অনলাইন ডেস্ক
জাতির উদ্দেশে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ভাষণে ঘোষিত জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে আয়োজনের সিদ্ধান্তের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটি বলেছে, এই ঘোষণা জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করেনি এবং এর ফলে নতুন একটি সংকট তৈরি হতে পারে।
আজ বৃহস্পতিবার (১৩ নভেম্বর) দুপুরে রাজধানীতে সংবাদ সম্মেলন করে এ প্রতিক্রিয়া জানায় জামায়াতে ইসলামী। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।
জামায়াতের প্রতিক্রিয়া: ‘আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়নি’
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, “একই দিনে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনের ঘোষণা জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করেনি। আমরা মনে করি, এতে একটি নতুন সংকট সৃষ্টি হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ সমমনা আটটি দল দাবি করে আসছে যে গণভোটটি জাতীয় নির্বাচনের আগে অনুষ্ঠিত হওয়া উচিত। তাহলে এর আইনি ভিত্তি সুদৃঢ় হবে এবং পরবর্তীকালে আদালতে এটি নিয়ে প্রশ্ন উঠবে না। সেই সংকট কিন্তু এখনো রয়ে গেল।”
জামায়াতের মতে, গণভোটকে জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে মিলিয়ে আয়োজন করার সিদ্ধান্তের ফলে রাজনৈতিক প্রক্রিয়া অনাকাঙ্ক্ষিভাবে জটিল হতে পারে। দলটি বলে, গণভোট যেহেতু সংবিধান সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে, তাই তা আলাদা দিনে আয়োজন করলে জনগণও বিষয়টি আরও পরিষ্কারভাবে উপলব্ধি করতে পারত।
প্রধান উপদেষ্টার ঘোষণা: ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধেই নির্বাচন ও গণভোট
এর আগে বৃহস্পতিবার দুপুরে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ঘোষণা দেন যে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে অনুষ্ঠিত হবে।
তিনি বলেন, “আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনে গণভোটের আয়োজন করা হবে। অর্থাৎ জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে মিলিয়ে ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে একই দিনে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। এতে কোনোভাবেই সংস্কারের লক্ষ্য ব্যাহত হবে না। বরং নির্বাচন আরও উৎসবমুখর ও সাশ্রয়ী হবে।”
প্রধান উপদেষ্টা আরও জানান, গণভোট আয়োজনের জন্য প্রয়োজনীয় আইন যথাসময়ে প্রণয়ন করা হবে।
৩০ দফা সংস্কারে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত
ভাষণে ড. ইউনূস বলেন, গত নয় মাস ধরে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপ করেছে। সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ ৩০টি বিষয়ে দলগুলো ঐকমত্যে পৌঁছেছে, যা দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য ‘আশাব্যঞ্জক’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, “জুলাই সনদের আলোকে আমরা গণভোটের ব্যালটে উপস্থাপনীয় প্রশ্নও চূড়ান্ত করেছি।”
ব্যালটে থাকবে একটি মাত্র প্রশ্ন:
আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং জুলাই সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলোর প্রতি আপনার সম্মতি দেন?
যেসব প্রস্তাবে ভোট নেওয়া হবে
গণভোটের ব্যালটে চারটি মূল প্রস্তাব থাকবে-
ক) তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদ অনুযায়ী গঠন
খ) দলগুলোর ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্যের উচ্চকক্ষসহ দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ
গ) নারীর রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও কমিটির সভাপতি নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ-সীমা নির্ধারণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণসহ ৩০ দফা সংস্কার
ঘ) বাকি সংস্কারসমূহ রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বাস্তবায়ন
প্রধান উপদেষ্টা জানান, গণভোটের দিন ভোটাররা এই চার প্রস্তাবের ওপর ভিত্তি করে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ দিয়ে মতামত জানাবেন।
গেজেটে প্রকাশিত আদেশ
উল্লেখ্য, আজই আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগ থেকে ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ–২০২৫’ গেজেট প্রকাশ করা হয়। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এতে স্বাক্ষর করেন।
এর আগে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন ২৮ অক্টোবর অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে দুটি বিকল্প সুপারিশ জমা দেয়। গত ১৭ অক্টোবর বিএনপি, জামায়াতসহ ২৪টি রাজনৈতিক দল জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় বহুল প্রত্যাশিত জুলাই সনদে স্বাক্ষর করে।
