সংবিধান সংস্কার: কিছু উপেক্ষিত জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়

0

খন্দকার তাসনীম।

জুলাই বিপ্লবের পর, দেশের সর্বস্তরের জনগণের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় ছিল ‘সংবিধান সংস্কার’। বিশেষ করে, ১৪২ ও ৭০ অনুচ্ছেদসহ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের দাবি ওঠে। তবে, সংবিধানের কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যেমন ২৮(২) ও ৩৩(৪) অনুচ্ছেদ প্রায়ই আলোচনার বাইরে থেকে যায়, যদিও এগুলো জনগণের মৌলিক অধিকার এবং বৈষম্য সম্পর্কিত।

৩৩(৪) অনুচ্ছেদ: নিবর্তনমূলক আটক এবং মানবাধিকার

সংবিধানের ৩৩(৪) অনুচ্ছেদ সরাসরি মানবাধিকার ও নাগরিকের মৌলিক অধিকারের সঙ্গে জড়িত। সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অনুচ্ছেদ সম্পূর্ণ অসাংবিধানিক ও অবৈধ। আইনের মূলনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো কিছু সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হলেই তা আইন হয়ে যায় না। উদাহরণস্বরূপ, সংসদ সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে যদি কোনো অনুচ্ছেদ অন্তর্ভুক্ত করে যে ‘বিকেল পাঁচটার সময় রাষ্ট্রের কোনো নাগরিক সুপেয় পানি পান করতে পারবে না’ তাহলেই তা আইন হয়ে যাবে না, কারণ, তা আইনের মূলনীতির (জুরিসপ্রুডেন্স) সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

নিবর্তনমূলক আটকের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের কোনো নাগরিককে বিচারের আওতায় না এনে যত দিন ইচ্ছা তত দিন পর্যন্ত, এমনকি সারা জীবন আটক রাখার ক্ষমতা রাষ্ট্রের রয়েছে। উক্ত অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘(৪) নিবর্তনমূলক আটকের বিধান–সংবলিত কোনো আইন কোনো ব্যক্তিকে ছয় মাসের অধিককাল আটক রাখিবার ক্ষমতা প্রদান করিবে না যদি………উপদেষ্টা-পর্ষদ উক্ত ছয় মাস অতিবাহিত হইবার পূর্বে তাঁহাকে উপস্থিত হইয়া বক্তব্য পেশ করিবার সুযোগদানের পর রিপোর্ট প্রদান না করিয়া থাকেন যে, পর্ষদের মতে উক্ত ব্যক্তিকে তদতিরিক্ত কাল আটক রাখিবার পর্যাপ্ত কারণ রহিয়াছে।’ অর্থাৎ উপদেষ্টা পর্ষদের কাছে যদি মনে হয় উক্ত ব্যক্তিকে তদতিরিক্ত কাল আটক রাখার পর্যাপ্ত কারণ রয়েছে, তাহলে ছয় মাসের অধিক আটক রাখা যাবে।

৩৩(৫) অনুচ্ছেদ: তথ্য প্রকাশের উপর বিধিনিষেধ

অনুচ্ছেদ ৩৩(৫)–এর বিধান নাগরিকের মানবাধিকারের জন্য আরও ভয়ংকর। যেখানে উল্লেখ আছে ‘(৫) ……তবে শর্ত থাকে যে, আদেশদানকারী কর্তৃপক্ষের বিবেচনায় তথ্যাদি-প্রকাশ জনস্বার্থবিরোধী বলিয়া মনে হইলে অনুরূপ কর্তৃপক্ষ তাহা প্রকাশে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করিতে পারিবেন।’ অর্থাৎ একজন ব্যক্তিকে সারা জীবন বিনা বিচারে আটক রাখার পর রাষ্ট্রের কাছে যদি মনে হয় তাকে কেন আটক রাখা হয়েছে, তা প্রকাশ করবে না, তাহলে সেই ক্ষমতাও বর্তমান সংবিধান নিশ্চিত করে।

সংবিধানের উক্ত অনুচ্ছেদ সম্পূর্ণ অসাংবিধানিক ও মানবাধিকার হরণকারী বিধান, যা অবশ্যই সংশোধন করতে হবে। রাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে এ ধরনের বিধান রাখা প্রয়োজনীয় হলেও আটক রাখার মেয়াদ সর্বোচ্চ ১৫ কিংবা ২০ দিন করা যেতে পারে এবং উক্ত সময়ের পর অপরাধে জড়িত রয়েছে মর্মে বিশ্বাসযোগ্য কারণ থাকলে তাকে অবশ্যই আদালত কর্তৃক বিচারের আওতায় আনতে হবে। তবে বাংলাদেশের মতো পারস্পরিক রাজনৈতিক অশ্রদ্ধাপূর্ণ দেশে এ ধরনের বিধান না থাকাটাই উত্তম। কারণ, ১৯৭২ সালে সংবিধান প্রবর্তন হওয়ার পর থেকে যখন যে সরকার ক্ষমতায় এসেছে, সেই সরকার তাদের দলীয় স্বার্থে এই অনুচ্ছেদের অপব্যবহার করেছে।

নারীদের সমান অধিকারের নিশ্চয়তা: সংবিধানে প্রয়োজন সংশোধন
২০২২ সালের আদমশুমারি রিপোর্ট অনুযায়ী দেশের মোট জনসংখ্যার ৫০ দশমিক ৪৫ শতাংশ নারী, যাঁদের পরিমাণ প্রায় ৮ কোটি ৫৬ লাখ এবং পুরুষের তুলনায় অধিক। অথচ বাংলাদেশের এই সর্ববৃহৎ জনগোষ্ঠীকে সংবিধানে অধিকার দেওয়ার ক্ষেত্রে উল্লেখ করা হয়েছে ‘রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারী-পুরুষের সমান অধিকার লাভ করিবেন।’

বাংলা অংশটি পড়ার সময় ‘নারী-পুরুষের’ শব্দ দুটি একত্র লিখিত হওয়ায় কিছুটা অস্পষ্টতা তৈরি হলেও ইংরেজি অনুচ্ছেদটি পড়লে সহজেই সেই অস্পষ্টতা দূর হয়ে যাবে। নারীদের অধিকার দেওয়ার ক্ষেত্রে পুরুষের অধিকার মানদণ্ড হিসেবে গণ্য করা পুরুষতান্ত্রিক সমাজের প্রভাব, যেমনটি বাংলাদেশের অন্যান্য প্রচলিত আইনে সেই প্রভাবের প্রতিচ্ছবি দেখা যায়। আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশের নারীরা যেখানে নিজেদের সক্ষমতার জানান দিচ্ছে; লেখাপড়া, খেলাধুলা, গবেষণা, সংস্কৃতি—প্রতিটি ক্ষেত্রে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করছে, সেখানে নারী ও পুরুষের সমান অধিকার সরাসরি স্বীকৃতি না দিয়ে কেন পুরুষের অধিকার মানদণ্ড গণ্য করে নারীকে অধিকার দিতে হবে! অনেক ক্ষেত্রে যুক্তি প্রদান করা হয় যে ‘যেভাবেই লেখা হোক অধিকার তো সমান পাচ্ছে’।

অধিকার সমান পেলেও উক্ত অনুচ্ছেদের মাধ্যমে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের শ্রেষ্ঠত্ব ফুটে ওঠে, পুরুষতান্ত্রিক সমাজের এই প্রভাব কতটা বৈষম্য সৃষ্টি করে, তা ‘দি মুসলিম ম্যারেজ এবং ডিভোর্সেস (রেজিস্ট্রেশন) অ্যাক্ট, ১৯৭৪’সহ বাংলাদেশের বিদ্যমান বিভিন্ন আইনে দেখা যায়। সংবিধান সংস্কার কমিশনকে এই অনুচ্ছেদ সংশোধনের মাধ্যমে নারীদের স্বাধীন অধিকার নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তাদের অধিকার সংকীর্ণ হয়ে যাবে না।

সংসদ সদস্যদের দক্ষতা ও যোগ্যতা: পেশাগোষ্ঠীর আধিপত্য রোধের প্রয়োজন
বাংলাদেশের সংবিধান অনুসারে সংসদ সদস্যদের মূল দায়িত্ব আইন প্রণয়ন করা। তবে, বিগত ১৫ বছরে সংসদ সদস্যদের মধ্যে আইন বিষয়ে মৌলিক ধারণা ছিল খুবই কম। বিশেষ করে ব্যবসায়ীদের উপস্থিতি সংসদে অত্যাধিক ছিল, যা আইন প্রণয়নের পেশাগত ভারসাম্যহীনতা তৈরি করেছে। সংবিধান সংস্কারের মাধ্যমে সংসদ সদস্য হওয়ার জন্য আইন-সংক্রান্ত ন্যূনতম যোগ্যতা নির্ধারণ করা প্রয়োজন, এবং সংসদ সদস্যদের আর্থিক ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা থেকে বিরত রাখার জন্য সংশোধন করা উচিত। এটি সংসদে দক্ষ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় সমন্বয় সাধন করবে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় সংস্কার ও জনকল্যাণ নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে।বাংলাদেশে ২০২৩ সালের আদমশুমারি রিপোর্ট অনুযায়ী, মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ শিশু (০-১৪ বছর বয়সী), কিন্তু এই বিশাল জনগোষ্ঠীর অধিকার এবং সুরক্ষা সংক্রান্ত কোনো স্পষ্ট বিধান সংবিধানে নেই। “আজকের শিশু, আগামী দিনের ভবিষ্যৎ” স্লোগান বাস্তবায়িত করতে হলে, শিশুদের সুরক্ষা এবং তাদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার জন্য সংবিধানে যথাযথ পরিবর্তন আনতে হবে। শিশু শ্রম নিরোধ এবং প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি, যাতে এই অধিকারগুলোর বাস্তবায়ন কার্যকর হতে পারে।

সুপ্রিম কোর্ট ও সংবিধানের অভিভাবকত্ব: বিচার বিভাগের স্বাধীনতা
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট সংবিধানের অভিভাবক হিসেবে কাজ করার কথা হলেও, বিভিন্ন সময়ে সরকার সুপ্রিম কোর্টের সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেছে, যার একটি উদাহরণ হল তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সম্পর্কে ৪ বনাম ৩ বিচারপতির রায়, যেখানে সুপ্রিম কোর্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অসাংবিধানিক বলে ঘোষণা করেছিল। এই রায়টির বিরুদ্ধে বা এর সমালোচনা করা এক প্রকার আদালত অবমাননা হিসেবে গণ্য হয়। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নিয়োগ নির্বাহী বিভাগের প্রভাব মুক্ত হতে হবে, যাতে বিচার বিভাগ সঠিকভাবে সংবিধানের অভিভাবক হিসেবে কাজ করতে পারে।

বাংলাদেশে বিচারপতি নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব থাকলে সুপ্রিম কোর্ট কখনোই সত্যিকার অর্থে সংবিধানের অভিভাবক হয়ে উঠতে পারবে না। উদাহরণস্বরূপ, গণতান্ত্রিক দেশের প্রধান বিচারপতি ‘গণভোট’কে অসাংবিধানিক বলে ঘোষণা করেছিলেন। নতুন বাংলাদেশের সংবিধানে আদালতের সমালোচনার অধিকার, ‘ফেয়ার ক্রিটিসিজম’ নিশ্চিত করা উচিত এবং আইন বিভাগের স্বাধীনতা সুরক্ষিত করতে হবে।

ক্ষমতার ভারসাম্য: বিচার বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ ও রাষ্ট্রপতির ভূমিকা
ক্ষমতার ভারসাম্য সাধারণত রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রী’র মধ্যে আলোচনা হয়ে থাকে, তবে সঠিক রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য আইন বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ, বিচার বিভাগ এবং প্রতিটি বিভাগের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নিয়োগে নির্বাহী বিভাগের প্রভাব মুক্ত করার জন্য সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের পরামর্শে রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে বিচারপতি নিয়োগ দেওয়া উচিত। সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল প্রধান বিচারপতি এবং আপিল বিভাগের দুইজন বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত হতে পারে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার হলে, প্রধান উপদেষ্টা এবং অন্যান্য উপদেষ্টা নিয়োগে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের কোনোভাবে সম্পৃক্ত করা উচিত নয়।সর্বোপরি রাষ্ট্র সঠিকভাবে পরিচালনা করার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সমঝোতা ও শ্রদ্ধাবোধ, যেখানে দেশপ্রেম হওয়া উচিত প্রধান চেতনা।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫৩ বছরের প্রায় ২৩ বছর (এরশাদ-৮ বছর, হাসিনা-১৫ বছর) স্বৈরাচারের শাসনের অধীন ছিল। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার ছিল ‘গণতন্ত্র’ এবং স্বাধীনতার পর থেকে যে রাজনৈতিক দল সবচেয়ে বেশি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সবক দিয়েছে, তারাই এ দেশে দীর্ঘতম সময় স্বৈরাচারী শাসন কায়েম করেছে।

রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ তৈরি না হলে সংবিধানের টেকসই উন্নয়ন কখনোই সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে উন্নত দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে আমরা শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি। যুক্তরাজ্যের অলিখিত সংবিধান থাকা সত্ত্বেও সেখানে স্বৈরাচার তৈরি হয় না। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান পৃথিবীর অন্যতম ছোট সংবিধান, যেখানে বাংলাদেশের মতো এত বেশি অধিকারের কথা উল্লেখ করতে হয় না। অথচ সবকিছু স্বাভাবিক নিয়মে চলছে শতাব্দী ধরে।

শিক্ষার্থী, আইন অনুষদ।

সম্পাদকীয়ঃ জানুয়ারী ২০২৫

প্রিয় পাঠকবৃন্দ, নতুন বছরের প্রথম প্রহরে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি সংখ্যাটি আমাদের সামনে নিয়ে এসেছে একটি অসামান্য সুযোগ—বিশ্বের পরিবর্তনশীল প্রেক্ষাপট এবং আমাদের নিজস্ব ঐতিহাসিক অর্জনকে পুনর্বিবেচনা করার। বিগত বছরটি যেমন চ্যালেঞ্জে পূর্ণ ছিল, তেমনি ছিল আশা ও পুনর্গঠনের জন্য অনুপ্রেরণামূলক। এই সংখ্যায় আমরা আলোকপাত করেছি এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমাদের জন্য বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।

‘জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র’ আমাদের জাতীয় জীবনের জন্য একটি আলোড়ন জন্ম দিয়েছে। জুলাই বিপ্লব শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়, এটি ছিল জনগণের চেতনার পুনর্জাগরণ এবং আত্মনির্ভরশীলতার একটি নতুন অধ্যায়। ঘোষণাপত্রটি জানুয়ারীর ১৫ তারিখ প্রকাশ হবে বলে আমরা আশা করি। এই সংখ্যায় যেসব লেখা প্রকাশিত হয়েছে, তা আমাদের সবার জন্য অনুপ্রেরণার উৎস।

আমাদের সংবিধান সংস্কারের প্রসঙ্গেও আমরা বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছি। প্রতিটি জাতির অগ্রগতির মূলে থাকে একটি শক্তিশালী ও যুগোপযোগী সংবিধান। বর্তমান পরিবর্তনগুলি কীভাবে আমাদের জাতীয় কাঠামোকে নতুন শক্তি ও স্থায়িত্ব প্রদান করবে, তা বিশ্লেষণ করা হয়েছে এই সংখ্যায়।

বিশ্বের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য দেশের সংবাদও আমরা অন্তর্ভুক্ত করেছি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চলমান উত্তেজনা এবং পরিবর্তনশীল গতি আমাদের ভবিষ্যতের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। আন্তর্জাতিক ডামাডোলের আলোচনায় উঠে এসেছে বৈশ্বিক কূটনীতির নতুন ধারাসমূহ এবং আমাদের করণীয় সম্পর্কে দিকনির্দেশনা।

ক্যাম্পাস নিউজ এই সংখ্যায় একটি বিশেষ স্থান পেয়েছে। আমাদের তরুণ প্রজন্মই ভবিষ্যতের পথপ্রদর্শক, এবং তাদের সৃষ্টিশীলতা, সংগ্রাম ও সাফল্যের কাহিনিগুলি আমাদের সবাইকে উজ্জীবিত করে। ছাত্রসংসদ নির্বাচনের দাবী সহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক ঘটনাগুলিকে আমরা তুলে ধরেছি, যা আমাদের শিক্ষাঙ্গনের চিত্র ফুটিয়ে তোলে।

আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি হলো—অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের পথে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে চলা। এই লক্ষ্যেই আমরা ২০২৫ সালকে আরও সমৃদ্ধ ও সম্ভাবনাময় করতে চাই। আসুন, ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার মাধ্যমে নতুন দিনের সূচনা করি। স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ হিসেবে যেন বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে, সেই শুভকামনা রইলো।

‘জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র’ অরাজকতা নাকি সম্ভাবনা?

বাংলাদেশের সমাজ-রাজনীতিতে জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসা অচলায়তন ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ভেঙে গেছে। এ অভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো গণতান্ত্রিক, মানবিক, ও বহুত্ববাদী একটি রাষ্ট্র গড়ার সম্ভাবনার পথ উন্মুক্ত হয়েছে। হাজারো প্রাণের আত্মত্যাগে অর্জিত এই ঐক্যের নেতৃত্ব দিয়েছে ছাত্রসমাজ; সর্বস্তরের মানুষ ও রাজনৈতিক দল এতে একত্রিত হয়ে অভ্যুত্থানকে সফল করে তুলেছে।

অভ্যুত্থানের প্রায় পাঁচ মাস পর, গত ৩১ ডিসেম্বর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে ‘জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র’ প্রকাশের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। এ কর্মসূচি জনসাধারণের মধ্যে কৌতূহল ও উদ্দীপনার জন্ম দিয়েছে। তবে, রাজনৈতিক মহলে বিশেষ করে বিএন[ইর পক্ষ থেকে এর প্রভাব নিয়ে কিছু প্রশ্নও উঠেছে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রথমে জানায়, এ কর্মসূচি একটি বেসরকারি উদ্যোগ এবং এর সঙ্গে সরকারের কোনো সরাসরি সম্পৃক্ততা নেই। তবে সরকারে থাকা ছাত্র নেতৃত্বের একটি অংশ এ কর্মসূচির প্রতি তাঁদের সমর্থন প্রকাশ করেছে। পরে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় অনুষ্ঠিত এক জরুরি প্রেস ব্রিফিংয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা ও জনগণের ঐক্য সংরক্ষণে একটি জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে ঘোষণাপত্র তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ঘোষণাপত্রে গণ-অভ্যুত্থানের অর্জন, ফ্যাসিবাদবিরোধী চেতনা এবং রাষ্ট্র সংস্কারের আকাঙ্ক্ষাকে সুসংহত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হবে।

৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের পর ৮ আগস্ট অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার শপথ নিয়ে যাত্রা শুরু করে। বিগত সরকারের অধীনে ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনীতি ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের চ্যালেঞ্জ সামনে রেখে, সরকার ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ খাতে সংস্কার কমিশন গঠন করে। এগুলো হলো নির্বাচনব্যবস্থা, পুলিশ, বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসন, সংবিধান, এবং দুর্নীতি দমন। পরবর্তীতে আরও কয়েকটি কমিশন গঠন করা হয়।

প্রথম ছয় কমিশন ইতোমধ্যে তাদের প্রস্তাব প্রায় চূড়ান্ত করেছে এবং অংশীজনদের মতামত গ্রহণ করেছে। এসব প্রস্তাবের ভিত্তিতে সরকারপ্রধান একটি “ঐকমত্য কমিশন” গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন, যার লক্ষ্য রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করা।

গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জনগণের মধ্যে যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা জন্ম নিয়েছে, তা পুরোনো ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থার স্পষ্ট প্রতিফলন। এই আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবে রূপ দিতে সংস্কার ও নির্বাচনের প্রশ্নে ঐক্যের প্রয়োজন। বিজয় দিবসের ভাষণ এবং ফোরাম ফর বাংলাদেশ স্টাডিজের উদ্বোধনীতে অধ্যাপক ইউনূস নির্বাচন নিয়ে প্রাথমিক ধারণা দিয়েছেন। তবে অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া পক্ষগুলোর ঐক্য ও সংহতি বজায় রাখাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরাচার শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের সমাজ-রাজনীতিতে গণতন্ত্র ও মানবিকতার একটি নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। এই অভ্যুত্থানের অন্যতম বড় অর্জন হলো একটি গণতান্ত্রিক, মানবিক, ও বহুত্ববাদী রাষ্ট্র গড়ার সামষ্টিক আকাঙ্ক্ষা, যা হাজারো প্রাণের আত্মত্যাগে সম্ভব হয়েছে।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটির নেতারা এ উদ্যোগকে স্বাগত জানান এবং ‘মার্চ ফর ইউনিটি’ কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এই কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে পালিত হওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের ধারাকে অব্যাহত রাখতে এবং মানবিক ও বহুত্ববাদী রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে আলাপ-আলোচনা ও সংলাপের মাধ্যমে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সামষ্টিক ঐক্য বজায় রেখে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার এ উদ্যোগই সবার প্রত্যাশিত।

জুলাই অভ্যুত্থানের পর সৃষ্ট গণতান্ত্রিক পরিবেশে জনগণ পরিবর্তনের প্রত্যাশা করছে। বিজয় দিবসের ভাষণে অধ্যাপক ইউনূস নির্বাচন আয়োজনের সম্ভাব্য সময় নিয়ে ইঙ্গিত দিয়েছেন। একইসঙ্গে, অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে ঐক্য বজায় রেখে সংস্কার ও নির্বাচনে অগ্রসর হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

এদিকে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ‘জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র’ প্রকাশের মাধ্যমে তাদের রাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করতে চায় বলে সন্দেহ করছে বিএনপি। তাদের মতে, এই আন্দোলন রাজনৈতিক দলগুলোকে বাদ দিয়ে একটি অরাজক পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করছে। তবে আন্দোলনকারীদের দাবির পেছনে কারা রয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। ‘মার্চ ফর ইউনিটি’ কর্মসূচি জনগণের মধ্যে কৌতূহল সৃষ্টি করলেও, শান্তিপূর্ণ ও সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গঠনে ঐক্য বজায় রাখা সবচেয়ে জরুরি।

৩০ ডিসেম্বর সোমবার রাতে গুলশানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ‘জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র’ প্রকাশের উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা হয়। এর ঘণ্টা দুই পর ছাত্ররা ঘোষণাপত্র প্রকাশ থেকে সরে আসার কথা জানায়। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার পক্ষ থেকে ঘোষণা দেওয়া হয় যে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে সরকারের তরফেই ঘোষণাপত্র প্রস্তুত করা হবে। বিএনপির মতে, এই পদক্ষেপের ফলে দেশ সম্ভাব্য নৈরাজ্য থেকে রক্ষা পেয়েছে।

বৈঠকে বিএনপি নেতারা ছাত্রদের ঘোষণাপত্র নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাদের মতে, ছাত্র আন্দোলনের পূর্ববর্তী দাবিগুলো—যেমন রাষ্ট্রপতিকে অপসারণের দাবি—দেশে সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক সংকট তৈরি করতে পারত। একইভাবে বাহাত্তরের সংবিধান বাতিলের দাবিও একটি নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা নস্যাৎ হতে পারে।

স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানান, তিনি প্রধান উপদেষ্টা এবং ছাত্র নেতাদের সঙ্গে আলাদা বৈঠক করেছেন। ছাত্রদের ঘোষণাপত্র প্রকাশের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোকে উপেক্ষা করার যে ঝুঁকি তৈরি হচ্ছিল, তা নিয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। বৈঠকে বিএনপি নেতারা মনে করেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের উদ্যোগ দেশের গণমানুষ ও রাজনৈতিক দলগুলোর স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এর পেছনে দৃশ্যমান কোনো পৃষ্ঠপোষকতা না থাকলেও, এটি বিএনপিকে রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্রের অংশ হতে পারে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মসূচি, তাদের অর্থায়ন এবং উদ্দেশ্য নিয়ে আলোচনা হয়। এক নেতা প্রশ্ন তোলেন, ছাত্রদের কর্মসূচি ঘিরে সারা দেশ থেকে ঢাকায় লোক আনতে যে অর্থ ব্যয় হচ্ছে, তার উৎস কী, কারণ ছাত্রদের নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিরা আর্থিকভাবে স্বচ্ছল নন।

আরেক নেতা বলেন, ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের অতীত পরিচয় নিয়ে সংশয় রয়েছে। কেউ ছাত্রলীগ বা ছাত্রশিবিরের সাথে জড়িত ছিলেন, যা তাদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে স্পষ্টতা আনে না। বিপ্লবের ঘোষণাপত্রও সময়ের দিক থেকে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে সমালোচনা হয়। এটি গণঅভ্যুত্থানের আগে প্রকাশ করলে জনগণ বিষয়টি নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারত। কিন্তু এখন এটি সংকট বাড়ানোর ঝুঁকি তৈরি করছে।

বৈঠকে ছাত্রদের রাজনৈতিক দল গঠনের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়। বিএনপি মনে করে, দল গঠন এবং নির্বাচনে অংশ নেওয়া গণতান্ত্রিক অধিকার। তবে যদি এটি ষড়যন্ত্রমূলক বা কর্তৃত্ববাদ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হয়, জনগণ এবং গণতান্ত্রিক দলগুলো তা মেনে নেবে না। ছাত্রদের উদ্যোগ রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় চালিত হলে বিএনপির আপত্তি থাকবে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’ আপাতত স্থগিত থাকলেও, এর পেছনে কারা আছে তা নিয়ে বিএনপির মধ্যে সন্দেহ এবং আলোচনা চলছে।

শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পাঁচ মাস পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঘোষণাপত্র প্রকাশের উদ্যোগ বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ ও সন্দেহ সৃষ্টি করেছে। অনেকেই মনে করেন, এই উদ্যোগের লক্ষ্য হতে পারে নির্বাচন বিলম্বিত করা। বৈষম্যবিরোধীরা শহীদ মিনারে ঘোষণাপত্রে ১৯৭২ সালের সংবিধান বাতিল এবং আওয়ামীলীগকে অপ্রাসঙ্গিক ঘোষণা করার কথা বললেও, শেষ মুহূর্তে তা স্থগিত করে। বিএনপির নেতারা এই উদ্যোগের পেছনে “বিশেষ রাজনৈতিক দল” বা অভ্যন্তরীণ স্বার্থ সংশ্লিষ্টতার সম্ভাবনা দেখলেও, কোনো বিদেশি শক্তির ইন্ধন খুঁজে পাননি।

বিএনপির নেতারা ১৯৭২ সালের সংবিধানকে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত শাসনতন্ত্র হিসেবে উল্লেখ করে, সেটি বাতিলের যে কোনো প্রচেষ্টার বিরোধিতা করেছেন। তারা মনে করেন, প্রয়োজনে সংবিধান যুগোপযোগী করে সংশোধন করা যেতে পারে, তবে এটি বাতিল করা অযৌক্তিক।

অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্বে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ছয়টি সংস্কার কমিশন গঠন করেছেন। বিএনপি সরকারকে সমর্থন জানালেও, তারা দ্রুত নির্বাচনের রোডম্যাপ প্রকাশের দাবি করে আসছে। প্রধান উপদেষ্টা ২০২৫ সালের শেষ বা ২০২৬ সালের শুরুর দিকে নির্বাচনের সম্ভাবনার কথা জানালেও, বিএনপি সুনির্দিষ্ট সময়সূচি চায়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিএনপি এই ঘোষণাপত্র উদ্যোগকে নির্বাচন বিলম্বিত করার কৌশল হিসেবে দেখছে। সংবিধান বাতিল বা পরিবর্তনের বিষয়ে তারা বরাবরই সতর্ক এবং সমালোচনামুখর।

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন আকস্মিকভাবে ‘জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র’ প্রকাশের ঘোষণা দিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোড়ন সৃষ্টি করে। শনিবার সামাজিক মাধ্যমে এই ঘোষণা আসার পর রবিবার সংবাদ সম্মেলনে হাসনাত আব্দুল্লাহ জানান, ঘোষণাপত্রে ১৯৭২ সালের সংবিধানকে “কবর দেওয়া” হবে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে এ উদ্যোগকে “ব্যক্তিগত উদ্যোগ” বলে উল্লেখ করা হয়।

বিএনপি তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। সোমবার রাতের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সভাপতিত্বে এই ইস্যু নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রধান উপদেষ্টার সাথে সাক্ষাৎ করে বিএনপির অবস্থান তুলে ধরেন। পরে সরকারের পক্ষ থেকে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে ঘোষণাপত্র তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়।

বৈষম্যবিরোধীরা দীর্ঘ আলোচনার পর ঘোষণাপত্র প্রকাশ স্থগিত করলেও শহীদ মিনারে সমাবেশ আয়োজন অব্যাহত রাখে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে ছাত্রদের এই উদ্যোগের পেছনে কারা উস্কানি দিচ্ছে এবং এর মাধ্যমে বর্তমান সরকারের ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার প্রচেষ্টা হচ্ছে কিনা, তা নিয়ে আলোচনা হয়। নেতারা মনে করেন, ঘোষণাপত্রের উদ্যোগ নির্বাচনের দাবিকে গুরুত্বহীন করার চেষ্টা হতে পারে।

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের আকস্মিক ‘জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র’ প্রকাশের ঘোষণা নিয়ে বিএনপির মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। দলটির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে নেতারা এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য ও অর্থের উৎস নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। অনেকেই মনে করেন, এটি নির্বাচনের সময় বিলম্বিত করার একটি প্রচেষ্টা এবং ক্ষমতায় থাকার সময় পেয়ে একটি নতুন রাজনৈতিক দল গোছানোর কৌশল হতে পারে।

বিএনপির নেতারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে বৈষম্যবিরোধীরা তাদের সমাবেশে বিএনপিসহ সব পক্ষকে উপস্থিত রেখে নিজেদের ‘কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা’ করতে চাইতে পারে। যদিও এ উদ্যোগে বিদেশি কোনো শক্তির সংশ্লিষ্টতা নেই বলে তারা মনে করেন, তবে দুটি দেশের জড়িত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। বৈঠকে অনেক নেতা মনে করেন, বৈষম্যবিরোধীরা ক্ষমতায় আসার লক্ষ্যে কাজ করছে এবং বর্তমান সরকারের সমর্থনে একটি নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলতে চাইছে। বিএনপি দ্রুততম সময়ে নির্বাচন দাবি করে আসলেও বৈষম্যবিরোধীরা এদিকে আগ্রহী নয় বলে মনে করছেন তারা।

সম্পাদক, দ্যা ক্যাম্পাস মিরর।

গুমের সাথে জড়িত আরও ২৪ কর্মকর্তার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা

0

ডেস্ক রিপোর্ট

গুমের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে ২৪ জন সরকারি কর্মকর্তার পাসপোর্ট স্থগিত করে তাদের দেশের বাইরে যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের দেওয়া চিঠির ভিত্তিতে এ নির্দেশনা কার্যকর করা হয়েছে।

বুধবার (১৮ ডিসেম্বর) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মো. কামরুজ্জামানের স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে এ আদেশ প্রদান করা হয়। আদেশে ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এবং পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) অতিরিক্ত আইজিপিকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, “গুম সংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারির অনুরোধ অনুযায়ী, দ্বিতীয় পর্যায়ে আরও ২৪ সরকারি কর্মকর্তার গুম সংক্রান্ত ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। তদন্তের প্রয়োজনে এই ব্যক্তিরা যাতে দেশ ত্যাগ করতে না পারেন, সে জন্য তাদের পাসপোর্ট স্থগিত করা হয়েছে এবং দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”

এর আগে, ১৫ ডিসেম্বর গুমের অভিযোগে আরও ২০ কর্মকর্তার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল।

আমার বক্তব্যের ‘অপব্যাখ্যা’ হয়েছে: বদিউল আলম মজুমদার

0

ডেস্ক রিপোর্ট।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ নিয়ে নিজের বক্তব্যের অপব্যাখ্যা হওয়া নিয়ে নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান বদিউল আলম মজুমদার মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, তার বক্তব্যের ভুল ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১৯ ডিসেম্বর) রাতে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে তিনি এই বিষয়টি তুলে ধরেন।

বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘আজ ১৯ ডিসেম্বর ২০২৪ তারিখে রংপুর জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের উদ্যোগে অংশীজনের সঙ্গে এক সফল সংলাপের পর স্থানীয় কিছু সাংবাদিক ভবিষ্যতের নির্বাচন সম্পর্কে আমার কাছে জানতে চান। আমি বলেছি যে আমাদের কমিশন সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় নির্বাচনী আইনকানুন ও বিধিবিধান সংস্কারের প্রস্তাব করবে। আমি আরও বলেছি, ভবিষ্যতে আইনকানুন মেনে প্রস্তুত হয়ে নির্বাচনে যারা অংশগ্রহণ করতে পারবে, তাদের ব্যাপারে আমি কোনো বাধা দেখছি না। এ ছাড়া এটি নির্বাচন কমিশনের বিষয়।’

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘এটি কারও অজানা নয় যে আইসিটি আইনে ইতোমধ্যেই অনেকগুলো মামলা হয়েছে। শেখ হাসিনাসহ অনেক আওয়ামী লীগ নেতার বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের নির্বাচন কার্যক্রম নি‍‍র্ভর করবে এসব মামলা সুরাহার ওপর। কিন্তু কিছু গণমাধ্যম আমার বক্তব্যের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে সংবাদ পরিবেশন করছে, যা অনাকঙ্ক্ষিত।’

বদিউল আলম মজুমদার আরও বলেন, ‘আমি স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই, বিপুলসংখ্যক ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগ ও প্রাণহানির বিনিময়ে গত ৫ আগস্ট এক গণ–অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়েছে। এ লক্ষ্যে কয়েক বছর ধরে আমি নানাভাবে ভূমিকা রেখেছি এবং এ জন্য নানাভাবে হেনস্তার স্বীকার হয়েছি। কিন্তু আমার বক্তব্যের ভুল ব্যাখ্যা প্রচার আমাকে ব্যথিত ও মর্মাহত করেছে। আমি মনে করি, এ ধরনের অপপ্রচার শহীদ আবু সাঈদ ও শহীদ মুগ্ধর রক্তকে অস্বীকার করার শামিল। 

মীর্যা গালিব ও ঢাবি প্রশাসন!

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) নিজ বিভাগে অনার্স-মাস্টার্সে প্রথম হওয়ার পরও মীর্যা গালিব শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাননি। সম্প্রতি একটি টকশোতে তিনি জানান, ভালো ফলাফলের কারণে তাকে নিয়োগ দেওয়ার চিন্তা না করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেনি।

জানা গেছে, রাজনৈতিক কারণে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তার শিক্ষক হওয়ার সুযোগ দেয়নি। এর ফলে মীর্যা গালিব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতে না পেরে যুক্তরাষ্ট্র চলে যান। সেখানে তিনি পিএইচডি শেষ করে শিক্ষকতায় যোগদান করেন। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে হাওয়ার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। মীর্যা গালিব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি ছিলেন এবং কেন্দ্রীয় কমিটিতেও দায়িত্ব পালন করেছেন।

টকশোতে মীর্যা গালিব বলেন, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার সময় খুবই ভালো কেটেছে। আমার সামনে দুটো অপশন ছিল—একটি ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করে বাইরে পিএইচডি করতে যাওয়া, আরেকটি ছিল একেবারে চলে যাওয়া। তবে রাজনৈতিক কারণে আমি যখন পাস করে বের হয়েছি, তখন তারা সার্কুলারই দেয়নি। আমি আবেদন করলেও রাজনৈতিক বিবেচনায় তারা আমাকে নিতে আগ্রহী ছিল না, কারণ তখন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসেছিল।”মীর্যা গালিব বলেন, “যখন আমি বুঝতে পারলাম নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব থাকতে পারে, তখন আমি বাইরে পিএইচডি করার জন্য আবেদন শুরু করি। আমার বিভাগের সংস্কৃতি ছিল, যে ছাত্র অনার্স ও মাস্টার্সে ভালো ফল করবে, তাকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে। সে অনুযায়ী, আমি আবেদন করলে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেতাম। কিন্তু তখনকার রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে নিতে আগ্রহী ছিল না। যখন আমি পিএইচডি শেষ করি, তখন দেশে গণতন্ত্র থেকে ফ্যাসিবাদে পরিবর্তন শুরু হয়েছিল, তাই আমি আর আবেদন করিনি।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসার সম্ভাবনা সম্পর্কে জানতে চাইলে মীর্যা গালিব বলেন, “আমার বিদেশে স্থায়ী হওয়ার কোনো ইচ্ছা ছিল না, এবং ফিরে আসার বিষয়টি সবসময়ই ছিল। এটা সম্ভাবনার মধ্যে রয়েছে, তবে এখনই ফিরব বলে কিছু ভাবছি না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার সময় খুবই ভালো কেটেছে।”

ইজতেমায় দুইপক্ষের সংঘর্ষ: সাদপন্থি নেতা গ্রেপ্তার

0

নিজস্ব প্রতিনিধি।

১৮ ডিসেম্বর রাত ৮টা থেকে গাজীপুরের টঙ্গীতে বিশ্ব ইজতেমার মাঠ দখলকে কেন্দ্র করে তাবলীগ জামায়াতের মাওলানা জুবায়ের এবং মাওলানা সাদপন্থীদের মধ্যে এক তীব্র সংঘর্ষ ঘটে। এই সংঘর্ষে চারজন নিহত ও পঞ্চাশাধিক মানুষ আহত হন, যাদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর।

সংঘর্ষের সূত্রপাত হয় ইজতেমা মাঠের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পক্ষে বিরোধের কারণে। গত কয়েক বছর ধরে তাবলীগ জামায়াতের দুই পক্ষ—জুবায়ের এবং সাদপন্থীদের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে। ইজতেমা মাঠের দখলকে কেন্দ্র করে এই সংঘর্ষের ঘটনাটি তাৎক্ষণিকভাবে এলাকায় ব্যাপক আতঙ্ক সৃষ্টি করে।

সংঘর্ষের পর, পুলিশ তদন্ত শুরু করে এবং ১৯ ডিসেম্বর রাতে রাজধানী ঢাকার উত্তরা এলাকা থেকে সাদপন্থি নেতা মুয়াজ বিন নূরকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারের পর, টঙ্গী পশ্চিম থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) ইস্কান্দর হাবিবুর রহমান গণমাধ্যমে জানান, “মুয়াজ বিন নূরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।”

তাবলীগ জামায়াতের এই সংঘর্ষের ঘটনা মূলত সংঘটিত হয়েছে দুটি পক্ষের মধ্যে ক্ষমতার লড়াইয়ের কারণে। তাবলীগ জামায়াতের বিশ্ব ইজতেমা, যা প্রতি বছর ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের একত্রিত করার এক বিশাল অনুষ্ঠান, সে কারণে মাঠের নিয়ন্ত্রণ অনেক গুরুত্বপূর্ণ। পুলিশ এবং স্থানীয় নেতারা এ ব্যাপারে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তারা শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য একযোগে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন।

চাঁদা না দেওয়ায় শাহবাগের দোকান বন্ধের হুমকি ছাত্রদল-যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের

0

নিজস্ব প্রতিনিধি

রাজধানীর শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটে চাঁদা দাবি করে না পাওয়ায় দোকান বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন স্থানীয় ছাত্রদল, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের কয়েকজন নেতাকর্মী। অভিযোগে বলা হয়েছে, এই ঘটনায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন শাহবাগ থানা ছাত্রদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মো. জাহিদুল ইসলাম।

অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, অভিযুক্তরা চাঁদা আদায়ের পরিবর্তে দোকান মালিককে “আওয়ামী লীগের পোস্টেড নেতা” আখ্যা দিয়ে দোকান পরিচালনা করতে বাধা দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন।

অভিযুক্ত ব্যক্তিরা হলেন: শাহবাগ থানা ছাত্রদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মো. জাহিদুল ইসলাম, যুগ্ম আহ্বায়ক ফেরদৌস, যুবদল থেকে বহিষ্কৃত নেতা শহিদুল ইসলাম খোকন, ২১ নম্বর ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মো. শাহ আলম, শাহবাগ থানা ছাত্রদলের কর্মী শিমুল, এবং স্বাধীন রেস্টুরেন্ট মালিক মো. নজরুল।জানা গেছে, গত শনিবার (১৪ ডিসেম্বর) রাতে শাহবাগের আজিজ কোঅপারেটিভ মেডিসিন মার্কেটের উত্তর পাশে অবস্থিত ‘বিসমিল্লাহ স্টোরে’ চাঁদা দাবি করেন স্থানীয় ছাত্রদল ও যুবদলের নেতাকর্মীরা। তারা দোকানের ভাড়া বাবদ মাসে ৪০-৫০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করেন এবং টাকা না দিলে দোকান তুলে দেওয়ার হুমকি দেন। চাঁদা না দেওয়ায় দোকানের মালামাল ফেলে দেন অভিযুক্তরা।

রবিবার (১৫ ডিসেম্বর) আসরের সময় ২১ নম্বর ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক শাহ আলম এবং মাগরিবের আগে যুবদল থেকে বহিষ্কৃত নেতা শহিদুল ইসলাম খোকন দোকানে এসে পুনরায় চাঁদা দাবি করেন। দোকান মালিক মো. রিপন তাদের থেকে সিদ্ধান্ত জানানোর জন্য দুইদিন সময় চান। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, শনিবার রাতে অভিযুক্তরা দোকানের সামনে ভিড় করছেন এবং দোকানের মালামাল ফেলে দিচ্ছেন।

ভুক্তভোগী মো. রিপন জানান, “শনিবার রাতে আমি দোকান থেকে চলে যাওয়ার পর স্থানীয় ছাত্রদলের নেতারা ১৫-২০ জনকে নিয়ে আমার দোকানে আসে। আমার চারজন কর্মচারী তখন দোকানে ছিল। তারা মাসে ৪০-৫০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করে এবং চাঁদা না দিলে দোকান বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেয়। পরে তারা দোকানের মালপত্র নিচে ফেলে দেয়।”

তিনি আরও বলেন, “রবিবার আসরের সময় শাহ আলম টাকা নিতে আসেন। এরপর মাগরিবের আগে খোকন ভাই পোলাপান নিয়ে এসে চাঁদার বিষয়ে কথা বলে। আমি তাদের দুইদিন সময় চাই।”ভাড়া কার হাতে পৌঁছতে হবে জানতে চাইলে দোকান মালিক মো. রিপন বলেন, “তারা প্রতি মাসে আসবে টাকা নিয়ে যেতে। আলাদাভাবে কার হাতে টাকা দিতে হবে তা আমাকে বলা হয়নি।”

অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে শাহবাগ থানা ছাত্রদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, “আমরা সেখানে গিয়েছিলাম ফুটপাথের দোকান তুলে দিতে। দোকানের মালিক সাদ্দাম যুবলীগ করে, তাই সে এখানে দোকান রাখতে পারবে না। আগে মার্কেটে ছাত্রলীগ ছিল, এখন তাদেরকে উঠিয়ে দেওয়া হবে। সেখানে টাকাপয়সা নিয়ে কোনো কথা হয়নি। আমাদের সিনিয়র আছে, আপনি তাদের সাথে কথা বলেন।”

২১ নম্বর ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মো. শাহ আলম বলেন, “আমরা সেই দোকানে কোনো চাঁদা নিতে যাইনি। দোকানের মালিক আওয়ামী লীগের পোস্টেড নেতা। আন্দোলনের সময় সে অনেককে আহত ও নিহত করেছে। পরবর্তীতে দোকান কাকে দেওয়া হবে সেটা দেখার বিষয় নয়, তার দোকান সেখানে থাকবে না, তুলে দিতে হবে।” তবে তিনি দোকান মালিকের আওয়ামী লীগের পদের সংশ্লিষ্টতা এবং হামলার ডকুমেন্টস দিতে রাজি হননি।

বিজয়ের অঙ্গিকার চব্বিশের দ্রোহে।

২০২৪ সালের ১৬ই ডিসেম্বর আমাদের বিজয়ের ৫৩ বছর পূর্ণ হবে। ১৯৭১ সালের এই দিনে, লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে। ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম শেষে, ১৬ই ডিসেম্বর পৃথিবীর বুকে নতুন একটি দেশ জন্ম নেয়-বাংলাদেশ। এক নতুন সূর্য উকি দেয়, নতুন স্বপ্নের আহ্বান আসে। আজ, যখন আমরা অতীতের অর্জন এবং অপ্রাপ্তি নিয়ে ফিরে তাকাই, তখন আমাদের সামনে উন্মোচিত হয় অনেক প্রশ্ন। আমরা কতটা এগিয়েছি এবং কোথায় পৌঁছেছি? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে গিয়ে, আমাদের অনেক কিছু নতুন করে ভাবতে হবে। বিজয় দিবস বাঙালি জাতির শৌর্যবীর্যের এক অনন্য নিদর্শন। এটি কেবল একটি জাতির বীরত্বের ঘোষণা নয়, বরং বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশ নামে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের দিন।

২৪ এর জুলাই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ তার নিজস্ব ইতিহাসের এমন এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে, যেখানে পৃথিবীর ইতিহাসে ইতোপূর্বে ঘটে যাওয়া বহু তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপট, পরিণতি ও অর্জনের ঘটনাগুলো বিচার-বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখতে পাই, যেকোনো ন্যায়ভিত্তিক যৌক্তিক রাজনৈতিক আন্দোলন সাফল্য অর্জন করেছে, কখনো ব্যর্থ হয়নি। এসব আন্দোলন-সংগ্রামের প্রকৃতি ও আদর্শগত অবস্থানের মধ্যে ভিন্নতা থাকলেও অবৈধ দখলদারী স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে এগুলো সর্বদাই বিজয়লাভ করেছে। বিশ্বের প্রাচীন ইতিহাসেও স্বৈরশাসকদের বিরুদ্ধে বারবার বিদ্রোহ ঘোষিত হয়েছে। কোথাও বিদ্রোহ সফল হয়েছে, কোথাও আবার ব্যর্থ হয়েছে। সাফল্য ও ব্যর্থতার ধারাবাহিকতায় আমরা দেখেছি আধুনিককালে কোনো স্বৈরশাসকই গণ-অভ্যুথানের প্রবল প্রতিরোধের মুখে তার মসনদ রক্ষা করতে পারেনি।

১৯৪৭ সালে ভারতীয় উপমহাদেশ বিভক্ত হয়ে পাকিস্তান ও ভারত নামক দুটি রাষ্ট্রের জন্ম হলেও পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিরা থেকে যায় শাসিত ও শোষিত। এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে বাঙালির অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম শুরু হয় ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে। ২১শে ফেব্রুয়ারি বাঙালির আত্মত্যাগের সেই অধ্যায় আজও বিশ্বকে মুগ্ধ করে।

এরপর আসে ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, এবং ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনের বিজয়। এই ধারাবাহিকতার চূড়ান্ত পরিণতি ছিল ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালায়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করা হয়। এই ঘটনার পর বাঙালিরা সংগঠিত হয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল আতাউল গনি ওসমানীর নেতৃত্বে বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করে মুক্তিবাহিনী গঠন করা হয়। ছাত্র-জনতা, পুলিশ, ইপিআর, আনসারসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ এই বাহিনীতে যোগ দেয়। মুক্তিবাহিনী গেরিলা যুদ্ধের কৌশলে পাক সেনাবাহিনীকে চরম বিপর্যস্ত করে তোলে। যুদ্ধের সময় বাঙালিরা শরণার্থী হিসেবে ভারতে আশ্রয় নেয়। সেখানে তারা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে। দিনে দিনে মুক্তিবাহিনী শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং শত্রুদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। পাক বাহিনী উন্নত অস্ত্রশস্ত্র ও প্রশিক্ষণ নিয়েও বাঙালির সম্মুখযুদ্ধে টিকতে পারেনি।

অবশেষে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ বিজয় অর্জন করে। এটি কেবল একটি যুদ্ধের সমাপ্তি নয়, বরং একটি জাতির শৃঙ্খল মুক্তির জয়গান। বিজয় দিবসের তাৎপর‍্য কেবল অতীতের গৌরব নয়; এটি একটি জাতির অহংকার এবং ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা।

১৯৭১ সালের পর থেকে বাংলাদেশের অনেক ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে। ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে এটি খুব বেশি দীর্ঘ সময় না হলেও একটি জাতির উন্নয়ন-অগ্রগতির জন্য একেবারে কম নয়। স্বভাবতই প্রশ্ন আসে, যে লক্ষ্য ও আদর্শকে সামনে রেখে আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম, সেই লক্ষ্য ও আদর্শ কতটা অর্জিত হয়েছে? রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, স্বাধীনতার প্রধান আকাঙ্ক্ষা ছিল সব ধরনের অধীনতা থেকে মুক্তি এবং সমাজে গণতন্ত্র, ন্যায় ও সমতা প্রতিষ্ঠা। সব নাগরিকের মৌলিক চাহিদা ও মানবাধিকার নিশ্চিত করতে বাহাত্তরের সংবিধানে জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে মৌলিক নীতি হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু আমরা সেখানে কি স্থির থাকতে পেরেছি? কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ আর্থসামাজিক সূচকে আমরা অনেক এগিয়ে গেলেও রাজনৈতিক আদর্শ অর্জন ও অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে আমরা কি পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে পেরেছি?

৫৩ বছরে আমাদের অর্থনৈতিক অর্জন বেশ মলিন। ২০১৫ সালে যখন আমরা নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছি, তখনও আমাদের সবগুলো দিকের উন্নতির সূচনা ঘটে। যদিও বর্তমানে মাথাপিছু আয় ১,৯০৯ ডলার, আমরা এখনো বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে কম উন্নত দেশগুলোর মধ্যে আছি। সমাজের প্রায় অর্ধেক মানুষ এখনও দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে এবং দেশের অধিকাংশ নাগরিক মৌলিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। দুর্নীতি, ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ, চিকিৎসা সেবা, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা-এই সমস্ত সমস্যা আমাদের উন্নতির পথে বাধা সৃষ্টি করছে।

আমদের স্বাধীনতা ও বিজয় সহজলভ্য হয়নি। আমাদের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে নানাবিধ ঘটনাপ্রবাহ ও চেতনাকে ধারণ করে। যেসব কারণে আমরা পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়ি এবং সে অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য মুক্তিসংগ্রামে অবতীর্ণ হই-মূলত সেগুলোয় হচ্ছে স্বাধীনতা বা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। কিন্তু আমাদের ক্ষয়িষ্ণু ও গন্তব্যহীন রাজনীতির কারণেই এতে বিচ্যুতি ঘটেছে। এখন শ্রেণি বিশেষের স্বার্থ রক্ষার অনুষঙ্গগুলোকে স্বাধীনতা বা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সাথে একাকার করে ফেলা হয়েছে। যা আমাদের মহান বিজয়ের অর্জনগুলোকে ম্লান করে দিচ্ছে।

এছাড়া, বিশ্বের অন্যান্য উন্নত দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের অগ্রগতি অনেক কম। দারিদ্র্য, অশিক্ষা, এবং অপর‍্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা অনেক সময় আমাদের অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দেয়। আমাদের দেশ এখনও উপযুক্ত পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়ন ছাড়াই এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশকে আরও অনেক দূর যেতে হবে, এবং এজন্য সমন্বিত ও সুসংহত উদ্যোগের প্রয়োজন।

যতদিন না আমরা সমাজের প্রতিটি স্তরে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারব, ততদিন আমাদের অর্থনীতি এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম সঠিকভাবে চলবে না। প্রতিনিয়ত খবর আসে, কোটি কোটি টাকা পাচার হয়েছে দেশের বাইরে। দুর্নীতি সমাজের প্রতিটি স্তরে একটি স্থায়ী রূপ ধারণ করেছে। ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ এক লাখ কোটিরও বেশি, যা আমাদের অর্থনীতি এবং দেশের ভবিষ্যতকে ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছে।

যদিও আমরা মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই, তবুও তাদের স্মৃতির সংরক্ষণে যথেষ্ট উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ত্রিশ লাখ শহীদের নাম তালিকাভুক্ত করা, তাদের স্মৃতি রক্ষায় জাদুঘর তৈরি করা, এবং তাদের জন্য ভাতা চালু করার দাবি এখন একান্ত জরুরি। এই শহীদরা নিজেদের জীবন দিয়ে আমাদের স্বাধীনতা এনেছেন-তাদের অবদান কখনো ভুলে যাওয়া উচিত নয়।

আজ, আমরা যখন ৫৩ বছরের পথচলা মূল্যায়ন করি, তখন অবশ্যই মনে রাখতে হবে, আগামীর পথচলা আরও কঠিন হবে। আমাদের সামনে অনেক বড় চ্যালেঞ্জ-বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা, জলবায়ু পরিবর্তন, সামাজিক অসাম্য, এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা। তবে আমাদের এগিয়ে যাওয়ার একমাত্র উপায় হল, আমরা যদি একে অপরের পাশে দাঁড়িয়ে কাজ করি, তবে আমাদের দেশ কখনও থেমে থাকবে না।

এখন সময় এসেছে, আমরা সবাই একযোগে কাজ করি। আমাদের সমাজে প্রতিটি নাগরিককে তাদের সম্পদে পরিণত করতে হবে। বিদেশে কর্মরত আমাদের শ্রমিকরা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। তাদের উন্নয়নে মনোযোগ দিলে, দেশ আরও সমৃদ্ধ হবে। ২০২৪ সালের জুলাই মাস এবং আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহজুড়ে ছাত্র-জন-তার অভূতপূর্ব ও অভূতশ্রুত গণ-আন্দোলন আমার পূর্বঘে-াষিত প্রত্যাশাকে বাস্তবে রূপদান করেছে। গণ-আন্দোলনেই যে হাসিনার স্বৈরতন্ত্রের ঐতিহাসিক পতন হবে এ বিষয়ে আমি পূর্বেই সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করি। একই সঙ্গে আমি এ কথাও গভীরভাবে বিশ্বাস করেছিলাম যে, উদীয়মান তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বিকশিত নবজাগরণের বা রেনেসাঁর উন্মেষ থেকেই নবপর্যায়ের একটি গণ-আন্দোলনের সূচনা হবে।

বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি কিছুটা সংকটে রয়েছে। ২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচন এবং এর পরবর্তী অবস্থা আমাদের চিন্তার জন্য বড় কারণ। গণতন্ত্রের মূল স্তম্ভ-অংশীদারিত এবং বিরোধী দলের অংশগ্রহণ-আজ প্রায় বিলুপ্ত। আমরা একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, মানবাধিক-ার এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করার জন্য ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।

তবে, স্বাধীনতার ৫৩ বছরে, আমরা যদি নিজেদের ভুলগু-ি লকে সংশোধন না করি, তবে ভবিষ্যতে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না। আমাদের নিজস্ব স্রষ্টি শক্তি-জনগণ-যদি তাদের শক্তি কাজে লাগায়, তবে এই দেশের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন একদিন আসবেই। আমাদের অভ্যন্তরীণ ঐক্য, সুশাসন, এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম বাংলাদেশকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবে। ২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশের সব দিগন্তে এক নতুন সূর্য উঠেছে, এসেছে এক আশ্চর্য্য নতুন প্রভাত উদ্ভাসিত এ সূর্যের প্রতিটি আলোকবিন্দুতে আমি দেখতে পাচ্ছি রেনেসাঁর দ্যুতি।

কেননা, একমাত্র রেনেসাঁ মুক্তির পথ দেখাতে পারে। সর্বকালে সব দেশে রেনেসাঁর মতো উন্মেষ নাও ঘটতে পারে। নিজের দেশের বাস্তবতায় সে দেশের জনগণ মুক্তির পথ খুঁজে নিবে। বাংলাদেশের জনগণ তাদের আর্থ-সাম-াজিক, রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক বিন্যাস ও পটভূমির আলোকেই আজ এক নতুন রেনেসাঁর জন্ম দিয়েছে। আমার বহু প্রত্যাশিত এ রেনেসাঁ ইউরোপের মতো নয়;চরিত্রগতভাবে এ রেনেসাঁ শুধু বুদ্ধিবৃত্তিক চেতনার ক্ষুরধার দিয়ে ইহলৌকিকতার জয়গান নয়, এ রেনেসাঁ জাতীয় মুক্তির চেতনায় আলোকিত একটি বৈষম্যহীন গণতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার রেনেসাঁ। এ নবউন্মেষ ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধের এক সম্মিলিত অঙ্গীকার। এ নবজাগরণ একটি জাতিকে নব উদ্বোধনের চালিকাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। আমার বহুলালিত এ রেনেসাঁ বাংলাদেশের সামগ্রিক জাতীয় চেতনা, আবেগ ও প্রত্যাশার এক উজ্জ্বল অগ্রদূত।

এ দেশের ছাত্রসমাজ এ রেনেসাঁর জন্ম দিয়েছে। তারা সম্পূর্ণরূপে বদলে দিয়েছেন রেনেসাঁর চিরাচরিত ধারণা। তারা ভাবমানসের অতীন্দ্রিয় কুহক থেকে রেনেসাঁকে সরিয়ে এনেছেন স্বৈরতন্ত্রের পতনের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রের মুক্তি। তারা মহামতি কাল মার্কসের সেই অমর বাক্যের মূর্তরূপ দিয়েছেন বাংলাদেশে। Philosophers have hitherto interpreted history, now the task is to change it. বাংলাদেশের ছাত্রসমাজ মার্কসের গভীর প্রত্যাশাকে আজ পূর্ণ করেছে। তারা আবদ্ধ কক্ষের গ্রন্থঠাসা আলো-আঁধারিতে বসে বাংলাদেশকে তথ্য ও তত্ত্বের সারণী ও সিদ্ধান্ত নিয়ে মস্তিষ্ক উত্তপ্ত করেননি; তারা গণমানুষের মুক্তি ও স্বাধীনতার সংগ্রামে সেনানায়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। মার্কস ‘পরিবর্তনের’ যে আশার কথা শুনতে চেয়েছিলেন, বাংলাদেশের ছাত্রসমাজ সমগ্র দেশবাসীকে সঙ্গে নিয়ে সেই আশা পূর্ণ করেছেন। ছাত্র-জনতা পরিণত হয়েছে সংগ্রামরত গণদার্শনিকে।

আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত, স্বাধীনতার পর থেকে আমাদের সাথে সহযোগিতা করেছে, তবে কিছু ক্ষেত্রে বিরোধও রয়েছে। ফারাক্কা বাঁধ, তিস্তা পানি সমস্যা, বিএসএফ-এর কর্মকাণ্ড-এই সব বিষয়গুলোতে আমাদের একে অপরের পাশে দাঁড়ানো দরকার। ভারতের সাথে আমাদের সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ, তবে তাতে সমতা থাকতে হবে। আমাদের স্বার্থ রক্ষা করেই তাদের সহযোগিতা নিতে হবে।

আজকের এই দিন, যখন আমরা ৫৩ বছর পর নিজেদের অর্জন ও অপ্রাপ্তি মূল্যায়ন করি, তখন আমাদের সবাইকে একটি কথা মনে রাখতে হবে: একমাত্র ঐক্যবদ্ধ জাতি অর্থবহ হতে পারে। যেখানে আজকে আমাদের সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে, প্রতিবেশী রাষ্ট্রের চোখরাঙানি, পালিয়ে যাওয়া ফ্যাসিবাদের চক্রান্ত হুক্কাহুয়ায় চারিদিকে শোরগোল। সেখানে আমরা হাত পা গুটিয়ে বসে থাকতে পারিনা, আমাদেরকে কূটনৈতিক এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। আমাদেরকে নিজের ঐতিহ্য, স্বাধীনতা এবং জনগণের স্বার্থ রক্ষা করে এগিয়ে যেতে হবে। আমাদের দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের স্থায়িত্বের জন্য একত্রে কাজ করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ একটি উন্নত, শান্তিপূর্ণ, এবং সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত হয়।

-লেখক 

সহকারী সম্পাদক, দ্যা ক্যাম্পাস মিরর 

শিক্ষার্থী, স্থাপত্য বিভাগ, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ।

মাই নেম ইজ রেড

সাদী মোহাম্মদ সাদ

নোবেল বিজয়ী তুর্কি সাহিত্যিক ওরহান পামুক বিশ্ব সাহিত্যে এক অনন্য নাম। তিনি একজন বিশিষ্ট ঔপন্যাসিক, চিত্রনাট্য সম্পাদক এবং শিক্ষক। ২০০৬ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভের পর তার খ্যাতি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে, যদিও মূলধারার পাঠকদের কাছে তিনি তার লেখালেখির শুরু থেকেই পরিচিত। বর্তমান সময়ে অন্যতম জনপ্রিয় এই লেখকের বই প্রায় ৬০টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে ১ কোটি ১০ লক্ষেরও বেশি কপি বিক্রি হয়েছে।

ওরহান পামুকের সাহিত্য শুধু পাঠকের হৃদয় জয় করেনি, বরং দেশ-বিদেশে বহু পুরস্কারও অর্জন করেছে। তুরস্কের ইতিহাসে তিনি অন্যতম জনপ্রিয় এবং সর্বাধিক পুরস্কৃত লেখকদের একজন হিসেবে বিবেচিত হন।

১৯৭৪ সালে লেখালেখির পথচলা শুরু করা পামুক ছাত্রজীবনে প্রথমে ইঞ্জিনিয়ারিং অধ্যয়ন করলেও পরে তা ছেড়ে দিয়ে সাংবাদিকতায় স্নাতক সম্পন্ন করেন। তার লেখা প্রতিটি উপন্যাসই বিপুল পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে। তবে নতুন বই প্রকাশের জন্য পাঠকদের দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হয়, কারণ তিনি বারবার সম্পাদনায় বিশ্বাসী। প্রতিটি উপন্যাস লেখার পর পামুক সেটি বহুবার সম্পাদনা করেন, ফলে তার নতুন গ্রন্থ প্রকাশের সময় তুলনামূলক দীর্ঘ হয়।

ওরহান পামুকের উপন্যাস ‘মাই নেম ইজ রেড’ তার শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকর্মগুলোর মধ্যে অন্যতম। উপন্যাসটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৯৮ সালে তুরস্কে এবং ২০০১ সালে ইংরেজি ভাষায় অনূদিত হয়। এটি শুধুমাত্র একটি উপন্যাস নয়; এটি একটি ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক এবং মানবিক অভিজ্ঞতার বিস্তৃত চিত্র। ষোড়শ শতাব্দীর শেষ ভাগে অটোম্যান সাম্রাজ্যের প্রেক্ষাপটে রচিত এই উপন্যাসে পামুক এমন এক পৃথিবীর কথা বলেন, যেখানে শিল্প, ধর্ম, রাজনীতি এবং ভালোবাসা গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।

‘মাই নেম ইজ রেড’ এর কাহিনি শুরু হয় একটি চিত্রশিল্পীর মৃত্যু দিয়ে। এই চিত্রশিল্পী একটি কুয়োর তলায় পড়ে রয়েছে, আর তার মৃত দেহ থেকেই গল্পের সূচনা। খুনী কে, সে কেন এই হত্যাকাণ্ড ঘটালো এবং এর সাথে সাম্রাজ্য ও চিত্রকলার ঐতিহ্য কীভাবে সম্পর্কিত, এই প্রশ্নের উত্তরই গল্পটির প্রধান চালিকা শক্তি হয়ে ওঠে। পুরো উপন্যাসটি বিভিন্ন চরিত্রের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বর্ণিত হয়েছে। মোট ৫৯টি অধ্যায়ে প্রত্যেক চরিত্র নিজের বয়ানে গল্পের অংশ তুলে ধরে। চিত্রশিল্পী, খুনী, সুলতান, একটি গাছ, এমনকি একটি লাল রঙও এই উপন্যাসে কথা বলে, যেমন গাছটি বলে, “আমি একে একে সবকিছু দেখেছি, কিন্তু আমার একদিনই অনুভব হয়েছে, আমি শুধু একজন শিল্পীর জন্যই জন্মেছি।”। এই স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গিগুলো উপন্যাসকে অসাধারণ একটি শৈল্পিক কাঠামো দেয়।

অটোম্যান সাম্রাজ্যের সুলতান তার জীবন এবং রাজত্বকাল সম্পর্কে একটি সচিত্র পাণ্ডুলিপি তৈরি করার আদেশ দেন। এর জন্য নিযুক্ত হয় সুলতানের সেরা চিত্রশিল্পীরা। কিন্তু কাজটি সহজ ছিল না। তাদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব প্রকট হয়, কারণ তাদেরকে মধ্যপ্রাচ্যের ঐতিহ্যবাহী অনুচিত্র শিল্পের নিয়ম থেকে সরে এসে ইউরোপীয় শৈলীতে কাজ করতে হয়। এই সাংস্কৃতিক সংঘাত শিল্পীদের মধ্যে গভীর ফাটল তৈরি করে। সেই সঙ্গে চিত্রশিল্পীদের একটি অংশ উগ্রপন্থীদের দ্বারা চিত্রকলার বিরুদ্ধে ধর্মীয় ফতোয়ার মুখোমুখি হয়। 

উপন্যাসে লাল রঙের ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন। চিত্রশিল্পীরা যখন তাদের আঁকা ছবিতে লাল রঙ ব্যবহার করে, তখন তা শুধু একটি রঙ নয়, বরং তাদের জীবনের এবং তাদের পৃথিবীর একটি গভীর প্রতীক হয়ে ওঠে। লাল রঙের মাধ্যমে শিল্পীরা তাদের নিজস্ব আবেগ, খুনের প্রতিশোধ এবং সাংস্কৃতিক সংগ্রামের কথা ব্যক্ত করেন। রঙটি কেবল একটি চিত্রের অংশ নয়, বরং পুরো উপন্যাসের কেন্দ্রীয় থিমেরও প্রতীক।

এই সংকটের মাঝেই একজন চিত্রশিল্পীর খুন হওয়া পুরো গল্পের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। খুনী কে তা জানতে হলে পাঠককে অপেক্ষা করতে হয় উপন্যাসের শেষ পর্যন্ত। এর মধ্যে উঠে আসে সুলতানের দরবারের রাজনীতি, শিল্পকলার ঐতিহ্য রক্ষার সংগ্রাম, এবং মানুষের অন্তর্দ্বন্দ্ব। এছাড়া বইয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রেম। একজন প্রাক্তন প্রেমিক, যিনি বারো বছর পর ইস্তাম্বুলে ফিরে আসেন, তার জীবনে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনা, তার প্রেমিকাকে ফিরে পাওয়ার লড়াই এবং তার বাবা হত্যার রহস্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা পুরো গল্পে একটি আবেগময় প্রেক্ষাপট তৈরি করে।

উপন্যাসের শৈল্পিক উপস্থাপনায় শুধু রহস্য বা প্রেম নয়, বরং সম্পর্ক, ঈর্ষা, ধর্মীয় মতবাদ এবং সাংস্কৃতিক সংঘাত অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে চিত্রিত হয়েছে। প্রতিটি চরিত্র তাদের নিজস্ব চিন্তা ও আবেগের মাধ্যমে একটি বৃহৎ গল্পের অংশ হয়ে ওঠে। উপন্যাসটি কেবল পাঠকের কাছে একটি চমৎকার গল্প নয়, বরং তাদের ভাবনার গভীরে প্রবেশ করার সুযোগ দেয়।

‘মাই নেম ইজ রেড’ এর শৈল্পিক বর্ণনা এবং কাহিনির জটিলতায় পাঠককে পুরোপুরি মুগ্ধ করে। উপন্যাসটি রহস্য এবং ইতিহাসের মিশেলে একটি অমর সাহিত্যকর্ম হিসেবে বিশ্বজুড়ে সাহিত্যপ্রেমীদের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে। দ্য গার্ডিয়ান, নিউ ইয়র্ক টাইমসসহ বিশ্বের প্রায় প্রতিটি বড় পত্রিকায় এই উপন্যাস প্রশংসিত হয়েছে। সত্যিই এটি একটি কালজয়ী উপন্যাস, যা সাহিত্যের গভীরতা এবং সৌন্দর্যকে নতুনভাবে চিনিয়ে দেয়।

শিক্ষার্থী,

স্থাপত্য বিভাগ, স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি।