ক্লাসরুমের তাত্ত্বিক শিক্ষাকে বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে পরিবেশবান্ধব পর্যটনের অপার সম্ভাবনা ও টেকসই উন্নয়নের রূপরেখা বুঝতে রাঙামাটিতে দুই দিনব্যাপী এক বিশেষ অ্যাকাডেমিক শিক্ষাসফর সম্পন্ন করেছে ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ (ডব্লিউইউবি)। বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট (টিএইচএম) বিভাগের উদ্যোগে গত ১৮ ও ১৯ মে এই ব্যতিক্রমী মাঠপর্যায়ের গবেষণা ও শিক্ষা অভিযানের আয়োজন করা হয়। এবারের সফরের মূল প্রতিপাদ্য ছিল—”তত্ত্বের সাথে বাস্তবতার সংযোগ: পরিবেশবান্ধব পর্যটন ও টেকসই উন্নয়ন”।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে পর্যটন খাতের ভূমিকা এবং স্থানীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণকে প্রাধান্য দিয়ে এই সফরের নকশা করা হয়। এতে বিভাগের বিভিন্ন সেমিস্টারের ৭২ জন শিক্ষার্থী অংশ নেন। সফরকারী দলটির সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন টিএইচএম বিভাগের ডিরেক্টর ও বিভাগীয় প্রধান মুহাম্মদ নাসিমুল আজিম এবং সার্বিক সমন্বয়ের দায়িত্বে ছিলেন সহকারী অধ্যাপক ও একাডেমিক কো-অর্ডিনেটর মো. আব্দুল লতিফ মাহমুদ। অনুষদ সদস্য হিসেবে আরও যুক্ত ছিলেন সারা মুর্তজা, পুলক সরকার, উম্মে হানি নিধি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি রেজিস্ট্রার মারুফ আহমেদ।
সফরের উদ্দেশ্য ও গুরুত্ব সম্পর্কে টিএইচএম বিভাগের ডিরেক্টর ও বিভাগীয় প্রধান মুহাম্মদ নাসিমুল আজিম বলেন, “আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল শিক্ষার্থীদের শুধু ক্লাসরুমের চার দেয়ালে বন্দি না রেখে পর্যটন খাতের বাস্তব চ্যালেঞ্জ ও পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাপনার কৌশল সামনাসামনি দেখানো। রাঙামাটির এই সফর শিক্ষার্থীদের পরিবেশগত সচেতনতা এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের প্রতি দায়িত্ববোধ তৈরিতে বড় ভূমিকা রাখবে, যা তাঁদের ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন নেতা হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করবে।”
সফরের অ্যাকাডেমিক এবং ব্যবহারিক দিক বিশ্লেষণ করে বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও একাডেমিক কো-অর্ডিনেটর মো. আব্দুল লতিফ মাহমুদ জানান, “শিক্ষার্থীরা কাপ্তাই হ্রদের বাস্তুতন্ত্র, ধারণক্ষমতা এবং জীববৈচিত্র্য সরাসরি মূল্যায়নের সুযোগ পেয়েছে, যা এসডিজি ১৫ (স্থলজ জীবন)-এর লক্ষ্যমাত্রার সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত। তাত্ত্বিক পড়াশোনা যখন মাঠপর্যায়ের বাস্তব অভিজ্ঞতার সাথে মিলে যায়, তখন শিক্ষার্থীদের শেখার প্রক্রিয়াটি পূর্ণতা পায়। এই অভিজ্ঞতা তাঁদের অ্যাকাডেমিক দক্ষতাকে অনেক সমৃদ্ধ করবে।”
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এই শিক্ষাসফরটিকে মাঠপর্যায়ে সফল ও সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করার পেছনে বিশেষ অবদান রেখেছেন বিভাগের শেষ সেমিস্টারের শিক্ষার্থী জাগরী সত্যজন (Jagori Sotyojn) এবং তাঁর দল। তাঁদের নিরলস পরিশ্রম ও সুনিপুণ টিমওয়ার্ক পুরো সফরের সার্বিক সাফল্য নিশ্চিত করতে অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে।
দুই দিনব্যাপী এই নিবিড় কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীরা রাঙামাটির কাপ্তাই লেক, সুবলং ঝরনা, রাজবন বিহার, বালুর চর এবং স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী বনরূপা বাজার পরিদর্শন করেন। এছাড়া শিক্ষার্থীরা স্থানীয় একটি ঐতিহ্যবাহী উপজাতীয় রেস্তোরাঁয় পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর খাদ্যাভ্যাস ও বাঁশের চোঙে রান্না করা বিখ্যাত ‘ব্যাম্বু চিকেন’সহ বিভিন্ন আদিবাসী খাবার আস্বাদন করেন, যা তাঁদের কমিউনিটি-ভিত্তিক হসপিটালিটি কার্যক্রমের প্রথম হাতের অভিজ্ঞতা দেয়।
একই সাথে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা স্থানীয় ক্ষুদ্র অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে সরাসরি আদিবাসী বিক্রেতাদের কাছ থেকে পাহাড়ি তাজা ফল (লিচু, আম, আনারস, বিরল প্রজাতির গোলাপ জাম), জুম চাষের কাঁচামরিচ, হিল বিনস, বিন্নি চাল ও শুঁটকি মাছ কেনেন। পাশাপাশি তাঁরা স্থানীয় কারিগরদের বোনা ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও কোমর তাঁতের তৈরি বিভিন্ন হস্তশিল্প সামগ্রী ক্রয় করেন। এই অর্থনৈতিক লেনদেন আদিবাসীদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য অক্ষুণ্ণ রেখে কীভাবে তাঁদের সরাসরি আর্থিক সহায়তা দেওয়া যায় তা ফুটিয়ে তোলে, যা এসডিজি ৮ (শোভন কর্ম ও অর্থনৈতিক বৃদ্ধি) এবং এসডিজি ১২ (পরিমিত ভোগ ও টেকসই উৎপাদন)-কে প্রতিফলিত করে।
সফর শেষে আয়োজিত এক অ্যাকাডেমিক আলোচনা সভায় শিক্ষকরা বিশ্বব্যাপী এসডিজি এজেন্ডা বাস্তবায়নে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ভূমিকা তুলে ধরেন। এরই অংশ হিসেবে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের “তত্ত্বের সাথে বাস্তবতার সংযোগ: রাঙামাটিতে পরিবেশবান্ধব পর্যটন ও টেকসই উন্নয়নের ওপর একটি প্রায়োগিক অধ্যয়ন” শীর্ষক একটি বিস্তারিত গবেষণা প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যা তাঁদের নিয়মিত পাঠ্যক্রমের অংশ হিসেবে মূল্যায়ন করা হবে।
