১২৫ বার পেছাল সাগর-রুনি হত্যা মামলার প্রতিবেদন দাখিল

ডেস্ক রিপোর্ট: সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ আবারও পিছিয়েছে। এ নিয়ে মোট ১২৫ বার পেছানো হলো বহুল আলোচিত এই মামলার প্রতিবেদন জমা দেওয়ার দিন। বুধবার আদালত নতুন করে আরেকটি তারিখ নির্ধারণ করেছেন। তদন্ত সংস্থা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় আদালত এই সিদ্ধান্ত নেন। ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারে নিজ বাসা থেকে সাগর-রুনির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এখনো রহস্য উদ্ঘাটন হয়নি, যা নিয়ে পরিবার, সহকর্মী এবং গণমাধ্যমকর্মীদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। প্রতিবারের মতো এবারও তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলে বিলম্ব হওয়ায় ন্যায়বিচার নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, দ্রুত তদন্ত শেষ করে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত ও শাস্তির আওতায় আনা হোক। এদিকে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, মামলাটি জটিল হওয়ায় তদন্তে সময় লাগছে। তবে দীর্ঘসূত্রিতার কারণে মামলাটির অগ্রগতি নিয়ে সাধারণ মানুষের আস্থাও ক্রমশ কমে যাচ্ছে।

স্কুল পর্যায়ে অনলাইন ক্লাস কি আদৌ প্রয়োজন?

  সামিউল ইসলাম : বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে স্কুল পর্যায়ে অনলাইন ক্লাস কতটা উপযোগী,এই প্রশ্নের উত্তরে সংক্ষেপে বলা যায়, বর্তমান বাস্তবতায় এটি খুব বেশি কার্যকর নয়। বিষয়টি কেবল প্রযুক্তির প্রাপ্যতার ওপর নির্ভর করে না; বরং সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানসিক নানা দিক এর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। প্রথমত, বাংলাদেশের অধিকাংশ শিক্ষার্থী এখনো ডিজিটাল সুবিধার বাইরে রয়েছে। গ্রামাঞ্চলসহ দেশের বহু অঞ্চলে প্রায় ৮০–৯০ শতাংশ শিক্ষার্থীর নিজস্ব স্মার্টফোন বা উপযুক্ত ডিভাইস নেই। ফলে অনলাইন ক্লাস চালু করা হলে একটি বড় অংশ স্বাভাবিকভাবেই বঞ্চিত হবে। এতে শিক্ষায় বৈষম্য আরও বৃদ্ধি পাবে, যা একটি ন্যায়ভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য মোটেও কাম্য নয়। দ্বিতীয়ত, যেসব শিক্ষার্থীর হাতে মোবাইল আছে, তাদের ক্ষেত্রেও অনলাইন ক্লাসের সুফল সবসময় পাওয়া যায় না। বাস্তবে দেখা যায়, অনেক শিক্ষার্থী শিক্ষামূলক কনটেন্টের চেয়ে বেশি সময় ব্যয় করে টিকটক, ফেসবুক, ইউটিউবসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এর ফলে তারা ধীরে ধীরে মোবাইল আসক্ত হয়ে পড়ছে। রাত জেগে অনলাইন আড্ডা দেওয়া, গেম খেলা বা বিনোদনে সময় কাটানো তাদের দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত হচ্ছে, যা তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তৃতীয়ত, কিশোর-কিশোরীদের জন্য অনলাইন জগত নানা ঝুঁকিও তৈরি করছে। অনেক সময় তারা অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে বন্ধুত্ব করে ব্যক্তিগত তথ্য বা ছবি শেয়ার করছে। এর ফলে ব্ল্যাকমেইল, হয়রানি বা আর্থিক প্রতারণার মতো ঘটনাও ঘটছে। কিছু ক্ষেত্রে মানসিক চাপে পড়ে তারা ভয়ংকর সিদ্ধান্তও নিয়ে ফেলছে। মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের মধ্যে এ প্রবণতা তুলনামূলক বেশি লক্ষ্য করা যায়, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। চতুর্থত, করোনা মহামারির সময় আমরা অনলাইন শিক্ষার একটি বাস্তব অভিজ্ঞতা পেয়েছি। তখন অনেক শিক্ষার্থীর হাতে মোবাইল দেওয়া হলেও তাদের একটি বড় অংশ সেটির সঠিক ব্যবহার করেনি। বরং তারা রাতজাগা অভ্যাসে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে, দিনের বেলায় ঘুমিয়ে থাকে এবং পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। তাদের আচরণ ও জীবনযাপনে যে পরিবর্তন দেখা গেছে, তার প্রভাব এখনো অনেক ক্ষেত্রে রয়ে গেছে। সবশেষে বলা যায়, শুধুমাত্র প্রযুক্তিনির্ভর সমাধান দিয়ে শিক্ষার মান উন্নয়ন সম্ভব নয়। বরং শিক্ষার্থীদের বয়স, মানসিকতা ও সামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা জরুরি। অনলাইন ক্লাসকে পুরোপুরি বাতিল না করে এটি সহায়ক পদ্ধতি হিসেবে সীমিতভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে, তবে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে সরাসরি শ্রেণিকক্ষভিত্তিক শিক্ষাই অধিক কার্যকর। অতএব, সরকারকে এ বিষয়ে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে অতীতের ভুলের পুনরাবৃত্তি না ঘটে এবং শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত থাকে। লেখক: সহকারী শিক্ষক হালিমুন্নেছা চৌধুরানী মেমোরিয়াল বালিকা উচ্চ  বিদ্যালয়, ভালুকা, ময়মনসিংহ। শ্রেষ্ঠ শিক্ষক (৪ বার), ময়মনসিংহ বিভাগ।

জ্বালানি সংকটে অনলাইন ক্লাস নিয়ে নতুন সিদ্ধান্ত

জ্বালানি সংকটে অনলাইন ক্লাস নিয়ে নতুন সিদ্ধান্ত নিজস্ব প্রতিবেদক: ঢাকাসহ দেশের সব মহানগরের স্কুল ও কলেজে সপ্তাহে তিন দিন অনলাইন ক্লাস চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত এক সমন্বয় সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় ঢাকা মহানগরের বিভিন্ন স্কুল ও কলেজের শিক্ষক, শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তা এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, আপাতত সপ্তাহে ছয় দিন ক্লাস চালু থাকবে। এর মধ্যে তিন দিন অনলাইনে এবং বাকি তিন দিন সরাসরি (অফলাইনে) ক্লাস অনুষ্ঠিত হবে। শিক্ষকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উপস্থিত থেকেই ক্লাস গ্রহণ করবেন। তিনি আরও জানান, অনলাইন ও অফলাইন ক্লাস পরিচালনায় জোড়-বিজোড় দিনভিত্তিক বিভাজন পদ্ধতি অনুসরণ করা হতে পারে। তবে এ সিদ্ধান্ত এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে জানানো হয়নি। খুব শিগগিরই এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এর আগে সকালে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলন বলেন, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনলাইন ও অফলাইন সমন্বয়ে ক্লাস পরিচালনার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।

আখাউড়া রেলওয়ে জংশনে অগ্নিবীণা স্কাউটদের বহুমুখী সেবামূলক অভিযান।

জাহিদুল হক শ্রাবণ বাংলাদেশ স্কাউটস রেলওয়ে অঞ্চলের অধীনে আখাউড়া রেলওয়ে জেলার অগ্নিবীণা রেলওয়ে মুক্ত স্কাউট গ্রুপ। রবিবার, ২৯ মার্চ ২০২৬ তারিখে আখাউড়া রেলওয়ে জংশনে এক অনন্য ও প্রশংসনীয় সেবামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। এই মহৎ উদ্যোগ পরিচালিত হয় গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা মোঃ মোস্তাক আহমেদ খাদেম টিটু (উডব্যাজার)-এর দিকনির্দেশনা ও অনুপ্রেরণায় এবং মোঃ আফজাল হোসেন – মহাপরিচালক, বাংলাদেশ রেলওয়ে ও সভাপতি, বাংলাদেশ স্কাউটস রেলওয়ে অঞ্চল এর সুদৃঢ় নির্দেশনায়। ঈদ যাত্রীসেবা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমে- টিকিট কাটা ও প্ল্যাটফর্ম ব্যবস্থাপনায় সহায়তা, বয়স্ক ও অসহায় যাত্রীদের আসন খুঁজে দেওয়া, ডেঙ্গু ও চিকুননগুনিয়া সতর্কতামূলক ঘোষণা ও নির্দেশনা প্রদান, স্টেশন এলাকায় পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা এবং টিকেট কালেক্টর (টিসি) দলের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যাত্রী সেবায় সক্রিয় সহযোগিতা প্রদান করেন, রেলওয়ে পরিবারের সাথে ঐক্যবদ্ধ মনোভাবের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। উক্ত কার্যক্রম পরিদর্শনে আসেন মোহাম্মদ নূরুন্নবী (সুপারিনটেনডেন্ট, আখাউড়া রেলওয়ে স্টেশন) এবং মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম (চিফ ইন্সপেক্টর আরএনবি)। উভয় বাংলাদেশ স্কাউটস আখাউড়া রেলওয়ে জেলার সহ-সভাপতি এর দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁরা উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেন। মোঃ মোস্তাক আহমেদ খাদেম টিটু একজন দূরদর্শী ও স্কাউটিংয়ের প্রতি গভীর অঙ্গীকারবদ্ধ ব্যক্তিত্ব তাঁর অনুপ্রেরণায় গড়ে ওঠা এই গ্রুপ আজ আখাউড়া রেলওয়ে অঞ্চলে সেবার এক উজ্জ্বল প্রতীকে পরিণত হয়েছে। স্কাউট সদা প্রস্তুত , এই মূলমন্ত্রে আজ অগ্নিবীণা স্কাউটরা আবারও প্রমাণ করল, সেবাই তাদের পরিচয়। লেখক: সদস্য,অগ্নিবীণা রেলওয়ে মুক্ত স্কাউট গ্রুপ।

ঈদ সংস্কৃতি: নানান জাতের নানান রকম

মুসলমানদের নিকট ঈদ মানেই এক আধ্যাত্মিক খুশির নাম। অঞ্চল ভেদে ঈদের আমেজে আছে ভিন্নতা, আছে বৈচিত্র্যতা। বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর ঈদ সংস্কৃতি নিয়ে আমাদের বিশেষ ফিচার। ফিচার তৈরিতে দৈনিক ইত্তেফাক, সময়ের আলো, ডেইলি স্টারে প্রকাশিত প্রতিবেদনের সহযোগিতা নেওয়া হয়েছে।

সৌদি আরব

ঈদুল ফিতর উপলক্ষে সৌদিরা বিভিন্ন উৎসবমুখর অনুষ্ঠান এবং বিনোদনমূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে আনন্দ ভাগাভাগি করে নেয়। দিনটি উদযাপনের অংশ হিসাবে দেশটি জাঁকজমক সাজে সাজানো হয়। পরিবার এবং বন্ধুরা সাধারণত ঈদের বিশেষ খাবারের জন্য একত্রিত হয়। সকালে খাবার পরিবেশন করার আগে পরিবারের বাচ্চারা বয়স্কদের থেকে ‘সালামি’ নেয়।

সৌদি আরবে ঈদে একটি অনন্য ঐতিহ্য হলো- স্থানীয়রা কম তুলনামূলক গরীব কিংবা সবার বাসার দরজায় প্রচুর পরিমাণে নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী ও খাবার রেখে যান। সৌদিতে ঈদের স্পেশাল খাবারের মধ্যে রয়েছে মুগলগাল, জেরিশ এবং ঘুরাইবাহ। মুগলগাল সৌদি আরবের অন্যতম বিখ্যাত খাবার। ঈদের সময় সাধারণত উপভোগ করা এই খাবারে মশলার সাথে ভাজা ভেড়ার মাংস, তাজা টমেটো, পেঁয়াজ এবং সবুজ মরিচ থাকে। দেশটিতে ঈদুল ফিতর ‘মিষ্টি ঈদ’ হিসাবেও পরিচিত। দিনটিতে বিভিন্ন ধরণের মিষ্টি খাবার খাওয়া হয়।

তুরস্ক

তুরস্কে ঈদুল ফিতর ‘সেকের বায়রাম’ নামেও পরিচিত, যার অর্থ ‘চিনির উৎসব’। দেশটিতে জাতীয়ভাবে উদযাপিত সমস্ত উত্সবকে ‘বায়রাম’ হিসাবে উল্লেখ করার ঐতিহ্য রয়েছে। ঈদ-বায়রামের আনন্দ দেশব্যাপী ঐতিহ্যের সাথে মিশে যায়। তুর্কিরা সাধারণত একে অপরকে ‘বায়রামিনিজ মুবারেক ওলসুন’ বা ‘বায়রামিনিজ কুতলু ওলসুন’ দিয়ে সম্বোধন করে।

প্রার্থনা এবং পারিবারিক সমাবেশ ঘটে দিনটিতে। সবাই মিলে বিশেষ করে শিশুরা দেশটির বিভিন্ন ঐতিহ্যগত আনন্দে মাতে। দিনের একটা অংশে আনন্দ-উদযাপন শেষে তুর্কিরা তাদের কাছের এবং প্রিয়জনদের সাথে দেখা করেন, শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। মূলত সবাই সবার প্রতি সৌহার্দ্যপূর্ণ আনন্দের মধ্য দিয়ে দিনটি পার করে।

মালেশিয়া মালয়েশিয়ানরা ঈদের আগের দিন তাদের নিজ নিজ শহরে ভ্রমণে বের হয়। উত্সবের আগের দিনটি তাদের জন্য সবচেয়ে ব্যস্ত সময় থাকে। তারা পেলিটা’ (তেলের প্রদীপ) দিয়ে ঘর সাজায় এবং ঐতিহ্যবাহী নানা খাবার প্রস্তুত করে। কেতুপাট, কুইহ রায়া, লেমাং, রেন্ডিং ইত্যাদি দেশোটিতে ঈদের দিনের জনপ্রিয় খাবার। সবাই মিলেমিশে খাওয়াদাওয়া ও শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। মালয়েশিয়ার দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য হলো ‘উন্মুক্ত ঘর’। যেখানে খাবারের পাশাপাশি সবাই মিলে আনন্দ-আয়োজনের সঙ্গে ভালো সময় উপভোগ করার জন্য একত্রিত হয়।

মিশর মিশরীয়রা ঈদ-উল-ফিতরের দিনটি পরিবার এবং বন্ধুদের সাথে ভোজ এবং সময় কাটানোর মাধ্যমে পার করে। দিনটিতে সবাই ‘ফাত্তার’ নামক বিশেষ খাবার প্রস্তুত করে। এটি ভাত, মাংস ও রুটির মিশ্রণ এবং কুনাফা, পনির দিয়ে তৈরি একটি মিষ্টান্ন। মিশরীয়দেরও তাদের সন্তানদের জন্য নতুন জামাকাপড় এবং নানা আয়োজনের ঐতিহ্য রয়েছে।

নিউজিল্যান্ড নিউজিল্যান্ডে মসজিদ বা বাহিরের খোলা স্থানে নামাজের মধ্য দিয়ে ঈদ উদযাপন শুরু হয়। তারপর মুসলিমরা সমেবেত হন ও বিভিন্ন পরিবার উপহার বিনিময় করে। একসাথে ঐতিহ্যবাহী খাবারও খাওয়া হয়। সম্প্রতি অকল্যান্ড, ওয়েলিংটন এবং ক্রাইস্টচার্চের মতো বড় শহরগুলোতে ঈদ উত্সব আরও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, খাবারের স্টল এবং শিশুদের জন্য বিনোদনের ব্যবস্থা থাকে। দেশটির অকল্যান্ডে বাড়িঘর পরিচ্ছন্নতার মাধ্যমে দিন শুরু হয়। তারপর ইডেন পার্কে যান্ত্রিক ষাঁড়, হিউম্যান ফুসবল এবং বিভিন্ন স্থানে অস্থায়ীভাবে খাবার বিক্রি করা হয়। এই উদযাপন মুসলিম সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং বৃহত্তর নিউজিল্যান্ড সম্প্রদায়ের মিশ্রণকে প্রতিফলিত করে, দেশের বৈচিত্র্য এবং অন্তর্ভুক্তি প্রদর্শন করে।

ইন্দোনেশিয়ায় ইন্দোনেশিয়ায় ঈদ-উল-ফিতরকে ‘হারি রায়া ঈদুল ফিতর’ বলা হয়। উদযাপন শুরু হয় তাকবির পাঠের মাধ্যমে, যা ঈদের আগের রাত থেকে শুরু হয়। ঈদের সকালে বিশাল খোলা মাঠে ঈদের নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। নামাজ শেষে আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের বাড়িতে গিয়ে ক্ষমা চাওয়া ও শুভেচ্ছা বিনিময় ইন্দোনেশিয়ার অন্যতম ঐতিহ্য। দেশটিতে এই উৎসবের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ‘মুদিক’, যার অর্থ নিজের জন্মভূমিতে ফিরে যাওয়া। লাখো মানুষ ঈদের ছুটিতে শহর থেকে গ্রামে ফিরে পরিবার-পরিজনের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেন। মুদিক এত গুরুত্বপূর্ণ যে, সরকার বিনামূল্যে গণপরিবহনের ব্যবস্থা করে।

ইন্দোনেশিয়ার ঈদ শুধু ধর্মীয় আচার নয়, এটি পরিবার ও ঐতিহ্যের এক অপূর্ব মেলবন্ধন।

যুক্তরাষ্ট্র

যুক্তরাষ্ট্রে ঈদুল ফিতর মুসলিমদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব। দেশটিতে এই উৎসব বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নিয়ে উদযাপিত হয়। মুসলিমরা ঈদের নামাজ মসজিদ বা খোলা মাঠে আদায় করে এবং তারপর পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দ উদযাপন করে।

এছাড়া আমেরিকান মুসলিমরা সাধারণত ‘কমিউনিটি সার্ভিস প্রকল্পে’ অংশগ্রহণ করেন। যেখানে তারা অসহায়দের সাহায্য করতে কাজ করেন। যুক্তরাষ্ট্রে ঈদ উদযাপনগুলো সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক অপূর্ব মিশ্রণ, যেখানে ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরিধান, সঙ্গীত শোনা এবং ঐতিহ্যবাহী খাবার গ্রহণ করার রীতি পালন করা হয়।

নাইজেরিয়া

পশ্চিম আফ্রিকার দেশ নাইজেরিয়া। প্রায় ২২ কোটি জনসংখ্যার এই দেশটির অর্ধেক মুসলিম। আর তাই ঈদ বেশ ঘটা করেই পালিত হয় দেশটিতে। অধিকাংশ নাইজেরিয়ান মুসলমান থাকেন দেশটির উত্তর প্রান্তে, সেখানে রোজার ঈদের স্থানীয় নাম আস সাল্লাহ, যার অর্থ আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো।

আর আল্লাহকে কৃতজ্ঞতা জানাতে নতুন পোশাক পরে প্রতিটি পরিবারের নারী-পুরুষ ছেলে-বুড়ো সবাই মিলে ঈদের সকালে নামাজে যায়, যা স্থানীয় ভাষায় ‘দুরবার’ নামে পরিচিত।

ঐতিহ্যবাহী খাবারে মাঝে সুয়া (শিক কাবাবের মতো খাবার), জল্লফ রাইস (টমেটো, মশলা এবং নানা সবজি দিয়ে রান্না করা ভাত) এবং মইন মইন (সেদ্ধ মটরের পুডিং) ঈদের দিন খুব জনপ্রিয়।

উজবেকিস্তান

মধ্য এশিয়ার দেশ উজবেকিস্তানেও ঈদুল ফিতর অন্যতম এক আনন্দের দিন। স্থানীয়দের কাছে দিনটি পরিচিত ‘রুজা হায়িত’ নামে। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ থাকা উজবেকিস্তানে দীর্ঘদিন ঈদে কোনো ছুটি ছিল না। তবে স্বাধীনতা ঘোষণার পর দেশটিতে তিন দিনব্যাপী ছুটি নিয়ে ঈদ উদযাপন করা হয়। ঈদের আগের দিনটিকে তারা বলে আরাফা। আর এই দিনে প্রায় প্রতিটি উজবেক পরিবারে ঐতিহ্যবাহী প্যাস্ট্রি কুশ টিল, বুগিরসক; অভিজাত প্যাস্ট্রি ওরামা, চাক-চাক ইত্যাদি তৈরি করা হয়। আর রাতে ঘরে ঘরে উজবেক প্লভ রান্না হয়। এটি বিরিয়ানির মতো খাবার হলেও অঞ্চলভেদে রান্নায় অনেক বৈচিত্র্য থাকে। একে অপরের বাড়িতে প্লভ পাঠানোও জনপ্রিয় একটি রীতি।

ঈদের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, যে বাড়িতে নতুন বিবাহিত কনে আছে সেই বাড়িতে আত্মীয় প্রতিবেশীরা বেড়াতে আসেন। আবার বাচ্চারাও পাড়া ঘুরে নতুন বউয়ের প্রশংসা করে মিষ্টি-চকলেট আদায় করে নেয়।

তিউনিশিয়া

আফ্রিকার সর্বোত্তরের দেশ তিউনিশিয়ায় ঈদ অন্যতম আনন্দের উপলক্ষ্য। মুসলিম অধ্যুষিত দেশটিতে ঈদ শুরু হয়ে যায় অনেকটা আমাদের মতোই, চাঁদরাত থেকে। এমনিতেই রমজান জুড়ে অনেক রাত পর্যন্ত বাজার খোলা থাকে। কিন্তু চাঁদরাতে খাবার স্টল, দোকানপাট সব প্রাণবন্ত থাকে একদম ফজর পর্যন্ত।

নারী-পুরুষ-শিশু সবাই ঈদের আনন্দে রাতভর ঘুরে বেড়ায়। ঈদের নামাজের পর তিউনিশিয়ান মুসলিমদের পছন্দের খাবার হলো খেজুর আর অলিভ অয়েলে তৈরি মিষ্টি খাবার আসসিদা। আরও থাকে বাকলাভা, কাক ভারকা, ঘ্রাইবা, ম্লাবেস, মাকরৌদ ইত্যাদি ঐতিহ্যবাহী পেস্ট্রি। আর এসব তৈরি করার জন্য ঈদের কয়েক রাত আগে থেকেই সারা রাতজুড়ে বাড়ির মেয়েরা (বিশেষ করে বয়স্করা) গান গাইতে গাইতে কাজ করে যায়। আর ছেলেরা পেস্ট্রির মিক্সচার নিয়ে যায় স্থানীয় কোনো বেকারিতে। সেখানেই বড় চুল্লিতে চলে পেস্ট্রি বানানো। পুরো এলাকা পেস্ট্রির সুবাসে ভরে ওঠে।

ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনী ফলাফল ও পর্যবেক্ষণ 

মুনিম মুবাশশির

গণতান্ত্রিক উত্তরণের প্রত্যাশা ও প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা পুনর্গঠনের প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে প্রতিভাত হয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থান এর ফলে দীর্ঘ ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদী আমলের পরিসমাপ্তি ঘটে। পরপর ৩ টা জাতীয় নির্বাচনকে কৌতুকে পরিণত করা বিগত সরকারের প্রায় সকল এমপি, মন্ত্রীরা নিজ দেশ থেকে পালাতে বাধ্য হয়। সন্ত্রাসী কার্যক্রমের জন্যে আওয়ামী লীগ এর দলীয় কার্যক্রমও নিষিদ্ধ করা হয়। ৫০ টি নিবন্ধিত দলের মধ্যে আওয়ামীলীগসহ ১০ টি দল এবারের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১২ কোটি ৭৭ লক্ষ নিবন্ধিত ভোটার ২৯৯টি সংসদীয় আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী ২,০২৮ জন প্রার্থীর মধ্য থেকে তাঁদের প্রতিনিধিকে নির্বাচিত করার সুযোগ লাভ করেন। দীর্ঘ সময় ধরে ন্যূনতম গ্রহণযোগ্যতা নির্বাচন অনুপস্থিত থাকার ফলে এ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উচ্চমাত্রার আগ্রহ ও প্রত্যাশা সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে এবারের নির্বাচনের ভোটারদের একটা বড় অংশ ফার্স্ট টাইম ভোটার হিসেবে ভোট প্রদান সম্পন্ন করেছেন। তাই নির্বাচনটি উৎসবমুখর পরিবেশেই সম্পন্ন হয়েছে বলে জনসাধারণ তাদের মতামত প্রকাশ করেছে। 

উল্লেখযোগ্য যে, নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলোর ১,৭৫৫ জন প্রার্থীর পাশাপাশি ২৭৩ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হন, যা প্রতিযোগিতামূলক বহুদলীয় অংশগ্রহণের একটি পরিসংখ্যানগত চিত্র উপস্থাপন করে। তবে একজন প্রার্থীর আকস্মিক মৃত্যুর কারণে শেরপুর-৩ আসনে ভোটগ্রহণ স্থগিত থাকায় অবশিষ্ট ২৯৯টি আসনে সকাল ৭:৩০ মিনিট থেকে বিকেল ৪:০০টা পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্নভাবে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়।

এ নির্বাচনের সাথে সমান্তরালভাবে একইদিনে রাষ্ট্র সংস্কার-সংক্রান্ত একটি গণভোট আয়োজন করা হয়, যা নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে কেবল প্রতিনিধিত্বমূলক ক্ষমতা হস্তান্তরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না রেখে প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তরের প্রশ্নের সাথে সংযুক্ত করে। নির্বাচন কমিশনের প্রাথমিক প্রতিবেদনে প্রায় ৬০ শতাংশ ভোটার উপস্থিতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যা অংশগ্রহণের মাত্রা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

উপর্যুক্ত প্রেক্ষাপটে, এ প্রবন্ধে নির্বাচনটির গুণগত মান, অংশগ্রহণের প্রকৃতি, প্রতিযোগিতার বাস্তবতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক নিরপেক্ষতার প্রশ্নসমূহের একটি বস্তুনিষ্ঠ ও বিশ্লেষণধর্মী পর্যালোচনা উপস্থাপনের প্রয়াস গ্রহণ করা হয়েছে।

নির্বাচনী পর্যবেক্ষণ: একটি সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ

১) শক্তিশালী সরকার গঠন:

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি মোট ২৯৯ আসনের মাঝে ২০৯ টি আসনে জয় লাভ করে। সংসদীয় রাজনীতিতে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা বা জোটবদ্ধ সংহতি সরকারকে নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত গ্রহণে একচ্ছত্র শক্তি প্রদান করেছে। এটি রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা দূর করে প্রশাসনে গতিশীলতা ফিরিয়ে আনছে। নবগঠিত সরকারের শক্তিশালী ম্যান্ডেট বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়া। একটি শক্তিশালী সরকারের অধীনেই কেবল দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও বৈদেশিক বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা সম্ভব। বিএনপি জোট থেকে মাত্র ২ জন এমপি জয় লাভ করেছেন যারা বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের, এবং বিএনপি ব্যতীত ভিন্ন কোনো দলের।

২) দ্বি-দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো কার্যকর দ্বি-দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার উত্থান। ওয়েস্টমিনস্টার পদ্ধতির একটি সীমাবদ্ধতা হচ্ছে বহুমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্রে খুব কম ভোট পেয়েও প্রার্থীর জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বিগত নির্বাচনগুলোতে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত ও জাতীয় পার্টি- এই চার দলের মধ্যে তুলনামূলক ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা লক্ষ করা যেত। তবে এবারের নির্বাচনে বিএনপি জোট ও জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট সম্মিলিতভাবে প্রায় ৯০% ভোট অর্জন করে এবং ২৮৯টি আসনে প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে, যা দ্বিমেরু রাজনীতির দিকে একটি কাঠামোগত রূপান্তরের ইঙ্গিত বহন করে। ৩য় বিশ্বের দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনে রাজনৈতিক দ্বি-দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বীতার চর্চা ইতিবাচক পরিবর্তন।

৩) তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা: নির্বাচনে অধিকাংশ আসনেই প্রত্যাশার তুলনায় অধিক প্রতিযোগিতাপূর্ণ হয়েছে। বিএনপি জোট ও জামায়াত জোট এর প্রার্থীরা নির্বাচনে জয়ী হওয়ার জন্য একে উপরের সাথে তীব্র প্রতিযোগিতায় নেমেছিলো। অল্প কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা বাদ দিলে নির্বাচন কেন্দ্রিক সহিংসতা পূর্বের তুলনায় অনেকটাই কমেছে। জুলাই পরবর্তী বাংলাদেশে সাধারণ জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রত্যেক প্রার্থীকেই সর্বোচ্চ ইফোর্টস দিতে হয়েছে। এই প্রবণতা প্রতিযোগিতামূলক গণতন্ত্রের বিকাশে ইতিবাচক সূচক হিসেবে বিবেচ্য।

৪) নির্বাচনের মাঠে জামায়াতের শক্তিশালী উত্থান: দীর্ঘ ৮০ বছরের বেশি সময় ধরে রাজনীতি করে আসা রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। অতীতে পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে সর্বোচ্চ ১২.৩ শতাংশ ভোট পেয়ে ১৮ টি আসনে জয়ী হয়। সরকারের অংশ হলেও একক নির্বাচনেও তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য সফলতা দেখতে পারেনি সংগঠনটি। সহযোগী শক্তি হিসেবে দীর্ঘদিন রাজনীতি করে আসা দল এবার প্রধানধারার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এর মাধ্যমে জামায়াত তাৎপর্যপূর্ণ সাফল্য প্রদর্শন করেছে। সিটি কর্পোরেশন অঞ্চলের ৪৫টি আসনের মধ্যে ১০টিতে জামায়াত জোটের জয় বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ উত্থান করে।

৫) ক্ষুদ্র দলগুলোর এলার্মিং ভোটের হার: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী ৫০টি দলের মধ্যে মাত্র পাঁচটি দল এক শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছে(বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ)। ফলে তুলনামূলক ক্ষুদ্ দলগুলোর টিকে থাকার সম্ভাবনা সংকুচিত হয়েছে। প্রায় ৪৫ টা দলই দেশব্যাপী ১% এর নিচে জনসমর্থন পেয়েছে।

৬) স্বল্প ব্যবধানে নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণ: এ নির্বাচনের বহু আসনে জয়ের ব্যবধান ছিল খুবই কম। ফলাফল নির্ধারণে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অনিশ্চয়তা বজায় ছিল। ইসির তথ্যানুযায়ী, প্রায় ২৩টি আসনে পাঁচ হাজারের কম ভোটের ব্যবধানে নির্বাচনী ফল নির্ধারিত হয়, যা নির্বাচনকে উচ্চমাত্রার প্রতিযোগিতাপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে। এই অনিশ্চয়তা আদর্শ নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ একটি নির্দেশক।

৭) স্বতন্ত্র প্রার্থীদের অগ্রগতি: ত্রয়োদশ নির্বাচনে ভালো সংখ্যক স্বতন্ত্র প্রার্থীর বিজয় এ নির্বাচনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক। অধিকাংশই দলীয় মনোনয়নবঞ্চিত হলেও তাঁরা সংগঠিত দলীয় প্রার্থীদের সঙ্গে সমানতালে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়লাভ করেছেন। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে যে ৭ প্রার্থী জয়ী হয়েছেন, সকলেই বিএনপির সাথে কোনো না কোনো সময় যুক্ত ছিলো। এটি নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় তুলনামূলক সমান সুযোগ ও ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার কার্যকারিতা নির্দেশ করে। ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও ইউনিক নির্বাচনী প্রচারণার ফলে জাতীয় নির্বাচনের মতো গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে এই স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয় নিশ্চিত করেছে।

৭) অঞ্চলভেদে দলীয় প্রভাব ফলাফলেও লক্ষণীয়: উক্ত নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অঞ্চলভেদে ফলাফলের একটা প্যাটার্ন লক্ষ্য করা যায়। খুলনা, রংপুর ও রাজশাহী বিভাগে ১১-দলীয় জোটের প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল, অন্যদিকে বিএনপি বিশেষ করে চট্টগ্রাম, সিলেট ও বরিশালে তাদের শক্তিশালী প্রভাব প্রদর্শন করে।

৮) বামদলগুলোর ললজ্জাজনক হার: বাম ও আদর্শভিত্তিক দলগুলোর ভোট ও আসনপ্রাপ্তি ছিল অত্যন্ত সীমিত, যা তাদের সাংগঠনিক দূর্বলতা ও ভোটার-আকর্ষণের ঘাটতির প্রতিফলন। ফলে নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হলেও বাম রাজনীতির প্রভাব ছিল না বললেই চলে। বেশির ভাগ আসনে জামানত বাজেয়াপ্ত হয়ে লজ্জাজনক হারের অভিজ্ঞতা অর্জন করে। বাংলাদেশে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাম দলগুলোর প্রভাব ধীরে ধীরে কমে আসছে।

৯) কারসাজির অভিযোগ ও ভোট পুনর্গণনার দাবি: নির্বাচনের রাতে ভোট গণনার সময় কিছু আসনে ফলাফল নিয়ে বেশ আপত্তি উঠতে থাকে। ভোট গণনাকে কেন্দ্র করে উভয় জোটই একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে থাকে। আলোচনায় আসে, “ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং” টার্মটা। আসলেই কি ইঞ্জিনিয়ারিং হয়েছে? হলেও সেটা কিভাবে হয়েছে? বিস্তারিত জানা যাবে ইলেকশনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ডাটা ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ফ্যাক্টর এর চুলচেড়া বিশ্লেষণ এর পরে। পরবর্তীতে প্রায় ৩০টি আসনে পুনর্গণনার দাবি উত্থাপিত হয়েছে। অভিযোগ উত্থাপিত হওয়া মানেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনিয়মের প্রমাণ নয়। তবুও এর ফলে নির্বাচনী স্বচ্ছতা নিয়ে আংশিক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।

১০) জাতীয় পার্টির হতাশাজনক ফলাফল: এ নির্বাচনে প্রায় ১৯৯টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেও ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের ঘনিষ্ঠ মিত্র জাতীয় পার্টির ১ শতাংশেরও কম ভোট প্রাপ্তি তাদের রাজনৈতিক প্রভাবের তীব্র অবনমন নির্দেশ করে। অতীতে উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও এবারের নির্বাচনে তাদের ভরাডুবি ভোটার পছন্দের পুনর্বিন্যাস এবং নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের প্রতিফলন হিসেবে প্রতীয়মান। জাতীয় পার্টির শক্তিশালী ভূমি হিসেবে পরিচিত রংপুরেও হারের স্বাদ নিতে হয়।

লেখক: সাবেক সদস্য, দুদক সংস্কার কমিশন।

এবার ফুয়েল কার্ড চালুর পরিকল্পনা

  ডেস্ক রিপোর্ট: দেশে জ্বালানি তেল নিয়ে চলমান অস্থিরতা ও কারসাজি মোকাবিলায় সব ধরনের যানবাহনের জন্য ‘ফুয়েল কার্ড’ চালুর পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে ইতোমধ্যে প্রাথমিক কাজও শুরু করেছে জ্বালানি বিভাগ। ফুয়েল কার্ড মূলত একটি বিশেষ পেমেন্ট কার্ড, যা পেট্রোল, ডিজেলসহ অন্যান্য জ্বালানি কেনার জন্য ব্যবহৃত হয়। এটি ক্রেডিট বা ডেবিট কার্ডের মতো কাজ করলেও এর মাধ্যমে জ্বালানি ব্যবহারের পরিমাণ নির্ধারণ, খরচ নিয়ন্ত্রণ এবং ডিজিটাল রেকর্ড সংরক্ষণের সুবিধা পাওয়া যায়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশকে বড় ধরনের চাপে পড়তে হতে পারে। এরই মধ্যে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী তেল মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। এ  প্রসঙ্গে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানিয়েছেন, দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। ইরান যুদ্ধের আগের মতোই সরবরাহ অব্যাহত থাকলেও হঠাৎ চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় দ্রুত পাম্প থেকে তেল শেষ হয়ে যাচ্ছে। তার মতে, এই পরিস্থিতির পেছনে মজুতদারদের ভূমিকাই বড় কারণ। এই প্রেক্ষাপটে তেল অপচয় ও অবৈধ মজুত ঠেকাতে ‘ফুয়েল কার্ড’ ব্যবস্থাকে কার্যকর সমাধান হিসেবে বিবেচনা করছে সরকার। প্রস্তাবিত এই কার্ডের মাধ্যমে মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার, বাস ও ট্রাকের মালিকরা নির্ধারিত সীমার মধ্যে জ্বালানি নিতে পারবেন। প্রতিটি কার্ডে একটি কিউআর কোড থাকবে, যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট পাম্প থেকে তেল সংগ্রহ করা যাবে।  

আমেরিকায় ট্রাম্প বিরোধী ’নো কিংস’ আন্দোলন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্রে আবারও ‘নো কিংস’ নামে বড় আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়েছে। এই আন্দোলনের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা হবে। আয়োজকরা জানিয়েছে, শনিবার (২৮ মার্চ) সারা দেশে ৩ হাজারের বেশি বিক্ষোভ কর্মসূচি হবে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিক্ষোভের দিনগুলোর একটি হতে পারে। এর আগে ২০২৫ সালের জুন ও অক্টোবর মাসেও এই আন্দোলন হয়। তখন লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমেছিল। আয়োজকদের দাবি, জুনে প্রায় ৫০ লাখ মানুষ এবং অক্টোবরে প্রায় ৭০ লাখ মানুষ অংশ নেয়।

এবারের বিক্ষোভে অনেক বিষয় নিয়ে প্রতিবাদ হবে। এর মধ্যে আছে ট্রাম্পের অভিবাসনবিরোধী নীতি এবং ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ।

ওয়াশিংটন ডিসি, মিনিয়াপোলিস, শিকাগো এবং সান ফ্রান্সিসকোতে বড় বিক্ষোভ হওয়ার কথা রয়েছে। ছোট অঙ্গরাজ্য ভারমন্টেও ৪০টির বেশি বিক্ষোভের পরিকল্পনা করা হয়েছে। রাজ্যটিতে মাত্র ৬ লাখ ৪৬ হাজার মানুষ বাস করে। তারপরও সেখানে এত কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। আয়োজকরা জানায়, এটি আমেরিকার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিক্ষোভের দিনগুলোর একটি হতে পারে।      

নেপালের ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী আটক

    আন্তর্জাতিক ডেস্ক: নেপালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলিকে শনিবার (২৮ মার্চ) গ্রেপ্তার করেছে দেশটির পুলিশ। দেশটিতে গত সেপ্টেম্বরে জেন-জি’র নেতৃত্বে হওয়া বিক্ষোভে বহু মানুষের মৃত্যুর ঘটনায় তার দায় আছে কিনা তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। এর আগে গত ৮ ও ৯ সেপ্টেম্বর দুর্নীতিবিরোধী যুব আন্দোলনে অন্তত ৭৭ জন নিহত হন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা জারির প্রতিবাদ থেকে এই আন্দোলনের সূচনা হলেও এর পেছনে দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক অসন্তোষ কাজ করেছিল। বিক্ষোভের প্রথম দিনেই দমন-পীড়নে অন্তত ১৯ জন তরুণ প্রাণ হারান। ওলির দল কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপালের (ইউএমএল) জ্যেষ্ঠ নেতা মিন বাহাদুর শাহি বলেন, ‘শনিবার সকালে তাকে তার বাসভবন থেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।’ পুলিশের মুখপাত্র ওম অধিকারী ওলি এবং তার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রমেশ লেখকের আটক হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এদিকে গত ৫ মার্চ সংসদ নির্বাচনে জয়ী হওয়া র‌্যাপার বালেন্দ্র শাহ শুক্রবার (২৭ মার্চ) প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। আর নতুন সরকার শপথ নেয়ার একদিন পরই ওলিকে গ্রেপ্তার করা হলো।  

স্বাধীনতা দিবস: সার্বভৌমত্বের প্রতিশ্রুতি ও গণমানুষের বঞ্চনা

  ড. মাহরুফ চৌধুরী ২৬শে মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস। এই দিনটি কেবল ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ নয়, বরং জাতীয় জীবনে একটি গভীর ঐতিহাসিক তাৎপর্যবাহী মুহূর্ত। দিনটি আমাদের জন্য একই সঙ্গে একটি রাজনৈতিক অঙ্গীকার, নৈতিক দায়বদ্ধতা এবং একটি চলমান, কিন্তু এখনো অসমাপ্ত জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্রগঠনের প্রকল্পের মূর্তপ্রতীক। ১৯৭১ সালের এই দিনে স্বাধীনতা ঘোষণার মধ্য দিয়ে রক্তাক্ত সংগ্রামের পথ ধরে আমরা অর্জন করি বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। লাল-সবুজের পতাকা নিয়ে বিশ্বের মানচিত্রে অভ্যুদয়ের মাধ্যমে আমাদেরকে দু’বার স্বাধীনতা অর্জন করতে হয়েছিল। আমাদের এই অর্জন ছিল উপনিবেশিক এবং উপনিবেশ-উত্তর শাসনব্যবস্থার দীর্ঘস্থায়ী শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ঐতিহাসিক মুক্তির ঘোষণা। সেই ঘোষণার মধ্যে নিহিত ছিল একটি ন্যায্য, সমতাভিত্তিক এবং মানবিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়। কিন্তু স্বাধীনতার ৫৫ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর যে প্রশ্নটি আজ আরও তীক্ষ্ণ, আরও অনিবার্য হয়ে ওঠে, সেটি হলো, এই রাষ্ট্র কি সত্যিই জনগণের রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে, নাকি ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় কেবল শাসকের হাতবদল ঘটেছে, যেখানে ক্ষমতার কেন্দ্র অপরিবর্তিত থেকেছে, আর প্রান্তিক মানুষ রয়ে গেছে একই বাস্তবতায় আবদ্ধ? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে রাষ্ট্র ও সার্বভৌমত্বের ধারণাকে কেবল আবেগের আলোকে নয়, বরং তাত্ত্বিক ও দার্শনিক কাঠামোর মধ্য দিয়ে বিশ্লেষণ করা জরুরি। ইংরেজ চিন্তক টমাস হবস (১৫৮৮-১৬৭৯) তাঁর ‘লেভিয়াথান’-এ রাষ্ট্রকে একটি সর্বময় ক্ষমতাসম্পন্ন সত্তা হিসেবে কল্পনা করেছিলেন, যার প্রধান দায়িত্ব হলো বিশৃঙ্খলা রোধ করে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা। তাঁর দৃষ্টিতে, মানুষের স্বাভাবিক অবস্থা ছিল সংঘাতপূর্ণ; তাই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব অপরিহার্য। কিন্তু এই ধারণা পরবর্তীকালে অপর ইংরেজ চিন্তক জন লক (১৬৩২-১৭০৪) সংশোধন করেন। লক যুক্তি দেন যে রাষ্ট্রের বৈধতা কোনো পরম ক্ষমতায় নয়, বরং জনগণের সম্মতি ও তাদের প্রাকৃতিক অধিকার তথা জীবন, স্বাধীনতা ও সম্পত্তির সুরক্ষার ওপর নির্ভরশীল। রাষ্ট্র যদি এই মৌলিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, তবে জনগণের সেই রাষ্ট্রকে পরিবর্তনের অধিকার রয়েছে। অন্যদিকে, সুইস চিন্তক জাঁ-জাক রুশো (১৭১২–১৭৭৮)‘সাধারণ ইচ্ছা’ (জেনারেল উইল)-র ধারণার মাধ্যমে রাষ্ট্র ও সার্বভৌমত্বকে আরও গভীরভাবে ব্যাখ্যা করেন। তাঁর মতে, প্রকৃত সার্বভৌমত্ব কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হাতে নয়; এটি নিহিত থাকে জনগণের সম্মিলিত ইচ্ছা ও অভিন্ন স্বার্থে। রাষ্ট্র তখনই বৈধ ও কার্যকর হয়ে ওঠে, যখন তা এই সাধারণ ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে সক্ষম হয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে স্পষ্ট হয় যে, যদি রাষ্ট্র জনগণের প্রত্যাশা, প্রয়োজন ও অধিকারকে প্রতিফলিত না করে, তবে তা কেবল একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে সীমাবদ্ধ থাকে, অর্থাৎ নামমাত্র রাষ্ট্র হিসেবে বিদ্যমান থাকে, কিন্তু প্রকৃত অর্থে সার্বভৌম হয় না। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা এই তাত্ত্বিক কাঠামোর সঙ্গে এক গভীর ও স্পষ্ট বৈপরীত্য সৃষ্টি করে। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রের মালিকানা গণমানুষের হাতে ন্যস্ত হওয়ার কথা থাকলেও, বাস্তব অভিজ্ঞতা আমাদের ভিন্ন এক চিত্র দেখায় যেখানে ক্ষমতা ধীরে ধীরে একটি সীমিত, কেন্দ্রাভিমুখী গোষ্ঠীর ভেতরে সঙ্কুচিত হয়ে পড়েছে। রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়া এবং সম্পদ বণ্টনের ধরন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সাধারণ নাগরিকের অংশগ্রহণ প্রায়ই প্রতীকী স্তরে সীমাবদ্ধ থেকেছে। কার্যত রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রটি থেকে তারা বহুলাংশে বিচ্ছিন্ন। এই প্রেক্ষাপটে ইতালীয় মার্কসবাদী চিন্তাবিদ আন্তোনিও গ্রামসির (১৮৯১-১৯৩৭) ‘হেজিমনি’ (আধিপত্য)-র ধারণা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। তিনি দেখিয়েছেন, শাসকশ্রেণী কেবল বলপ্রয়োগ বা রাষ্ট্রীয় দমননীতির মাধ্যমে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখে না; বরং তারা সাংস্কৃতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও আদর্শিক ক্ষেত্রকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এমন এক সম্মতিনির্ভর বাস্তবতা তৈরি করে, যেখানে তাদের আধিপত্য স্বাভাবিক, এমনকি অপরিহার্য বলে প্রতীয়মান হয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই আধিপত্য কেবল রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি শিক্ষা, গণমাধ্যম, প্রশাসন এবং সামাজিক মূল্যবোধের মধ্য দিয়েও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে। ফলে একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর কর্তৃত্ব সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এমনভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়েছে যে, তা অনেকের কাছেই প্রশ্নাতীত সত্য হিসেবে প্রতিভাত হয়। এখানে ফরাসী ঐতিহাসিক ও চিন্তক মিশেল ফুকোর (১৯২৬–১৯৮৪) ‘ক্ষমতা তত্ত্ব’ (পাওয়ার থিওরি) এই আলোচনাকে আরও গভীরতা প্রদান করে। তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন যে ক্ষমতা কোনো একক কেন্দ্র বা শীর্ষস্তরে সীমাবদ্ধ নয়; এটি বহুমাত্রিক, বিস্তৃত এবং সমাজের প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে থাকে। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, আইনব্যবস্থা, এমনকি ভাষা ও দৈনন্দিন চর্চার মধ্য দিয়েও ক্ষমতা নিজেকে ক্রমাগত পুনরুৎপাদন করে। ফলে ক্ষমতার দৃশ্যমান রূপ, যেমন সরকার বা নেতৃত্বের পরিবর্তন ঘটলেও, অদৃশ্য কাঠামোগত সম্পর্কগুলো অপরিবর্তিত থেকে যেতে পারে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সরকার পরিবর্তনের মধ্য দিয়েও প্রশাসনিক কাঠামো, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং ক্ষমতা প্রয়োগের পদ্ধতিতে একটি লক্ষণীয় ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। এই ধারাবাহিকতা আমাদের সামনে একটি গভীর কাঠামোগত সংকটের ইঙ্গিত দেয়। এটি কেবল কোন রাজনৈতিক ব্যক্তি বা দলের ব্যর্থতা নয়; বরং একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও সাংস্কৃতিক জটিলতা, যেখানে ক্ষমতার বিন্যাস এমনভাবে স্থায়ী রূপ পেয়েছে যে, তা সহজে পরিবর্তিত হয় না। ফলে স্বাধীনতার পর যে রাষ্ট্র জনগণের সার্বভৌমত্বের প্রতিফলন হওয়ার কথা ছিল, তা বাস্তবে এক সীমাবদ্ধ ক্ষমতার পুনরুৎপাদনের ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে যেখানে জনগণের মাঝে পরিবর্তনের প্রত্যাশা বারবার জাগ্রত হলেও, কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতার কারণে তা পূর্ণতা পায় না। ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করলে দেখা যায়, বাংলার শাসকগোষ্ঠীর গণবিচ্ছিন্নতা কেবল সাম্প্রতিক কোনো বাস্তবতা নয়; বরং এটি একটি দীর্ঘকালীন প্রক্রিয়ার ফল, যা বর্তমান সংকটকে আরও গভীর ও জটিল করে তুলেছে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে যে রাষ্ট্রকাঠামো গড়ে উঠেছিল, তা মূলত একটি ‘শোষণমূলক রাষ্ট্র’ যার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল উপনিবেশ থেকে সম্পদ আহরণ এবং কেন্দ্রীয় ক্ষমতার স্বার্থ সংরক্ষণ। এই কাঠামোয় জনগণের অংশগ্রহণ ছিল নগণ্য, আর প্রশাসন ছিল জনগণের সেবক নয়, বরং শাসকের হাতিয়ার। পাকিস্তান আমলেও এই একই ধারা বহুলাংশে অব্যাহত থাকে, যেখানে পূর্ব বাংলার জনগণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রান্তিক অবস্থায় থেকে যায়। স্বাধীনতার মাধ্যমে সেই শোষণমূলক কাঠামো ভেঙে দিয়ে জনগণের মনে একটি ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা ছিল এক গভীর ঐতিহাসিক আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ। এই প্রত্যাশার কেন্দ্রে ছিল এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ হবে এবং উন্নয়ন ও সম্পদের সুফল দেশের সব মানুষের মাঝে সমভাবে বণ্টিত হবে। কিন্তু বাস্তবতা আমাদের দেখিয়েছে ভিন্ন এক চিত্র। রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে বহু ক্ষেত্রে সেই পুরোনো শোষণমূলক প্রবণতার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে যেখানে ক্ষমতা ও সম্পদ একটি সীমিত গোষ্ঠীর মধ্যে কেন্দ্রীভূত থেকে গেছে, আর সাধারণ মানুষ কাঙ্ক্ষিত অধিকার ও সুযোগ থেকে সবসময়ই বঞ্চিতই রয়ে গেছে। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর মৌলিক দুর্বলতা হলো দলীয় ও পরিবারতান্ত্রিক বৃত্তবদ্ধতা, যা সর্বস্তরের মানুষের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণকে প্রকৃত অর্থে সীমিত করে ফেলে। এ প্রসঙ্গে জার্মান বংশোদ্ভুত সমাজতাত্ত্বিক রবার্ট মিখেলসের (১৮৭৬-১৯৩৬) ‘অলিগার্কের লৌহ আইন’ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি দেখিয়েছেন, যে কোনো সংগঠন, তা যতই গণতান্ত্রিক আদর্শে প্রতিষ্ঠিত হোক না কেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেটা একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর নেতৃত্বে ও নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। ক্ষমতাবান এই গোষ্ঠী নিজেদের অবস্থান সংরক্ষণে এমন সব কলাকৌশল অবলম্বন করে, যা সংগঠনের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রকে ক্রমশ সংকুচিত করে ফেলে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো এই তত্ত্বের এক সুস্পষ্ট প্রতিফলন। এখানে দলীয় কাঠামোর ভেতরেই এমন এক অলিগার্কিক নিয়ন্ত্রণ গড়ে উঠেছে, যেখানে নেতৃত্বের পরিবর্তন বা বিকল্প নেতৃত্বের বিকাশ অত্যন্ত সীমিত, এমনকি প্রায় অসম্ভব। পরিবারতান্ত্রিক প্রভাব, আনুগত্যভিত্তিক রাজনীতি এবং ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন- এসব উপাদান মিলিয়ে একটি সংকীর্ণ বৃত্ত তৈরি হয়েছে, যা রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রবাহকে সাধারণ জনগণের দিকে না নিয়ে সেই নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যেই আবদ্ধ রাখে। ফলে গণতন্ত্রের আনুষ্ঠানিক কাঠামো বিদ্যমান থাকলেও, তার কার্যকারিতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্র প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। এই প্রেক্ষাপটে স্পষ্ট হয় যে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় সংকট কেবল সাময়িক বা ব্যক্তিনির্ভর নয়; এটি গভীরভাবে প্রোথিত একটি ঐতিহাসিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতা, যেখানে শোষণমূলক কাঠামো এবং অলিগার্কিক নিয়ন্ত্রণ একে অপরকে শক্তিশালী করে চলেছে। এর ফলে স্বাধীনতার মৌলিক প্রতিশ্রুতি তথা জনগণের ক্ষমতায়ন ও রাষ্ট্রের সর্বত্র সার্বভৌমত্বের প্রতিষ্ঠা আজও পূর্ণতা লাভ করতে পারেনি। সাম্প্রতিক জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে এই দীর্ঘস্থায়ী কাঠামোগত সংকটের প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করলে তা কেবল একটি তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক ঘটনারূপে নয়, বরং গণমানুষের সঞ্চিত বঞ্চনা, ক্ষোভ এবং প্রত্যাশার এক প্রতীকী বিস্ফোরণ হিসেবে প্রতিভাত হয়। এটি ছিল এমন এক মুহূর্ত, যখন প্রাতিষ্ঠানিকভাবে উপেক্ষিত মানুষেরা নিজেদের অস্তিত্ব, অধিকার এবং অংশগ্রহণের প্রশ্নকে নতুন করে সামনে নিয়ে আসে। এই অর্থে, ঘটনাটিকে জাঁ-জাক রুশোর ‘সাধারণ ইচ্ছা’ (জেনারেল উইল) অর্থাৎ জনগণের সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষা ও ন্যায্য দাবির এক ধরনের পুনরুত্থান হিসেবেও দেখা যেতে পারে, যেখানে রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের ন্যায্য অধিকার পুনরায় উচ্চারিত হয়েছে। তবে এই জাগরণ, যা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রত্যাশা তৈরি করেছিল, তা রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রত্যাশিত প্রতিফলন পায়নি। অঙ্গীকার থাকা সত্ত্বেও বর্তমান সরকারের ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নে অনীহা, বিলম্ব এবং নানা কৌশলগত তালবাহানার আশ্রয় নেওয়া ইঙ্গিত দেয় যে বিদ্যমান ক্ষমতাকাঠামোকে ভেঙে তা পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে অনিচ্ছুক, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে প্রতিরোধী। রাষ্ট্রসংস্কারের প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে দ্বিধা, দ্বন্দ্ব, অবিশ্বাস ও পারস্পরিক প্রতিযোগিতা দেখা যায়, তা এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে তোলে যে পরিবর্তনের দাবি যতই জোরালো হোক না কেন, ক্ষমতার বর্তমান বিন্যাস তা গ্রহণের জন্য প্রস্তুত নয়। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ‘পথের উপর নির্ভরতা’ (পাথ ডিপেন্ডেন্সি) তত্ত্বের আলোকে বিশ্লেষণ করা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, অতীতের প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং ক্ষমতার বিন্যাস এমন এক ধারাবাহিকতা তৈরি করে, যা ভবিষ্যতের সম্ভাব্য পথগুলোকে সীমাবদ্ধ করে দেয়। ফলে পরিবর্তনের সম্ভাবনা থাকলেও তা সহজে বাস্তবায়িত হয় না, কারণ বিদ্যমান কাঠামো নিজেকে টিকিয়ে রাখতে নানা কলাকৌশলের প্রয়োগ ও বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় সক্রিয় থাকে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই নির্ভরতা কেবল প্রশাসনিক কাঠামোতেই নয়, বরং রাজনৈতিক আচরণ, নীতিনির্ধারণের ধরণ এবং ক্ষমতার চর্চার মধ্যেও গভীরভাবে প্রোথিত। এর ফলে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্য তৈরি হয় অর্থাৎ ব্যক্তি, পরিবার বা দল পরিবর্তিত হয়, কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্রের শাসনের ধরন অপরিবর্তিত থেকে যায়। গণতন্ত্রের আনুষ্ঠানিক রূপ বিদ্যমান থাকলেও, তার ভেতরকার চর্চা ও কার্যকারিতা ক্রমশ সীমিত হয়ে পড়ে। এই অবস্থাকে অনেকাংশে এমন এক রাজনৈতিক বাস্তবতা হিসেবে দেখা যায়, যেখানে গণতন্ত্রের ভাষ্য বজায় রেখেই এক ধরনের কাঠামোগত স্বৈরতন্ত্র পুনরুৎপাদিত হয় যা জনগণকে প্রতিশ্রুতি দেয় মুক্তির, কিন্তু বাস্তবে তাদের আবদ্ধ করে রাখে একটি পুনরাবৃত্তিমূলক, পরিত্রাণহীন নিয়তির মধ্যে। এই দুষ্টচক্র ভাঙতে হলে প্রয়োজন একটি মৌলিক রাষ্ট্রসংস্কার প্রক্রিয়ার বাস্তবায়ন যা কেবল প্রশাসনিক কাঠামোর আংশিক পরিবর্তনের প্রয়াসে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি, রাজনৈতিক দর্শন এবং ক্ষমতার বিন্যাসের একটি সামগ্রিক পুনর্গঠন নিশ্চিত করবে। এখানে প্রশ্নটি কেবল কে শাসন করবে, তা নয়; বরং কিভাবে শাসন পরিচালিত হবে এবং সেই শাসনের উদ্দেশ্য কী হবে- এই মৌলিক প্রশ্নগুলোর পুনর্বিবেচনা অপরিহার্য। মার্কিন চিন্তক জন রলস (১৯২১-২০০২) তাঁর ‘ন্যায্যতা হিসেবে ন্যায় বিচার’ (জাস্টিস এজ ফেয়ারনেস) তত্ত্বে যে ধারণা তুলে ধরেছেন, তা এই প্রেক্ষাপটে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর মতে, একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজে রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান এমনভাবে গঠিত হওয়া উচিত, যাতে তা সর্বপ্রথম এবং সর্বাধিকভাবে সমাজের সবচেয়ে দুর্বল ও বঞ্চিত মানুষের স্বার্থ রক্ষা করে। অর্থাৎ উন্নয়ন, নীতি এবং সম্পদ বণ্টনের মানদণ্ড নির্ধারিত হবে ক্ষমতাবানদের সুবিধা নয়, বরং প্রান্তিক মানুষের কল্যাণকে কেন্দ্র করে। এই তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গিকে বাস্তব রূপ দিতে হলে রাষ্ট্রের পাশাপাশি নাগরিক সমাজের ভূমিকাও অপরিহার্য হয়ে ওঠে। একটি সক্রিয়, সচেতন এবং সংগঠিত নাগরিক সমাজই পারে রাষ্ট্রের ওপর কার্যকর জবাবদিহিতা আরোপ করতে, ক্ষমতার অপব্যবহার প্রতিরোধ করতে এবং ন্যায্যতার প্রশ্নে জনমত গড়ে তুলতে। গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পেশাজীবী সংগঠন এবং সামাজিক আন্দোলন- এই সবগুলো ক্ষেত্র সম্মিলিতভাবে একটি সমালোচনামূলক নাগরিক চেতনা নির্মাণে ভূমিকা রাখতে পারে, যা রাষ্ট্রকে তার প্রতিশ্রুতির প্রতি দায়বদ্ধ রাখতে সক্ষম হবে। এই প্রেক্ষাপটে আমাদের স্বাধীনতা দিবসের তাৎপর্য নতুন করে অনুধাবন করা প্রয়োজন। এটি কেবল জাতির জন্য অতীতের গৌরবময় অর্জন স্মরণের দিন নয়; বরং একটি অসমাপ্ত সংগ্রামের পুনঃঘোষণা, একটি নৈতিক দায়বদ্ধতার নবায়ণ। স্বাধীনতা তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন সার্বভৌমত্ব কেবল সংবিধানের ভাষায় সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং প্রতিটি নাগরিকের দৈনন্দিন জীবনে প্রতিফলিত হবে যেখানে মানুষ নিজেকে রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক হিসেবে অনুভব করবে, এবং রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নীতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় বাইরের প্রভাব ও আগ্রাসন থেকে মুক্ত থাকবে। অতএব, স্বাধীনতা দিবসে গণমানুষের ভাগ্যের প্রকৃত পরিবর্তনই হোক আমাদের স্বাধীনতার মূল অঙ্গীকার। এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন সুদৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কার্যকর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং সর্বোপরি একটি জাগ্রত, দায়িত্বশীল ও অংশগ্রহণমূলক নাগরিক সমাজ। অন্যথায় স্বাধীনতা একটি প্রতীকী অর্জন হিসেবেই থেকে যাবে, কিন্তু তার বাস্তব রূপ চিরকালই আমাদের নাগালের বাইরে রয়ে যাবে। তাই স্বাধীনতা দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক- স্বাধীনতাকে কেবল অতীতের একটি সাফল্য হিসেবে নয়, বরং একটি চলমান, ক্রমবিকাশমান প্রকল্প হিসেবে দেখা; এবং সেই প্রকল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে গণমানুষের মুক্তি, মানবিক মর্যাদা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা। লেখক: ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য।