বাংলাদেশের ক্ষমতার পালাবদল ও ‘আমেরিকা প্রসঙ্গ’: সুযোগ, শর্ত ও ভূরাজনৈতিক নতুন ভারসাম্য
মোঃ ওবায়দুল্লাহ
ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর নির্বাচন ও নতুন সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি যুগান্তকারী ও তাৎপর্যপূর্ণ মোড় এসেছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থাপনার অবসান ঘটিয়ে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার পুনরায় রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরেছে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন তারেক রহমান। ভোটের টার্নআউট, নাগরিক অংশগ্রহণ এবং রাজনীতিতে নতুন দল ও জোটের অভাবনীয় উত্থান সব মিলিয়ে এই পালাবদল কেবল সাধারণ কোনো কাঠামোগত বা দলীয় রদবদল নয়, বরং এটি বাংলাদেশের রাজনীতির ভাষা, ব্যাকরণ এবং অগ্রাধিকার পরিবর্তনের একটি সুস্পষ্ট ও জোরালো ইঙ্গিত (১)। এই পরিবর্তিত ও যুগসন্ধিক্ষণের প্রেক্ষাপটে “আমেরিকা প্রসঙ্গ” পুনরায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আলোচনার একেবারে কেন্দ্রে উঠে এসেছে। গত এক দশকের বেশি সময় ধরে ওয়াশিংটনের সঙ্গে ঢাকার সম্পর্ক একটি জটিল সমীকরণের মধ্য দিয়ে পার হয়েছে, যা কখনো কৌশলগত অংশীদারত্বের, আবার কখনো তীব্র চাপ ও সংযমের দ্বন্দ্বে আবর্তিত হয়েছে (২)।
শুরুতেই অনুধাবন করা প্রয়োজন যে, বাংলাদেশের মতো একটি উদীয়মান মাঝারি শক্তির (Middle Power) দেশে “ক্ষমতার পালাবদল” আন্তর্জাতিক মহলে, বিশেষ করে পরাশক্তিগুলোর কাছে কেন এতটা গুরুত্ব বহন করে। প্রথমত, একুশ শতকের ভূরাজনীতিতে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল বৈশ্বিক ক্ষমতার ভরকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় বৃহৎ শক্তিগুলোর বিশেষত চীন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের যে বহুমুখী ও তীব্র প্রতিযোগিতা (Great Power Competition) চলমান, সেখানে ঢাকার যেকোনো নীতিগত দিকনির্দেশনা ও কৌশলগত অবস্থান পুরো বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের স্থিতিশীলতায় সরাসরি প্রভাব ফেলে (৩)। দ্বিতীয়ত, বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ এবং উদীয়মান অর্থনীতি হিসেবে বাংলাদেশ আজ বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের (Global Supply Chain) একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। সুতরাং, এ দেশে শ্রমমান, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, মানবাধিকার পরিস্থিতি কিংবা বন্দর ও লজিস্টিকসের যেকোনো ঝুঁকি সরাসরি পশ্চিমা দেশগুলোর বাজার ও অর্থনীতিকে নাড়া দেয়। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে ওয়াশিংটন, বেইজিং কিংবা মস্কোর মতো পরাশক্তিগুলো এখন ঢাকার অভ্যন্তরীণ শাসনতান্ত্রিক গতিপ্রকৃতি বা ‘গভর্ন্যান্স ট্রেন্ড’ অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে তাদের পরবর্তী কৌশল নির্ধারণ করছে।
১. ক্ষমতার পালাবদল, অভ্যন্তরীণ সমীকরণ ও গণতান্ত্রিক উত্তরণ
যেকোনো দেশে স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক রদবদলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া সাধারণত প্রথাগত অভিনন্দন বার্তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে দেখা গেছে, নির্বাচনী প্রতিযোগিতার ধরন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মান, মানবাধিকারের সুরক্ষা এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতির মতো বিষয়গুলো কেবল অভ্যন্তরীণ ইস্যু হিসেবে আটকে নেই; বরং এগুলো আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অবিচ্ছেদ্য নির্ণায়কে পরিণত হয়েছে। এবারের নির্বাচনকে ঘিরে দেশি-বিদেশি মহলে ব্যাপক সহিংসতার আশঙ্কা থাকলেও, সামগ্রিকভাবে ভোটগ্রহণ ও ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া তুলনামূলক শান্তিপূর্ণ হওয়ায় নতুন সরকার আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একটি ইতিবাচক প্রারম্ভিক স্বীকৃতি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। একই সঙ্গে, নতুন সংসদে ইসলামপন্থী রাজনৈতিক শক্তির বড় উপস্থিতি এবং অধিকারভিত্তিক নতুন নাগরিক-ধারার দলগুলোর উত্থান স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি কেবল পুরোনো দ্বিদলীয় বৃত্তের ছকে আটকে থাকবে না; বরং আদর্শিক এবং সামাজিক বিভাজনগুলো আরও বহুমুখী ও গভীর হতে পারে।
এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, নতুন সরকার কি একটি সত্যিকারের অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বহুত্ববাদী রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়তে পারবে? তুলনামূলক রাজনীতির ইতিহাস বলে, একটি দেশে ক্ষমতার পালাবদল তখনই দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হয়, যখন পরাজিত পক্ষের রাজনৈতিক অধিকার ও নাগরিক পরিসর (Civic Space) সম্পূর্ণ সুরক্ষিত থাকে (৪)। বিগত বছরগুলোতে ‘নির্বাচনী স্বৈরতন্ত্র’ (Electoral Autocracy) বা কাঠামোগত দমনের যে চর্চা দেখা গেছে, তা থেকে বেরিয়ে এসে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশেষ করে বিচার বিভাগ, পুলিশ, সিভিল প্রশাসন এবং নির্বাচন কমিশনকে দলীয়করণের নগ্ন থাবা থেকে মুক্ত করা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ২০২৪-পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্র সংস্কারের যে প্রবল দাবি ও আলোচনা সমাজে শুরু হয়েছিল, তা যদি স্রেফ রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, ভিন্ন খাতে মনোযোগ ঘোরানোর কৌশল বা (Zero-sum) গেমের রাজনীতিতে আটকে যায়, তবে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা আবারও সেই পুরোনো অগণতান্ত্রিক চক্রে ফিরে যাওয়ার মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে। নতুন সরকারকে তাই ভোটের বৈধতার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির মাধ্যমে ‘শাসনের বৈধতা’ (Performance Legitimacy) অর্জনের দিকেও সমান মনোযোগ দিতে হবে।
২. ওয়াশিংটনের বহুমাত্রিক লেন্স: মানদণ্ড-চালিত অংশীদারত্ব ও ‘কিউরেটেড ভিজিবিলিটি’
বাংলাদেশ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ বা পররাষ্ট্রনীতি মূলত তিনটি প্রধান স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে: গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, ভূরাজনৈতিক নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্বার্থ। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একটি বড় পরিবর্তন হলো, এই তিনটি স্তম্ভের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ অত্যন্ত দৃশ্যমানভাবে যুক্ত হয়েছে। মার্কিন কংগ্রেস, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এবং পশ্চিমা মূলধারার মিডিয়া এখন দক্ষিণ এশিয়া নীতি নির্ধারণে শক্তিশালী প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে। ফলে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কটি এখন আর কেবল নিছক কূটনৈতিক সৌজন্য বা আনুষ্ঠানিকতার পর্যায়ে নেই. এটি একটি “মানদণ্ড-চালিত অংশীদারত্বে” (Standards-driven partnership) রূপান্তরিত হয়েছে।
গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশে অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন, রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহিতার ওপর প্রকাশ্য ও কঠোর অবস্থান নিয়ে আসছে। ২০২১ সালে র্যাব ও এর সাবেক-বর্তমান কর্মকর্তাদের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এবং ২০২৩ সালে গণতান্ত্রিক নির্বাচন-প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্তকারীদের বিরুদ্ধে ভিসা-নীতির ঘোষণা, এই পদক্ষেপগুলো স্পষ্ট প্রমাণ করে যে, ওয়াশিংটন মানবাধিকার ও গণতন্ত্রকে কেবল কথার কথায় সীমাবদ্ধ না রেখে, এটিকে তাদের পররাষ্ট্রনীতির একটি দৃশ্যমান ও প্রায়োগিক হাতিয়ার বা “সিগন্যালিং টুল” হিসেবে ব্যবহার করছে (৫)।
নতুন সরকারের প্রতি ওয়াশিংটনের তরফ থেকে আসা অভিনন্দন বার্তাটি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সিগন্যাল। এর অর্থ হলো ওয়াশিংটন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা চায় এবং নির্বাচনের পর নতুন প্রশাসনের সঙ্গে দ্রুত কাজ শুরু করতে তারা আগ্রহী। তবে মনে রাখা প্রয়োজন, এটি কোনোভাবেই শর্তহীন বা অন্ধ সমর্থন নয়। যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক সমর্থন সাধারণত দ্বিমুখী সমীকরণে আসে। একদিকে থাকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও নিরাপত্তা সহযোগিতার আকর্ষণীয় প্রস্তাব, অন্যদিকে থাকে মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক মানদণ্ড নিয়ে কঠোর নজরদারি। নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক পরীক্ষা হলো এই বাহ্যিক চাপকে শত্রুতা বা বৈরিতায় রূপ না দিয়ে, এটিকে রাষ্ট্রীয় সংস্কার এবং কৌশলগত দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা।
এখানে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক বিষয় হলো ‘কিউরেটেড ভিজিবিলিটি’ (Curated Visibility) বা নিয়ন্ত্রিত দৃশ্যমানতা। অনেক সময় সরকারগুলো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ সামাল দিতে বাহ্যিকভাবে মানবাধিকার বা গণতান্ত্রিক সংস্কারের একটি মেকি বা নিয়ন্ত্রিত চিত্র তুলে ধরে, যা আদতে ভেতরে কাঠামোগত কোনো পরিবর্তন আনে না (৬)। ওয়াশিংটন এখন এই ‘কিউরেটেড ভিজিবিলিটি’র ফাঁদ সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন। তাই অতীতের গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা বা রাজনৈতিক হয়রানির অভিযোগগুলোর প্রেক্ষিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মৌলিক কাঠামোগত সংস্কার, বিরোধী দলগুলোর স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিসর এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, এসব ইস্যুগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র কেবল লোকদেখানো সংস্কার নয়, বরং দৃশ্যমান ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের ওপর জোর দেবে।
৩. বৃহৎ শক্তির প্রতিযোগিতা এবং ঢাকার ‘নন-অ্যালাইনমেন্ট ২.০’ কৌশল
ইন্দো-প্যাসিফিক বা ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত নৌপথ, গভীর সমুদ্রবন্দর, সাইবার নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ দমন এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার মতো ক্রিটিক্যাল ইস্যুগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে একটি নিবিড় কৌশলগত বলয় তৈরি করতে চায় (৭)। তবে এই আগ্রহের নেপথ্যে চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও সামরিক উপস্থিতি একটি বিশাল প্রভাবক বা “পেছনের ফ্রেম” হিসেবে কাজ করছে। এশিয়ার উঠতি পরাশক্তি হিসেবে চীনের প্রভাব মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদের নিয়ে যে বলয় তৈরি করছে, বাংলাদেশ ভৌগোলিক কারণেই তার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের পররাষ্ট্রনীতি হলো “সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়”। কিন্তু বর্তমানের তীব্র মেরুকৃত বিশ্বে এই নীতির আক্ষরিক প্রয়োগ অত্যন্ত কঠিন। পরাশক্তিগুলো এখন কেবল বন্ধুত্বই চায় না। তারা বৈশ্বিক ইস্যুতে কৌশলগত অবস্থান ও রাজনৈতিক আনুগত্যও প্রত্যাশা করে। এমতাবস্থায় বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর, বাস্তবসম্মত ও যুগোপযোগী কৌশল হতে পারে “নন-অ্যালাইনমেন্ট ২.০” (Non-Alignment 2.0) বা কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন (Strategic Autonomy) বজায় রেখে ইস্যুভিত্তিক অংশীদারত্ব গড়ে তোলা (৮)। অর্থাৎ, ঢাকা একই সঙ্গে সামুদ্রিক নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা আধুনিকায়ন, সাইবার স্পেস এবং প্রযুক্তি-স্ট্যান্ডার্ডের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করবে; আবার নিজস্ব অর্থনৈতিক প্রয়োজনে ভৌত অবকাঠামো, উৎপাদনশীল খাত এবং বাণিজ্যের ক্ষেত্রে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক সম্প্রসারণ করবে। তবে এই ভারসাম্য রক্ষার প্রধান শর্ত হলোঃ যেকোনো দ্বিপাক্ষিক চুক্তির পূর্ণ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, বিদেশি ঋণের টেকসইতা (Debt sustainability) বিশ্লেষণ করা এবং জাতীয় নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট বা সংবেদনশীল প্রযুক্তির ক্ষেত্রে সম্ভাব্য ঝুঁকির সঠিক মূল্যায়ন করা।
এই জটিল ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যের খেলায় নিকটতম প্রতিবেশী ভারতের অবস্থানও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দিল্লি ঐতিহাসিকভাবেই বাংলাদেশের নিরাপত্তা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং অর্থনৈতিক সংযোগের সবচেয়ে বড় আঞ্চলিক অংশীদার। আবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের বর্তমান কৌশলগত ও প্রতিরক্ষা ঘনিষ্ঠতা বাংলাদেশের জন্য একধরনের সূক্ষ্ম “ত্রিভুজীয় সমীকরণ” তৈরি করেছে। ঢাকার জন্য সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ হবে, ভারত এবং যুক্তরাষ্ট্রকে একে অপরের বিরুদ্ধে ‘লিভারেজ’ বা দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করার প্রলোভন থেকে বিরত থাকা। এর বদলে আঞ্চলিক কানেক্টিভিটি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিরাপত্তা এবং সমুদ্র অর্থনীতিতে (Blue Economy) বহুপাক্ষিক সহযোগিতা বাড়ানো উচিত।
পাশাপাশি, রোহিঙ্গা সংকট বর্তমানে বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি মানবিক বিপর্যয় নয়, বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক চাপের কারণ। বিশ্বজুড়ে নতুন নতুন যুদ্ধ ও সংকটের কারণে পশ্চিমা দাতাদের মধ্যে যে ‘দাতা-ক্লান্তি’ (Donor fatigue) তৈরি হয়েছে, তার ফলে এই সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে (৯)। নতুন সরকারকে এখন রোহিঙ্গা ইস্যুকে কেবল ত্রাণের দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, বরং এশিয়ার আঞ্চলিক নিরাপত্তা, মানবপাচার এবং বৈশ্বিক অভিবাসন ঝুঁকির বিস্তৃত ফ্রেমওয়ার্ক থেকে ওয়াশিংটনের সামনে উপস্থাপন করতে হবে।
৪. অর্থনৈতিক কূটনীতি, সরবরাহ শৃঙ্খল এবং ভবিষ্যৎ রূপরেখা
বাংলাদেশের সামনে এখন বহুমুখী ও তীব্র অর্থনৈতিক চাপ বিদ্যমান। একদিকে অভ্যন্তরীণ বাজারে লাগামহীন মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট এবং কর্মসংস্থানের অভাব; অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি প্রতিযোগিতা এবং ট্যারিফ বা শুল্কনীতির খড়গ। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন বাণিজ্যের কাঠামো বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতকে কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে, তবে সেটি সম্পূর্ণরূপে নির্ভর করবে বাংলাদেশ কীভাবে তার নিজস্ব শ্রম অধিকার, কারখানার সার্বিক নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের ট্রেসেবিলিটি বা স্বচ্ছতা উন্নত করে তার ওপর (১০)।
নতুন সরকার যদি আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্কারের দাবিগুলোকে কেবল ‘বিদেশি হস্তক্ষেপ’ বা বাইরের চাপ হিসেবে দেখে, তবে বিশ্ববাজারে টিকে থাকা কঠিন হবে। বরং এই সংস্কারগুলোকে দেশের উৎপাদনশীলতা, শ্রমিকদের জীবনমান এবং আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড-ভ্যালু বৃদ্ধির একটি দীর্ঘমেয়াদী ‘বিনিয়োগ’ হিসেবে দেখা উচিত। কেবল সস্তা শ্রমের ওপর নির্ভর করে অর্থনীতিকে আর বেশি দূর এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে কেবল তৈরি পোশাক নয়, বরং আইটি বা তথ্যপ্রযুক্তি সেবা, ফার্মাসিউটিক্যালস, জাহাজ নির্মাণ এবং কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের মতো নতুন নতুন খাতে প্রবেশের জন্য একটি আগ্রাসী অর্থনৈতিক কূটনীতি প্রয়োজন। ওয়াশিংটন তাদের সাপ্লাই চেইনে “ডাইভারসিফিকেশন” বা বৈচিত্র্য পছন্দ করে। অর্থনৈতিক ঝুঁকি এড়াতে বাংলাদেশেরও এখন বহুমুখী রপ্তানি খাতের দিকে যাওয়া অপরিহার্য।
পরিশেষে, ক্ষমতা বদলের এই ক্রান্তিলগ্নে বিদেশি রাষ্ট্র ও বিনিয়োগকারীরা মূলত নীতি-ধারাবাহিকতা বা “পলিসি স্ট্যাবিলিটি” খোঁজেন। নতুন সরকার যদি দ্রুততার সঙ্গে জাতীয় বাজেটে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, ব্যাংক খাতে লাগামহীন খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ এবং জ্বালানি খাতের অসম চুক্তিগুলোতে স্বচ্ছতা আনতে পারে, তবে সামষ্টিক অর্থনীতিতে আস্থা ফিরে আসবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ওয়াশিংটনের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আর কোনোভাবেই ব্যক্তিনির্ভর বা সাময়িক লবিং-নির্ভর রাখা যাবে না। এটিকে পুরোপুরি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে। সংসদীয় কমিটি, আন্তর্জাতিক মানের থিঙ্কট্যাংকগুলোর মধ্যে ডায়ালগ, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত শক্তিশালী বাংলাদেশি ডায়াস্পোরা নেটওয়ার্কের কার্যকর ব্যবহার এবং নিয়মিত কৌশলগত সংলাপের (Strategic Dialogue) মাধ্যমে এই সম্পর্ককে টেকসই করতে হবে।
বাংলাদেশের ক্ষমতার পালাবদল যেমন অপার সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে, তেমনি পুরোনো কাঠামোগত ত্রুটিগুলোকে নতুন মোড়কে ফিরিয়ে আনার ঝুঁকিও তৈরি করেছে। তাই “আমেরিকা প্রসঙ্গ” এখানে কোনো একক ভালো বা মন্দের গল্প নয়; এটি মূলত বাংলাদেশের নিজস্ব রাষ্ট্রক্ষমতা, পরিপক্বতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার একটি চূড়ান্ত আন্তর্জাতিক পরীক্ষা। নতুন সরকার যদি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন এবং দক্ষ অর্থনৈতিক শাসনযন্ত্র উপহার দিতে পারে, তবেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক নিছক চাপ ও সংযমের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে একটি প্রকৃত, সমমর্যাদাসম্পন্ন ও পরিণত অংশীদারত্বে উন্নীত হতে পারে।
তথ্যসূত্র (References):
(১) Riaz, A. (2024). Pathways of Autocratization: The Tumultuous Journey of Bangladeshi Politics. Routledge.
(২) Kugelman, M. (2023). “Bangladesh’s Balancing Act in the Indo-Pacific.” Foreign Policy, January 12.
(৩) Baruah, D. M. (2021). Mapping the Bay of Bengal: The Real Geopolitics of the Indo-Pacific. Carnegie Endowment for International Peace.
(৪) Levitsky, S., & Way, L. A. (2010). Competitive Authoritarianism: Hybrid Regimes after the Cold War. Cambridge University Press.
(৫) U.S. Department of State. (2023). Announcement of Visa Policy to Promote Democratic Elections in Bangladesh. Press Statement, May 24. [সাথে যুক্ত: U.S. Department of the Treasury. (2021). Treasury Sanctions Perpetrators of Serious Human Rights Abuse… December 10.]
(৬) Dukalskis, A. (2021). Making the World Safe for Dictatorship. Oxford University Press.
(৭) The White House. (2022). Indo-Pacific Strategy of the United States. Washington, DC.
(৮) Anwar, A. (2019). “How Bangladesh is balancing US-China rivalry.” East Asia Forum, August 14.
(৯) UNHCR. (2024). Joint Response Plan for the Rohingya Humanitarian Crisis.
(১০) Office of the United States Trade Representative (USTR). (2024). National Trade Estimate Report on Foreign Trade Barriers: Bangladesh.
লেখক: ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ঢাকার ভিজিটিং স্কলার। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন মিসিসিপিতে পলিটিক্যাল সায়েন্সে উচ্চশিক্ষারত।
লেখক: ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ঢাকার ভিজিটিং স্কলার। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন মিসিসিপিতে পলিটিক্যাল সায়েন্সে উচ্চশিক্ষারত।
