পবিত্র ঈদুল ফিতরের নামাজ আদায়ে ফিলিস্তিনিদের আল-আকসা মসজিদে প্রবেশে বাধা দিয়েছে ইসরাইলি বাহিনী। নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে ঈদের দিনে মসজিদুল আকসা বন্ধ করে রাখে ইসরাইল। ফলে শত শত মুসল্লিকে মসজিদের ফটক ও আশপাশের সড়কে নামাজ আদায় করতে হয়েছে। ইসরাইলের নিষেধাজ্ঞার কারণে প্রায় ছয় দশকের মধ্যে এই প্রথম ফিলিস্তিনের জেরুজালেমে মুসলিমদের প্রথম কিবলা আল-আকসা মসজিদে ঈদের নামাজ হয়নি। গার্ডিয়ানের সংবাদে এসেছে, ১৯৬৭ সালের পর এই প্রথম ঈদুল ফিতরের দিন আল-আকসা মসজিদ বন্ধ রাখা হয়। ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ মসজিদ চত্বরটি বন্ধ রাখায় ফিলিস্তিনিদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পবিত্র ঈদুল ফিতরের নামাজ আদায়ের জন্য মুসল্লিরা বন্ধ করে দেওয়া ওই স্থাপনার যতটা সম্ভব কাছে জড়ো হন। ইসরাইলের নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে আল-আকসার খতিব ও জেরুজালেমের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি শেখ ইকরিমা সাবরি একটি ধর্মীয় নির্দেশনা জারি করেন। তিনি মুসলিমদের মসজিদের নিকটতম স্থানে ঈদের নামাজ আদায়ের আহ্বান জানান। আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মুসল্লিরা শুক্রবার নামাজ পড়তে আসলে তাদেরকে বাধা দিতে সেখানে টিয়ার গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করা হয় এবং তাদের ছত্রভঙ্গ করতে অভিযান চালানো হয়। ইরানের সঙ্গে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে এর আগ থেকেই আল-আকসা মসজিদে প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই শুক্রবার এ ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বেড়েছে বলে পর্যবেক্ষকদের ধারণা।  

ঈদের গান, নজরুলের দর্শন ও কিশোর হৃদয়ের জাগরণ

ঈদের গান, নজরুলের দর্শন ও কিশোর হৃদয়ের জাগরণ ইফতেখার রবিন   কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্য ও বাঙালি জাতিসত্তার ইতিহাসে এক অনন্য নাম। তিনি কেবল একজন কবি নন—তিনি বিদ্রোহের দ্রষ্টা, প্রেমের সাধক, মানবতার দূত এবং সাম্যের অগ্রদূত। তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছে শোষিত মানুষের আর্তনাদ, আবার সেই কণ্ঠেই ধ্বনিত হয়েছে প্রেম, ভ্রাতৃত্ব ও বিশ্বমানবতার মহাসংগীত। একদিকে তিনি বজ্রকণ্ঠে অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন, অন্যদিকে কোমল হৃদয়ে রচনা করেছেন প্রেম ও ভক্তির গান। এই দ্বৈত সত্তার সম্মিলনে নজরুল হয়ে উঠেছেন বাংলা সাহিত্যের এক অনতিক্রম্য মহীরুহ। নজরুলের সাহিত্যচিন্তা কেবল আবেগের প্রকাশ নয়; এটি একটি গভীর দার্শনিক বোধের ফসল। তাঁর লেখায় যেমন রয়েছে রাজনৈতিক প্রতিবাদ, তেমনি রয়েছে আধ্যাত্মিক অনুসন্ধান, মানবিক সাম্য এবং ধর্মীয় সম্প্রীতির সুগভীর চেতনা। তিনি বিশ্বাস করতেন—মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার ধর্ম, বর্ণ বা জাতিতে নয়; মানুষের আসল পরিচয় নিহিত তার মানবিকতায়। এই দর্শনকে ধারণ করেই তিনি লিখেছেন সাম্যের গান, ভাঙনের গান, জাগরণের গান। বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁকে নজরুলের কণ্ঠস্বর নতুন তাৎপর্য নিয়ে ফিরে আসে। ১৯৪৭ সালের দেশভাগ, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ কিংবা সাম্প্রতিক কিশোর-যুব আন্দোলন—প্রতিটি পর্যায়েই নজরুল হয়ে উঠেছেন প্রতিবাদের ভাষা ও মুক্তির প্রতীক। কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের জাতীয় কবি। ১৯৭২ সালের ২৪ মে আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁকে জাতীয় কবির মর্যাদা দিয়ে ভারত থেকে স্বাধীন বাংলাদেশে আনা হয়। তবে ইতিহাস বলছে, তিনি সর্বপ্রথম জাতীয় কবির স্বীকৃতি পান ১৯২৯ সালে, যখন নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু তাঁকে অবিভক্ত ভারতের জাতীয় কবি হিসেবে ঘোষণা করেন। কিন্তু ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর পূর্ববাংলার মানুষের হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা না থাকায় সেই স্বীকৃতি বাস্তবায়নের সুযোগ সৃষ্টি হয়নি। অপরদিকে, মুসলিম পরিচয়ের কারণে স্বাধীন ভারতে নজরুল দীর্ঘকাল অবহেলা ও উপেক্ষার শিকার হন। তাঁকে জাতীয় কবির মর্যাদা তো দেওয়া হয়নি, বরং ন্যূনতম রাষ্ট্রীয় সম্মানও প্রদর্শিত হয়নি। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর জাতি নতুন করে নজরুলকে ফিরে পাওয়ার সুযোগ পায়। তাঁকে বাংলাদেশে এনে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা হয়। তিনি হয়ে ওঠেন চিরদিনের জন্য আমাদের—এই ভূখণ্ডের, এই মানুষের, এই সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, দীর্ঘ সময় ধরে রাষ্ট্রীয়ভাবে নজরুলের জীবন, দর্শন ও সাহিত্যকে যেভাবে গভীরভাবে ধারণ করা প্রয়োজন ছিল, তা আমরা করতে পারিনি। নানা সীমাবদ্ধতা ও অবহেলার কারণে তিনি অনেকাংশেই উপেক্ষিত থেকে গেছেন। তবে ইতিহাস নতুন মোড় নেয় ৩৬ জুলাইয়ের কিশোর ও যুব বিপ্লবে। এই বিপ্লব কেবল একটি রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়; এটি ছিল চেতনার নবজাগরণ, আত্মমর্যাদার পুনরুদ্ধার এবং প্রকৃত স্বাধীনতার পুনঃসংজ্ঞায়ন। কিশোর ও তরুণদের নেতৃত্বে সংঘটিত এই আন্দোলন বাংলাদেশকে উপহার দেয় এক নতুন পরিচয়—“নতুন বাংলাদেশ”। এই নতুন বাংলাদেশের দাবিতে সরকার নতুন করে গেজেট প্রকাশ করে নজরুলকে “নতুন বাংলাদেশের জাতীয় কবি” হিসেবে পুনঃঘোষণা দেয়। এটি ছিল ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক সংশোধন। নজরুল শিশু-কিশোরদের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি জানতেন—আজকের কিশোররাই আগামী দিনের সমাজ, রাষ্ট্র ও সভ্যতার নির্মাতা। তাই তিনি শিশু-কিশোরদের জন্য রচনা করেছেন অসংখ্য কবিতা, ছোটগল্প, গান ও নাটিকা। তাঁর লেখায় কিশোররা খুঁজে পায় সাহস, আত্মবিশ্বাস, মানবিকতা, দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগের অনুপ্রেরণা। জুলাই বিপ্লবের প্রতিটি মুহূর্তে কিশোররা নজরুলের কবিতা ও গানকে হাতিয়ার করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য তাঁর ঈদসংগীত— “ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ, তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে, শোন আসমানি তাগিদ।” এই গান কেবল ঈদের আনন্দের আহ্বান নয়; এটি ইসলামের মানবিক দর্শনের এক গভীর ব্যাখ্যা। এখানে ‘আপনাকে বিলিয়ে দেওয়া’ মানে আত্মত্যাগ, সহমর্মিতা, দান, ভালোবাসা ও সামাজিক দায়িত্ববোধে উদ্বুদ্ধ হওয়া। ঈদ মানে শুধু খুশি নয়; ঈদ মানে সমাজে বন্ধুত্ব স্থাপন করা, গরিব-দুঃখীর পাশে দাঁড়ানো, ইয়াতিম ও মিসকিনের মুখে হাসি ফোটানো। নজরুল স্মরণ করিয়ে দেন—এই নির্দেশ মানুষের বানানো নয়; এটি “আসমানি তাগিদ”, অর্থাৎ আল্লাহর নির্দেশ। তিনি বলেন— “যারা জীবন ভরে রাখছে রোজা, নিত্য উপবাসী, সেই গরীব ইয়াতীম মিসকিন দে যা কিছু মুফিদ।” এই পঙক্তিতে ইসলামের সামাজিক ন্যায়বোধ ও মানবকল্যাণের দর্শন অনন্যভাবে প্রকাশ পেয়েছে। নজরুল কিশোরদের সামনে তুলে ধরেছেন মুসলিম সভ্যতার গৌরবময় ইতিহাস। তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন—জ্ঞান-বিজ্ঞান, গণিত, দর্শন, চিকিৎসা ও শিল্পকলায় মুসলমানদের অবদান একসময় বিশ্বসভ্যতার অগ্রদূত ছিল। অথচ আজ নানা কারণে মুসলমানরা সেই ঐতিহ্য বিস্মৃত হয়েছে। নজরুল এই অবস্থাকে আক্ষেপের সঙ্গে উল্লেখ করেছেন—“মুর্দা মুসলমান” বলে। তবে তিনি আশাবাদী—আজকের কিশোররাই আবার সেই হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনবে। তাই তিনি আহ্বান জানান— “আজ ভাঙাইতে নিঁদ”—অর্থাৎ অলসতা ও আত্মবিস্মৃতি ভেঙে জাগ্রত হওয়ার ডাক। ঈদের নামাজ প্রসঙ্গে নজরুল ইতিহাসের এক গভীর তাৎপর্য তুলে ধরেছেন—
“আজ পড়বি ঈদের নামাজ রে মন সেই সে ঈদগাহে, যে ময়দানে সব গাজী মুসলিম হয়েছে শহীদ।”
এখানে ঈদগাহ কেবল নামাজের স্থান নয়; এটি আত্মত্যাগ, সংগ্রাম ও শহীদের রক্তে রঞ্জিত ইতিহাসের প্রতীক। এই স্মরণ কিশোরদের মধ্যে আত্মপরিচয় ও দায়িত্ববোধ জাগ্রত করে। নজরুলের মানবতাবাদী দর্শনের সর্বোচ্চ প্রকাশ ঘটেছে তাঁর সম্প্রীতির আহ্বানে— “আজ ভুলে যা তোর দোস্ত-দুশমন, হাত মেলাও হাতে, তোর প্রেম দিয়ে কর বিশ্ব নিখিল ইসলামে মুরিদ।” এখানে তিনি ধর্মীয় সংকীর্ণতা, জাতিগত বিভেদ ও শত্রুতার ঊর্ধ্বে উঠে বিশ্বমানবতার আহ্বান জানিয়েছেন। প্রেম ও ভালোবাসার শক্তিতে বিশ্বজয়ের এই দর্শনই ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা। আরও গভীর তাৎপর্য বহন করে তাঁর এই পঙক্তি—
“ঢাল হৃদয়ের তশতরীতে শিরনি তৌহিদের, তোর দাওয়াত কবুল করবেন হজরত হয় মনে উম্মীদ।”
এখানে হৃদয়কে পবিত্র থালা হিসেবে কল্পনা করে তৌহিদের শিরনি নিবেদনের কথা বলা হয়েছে—যা আধ্যাত্মিকতা, আত্মশুদ্ধি ও মানবিকতার এক অপূর্ব রূপক। সবচেয়ে বিস্ময়কর মানবিক দর্শন প্রকাশ পায় এই আহ্বানে—

“তোদের মারল’ ছুঁড়ে জীবন জুড়ে ইট পাথর যারা,

সেই পাথর দিয়ে তোলরে গড়ে প্রেমেরই মসজিদ।”

অর্থাৎ যারা আমাদের আঘাত করে, কষ্ট দেয়, অবমাননা করে—তাদের দেওয়া ইট-পাথর দিয়েই গড়ে তুলতে হবে ভালোবাসার মসজিদ। প্রতিশোধ নয়, প্রতিরোধ নয়—ক্ষমা, সহমর্মিতা ও প্রেমের মধ্য দিয়েই সমাজ বদলের এই দর্শন নজরুলকে অনন্য উচ্চতায় অধিষ্ঠিত করেছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, কাজী নজরুল ইসলাম কেবল একটি নাম নয়—তিনি একটি চেতনা, একটি আন্দোলন, একটি অনন্ত প্রেরণার উৎস। তাঁর সাহিত্য আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে শৃঙ্খল ভাঙতে হয়, কীভাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হয় এবং কীভাবে ভালোবাসার শক্তিতে সমাজকে রূপান্তরিত করতে হয়। তাঁর দর্শনে বিদ্রোহ ও প্রেম পরস্পরের বিরোধী নয়—বরং একে অন্যের পরিপূরক। নতুন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নজরুল আজ আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। যখন বিশ্বজুড়ে হিংসা, বিদ্বেষ, সাম্প্রদায়িকতা ও বিভেদের রাজনীতি মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে, তখন নজরুল আমাদের শেখান—ভালোবাসাই চূড়ান্ত শক্তি। তিনি কিশোরদের হাতে তুলে দেন সম্প্রীতির পতাকা, বন্ধুত্বের আহ্বান এবং আত্মত্যাগের মহিমা। তাঁর ঈদসংগীত আমাদের মনে করিয়ে দেয়—উৎসব তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তা অন্যের মুখে হাসি ফোটায়, দুঃখীর কষ্ট লাঘব করে এবং সমাজে মানবিক সম্পর্ক গড়ে তোলে। অতএব, নজরুলকে কেবল পাঠ্যবইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না; তাঁকে জীবনের ভেতর ধারণ করতে হবে। তাঁর গান, কবিতা ও দর্শনকে ব্যক্তিজীবন, সমাজজীবন ও রাষ্ট্রচিন্তার কেন্দ্রে স্থাপন করলেই গড়ে উঠবে সত্যিকারের মানবিক বাংলাদেশ। তখনই নজরুল হয়ে উঠবেন কেবল আমাদের জাতীয় কবি নন—আমাদের নৈতিক দিশারি, আমাদের আত্মিক আলোকবর্তিকা। নজরুলের ভাষায়—

“মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।”

এই বাণী ধারণ করেই এগিয়ে যাক নতুন বাংলাদেশের যাত্রা।

লেখক পরিচিতি: কবি ও শিক্ষার্থী ,বাংলা বিভাগ, ঢাকা কলেজ, ধানমন্ডি ঢাকা।

উত্তর কোরিয়ায় ৯৯.৯৩ শতাংশ ভোট পেয়ে পুনর্নির্বাচিত কিম জং-উন

অনলাইন ডেস্ক:

উত্তর কোরিয়ার পার্লামেন্ট নির্বাচনে আবারও নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছেন দেশটির শীর্ষ নেতা কিম জং-উন।

১৫ মার্চ অনুষ্ঠিত সুপ্রিম পিপলস অ্যাসেম্বলির নির্বাচনে তাঁর নেতৃত্বাধীন ওয়ার্কার্স পার্টি অব কোরিয়া এবং মিত্র দলগুলো ৯৯ দশমিক ৯৩ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছে। তবে এই বিপুল জয়ের চেয়েও বেশি আলোচনায় এসেছে বাকি ০.০৭ শতাংশ ভোট, যা ছিল সরকারি প্রার্থীদের বিরুদ্ধে দেওয়া ‘না’ ভোট।

রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা কেসিএনএ জানায়, নির্বাচনে কোনো বিরোধী প্রার্থী ছিল না। প্রতিটি আসনে ভোটারদের সামনে একজন অনুমোদিত প্রার্থীই ছিলেন, যাঁকে গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করার সুযোগ দেওয়া হয়। ফলে এই ‘না’ ভোট কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী দলের পক্ষে নয়, বরং সরকারি প্রার্থীদের বিরুদ্ধে অসন্তোষের প্রকাশ।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৫৭ সালের পর এই প্রথম দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম নির্বাচনে ‘না’ ভোট পড়ার বিষয়টি প্রকাশ্যে স্বীকার করেছে। নির্বাচনে শ্রমিক, কৃষক, বুদ্ধিজীবী ও সামরিক প্রতিনিধিসহ মোট ৬৮৭ জন সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।

উল্লেখ্য, ২০১১ সালে তাঁর বাবা কিম জং-ইল–এর মৃত্যুর পর ক্ষমতায় আসেন কিম জং-উন। পরে ২০১৯ সালে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে তাঁর ক্ষমতা আরও সুসংহত করা হয়। বর্তমানে তিনি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে সামরিক ও সরকারি সব প্রতিষ্ঠানের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছেন।

৬০ কি.মি বেগে ৪ অঞ্চলে ঝড়ের আভাস: আবহাওয়া অধিদপ্তর

অনলাইন প্রতিবেদক: দেশের বিভিন্ন এলাকার ওপর দিয়ে রাত ১টার মধ্যে ৬০ কিলোমিটার বেগে ঝড় বয়ে যেতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদফতর। মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) বিকেলে অভ্যন্তরীণ নদীবন্দরের জন্য দেওয়া এক সতর্কবার্তায় এ তথ্য জানানো হয়।
এতে বলা হয়– মঙ্গলবার বিকেল ৩টা থেকে রাত ১টার মধ্যে রাজশাহী, পাবনা, যশোর ও সিলেট অঞ্চলের ওপর দিয়ে পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে ঘণ্টায় ৪৫-৬০ কিলোমিটার বেগে অস্থায়ীভাবে দমকা বা ঝড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে।
এসব এলাকার নদীবন্দরকে ১ নম্বর সতর্কসংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে হঠাৎ ভিসি পরিবর্তন ‘শিষ্টাচার পরিপন্থী’: ইউটিএল

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে হঠাৎ ভিসি পরিবর্তন ‘শিষ্টাচার পরিপন্থী’: ইউটিএল ডেস্ক রিপোর্ট: দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের (ভিসি) আকস্মিক পরিবর্তনকে ‘অত্যন্ত বিরল, শিষ্টাচার পরিপন্থী ও অসম্মানজনক’ বলে মন্তব্য করেছে ইউনিভার্সিটি টিচার্স লিংক (ইউটিএল)। সংগঠনটির মতে, কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা ছাড়া এমন সিদ্ধান্ত দেশের উচ্চশিক্ষা অঙ্গনে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) এক বিবৃতিতে এ উদ্বেগ প্রকাশ করেন ইউটিএলের ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. যোবাইর মুহাম্মদ এহসানুল হক এবং সদস্য সচিব অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বিলাল হোসাইন। বিবৃতিতে বলা হয়, সম্প্রতি দেশের কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের হঠাৎ করে অপসারণ ও নতুন নিয়োগের ঘটনা গভীর উদ্বেগজনক। কেন এবং কী প্রেক্ষাপটে রাতারাতি বর্তমান উপাচার্যদের নিয়োগ বাতিল করা হলো, সে বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা না থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এ ধরনের পদক্ষেপকে তারা অস্বাভাবিক এবং শিষ্টাচারবিরোধী বলে উল্লেখ করেন। ইউটিএল নেতারা বলেন, পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তী সরকার একাডেমিক ও প্রশাসনিকভাবে যোগ্য অধ্যাপকদের জীবনবৃত্তান্ত যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে উপাচার্য নিয়োগ দিয়েছিল। কিন্তু বর্তমান সরকার কোনো পূর্ব আলোচনা বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে প্রথমে ঘোষণা এবং পরে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাদের অপসারণ করেছে, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত প্রশাসনিক রীতির পরিপন্থী। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, উপাচার্যের পদ একজন শিক্ষকের পেশাজীবনের সর্বোচ্চ সম্মান। যথাযথ প্রক্রিয়া ও সৌজন্যতা উপেক্ষা করে দায়িত্বে থাকা অবস্থায় নতুন নিয়োগ প্রদান বিশ্ববিদ্যালয়ের চিরায়ত শিষ্টাচারের লঙ্ঘন। নেতৃবৃন্দ উল্লেখ করেন, বিশেষ করে ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশের আওতার বাইরের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উপাচার্যরা সাধারণত চার বছরের জন্য চ্যান্সেলরের মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। এ সময়ে তারা দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করে থাকেন। হঠাৎ পরিবর্তনের ফলে এসব পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক ও একাডেমিক ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ইউটিএল আরও জানায়, উপাচার্য নিয়োগ ও পরিবর্তন সরকারের স্বাভাবিক প্রশাসনিক দায়িত্ব হলেও এ ক্ষেত্রে প্রচলিত নিয়ম, শালীনতা ও একাডেমিক সংস্কৃতি বজায় রাখা জরুরি। অন্যথায় বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা ও সুশাসনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। সংগঠনটি সতর্ক করে বলে, একতরফাভাবে উপাচার্যসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও একাডেমিক পদে অব্যাহতি বা নিয়োগ দেওয়া হলে তা উচ্চশিক্ষার অগ্রযাত্রা ব্যাহত করবে এবং একাডেমিক অঙ্গনে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করবে। এ ধরনের সিদ্ধান্ত দেশের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য একটি নিন্দনীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

ঈদুল ফিতরের দিনে বন্ধ থাকবে আল আকসা মসজিদ

ঈদুল ফিতরের দিনে বন্ধ থাকবে আল আকসা মসজিদ আন্তর্জাতিক ডেস্ক: মুসলিমদের বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর এবং তার পরবর্তী সময়েও আল-আকসা মসজিদ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসরাইল। মসজিদের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা ইসলামিক ওয়াকফকে এ বিষয়ে ইতোমধ্যে অবহিত করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও ইরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে চলতি মাসের শুরুতে ‘নিরাপত্তা পরিস্থিতি’র অজুহাতে মসজিদটি বন্ধ করে দেয় ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ। বিশেষ করে রমজান মাসে এই নজিরবিহীন সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ফিলিস্তিনিরা। তাদের অভিযোগ, নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে আল-আকসার ওপর নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করার চেষ্টা চলছে। ১৯৬৭ সালের পূর্ব জেরুজালেম দখলের পর প্রথমবারের মতো রমজানে ফিলিস্তিনিরা এই মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করতে পারেনি। গত সপ্তাহে কয়েকটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ এ পদক্ষেপকে ‘অযৌক্তিক’ আখ্যা দিয়ে এর নিন্দা জানায় এবং অবিলম্বে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আহ্বান জানায়। তবে এখনো মসজিদটি বন্ধ রয়েছে; জুমা ও তারাবির নামাজ বন্ধ থাকায় মুসল্লিদের প্রবেশে বাধা দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে প্রতিটি শিফটে সর্বোচ্চ ২৫ জন ওয়াকফ কর্মীকে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। অতিরিক্ত কর্মী প্রবেশের আবেদনও নাকচ করা হয়েছে বলে জানা গেছে। এমনকি মসজিদের বিভিন্ন স্থানে নজরদারি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে বলেও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন ওয়াকফ কর্মকর্তারা। আল-আকসা বন্ধের পাশাপাশি জেরুজালেমের পুরনো শহর এলাকায় কার্যত লকডাউন জারি করা হয়েছে। শুধুমাত্র স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রবেশের অনুমতি থাকায় এলাকা প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়েছে। তবে শহরের বাইরের অংশে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা অব্যাহত রয়েছে। পবিত্র লাইলাতুল কদরের রাতে শত শত পুলিশ মোতায়েন করে মসজিদমুখী পথগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়, ফলে অনেক মুসল্লি রাস্তায় নামাজ আদায় করতে বাধ্য হন। ইসলামিক ওয়াকফ কাউন্সিলের সদস্য ড. মুস্তাফা আবু সুয়াই বলেন, এভাবে পুরো পুরনো শহর বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনা আগে কখনও ঘটেনি। তিনি আরও উল্লেখ করেন, নিরাপত্তা উদ্বেগ থাকলে মসজিদের ভেতরের নিচতলায় আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা যেত। অন্যদিকে, ওয়াকফের আন্তর্জাতিক বিষয়ক পরিচালক আউনি বাজবাজ সতর্ক করে বলেন, এই ‘অস্থায়ী’ নিষেধাজ্ঞা ধীরে ধীরে স্থায়ী রূপ নিতে পারে—যা দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। দশকের পর দশক ধরে আল-আকসা একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘স্ট্যাটাস কো’ অনুযায়ী পরিচালিত হয়ে আসছে, যেখানে এটি সম্পূর্ণ মুসলিমদের উপাসনালয় হিসেবে বিবেচিত এবং এর প্রশাসন ইসলামিক ওয়াকফের হাতে রয়েছে। তবে ফিলিস্তিনিদের অভিযোগ, পূর্ব জেরুজালেম দখলের পর থেকে মুসলমানদের প্রবেশে বিধিনিষেধ আরোপ এবং ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধির মাধ্যমে এই ব্যবস্থাকে ক্ষয় করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, দখলকৃত অঞ্চলে স্থায়ী পরিবর্তন আনা বৈধ নয় বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।  

ইরান যুদ্ধে ১৩ জন মার্কিন সৈন্য নিহত

ইরান যুদ্ধে ১৩ জন মার্কিন সৈন্য নিহত আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ১৩ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ২০০ জন। আহতদের মধ্যে ১০ জনের অবস্থা গুরুতর বলে জানিয়েছেন মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স। মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা’র এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স জানান, আহতদের মধ্যে অনেকেই ইতোমধ্যে সুস্থ হয়ে দায়িত্বে ফিরেছেন। এ পর্যন্ত প্রায় ১৮০ জন সেনাসদস্য আবার কাজে যোগ দিয়েছেন। তিনি বলেন, আহতদের মধ্যে দগ্ধ হওয়া, বিস্ফোরণের আঘাত, মস্তিষ্কে আঘাতজনিত ক্ষতি এবং বিস্ফোরণের টুকরোর আঘাতে আহত হওয়ার ঘটনা রয়েছে। সামরিক কর্মকর্তারা বলেন, অনেক হামলা ইরানের ‘একমুখী’ ড্রোন হামলার কারণে ঘটেছে। মার্কিন বাহিনীর যৌথ চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন গত সপ্তাহে বলেছিলেন, এ ধরনের ড্রোন হামলাই বেশিরভাগ হতাহতের জন্য দায়ী। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যৌথ সামরিক অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এরপর থেকে ইরানও পাল্টা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র হিসেবে পরিচিত উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশে ইরানের হামলার খবর পাওয়া গেছে।  

বাংলাদেশের ক্ষমতার পালাবদল ও ‘আমেরিকা প্রসঙ্গ’: সুযোগ, শর্ত ও ভূরাজনৈতিক নতুন ভারসাম্য

বাংলাদেশের ক্ষমতার পালাবদল ও ‘আমেরিকা প্রসঙ্গ’: সুযোগ, শর্ত ও ভূরাজনৈতিক নতুন ভারসাম্য মোঃ ওবায়দুল্লাহ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর নির্বাচন ও নতুন সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি যুগান্তকারী ও তাৎপর্যপূর্ণ মোড় এসেছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থাপনার অবসান ঘটিয়ে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার পুনরায় রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরেছে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন তারেক রহমান। ভোটের টার্নআউট, নাগরিক অংশগ্রহণ এবং রাজনীতিতে নতুন দল ও জোটের অভাবনীয় উত্থান সব মিলিয়ে এই পালাবদল কেবল সাধারণ কোনো কাঠামোগত বা দলীয় রদবদল নয়, বরং এটি বাংলাদেশের রাজনীতির ভাষা, ব্যাকরণ এবং অগ্রাধিকার পরিবর্তনের একটি সুস্পষ্ট ও জোরালো ইঙ্গিত (১)। এই পরিবর্তিত ও যুগসন্ধিক্ষণের প্রেক্ষাপটে “আমেরিকা প্রসঙ্গ” পুনরায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আলোচনার একেবারে কেন্দ্রে উঠে এসেছে। গত এক দশকের বেশি সময় ধরে ওয়াশিংটনের সঙ্গে ঢাকার সম্পর্ক একটি জটিল সমীকরণের মধ্য দিয়ে পার হয়েছে, যা কখনো কৌশলগত অংশীদারত্বের, আবার কখনো তীব্র চাপ ও সংযমের দ্বন্দ্বে আবর্তিত হয়েছে (২)। শুরুতেই অনুধাবন করা প্রয়োজন যে, বাংলাদেশের মতো একটি উদীয়মান মাঝারি শক্তির (Middle Power) দেশে “ক্ষমতার পালাবদল” আন্তর্জাতিক মহলে, বিশেষ করে পরাশক্তিগুলোর কাছে কেন এতটা গুরুত্ব বহন করে। প্রথমত, একুশ শতকের ভূরাজনীতিতে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল বৈশ্বিক ক্ষমতার ভরকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় বৃহৎ শক্তিগুলোর বিশেষত চীন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের যে বহুমুখী ও তীব্র প্রতিযোগিতা (Great Power Competition) চলমান, সেখানে ঢাকার যেকোনো নীতিগত দিকনির্দেশনা ও কৌশলগত অবস্থান পুরো বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের স্থিতিশীলতায় সরাসরি প্রভাব ফেলে (৩)। দ্বিতীয়ত, বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ এবং উদীয়মান অর্থনীতি হিসেবে বাংলাদেশ আজ বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের (Global Supply Chain) একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। সুতরাং, এ দেশে শ্রমমান, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, মানবাধিকার পরিস্থিতি কিংবা বন্দর ও লজিস্টিকসের যেকোনো ঝুঁকি সরাসরি পশ্চিমা দেশগুলোর বাজার ও অর্থনীতিকে নাড়া দেয়। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে ওয়াশিংটন, বেইজিং কিংবা মস্কোর মতো পরাশক্তিগুলো এখন ঢাকার অভ্যন্তরীণ শাসনতান্ত্রিক গতিপ্রকৃতি বা ‘গভর্ন্যান্স ট্রেন্ড’ অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে তাদের পরবর্তী কৌশল নির্ধারণ করছে। ১. ক্ষমতার পালাবদল, অভ্যন্তরীণ সমীকরণ ও গণতান্ত্রিক উত্তরণ যেকোনো দেশে স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক রদবদলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া সাধারণত প্রথাগত অভিনন্দন বার্তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে দেখা গেছে, নির্বাচনী প্রতিযোগিতার ধরন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মান, মানবাধিকারের সুরক্ষা এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতির মতো বিষয়গুলো কেবল অভ্যন্তরীণ ইস্যু হিসেবে আটকে নেই; বরং এগুলো আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অবিচ্ছেদ্য নির্ণায়কে পরিণত হয়েছে। এবারের নির্বাচনকে ঘিরে দেশি-বিদেশি মহলে ব্যাপক সহিংসতার আশঙ্কা থাকলেও, সামগ্রিকভাবে ভোটগ্রহণ ও ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া তুলনামূলক শান্তিপূর্ণ হওয়ায় নতুন সরকার আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একটি ইতিবাচক প্রারম্ভিক স্বীকৃতি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। একই সঙ্গে, নতুন সংসদে ইসলামপন্থী রাজনৈতিক শক্তির বড় উপস্থিতি এবং অধিকারভিত্তিক নতুন নাগরিক-ধারার দলগুলোর উত্থান স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি কেবল পুরোনো দ্বিদলীয় বৃত্তের ছকে আটকে থাকবে না; বরং আদর্শিক এবং সামাজিক বিভাজনগুলো আরও বহুমুখী ও গভীর হতে পারে। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, নতুন সরকার কি একটি সত্যিকারের অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বহুত্ববাদী রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়তে পারবে? তুলনামূলক রাজনীতির ইতিহাস বলে, একটি দেশে ক্ষমতার পালাবদল তখনই দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হয়, যখন পরাজিত পক্ষের রাজনৈতিক অধিকার ও নাগরিক পরিসর (Civic Space) সম্পূর্ণ সুরক্ষিত থাকে (৪)। বিগত বছরগুলোতে ‘নির্বাচনী স্বৈরতন্ত্র’ (Electoral Autocracy) বা কাঠামোগত দমনের যে চর্চা দেখা গেছে, তা থেকে বেরিয়ে এসে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশেষ করে বিচার বিভাগ, পুলিশ, সিভিল প্রশাসন এবং নির্বাচন কমিশনকে দলীয়করণের নগ্ন থাবা থেকে মুক্ত করা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ২০২৪-পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্র সংস্কারের যে প্রবল দাবি ও আলোচনা সমাজে শুরু হয়েছিল, তা যদি স্রেফ রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, ভিন্ন খাতে মনোযোগ ঘোরানোর কৌশল বা (Zero-sum) গেমের রাজনীতিতে আটকে যায়, তবে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা আবারও সেই পুরোনো অগণতান্ত্রিক চক্রে ফিরে যাওয়ার মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে। নতুন সরকারকে তাই ভোটের বৈধতার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির মাধ্যমে ‘শাসনের বৈধতা’ (Performance Legitimacy) অর্জনের দিকেও সমান মনোযোগ দিতে হবে। ২. ওয়াশিংটনের বহুমাত্রিক লেন্স: মানদণ্ড-চালিত অংশীদারত্ব ও ‘কিউরেটেড ভিজিবিলিটি’ বাংলাদেশ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ বা পররাষ্ট্রনীতি মূলত তিনটি প্রধান স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে: গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, ভূরাজনৈতিক নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্বার্থ। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একটি বড় পরিবর্তন হলো, এই তিনটি স্তম্ভের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ অত্যন্ত দৃশ্যমানভাবে যুক্ত হয়েছে। মার্কিন কংগ্রেস, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এবং পশ্চিমা মূলধারার মিডিয়া এখন দক্ষিণ এশিয়া নীতি নির্ধারণে শক্তিশালী প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে। ফলে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কটি এখন আর কেবল নিছক কূটনৈতিক সৌজন্য বা আনুষ্ঠানিকতার পর্যায়ে নেই. এটি একটি “মানদণ্ড-চালিত অংশীদারত্বে” (Standards-driven partnership) রূপান্তরিত হয়েছে। গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশে অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন, রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহিতার ওপর প্রকাশ্য ও কঠোর অবস্থান নিয়ে আসছে। ২০২১ সালে র‍্যাব ও এর সাবেক-বর্তমান কর্মকর্তাদের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এবং ২০২৩ সালে গণতান্ত্রিক নির্বাচন-প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্তকারীদের বিরুদ্ধে ভিসা-নীতির ঘোষণা, এই পদক্ষেপগুলো স্পষ্ট প্রমাণ করে যে, ওয়াশিংটন মানবাধিকার ও গণতন্ত্রকে কেবল কথার কথায় সীমাবদ্ধ না রেখে, এটিকে তাদের পররাষ্ট্রনীতির একটি দৃশ্যমান ও প্রায়োগিক হাতিয়ার বা “সিগন্যালিং টুল” হিসেবে ব্যবহার করছে (৫)। নতুন সরকারের প্রতি ওয়াশিংটনের তরফ থেকে আসা অভিনন্দন বার্তাটি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সিগন্যাল। এর অর্থ হলো ওয়াশিংটন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা চায় এবং নির্বাচনের পর নতুন প্রশাসনের সঙ্গে দ্রুত কাজ শুরু করতে তারা আগ্রহী। তবে মনে রাখা প্রয়োজন, এটি কোনোভাবেই শর্তহীন বা অন্ধ সমর্থন নয়। যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক সমর্থন সাধারণত দ্বিমুখী সমীকরণে আসে। একদিকে থাকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও নিরাপত্তা সহযোগিতার আকর্ষণীয় প্রস্তাব, অন্যদিকে থাকে মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক মানদণ্ড নিয়ে কঠোর নজরদারি। নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক পরীক্ষা হলো এই বাহ্যিক চাপকে শত্রুতা বা বৈরিতায় রূপ না দিয়ে, এটিকে রাষ্ট্রীয় সংস্কার এবং কৌশলগত দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা। এখানে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক বিষয় হলো ‘কিউরেটেড ভিজিবিলিটি’ (Curated Visibility) বা নিয়ন্ত্রিত দৃশ্যমানতা। অনেক সময় সরকারগুলো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ সামাল দিতে বাহ্যিকভাবে মানবাধিকার বা গণতান্ত্রিক সংস্কারের একটি মেকি বা নিয়ন্ত্রিত চিত্র তুলে ধরে, যা আদতে ভেতরে কাঠামোগত কোনো পরিবর্তন আনে না (৬)। ওয়াশিংটন এখন এই ‘কিউরেটেড ভিজিবিলিটি’র ফাঁদ সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন। তাই অতীতের গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা বা রাজনৈতিক হয়রানির অভিযোগগুলোর প্রেক্ষিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মৌলিক কাঠামোগত সংস্কার, বিরোধী দলগুলোর স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিসর এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, এসব ইস্যুগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র কেবল লোকদেখানো সংস্কার নয়, বরং দৃশ্যমান ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের ওপর জোর দেবে। ৩. বৃহৎ শক্তির প্রতিযোগিতা এবং ঢাকার ‘নন-অ্যালাইনমেন্ট ২.০’ কৌশল ইন্দো-প্যাসিফিক বা ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত নৌপথ, গভীর সমুদ্রবন্দর, সাইবার নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ দমন এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার মতো ক্রিটিক্যাল ইস্যুগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে একটি নিবিড় কৌশলগত বলয় তৈরি করতে চায় (৭)। তবে এই আগ্রহের নেপথ্যে চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও সামরিক উপস্থিতি একটি বিশাল প্রভাবক বা “পেছনের ফ্রেম” হিসেবে কাজ করছে। এশিয়ার উঠতি পরাশক্তি হিসেবে চীনের প্রভাব মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদের নিয়ে যে বলয় তৈরি করছে, বাংলাদেশ ভৌগোলিক কারণেই তার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের পররাষ্ট্রনীতি হলো “সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়”। কিন্তু বর্তমানের তীব্র মেরুকৃত বিশ্বে এই নীতির আক্ষরিক প্রয়োগ অত্যন্ত কঠিন। পরাশক্তিগুলো এখন কেবল বন্ধুত্বই চায় না। তারা বৈশ্বিক ইস্যুতে কৌশলগত অবস্থান ও রাজনৈতিক আনুগত্যও প্রত্যাশা করে। এমতাবস্থায় বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর, বাস্তবসম্মত ও যুগোপযোগী কৌশল হতে পারে “নন-অ্যালাইনমেন্ট ২.০” (Non-Alignment 2.0) বা কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন (Strategic Autonomy) বজায় রেখে ইস্যুভিত্তিক অংশীদারত্ব গড়ে তোলা (৮)। অর্থাৎ, ঢাকা একই সঙ্গে সামুদ্রিক নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা আধুনিকায়ন, সাইবার স্পেস এবং প্রযুক্তি-স্ট্যান্ডার্ডের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করবে; আবার নিজস্ব অর্থনৈতিক প্রয়োজনে ভৌত অবকাঠামো, উৎপাদনশীল খাত এবং বাণিজ্যের ক্ষেত্রে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক সম্প্রসারণ করবে। তবে এই ভারসাম্য রক্ষার প্রধান শর্ত হলোঃ যেকোনো দ্বিপাক্ষিক চুক্তির পূর্ণ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, বিদেশি ঋণের টেকসইতা (Debt sustainability) বিশ্লেষণ করা এবং জাতীয় নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট বা সংবেদনশীল প্রযুক্তির ক্ষেত্রে সম্ভাব্য ঝুঁকির সঠিক মূল্যায়ন করা। এই জটিল ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যের খেলায় নিকটতম প্রতিবেশী ভারতের অবস্থানও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দিল্লি ঐতিহাসিকভাবেই বাংলাদেশের নিরাপত্তা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং অর্থনৈতিক সংযোগের সবচেয়ে বড় আঞ্চলিক অংশীদার। আবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের বর্তমান কৌশলগত ও প্রতিরক্ষা ঘনিষ্ঠতা বাংলাদেশের জন্য একধরনের সূক্ষ্ম “ত্রিভুজীয় সমীকরণ” তৈরি করেছে। ঢাকার জন্য সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ হবে, ভারত এবং যুক্তরাষ্ট্রকে একে অপরের বিরুদ্ধে ‘লিভারেজ’ বা দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করার প্রলোভন থেকে বিরত থাকা। এর বদলে আঞ্চলিক কানেক্টিভিটি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিরাপত্তা এবং সমুদ্র অর্থনীতিতে (Blue Economy) বহুপাক্ষিক সহযোগিতা বাড়ানো উচিত। পাশাপাশি, রোহিঙ্গা সংকট বর্তমানে বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি মানবিক বিপর্যয় নয়, বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক চাপের কারণ। বিশ্বজুড়ে নতুন নতুন যুদ্ধ ও সংকটের কারণে পশ্চিমা দাতাদের মধ্যে যে ‘দাতা-ক্লান্তি’ (Donor fatigue) তৈরি হয়েছে, তার ফলে এই সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে (৯)। নতুন সরকারকে এখন রোহিঙ্গা ইস্যুকে কেবল ত্রাণের দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, বরং এশিয়ার আঞ্চলিক নিরাপত্তা, মানবপাচার এবং বৈশ্বিক অভিবাসন ঝুঁকির বিস্তৃত ফ্রেমওয়ার্ক থেকে ওয়াশিংটনের সামনে উপস্থাপন করতে হবে। ৪. অর্থনৈতিক কূটনীতি, সরবরাহ শৃঙ্খল এবং ভবিষ্যৎ রূপরেখা বাংলাদেশের সামনে এখন বহুমুখী ও তীব্র অর্থনৈতিক চাপ বিদ্যমান। একদিকে অভ্যন্তরীণ বাজারে লাগামহীন মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট এবং কর্মসংস্থানের অভাব; অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি প্রতিযোগিতা এবং ট্যারিফ বা শুল্কনীতির খড়গ। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন বাণিজ্যের কাঠামো বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতকে কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে, তবে সেটি সম্পূর্ণরূপে নির্ভর করবে বাংলাদেশ কীভাবে তার নিজস্ব শ্রম অধিকার, কারখানার সার্বিক নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের ট্রেসেবিলিটি বা স্বচ্ছতা উন্নত করে তার ওপর (১০)। নতুন সরকার যদি আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্কারের দাবিগুলোকে কেবল ‘বিদেশি হস্তক্ষেপ’ বা বাইরের চাপ হিসেবে দেখে, তবে বিশ্ববাজারে টিকে থাকা কঠিন হবে। বরং এই সংস্কারগুলোকে দেশের উৎপাদনশীলতা, শ্রমিকদের জীবনমান এবং আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড-ভ্যালু বৃদ্ধির একটি দীর্ঘমেয়াদী ‘বিনিয়োগ’ হিসেবে দেখা উচিত। কেবল সস্তা শ্রমের ওপর নির্ভর করে অর্থনীতিকে আর বেশি দূর এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে কেবল তৈরি পোশাক নয়, বরং আইটি বা তথ্যপ্রযুক্তি সেবা, ফার্মাসিউটিক্যালস, জাহাজ নির্মাণ এবং কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের মতো নতুন নতুন খাতে প্রবেশের জন্য একটি আগ্রাসী অর্থনৈতিক কূটনীতি প্রয়োজন। ওয়াশিংটন তাদের সাপ্লাই চেইনে “ডাইভারসিফিকেশন” বা বৈচিত্র্য পছন্দ করে। অর্থনৈতিক ঝুঁকি এড়াতে বাংলাদেশেরও এখন বহুমুখী রপ্তানি খাতের দিকে যাওয়া অপরিহার্য। পরিশেষে, ক্ষমতা বদলের এই ক্রান্তিলগ্নে বিদেশি রাষ্ট্র ও বিনিয়োগকারীরা মূলত নীতি-ধারাবাহিকতা বা “পলিসি স্ট্যাবিলিটি” খোঁজেন। নতুন সরকার যদি দ্রুততার সঙ্গে জাতীয় বাজেটে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, ব্যাংক খাতে লাগামহীন খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ এবং জ্বালানি খাতের অসম চুক্তিগুলোতে স্বচ্ছতা আনতে পারে, তবে সামষ্টিক অর্থনীতিতে আস্থা ফিরে আসবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ওয়াশিংটনের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আর কোনোভাবেই ব্যক্তিনির্ভর বা সাময়িক লবিং-নির্ভর রাখা যাবে না। এটিকে পুরোপুরি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে। সংসদীয় কমিটি, আন্তর্জাতিক মানের থিঙ্কট্যাংকগুলোর মধ্যে ডায়ালগ, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত শক্তিশালী বাংলাদেশি ডায়াস্পোরা নেটওয়ার্কের কার্যকর ব্যবহার এবং নিয়মিত কৌশলগত সংলাপের (Strategic Dialogue) মাধ্যমে এই সম্পর্ককে টেকসই করতে হবে। বাংলাদেশের ক্ষমতার পালাবদল যেমন অপার সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে, তেমনি পুরোনো কাঠামোগত ত্রুটিগুলোকে নতুন মোড়কে ফিরিয়ে আনার ঝুঁকিও তৈরি করেছে। তাই “আমেরিকা প্রসঙ্গ” এখানে কোনো একক ভালো বা মন্দের গল্প নয়; এটি মূলত বাংলাদেশের নিজস্ব রাষ্ট্রক্ষমতা, পরিপক্বতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার একটি চূড়ান্ত আন্তর্জাতিক পরীক্ষা। নতুন সরকার যদি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন এবং দক্ষ অর্থনৈতিক শাসনযন্ত্র উপহার দিতে পারে, তবেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক নিছক চাপ ও সংযমের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে একটি প্রকৃত, সমমর্যাদাসম্পন্ন ও পরিণত অংশীদারত্বে উন্নীত হতে পারে। তথ্যসূত্র (References): (১) Riaz, A. (2024). Pathways of Autocratization: The Tumultuous Journey of Bangladeshi Politics. Routledge. (২) Kugelman, M. (2023). “Bangladesh’s Balancing Act in the Indo-Pacific.” Foreign Policy, January 12. (৩) Baruah, D. M. (2021). Mapping the Bay of Bengal: The Real Geopolitics of the Indo-Pacific. Carnegie Endowment for International Peace. (৪) Levitsky, S., & Way, L. A. (2010). Competitive Authoritarianism: Hybrid Regimes after the Cold War. Cambridge University Press. (৫) U.S. Department of State. (2023). Announcement of Visa Policy to Promote Democratic Elections in Bangladesh. Press Statement, May 24. [সাথে যুক্ত: U.S. Department of the Treasury. (2021). Treasury Sanctions Perpetrators of Serious Human Rights Abuse… December 10.] (৬) Dukalskis, A. (2021). Making the World Safe for Dictatorship. Oxford University Press. (৭) The White House. (2022). Indo-Pacific Strategy of the United States. Washington, DC. (৮) Anwar, A. (2019). “How Bangladesh is balancing US-China rivalry.” East Asia Forum, August 14. (৯) UNHCR. (2024). Joint Response Plan for the Rohingya Humanitarian Crisis. (১০) Office of the United States Trade Representative (USTR). (2024). National Trade Estimate Report on Foreign Trade Barriers: Bangladesh. লেখক: ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ঢাকার ভিজিটিং স্কলার। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন মিসিসিপিতে পলিটিক্যাল সায়েন্সে উচ্চশিক্ষারত।   লেখক: ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ঢাকার ভিজিটিং স্কলার। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন মিসিসিপিতে পলিটিক্যাল সায়েন্সে উচ্চশিক্ষারত।  

ইরানে পশ্চিমা আগ্রাসন- খোমেনির নির্মম বিদায়ে স্তম্ভিত গোটা বিশ্ব

ইরানে পশ্চিমা আগ্রাসন- খোমেনির নির্মম বিদায়ে স্তম্ভিত গোটা বিশ্ব

উপসাগরীয় জ্বালানি স্থাপনায় হামলা, ইরানের বিরুদ্ধে আরব দেশগুলোকে যুদ্ধে টানার অভিযোগ, মিনাবে স্কুলে হত্যাযজ্ঞ এবং খামেনির মৃত্যুর পর নতুন শক্তিসংকটে মধ্যপ্রাচ্য।

সাদী মোহাম্মদ সাদ আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি; আধুনিক মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসের এমন এক ব্যক্তিত্ব, যাকে ছাড়া এ অঞ্চলের গত চার দশকের কোনো সমীকরণ মেলানোই অসম্ভব। মাশহাদের এক অতি সাধারণ ধার্মিক পরিবার থেকে উঠে আসা এই নিভৃতচারী ছাত্রটি কেবল ইরানের ‘সুপ্রিম লিডার’ নন, বরং ইসলামী বিশ্বের এক প্রভাবশালী রাজনৈতিক দর্শনের প্রতীক। তার জীবন ছিল বিপ্লব, কারাবরণ, রক্তাক্ত হামলা, যুদ্ধকালীন নেতৃত্ব, কঠোর রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রণ ও আঞ্চলিক প্রতিরোধ রাজনীতির দীর্ঘ এক ইতিহাস।ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় নিহত হয়েছেন ইরানের এই সর্বোচ্চ নেতা। একই সঙ্গে ইরানের শীর্ষ ৪৮ জন সামরিক ও বেসামরিক নেতা নিহত হয়েছেন।  সেই মানুষটির মৃত্যুকে ঘিরে এখন নতুন অগ্নিগর্ভ বাস্তবতার মুখোমুখি মধ্যপ্রাচ্য। ইরানে ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত এক হাজার ৯৭ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৮১ জন ১০ বছর বয়সী শিশু।

ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনা ইসরায়েলি-মার্কিন হামলায় শামখানি ও পাকপুরের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছে। এছাড়া বিপ্লবী গার্ডের অ্যারোস্পেস ফোর্সের কমান্ডার সৈয়দ মজিদ মুসাভি এবং গোয়েন্দা উপমন্ত্রী মোহাম্মদ শিরাজিসহ প্রায় ৪০ জন কর্মকর্তা ওই যৌথ হামলায় নিহত হয়েছেন।

দেশটির বার্তা সংস্থা ফারস নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খামেনির পরিবারের কয়েকজন সদস্যও হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন। তাদের মধ্যে তার মেয়ে, জামাতা, নাতি এবং এক পুত্রবধূ রয়েছেন। পরে ইরানি সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল আবদুর রহিম মুসাভির মৃত্যুর খবরও নিশ্চিত করা হয়েছে। ইরান এ ঘটনায় ৪০ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে এবং হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, হামলার আদেশদাতারা শিগগিরই তাদের কর্মকাণ্ডের জন্য অনুশোচনা করবে।

ইরানের নিহতদের অফিসারদের মধ্যে 

মেজর জেনারেল আবদোলরাহিম মুসাভি: ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব স্টাফ ।

মোহাম্মদ পাকপুর: ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (IRGC) এর গ্রাউন্ড ফোর্সের কমান্ডার।

আলি শামখানি: ইরানের ডিফেন্স কাউন্সিলের সেক্রেটারি এবং সাবেক প্রতিরক্ষা মন্ত্রী।

আজিজ নাসিরজাদেহ: ইরানের বর্তমান প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ।

সালাহ আসাদি: সামরিক জরুরি কমান্ডের গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান [০.৪.৯]।

মোহাম্মদ শিরাজী: সর্বোচ্চ নেতার সামরিক কার্যালয়ের প্রধান [০.৪.৯]।

সর্বমোট নিহতের সংখ্যা: সংঘাতে এখন পর্যন্ত ইরানে সব মিলিয়ে ১,৩০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে একটি বড় অংশ বেসামরিক নাগরিক

মাশহাদ থেকে মধ্যপ্রাচ্যের কেন্দ্রবিন্দু

আলী খামেনির জীবন শুরু হয়েছিল ইরানের পবিত্র শহর মাশহাদে, ১৯৩৯ সালের ১৯ এপ্রিল। আট ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। তার পিতা আয়াতুল্লাহ সায়েদ জাওয়াদ খামেনি ছিলেন একজন ধর্মপ্রাণ, মিতব্যয়ী আলেম। দারিদ্র্য, কৃচ্ছ্রসাধন ও ধর্মীয় অনুশাসনের মধ্য দিয়ে কাটানো শৈশবই খামেনির রাজনৈতিক ও নৈতিক চেতনার ভিত গড়ে দেয়।

মাশহাদে প্রাথমিক ধর্মীয় শিক্ষা শেষ করে ১৯৫৮ সালে তিনি কৌমে যান। সেখানেই আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির সান্নিধ্যে এসে তিনি ইসলামী রাজনৈতিক দর্শনের প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট হন। ইসলামকে কেবল আধ্যাত্মিক অনুশাসন নয়, বরং রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালনার পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠার ধারণা তাকে দ্রুতই এক বিপ্লবী আলেমে পরিণত করে।

বিপ্লব, কারাবরণ ও বেঁচে ফেরার ইতিহাস

১৯৬০ ও ৭০-এর দশকে শাহবিরোধী আন্দোলনে খামেনি ছিলেন সামনের সারির সংগঠক ও বক্তা। মাশহাদ ও তেহরানের মসজিদে জ্বালাময়ী বক্তব্য দিয়ে তিনি যুবসমাজকে সংগঠিত করেন। ইমাম খোমেনির ‘উইলায়াত-ই ফকিহ’ তত্ত্বে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি শাহের পশ্চিমাঘেঁষা নীতি, দুর্নীতি ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলেন।

এই সক্রিয়তার কারণে ১৯৬৩ থেকে ১৯৭৯ সালের মধ্যে তাকে ছয়বার গ্রেপ্তার করা হয়। সাভাকের নির্যাতন, নির্জন কারাবাস এবং নির্বাসন;সবকিছু তাকে আরও কঠোর করে তোলে। ১৯৭৭ সালে ইরানশহরে নির্বাসিত হয়েও তিনি জনগণের পাশে দাঁড়িয়ে নিজের নেতৃত্বগুণের পরিচয় দেন। ১৯৭৮ সালের শেষভাগে মুক্তি পেয়ে তিনি সরাসরি খোমেনির বিপ্লবী কাউন্সিলে যোগ দেন।

১৯৮১ সালের ২৭ জুন বোমা হামলায় তিনি প্রায় মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসেন। এ হামলায় তার ডান হাত স্থায়ীভাবে অকেজো হয়ে যায়। এই ঘটনা তাকে সমর্থকদের চোখে এক ‘জীবন্ত শহীদ’-এর মর্যাদা দেয়।

১৯৮১ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে তিনি ইরান-ইরাক যুদ্ধের সবচেয়ে সংকটময় সময়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেন। ১৯৮১ থেকে ১৯৮৯ পর্যন্ত যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা, অভ্যন্তরীণ সংঘাত ও অর্থনৈতিক চাপের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখার অভিজ্ঞতা তাকে এক কঠোর বাস্তববাদী নেতা হিসেবে গড়ে তোলে।

১৯৮৯ সালে ইমাম খোমেনির মৃত্যুর পর তিনি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হন। প্রথমদিকে অনেকেই ভেবেছিলেন, তিনি হয়তো দীর্ঘদিন টিকবেন না। কিন্তু গত ৩৬ বছরে তিনি গার্ডিয়ান কাউন্সিল, আইআরজিসি, বিচার বিভাগ, গোয়েন্দা কাঠামো এবং রাষ্ট্রের কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার ওপর এমন দৃঢ় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন, যা তাকে আধুনিক ইরানের দীর্ঘতম মেয়াদের শাসকে পরিণত করে।

খামেনির পররাষ্ট্রনীতি: প্রতিরোধ, স্বনির্ভরতা, আঞ্চলিক প্রভাব

খামেনির পররাষ্ট্রনীতির মূলভিত্তি ছিল ‘প্রতিরোধ’। তার কাছে যুক্তরাষ্ট্র ছিল ইরানের প্রধান প্রতিপক্ষ, আর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ছিল আত্মসমর্পণ নয়, বরং স্বনির্ভরতার দিকে ঠেলে দেওয়া এক বাস্তবতা। ‘প্রতিরোধ অর্থনীতি’র ধারণা, পরমাণু কর্মসূচিতে অটল থাকা, এবং আঞ্চলিক মিত্রগোষ্ঠীগুলোকে শক্তিশালী করা ছিল তার কৌশলের স্তম্ভ।

লেবাননের হিজবুল্লাহ, সিরিয়ার আসাদ সরকার, ইরাকের শিয়া মিলিশিয়া এবং ইয়েমেনের হুথিদের সঙ্গে ইরানের প্রভাব বলয় বিস্তারের পেছনে খামেনির বড় ভূমিকা ছিল। ইসরায়েলের প্রতি তার অবস্থান ছিল প্রকাশ্য, কঠোর ও আপসহীন। ফিলিস্তিনি প্রশ্নে হামাস ও ইসলামিক জিহাদের প্রতি সমর্থন দিয়ে তিনি নিজেকে মুসলিম বিশ্বের ফিলিস্তিনপন্থী নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ মুখ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন।

সংঘাতের বিস্তার: উপসাগরীয় স্থাপনায় হামলা ঘিরে নতুন অভিযোগ

খামেনির মৃত্যুর পরপরই সংঘাত ভয়াবহভাবে বিস্তৃত হয়। আরব উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি ও বেসামরিক স্থাপনাগুলোতে একাধিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর ইরান অভিযোগ তোলে, এসব হামলার পেছনে ইসরায়েল রয়েছে। তেহরানের দাবি, এটি একটি সুপরিকল্পিত ফাঁদ;যার উদ্দেশ্য আঞ্চলিক ক্ষোভ উসকে দেওয়া এবং আরব দেশগুলোকে ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে নামানো।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা মিডল ইস্ট আই–কে বলেন, সৌদি আরবে সংঘটিত বেশ কিছু ড্রোন হামলার পেছনে ইসরায়েল ছিল। তিনি আরও দাবি করেন, ওমানেও অন্তত একটি হামলার জন্য ইসরায়েল দায়ী। তার ভাষায়, “আমি সুনির্দিষ্টভাবে বলতে পারি, বেশ কিছু হামলা আমাদের (ইরান) পক্ষ থেকে চালানো হয়নি।”

ইরানের দাবি: বেসামরিক স্থাপনায় সব হামলা তাদের নয়

গত শনিবার থেকে ইরান মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন স্থাপনাগুলোকে নিশানা বানানো শুরু করে। তেহরানের ভাষ্য, এটি ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ আগ্রাসনের প্রতিশোধ। তবে ইরান বলছে, উপসাগরীয় জ্বালানি স্থাপনা বা কিছু বেসামরিক অবকাঠামোয় যেসব হামলা হয়েছে, তার সবগুলোর দায় তাদের নয়।

পাঁচ দিনের এই সংঘাতেই সৌদি আরব ও কাতারের তেল-গ্যাস রপ্তানি সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিদেশিদের কাছে দুবাইয়ের ‘নিরাপদ আশ্রয়’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ভাবমূর্তিও বড় ধাক্কা খেয়েছে।

ইরানি মাটিতে মোসাদের তৎপরতা

ইরানের একাধিক সূত্র দাবি করেছে, কিছু ড্রোন হামলা সরাসরি মোসাদ পরিচালনা করেছে। তারা বলছে, ইসলামি প্রজাতন্ত্র নিজেদের ভূখণ্ডেই মোসাদের সক্রিয়তার আলামত শনাক্ত করেছে। ইরানি কর্মকর্তাদের দাবি, ড্রোন মজুতের জন্য ব্যবহৃত গুদামগুলো খুঁজে বের করে ধ্বংস করার অভিযান চলছে।

একটি সূত্রের ভাষ্য, শুধু ইরানেই নয়, অঞ্চলের অন্য দেশগুলোতেও মোসাদের গুদাম বা অপারেশনাল রুম থাকতে পারে, যেখান থেকে উপসাগরীয় প্রতিবেশীদের লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে দায় ইরানের ঘাড়ে চাপানোর চেষ্টা হচ্ছে। এ বক্তব্যে পুরনো ঘটনাও টানা হয়েছে;যেমন ইরানের শীর্ষ পরমাণু বিজ্ঞানীকে দূরনিয়ন্ত্রিত অস্ত্রে হত্যা, পারমাণবিক কর্মসূচিতে ম্যালওয়্যার হামলা এবং নথি চুরি।

আঞ্চলিক বিশ্লেষকদের আশঙ্কা: ইসরায়েলের স্বার্থে সরাসরি সংঘাত

তেহরান পলিটেকনিক ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক সৈয়দ ইমামিয়ান মনে করেন, ইরান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর দীর্ঘ কূটনৈতিক সম্পর্কোন্নয়ন প্রক্রিয়াকে ভেঙে দেওয়ার জন্যই এ ধরনের হামলার পেছনে ইসরায়েলের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে। তার মতে, ইরান বরাবরই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল-সংশ্লিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলার কথা বলেছে, কিন্তু বেসামরিক ও অ-মার্কিন স্থাপনায় হামলার পেছনে হয় ইসরায়েলি ভূমিকা আছে, নয়তো বিরল ক্ষেত্রে কারিগরি ত্রুটি।

ন্যাশনাল ইরানিয়ান আমেরিকান কাউন্সিলের সিনা তুসির মতে, উপসাগরীয় দেশগুলোকে সরাসরি ইরানের বিপক্ষে যুদ্ধে ঠেলে দিতে পারলে তা ইসরায়েলের কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা করবে। কারণ এতে সংঘাত আঞ্চলিক রূপ নেবে এবং তেহরান আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে।

মিনাবের স্কুলে ভয়াবহ হামলা

সংঘাতের সবচেয়ে শোকাবহ অধ্যায়গুলোর একটি দক্ষিণ ইরানের মিনাব শহরের মেয়েদের একটি প্রাইমারি স্কুলে হামলা। রয়টার্স জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তদন্তকারীরা ধারণা করছেন, এ হামলার জন্য মার্কিন বাহিনী দায়ী হতে পারে;যদিও তদন্ত এখনো শেষ হয়নি।

মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ স্বীকার করেছেন, ঘটনাটি তদন্তাধীন। ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডের মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিমোথি হকিন্স এ বিষয়ে মন্তব্য থেকে বিরত থেকেছেন। হোয়াইট হাউস সরাসরি দায় অস্বীকার করে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র বেসামরিক মানুষ ও শিশুদের লক্ষ্য করে হামলা চালায় না।

ইরানের রাষ্ট্রদূত আলি বাহরেইনি জানান, ওই হামলায় ১৫০ জন শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে। যদিও এ সংখ্যা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। জাতিসংঘ মানবাধিকার দপ্তর হামলার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত দাবি করেছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী, ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো স্কুল, হাসপাতাল বা বেসামরিক স্থাপনায় হামলা যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

একজন জ্যেষ্ঠ ইসরায়েলি কর্মকর্তা এবং যৌথ সামরিক পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত একটি সূত্রের বরাতে জানা গেছে, ইরানে হামলার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ভৌগোলিক এলাকা ও লক্ষ্যবস্তুর ধরন অনুযায়ী দায়িত্ব ভাগ করে নিয়েছে। পশ্চিম ইরানে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্রগুলোতে হামলা চালাচ্ছে ইসরায়েল, আর দক্ষিণাঞ্চলে একই ধরনের লক্ষ্যবস্তু ও নৌবাহিনীর স্থাপনাগুলোতে হামলা করছে যুক্তরাষ্ট্র।

রিয়াদ, কুয়েত ও সমুদ্রপথে উত্তেজনা

শুক্রবার সৌদি কর্তৃপক্ষ জানায়, রাজধানী রিয়াদের আকাশে বেশ কয়েকটি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে। কয়েকটি বিস্ফোরণের শব্দও শোনা গেছে, যদিও তাৎক্ষণিকভাবে হতাহতের তথ্য পাওয়া যায়নি।

একই দিনে ইরানের সেনাবাহিনী জানায়, তারা কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে নতুন করে হামলা চালিয়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানাধীন একটি জাহাজেও আক্রমণ হয়েছে, যা একটি তেলবাহী ট্যাঙ্কার হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

“আমাদের প্রতিরোধক অস্ত্র থাকতেই হবে, যদি কোনো দেশের কাছে তা না থাকে, তাহলে তারা তার শত্রুদের পায়ের তলায় মিশে যেতে বাধ্য হয়।” ; আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি, মৃত্যুর ১১ দিন আগে শেষ জনসভায়

“আমি সুনির্দিষ্টভাবে বলতে পারি, বেশ কিছু হামলা আমাদের (ইরান) পক্ষ থেকে চালানো হয়নি।” ; ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা

“জায়নবাদী সত্তা এসব দেশকে যুদ্ধে টেনে এনে ধ্বংসযজ্ঞ বাড়াতে চায়।” ; আবদুল আজিজ আলতুওয়াইজিরি

খামেনির মৃত্যু, ইরানের পাল্টা প্রতিশোধ, উপসাগরীয় স্থাপনায় হামলা, মোসাদের তৎপরতার অভিযোগ, মিনাবে স্কুলে হত্যাযজ্ঞ এবং জিসিসির সম্ভাব্য অবস্থান;সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্য এখন এক অভূতপূর্ব মোড়ে। প্রশ্ন একটাই: এই সংঘাত কি ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সীমার মধ্যে থাকবে, নাকি তা ছড়িয়ে পড়বে পুরো আরব উপসাগর, জ্বালানি বাজার ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা কাঠামো জুড়ে?